Home Blog Page 39

হলোকাস্টের ছাই থেকে উঠে আসা একক কণ্ঠস্বর – পাউল সেলান : নাসরুল্লাহ মাম্ব্রোল, লেখক, গবেষক ও সাহিত্য সমালোচক

পল সেলানের সবচেয়ে খ্যাতিমান ও বারবার উদ্ধৃত কবিতা নিঃসন্দেহে Death Fugue (Todesfuge)। সাহিত্য বিশ্লেষক সিদ্রা ডিকোভেন এজরাহি বলেছেন, এটি হোলোকাস্টের এমন এক প্রতীক হয়ে উঠেছে, যেমন হয়ে উঠেছে ওয়ারশ গেটোয় ছোট্ট ছেলেটির সেই বিখ্যাত ছবিটি, যে আতঙ্কে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

এই কবিতাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেখা হয় এবং ১৯৪৭ সালের মে মাসে রোমানিয়ার একটি ম্যাগাজিনে প্রথম ছাপা হয়, যেখানে এর নাম ছিল Tango of Death। এটি ছিল সেলানের প্রথম প্রকাশিত কবিতা এবং তিনির নতুন ছদ্মনাম “সেলান” ব্যবহার করার প্রথম উদাহরণও।

শোনা যায়, দার্শনিক থেওডর অ্যাডোর্নো যখন Death Fugue পড়েন এবং এতে থাকা অতিবাস্তব কল্পনা ও চরম সৌন্দর্যের মিশ্রণ দেখেন, তখনই তিনি তাঁর বিখ্যাত মন্তব্যটি করেন “আউশভিৎসের পর কবিতা লেখা বর্বরতা”। যদিও তিনি পরে এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন এবং এমনকি সেলানের একটি কবিতার বই অনুবাদ করতেও আগ্রহী ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তাঁর বই Negative Dialectics-এ অ্যাডোর্নো তাঁর সেই প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করেন।

প্রথমদিকে অনেকে এই কবিতাকে অতি-রোমান্টিক ও নান্দনিক বলে সমালোচনা করেন। বলা হয়, এটি হোলোকাস্টের ভয়াবহতাকে হালকা করে তোলে। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে জার্মানিতে যখন এই কবিতা ব্যাপক স্বীকৃতি পেতে থাকে, সেলান অনুভব করেন, জার্মান জাতি এই কবিতাকে তাদের অপরাধবোধ ঢাকতে ব্যবহার করছে। তাই তিনি এরপর আর কবিতাটি জনসমক্ষে পাঠ করতেন না এবং কোনো সংকলনে রাখতেও নিষেধ করেন।

যদিও কবিতাটি রূপক ও প্রতীকে পরিপূর্ণ, এতে যে সব ছবি আঁকা হয়েছে, সেগুলো বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে গড়া এবং হোলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকের বিবরণ থেকে নেওয়া। কবিতাটি যখন প্রথম ছাপা হয়, তখন তার পরিচিতিতেই বলা হয়েছিল এই ভাষা বাস্তবতার ভেতরেই প্রোথিত। সাহিত্য বিশ্লেষক জন ফেলস্টিনার Death Fugue-কে “পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্যের গুয়ার্নিকা” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

কবিতার শুরুতেই বন্দীদের কণ্ঠে ফিরে ফিরে আসে এক যন্ত্রণাকাতর উচ্চারণ:
“Black milk of daybreak we drink it at evening
we drink it at midday and morning we drink it at night
we drink it and we drink
we shovel a grave in the air.”

এই মন্ত্রমুগ্ধ করা পংক্তিগুলো প্রতিটি স্তবকে ফিরে আসে। এরপর ভয়াবহ বর্ণনা—বন্দিদের জীবন ও শিবিরের কমান্ডারের নির্মমতা। একই শব্দ, বিনা যতিচিহ্নে, ঘুরে ফিরে আসে, এক অদ্ভুত চক্রে, যেন ব্যক্তিসত্তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, শুধু থেকে যায় চলন্ত মৃতদেহ। একটি পর্যায়ে “আমরা তা খাই” বদলে হয়ে যায় “আমরা তোকে খাই” নিরবিচার হতাশার ভেতর এক অদ্ভুত উল্টো উচ্চারণ।

কবিতায় কোনো নির্দিষ্ট কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নাম নেই, কিন্তু এর প্রতিটি চিত্র যেন হোলোকাস্টে জীবিত বেঁচে ফেরা মানুষদের বয়ানের অনুরূপ।কবিতার “আমরা”এই প্রথম পুরুষ বহুবচন আমাদের নিয়ে যায় কাঁটাতারের ভেতরে। ব্যক্তিগত “আমি”-এর পরিবর্তে “আমরা” ব্যবহারে, সেলান যেন ইহুদি নির্যাতিতদের বাইরেও সমগ্র মানবজাতিকে এই সহিংসতার ভেতরে যুক্ত করে দেন।

এছাড়াও কবিতার “জার্মান প্রভু” যিনি তাঁর স্বর্ণকেশী প্রিয়তমা মার্গারেটকে চিঠি লিখছেন, আবার একইসাথে ইহুদিদের গ্যাসচেম্বারে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন—এটি একটি দোদুল্যমান সংকেত, যার মধ্যে বহুস্তর রয়েছে। “মাস্টার” বা “প্রভু” শব্দটি এখানে শুধু ব্যক্তি নয়, বরং নাৎসি নির্মূলযন্ত্রের কারিগর, ক্যাম্পের অধিপতি, এমনকি আর্য শ্রেষ্ঠ জাতির প্রতিনিধিকেও নির্দেশ করে।

কবিতার ট্যাঙ্গো থিমটি দুটি দিক থেকে অর্থবহ। একদিকে এটি ইউরোপের জনপ্রিয় নৃত্য, সেলানের যৌবনের স্মৃতি, আবার অপরদিকে এটি ক্যাম্পের সেই ভয়াবহ চিত্র, যেখানে ইহুদি সঙ্গীতজ্ঞদের দিয়ে বন্দিদের মৃত্যুর পথে এগিয়ে যেতে ট্যাঙ্গো বাজানো হতো। চেরনিভসি, লেমবার্গ (বর্তমানে লভিভ, ইউক্রেন), ও আউশভিৎসে এমন ঘটনা ঘটে। অবশেষে সেই অর্কেস্ট্রার সদস্যদেরই হত্যা করা হতো।

এই ট্যাঙ্গো জার্মান সংস্কৃতিতে ইহুদি উপস্থিতির অতীত স্মৃতিও বহন করে। কবিতার ছন্দ, শব্দের বুনন, এমনভাবে সাজানো যেন তা একটি সঙ্গীত রচনার মতো একটি ফিউগ, যার কাঠামো জটিল, ঘুরপাক খাওয়া, নিয়মতান্ত্রিক। তবে এই ‘ফিউগ’ শব্দটি মানসিক ব্যাধি পরিচয় ভুলে যাওয়ার এক মানসিক অবস্থা সেই অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে।

