Home Blog Page 45

চীনে ব্রহ্মপুত্রের উজানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ভারত ও বাংলাদেশ কি আসলেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

রয়টার্স রিপোর্ট – গত রোববার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং তিব্বতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করার ঘোষণা দেন। বলা হচ্ছে, পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এটি যুক্তরাজ্যের সারা বছরের বিদ্যুতের চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।

উজানে চীন যে নদীর ওপর এই বাঁধ নির্মাণ করছে, সেই ইয়ারলুং জাংপো নদীই ভারতে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নাম নিয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে ভাটির দেশগুলোতে পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

তিব্বত মালভূমিতে ইয়ারলুং জাংপো নদীর যে অংশে নতুন জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে নদীর একটি অংশ ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) চওড়া হয়ে প্রায় ২ হাজার মিটার (৬ হাজার ৫৬১ ফুট) উঁচু থেকে নিচে প্রবাহিত হয়েছে, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সেখানে ধাপে ধাপে পাঁচটি বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

২০৩০-এর দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই এই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় ও সম্ভাব্য সময়সীমা ছাড়া এর নির্মাণ পদ্ধতি সম্পর্কে চীন এখনো তেমন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

তথ্যের এ ঘাটতি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র নদ কৃষিকাজ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানীয় জলের জন্য দুই দেশেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল মঙ্গলবার বলেছে, ইয়ারলুং জাংপো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ চীনের সার্বভৌম অধিকারের অন্তর্গত বিষয়। চীনের যুক্তি, এই বাঁধ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ করবে ও বন্যা প্রতিরোধ করবে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আরও বলা হয়–ইয়ারলুং জাংপো প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য, বন্যানিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ প্রশমন সহযোগিতা বিষয়ে চীন ভাটির দেশগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও করেছে।

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারত-চীন পানি সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সায়ানাংশু মোদক রয়টার্স-কে বলেন–এই বাঁধের কারণে ভাটির দিকে পানিপ্রবাহে যে প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা খানিকটা অতিরঞ্জিত। কারণ, ব্রহ্মপুত্র নদে যে বিপুল পরিমাণ পানি আসে তার বেশির ভাগই হিমালয়ের দক্ষিণে মৌসুমি বৃষ্টি থেকে আসে, চীন থেকে নয়।

মোদক আরও বলেন, চীনের পরিকল্পিত প্রকল্পটি একটি ‘রান অব দ্য রিভার’ ধরনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর অর্থ হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র নদের স্বাভাবিক প্রবাহপথেই পানি প্রবাহিত হবে, এর গতিপথে বড় ধরনের বাধা দেওয়া যাবে না।

ভারত নিজেও এ নদীর ওপর দুটি বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনের ইয়ারলুং জাংপো নদী ভারতে সিয়াং নাম নিয়ে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে যে বাঁধটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটি ১১.৫ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকল্প হওয়ার কথা। এটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে ভারতের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

ভারতের একটি নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে যে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত হলে চীন ইচ্ছাকৃতভাবে এই বাঁধ ব্যবহার করে পানির প্রবাহ বন্ধ করতে বা ঘুরিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের অভিযোগ–ভারত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল কাশ্মীরে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা পানির উৎসগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, বিশেষ করে নয়াদিল্লি সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত করেছে।

চীনের নতুন জলবিদ্যুৎ বাঁধটি একটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে। ভূমিধস, হিমবাহ হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা ও ঝড়ের জন্যও অঞ্চলটি ঝুঁকিপূর্ণ। এমন একটি এলাকায় বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে প্রকল্প বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে এ বছরের শুরুর দিকে তিব্বতে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল স্টেকলার বলেছেন, এই বাঁধ শুধু পানিপ্রবাহ কমিয়ে দেবে, এমনটা নয়; বরং এই বাঁধের ফলে ভাটি অঞ্চলের দিকে পলি বা কাদামাটির প্রবাহও কমে যাবে। এই পলিমাটি ভাটির বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি পুষ্টি উপাদান বহন করে।

(সূত্র : রয়টার্স, প্রথম আলো)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বেগ, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে

মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একটি জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।

ডব্লিউএইচও-এর মেডিকেল অফিসার ডায়ানা রোজাস আলভারেজ ২২ জুলাই জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন মানুষ ১১৯টি দেশের এমন অঞ্চলে বসবাস করেন যেখানে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি রয়েছে।

রোহাস আলভারেজ ২০০৪-০৫ সালের প্রাদুর্ভাবের কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, “আমরা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি।” সেবার প্রায় ৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং প্রাথমিকভাবে ছোট ছোট দ্বীপ থেকে এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

চলতি বছরের শুরু থেকেই ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব বেড়েছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লা রিইউনিয়ন, মায়োতি এবং মরিশাস দ্বীপে। শুধুমাত্র লা রিইউনিয়নে এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আলভারেজ।

এছাড়া ভাইরাসটি বর্তমানে মাদাগাস্কার, সোমালিয়া এবং কেনিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতেও সংক্রমণের হার বেড়েছে।

ফ্রান্সে ১ মে থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০টি সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে এবং দক্ষিণ ফ্রান্সে ১২টি স্থানীয় সংক্রমণের ঘটনা পাওয়া গেছে, যার মানে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিদেশ ভ্রমণ না করেও স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছেন। ইতালিতেও গত সপ্তাহে একটি স্থানীয় সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।

চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এটি মূলত এডিস প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায় — বিশেষ করে ‘টাইগার মশা’, যেটি ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসও বহন করে। এডিস জাতীয় মশারা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়, তাই প্রতিরোধই চিকনগুনিয়া ভাইরাস থেকে বাঁচার প্রধান উপায়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকজনকে মশার স্প্রে ব্যবহার এবং লম্বা হাতাযুক্ত পোশাক পরারও পরামর্শ দিয়ে আসছেন। এই চিকনগুনিয়া ভাইরাসে তীব্র জ্বর, হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রতিবন্ধিতা দেখা দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভাইরাসটি খুব দ্রুত ছড়ায় এবং বড় পরিসরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ফলে এটি এখন একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

(সূত্র : রয়টার্স, bdnews24.com, দেশ টিভি অনলাইন)

