Home Blog Page 183

কী হবে , যদি যুক্তরাষ্ট্র সরে যায় আইএমএফ – বিশ্ব ব্যাংক থেকে ?

গত জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের চেয়ারে ফেরার পরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে পড়ার ঘোষণা দেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও দেশকে নেন সরিয়ে। গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইউএসএআইডির কার্যক্রমও দেন বন্ধ করে। এবার কি তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব ব্যাংকের মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেবেন, আলোচনা এখন তা নিয়ে। বিশেষ করে জি-২০ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের অনুপস্থিতি এই গুঞ্জনকেই ভিত্তি দিচ্ছে, সেই সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি করছে অস্বস্তি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রায় শেষ তখন বিজয়ী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিলে যুদ্ধবিক্ষত বিশ্বের অর্থনীতিতে পুনরায় দাঁড় করানোর লক্ষ্যে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছিল এই দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তারপর থেকে যে কোনও দুর্দশাপীড়িত দেশের অর্থ পাওয়ার শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএমএফ। আর্থিক সঙ্কটে জর্জর ইউরোপের দেশ গ্রিস থেকে শুরু করে দেনার ভারে নুইয়ে পড়া লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, এমনকি ১৯৭৬ সালে যুক্তরাজ্যেরও সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল আইএমএফ। জরুরি ভিত্তিতে কোনও দেশের লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় অর্থ ধার দিয়ে থাকে আইএমএফ। তবে এই ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্তও জুড়ে দেয় সংস্থাটি। এর মধ্যে সাধারণত থাকে ঋণ গ্রহীতা দেশে আর্থিক খাত সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, বাজেটে স্বচ্ছতা আনা, দুর্নীতি দূর করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো ইত্যাদি।

বিশ্ব ব্যাংক বিভিন্ন দেশকে অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। তাদের ঋণ সড়ক, রেলপথ তৈরি থেকে শুরু করে বাধ নির্মাণসহ আর্থিক খাত উন্নয়নে দেওয়া হয়ে থাকে।বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ দুটি প্রতিষ্ঠানই সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নানা নীতি পরামর্শ দিয়ে থাকে।বিশ্ব ব্যাংকের তহবিলের উৎস বেশ কয়েকটি। শুরুতে ধনী সদস্য দেশগুলো এতে তহবিল জুগিয়ে আসছিল। এখন বিশ্ব ব্যাংক পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করছে। আইএমএফের তহবিলও আসে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে। কে কত অর্থ দেবে, তার একটি কোটা নির্ধারিত রয়েছে।

বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ উভয়েরই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তহবিলে কে কত অর্থ দিল, সেই দেশ অগ্রাধিকার পায়। কেননা এখানে এক দেশ এক ভোেট প্রথা নেই; কে কত অর্থ তহবিলে রাখল, তার ওপর নির্ধারিত হয় ভোটের হার। বর্তমানে আইএমএফের সদস্য দেশের সংখ্যা ১৯১। বিশ্ব ব্যাংকের সদস্য হতে হলে আগে আইএমএফের সদস্য হতে হয়। বিশ্ব ব্যাংকের সদস্য দেশ এখন ১৮৯টি।যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো বিশ্ব ব্যাংক আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানকে তহবিল জুগিয়ে থাকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে সুস্থির রাখার লক্ষ্যে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি যেন কার্যকর থাকে, সেই জন্য। বড় অঙ্কের অর্থ জুগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিশর, পাকিস্তান, জর্ডানের মতো দেশকে সহায়তা দেয়, যেখানে ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।

জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো কিংবা রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকারকে খড়গহস্ত হওয়ার মতো অজনপ্রিয় পরামর্শ দেওয়ার কারণে উন্নয়নশীল অনেক দেশে প্রায়ই বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় আইএমএফকে। কিউবা, উত্তর কোরিয়া, তাইওয়ানের মতো দেশগুলো আইএমএফের সদস্যই হয়নি। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ দুটোরই সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য যুক্তরাষ্ট্র দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরই একক দেশ হিসাবে সবচেয়ে বড় শেয়ারের মালিক। আইএমএফে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার ১৬ শতাংশ, বিশ্ব ব্যাংকে তার খানিকটা কম। এই দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ওপর ওয়াশিংটনকে ছড়ি ঘোরাতে সহায়তা করে। তুলনামূলক কম খরচ করে যেখানে গোটা বিশ্বের ওপর প্রভাব রাখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেই সুযোগ ছেড়ে দেওয়াকে বিশেষজ্ঞদেরও অবাক করবে।

সেই সঙ্গে তার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতে চীনের প্রভাব আরও বাড়িয়ে তুলবে, যেখানে চীনের হাতে এখন আইএমএফের ৫ শতাংশের মতো শেয়ার রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে দেশটির কোম্পানিগুলোর বিশ্ব ব্যাংকের তহবিল পাওয়া কমে যেতে পারে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো সতর্ক করে আসছে, তেমনটা ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এখনকার ট্রিপল-এ রেটিং ঝুঁকিতে পড়তে পারে, কারণ তাদের ধার দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে।





বন্ধু কেন দূরে চলে যায় ? নীতশে কি বলেন ?

ফ্রিডরিখ নীটশে জার্মানির অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক। তার দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবর্তন ও বিবর্তনের ধারণা। ব্যক্তি কিভাবে নিজেকে গড়ে তোলে, কীভাবে মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয়, এবং সম্পর্ক কিভাবে সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও নীটশে একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বন্ধুদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া কেবল স্বাভাবিকই নয়।এটি আত্মোন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নীটশে তার ১৮৮২ সালের রচনা The Gay Science-এ বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপকে Star Friendship বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে ব্যাখ্যা করেন জীবন এক ধরনের মহাসাগর, যেখানে প্রতিটি মানুষ একেকটি জাহাজের মতো। কিছু সময়ের জন্য এই জাহাজগুলো পাশাপাশি থাকে, একসঙ্গে এগিয়ে চলে, কিন্তু সময়ের সাথে তারা ভিন্ন দিকে চলে যেতে পারে।

নীটশের ভাষায় –
“আমরা একসঙ্গে সমুদ্রে যাত্রা করেছিলাম… আমাদের পথ একই ছিল। কিন্তু তারপর আমাদের পথ আলাদা হতে থাকল, এবং এখন আমাদের একে অপরকে আর দেখতে পাওয়া যায় না। তবে এটি কি আমাদের বন্ধুত্বকে অবমূল্যায়ন করে? করে না।” এই বক্তব্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন সম্পর্কের দূরত্ব হওয়া মানে বন্ধুত্বের অবসান নয়। এটি জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ। অনেক সময় আমরা ভাবি কেউ আমাদের জীবন থেকে দূরে চলে গেলে তবে সেই সম্পর্কটি ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু নীটশে মনে করতেন বন্ধুত্ব একসময় মূল্যবান ছিল বলেই তার গুরুত্ব চিরকাল থাকে। দূরত্ব কোনোভাবে তার মূল্যকে নষ্ট করতে পারে না।

নীটশের দর্শনের একটি মূল দিক হলো ‘আত্মোন্নয়ন’ (Self-overcoming)। তিনি মনে করতেন মানুষকে তার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে নিজের শ্রেষ্ঠ রূপে পরিণত হতে হবে। নীটশে লিখেছিলেন – “যারা আমাদের সঙ্গে পথচলা শুরু করেছিল, তাদের সকলের সঙ্গে আমরা শেষ পর্যন্ত চলতে পারি না।” এখানে তিনি দেখিয়েছেন আত্মোন্নয়নের পথে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দিক গ্রহণ করে। যা হয়তো সম্পর্কের বিভাজন ঘটাতে পারে। কেউ হয়তো জীবনের গভীরতর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত, অন্য কেউ হয়তো সামাজিক বন্ধনে আটকে থাকছে। ফলে সময়ের সাথে কিছু সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই শিথিল হতে পারে।

নীটশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো ‘ক্ষমতার ইচ্ছা’ (Will to Power)। এটি মূলত মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, যা তাকে উন্নতির পথে চালিত করে। নীটশে মনে করতেন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদি দুই ব্যক্তি একে অপরের বৃদ্ধি ও শক্তিকে উৎসাহিত না করে, তাহলে সেই বন্ধুত্ব টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। তার মতে প্রকৃত বন্ধুত্ব হলো যেখানে উভয় পক্ষ একে অপরের উন্নতি চায় এবং একে অপরকে সৃষ্টিশীল ও দার্শনিকভাবে উন্নত হতে সাহায্য করে। যদি কোনো সম্পর্ক কেবল পুরোনো অভ্যাসের কারণে টিকে থাকে, তবে সেটি নীটশের দৃষ্টিতে ইতিবাচক কিছু নয়।

অ্যারিস্টটলের বন্ধুত্ব তত্ত্ব ও নীটশের দৃষ্টিভঙ্গি অ্যারিস্টটল বন্ধুত্বের তিনটি ধরণ উল্লেখ করেছিলেনড় – উপযোগিতার বন্ধুত্ব, যেখানে দুই পক্ষের সম্পর্ক পারস্পরিক সুবিধার জন্য। আনন্দের বন্ধুত্ব, যেখানে সম্পর্ক গড়ে ওঠে সাধারণ বিনোদনের জন্য। গুণের বন্ধুত্ব (Friendship of Virtue), যেখানে সম্পর্ক দুই ব্যক্তির উন্নতির জন্য গঠিত হয়। নীটশে মূলত তৃতীয় ধরনের বন্ধুত্বকেই মূল্যবান মনে করতেন। কিন্তু তিনি এটাও মনে করতেন যে, এমন বন্ধুত্বও চিরস্থায়ী নাও হতে পারে। কারণ একজন ব্যক্তি নিজেকে যদি আরও উচ্চতর অবস্থানে নিয়ে যান, তবে তার বন্ধুরাও যদি একই পথে না এগোন তাহলে তাদের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

সাধারণত বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ মানুষকে কষ্ট দেয়। কিন্তু নীটশে এটিকে দুঃখজনক মনে করতেন না। তিনি বলতেন, “যে সম্পর্কগুলো একসময় আমাদের জীবনের অংশ ছিল তারা আমাদের গঠন করেছে। তারপর তারা চলে গেলেও তো আমাদের মধ্যেই থেকে গেছে।”এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায়, দূরত্ব মানে ভুল বোঝাবুঝি নয় বরং এটি জীবনের অনিবার্য পরিণতি। আমাদের বন্ধুরা আমাদের জীবনের একটি বিশেষ সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সময়ের সাথে যদি আমরা আলাদা হয়ে যাই তবে সেটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

নীটশের দর্শন আমাদের শেখায় বন্ধুত্ব পরিবর্তনশীল সম্পর্ক। সময়ের সাথে আমাদের মূল্যবোধ, চিন্তা ও অভিজ্ঞতা পরিবর্তিত হয় এবং এ কারণেই কিছু বন্ধু আমাদের জীবন থেকে দূরে সরে যায়। তবে এর মানে এই নয় যে সেই বন্ধুত্বের কোনো মূল্য ছিল না। বরং বন্ধুত্ব তার সময়ে মূল্যবান ছিল এবং সেই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীতে আমাদের গঠনে সাহায্য করেছে।