সেলানের অন্য কবিতাতেও “খনন” (digging) থিমটি আসে, যেমন “There Was Earth in Them”—যেখানে বন্দিরা চব্বিশ ঘণ্টা খনন করছে। সেখানে কোনো ঈশ্বর নেই, ভাষা নেই, বুদ্ধি নেই। Death Fugue-এ “আকাশে কবর” তৈরি মানে, বাস্তবে মৃতদের দাহ করা হতো, আর তাদের ছাই উঠে যেত আকাশে। ভয়ঙ্কর সব প্রতীকের সমাবেশ সাপ, কুকুর, কবর, কোদাল, নীল চোখের কমান্ডার, হুকুমের কণ্ঠ—সব একত্র হয়ে গড়ে তোলে মৃত্যু যন্ত্রের চিত্র।

অনেক পাঠক মনে করেন, মার্গারেট ও শুলামিথের মিলন যেন কোনো মিলনের আশ্বাস। কিন্তু সেলানের কাছে এটা কোনো ক্ষমা নয়, বরং একটি ভয়াবহ বাস্তবতারই প্রকাশ যা শুলামিথকে মেরে ফেলে। এই দুই নারী কখনোই মিলিত হয় না যেমন জার্মান ও ইহুদি ইতিহাসের বিচ্ছেদ কখনো পূরণ হয়নি।

শেষ লাইনে সেলান শুলামিথকে তুলে ধরেন, যেন এই ‘Jewish Beloved’ হয়ে ওঠে কবিতার চূড়ান্ত কণ্ঠস্বর—একটি প্রত্যাখ্যান, যে প্রত্যাখ্যান নাৎসি পরিকল্পিত পরিচয় মুছে ফেলার বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশের রক ছিল নতুন স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা : জো অ্যাডেটুনজি, সম্পাদক, দ্য কনভারসেশন, দ্য গার্ডিয়ান

বাংলাদেশে রক ‘এন’ রোল সংস্কৃতির বীজ বপন হয়েছিল ১৯৭১ সালে দেশের জন্মের সময়, যখন একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটি পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়। বিশ শতকের বেশিরভাগ সময়জুড়ে এই অঞ্চল ছিল এক ঐতিহ্যবাহী কৃষিনির্ভর দক্ষিণ এশীয় সমাজ। এর সঙ্গীতচিত্রে ছিল বাংলা লোকসংগীত, যেখানে ব্যবহৃত হতো তবলা, হারমোনিয়াম এবং একতারা।

এরপর আসে এক রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই রাজনৈতিক বিদ্রোহের সাথে সাথে জন্ম নেয় এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ, যা আমার গবেষণায় উঠে এসেছে।

স্বাধীনতার পর কিছু বাংলাদেশি শিল্পী, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা থেকে সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠা আজম খান, পশ্চিমা সংগীত থেকে অনুপ্রেরণা নিতে শুরু করেন। তারা শুনতে থাকেন জিমি হেনড্রিক্স, জর্জ হ্যারিসন এবং দ্য ডোরস-এর মতো শিল্পীদের গান।

আজম খানের ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ ড্রামস, গিটার ও কি-বোর্ড ব্যবহার করে বাংলা সংগীতকে এক নতুন রূপ দেয়। বাংলাদেশের শ্রোতারা এমন কিছু আগে কখনো শোনেননি। লম্বা চুল, বেল-বটম প্যান্ট, স্টেডিয়াম কনসার্ট এবং জোরালো রাজনৈতিক-সামাজিক বক্তব্যপূর্ণ গান দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক সাংস্কৃতিক আইকন।

তার ১৯৭০-এর দশকের একটি বিখ্যাত গান “বাংলাদেশ”-এ তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত সদ্য স্বাধীন জাতির করুণ চিত্র তুলে ধরেন। সেখানে তিনি এক বস্তিতে জন্ম নেওয়া শিশুর মৃত্যু ও তার মায়ের আহাজারির বর্ণনা দেন। পুরো গানে ভর করে থাকে হতাশা, গিটার-নির্ভর সুর এবং “ও বাংলাদেশ!”—এই আকুতিভরা আহ্বান।

২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করা আজম খান এক প্রজন্মের তরুণদের দেশীয় সংস্কার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখান। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন রক সংগীত এক দশক আগে জাতি, ধর্ম ও যৌনতা নিয়ে সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল, বাংলাদেশেও রক ‘এন’ রোল – বিশেষ করে আজম খানের উপস্থিতি মানুষকে বোঝাতে শুরু করে যে ভিন্ন এক জীবনও সম্ভব।

এক ভক্ত বলেছিলেন, “তিনি ছিলেন প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহী।” তিনি আরও বলেন, “আমি আজম খানকে জিন্স পরতে দেখেছি বলেই আমিও পাঞ্জাবি ছেড়ে জিন্স পরতে শুরু করি।” তবে এই পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক নয়। “তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছিলেন এবং স্বাধীনচেতা মূল্যবোধ বিশেষ করে রক্ষণশীলতার বাইরে চিন্তার স্বাধীনতা ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন,” বলেছিলেন আরেকজন। “আমরা তখন রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠছিলাম।”

নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল এক ধরনের বিপ্লবী কাজ। ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশের সরকার বারবার সামরিক শাসন, কর্তৃত্ববাদ এবং সীমিত গণতন্ত্রের মধ্যে দোলাচলে ছিল। যদিও গ্রামীণ উন্নয়ন কিছু অর্থনৈতিক গতি এনেছিল, তবুও ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দেশের ৪১% মানুষ চরম দারিদ্রে বাস করত।

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হলেও বাংলাদেশ ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেটি বহাল রাখে। এর ফলে দেশটি আরও রক্ষণশীল হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে রক সংস্কৃতি ছিল এক বিকল্প জগত যেখানে সরকারবিরোধী সমালোচনা স্বাভাবিক ছিল এবং ধর্মীয় উগ্রতা ছিল বেমানান।

১৯৯০-এর দশকে গান এন’ রোজেস, পিংক ফ্লয়েড ও অ্যারোসমিথের মতো পশ্চিমা ব্যান্ড বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখনই গড়ে ওঠে দেশীয় রক ব্যান্ড রকস্ট্রাটা (metal-এর পথিকৃৎ), ওয়ারফেজ (Warfaze), লাভ রান্স ব্লাইন্ড (Love Runs Blind) এবং আরও অনেক। ইংরেজি নামের এ ব্যান্ডগুলো স্টেডিয়ামভর্তি শ্রোতার সামনে পারফর্ম করত, যারা লম্বা চুল, টি-শার্ট, বুট আর চেইন গলায় পরে আসতেন।