গাজায় মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ চলছে : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বুধবার জেনেভা থেকে একটি ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন–ইসরায়েলি আক্রমণ ও সহায়তা প্রবেশ বন্ধের কারণে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ চলছে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও ডব্লিউএইচওর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে–গত রাতেই আরও ১০ জন ফিলিস্তিনি খাদ্যাভাবে মারা গেছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে অপুষ্টিজনিত কারণে গাজায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১১ জনে। আর এর বেশিরভাগই গত কয়েক সপ্তাহে ঘটেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে–২০২৪ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের মধ্যে ২১ জনের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। সংস্থাটি বলছে, মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৮০ দিন তারা গাজায় কোনো খাদ্যসামগ্রী পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমানে কিছু খাদ্য সহায়তা পাঠানো শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

ডব্লিউএইচও বলছে, পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে— বর্তমানে গাজায় পরীক্ষা করা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ১০% মাঝারি বা তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন এবং গর্ভবতী নারীদের মধ্যে এই হার ২০% পর্যন্ত।

শুধু জুলাই মাসেই ৫ হাজার ১০০ শিশুকে অপুষ্টিজনিত চিকিৎসায় ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮০০ জন চরম রকমের শুকনো ছিল বলে জানান ফিলিস্তিনে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি রিক পিপারকর্ন।

তিনি বলেন, ত্রাণ নিতে আসা মানুষের ওপর একের পর এক হামলার ফলে গাজায় অবশিষ্ট থাকা কিছু হাসপাতাল এখন ‘বৃহৎ ট্রমা ওয়ার্ডে’ পরিণত হয়েছে।

পিপারকর্ন আরও বলেন, খাদ্যের এমন চরম সংকট চলছে যে মানুষ স্বাভাবিক কাজকর্মই করতে পারছে না। এমনকি খাদ্যসংকটে সাংবাদিক, শিক্ষক, ডব্লিউএইচওর নিজস্ব কর্মীরাও নিজেদের কাজ করতে পারছেন না।

গাজা নগরের আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসক নূর সরাফও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে থাকছে। এখন তারা অনাহারে মারা যাচ্ছে। অনেক সময় চিকিৎসকেরা খাবার পান না, তবু তাঁরা কাজ করে যান।’

এক যৌথ বিবৃতিতে মার্সি কর্পস, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল এবং রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনালসহ ১১১টি আন্তর্জাতিক সংগঠন জানিয়েছে, “গাজায় এখন গণ-অনাহারের পরিস্থিতি চলছে”। অথচ সীমান্তের বাইরে বিপুল পরিমাণ খাদ্য, পানি ও ওষুধ মজুদ থাকলেও ইসরাইলের অবরোধের কারণে সেগুলো সহায়তাকারী সংস্থাগুলো প্রবেশ করাতে পারছে না।

(সূত্র : প্রথম আলো, দেশ রূপান্তর)

বিজ্ঞানীরা স্মার্ট স্যানিটারি প্যাড তৈরি করেছেন, যা ঋতুস্রাবের রক্তে ক্যানসার, প্রদাহসহ নানা রোগ শনাক্ত করতে পারে।

মেনস্ট্রুএআই (MenstruAI) কী?

ETH জুরিখ-এর গবেষক লুকাস ডোসনন ও তার দল ‘MenstruAI’ নামে একটি স্মার্ট স্যানিটারি প্যাড তৈরি করেছেন, যা ঋতুস্রাবের রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের সংকেত শনাক্ত করে। এটি একটি সহজ, ব্যথাহীন এবং তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা পদ্ধতি।

MenstruAI কীভাবে কাজ করে?

এই প্যাডে সিলিকন চেম্বারের ভেতরে কাগজ-ভিত্তিক একটি র‍্যাপিড টেস্ট স্ট্রিপ থাকে। ঋতুস্রাবের রক্ত সেই স্ট্রিপের অ্যান্টিবডির সঙ্গে সংস্পর্শে এলে রঙ পরিবর্তন হয়। ব্যবহারকারী একটি ছবি তুলে AI অ্যাপে দিলে সেটি রঙের ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে কোন বায়োমার্কার কতটা আছে তা জানায়।

যে বায়োমার্কারগুলো শনাক্ত করা যায়

MenstruAI বর্তমানে C-reactive protein (প্রদাহের নির্দেশক), CEA (টিউমারের চিহ্ন) এবং CA-125 (এন্ডোমেট্রিওসিস ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত) শনাক্ত করতে পারে। ভবিষ্যতে আরও প্রোটিন বায়োমার্কার যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলো আরো বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারবে।

ব্যবহারিক দিক ও পরীক্ষার প্রক্রিয়া

প্রাথমিকভাবে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই পরীক্ষার পর ১০০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে বৃহত্তর পরীক্ষা চালানো হবে। এতে বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে এবং পরীক্ষাগারে করা টেস্টের সঙ্গে ফলাফল তুলনা করা হবে। এটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে ল্যাব ছাড়াও খুব সহজে ব্যবহার করা যায়।

প্রভাব ও ভবিষ্যত লক্ষ্য

MenstruAI একটি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা হতে পারে। এটিতে সহজে অস্বাভাবিক মান ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে। এছাড়াও এই প্যাড নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে, সামাজিক কুসংস্কার ভাঙতে এবং বিশ্বজুড়ে জনভিত্তিক স্ক্রিনিং ব্যবস্থার পথ খুলে দিতে পারে।

ফ্রান্ৎস কাফকা কি অতিমূল্যায়িত : জোসেফ এপস্টেইন, লেখক ও সমালোচক

এডমন্ড উইলসন বলেছিলেন, সকালের নাশতার সময় তিনি একমাত্র মারকুই দ্য সাদের বই-ই পড়তে পারেন না। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন আমি সকালের চা ও টোস্টের সঙ্গে কাফকার লেখা পড়তে পারি না। অত বেশি যন্ত্রণা, ক্ষত-বর্ণনা, বিভ্রান্তি, স্যাডোম্যাসোকিজম, অকারণ নিষ্ঠুরতা, আর ইঁদুর, পোকামাকড়, শকুনের মতো বিচিত্র জীবের আবির্ভাব—সব মিলিয়ে এক গভীর হতাশার পটভূমি তৈরি করে কাফকা, যা সকালটা বিষণ্ন করে তোলে।আর রাতের ঘুমের আগে তো কথাই নেই, কাফকা মোটেও সান্ত্বনাদায়ক পাঠ নয়।

