Home Blog Page 185

স্বাধীনতার পর কোনো সরকারই ভূমি সংস্কারে হাত দেয়নি

মেক্সিকোয় বিপ্লবের (১৯১০-১৯২০) পর দেশটিতে ব্যাপক মাত্রায় ভূমি সংস্কার করা হয়। দেশটির ওই বিপ্লব ও পাল্টা বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কৃষকদের ভূমি অধিকারের দাবি আদায়। বলশেকিভ বিপ্লবের পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯১৭ সালেই বড় ধরনের ভূমি সংস্কারে হাত দেয়া হয়। এতে বৃহৎ ভূমি মালিকদের থেকে জমি উদ্ধার করে তা স্থানীয় কৃষক ও কমিউনের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। এতে কৃষি উৎপাদনে নয়া জাগরণ সৃষ্টি হয়। এ ভূমি বণ্টনকে রাশিয়াসহ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সংস্কার হিসেবে দেখা হয়। চীনেও কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর ১৯৪৯-৫০ সালে ব্যাপকভিত্তিক ভূমি সংস্কার করা হয়।জমিদারদের কাছ থেকে ভূমির মালিকানা বুঝিয়ে দেয়া হয় প্রান্তিক চাষীদের, যা দেশটির গ্রামীণ কৃষি ও অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে।

একই সময়ে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই বড় ধরনের ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়ায়ও। গ্রামীণ এলাকাগুলোয় বৈষম্য কমে গড়ে ওঠে সমতাভিত্তিক সামাজিক কাঠামো। বাড়ে কৃষির উৎপাদনশীলতা, যা দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। একইভাবে ভূমির সংস্কার করা হয়েছিল জাপান, তাইওয়ানসহ আরো বেশকিছু দেশে। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় শুরু হয় ভূমি সংস্কার কর্মসূচি ‘নিউ ওয়েভ’। এর মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া ও জিম্বাবুয়েতে ভূমি সংস্কার করা হয়। এক সময় ফিলিপাইন ও হন্ডুরাসেও প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভূমির সংস্কার।

বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ভূমি সংস্কারের উদ্দেশ্যে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সরকার ১১টি কমিশন গঠন করলেও প্রান্তিক কৃষকের ভূমি মালিকানা নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় কোনো সরকারই ভূমির সংস্কারে হাত দেয়নি। কিছু আইন প্রণয়ন হলেও ভূমি মালিকানার কাঠামোয় কোনো কার্যকর পরিবর্তন আনা হয়নি। দেশের গ্রামীণ কৃষিতে ভূমি বণ্টনে রয়ে গেছে বড় ধরনের বৈষম্য। এখনো দেশের গ্রামীণ কৃষি খাতে নিয়োজিত বেশির ভাগ পরিবারই ভূমিহীন। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো জমি নেই। যদিও গ্রামাঞ্চলে মোট কৃষিজমির ৬৬ শতাংশই এখন আয়-ব্যয়ের দিক থেকে শীর্ষ ১৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের দখলে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের ভূমি সংস্কার নিয়ে কাজ শুরু করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরাও।সরকারের অর্থনীতিবিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রধান ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানে ভূমি নিয়ে বহুকাল কোনো আলাপ নেই, গবেষণাও নেই। এখন ভূমি ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি অন্যায্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের হাতে খুব বেশি জমি নেই। খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় প্রযুক্তি ও উন্নত যন্ত্রায়নের কথা বললেও ভূমির কথা নেই। কত দ্রুত আমাদের ভূমির ব্যবহার বদলে যাচ্ছে, সেটিও বোঝা যাচ্ছে না। এটা জানা দরকার। এখন গবেষকদের মধ্যেও কৃষি নিয়ে আগ্রহ কম। যদিও জিডিপির ২৩ শতাংশে অবদান রাখছে গ্রামীণ অর্থনীতি।’

দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশের বেশি নিয়োজিত রয়েছে কৃষি খাতে। কৃষিকাজে নিয়োজিত মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ। তবে কৃষিতে নিয়োজিত যেসব কৃষকের জমি নেই, তারা জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আইএফপিআরআইয়ের গবেষণার তথ্যমতে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের যথাক্রমে ৬৭দশমিক ৮ ও ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের কোনো ভূমি নেই। এছাড়া ঢাকা বিভাগের ৫৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো ভূমি নেই। রংপুর ও বরিশাল বিভাগের ক্ষেত্রে এ হার ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ করে। রাজশাহী বিভাগের ৫২ দশমিক ১ ও খুলনা বিভাগের ৪৭ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন। এসব পরিবারের কৃষির জন্য আলাদা কোনো ভূমি নেই।

গবেষণার বিষয়ে আইএফপিআরআইয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আখতার আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্রামের ভূমিহীন কৃষকদের জমির মালিকদের উৎপাদনের অর্ধেক দিয়ে দিতে হয়। এতে তাদের আর তেমন কিছু থাকে না। কিন্তু বিকল্প না থাকায় তারা কৃষিতে যুক্ত থাকে। এখন কীভাবে এসব কৃষককে সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। তবে আমাদের মতো দেশে ভূমি সংস্কার কতটা সম্ভব হবে, সেটি এখনো নিশ্চিত না। যদিও আগে অনেক দেশেই এটা হয়েছে।’ দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথার বিলোপ ও ভূমি মালিকানা সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করা হয়। সে সময় পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে স্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্ত করে বর্গাচাষীদের সরাসরি রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু পরে ১৯৬১ সালে আইয়ুব খান সরকার এর পরিমাণ ধার্য করে ৩৭৫ বিঘা বা ১২৫ একর।

