বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বন্যা, খরা, হিমবাহ গলন, খাদ্য সংকট, রোগের বিস্তারসহ নানা দুর্যোগ বিশ্বজুড়ে জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে। এমন সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ পাকিস্তান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো “জলবায়ু-কেন্দ্রিক বাজেট” ঘোষণা করেছে। এটি শুধুমাত্র একটি বাজেটীয় পরিকল্পনা নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের পথে পাকিস্তানের নতুন যাত্রার সূচনা।
এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, দেশের ৩০ শতাংশ পাবলিক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পকে Climate Public Investment Management Assessment (CPIMA) এর আওতায় আনা হবে। অর্থাৎ কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তা জলবায়ু ও পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা পূর্বেই মূল্যায়ন করা হবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রতিফলন।
পাকিস্তানের জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেজরা মানসাব আলী খান খারাল জানান, “এই বাজেটের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় জলবায়ু বিবেচনা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।” এটি পাকিস্তানের জন্য এক বড় ধরনের নীতিগত ও প্রশাসনিক অগ্রগতি।
কেন এই উদ্যোগ জরুরি?
পাকিস্তান বিগত দশকে একের পর এক জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়, প্রায় দুই কোটি মানুষ গৃহহীন হয়। কৃষি, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো খাতগুলিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নানা সংকটের শিকার।
ভারতের সঙ্গে ইন্দাস পানি চুক্তি কার্যত স্থগিত হওয়ায় পাকিস্তানে পানি সংকট তীব্রতর হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এর কৃচ্ছ্রতা কর্মসূচির চাপে পড়ে দেশটির উন্নয়ন ব্যয় সীমিত হয়ে গেছে। এসব প্রেক্ষাপটে জলবায়ুকেন্দ্রিক বাজেট প্রণয়ন একটি সময়োচিত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
এই বাজেটের মাধ্যমে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যেগুলো জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনকে এগিয়ে নেবে:
পাকিস্তান ক্লাইমেট চেঞ্জ অথরিটি-কে সক্রিয় করা হয়েছে, যাতে জলবায়ুবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন সহজ হয়।
জাতীয় ক্লাইমেট ফাইন্যান্স স্ট্র্যাটেজি প্রণয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়া ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
“জেন্ডার ও ক্লাইমেট বাজেট ট্যাগিং” যুক্ত করে বাজেট ব্যবস্থায় আরও সমতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান ও ই-বাইকের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেটের ৭.৭% সিভিল গভর্নমেন্ট ফান্ড এবং ১৫.৩% পাবলিক সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ফান্ড জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে।
এই বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাকিস্তানের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব হবে। বিশেষ করে কৃষি, পানি ও জ্বালানি খাতে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়বে। ফলে শুধু যে জনগণের জীবনমান উন্নত হবে তা নয়, বরং আর্থিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সহযোগিতা অর্জনের পথও সুগম হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে পাকিস্তানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
পাকিস্তানের এই জলবায়ু-কেন্দ্রিক বাজেট এক ধরনের দৃষ্টান্ত। এটি শুধু পাকিস্তান নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যও অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে। বিশ্ব যখন জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে, তখন এমন উদ্যোগই হতে পারে মানবজাতির ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ।