হাইপোকন্ড্রিয়াক, অনিদ্রাগ্রস্ত, খাদ্যসংকীর্ণ, সিদ্ধান্তহীন, জীবনের ভয়ে ভীত, এবং মৃত্যু নিয়ে সারাক্ষণ ভাবত কাফকা, তাঁর স্নায়বিক দুর্বলতাগুলোকেই শিল্পে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। আইজাক বাসেভিস সিঙ্গারের একটি গল্পে একজন চরিত্র বলেছে, কাফকা ছিল “হোমো স্যাপিয়েন্সের আত্ম-নির্যাতনের সর্বোচ্চ রূপ।” তবুও আজ সবাই একমত যে কাফকা একজন আধুনিক মাস্টার, এমন একজন শিল্পী যিনি জেমস জয়েস, পিকাসো, স্ট্রাভিনস্কি বা মালার্মের মতো আধুনিকতার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন।

এরিখ হেলার লিখেছিলেন, কাফকা তৈরি করেছেন “অন্ধকার স্বচ্ছতা”, একটি শিল্প যেখানে জিনিসপত্র যেন পরিষ্কার, অথচ বোধগম্য নয়। আমরা ভাবি বুঝেছি, কিন্তু কি সত্যিই বুঝেছি? তার একটি বিখ্যাত উক্তি: “লুকানোর জায়গা অসংখ্য, পালানোর পথ একটি, কিন্তু পালানোর সম্ভাবনা আছে যতটা লুকানোর জায়গা আছে।” আরেকটা “একটি খাঁচা খুঁজছিল একটি পাখিকে।” কাফকার ছোট ছোট রূপক-গল্প নিয়েও বিশ্লেষণ থামে না।

ওয়াল্টার বেঞ্জামিন লিখেছিলেন, কাফকার রচনাগুলো “কখনোই ব্যাখ্যার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় না; বরং তিনি ব্যাখ্যা প্রতিরোধের জন্যই সব রকম সাবধানতা অবলম্বন করতেন।” তবুও সেই সাবধানতা ফলপ্রসূ হয়নি। শেক্সপিয়ার ও বাইবেলের পর কাফকার লেখাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যাখ্যাত এবং হয়তো অতিরিক্ত ব্যাখ্যাত।

২০১২ সালে টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট পত্রিকায় গ্যাব্রিয়েল যসিপোভিচি কাফকার ওপর বেশ কিছু বইয়ের আলোচনা করেন। তার মধ্যে ইতিহাসবিদ সল ফ্রিডল্যান্ডারের লেখা Franz Kafka: The Poet of Shame and Guilt একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ইতিহাসবিদ হলেও, কাফকার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক। দুজনই জার্মানভাষী ইহুদি এবং প্রাগে বেড়ে ওঠা। কাফকা যেভাবে নাৎসি শিবিরে তিন বোনকে হারিয়েছিলেন, ফ্রিডল্যান্ডারও নিজের মা-বাবাকে হারিয়েছিলেন ।

ফ্রিডল্যান্ডার বুঝেন কাফকাকে নিয়ে কত রকম ব্যাখ্যা চালু আছে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি হলো—“কাফকা ছিল নিজের ভেতরের বিশৃঙ্খলার কবি।” যদিও তিনি সরাসরি বলেননি, তবুও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কাফকা হয়তো চেপে রাখা সমকামী ছিলেন এবং তাঁর লজ্জা ও অপরাধবোধ মূলত সেখান থেকেই। যদিও এক পর্যায়ে নিজেই লেখেন, “সম্ভবত কাফকা কখনো সমকামী সম্পর্কে চিন্তাও করেননি।” তবুও কাফকার রচনায় তিনি এমন গোপন সত্য খুঁজে পান যা চরিত্ররা লুকাতে চায়। “একটা কিছু আছে যা গোপন এবং যা সে লুকাতে চেষ্টা করে—এটা কি কাফকার নিজের যৌন প্রবণতা লুকানোর চেষ্টা নয়?”

তিনি কাফকার তরুণ বয়সে ছেলে বন্ধুদের প্রতি “হোমোইরোটিক” ঝোঁকের কথা উল্লেখ করেন, আবার বলেন কাফকার নারীদের চিত্রায়ন প্রায় অমানবিক।এমনকি “A Country Doctor” গল্পে এক শিশুর ঘায়ের মধ্যে কীটের ওলটানো প্রতীক হিসাবে যোনির ইঙ্গিতও টানেন। সমালোচকেরা নিরবিচারে ঘুমালেও, সমালোচনার পাহারা চলে।

কাফকা নাকি প্রুস্তের মতো দীপ্তিমান নন, জয়েসের মতো উদ্ভাবক নন তবুও, জেরেমি অ্যাডলারের মতে, কাফকার দৃষ্টিভঙ্গি বেশি তীব্র, বেদনাদায়ক এবং সার্বজনীন। কাফকা শহরের নাম দেননি, চরিত্রের চেহারা বর্ণনা করেননি, তার গল্পের প্রেক্ষাপট যেন দুঃস্বপ্নের মতো আবছা, এটি এক ধরণের সাধারণতা থেকে বিস্তারিতের দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়া।

এরিখ হেলার বলেছিলেন, কাফকার সাহিত্য ও আত্মজীবনী প্রায় এক হয়ে গেছে। কাফকার জীবনের চিত্র, অপ্রসন্নতা, সন্দেহ, মানসিক যন্ত্রণা সবারই জানা। তাঁর বিখ্যাত চিঠি Letter to His Father এ জানা যায়, বাবা ছিলেন শক্তিধর ও কর্তৃত্ববাদী, যিনি ছেলের মনে জন্ম দিয়েছিলেন চিরস্থায়ী অযোগ্যতার অনুভব। তাঁর সরকারি চাকরিটিও তাঁকে এনে দিয়েছিল সেই দুর্বোধ্য, দুঃস্বপ্নময় আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা, যাকে আজ “Kafkaesque” বলা হয়।

“The Metamorphosis” বা “The Judgment” এর মতো গল্পে কাফকার সেই পিতৃপ্রভুত্ব ফিরে ফিরে আসে। “In the Penal Colony” বা “The Trial”-এ অপরাধহীন মানুষদেরও সাজা পেতে হয় ব্যাখাহীনভাবে। এমন সব গল্পের মধ্য দিয়ে কাফকা তুলে ধরেন অন্তঃসারশূন্য এক জীবনের দুঃস্বপ্ন যেখানে যুক্তি পরাজিত, অপরাধ অজানা, আর শাস্তি অবশ্যম্ভাবী।

লুইস বেগলি বলেন, কাফকা “মানব অবস্থান” লিখেছেন নিয়ে। হেলার বলেন, কাফকা সময়ের বাস্তবতাকে অতিক্রম করে গেছেন। কিন্তু তারা কেউই বলেন না, কীভাবে?

ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মতে, কাফকার লেখা এক ধরণের সংকেত যার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই, বরং প্রতিটি রচনায় তা বদলায়। কাফকা নিজেই বলেছিলেন, তাঁর প্রতিভা ছিল “স্বপ্নময় অন্তর্জীবন চিত্রায়নে।” কিন্তু স্বপ্ন, যতই মোহময় হোক, শিল্পগতভাবে অপূর্ণ লাগে বিশেষ করে তাদের শেষ অংশে। কাফকাও “The Metamorphosis” এর শেষ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। হয়তো সেই কারণেই তাঁর উপন্যাসগুলো অসম্পূর্ণ থেকে গেছে, দুঃস্বপ্নের তো কোনও ঠিকঠাক উপসংহার হয় না।

অবশ্য কাফকার গল্পগুলো নিঃসন্দেহে নিরানন্দ হলেও, মাঝে মাঝে তাতে অদ্ভুত হাস্যরসের ছোঁয়াও থাকে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়া, বাসায় বল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ব্যাচেলর গভীর শূন্যতার মধ্যে একরকম উদ্ভটতা। কাফকা একবার The Trial এর প্রথম অধ্যায় পড়ে শুনিয়ে নিজেই হেসেছিলেন। কিন্তু সেই হাসি থাকে না; পাঠকের মনে রয়ে যায় ভয়, বিভ্রান্তি, শূন্যতা।

আজকের দুনিয়ায় অনেকে কাফকাকে এক ধরণের ভবিষ্যৎবক্তা ভাবেন, যিনি পূর্বাভাস দিয়েছিলেন স্বৈরশাসনের, বিশেষ করে সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের।কিন্তু তাঁর গল্পগুলোতে পিতৃআক্রান্ততা আর ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের গন্ধ আজ অনেকের কাছেই অচল। কাফকা নিজেই বলেছিলেন, “The Judgment” লেখার সময় তিনি ফ্রয়েডকে নিয়ে ভাবছিলেন। তাঁর গল্পে স্বপ্ন ও অচেতন মন সবই সেই সময়ের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন।

আজ ফ্রয়েডের ভাবনা ভেঙে পড়েছে, কিন্তু কাফকা এখনো টিকে আছে। প্রশ্ন হলো ফ্রয়েড ছাড়া কাফকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? অনেকে বলেন, কাফকাকে বিশ্লেষণ না করে শুধু অনুভব করতে হয়। কিন্তু যদি সেই অনুভব আজকের যুগে যথেষ্ট না হয়? শেষ কথায় ফিরে যাই, হেনরি জেমস বলেছিলেন, কোনো লেখকের সম্পর্কে আমরা জানতে চাই: “সে জীবনের প্রতি কী অনুভব রাখে?” কাফকার উত্তর জীবন জটিল, ভীতিকর, বিষণ্ন। কিন্তু একজন মহান লেখক তো জীবনের রহস্যে মোহিত হন; কাফকা, বরং, সেগুলোতে পিষ্ট হয়েছিলেন।

আদি শঙ্করের দর্শনে – ‘আমি কে?’ এই প্রশ্নের সহজ কিন্তু গভীর উত্তর

ভাবুন আপনি একটা স্বপ্ন দেখছেন। স্বপ্নে আপনি পাহাড়ে উঠছেন, নিচে নেমে আসছেন, ভয় পাচ্ছেন, আনন্দ পাচ্ছেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। আপনি বুঝতে পারেন সব কিছু কল্পনা ছিল, আপনি আসলে নিজের বিছানাতেই আছেন। কিন্তু স্বপ্নটা কি পুরোপুরি মিথ্যা ছিল? নাকি কোনো সত্যও তার পেছনে লুকিয়ে ছিল?

আদি শঙ্করের দর্শন এই প্রশ্নটির গভীরে যায়। তিনি বলেন, আমাদের এই জাগতিক জীবনটিও একধরনের “মায়া”, একটি বিভ্রম। এবং এর পেছনে রয়েছে একটি চরম সত্য, ব্রহ্ম। এই ব্রহ্মই আমাদের আসল পরিচয়। এই ভাবনাটিই “অদ্বৈত বেদান্ত” নামে পরিচিত।

আদি শঙ্কর ছিলেন ৮ম শতাব্দী’র একজন বিশিষ্ট দার্শনিক ও সাধক, যিনি ভারতীয় দর্শনের অদ্বৈত শাখাকে একটি সুসংহত ও যুক্তিনিষ্ঠ কাঠামো দেন।তিনি বলেছিলেন, আত্মা (অর্থাৎ ‘আমি’) এবং ব্রহ্ম (সর্বব্যাপী চেতনা বা ঈশ্বর) এক ও অভিন্ন। একজন পথিক যেমন তার পথ ভুলে শহরের গলিতে হারিয়ে যায়, তেমনি আমরা আমাদের সত্য পরিচয় ভুলে গেছি জাগতিক পরিচয়ের জালে। শঙ্করের দর্শন হলো এই ভুল চেনাকে ভাঙা, এই বিভ্রম থেকে জাগা।

শঙ্করের মতে, আমরা জগৎকে যেভাবে দেখি তা একধরনের মায়া। কিন্তু মায়া মানে কেবল মিথ্যা নয়। বরং এটা সত্য আর মিথ্যার মাঝখানের এক ঘোলাটে স্তর যা সত্যকে আড়াল করে রাখে, আবার সত্যের ইঙ্গিতও দেয়।

যেমন ধরুন, আপনি দূর থেকে একটা দড়ি দেখলেন এবং ভয় পেয়ে ভাবলেন এটি সাপ। পরে কাছে গিয়ে দেখলেন, সেটি আসলে দড়ি। এখানেও আপনি কিছু দেখেছেন, কিছু অনুভব করেছেন—কিন্তু ভুল বুঝেছেন। এই দড়ি-সাপের উপমাই শঙ্কর ব্যবহার করেন বোঝাতে, আমরা জগতকে যেমন দেখি, তেমনটি তা নয়। কিন্তু এই জগত সম্পূর্ণ মিথ্যাও নয়, কারণ একে দেখার জন্য কোনো না কোনো ভিত্তি তো থাকতেই হয়। সেই ভিত্তিই হলো ব্রহ্ম।

আমরা যখন নিজের মধ্যে ঢুকি সব অনুভব, চিন্তা, ইচ্ছার পেছনে যে চেতনা কাজ করে, সেটিই ব্রহ্ম। এই চেতনা কখনো বদলায় না, জন্মেও না, মরে না।শঙ্করের ভাষায়, “জগত পরিবর্তনশীল, কিন্তু চেতনা অপরিবর্তনীয়। এটাই একমাত্র বাস্তব।” শঙ্করের দর্শনে তাই ঈশ্বর, আত্মা ও জগতের বিভেদ অপ্রয়োজনীয়। আমরা যেমন সমুদ্রে ঢেউ দেখি—তবে জানি ঢেউ, ফেনা, জলোচ্ছ্বাস—সবই আসলে জল, তেমনি আমাদেরও সার সত্য একটাই, চেতনাময় ব্রহ্ম।