স্বাধীনতার পর ভূমি সংস্কারের বিষয়টিও আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ ছিল। মালিকানার কাঠামো পরিবর্তনে এসব আইন কখনই কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। বাংলাদেশ ল্যান্ড হোল্ডিং লিমিটেশন অর্ডার, ১৯৭২ (১৯৭২ সালের ৯৮ নং আদেশ)-এর ৩ ধারা মোতাবেক পরিবার/সংস্থার মালিকানাধীন জমির সিলিং আবারো ১০০ বিঘা নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় ১৯৮৪ সালে ভূমি সংস্কার আইন সংশোধন করে প্রতি পরিবারের জন্য কৃষিজমির মালিকানা সিলিং নির্ধারণ করা হয় ৬০ বিঘা। এর প্রায় তিন দশক পর ভূমি আইন সংস্কার করে ২০২৩ সালে এক অধ্যাদেশ জারি করে শেখ হাসিনা সরকার। ওই অধ্যাদেশেও পরিবারপ্রতি কৃষিজমির মালিকানা সিলিং ৬০ বিঘা রাখা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ভূমি সংস্কার বোর্ডের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির ফলে কৃষকরা ভূমির মালিক হলেন। তারপর ব্যক্তির কৃষিজমির পরিমাণ ১০০ বিঘা হলো। পরে সেটিকে ৬০ বিঘা করা হয়। এখনো তা ৬০ বিঘাই আছে। অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো ধরনের ভূমি সংস্কার হবে কিনা সেটি জানি না। ভূমি মন্ত্রণালয় সেটি বলতে পারবে।’ এসব আইনে মূলত কয়েকটি শব্দের পরিবর্তন ছাড়া আদতে আর কোনো সংস্কারই হয়নি বলে মনে করছেন ভূমি অধিকার আন্দোলনসংশ্লিষ্টরা। এখনো প্রান্তিক চাষীর জমির মালিকানা নিশ্চিতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম ইন বাংলাদেশের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে ১৯৫০ সালের আইনে ভূমির মালিকানা সিলিং ১০০ বিঘা ছিল। কিন্তু তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এটিকে বাড়িয়ে ৩৭৫ বিঘা করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সেটি পরিবর্তন করে ১০০ বিঘা করা হয়। কিন্তু সেটি কার্যকর করা হয়নি। এ বিষয়ে কোনো সমীক্ষাও করা হয়নি। কিংবা ভূমি উদ্ধারও করেনি। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালে ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ করে সিলিং ৬০ বিঘা করা হলো। সেটিও কার্যকর করা হয়নি। সর্বশেষ ২০২৩ সালে এটি পরিবর্তন করা হয়। পরিবর্তন বলতে কিছু শব্দের পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু বিষয়বস্তুর দিক থেকে কোনো ব্যাপক পরিবর্তন আসেনি। ফলে যারা চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত তাদের হাতে জমি থাকছে না।’





কি থাকছে নতুন প্রজন্মের সোলার প্যানেলে !

Nature জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে, লিংকোপিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক দ্রাবক ব্যবহার না করেই বারবার একটি সৌরকোষের সব অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। পুনর্ব্যবহৃত সৌরকোষের কার্যকারিতা মূল সৌরকোষের মতোই থাকে। এই সৌরকোষটি পেরোভস্কাইট দিয়ে তৈরি এবং এর প্রধান দ্রাবক হলো পানি। এআই উন্নয়ন এবং বৈদ্যুতিক পরিবহনে রূপান্তরের মতো পরিবর্তনগুলোর কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার আগামী বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তন যেন জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত না করে সে জন্য বিভিন্ন টেকসই জ্বালানি উৎসকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সৌরশক্তিকে দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং সিলিকন-ভিত্তিক সৌর প্যানেল ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাজারে রয়েছে। তবে প্রথম প্রজন্মের সিলিকন সৌর প্যানেল এখন তাদের জীবনচক্রের শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং একটি অপ্রত্যাশিত সমস্যার সৃষ্টি করেছে। লিংকোপিং বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিভাগের (IFM) পোেস্টডক্টরাল গবেষক জুন শিয়াও বলেন, “সিলিকন প্যানেলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বর্তমানে কার্যকর কোনো প্রযুক্তি নেই। ফলে পুরোনো সৌর প্যানেলগুলো আবর্জনার স্তূপে চলে যায়। এতে বিশাল পরিমাণে ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হয়, যা ব্যবহার করা সম্ভব নয়,”।

একই বিভাগের অপটোইলেকট্রনিক্সের অধ্যাপক ফেং গাও বলেন, “আমাদের নতুন সৌরকোষ প্রযুক্তি উন্নয়নের সময় পুনর্ব্যবহারযোগ্যতার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। যদি আমরা জানিই না কীভাবে এগুলো পুনর্ব্যবহার করব, তাহলে এগুলো বাজারে আনা উচিত নয়।” পরবর্তী প্রজন্মের সৌরকোষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল প্রযুক্তির একটি হলো পেরোভস্কাইট। এটি তুলনামূলকভাবে কম খরচে সহজে উৎপাদনযোগ্য, হালকা, নমনীয় এবং স্বচ্ছ। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে পেরোভস্কাইট সৌরকোষ বিভিন্ন ধরনের পৃষ্ঠে স্থাপন করা সম্ভব। এমনকি জানালার উপরেও। এ ছাড়া, এটি সূর্যালোকের প্রায় ২৫ শতাংশ বিদ্যুতে রূপান্তর করতে পারে, যা আধুনিক সিলিকন সৌরকোষের কার্যকারিতার সমান।

পেরোভস্কাইট সৌরকোষের বর্তমান জীবনকাল সিলিকন সৌরকোষের তুলনায় সংক্ষিপ্ত হওয়ায় এর পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়াকে অবশ্যই দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব হতে হবে। পেরোভস্কাইট সৌরকোষে অল্প পরিমাণ সিসা থাকে যা উচ্চ কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার দাবি তোলে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন অংশে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে উৎপাদকদের অবশ্যই পুরোনো সৌরকোষ সংগ্রহ এবং টেকসইভাবে পুনর্ব্যবহার করতে হবে। পেরোভস্কাইট সৌরকোষ খুলে ফেলার জন্য ইতিমধ্যে কিছু পদ্ধতি বিদ্যমান। সাধারণত এতে ডাইমিথাইলফর্মামাইড নামে একটি পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এটি রঙের দ্রাবক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি বিষাক্ত, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং সম্ভাব্য কার্সিনোজেনিক।

কিন্তু লিংকোপিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এখন এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন যেখানে এই প্রক্রিয়ায় পানি ব্যবহার করা সম্ভব। এর ফলে পানির দ্রবণে উচ্চমানের পেরোভস্কাইট পুনরুদ্ধার করা যায়। “আমরা সব কিছু পুনর্ব্যবহার করতে পারিড়আবরণী কাচ, ইলেকট্রোড, পেরোভস্কাইট স্তর এবং চার্জ পরিবহন স্তর,” বলেন জুন শিয়াও। পরবর্তী ধাপে গবেষকরা এই পদ্ধতিকে শিল্পকারখানার জন্য বড় পরিসরে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে চান। দীর্ঘমেয়াদে তারা বিশ্বাস করেন, অবকাঠামো ও সরবরাহ চেইন যথাযথভাবে গড়ে উঠলে পেরোভস্কাইট সৌরকোষ শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।





Al কি পাল্লা দিতে পারবে শিল্পীর সাথে ?