যেখানে ঐতিহ্যগত সংগীত ছিল শান্ত, সুশৃঙ্খল ও বসে বসে শোনার মতো, সেখানে রক কনসার্ট ছিল উত্তাল সিগারেটের ধোঁয়া, হেডব্যাং, মারামারি।শিল্পীরা মদ, গাঁজা এবং অন্যান্য মাদকও ব্যবহার করতেন, যদিও পাশ্চাত্য শিল্পীদের মতো অতটা নয়।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত হতে থাকে—পরিধান শিল্প রপ্তানি বাড়ে, হলিউড সিনেমা আসে, বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি হয় তখন শহরগুলোতে দ্রুত বৈষম্যও বাড়তে থাকে। একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে নতুন ধনীদের উত্থান। বাংলাদেশি রকাররা এই অসাম্যকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।

১৯৯৮ সালের গানে ওয়ারফেজ “ধূসর মানচিত্র”-এ বলেন, “রোজ পড়ে থাকে লাশ রাস্তায়”, আর “নীল মার্সিডিজ গর্বে ঘুরে বেড়ায়”, সেখানে “গণতন্ত্র চোখ টিপে হাসে”—এই কথাগুলো দিয়ে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ তুলে ধরেন। ১৯৯৭ সালে মাকসুদ ও ঢাকা “গণতন্ত্র” নামের গানে বলেন, “গণতন্ত্র এক সংবিধানিক গুন্ডাতন্ত্র।” তারা ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন। “পরওয়ারদিগার” গানে, যার ভিডিও শুরু হয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বার্তায়, সেখানে তিনি বলেন—“অন্ধ উগ্রবাদী ও মৌলবাদীরা আমাদের ভবিষ্যৎ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।”

কিন্তু এরপর থেকে এই সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটালেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮ সালে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ও সমাজবিজ্ঞানী মাইদুল ইসলাম সরকারবিরোধী “মিথ্যা তথ্য” ছড়ানোর অভিযোগে কারাগারে যান, যার সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছর।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশে হাজারো বিরোধী মতাবলম্বীকে “রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের” অভিযোগে আটক রাখা হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে দেশজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, শিল্পী ও সংখ্যালঘুদের উপর সহিংস হামলা বেড়েছে, যা প্রমাণ করে, স্বাধীন মত প্রকাশ ও নাগরিক স্বাধীনতা মারাত্মক সংকুচিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ আজ আবারও প্রতিবাদী সংগীতের জন্য তৃষ্ণার্ত। কিন্তু রক সংস্কৃতি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এর একটি কারণ ভারতের বলিউড সংগীত, যা জীবনের আনন্দ আর প্রেম উদ্‌যাপন করে। এই গানগুলো সহজে pirated কপি আকারে ছড়িয়ে পড়ে ও রেডিও দখল করে নেয়। এরপর আসে বাংলাদেশি আন্ডারগ্রাউন্ড হিপ-হপ সংস্কৃতি, যা আজকের তরুণদের বিদ্রোহের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

রকশিল্পীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশে মাত্র ১০% সংগীতই বৈধভাবে কেনাবেচা হয়, আর মিউজিক পাইরেসির কারণে শিল্পীরা প্রতিবছর প্রায় ১৮ কোটি মার্কিন ডলার হারান বলে মনে করা হয়।

ওয়ারফেজ ব্যান্ডের গিটারিস্ট সামির হাফিজ বলেন, “বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি আর রয়্যালটির ধারণা আমাদের সংস্কৃতিতে এখনও ভালোভাবে গেঁথে যায়নি।বাংলাদেশে রক মিউজিশিয়ান হিসেবে টিকে থাকা সত্যিই কষ্টকর।” ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, যা পশ্চিমা সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে, সেটাও রকের পতনে ভূমিকা রেখেছে। কিছু তরুণ মুসলমান রক ‘এন’ রোলকে এখনও পাপ হিসেবে দেখেন। এক সময় বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছিল রক সংগীত। আজ যেন সেই সংগীতের জন্য দেশে আর জায়গা নেই।

তৈরি হলো বিশ্বের প্রথম জীবন্ত কম্পিউটার

অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান Cortical Labs এই জীবন্ত কম্পিউটারটির নাম দিয়েছে CL1। এটি এমন এক প্রযুক্তি যেখানে জীবন্ত মানব মস্তিষ্কের কোষের সাথে সিলিকন হার্ডওয়্যার যুক্ত করে নতুন ধরনের একটি বুদ্ধিমত্তার পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে।

কিভাবে এটি তৈরি করা হয়েছে?

বিজ্ঞানীরা প্রথমে মানবদেহের induced pluripotent stem cells (iPSCs) থেকে নিউরন তৈরি করেন এবং সেগুলোকে একটি সিলিকন চিপে স্থাপন করেন, যেখানে ৫৯টি ইলেকট্রোড ছিল। এই কোষগুলো চিপের সাথে যোগাযোগ করতে শেখে এবং একটি জীবন্ত-ডিজিটাল নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।

এটি কিভাবে কাজ করে?

CL1 একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ পরিবেশে নিউরনগুলোকে জীবিত রাখে। এর ভেতরে থাকা পাম্প ও সেন্সর গ্যাস, তাপমাত্রা ও বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করে। নিউরনগুলো চিপের মাধ্যমে সিগনাল পাঠায় ও গ্রহণ করে এবং সময়ের সাথে সাথে শিখে ও মানিয়ে নিতে পারে।

কেন এটি বিপ্লবী আবিষ্কার?

এই হাইব্রিড সিস্টেমটি প্রচলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে অনেক দ্রুত শেখে এবং অনেক কম শক্তি খরচ করে। এর নিউরাল নেটওয়ার্কগুলো প্রাণবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং জটিল কাজ মাত্র সামান্য শক্তি ব্যবহার করে করতে পারে।

অন্বেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

CL1 ওষুধ আবিষ্কার, রোগের মডেল তৈরি এবং মস্তিষ্ক অনুপ্রাণিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। গবেষকরা এর মাধ্যমে জানতে পারছেন কিভাবে বাস্তব নিউরন শেখে যা ভবিষ্যতের আরও বুদ্ধিমান, কার্যকর ও মানব-মস্তিষ্কঘনিষ্ঠ প্রযুক্তি তৈরির পথ দেখায়।

ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত আফ্রিকা, সুযোগ বাড়ছে চীনের

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ককেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। এই নীতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আফ্রিকার দেশগুলোর উপর, যাদের বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।

