১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং ১৯৪৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এই সময়টি ছিল “কোল্ড ওয়ার” নামে পরিচিত দুই পরাশক্তি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শগত ও সামরিক সংঘাতের যুগ। এই সংঘাত কেবল ইউরোপ বা আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তার প্রভাব ভারত, পাকিস্তান, এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশসহ সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।কোল্ড ওয়ারের এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উপমহাদেশের দেশগুলির কূটনীতি ছিল এক জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত এবং প্রায়শই আত্মরক্ষামূলক কৌশল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন বিশ্ব দ্রুত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছিল একদিকে পুঁজিবাদী মার্কিন ব্লক এবং অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ব্লক তখন উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এই বিভাজনই ছিল উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনীতির প্রধান নিয়ামক। ভারত, তার প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) নামক একটি তৃতীয় পথ বেছে নেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল কোনো ব্লকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং নিজেদের উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া। নেহরুর এই নীতি ছিল বাস্তববাদী এবং দূরদর্শী, কারণ এটি ভারতকে দুটি পরাশক্তির চাপ থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করেছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তান নবগঠিত রাষ্ট্র হিসেবে নিজের নিরাপত্তা এবং ভারতের সঙ্গে বৈরিতা মোকাবিলার জন্য মার্কিন ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার বিনিময়ে পাকিস্তান ১৯৫৪ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা (SEATO) এবং ১৯৫৫ সালে বাগদাদ চুক্তিতে (পরবর্তীতে CENTO) যোগ দেয়। এই দুটি চুক্তি ছিল মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
ভারতের জোট নিরপেক্ষতা নীতিকে অনেকে প্রথমদিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখলেও এটি ছিল কার্যকর কৌশল। নেহরু জানতেন যে কোনো একটি ব্লকে যোগ দিলে ভারত অন্য ব্লকের শত্রু হয়ে যাবে, যা দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর। জোট নিরপেক্ষতার মাধ্যমে ভারত উভয় পরাশক্তির কাছ থেকে সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছিল তখন ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক জোরদার করে। ১৯৬০-এর দশকে ভারত-চীন যুদ্ধের পর ভারতের সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি ঝোঁক আরও বাড়ে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন করছিল, তখন ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ‘শান্তি, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যা ভারতকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে ভারতের জোট নিরপেক্ষতা নীতি কোনো নিষ্ক্রিয় অবস্থান ছিল না, বরং এটি ছিল এক সক্রিয় এবং গতিশীল কৌশল যা দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছিল।
পাকিস্তানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা ছিল এক জটিল এবং প্রায়শই দ্বিধাগ্রস্ত সম্পর্ক। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা বিশেষত আইয়ুব খান মনে করতেন মার্কিন সামরিক সহায়তা ভারতের বিরুদ্ধে তাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। তবে এই মৈত্রী সম্পর্কের কিছু নেতিবাচক দিকও ছিল। প্রথমত এটি পাকিস্তানকে ভারতের সঙ্গে একটি স্থায়ী সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঠেলে দেয়। দ্বিতীয়ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পাকিস্তানের নিজস্ব বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায়শই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করত। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন করে, তখন এটি পাকিস্তানের জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করে। ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আগ্রাসনের পর পাকিস্তান আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হয়ে ওঠে, কিন্তু এই সম্পর্ক সবসময়ই ছিল স্বার্থভিত্তিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কোল্ড ওয়ারের অবসান হয়। এই ঘটনা উপমহাদেশের দেশগুলির কূটনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। পাকিস্তানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার কৌশলগত মৈত্রীর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ভারতের জন্য, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে তার পুরনো মিত্রের অভাব দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ভারত তার অর্থনীতিকে উদারীকরণের মাধ্যমে পশ্চিমা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করে। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক নতুন করে গড়ে ওঠে, যা ছিল একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতির এক নতুন অধ্যায়।
কোল্ড ওয়ারের প্রেক্ষাপটে উপমহাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ছিল এক বহুমুখী এবং জটিল প্রক্রিয়া। এই সময়ে ভারত তার জোট নিরপেক্ষ নীতির মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান মার্কিন ব্লকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল, যা তাদের জন্য মিশ্র ফলাফল নিয়ে আসে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পরবর্তীকালে তার পররাষ্ট্রনীতি এই দুটি দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে উঠেছিল। কোল্ড ওয়ারের অবসান ঘটলেও তার প্রভাব উপমহাদেশের ভূরাজনীতিতে আজও বিদ্যমান। কাশ্মীরের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত থেকে শুরু করে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা পর্যন্ত, এই অঞ্চলের অনেক আন্তর্জাতিক সমস্যার শিকড় কোল্ড ওয়ারের যুগে প্রোথিত। এই প্রেক্ষাপটে, কোল্ড ওয়ারের সময়ের উপমহাদেশের কূটনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, বরং এটি বর্তমানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার এক অপরিহার্য চাবিকাঠি।