চিত্রকলা, সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য এসব মাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ তার চিন্তা, অনুভূতি ও দর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আজ আমরা এমন এক সময়ে এসে পৌঁছেছি যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নতুনভাবে শিল্প ও সৃজনশীলতাকে সংজ্ঞায়িত করছে। বিশেষত জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Generative AI) শিল্প ও সৃজনশীলতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। জেনারেটিভ এআই এক ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যা নতুন কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। এটি বিশাল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করে এবং সেই ডেটা থেকে নতুন ছবি, লেখা, সঙ্গীত, ভিডিও এমনকি কোডও তৈরি করতে পারে।

জনপ্রিয় কিছু জেনারেটিভ এআই মডেলের মধ্যে আছে OpenAl-এর GPT (যেমন GPT-4), DALL·E, Google-এর Bard, এবং Stable Diffusion । এগুলো শেখার মাধ্যমে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে, যা পূর্ববর্তী তথ্যের উপর ভিত্তি করে হলেও স্বতন্ত্র বলে বিবেচিত হতে পারে। জেনারেটিভ এআই বর্তমানে ডিজিটাল শিল্প ও গ্রাফিক ডিজাইনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। DALL-E এবং Stable Diffusion-এর মতো এআই মডেল ব্যবহার করে শিল্পীরা অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করতে পারেন বা পুরোপুরি নতুন শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারেন। আগে যেখানে একটি চিত্রকর্ম আঁকতে সপ্তাহ বা মাস সময় লাগত এখন সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যেই উচ্চমানের ডিজাইন তৈরি করা সম্ভব। তবে এটি কি শিল্পের মৌলিকত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে?

GPT-এর মতো ভাষাভিত্তিক এআই মডেল গল্প, কবিতা, নাটক এমনকি গবেষণামূলক লেখা লিখতে পারে। লেখকরা এখন কনটেন্ট তৈরিতে এআই-এর সাহায্য নিচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন লেখক যদি কোনো কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস লিখতে চান, তবে এআই তাকে চরিত্র, প্লট বা সংলাপ সাজাতে সাহায্য করতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, এই ধরনের লেখা কি প্রকৃত অর্থে মানবিক সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ নাকি নিছকই অ্যালগরিদমিক পুনরাবৃত্তি? এবার একটি বড় বিতর্ক হলো এআই কি প্রকৃত অর্থে সৃজনশীল? সৃজনশীলতা বলতে আমরা সাধারণত এমন কিছু বুঝি, যা নতুন, অনন্য এবং মানব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। এআই যে কাজগুলো করছে, তা আসলে বড় পরিমাণে ডেটার ওপর ভিত্তি করে পূর্বনির্ধারিত নিদর্শন অনুসারে কিছু তৈরি করা। অন্যদিকে, মানব মস্তিষ্ক অনুভূতি, স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং স্বকীয়তা মিশিয়ে সৃজনশীল কাজ করে।

যেমন, পিকাসোর “গুয়ের্নিকা” শুধুমাত্র একটি চিত্রকর্ম নয়, এটি স্পেনের গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিবাদও বটে।অন্যদিকে, জেনারেটিভ এআই কোনো ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে পারে না, বরং বিদ্যমান উপাদানের ভিত্তিতে নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। তাই প্রশ্ন থেকে যায় এআই দ্বারা তৈরি শিল্পকর্ম কি একই ধরনের তাৎপর্য বহন করতে পারে? জেনারেটিভ এআই-এর বিস্তৃতি অনেক শিল্পীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল শিল্পী, লেখক, সংগীতশিল্পী এবং অন্যান্য সৃজনশীল পেশাজীবীরা ভাবছেন, এআই কি তাদের কাজ প্রতিস্থাপন করবে? যদিও এটি সত্য যে, কিছু ক্ষেত্রে এআই দক্ষতার সাথে কাজের গতি বাড়াতে পারে, তবে এটি মানব সৃজনশীলতার বিকল্প হতে পারবে না। ভবিষ্যতে এআই এবং মানব সৃজনশীলতার মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা বেশি।

বহু শিল্পী এখন এআই-কে একটি টুল হিসেবে দেখছেন যা তাদের কাজকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ডিজিটাল আর্টিস্টরা এআই ব্যবহার করে দ্রুত স্কেচ তৈরি করততিস্ত্র। পরে সেটাকে নিজেদের মতো করে পরিমার্জিত করতে পারেন। একইভাবে লেখকেরা এআই-কে একটি কল্পনাপ্রসূত সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এআই-নির্ভর শিল্প ও সৃজনশীলতার আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো নৈতিকতা এবং কপিরাইট। যখন একটি এআই মডেল প্রশিক্ষিত হয়, এটি হাজার হাজার মানুষের কাজ বিশ্লেষণ করে। কিন্তু সেই শিল্পীদের সম্মতি বা পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। তাই অনেকেই দাবি করছেন এআই দ্বারা তৈরি কনটেন্টের পিছনে থাকা শিল্পীদের যথাযথ স্বীকৃতি এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করা উচিত।

জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প এবং সৃজনশীলতার জগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি মানব সৃজনশীলতার প্রতিযোগী না হয়ে বরং সহযোগী হতে পারে। তবে এটি কিভাবে ব্যবহৃত হবে তার উপর নির্ভর করবে শিল্পের ভবিষ্যৎ। মানব অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সাথে এআই-কে সংযুক্ত করতে পারলেই কেবল সত্যিকারের সৃজনশীল বিপ্লব ঘটতে পারে। তাই আমাদের উচিত প্রযুক্তিকে স্বাগত জানানো, তবে তার ব্যবহার নিয়ে সচেতন থাকা। যাতে মানব সৃজনশীলতা তার স্বকীয়তা হারিয়ে না ফেলে।

নতুন বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে , হ্রাস পেয়েছে অর্থছাড়

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যানুসারে, এ সাত মাসে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ২৩৫ কোটি ডলারের। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময় প্রতিশ্রুতি এসেছিল ৭১৭ কোটি ডলারের। এ সময় বিদেশী ঋণগ্রহণ নিয়ে আটটি ও অনুদানের বিষয়ে ৩১টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯৪ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি এসেছে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। এরপর সবচেয়ে বেশি ৭০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি। এছাড়া এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কাছ থেকে ৪৫ কোটি এবং এশিয়া ও জেইসির কাছ থেকে ১৬ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি এসেছে।

প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি কমেছে আগের প্রতিশ্রুত বিদেশী ঋণের অর্থছাড়ও। এ সাত মাসে বিদেশী ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৩৯৪ কোটি ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ৪৪০ কোটি ডলার। এ সময়ে বিদেশী ঋণের অর্থছাড় কমেছে ৪৬ কোটি ডলার বা প্রায় ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ ১১০ কোটি ডলার। বিশ্বব্যাংক ছাড় করেছে ৮৭ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কাছ থেকে এসেছে ৭৬ কোটি ডলার। চীনের কাছ থেকে এ সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কোনো অর্থছাড় হয়নি। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ৬৯ কোটি ডলার এবং এশিয়া ও জেইসি থেকে এসেছে ৪১ কোটি ডলারের ঋণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ইইউ ছাড়া অন্য সব জায়গা থেকে বিদেশী ঋণের অর্থছাড় কমেছে।

বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমে যাওয়ার পেছনে দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দেশের অর্থনীতি এখনো সংকট থেকে বের হতে পারেনি। বরং শিল্পোৎপাদন ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখিতা অর্থনীতিকে বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। পাশাপাশি দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।আশাব্যঞ্জক নয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও। বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে নতুন করে বিনিয়োগের জন্য কোনোভাবেই ভরসা পাচ্ছেন না দেশী বিনিয়োগকারীরা। বিদেশী বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় দাতারাও বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নতুন করে ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দাতাদের কাছ থেকে অর্থপ্রবাহ সামনের দিনগুলোয় আরো কমে আসতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বতী সরকার এসেছে স্বল্পসময়ের জন্য। অন্যদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক সরকারের মেয়াদ হয় পাঁচ বছর। তাছাড়া সামনে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসারে নতুন নীতি গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যমান নীতিতে পরিবর্তনও আনবে, এটাই স্বাভাবিক। এ অবস্থায় বর্তমান এ অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিদেশী সহায়তা কমাটাই স্বাভাবিক। আরেকটি দিক হচ্ছে বর্তমানে অর্থনীতি এক প্রকার স্থবির হয়ে আছে।আমাদের বাস্তবায়ন সক্ষমতাও কম। অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট সরকারের যেসব মন্ত্রণালয় আছে তারা বর্তমানে সংকট মোকাবেলায় ব্যস্ত রয়েছে। একটার পর একটা সংকট লেগেই আছে।

ফলে এসব সংকট মোকাবেলা করতেই তারা সর্বশক্তি দিয়ে নিয়োজিত রয়েছে। এ অবস্থায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা দীর্ঘ বা মধ্যমেয়াদি কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়নে তাদের নজর দেয়ার সুযোগটা সীমিত। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থছাড়ের প্রত্যাশা করাটা সংগত নয়। চলমান ও স্বল্পকালীন ক্ষেত্রে বহুপক্ষীয় দাতাদের কাছ থেকে কিছু অর্থ ছাড় করা হতে পারে। অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় দাতারা পরিস্থিতি কোনদিকে যায় সেটি পর্যবেক্ষণ করছেন। বর্তমান অনিশ্চিত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে যেখানে দেশী বিনিয়োগকারীরাই বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হচ্ছেন, না সেখানে বিদেশীরা তো আরো বেশি সতর্ক থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। এ ধরনের পরিস্থিতি চলমান থাকলে সামনে বিদেশীদের কাছ থেকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় আরো কমবে। যতদিন পর্যন্ত অর্থনীতি ঘুরে না দাঁড়াবে ততদিন পর্যন্ত এটি নিম্নমুখী হওয়ার প্রবণতা প্রবল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’

প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমলেও বেড়েছে বিদেশী ঋণ পরিশোধের পরিমাণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বিদেশী ঋণের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে ২৪২ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১৫৫ কোটি ডলারের মূল ঋণ ও ৮৭কোটি ডলার সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধ করা হয়েছিল ১৮৬ কোটি ডলারের ঋণ। সে অনুযায়ী ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ৫৬ কোটি ডলার বা ৩০ শতাংশ। ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়বে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারেরও বেশি। পর্যায়ক্রমে এ ঋণ পরিশোধের চাপ সামনের বছরগুলোয় আরো বাড়বে। কেননা গত অর্থবছরে বিদেশী ঋণের আসল পরিশোধ যে গতিতে বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে বেড়েছে সুদ বাবদ খরচ। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে বিদেশী ঋণের সুদের পরিমাণ বেড়ে গেছে। তাছাড়া প্রকল্পের জন্য নেয়া ঋণের চাপও সামনে বাড়তে থাকবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণেও নতুন করে সহায়তার প্রতিশ্রুতি কমে গেছে। সরকার যেসব সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, সেগুলোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়ে এলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহায়তার পরিমাণ বাড়বে। দেশে বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিগত সরকার বিপুল পরিমাণ বিদেশী ঋণ নিয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই বাস্তবায়ন হয়েছে। বেশ কয়েকটির কাজ এখনো চলমান। এরই মধ্যে বাস্তবায়িত অনেক প্রকল্পের বিদেশী ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এতে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভ দুটোই কঠিন চাপে রয়েছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকেও বিভিন্ন ধরনের বকেয়া ও ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে হচ্ছে। বাড়তি এ চাপ সামাল দিতে এরই মধ্যে আইএমএফ, এডিবি, বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বাড়তি অর্থ চেয়েছে সরকার। যদিও শর্ত পূরণ করতে না পারায় এরই মধ্যে আইএমএফের ঋণের কিস্তির অর্থছাড় আগামী জুন পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্যান্য বছরে যখন স্বাভাবিক গতিতে প্রকল্পের কাজ চলমান থাকত, তখনো আমরা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হতাম না। আর এবার তো প্রকল্প কাটছাঁট করা হয়েছে, অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে, দুই মাসের মতো সময় সেভাবে কাজ হয়নি। ফলে এবার বিদেশী সহায়তার পরিমাণ কমবে, এটিই স্বাভাবিক। বিদেশী সহায়তার ক্ষেত্রে আগেরগুলো বাস্তবায়ন না হলে সেগুলো থেকে যায়। এ অবস্থায় নতুন করে কেউ প্রতিশ্রুতি দেবে না। বরং আগেরগুলোই ঘুরেফিরে আসবে। চীনের কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি না আসার কারণ হিসেবে আমার কাছে মনে হয় তারা হয়তো বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সামনে নির্বাচনের আগে নতুন বিনিয়োগ কিংবা ঋণ সেভাবে আসবে না; বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় দাতাদের কাছ থেকে। …’





দেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সংকট বেড়েই চলেছে

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুতির হার দিন দিন বাড়ছে। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে লাখো মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র অভিবাসন নিতে বাধ্য হচ্ছে। ১৯৮৮ সালে বরিশালের উজিরপুরের বেলায়েত হোসেনের মতো অনেকেই বন্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে বাগেরহাটের মোংলায় স্থানান্তরিত হয়েছেন। তিন দশক উদ্বাস্তুর জীবনযাপনের পর ২০১৯ সালে সরকারি আবাসন প্রকল্পে তিনি ৫০০ বর্গফুটের একটি টিনের ঘর পেয়েছেন, যেখানে তাঁর পাঁচ সদস্যের পরিবার কোনোমতে বসবাস করছে।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (আইডিএমসি) তথ্য অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের বর্তমান বার্ষিক বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ৯ লাখ ১৫ হাজার। যেটি শতকের শুরুতে ছিল গড়ে সাত লাখ। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির শীর্ষে থাকা দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান বিশ্বে পঞ্চম। সংখ্যাটা হচ্ছে ১৭ লাখ ৯১ হাজার। ২০০৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘গ্রাউন্ডসওয়েল’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার মোট অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর প্রায় অর্ধেক হয়ে উঠতে পারে, যেটি সংখ্যার বিচারে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৯ লাখ।

জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তসরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ০.৪৮ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণেই এসব অঞ্চলের ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।আইডিএমসির তথ্য অনুসারে উপকূলীয় জেলা যেমন ভোলা, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরার মতো জেলাগুলো থেকে বাস্তুচ্যুতি বেশি ঘটে। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের বছরগুলোতে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বেড়ে যায়। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ফলে ২৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ২০১৮ সালের গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা অভিবাসন নিচ্ছে, তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ রাজধানী ঢাকা, ২০ শতাংশ চট্টগ্রাম শহরে ও ২০ শতাংশ আন্তজেলায় অভিবাসী হচ্ছে। মেয়রস মাইগ্রেশন কাউন্সিলের ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুসারে দেশের উপকূলীয় নিম্নভূমি থেকে প্রতিদিন দুই হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। প্রতিবছর ঢাকায় চার লাখের মতো নিম্ন আয়ের অভিবাসী আসে যারা রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করছে। এর একটি উদাহরণ হল ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভোলার মানুষদের নিয়ে গড়ে ওঠা “ভোলা বস্তি”। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ওয়াসা ও গৃহায়ণ অধিদপ্তরের জমিতে গড়ে উঠেছিল এই বস্তি। পুরানো বাসিন্দাদের অনেকেই এখন উচ্ছেদের ভয়ে ভুগছেন।

গবেষকরা বলছেন অভিবাসনের ফলে তিন শ্রেণির মানুষ বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, অভিবাসী নিজে, অভিবাসন এলাকায় থেকে যাওয়া মানুষ, এবং যে এলাকায় অভিবাসন ঘটে সেই এলাকার মানুষ। এর ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে যায়।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আবদুল লতিফ খান বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ আসলে সহিষ্ণু (রেজিলিয়েন্ট)। তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে। কিন্তু এটি স্রেফ মানিয়ে নেওয়া। তারা মানবেতর জীবন যাপন করলেও টিকে আছে। এ টিকে থাকা মানুষদের সহায়তা করতে হলে পরিসংখ্যানের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।”

রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “বাংলাদেশের বাস্তুচ্যুতির সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত না থাকায় জাতিসংঘের জলবায়ু তহবিল বা জলবায়ু ক্ষতিপূরণে গঠিত অন্য আন্তর্জাতিক তহবিলের কোথাও সাহায্যের আবেদন করা যায় না। কারণ সংস্থাগুলো বাস্তুচ্যুতির সুনির্দিষ্ট তথ্য চায় এবং সেটাই স্বাভাবিক।” সুতরাং জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।



রাশিয়া – ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘে যেভাবে বদলে গেল যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের তিন বছরে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে কিয়েভ নিয়ে অবস্থান বদলাতে শুরু করে ওয়াশিংটন। গত সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) ইউক্রেন যুদ্ধের তিন বছর পূর্তির দিন উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল। এতে ইউক্রেনে হামলা চালানোয় রাশিয়ার নিন্দা করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, ইউক্রেন থেকে অবিলম্বে রুশ সেনাদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং যুদ্ধের সমাপ্তি টানা। ইউএনজিএতে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে একই দিন আলাদা করে যুক্তরাষ্ট্রও একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রস্তাবে সংঘাতের জন্য স্পষ্ট করে রাশিয়াকে দায়ী করা হয়নি। অন্যদিকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে যুদ্ধের ইতি টানার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইউএনজিএতে উত্থাপিত এই দুই প্রস্তাব থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে। একইসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন কিয়েভ নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতির পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের উপরাষ্ট্রদূত ডরোথি শিয়া গত সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে এর আগে একাধিক প্রস্তাব পাস করা হয়েছে।এসব প্রস্তাবে ইউক্রেন থেকে রুশ সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল; কিন্তু এসব প্রস্তাব ‘যুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে’।তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন একটি প্রস্তাব দরকার, যাতে টেকসইভাবে যুদ্ধের ইতি টানার বিষয়ে জাতিসংঘের সব সদস্যের প্রতিশ্রুতি থাকবে।’


ধর্ম ও ধার্মিকতার বর্তমান – ভবিষ্যৎ

মানবজীবনের বিশাল ক্যানভাসে ধর্মের প্রশ্নটি সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে বোনা এক সুতো। The New Yorker-এ সম্প্রতি প্রকাশিত “Should You Be Religious?” শীর্ষক নিবন্ধে জোশুয়া রথম্যান এই চিরন্তন প্রশ্নটি অন্বেষণ করেছেন। যেখানে তিনি রস ডাউথাটের বই ইবষরবাব: Why Everyone Should Be Religious (বিশ্বাস: কেন সবাই ধর্মপ্রাণ হওয়া উচিত) নিয়ে আলোচনা করেছেন। ডাউথাট একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও ধর্মীয় ভাবনার প্রবক্তা। তিনি আধুনিক সংশয়বাদীদের বোঝাতে চান যে ধর্ম কেবল মানসিক প্রশান্তির জন্য নয়, বরং এটিই পরম সত্য। অনেকেই মনে করেন ধর্মের মূল উপযোগিতা হলো এটি মানুষকে অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করতে সাহায্য করে, তবে এই সত্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু ডাউথাট যুক্তি দেন যে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস কেবল সুবিধাজনকই নয়, বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য।

ধর্মের ইতিহাস এবং আধুনিক ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ক্যারেন আর্মস্ট্রং-এর বইগুলোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। তার বই The Case for God, A History of God, এবং The Battle for God ধর্মের বিবর্তন ও আধুনিক বিশ্বের ধর্মীয় দ্বন্দ্ব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করে। আর্মস্ট্রং দেখিয়েছেন ধর্মের উৎপত্তি একধরনের আধ্যাত্মিক অন্বেষণ থেকে। যেটি কেবল ঈশ্বরের ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নৈতিক ও মানবিক আদর্শের সঙ্গেও জড়িত। তার মতে ধর্ম কেবল বিশ্বাসের একটি কাঠামো নয়, এটি মানুষের চেতনার বিকাশের অংশ। আধুনিক বিশ্বে ধর্মের ভূমিকা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় ধর্মচর্চা কমে এলেও আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ায় ধর্মের ভূমিকা শক্তিশালী থেকে যাচ্ছে। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম ও হিন্দুধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যদিও ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যকার সংঘর্ষও তীব্রতর হচ্ছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিস্থিতি একটি বিস্ময়কর পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। দেশটির ইতিহাসে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিশাল প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ধর্মের প্রভাব কমে এসেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একটি অন্যতম ধর্মীয় দেশ তবে বর্তমানে ধর্মীয় বিশ্বাসের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। Pew Research Center এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ২০২৩ সালে প্রায় ৩১% আমেরিকান নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বা নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা এক দশক আগের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মের ভূমিকা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত খ্রিস্টান মৌলবাদী গোষ্ঠীসমূহের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিষয়ে যেমন, গর্ভপাত নিষিদ্ধকরণ, সমকামী বিবাহ নিষিদ্ধকরণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে চরম অবস্থান নিয়েছে।