ট্রাম্প প্রশাসন যখন “পারস্পরিক বাণিজ্য”র নামে বিভিন্ন দেশের উপর ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে, তখন আফ্রিকার বহু দেশ বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষত দক্ষিণ আফ্রিকা, তিউনিসিয়া, লিবিয়া এবং আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো শুল্কের উচ্চহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে যে, এই শুল্কহার ভুল বাণিজ্য বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে আরোপ করা হয়েছে। তবে, এই চাপের মধ্যেও ১৮টি দেশ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে, যাদের জন্য শুল্কহার ১৫ শতাংশে সংশোধন করা হয়।

লেসোথোর মতো দরিদ্র এবং ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশও এই নীতির বলি হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্যামুয়েল ম্যাটেকানে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য বন্ধ হওয়া এবং অতিরিক্ত শুল্কের কারণে হাজার হাজার মানুষের চাকরি হারিয়ে গেছে। শিল্প খাত ভেঙে পড়ছে।

এই সংকটের সুযোগ নিয়েছে চীন। বাণিজ্যে আফ্রিকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ার কৌশলগত পরিকল্পনায় থাকা চীন এই মুহূর্তে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে শুরু করেছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের পণ্য আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। যা স্বাভাবিকভাবেই আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য একটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।

নাইজেরিয়ার বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বিসমার্ক রেওয়ান বলেন, “আমরা সরাসরি চীনের হাতে চলে যাচ্ছি। এটাই হলো দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি।” তার মতে আফ্রিকা এখন চীনের দিকে ঝুঁকছে এবং চীন হয়ে উঠেছে তাদের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।

তবে এই পরিস্থিতিতে আশঙ্কার কথাও জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি বাজারে সুরক্ষা না থাকে তাহলে চীনা সস্তা পণ্য আফ্রিকার বাজার দখল করে ফেলবে। এতে আফ্রিকার নিজস্ব শিল্প খাত হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, আফ্রিকা কি চীনের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে উঠবে? না কি এই সংকট থেকে বেরিয়ে নিজস্ব অর্থনীতিকে মজবুত করবে? অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, এই সংকট হয়তো আফ্রিকার জন্য একটি সুযোগ। নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়িয়ে এবং অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নে মনোযোগ দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (AfCFTA) এর বাস্তবায়ন এই সংকটে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে এখনও কার্যকর ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি আফ্রিকার জন্য যেমন এক বিপর্যয়, তেমনি চীনের উত্থান তাদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা যেন নতুন নির্ভরতার শৃঙ্খলে পরিণত না হয়, সেজন্য প্রয়োজন দক্ষ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।

ক্ষমতা, কৌশল ও চ্যালেঞ্জের প্রতীক, ইতিহাসের প্রভাবশালী চীনা নারী জলদস্যু চিং শি

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু চরিত্র আছে, যাদের জীবন একইসাথে আলো ও অন্ধকারের এক জটিল মিশ্রণ। চীনের কিংবদন্তী নারী জলদস্যু চিং শি (Ching Shih) তেমনই এক চরিত্র। উনিশ শতকের শুরুর দিকে দক্ষিণ চীনের সমুদ্র উপকূলে এক লাখেরও বেশি জলদস্যুর বিশাল নৌবহরকে যিনি শাসন করতেন, তার নাম শুনলেই তৎকালীন সাম্রাজ্যিক চীনের বুকে কাঁপন ধরতো। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বটি ছিল ক্ষমতা বা সম্পদের জন্য নয়, বরং শান্তি ও স্থিতিশীল জীবনের জন্য। আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো একজন জলদস্যু কেবল লুটেরা, যার একমাত্র লক্ষ্য ধ্বংস আর বিশৃঙ্খলা।কিন্তু চিং শি সেই ধারণা ভেঙেছেন। তিনি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে চেয়েছিলেন এক সাধারণ জীবন। এখানেই তার জীবনের ট্র্যাজেডি, যখন তিনি শান্তি চাইলেন, তখন তাকে ঘোষণা করা হলো ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক নারী’, যার জন্য জারি হলো দেখামাত্র হত্যা’র নির্দেশ।

চিং শি-এর আসল নাম ছিল শি ইয়াং (Shih Yang)। তার জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ, এমনকি নিম্নবিত্ত। তিনি ছিলেন একজন ক্যান্টনিজ পতিতা, যাকে পরবর্তীতে প্রভাবশালী জলদস্যু নেতা চেং ই (Cheng I) বিয়ে করেন। চেং ই মারা যাওয়ার পর তার বিশাল লাল পতাকাবাহী নৌবহরের (Red Flag Fleet) নেতৃত্বভার কার কাঁধে যাবে, তা নিয়ে যখন জলদস্যুদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তখন চিং শি এক অসামান্য রাজনৈতিক ও সামরিক প্রজ্ঞা দিয়ে সেই সংকট মোকাবিলা করেন।

তিনি কেবল চেং ই-এর উত্তরাধিকারী হিসেবে ক্ষমতা দখল করেননি, বরং তিনি তার বিশাল নৌবহরকে এক সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন। তার অধীনে প্রায় ১৮০০টি যুদ্ধজাহাজ এবং লক্ষাধিক জলদস্যু ছিল, যা ছিল তৎকালীন সময়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নৌবাহিনী। তার নেতৃত্ব এতটা দৃঢ় ছিল যে, অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী জলদস্যু গোত্রও তার কাছে মাথা নত করে। এটি ছিল শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে জয় নয়, বরং তার কৌশলগত দক্ষতা ও দূরদর্শিতার ফল।

চিং শি-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল জলদস্যুতাকে একটি সংগঠিত রূপ দেওয়া। তিনি তার বাহিনীর জন্য কঠোর আইনকানুন তৈরি করেছিলেন, যা জলদস্যুদের বিশৃঙ্খল জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তার নিয়মানুযায়ী কোনো জলদস্যু বিনা অনুমতিতে কোনো গ্রামে প্রবেশ করতে পারত না। লুণ্ঠিত সম্পদ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ কোষাগারে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নারীর প্রতি তার আইন। কোনো জলদস্যু যদি কোনো বন্দী নারীকে ধর্ষণ বা অসম্মান করত, তবে তার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। এমনকি কোনো নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যও জলদস্যুকে ওই নারীর অনুমতি নিতে হতো।

এই কঠোর শৃঙ্খলা জলদস্যুদের একটি বিশৃঙ্খল দল থেকে একটি শক্তিশালী ও অনুগত সামরিক শক্তিতে পরিণত করে। এটি কেবল তার বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করেনি, বরং সাধারণ জনগণের কাছেও তাকে এক ভিন্ন মর্যাদায় স্থাপন করেছিল। এই নিয়মগুলো থেকে বোঝা যায়, চিং শি কেবল লুণ্ঠনকারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল প্রশাসকও। তিনি জলদস্যুদের একটি রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করে দিয়েছিলেন, যা সাম্রাজ্যের প্রচলিত শাসনব্যবস্থার বিপরীতে এক বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছিল।