শঙ্কর তর্ক করেন, কিন্তু সেটা কেবল যুক্তির খাতিরে নয় তাঁর যুক্তি সবসময় অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, আপনি কেবল বই পড়ে বা গুরুকে শুনে সত্যকে বুঝবেন না, আপনাকে নিজের ভেতর ডুব দিতে হবে।

এই উপলব্ধির পথ হলো “জ্ঞানযোগ” বা আত্মানুসন্ধানের পথ। তিনি বলেন, “যতক্ষণ তুমি মনে করো তুমি শরীর, মন, পরিচয়, ততক্ষণ তুমি তোমার মূল সত্য ভুলে আছো।” এই ভুল ভাঙতে লাগে প্রশ্ন, “আমি কে?”—এ প্রশ্নই মুক্তির দিকচিহ্ন।

এই দর্শন আমাদের জীবনে কী দেয়?
ভাবতে পারেন “এই দর্শন আমার জীবনে কী কাজে আসবে?” চলুন সহজ উদাহরণে যাই। ধরা যাক, আপনি খুব দুঃখী, চাকরি হারিয়েছেন, সম্পর্ক ভেঙেছে।আপনি যদি ভাবেন আপনার পরিচয় এই চাকরি বা এই সম্পর্ক তাহলে আপনি নিজেকেও হারাবেন। কিন্তু যদি আপনি বুঝেন, “আমি সেই চেতনা, যার অভ্যন্তরে এই অভিজ্ঞতাগুলো ঘটছে” তাহলে আপনি দুঃখের মাঝে থেকেও অটুট থাকবেন।

শঙ্কর বলেন, “তুমি যা নও, তা আঁকড়ে ধরো না।” নিজের অভ্যন্তরে থাকা সেই নিরবিচল চেতনাকে চিনলে জীবন বদলাতে বাধ্য।

আদি শঙ্করের দর্শন কোনো ধর্মীয় ঘেরাটোপ নয়, বরং এটি একটি অভ্যন্তরীণ বিপ্লব। যেখানে “আমি” বলতে আমরা যা বুঝি, তা চূর্ণ হয়ে যায় এবং উঠে আসে একটি চিরন্তন, নির্বিকল্প চেতনার অনুভব। এই দর্শন আমাদের শেখায়, সত্যের জন্য বাইরের জগত নয়, নিজের ভেতরেই যেতে হবে। কারণ আমরা যে চেতনাকে খুঁজছি, সেই চেতনা দিয়েই তো আমরা খুঁজছি!

শঙ্করের অদ্বৈত দর্শন আমাদের শেখায়, জগত এক, সত্য এক, এবং আমরাও সেই একেরই প্রতিফলন। দুঃখ, ভয়, বিভেদ সবই অজ্ঞানতার ফল। আর এই জ্ঞানেই রয়েছে মুক্তি, যা কোনো গ্রন্থ নয়, কোনো গুরুও নয় আপনার নিজের ভেতরের জ্যোতির আলোয় উদ্ভাসিত।

নিউরাল নেটওয়ার্ক – কৃত্রিম নিউরন মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে?

বর্তমান যুগের প্রযুক্তি বিপ্লবের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। তার অন্তর্গত একটি অত্যাধুনিক ক্ষেত্র হলো নিউরাল নেটওয়ার্ক, এটি মানুষের মস্তিষ্কের নিউরন তথা স্নায়ুতন্ত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি। এটি এমন একটি গাণিতিক মডেল যা বিভিন্ন ধরনের তথ্য থেকে শেখার মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা মেশিনকে শেখাতে পারি যে কিভাবে ছবি চিনতে হয়, ভাষা বুঝতে হয়, এমনকি চিকিৎসায় রোগ শনাক্ত করতে হয়।

মানব মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে, যাদের মধ্যে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে তথ্য আদানপ্রদান হয়। নিউরাল নেটওয়ার্ক এই প্রক্রিয়াটির একটি অ্যালগরিদমিক অনুকরণ। এখানে কৃত্রিম নিউরন নামে ছোট ছোট গাণিতিক ইউনিট থাকে, যাদের বহু লেয়ারে সাজিয়ে তথ্য প্রক্রিয়া করা হয়। একটি নিউরন বিভিন্ন ইনপুট নেয় এবং তাদের ওজন (weight) অনুযায়ী গাণিতিকভাবে প্রক্রিয়া করে একটি আউটপুট দেয়। এই প্রক্রিয়া স্তর থেকে স্তরে চলতে থাকে, যতক্ষণ না আমরা চূড়ান্ত ফলাফল পাই।

শেখার মূল পদ্ধতি হলো “সুপারভাইজড লার্নিং”, যেখানে একটি নিউরাল নেটওয়ার্ককে প্রচুর সংখ্যক ডেটা দেওয়া হয়। ধরুন এটি হাজার হাজার বিড়ালের এবং কুকুরের ছবি দেখে, প্রতিটি ছবির সঠিক লেবেল দিয়ে। প্রথম দিকে এটি হয়ত ভুল করবে, কিন্তু প্রতিটি ভুলের জন্য এটি নিজেকে সংশোধন করে। এই সংশোধন পদ্ধতিটিকে বলা হয় ব্যাকপ্রোপাগেশন। এর মাধ্যমে প্রতিটি নিউরনের ওজন আপডেট হয়, যা ধাপে ধাপে ভুল কমিয়ে আনে। এইরকম হাজার হাজার চক্র চালিয়ে নিউরাল নেটওয়ার্ক তার দক্ষতা বাড়ায়।

এই শেখার পদ্ধতির কিছু জটিলতা আছে। যেমন, যখন নেটওয়ার্ক অনেক গভীর হয়, তখন “ভ্যানিশিং গ্র্যাডিয়েন্ট” সমস্যা দেখা দেয়, যার ফলে শেখার গতি কমে যায় বা থেমে যায়। আরেকটি সমস্যা হলো “ওভারফিটিং”, যেখানে নেটওয়ার্ক প্রশিক্ষণ ডেটাকে মুখস্থ করে দেয়, ফলে নতুন ডেটায় ভালো পারফর্ম করে না। এই সমস্যাগুলো সমাধানে বিভিন্ন কৌশল যেমন ড্রপআউট, ব্যাচ নরমালাইজেশন, এবং রেগুলারাইজেশন ব্যবহৃত হয়।