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের অধিকার বাতিল করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় ও নৈতিক আলোচনা নতুন করে উস্কে দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মের বেড়ে চলা প্রভাবের পাশাপাশি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং একাধিক ধর্মের সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। ক্যারেন আর্মস্ট্রং ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে একধরনের গভীর মানবিক চাহিদার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন। তিনি বলেন ধর্ম শুধু অলৌকিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। এটি মানুষের অস্তিত্বসংকটের উত্তর খোঁজার একটি মাধ্যম।

আধুনিক সমাজে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা কেমন? এটি কি শুধুই ব্যক্তিগত বিশ্বাস নাকি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ?
একটি আকর্ষণীয় বিশ্লেষণে রথম্যান বলেন, কম জন্মহার ও পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোর কারণে কিছু নীতিনির্ধারকরা মনে করেন ধর্মীয় মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ পরিবারকেন্দ্রিক নীতিগুলো প্রায়শই ধর্মীয় শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত এবং কেউ কেউ মনে করেন একটি সুসংগঠিত সমাজের জন্য ধর্ম অপরিহার্য। আর্মস্ট্রং তার Fields of Blood বইয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে ধর্ম ও রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তিনি বলেন প্রায়শই মনে করা হয় যে ধর্ম সংঘাত সৃষ্টি করে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই অধিকাংশ সহিংসতার উৎস নিহিত থাকে।

আজকের বিশ্বে একদিকে বিশ্বজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা বাড়ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর গুরুত্বও বেড়ে চলেছে।উদাহরণস্বরূপ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় রাজনীতি শক্তিশালী হচ্ছে, যেখানে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মানুষ ক্রমশ ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। রথমম্যান ও ডাউথাটের বিতর্কের মূল সুর এটাই, ধর্ম কি কেবল অতীতের ধারা, নাকি এটি আধুনিক বিশ্বেও অপরিহার্য? ক্যারেন আর্মস্ট্রং মনে করেন ধর্মকে নতুনভাবে বোঝা দরকার। এটি যদি কেবল নিয়মকানুনের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এটি তার মূল উদ্দেশ্য হারাবে। ধর্ম যদি মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক থাকবে।

তাহলে আপনাকে কি ধর্মপরায়ণ হওয়া উচিত? এটি একটি গভীর ব্যক্তিগত প্রশ্ন। রস ডাউথাটের মতে উত্তরটি হ্যাঁ হওয়া উচিত। কারণ ধর্ম সত্য এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু রথম্যান এই তত্ত্বকে পুরোপুরি সমর্থন করেন না। তিনি মনে করেন যে বিষয়টি ব্যক্তিগত অনুধাবনের ওপর নির্ভর করে। একজন ব্যক্তি বিশ্বাস ও সংশয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতে পারেন। অথবা যুক্তি ও অনুভূতির সমন্বয় ঘটিয়ে নিজের পথ বেছে নিতে পারেন। ক্যারেন আর্মস্ট্রং-এর মতে ধর্ম যদি আধ্যাত্মিক চর্চা, মানবতা ও সংযোগের মাধ্যম হয় তবে এটি কেবল অতীতের ঐতিহ্য নয়, ভবিষ্যতেরও একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে। ধর্ম গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত কোনো একক যুক্তির ওপর নির্ভর করে না। এটি এক দীর্ঘ ও মোহনীয় যাত্রা।




বাংলাদেশে স্টারলিংক ইন্টারনেটে স্বাধীনতা নাকি নিয়ন্ত্রণ !

বাংলাদেশে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক চালুর বিষয়ে আগ্রহী অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের ভাষ্য, স্টারলিংক এলে ইন্টারনেট সম্পূর্ণরূপে বন্ধ (শাটডাউন) করার সুযোগ কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে না। যদিও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, স্টারলিংককে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর শর্ত মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। খাত – সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খসড়া নীতিমালা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হলে পরিস্থিতির খুব বেশি হেরফের হবে না। বিগত সরকারগুলোর মতোই ধনকুবের ইলন মাস্কের উচ্চগতির এ ইন্টারনেট সেবা সরকারের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।

আর দেশের ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা (আইএসপি) স্টারলিংকের আগমনকে তাদের প্রচলিত ব্যবসার জন্য হুমকি মনে করছেন। তারা বলছেন, এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যাবে। টাকা চলে যাবে বিদেশে। যদিও মোবাইল অপারেটররা স্টারলিংকের আগমনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তবে বিশ্লেষকরা স্টারলিংককে শুধুই ইন্টারনেট সেবা হিসেবে দেখছেন না। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে ইলন মাস্কের সঙ্গে বিশেষ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতেই অন্তর্বর্তী সরকার স্টারলিংক নিয়ে আগ্রহী হয়েছে। ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের স্টারলিংক প্রকল্প শুরু হয় ২০১৫ সালে। ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্টারলিংক স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দেয়। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্থাপিত হাজার হাজার স্যাটেলাইটের সমষ্টি হচ্ছে স্টারলিংক।

বর্তমানে বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে স্টারলিংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান প্রথম স্টারলিংকের সেবা গ্রহণ করে। স্টারলিংক ব্যবহারকারীরা গড়ে ১০০ এমবিপিএসের বেশি গতি পান, যেখানে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের গড় গতি ৪০-৫০ এমবিপিএস।স্টারলিংকের প্যাকেজ বেশ ব্যয়বহুল। দেশে একজন গ্রাহক ৫০০ টাকায় মাসজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু স্টারলিংকের সর্বনিম্ন মাসিক খরচ পড়বে ১৫ হাজার টাকা। আবার সংযোগ পেতে যেসব যন্ত্রপাতি গ্রাহককে বসাতে হবে, তার জন্য কমপক্ষে ৪৫ হাজার টাকা লাগবে।


সেনাপ্রধানের বক্তব্য কে কিভাবে দেখছেন !