চিং শি-এর এই অপ্রতিরোধ্য উত্থান তৎকালীন চীনা কিং সাম্রাজ্যের (Qing Dynasty) জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। একাধিকবার সাম্রাজ্যিক নৌবাহিনী তার বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এমনও হয়েছে যে চিং শি-এর নৌবহর চীনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছিল। কিং সাম্রাজ্য যখন একা পেরে উঠছিল না, তখন তারা ব্রিটিশ ও পর্তুগিজ নৌবাহিনীর সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু তারাও চিং শি-কে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়।

এইসব বিজয় সত্ত্বেও চিং শি উপলব্ধি করেন এই যুদ্ধ অনন্তকাল চলতে পারে না। তিনি জানতেন, সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব নয়, কেবল লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাই তিনি শান্তির পথে হাঁটতে চাইলেন। তার এই সিদ্ধান্ত কোনো দুর্বলতা ছিল না, বরং ছিল একজন দূরদর্শী নেতার বিচক্ষণ পদক্ষেপ। তিনি তার বিশাল বাহিনী ও তাদের পরিবারগুলোর জন্য একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজে থেকেই সাম্রাজ্যের কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠান।

কিন্তু তার এই শান্তি ও আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা সাম্রাজ্যের অভিজাতদের কাছে এক ভিন্ন বার্তা নিয়ে আসে। তারা একজন নারী, যিনি কিনা তাদের হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও পরাজিত হননি তার কাছে মাথা নত করে শান্তি আলোচনা করতে রাজি ছিলেন না। তারা চিং শি-কে বিপজ্জনক নারী হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তার আত্মসমর্পণের প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে ‘দেখামাত্র হত্যা’র নির্দেশ জারি করা হয়, যেন তিনি একজন সাধারণ অপরাধী। এই ঘটনাটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়, যিনি শান্তি চান, তাকেই অপরাধী বানানো হয়।

সাম্রাজ্যের প্রত্যাখ্যান চিং শি-কে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি আবারও তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশল ব্যবহার করেন। তিনি সরাসরি সাম্রাজ্যের গভর্নর-জেনারেলের সাথে আলোচনায় বসেন এবং এমন কিছু শর্ত দেন, যা সাম্রাজ্যের পক্ষেও মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। তিনি কেবল নিজের জন্য ক্ষমা চাননি, বরং তার অধীনে থাকা হাজার হাজার জলদস্যু ও তাদের পরিবারের জন্য সাধারণ নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দাবি করেন।

অবশেষে ১৮১০ সালে চিং শি আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু এটি কোনো সাধারণ পরাজয় ছিল না। তিনি ও তার প্রধান সেনাপতি (যিনি পরবর্তীতে তার দ্বিতীয় স্বামী হন) সাম্রাজ্যে উচ্চ পদে আসীন হন এবং তার অনুগত অনেক জলদস্যুকেও সাম্রাজ্যিক নৌবাহিনীর পদে নিযুক্ত করা হয়। তার আত্মসমর্পণের শর্ত ছিল এমন, যেন তিনি জয়ী হয়েই ফিরেছেন। তিনি জীবনের বাকি দিনগুলো সুখে শান্তিতে কাটান, নিজের একটি সফল জুয়ার ব্যবসা পরিচালনা করেন। তার এই শেষ জীবন ছিল তার এক সফল রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত প্রতিফলন।

চিং শি-এর জীবন ও তার আত্মসমর্পণের গল্প ইতিহাসের পাতায় এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তিনি শুধু একজন জলদস্যু নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য সামরিক কৌশলবিদ, একজন বিচক্ষণ প্রশাসক এবং একজন দক্ষ সমঝোতাকারী। তার গল্প প্রমাণ করে প্রচলিত সামাজিক কাঠামোয় নারীদের জন্য যে ভূমিকা নির্দিষ্ট করা হয়, তিনি তা ভেঙেছেন।

চিং শি-এর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাস কেবল রাজারাজড়াদের গল্প নয়, বরং এমন সব অসাধারণ মানুষেরও গল্প, যারা নিজেদের জীবন দিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। চিং শি শুধুমাত্র জলদস্যু নেত্রী ছিলেন না, তিনি নারীর ক্ষমতায়নের একটি প্রতীক। তার জীবন ও কর্মের মাধ্যমে দেখা যায় নারীরাও সামুদ্রিক রাজত্বের শাসক হতে পারে। তিনি শাসন ও নেতৃত্বের পুরুষতান্ত্রিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির মুখে, ইউরোপের ইস্পাত বাজারে ধস

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি এবং ইউরোপজুড়ে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইউরোপের ইস্পাত শিল্প চরম মন্দার মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্কের প্রভাবে ইউরোপের বাজারে সস্তা ইস্পাতের প্রবাহ বেড়েছে। এই অতিরিক্ত আমদানির চাপ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস ইউরোপের ইস্পাত বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমানে ইস্পাত বাজারে মূল্য অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে, এটি বছরের বাকি সময়জুড়ে আরও তীব্র হতে পারে। হেলেনিক শিপিং নিউজ–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে সস্তায় আমদানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির প্রভাবে ইউরোপীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন।

২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ইস্পাত খাতের কয়েকটি শীর্ষ কোম্পানি আর্সেলরমিত্তাল, আউটোকুম্পু এবং অ্যাপেরাম তাদের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করে। এর মধ্যে আর্সেলরমিত্তালের আয় বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গে মিল থাকলেও, আউটোকুম্পু ও অ্যাপেরাম বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তাদের মুনাফা কমে যেতে পারে। এই পূর্বাভাসের প্রভাব বাজারে দ্রুত পড়ে , লেনদেন চলাকালে দুই কোম্পানির শেয়ারের দাম ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়।

এছাড়া স্পেনের এসেরিনক্স ও সুইডেনের এসএসএবি পূর্বেই সতর্ক করেছিল যে তারা প্রত্যাশিত আয় অর্জন করতে পারছে না। তাদের মতে মার্কিন শুল্ক ও ইউরোপের অর্থনৈতিক দুর্বলতা মিলিয়ে বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে অনেক ইস্পাত রফতানি ইউরোপে ঘুরে আসতে পারে যার ফলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়ে মূল্য আরও নিচে নামতে পারে। এশিয়া থেকে সস্তা আমদানির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে ইউরোপীয় ইস্পাত উৎপাদকরা মারাত্মক প্রতিযোগিতায় পড়বেন যা এই শিল্পের স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।

স্ট্যানফোর্ডের রেডিয়েটিভ কুলিং, রাতেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে সৌর প্যানেল