নিউরাল নেটওয়ার্ক মানুষের মস্তিষ্কের অনুকরণে তৈরি হলেও কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক তথ্য শুধু প্রক্রিয়া করে না, বরং আবেগ, স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ক্রিয়া ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে চিন্তা করে। অন্যদিকে নিউরাল নেটওয়ার্ক শুধুমাত্র গাণিতিক সূত্র ও ডেটার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এটি এখনও মানুষের মতো সাধারণ বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে পারেনি। তবে নির্দিষ্ট কাজ যেমন ছবি চিনতে, ভাষা অনুবাদ করতে বা রোগ শনাক্ত করতে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের সক্ষমতাকে ছাপিয়ে গেছে।

নিউরাল নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর ব্যাখ্যাযোগ্যতার অভাব। আমরা জানি এটি কী সিদ্ধান্ত নিল, কিন্তু কেন নিল তা বোঝা কঠিন। এই “ব্ল্যাক বক্স” সমস্যা নিয়েই একাধিক গবেষণা চলছে। Explainable AI বা XAI নামে এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যা এই জটিলতা দূর করার চেষ্টা করছে। এছাড়া নিউরাল নেটওয়ার্কে পক্ষপাত বা বায়াসের সমস্যা রয়েছে। যদি ডেটায় কোনো সাংস্কৃতিক বা সামাজিক পক্ষপাত থাকে, তবে মডেলও সেই পক্ষপাত বহন করে। তাই ডেটার সঠিকতা ও বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা জরুরি।

বর্তমানে নিউরাল নেটওয়ার্ক চিকিৎসা, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, ভাষা প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, আর্টিফিশিয়াল ক্রিয়েটিভিটি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মেডিকেল ইমেজ থেকে ক্যান্সার শনাক্তকরণ, গুগল ট্রান্সলেটের মতো ভাষা অনুবাদ, স্বয়ংক্রিয় গাড়ির অবজেক্ট ডিটেকশন ও ফ্রড ডিটেকশন ইত্যাদি এই প্রযুক্তির ফলাফল। তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, ততই এর নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নিউরাল নেটওয়ার্ক কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, বরং একটি চিন্তার দার্শনিক প্রশ্নও ছুঁয়ে যায়, যন্ত্র কি কখনো মানুষের মতো চিন্তা করতে পারবে? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনও দূর। তবে এতটুকু বলা যায়, নিউরাল নেটওয়ার্ক মানব বুদ্ধিমত্তার একটি শক্তিশালী সঙ্গী, যার সঠিক ব্যবহার আমাদের প্রযুক্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের সমন্বয়হীনতা ও গুজবে অস্থিরতা

0

রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিশু শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনার পর কিছু সরকারি সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতায় জনমনে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ক্ষোভ-বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। সরকারের দুই উপদেষ্টাকে দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে অবরুদ্ধ করে রাখারও ঘটনা ঘটে।

সোমবার রাত পৌনে ৩টায় স্থগিত করা হয় মঙ্গলবারের এইচএসসি পরীক্ষা। এতে বিভ্রান্তিতে পড়া ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের পর শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে পুলিশের বেষ্টনী ভেঙে ফটক টপকে সচিবালয়ে ঢুকে পড়েন।

স্কুলে প্রশিক্ষণ বিমান আছড়ে পড়ার পর আগুনে হতাহতদের পূর্ণাঙ্গ নাম-পরিচয়ের তালিকা প্রকাশ করতে না পারায়, মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে আগের রাত থেকেই ফেসবুকে গুজব ছড়ায়। কথিত প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে দাবি করা হয়, শত শত শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

নিহত ২৫ জনের লাশ গতকাল পর্যন্ত হস্তান্তর করা হয়েছে পরিবারের কাছে। আগুনে দগ্ধ বাকি ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় মরদেহগুলো মর্গে রয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় উদ্ধারে। এর বাইরে কারও নিখোঁজ থাকার দাবি গতকাল রাত পর্যন্ত কোনো পরিবারের ছিল না।

গতকাল প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মাইলস্টোন স্কুলের হতাহতদের জন্য জনসাধারণের কাছে সাহায্যের আহ্বান জানিয়ে পোস্ট করা হয়। তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং সমালোচনার পর এ পোস্ট সরিয়ে নেওয়া হয়। সরকারের কী হতাহত ২০০ মানুষকে সহায়তার সামর্থ্য নেই–এমন প্রশ্নও তোলা হয়।

তবে বেশি বিক্ষোভ হয়েছে মধ্যরাতে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তে। গত সোমবার সন্ধ্যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়, জেলা-উপজেলায় প্রশ্নপত্র পৌঁছে যাওয়ায়, তা ফাঁস ঠেকাতে পরীক্ষা স্থগিত করা হবে না। তবে শিক্ষা উপদেষ্টার বাসায় বৈঠক করে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ফেসবুক পোস্টে পরীক্ষা স্থগিতের সরকারি সিদ্ধান্ত জানান। এই ঘটনার জেরে শিক্ষা সচিবকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

শুধু হতাহতের সংখ্যা নয়, সামাজিক মাধ্যমে একটি পক্ষ কদিন ধরেই গুজব ছড়াচ্ছে–এবার এইচএসসি পরীক্ষার খাতা কঠিন করে দেখা হবে। এসএসসির মতো এইচএসসিতে তাই পাস এবং জিপিএ ৫ কমবে। এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগ চাচ্ছেন।

(সূত্র : দৈনিক সমকাল)

নাট্যচেতনার বিপরীতে থিয়েটার, পিটার ব্রুকের ‘The Empty Space’

বিশ্ব নাট্যসমালোচনার ইতিহাসে একটি বই প্রায় অনিবার্যভাবে আলোচনায় আসে, পিটার ব্রুকের The Empty Space (১৯৬৮)। এটি শুধু একটি নাট্যতত্ত্ব নয়, বরং থিয়েটারকে পুনরায় কল্পনা করার এক র‍্যাডিক্যাল আহ্বান। পিটার ব্রুক এই গ্রন্থে প্রশ্ন তুলেছেন, কীসের ভিত্তিতে আমরা থিয়েটার বলি? কতটা জীবন্ত আমাদের মঞ্চ? আর কতটা মৃত? তাঁর চার ধরনের থিয়েটার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আধুনিক নাট্যবিশ্ব এক নতুন তাত্ত্বিক আলো পায়; Deadly Theatre, Holy Theatre, Rough Theatre ও Immediate Theatre।