বাংলাদেশে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের ক্লাবে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে কী বার্তা দিলেন, এ নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ আলোচনা। রাজনৈতিক দলগুলোর কাদা ছোড়াছুড়ি, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার বিষয় এবং এমনকি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সতর্ক করেছেন তিনি।
জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের এই বক্তব্য দেওয়ার সময় তার শারীরিক ভঙ্গি এবং বক্তব্যের ভাষাও বেশ কঠোর মনে হয়েছে। রাজনীতিকদেরও কেউ কেউ এতে অবাক হয়েছেন। এখন সেনাপ্রধানের এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা একটা বড় কারণ বলে রাজনীতিকদেরই অনেকে মনে করেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসি বংলাকে বলেছেন- রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, সে কারণে সেনাপ্রধানকে সবাইকে সতর্ক করে বক্তব্য দিতে হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মির্জা ফখরুল আরো বলেন, সেনাপ্রধানের বক্তব্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই। এই বক্তব্য তার ভালই লেগেছে। কারণ দেশে এখন সবার ঐক্য প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ বিবিসি বাংলাকে বলেন- রাজনীতিতে ঐক্যের জায়গায় বিভক্তির কারণে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটাই সেনাপ্রধানের বক্তব্যে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাদা-ছোড়াছুড়ি বন্ধ করা উচিত।

মতিউর রহমান আকন্দ অবশ্য বলেছেন – দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সঙ্গে স্বাধীনতা – সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার বিষয় কেন এলো, এটি সহ সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সার্বিক বিষয় নিয়ে তারা দলে আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবেন।
অন্যান্য দল ও জোটগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চের একাধিক শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা নিজেদের
মধ্যে আলোচনার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। সবদিকে যখন বিশৃঙ্খলা এ সরকার সামলাতে পারছে না, সামরিক শাসন আসতে পারে কি না – এখন এই আলোচনাও উঠছে বিভিন্ন মহলে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান বললেন, তার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। তিনি নির্বাচনের কথা বলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, দেশে অস্থির পরিস্থিতিতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে সেনাপ্রধানের বক্তব্য।

আওয়ামী লীগের শাসনের সময় গুম, খুনসহ মানবাধিকার লংঘনের বিভিন্ন অপরাধের ব্যাপারে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই-এর অতীত ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ এসেছে। এমনকি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান রাখা উচিত কি না – এই প্রশ্নও অনেকে তুলেছেন। আর এমন পটভূমিতেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই- কে ‘আন্ডারমাইন না করা’র ব্যাপারে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে তার একটা অবস্থান এসেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে ১৬ বছর আগের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আবার তদন্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে ওই ঘটনায় দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকা সাবেক বিডিআর সদস্যদের অনেককে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভতৈরি হয়েছে। সেই চাপ থেকে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে বিষয়টি এসেছে – দুইজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন।

সেনাপ্রধান তার সর্বশেষ বক্তব্যে ডিসেম্বর বা কাছাকাছি সময়ের মধ্যে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথাও বলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সেনাপ্রধানের বক্তব্য নির্বাচনের ব্যাপারে তাগিদ বাড়াবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, দেশকে নির্বাচনমুখী করা হলে সমস্যা কমে আসবে।


অস্কার মৌসুমে উপেক্ষিত হচ্ছে কিছু অসাধারণ ছবি : টিম গ্রিয়ারসন , চলচ্চিত্র সমালোচক

অস্কার মৌসুম যতই দীর্ঘায়িত হোক না কেন আমি কিন্তু এই সময়টা পছন্দ করি। বিশেষত এখানে মূলত চলচ্চিত্রের গুণগত মান নিয়ে আলোচনা হয়, বক্স অফিসে তারা কত আয় করেছে তা নিয়ে নয়। তবে এই কয়েক মাসের গুঞ্জনের একটি দিক সত্যিই ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে: জানুয়ারিতে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন ঘোষণার পর, অনেক দুর্দান্ত সিনেমা, যা একটিও মনোনয়ন পায়নি, আলোচনার বাইরে চলে যায়। ফলে আমরা মাত্র কয়েকটি ছবি নিয়েই বারবার কথা বলতে থাকি।

তাই ২০২৪ সালের মতো এবারও আমি ১০টি অসাধারণ সিনেমার জন্য একটি বিশেষ “ইন মেমোরিয়াম” তৈরি করলাম। যেগুলো একাডেমির কাছ থেকে কোনো স্বীকৃতি পায়নি। আমি সাধারণত এই বছরের মনোনীতদের নিয়ে সন্তুষ্ট। তবে অস্কার অনুষ্ঠানে যদি আমি যেসব ছবিকে এখানে তুলে ধরেছি সেগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকত তাহলে এটি আরও ভালো হতো এবং এটা পরিষ্কার করে বলা দরকার ২০২৪ সালে অস্কার দ্বারা উপেক্ষিত অসাধারণ সিনেমার সংখ্যা ১০টির চেয়েও অনেক বেশি। আমার তালিকায় পেদ্রো আলমোদোভার-এর “The Room Next Door”, অন্যায্যভাবে সমালোচিত “Furiosa: A Mad Max Saga”, বাস দেবোসের রোমান্টিক ড্রামা “Here”, খুব কম দেখা “In the Summers”, এবং অবমূল্যায়িত “Kinds of Kindness”-এর জন্য জায়গা হয়নি। তাছাড়া বিতর্কিত ছবি “Megalopolis” নিয়ে বলাই বাহুল্যড়যা আমার মতে ব্যর্থ, কিন্তু হয়তো আপনি ভালোবেসেছেন!

বর্ণানুক্রমিকভাবে এই তালিকা কিছু অসাধারণ সিনেমার প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য। যেগুলো আমরা অস্কার মঞ্চে সম্মানিত হতে দেখব না। হয়তো আমি এমন কিছু সিনেমার নাম বাদ দিয়েছি যেগুলো আপনি পছন্দ করেছেন। সেটাই আমার যুক্তিকে আরও জোরালো করে তোলে। এটা বুঝতে আমাদের অস্কারের দরকার নেই যে অসংখ্য রত্ন তাদের সংকীর্ণ “সেরা” সংজ্ঞার মধ্যে ফিট করে না। ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব এবারের অস্কার দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেড় “Anora”, “Emilia Pérez”, এবং “The Substance” এর মতো সেরা চলচ্চিত্রের মনোনীত সিনেমাগুলো ক্রোয়েসেটে (Cannes Croisette) আত্মপ্রকাশ করেছিল। তবে দুঃখজনকভাবে আরেকটি দুর্দান্ত সিনেমা, যা ফরাসি এই মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে দারুণ প্রশংসা পেয়েছিল। এটি একাডেমির আলোচনার বাইরে থেকে গেছে।