সৌরশক্তি দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এটি কেবলমাত্র দিনের আলোয় কাজ করে। রাত নামলেই সৌর প্যানেল কার্যক্ষমতা হারায়, ফলে ব্যাটারি বা বিকল্প শক্তির উৎসের উপর নির্ভরতা বাড়ে। এই বাস্তবতা বদলে দেওয়ার চমকপ্রদ এক উদ্ভাবন এনেছেন Stanford University-এর গবেষক দল।

এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি radiative cooling একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠতল থেকে উত্তাপ মহাশূন্যে বিকিরিত হয়। দিনে সূর্যের আলো জমা হয় এবং রাতের বেলায় সেই তাপ ধীরে ধীরে বের হয়ে যায়। স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা এই তাপ বিকিরণের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা।

তারা থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (Thermoelectric Generator বা TEG) নামক একটি যন্ত্র যুক্ত করেছেন সাধারণ সৌর প্যানেলের পেছনে। রাতের বেলায় প্যানেলের উপরিভাগ ঠান্ডা হয়ে যায়, কিন্তু নিচের দিক অপেক্ষাকৃত গরম থাকে এই তাপমাত্রার পার্থক্য থেকেই TEG বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়?
গবেষণা অনুসারে, প্রতি বর্গমিটার সৌর প্যানেলে প্রায় ৫০ মিলিওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়েছে। সংখ্যাটা শুনতে ছোট মনে হলেও, এটি কম শক্তিচালিত এলইডি বাতি, সেন্সর বা পরিবেশ পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের মতো ডিভাইস চালানোর জন্য যথেষ্ট।

এই গবেষণা ২০২২ সালের দিকে Applied Physics Letters জার্নালে প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত হলেও ২০২৫ সালে তা বাস্তব পরীক্ষায় বড় পরিসরে আলোচনায় আসে। এতে প্রমাণ হয় প্রযুক্তিটি শুধু গবেষণাগারে নয়, বাস্তব পরিস্থিতিতেও কাজ করতে সক্ষম।

কেন এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমানে সৌর প্যানেল ব্যবহারের সবচেয়ে বড় বাধা হলো এনার্জি স্টোরেজ। দিনের বেলা উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতের জন্য ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করতে হয়, যা ব্যয়বহুল, টেকসই নয় এবং পরিবেশবান্ধবও নয় সবসময়। এই নতুন প্রযুক্তি নিরবচ্ছিন্ন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশেষ করে অফ-গ্রিড গ্রামাঞ্চল যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই বা অনিয়মিত সেখানে এমন প্রযুক্তি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

সীমাবদ্ধতাও আছে, এই উদ্ভাবন আশাব্যঞ্জক হলেও এর কিছু বাস্তব বাধা রয়েছে। কার্যকারিতা সীমিত ৫০ মিলিওয়াট শক্তি বড় যন্ত্র চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। অতিরিক্ত TEG ইউনিট যোগ করায় খরচ বেড়ে যায়। দিনে যেমন সৌর প্যানেলের সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে, রাতে তা অনেক কম।

তবে গবেষকেরা বলছেন, প্রযুক্তি ধীরে ধীরে পরিপক্ব হবে। ভবিষ্যতে নতুন ধরণের থার্মোইলেকট্রিক উপাদান, উন্নত তাপ নিয়ন্ত্রণ কৌশল এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন খরচ কমালে এই প্রযুক্তি আরও ব্যবহারিক হয়ে উঠতে পারে।

এই উদ্ভাবন দেখিয়েছে সৌরশক্তিকে আর কেবল দিনের আলোতে সীমাবদ্ধ রাখার সময় ফুরিয়ে এসেছে। প্রযুক্তির ক্রমাগত অগ্রগতিতে আমরা এমন এক বিশ্ব কল্পনা করতে পারি যেখানে দিন-রাত নির্বিশেষে নবায়নযোগ্য শক্তির সঞ্চালন অবিচ্ছিন্ন থাকবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে বিশ্ব যখন দৌড়াচ্ছে, তখন Stanford-এর এই গবেষণা এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।

অর্ধশত বছরের ব্যবধানে দুটি রাষ্ট্রনীতিক আগস্ট : মাহফুজ রাহমান, বণিক বার্তা

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সেই স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন, যেখানে থাকবে না দমন-পীড়ন কিংবা বাকস্বাধীনতার সংকোচন। অথচ স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে দুটি আগস্ট মাস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই দুই ঘটনাতেই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে একতরফা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে।

১৯৭২ সালের সংবিধানে ঘোষিত চার মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ—ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি। কিন্তু স্বাধীনতার অল্প সময় পর থেকেই শুরু হয় ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিব বাকশাল গঠন করে একদলীয় শাসন চালু করেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রুদ্ধ করে দেন। এরপর ১৫ আগস্ট সপরিবারে শেখ মুজিব নিহত হলে রাষ্ট্রীয় শাসনে আসে বড় ধরনের পরিবর্তন। খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এবং সামরিক আইনের মাধ্যমে একনায়কতান্ত্রিক প্রেসিডেন্সিয়াল কাঠামো তৈরি করেন।

এই সময়ই ভারতের একাংশ থেকে সিআইএ ও চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ পায়। ভারতের গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদরা ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার অভিযোগ তোলে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করে।

১৫ আগস্টের পর দেশের বাজারে আচমকা মূল্যস্ফীতি হ্রাস পায়, চালসহ নিত্যপণ্যের দাম কমে আসে। মোশতাক সরকার শ্বেতপত্র প্রকাশ করে শেখ মুজিব সরকারের আমলে দুর্নীতি, পরিকল্পনাহীনতা ও আর্থসামাজিক অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে নিজেদের প্রশাসনকে একেবারে জবাবদিহিমূলক হিসেবে উপস্থাপন করে। যদিও এই সরকারের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়নি। সেনাবাহিনীর প্রভাব, মতপ্রকাশের দমন এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার ফলে সরকারটি তিন মাসও টিকতে পারেনি। নভেম্বরে ঘটে যায় দুই দফা অভ্যুত্থান, যার মধ্যে ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

প্রায় ৫০ বছর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঘটে আরেক রাজনৈতিক পালাবদল। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন শেষে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এর পেছনে ছিল একাধিক বিতর্কিত নির্বাচন, রাজনৈতিক দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন ও ইন্টারনেট শাটডাউনের মধ্যে আন্দোলন তীব্র রূপ নেয় এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালায়। দেশ কয়েকদিন কার্যত প্রশাসনহীন থাকে।

৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনে দেশে ১১.৬৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ছিল প্রকট। সরকার পতনের পর কিছুটা স্বস্তি দেখা দেয় বাজারে। তবে একই সময়ে পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মোকাবেলায় সরকারকে হিমশিমও খেতে হয়।