Deadly Theatre

পিটার ব্রুক যে থিয়েটারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন তা হলো Deadly Theatre। এটি এমন এক থিয়েটার যা জীবনের স্পন্দন হারিয়ে ফেলে শুধুমাত্র পুনরাবৃত্তি ও শৈল্পিক আলসেমিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা সবাই একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে কাজ করেন, যেন তারা শিল্প নয় বরং শিল্পের অনুকরণ করছেন। এই ধরনের থিয়েটার সাধারণত বড় প্রতিষ্ঠান, পুরষ্কার, কনভেনশন এবং তথাকথিত “ভদ্র সমাজের” কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু এই ‘গ্রহণযোগ্যতা’ই ব্রুকের দৃষ্টিতে এর মৃত্যু ঘটায়। তিনি বলেন, “আমরা তা-ই দেখি যা আমরা দেখতে অভ্যস্ত, আর যা অভ্যস্ত, তা আর চমকে দেয় না।” এই থিয়েটার দর্শকের চিন্তা উদ্রেক করে না, বরং তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।

Holy Theatre

Holy Theatre নাট্যচর্চাকে একধরনের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে পরিণত করে। এটি দর্শককে দৃশ্যমানের বাইরে যেতে শেখায়, এমনকি কখনো কখনো তাদের অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

এই থিয়েটার নির্মাণে প্রায়শই প্রতীক, রূপক, সংলাপবর্জিত ভাষা এবং অলৌকিক আবহ ব্যবহৃত হয়। ব্রুক এখানে অ্যান্টোনিন আরতো’র “থিয়েটার অফ ক্রুয়েলটি” বা গ্রোতোস্কির মঞ্চ ভাবনার উদাহরণ টানেন। তবে তিনি আবার সতর্কও করেন, যদি এই ধারা নিজেই একটি প্রথায় পরিণত হয়, তবে তা আবার Deadly Theatre-এ পরিণত হতে পারে। তাই Holy Theatre-এর প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, দর্শকের আত্মা ও মন দুইকেই জাগিয়ে তোলা। ভক্তিতে নয়, চেতনায়।

Rough Theatre

Rough Theatre মানুষের মাটির গন্ধে ভেজা থিয়েটার। এটি কোনো অলঙ্কারচর্চা নয়, বরং সরাসরি জীবনের বাস্তবতা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ নিয়ে কাজ করে। এ ধারা ব্রেখটের এপিক থিয়েটারের মতো রাজনৈতিক, প্রতিক্রিয়াশীল এবং খোলামেলা।

এটি এমন থিয়েটার, যা বাজারে, রাস্তায়, চায়ের দোকানে যে কোনো জায়গায় ঘটতে পারে। অস্থায়ী সেট, লোকজ সংগীত, দৈনন্দিন ভাষা সব মিলিয়ে এটি এক ধরণের ‘পাবলিক থিয়েটার’। ব্রুক মনে করেন, এই থিয়েটার সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করে, তাদের দুঃখ-কষ্ট ও হাস্যরসের ভাষায় কথা বলে। Rough Theatre-এর শক্তি তার জীবন্ততা ও স্বতঃস্ফূর্ততায়। এটি কখনোই ফর্মাল নয়, বরং খোলা মনে, খোলা জায়গায়, খোলা ভাষায় মঞ্চস্থ হয়।

Immediate Theatre

Immediate Theatre ধারা ব্রুকের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষিত থিয়েটার। এটি হলো এমন থিয়েটার যা সৃষ্টির মুহূর্তেই ঘটে, পুনরাবৃত্তি নয় বরং প্রতিবার নতুন। এখানে দর্শক শুধু দেখেন না, বরং প্রতিক্রিয়া জানান, শ্বাস ফেলে, হাসেন, চুপ করে থাকেন তারা থিয়েটারের অংশ হয়ে ওঠেন।

এই থিয়েটার একধরনের “জীবনের ট্রায়াল”, যেখানে আমরা রিহার্সাল ছাড়াই নিজেদের অনুভব করতে পারি। এটি অতীত বা ভবিষ্যতকে টেনে আনে না, বরং বর্তমান মুহূর্তে দর্শক ও শিল্পীকে নিক্ষিপ্ত করে। ব্রুক বলেন, Immediate Theatre হচ্ছে মঞ্চের সত্যিকারের স্পন্দন। এটি জীবন ও নাটকের মধ্যে প্রাচীর ভেঙে দেয়।

The Empty Space কোনো একক ধারা নয়, বরং একান্তভাবে নাট্যভাবনার বিপ্লব। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, আমরা কি জীবন্ত থিয়েটার করছি, নাকি প্রথার ছায়া? ব্রুক যেমন Deadly Theatre-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, তেমনি Rough ও Immediate ধারা দিয়ে তার বিকল্পও দেখিয়েছেন।

এটি শুধুই পরিচালক বা অভিনেতার জন্য নয়, দর্শকের জন্যও এক নতুন সচেতনতার পাঠ। সমসাময়িক থিয়েটার প্রায়শই প্রযুক্তি-নির্ভর, কর্পোরেট চাহিদা অনুযায়ী সাজানো, সেখানে এই বই হয়ে উঠেছে এক ধরণের অস্তিত্ববাদী প্রতিবাদ।

পিটার ব্রুকের The Empty Space শুধু একটি বই নয়, বরং একটি চেতনা-একটি প্রশ্ন “কীভাবে আমরা মানুষের গভীরতাকে স্পর্শ করবো?” থিয়েটার কি কেবল নাট্যচিত্র, না কি মানবিক সম্পর্ক ও সময়ের ভাষা? তিনি আমাদের শেখান একটি ফাঁকা মঞ্চ, একজন অভিনেতা, একজন দর্শক এই তিনেই শুরু হয় থিয়েটার। বাকিটা হলো বোধ, ছন্দ, ও সেই জাদু, যা শুধুই মুহূর্তের। তাই যারা আজও থিয়েটারকে জীবনের বাইরে দেখেন, তাদের জন্য এই বই এক তীব্র অন্তর্প্রবেশ।

ডিজাইনে ডিকনস্ট্রাক্টিভিজম কী? গেহরি কিভাবে বদলে দিলেন স্থাপত্যের ভাষা!