ভারতীয় লেখক-পরিচালক পায়াল কাপাডিয়ার “All We Imagine as Light” সিনেমাটি মুম্বাইয়ের দুই নার্সড়একজন বয়স্ক (কানি কুসরুতি) এবং একজন তরুণ (দিব্যা প্রভা), যারা একই বাড়িতে থাকে এবং জীবন-সংকটে পড়ে, তাদের গল্প বলে। এই সূক্ষ্ম ড্রামাটি সমালোচকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং BAFTA-তে Best Film Not in the English Language বিভাগে মনোনয়ন অর্জন করেছিল। কিন্তু একাডেমির ভোটারদের মধ্যে এটি তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। এর প্রধান কারণ ছিল এটি ভারত বা ফ্রান্স কেউই তাদের অফিসিয়াল Best International Film মনোনয়ন হিসেবে জমা দেয়নি। অস্কারের নিয়ম অনুসারে, প্রতিটি দেশ কেবল একটি ছবি পাঠাতে পারে। যেমন, ফ্রান্স “Emilia Pérez”-কে তাদের সরকারি মনোনয়ন হিসেবে পাঠিয়েছিল।

ফলে “All We Imagine as Light” তার সবচেয়ে সম্ভাব্য অস্কার স্বীকৃতি হারিয়ে ফেলে। আবারও দেখিয়ে দেয় যে, এই বিভাগে মনোনয়ন নির্ধারণের পদ্ধতিতে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে। তবে যারা এই ছবিটি দেখেছেন তারা জানেন এটি কতটা বিশেষ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিসে এক মিলিয়নেরও বেশি আয় করেছে। ২০২৩ সালের লেখক ও অভিনেতাদের ধর্মঘটের কারণে মুক্তির সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় লুকা গুয়াদানিনো গত বছর দুটি সিনেমা মুক্তি দিয়েছিলেন। প্রথমটি “Challengers”, যা মূলত ২০২৩ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু স্টুডিও এটি সরিয়ে নেয়। কারণ ধর্মঘটের কারণে অভিনেতারা ছবিটির প্রচার করতে পারছিলেন না। ফলে এই চরম বিনোদনমূলক প্রেমের ত্রিভুজ-ভিত্তিক টেনিস ড্রামা বসন্তে মুক্তি পায় গুয়াদানিনোর আরেকটি ২০২৪ সালের ছবি, বিষণ্ণ প্রেমের গল্প “Queer”-এর প্রায় ছয় মাস পর।

উইলিয়াম এস. বারোজ-এর উপন্যাসের এই রূপান্তরণটি চমৎকার ছিল তবে “Challengers”-এর বিদ্যুৎত্ময়তা, যৌন আবেদন এবং বুদ্ধিমত্তার ধারে কাছেও ছিল না। বিশেষত দুবারের অস্কার বিজয়ী ট্রেন্ট রেজনর ও অ্যাটিকাস রসের ইলেকট্রনিক সাউন্ডট্র্যাকের অবমূল্যায়নও অবাক করার মতো! শেষ পর্যন্ত, গুয়াদানিনোর দুটি ছবির কোনোটিই অস্কারে মনোনয়ন পায়নি তবে আমি নিশ্চিত “Challengers”-কেই আমরা ভবিষ্যতে বেশি মনে রাখব। গত বছর বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে Golden Bear জয়ী এই ডকুমেন্টারিটি ২০২১ সালে ফরাসি সরকার কর্তৃক ২৬টি আফ্রিকান শিল্পকর্ম বর্তমান বেনিন প্রজাতন্ত্রে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মাতি দিওপ, যিনি ২০১৯ সালে “Atlantics” তৈরি করেছিলেন। ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে চলমান রাজনৈতিক ও বর্ণগত উত্তেজনা নিয়ে আগ্রহী একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং “Dahomey” সেই আগ্রহকে তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরেছে, দেখিয়েছে কীভাবে স্থানীয় জনগণ এই ফিরিয়ে আনা সম্পদগুলোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। আমার ধারণা ন্যায়সঙ্গত পৃথিবীতে ইলিনকা মানোলাচে সেরা অভিনেত্রীর জন্য অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী হতেন। তিনি রোমানিয়ান লেখক ও পরিচালক রাদু জুদে-র এই তীব্র সমালোচনামূলক সিনেমার বিস্ফোরক প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই তালিকায় আরও কিছু উপেক্ষিত সিনেমা রয়েছে, যেমনড় “Evil Does Not Exist”, “Hard Truths”, “His Three Daughterং”, “I Saw the TV Glow”, এবং “Inside the Yellow Cocoon Shell”।

অস্কার হয়তো এই সিনেমাগুলোর গুণমানকে স্বীকৃতি দেয়নি, তবে এগুলো এমন চলচ্চিত্র যা আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যাবে।
আর্টহাউস স্টুডিওগুলোকে ঠিক করতে হয় যে তারা পুরস্কার মৌসুমে কোথায় তাদের সময়, শক্তি এবং (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) অর্থ বিনিয়োগ করবে। গত বছর, A24 ÒThe Brutalist,” “Sing Sing, “Babygirl” এবং অন্যান্য চলচ্চিত্রের প্রচারে জোর দিয়েছিল। যার ফলে কোম্পানির ২০২৪ সালের সেরা চলচ্চিত্রটি যেন অবহেলিত রয়ে যায়। “Janet Planet” ছিল এক অস্থির মায়ের এবং তার উদ্বিগ্ন কন্যার এক কোমল গল্প। যেখানে যথাক্রমে জুলিয়ান নিকোলসন এবং জোয়ে জিগলার অপূর্ব সংবেদনশীলতায় অভিনয় করেছেন। গল্পটি তিনটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে প্রতিটিতে এমন কাউকে দেখা যায় যে মায়ের জীবনে প্রবেশ করে ও তার মেয়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে হুমকির মুখে ফেলে।

লেখক-পরিচালক অ্যানি বেকারের এই অভিষেক চলচ্চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় কীভাবে আমাদের শৈশবের অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের বাবা-মায়েদের সম্পর্কে গভীর কিন্তু রহস্যময় স্মৃতি হয়ে থাকে। অনেকটা A24-এর আরেকটি সিনেমা ২০২২ সালের “Aftersun”-এর মতো, “Janet Planet” কিশোর বয়সের অনুভূতিগুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরে এবং একই সঙ্গে এও দেখায় যে আমরা আমাদের মা-বাবাদের কখনোই সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারি না। নিকোলসন “Janet” চরিত্রে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন। সেখানে তিনি প্রেমের খোঁজে এবং তার প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন সন্তানকে বড় করার চেষ্টায় এক সংগ্রামী মায়ের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন। অন্যান্য উপেক্ষিত সিনেমাগুলোর মতোই এটিও এক অনবদ্য সৃষ্টি হয়ে আবিষ্কারের অপেক্ষায় বসে আছে।