শেখ হাসিনার পতনের পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশংসা করে। তবে ভারত সরকার সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানায়। হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া দিল্লির জন্য কূটনৈতিক দুশ্চিন্তা তৈরি করে। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব জোরালো হয়। পরবর্তীতে ভারত অন্তর্বর্তী সরকারকে শুভেচ্ছা জানালেও দুই দেশের সম্পর্কে থেকে যায় অস্বস্তিকর দূরত্ব।

পরে গঠিত দুর্নীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে উঠে আসে ২০০৯–২০২৪ সময়কালে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার, ‘চামচা পুঁজিবাদ’ থেকে ‘চোরতন্ত্রে’ রূপান্তরের চিত্র। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দেয়, ২০২৬ সালের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল গণতন্ত্র রক্ষার একটি নিরপেক্ষ আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে কোনো একনায়কতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি না হওয়া। তবে তিনি সতর্ক করেন যে এই উত্তরণ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে মূলধারার রাজনীতির প্রক্রিয়ায় এই অভ্যুত্থানের আদর্শ কতটা স্থান পায় তার উপর। এক বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যত বড় কোনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে এবং প্রশাসনিক সংস্কারে অগ্রগতি ধীরগতির। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিক্ষাঙ্গনের স্থিতিশীলতা এবং বিচারব্যবস্থা সংস্কার এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো এখনো গুরুত্ব পায়নি।

সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান এক নির্মোহ বিশ্লেষণে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সুর মিলালেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা আমলা শাসনের উপর নির্ভর করছে, যা এক প্রকার স্ববিরোধিতা। তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কার কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ কম এবং সুপারিশগুলো এসেছে আমলাতান্ত্রিক চ্যানেল থেকে। সবচেয়ে বেশি দ্রুততার সঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে এক আমলা গোষ্ঠী, যারা মাঠের বাস্তবতা নয়, বরং নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। এক বছরের এই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ভালো উদ্যোগ নিলেও তা এখনো জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় এই অভ্যুত্থান কি কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা হয়ে থাকবে, নাকি তা সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে?

প্রযুক্তি ও নকশা পিসি ডিজাইনের ১০ যুগ

১. Apple Macintosh 128K (১৯৮৪)
ম্যাকিন্টশ ১২৮কে ছিল প্রথম সত্যিকার অর্থে “ব্যবহারকারী বান্ধব” পিসি। স্টিভ জবসের নেতৃত্বে এই পিসির ডিজাইন করেছিল Apple, যা বাজারে এনেছিল গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস (GUI) এবং মাউস। ঐ সময়ের অন্যান্য কমান্ড লাইন ভিত্তিক পিসির তুলনায় ম্যাকিন্টশের ডিজাইন ছিল সহজ, ছোট এবং বক্স আকারে যা ডেস্কটপে কম জায়গা নিত। এর সাদা প্লাস্টিক বডি এবং স্ক্রিন ফ্রেমের নকশা কম্পিউটারকে ঘরোয়া পরিবেশে নিয়ে আসার পথ প্রশস্ত করেছিল।

২. IBM PC 5150 (১৯৮১)
আইবিএম পিসি 5150 ডিজাইনটি ছিল প্রযুক্তি ও ব্যবসার জন্য এক বিপ্লব। এটি পিসির স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের মান নির্ধারিত হল। এর বাক্সাকৃতি শক্তিশালী এবং সহজ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিজাইন করা ছিল। বাণিজ্যিক ও সরকারি অফিসগুলোর জন্য আদর্শ এই ডিজাইনটি ছিল পিসির শিল্পে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এবং বহু কম্পিউটারের ডিজাইনের মডেল হিসেবে বিবেচিত।

৩. Commodore 64 (১৯৮২)
কমোডোর ৬৪ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় হোম কম্পিউটার। এর ডিজাইন ছিল সাশ্রয়ী এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব। প্লাস্টিকের মজবুত বডি এবং কীবোর্ড একত্রে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যা ব্যবহারকারীরা সহজেই রাখতে ও ব্যবহার করতে পারতেন। এর আইকনিক ব্রাউন-বেজড শরীর আজও রেট্রো ডিজাইন প্রেমীদের কাছে জনপ্রিয়।

৪. Apple iMac G3 (১৯৯৮)
স্টিভ জবসের দ্বিতীয় পর্যায়ের ম্যাজিক ছিল iMac G3, যা এক রঙিন ট্রান্সলুসেন্ট প্লাস্টিক বডিতে আবৃত। এর ডিজাইন বাজারে এক নতুন ধারা আনলো কম্পিউটারের সঙ্গে নানান রঙের ব্যবহার ও আধুনিক, জেলি বীনের মত ফিনিশিং। এর মাধ্যমে কম্পিউটারকে শুধু প্রযুক্তি নয়, জীবনযাত্রার অংশ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। এটি ইউজার ইন্টারফেস সহজ করার পাশাপাশি, ভিজ্যুয়াল আকর্ষণ বৃদ্ধি করে ডিজাইন ও প্রযুক্তির মিলন ঘটায়।

৫. Dell XPS Tower (২০১০ দশক)
ডেল এক্সপিএস টাওয়ার সিরিজ পিসি ডিজাইনে আধুনিকতা ও ফাংশনালিটির নিখুঁত সমন্বয়। এর ডিজাইন ছিল খুবই মিনিমালিস্টিক, লাইটওয়েট এলুমিনিয়াম ফ্রেমে মোড়ানো, যা গেমার, প্রফেশনাল ও হেভি ইউজারের জন্য তৈরি। ভেন্টিলেশন ও অভ্যন্তরীণ কম্পোনেন্ট সাজানোর ক্ষেত্রে এতে ছিল বিশেষ নজর, যা প্রযুক্তিগত চাহিদার সাথে ডিজাইনের সুষম মিলন দেখায়।

৬. Microsoft Surface Studio (২০১৬)
মাইক্রোসফটের এই অল-ইন-ওয়ান পিসিটি ডিজাইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ২৮ ইঞ্চি টাচস্ক্রিন যার তীব্র রেজুলেশন এবং স্লিম বেজ ইউনিটে সমন্বিত অত্যাধুনিক হার্ডওয়্যার। ডিজাইনার ও ক্রিয়েটিভ পেশাজীবীদের জন্য এটি বিশেষভাবে তৈরি, যেখানে পর্দার এঙ্গেল পরিবর্তন করে সহজে আঁকা বা ডিজাইন করা যায়। এর ডিজাইনই প্রযুক্তির সৃজনশীল সম্ভাবনার এক প্রতীক।

