মানবজীবনের বিশাল ক্যানভাসে ধর্মের প্রশ্নটি সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে বোনা এক সুতো। The New Yorker-এ সম্প্রতি প্রকাশিত “Should You Be Religious?” শীর্ষক নিবন্ধে জোশুয়া রথম্যান এই চিরন্তন প্রশ্নটি অন্বেষণ করেছেন। যেখানে তিনি রস ডাউথাটের বই ইবষরবাব: Why Everyone Should Be Religious (বিশ্বাস: কেন সবাই ধর্মপ্রাণ হওয়া উচিত) নিয়ে আলোচনা করেছেন। ডাউথাট একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও ধর্মীয় ভাবনার প্রবক্তা। তিনি আধুনিক সংশয়বাদীদের বোঝাতে চান যে ধর্ম কেবল মানসিক প্রশান্তির জন্য নয়, বরং এটিই পরম সত্য। অনেকেই মনে করেন ধর্মের মূল উপযোগিতা হলো এটি মানুষকে অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করতে সাহায্য করে, তবে এই সত্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু ডাউথাট যুক্তি দেন যে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস কেবল সুবিধাজনকই নয়, বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য।
ধর্মের ইতিহাস এবং আধুনিক ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ক্যারেন আর্মস্ট্রং-এর বইগুলোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। তার বই The Case for God, A History of God, এবং The Battle for God ধর্মের বিবর্তন ও আধুনিক বিশ্বের ধর্মীয় দ্বন্দ্ব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করে। আর্মস্ট্রং দেখিয়েছেন ধর্মের উৎপত্তি একধরনের আধ্যাত্মিক অন্বেষণ থেকে। যেটি কেবল ঈশ্বরের ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নৈতিক ও মানবিক আদর্শের সঙ্গেও জড়িত। তার মতে ধর্ম কেবল বিশ্বাসের একটি কাঠামো নয়, এটি মানুষের চেতনার বিকাশের অংশ। আধুনিক বিশ্বে ধর্মের ভূমিকা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় ধর্মচর্চা কমে এলেও আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ায় ধর্মের ভূমিকা শক্তিশালী থেকে যাচ্ছে। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম ও হিন্দুধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যদিও ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যকার সংঘর্ষও তীব্রতর হচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিস্থিতি একটি বিস্ময়কর পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। দেশটির ইতিহাসে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিশাল প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ধর্মের প্রভাব কমে এসেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একটি অন্যতম ধর্মীয় দেশ তবে বর্তমানে ধর্মীয় বিশ্বাসের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। Pew Research Center এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ২০২৩ সালে প্রায় ৩১% আমেরিকান নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বা নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা এক দশক আগের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মের ভূমিকা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত খ্রিস্টান মৌলবাদী গোষ্ঠীসমূহের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিষয়ে যেমন, গর্ভপাত নিষিদ্ধকরণ, সমকামী বিবাহ নিষিদ্ধকরণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে চরম অবস্থান নিয়েছে।
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের অধিকার বাতিল করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় ও নৈতিক আলোচনা নতুন করে উস্কে দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মের বেড়ে চলা প্রভাবের পাশাপাশি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং একাধিক ধর্মের সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। ক্যারেন আর্মস্ট্রং ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে একধরনের গভীর মানবিক চাহিদার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন। তিনি বলেন ধর্ম শুধু অলৌকিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। এটি মানুষের অস্তিত্বসংকটের উত্তর খোঁজার একটি মাধ্যম।
আধুনিক সমাজে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা কেমন? এটি কি শুধুই ব্যক্তিগত বিশ্বাস নাকি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ?
একটি আকর্ষণীয় বিশ্লেষণে রথম্যান বলেন, কম জন্মহার ও পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোর কারণে কিছু নীতিনির্ধারকরা মনে করেন ধর্মীয় মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ পরিবারকেন্দ্রিক নীতিগুলো প্রায়শই ধর্মীয় শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত এবং কেউ কেউ মনে করেন একটি সুসংগঠিত সমাজের জন্য ধর্ম অপরিহার্য। আর্মস্ট্রং তার Fields of Blood বইয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে ধর্ম ও রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তিনি বলেন প্রায়শই মনে করা হয় যে ধর্ম সংঘাত সৃষ্টি করে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই অধিকাংশ সহিংসতার উৎস নিহিত থাকে।
আজকের বিশ্বে একদিকে বিশ্বজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা বাড়ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর গুরুত্বও বেড়ে চলেছে।উদাহরণস্বরূপ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় রাজনীতি শক্তিশালী হচ্ছে, যেখানে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মানুষ ক্রমশ ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। রথমম্যান ও ডাউথাটের বিতর্কের মূল সুর এটাই, ধর্ম কি কেবল অতীতের ধারা, নাকি এটি আধুনিক বিশ্বেও অপরিহার্য? ক্যারেন আর্মস্ট্রং মনে করেন ধর্মকে নতুনভাবে বোঝা দরকার। এটি যদি কেবল নিয়মকানুনের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এটি তার মূল উদ্দেশ্য হারাবে। ধর্ম যদি মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক থাকবে।
তাহলে আপনাকে কি ধর্মপরায়ণ হওয়া উচিত? এটি একটি গভীর ব্যক্তিগত প্রশ্ন। রস ডাউথাটের মতে উত্তরটি হ্যাঁ হওয়া উচিত। কারণ ধর্ম সত্য এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু রথম্যান এই তত্ত্বকে পুরোপুরি সমর্থন করেন না। তিনি মনে করেন যে বিষয়টি ব্যক্তিগত অনুধাবনের ওপর নির্ভর করে। একজন ব্যক্তি বিশ্বাস ও সংশয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতে পারেন। অথবা যুক্তি ও অনুভূতির সমন্বয় ঘটিয়ে নিজের পথ বেছে নিতে পারেন। ক্যারেন আর্মস্ট্রং-এর মতে ধর্ম যদি আধ্যাত্মিক চর্চা, মানবতা ও সংযোগের মাধ্যম হয় তবে এটি কেবল অতীতের ঐতিহ্য নয়, ভবিষ্যতেরও একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে। ধর্ম গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত কোনো একক যুক্তির ওপর নির্ভর করে না। এটি এক দীর্ঘ ও মোহনীয় যাত্রা।