ভবন কি শুধু কোনো জায়গা যেখানে আমরা থাকি? এটিও এক ধরনের শিল্পকর্ম নয়? এই প্রশ্নের উত্তরে ফ্র্যাঙ্ক গেহরি স্থাপত্য জগতে নতুন বিপ্লব এনেছেন। তাঁর কাজ শুধু স্থাপত্য নয়, এক রকম নান্দনিক বিদ্রোহ, যেখানে প্রচলিত নিয়ম ভেঙে ফেলা হয় এবং নতুন রূপে শিল্প ও প্রযুক্তিকে মিশিয়ে তৈরি হয় আশ্চর্য ক্যানভাস।

ফ্র্যাঙ্ক গেহরির ডিজাইন দর্শনকে বোঝার জন্য আমাদের প্রথমেই ডিকনস্ট্রাক্টিভিজম (Deconstructivism) সম্পর্কে জানতে হবে। সাধারণত স্থাপত্যের মধ্যে সবাই সোজা লাইন, স্পষ্ট জ্যামিতিক আকৃতি এবং সুবিন্যস্ত গঠন প্রত্যাশা করে। কিন্তু গেহরির কাজ সেই নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তাঁর ভবনগুলো খণ্ডিত, অসমান এবং অনেক সময় এলোমেলো আকারের হয় তবে তাতেও একটা বিশেষ সৌন্দর্য এবং সংগতি থাকে। ঠিক যেন একটি ভাঙা-গড়া ভাস্কর্যের মতো, যা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
এই ধরনের অসামঞ্জস্য তাঁর ডিজাইনের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা শুধু চোখকে আনন্দ দেয় না, বরং দর্শকের মনে প্রশ্নও জাগায়। স্থাপত্য কি শুধুই ব্যবহারিক হতে হবে, না তার মধ্যেও থাকতে পারে শিল্প এবং আবেগ?

গেহরির নবপন্থা শুধু রূপকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন স্থাপত্যে ডিজিটাল প্রযুক্তির একজন পথপ্রদর্শক। বিশেষ করে বিমানের ডিজাইনের জন্য বানানো CATIA সফটওয়্যার ব্যবহার করে তিনি জটিল, বাঁকানো ও ঢেউখেলানো ভবনের ডিজাইন তৈরি করতেন। এই প্রযুক্তি তাঁকে ফ্রিজে ঢেউ টানার মতোই প্রাকৃতিক, তবু অপ্রত্যাশিত আকার নির্মাণ করতে সাহায্য করেছে।
এই ডিজিটাল ও কারিগরি সমন্বয় গেহরিকে ভবনের নকশাকে কেবল স্থির বস্তু না রেখে, জীবন্ত শিল্পকর্মে রূপান্তর করার সুযোগ দিয়েছে।

গেহরির কিছু বিখ্যাত সৃষ্টি –
গুগেনহেইম মিউজিয়াম, বিলবাও (১৯৯৭)

স্পেনের বিলবাও শহরে নির্মিত এই ভবনটি এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন। টাইটানিয়াম প্লেট দিয়ে মোড়ানো এই জাদুঘর শুধু দেখতেও চমৎকার নয়, শহরের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণেও বিশাল ভূমিকা রেখেছে। এই ঘটনার নামকরণ করা হয় “Bilbao Effect” অর্থাৎ এক ভবন যা পুরো শহরের জীবন বদলে দিতে পারে।

ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হল, লস অ্যাঞ্জেলেস (২০০৩)

এই ভবনটি দেখতে যেন এক সংগীতের ঢেউ। এর স্টেইনলেস স্টিলের ঢেউখেলানো গঠন এবং অভ্যন্তরীণ সাউন্ড সিস্টেম একসঙ্গে দর্শক ও শ্রোতাকে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা দেয়। এখানে গেহরি দেখিয়েছেন কীভাবে স্থাপত্য এবং সঙ্গীত একসাথে মিলতে পারে।

ড্যান্সিং হাউস, প্রাগ (১৯৯৬)

“ফ্রেড এবং জিঞ্জার” নামে পরিচিত এই ভবন দেখতে একজোড়া নাচানো শরীরের মতো। কাঁচ ও কংক্রিটের অসাধারণ সংমিশ্রণ ভবনটিকে শহরের অন্যতম দর্শনীয় আকর্ষণে পরিণত করেছে।

স্থাপত্যে ফর্ম (আকার) এবং ফাংশন (কার্যকারিতা) নিয়ে বহুকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে। অনেক স্থপতি মনে করেন, ভবনের কার্যকারিতা সবকিছুর উপরে। কিন্তু গেহরি দেখিয়েছেন, ফর্ম ও ফাংশন উভয়েরই গুরুত্ব থাকতে পারে এবং থাকা উচিত। তাঁর ডিজাইনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ছায়া ভবনকে শুধু দেখতে আকর্ষণীয় করে না, বরং সেখানে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতাকেও গভীর করে তোলে।
তিনি বলেন, “যদি সবকিছু নিয়ম-কানুন মেনে করতে হয়, তাহলে শিল্প সৃষ্টি কিভাবে হবে?” তাঁর কাজই সেই প্রশ্নের জবাব।

আমরা এখনও বেশিরভাগ স্থাপত্যেই পুরনো পদ্ধতির প্রভাব দেখি, সোজা লাইন, চৌকোনা রুম এবং প্রচলিত কাঠামো। কিন্তু গেহরির মতো স্থপতির কাজ তরুণ স্থপতি ও ডিজাইনারদের জন্য নতুন চিন্তার পথ খুলে দিয়েছে।
এই ডিজাইনগুলো শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে নতুন ধরনের ভাবনার সৃষ্টি করে যা সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য অপরিহার্য।

ফ্র্যাঙ্ক গেহরির স্থাপত্যে শেখার সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ভবন শুধুই কাজের জায়গা নয়, এটি এক অভিজ্ঞতা, এক অনুভূতি। তার ডিজাইনগুলো মানুষকে ভাবায়, মানুষকে স্পর্শ করে এবং অনেক সময় চ্যালেঞ্জও দেয়।
গেহরির ডিজাইন করা ভবনে গেলে শুধু চার দেয়ালের মধ্যে থাকার পরিবর্তে মনে হয় আপনি নিজেও আসলে এক ধরনের শিল্পকর্মের অংশ। সেটাই তার কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ফ্র্যাঙ্ক গেহরি শুধু ভবন ডিজাইন করেন না, তিনি স্থাপত্যের ভাষাও বদলে দেন। তার ডিজাইন বিশ্বকে শেখায়, স্থাপত্য কেবল ব্যবহারিক নয় তা হতে পারে এক শিল্পের রূপ, এক ভাবনার প্রকাশ। ভবিষ্যতের স্থপতিরা তাঁর কাজ থেকে শিখবে কিভাবে সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি আর সাহস একসঙ্গে মিশিয়ে স্থাপত্যকে নতুন রূপ দেওয়া যায়।