৭. Alienware Aurora (২০০০-এর দশক)
গেমিং পিসির বাজারে এলিয়েনওয়্যার অরোরা ডিজাইন ছিল অভিনবত্বের উদাহরণ। এর ফিউচারিস্টিক লুক, LED লাইটিং ও শক্তিশালী কেস ডিজাইন গেমারদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ। উচ্চ পারফরমেন্সের হার্ডওয়্যারকে ধরে রাখার পাশাপাশি, এর কেস সহজেই আপগ্রেড করা যায় যা গেমিং কমিউনিটির জন্য অপরিহার্য।

৮. HP Pavilion Wave (২০১৫)
এই পিসি ছিল স্টেরিও স্পিকার ও সেন্ট্রাল প্রসেসরের অভিনব মিশ্রণ। অ্যালুমিনিয়ামের একক কনসোল ডিজাইন যা সাউন্ড কোয়ালিটির জন্য তৈরি, এটি ডেস্কটপ পিসির সাধারণ বক্সাকৃতির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কম্প্যাক্ট এবং আধুনিক, এই ডিজাইনটি মাল্টিমিডিয়া অভিজ্ঞতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

৯. Lenovo ThinkCentre Tiny (২০১০-এর দশক)
লেনোভো থিঙ্কসেন্টার টিনি সিরিজের ডিজাইন ছিল অত্যন্ত ছোট, কিন্তু শক্তিশালী। অফিস ও কর্পোরেট পরিবেশে যেখানে স্থান সংকুলান অতি গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই পিসি ডিজাইন বড় সুবিধা দেয়। এর মডুলার ডিজাইন রক্ষণাবেক্ষণ সহজ করে, এবং এটি ডেস্কের নিচে বা পেছনে মাউন্ট করার সুবিধা দেয়। প্রযুক্তি ও ডিজাইনের এই মিলন ছিল আধুনিক অফিসের চাহিদা মেটানোর এক নমুনা।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে কোল্ড ওয়ারের টানাপড়েন

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং ১৯৪৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এই সময়টি ছিল “কোল্ড ওয়ার” নামে পরিচিত দুই পরাশক্তি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শগত ও সামরিক সংঘাতের যুগ। এই সংঘাত কেবল ইউরোপ বা আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তার প্রভাব ভারত, পাকিস্তান, এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশসহ সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।কোল্ড ওয়ারের এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উপমহাদেশের দেশগুলির কূটনীতি ছিল এক জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত এবং প্রায়শই আত্মরক্ষামূলক কৌশল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন বিশ্ব দ্রুত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছিল একদিকে পুঁজিবাদী মার্কিন ব্লক এবং অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ব্লক তখন উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এই বিভাজনই ছিল উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনীতির প্রধান নিয়ামক। ভারত, তার প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) নামক একটি তৃতীয় পথ বেছে নেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল কোনো ব্লকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং নিজেদের উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া। নেহরুর এই নীতি ছিল বাস্তববাদী এবং দূরদর্শী, কারণ এটি ভারতকে দুটি পরাশক্তির চাপ থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করেছিল।

অন্যদিকে পাকিস্তান নবগঠিত রাষ্ট্র হিসেবে নিজের নিরাপত্তা এবং ভারতের সঙ্গে বৈরিতা মোকাবিলার জন্য মার্কিন ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার বিনিময়ে পাকিস্তান ১৯৫৪ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা (SEATO) এবং ১৯৫৫ সালে বাগদাদ চুক্তিতে (পরবর্তীতে CENTO) যোগ দেয়। এই দুটি চুক্তি ছিল মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।

ভারতের জোট নিরপেক্ষতা নীতিকে অনেকে প্রথমদিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখলেও এটি ছিল কার্যকর কৌশল। নেহরু জানতেন যে কোনো একটি ব্লকে যোগ দিলে ভারত অন্য ব্লকের শত্রু হয়ে যাবে, যা দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর। জোট নিরপেক্ষতার মাধ্যমে ভারত উভয় পরাশক্তির কাছ থেকে সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছিল তখন ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক জোরদার করে। ১৯৬০-এর দশকে ভারত-চীন যুদ্ধের পর ভারতের সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি ঝোঁক আরও বাড়ে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন করছিল, তখন ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ‘শান্তি, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যা ভারতকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে ভারতের জোট নিরপেক্ষতা নীতি কোনো নিষ্ক্রিয় অবস্থান ছিল না, বরং এটি ছিল এক সক্রিয় এবং গতিশীল কৌশল যা দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছিল।

পাকিস্তানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা ছিল এক জটিল এবং প্রায়শই দ্বিধাগ্রস্ত সম্পর্ক। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা বিশেষত আইয়ুব খান মনে করতেন মার্কিন সামরিক সহায়তা ভারতের বিরুদ্ধে তাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। তবে এই মৈত্রী সম্পর্কের কিছু নেতিবাচক দিকও ছিল। প্রথমত এটি পাকিস্তানকে ভারতের সঙ্গে একটি স্থায়ী সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঠেলে দেয়। দ্বিতীয়ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পাকিস্তানের নিজস্ব বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায়শই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করত। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন করে, তখন এটি পাকিস্তানের জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করে। ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আগ্রাসনের পর পাকিস্তান আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হয়ে ওঠে, কিন্তু এই সম্পর্ক সবসময়ই ছিল স্বার্থভিত্তিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কোল্ড ওয়ারের অবসান হয়। এই ঘটনা উপমহাদেশের দেশগুলির কূটনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। পাকিস্তানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার কৌশলগত মৈত্রীর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ভারতের জন্য, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে তার পুরনো মিত্রের অভাব দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ভারত তার অর্থনীতিকে উদারীকরণের মাধ্যমে পশ্চিমা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করে। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক নতুন করে গড়ে ওঠে, যা ছিল একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতির এক নতুন অধ্যায়।

কোল্ড ওয়ারের প্রেক্ষাপটে উপমহাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ছিল এক বহুমুখী এবং জটিল প্রক্রিয়া। এই সময়ে ভারত তার জোট নিরপেক্ষ নীতির মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান মার্কিন ব্লকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল, যা তাদের জন্য মিশ্র ফলাফল নিয়ে আসে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পরবর্তীকালে তার পররাষ্ট্রনীতি এই দুটি দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে উঠেছিল। কোল্ড ওয়ারের অবসান ঘটলেও তার প্রভাব উপমহাদেশের ভূরাজনীতিতে আজও বিদ্যমান। কাশ্মীরের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত থেকে শুরু করে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা পর্যন্ত, এই অঞ্চলের অনেক আন্তর্জাতিক সমস্যার শিকড় কোল্ড ওয়ারের যুগে প্রোথিত। এই প্রেক্ষাপটে, কোল্ড ওয়ারের সময়ের উপমহাদেশের কূটনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, বরং এটি বর্তমানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার এক অপরিহার্য চাবিকাঠি।