দূষণ রোধে নতুন প্রকৌশল , পাথরে আটকাবে কার্বন

বিজ্ঞানীরা বলছেন পাথরকে অসাধারণ কিছুতে রূপান্তর করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন। এটি উচ্চ- প্রযুক্তির কম খরচের পদার্থ, যা ভূতাত্ত্বিক সময়কে বাঁকাতে পারে এবং গ্রহের উষ্ণায়নকে থামাতে, এমনকি উল্টে দিতেও সাহায্য করতে পারে। দেখতে একেবারেই সাধারণ ধূসর, কিছুটা সবুজ আভাযুক্ত এমন পাথর যা হয়তো আমারা খেয়াল না করেই পার হয়ে যাই। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, সিমেন্ট তৈরির জন্য ব্যবহৃত কিছু প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা সাধারণ খনিজ পদার্থের একটি মিশ্রণ উত্তপ্ত করে এমন একটি উপাদানে পরিণত করার উপায় পেয়েছেন, যা বাতাস থেকে কার্বন শোষণ করে এবং তা গভীর সমুদ্রে জমা রাখতে সক্ষম।

গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ ম্যাট কানান বলেছেন “এটা সেই বস্তু, যার উপর আমরা প্রতিদিন হাঁটি,” গবেষণাপত্রটি বুধবার Nature জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে কীভাবে পাথরকে এই ধরনের উপাদানে রূপান্তরিত করা সম্ভব। আমাদের চারপাশের কঠিন পাথর কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে। যখন বৃষ্টি এমন ভূমিতে আঘাত করে যেখানে নির্দিষ্ট খনিজ পদার্থের মিশ্রণ থাকে তখন বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড পানির সাথে মিশে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন যৌগ তৈরি করে যা এই গ্যাসকে বন্দি রাখতে পারে। যথেষ্ট সময় পেলে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড দূর করতে পারে যেটি মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত হয়।

কিন্তু সমস্যা হলো এই প্রাকৃতিক চক্রটি কয়েক হাজার বছর বা তারও বেশি সময় ধরে চলে। কানানের ধারণা হলো এই প্রক্রিয়াটি যা সাধারণত ভূতাত্ত্বিক সময়সীমায় ঘটে সেটিকে দ্রুততর করা। কাজটি করার জন্য তার গবেষক দল চুনাপাথরের সাথে ম্যাগনেশিয়ামযুক্ত এক ধরনের সিলিকেট খনিজ মিশ্রিত করেছেন। যেমন অলিভাইন, যা বিশ্বজুড়ে পাওয়া যায়। যখন এই মিশ্রণকে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়, তখন চুনাপাথরের ক্যালসিয়াম ও সিলিকেটের ম্যাগনেশিয়াম একে অপরের সাথে অবস্থান বদল করে। অনেকটা নাচের সময় সঙ্গী বদলানোর মতো।

এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে দুটি যৌগ তৈরি হয়, ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইড ও ক্যালসিয়াম সিলিকেট। যা উন্মুক্ত বাতাস ও পানির সংস্পর্শে এসে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কার্বন ডাই অক্সাইড বন্দি করতে পারে। গবেষকরা হিসাব করেছেন এই প্রক্রিয়ার জন্য চুল্লি উত্তপ্ত করতে ও চুনাপাথর পোড়ানোর ফলে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড ধরে রাখার পরও প্রতি টন উপাদান এক টন কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে সরাতে সক্ষম। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাবি লুনস্ট্রম গবেষণাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হয়েও বলেছেন এটি “ভূতাত্ত্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।” তবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যখন অশুদ্ধ পাথরের ব্যবহার করা হবে তখন এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার কেলেমন সন্দেহ প্রকাশ করেছেন প্রস্তাবিত প্রক্রিয়াটি অন্য অনুরূপ প্রক্রিয়ার চেয়ে কম শক্তি ব্যবহার করবে কি না। কারণ এতে উচ্চ তাপমাত্রা ও বিশাল পরিমাণ উপাদান প্রয়োজন হবে। “অন্য সহজ পদ্ধতির মতো, যেমন চুনাপাথর উত্তপ্ত করে চুন তৈরি করা, এই প্রক্রিয়ার অর্ধেকেরও বেশি ব্যয় সম্ভবত উত্তপ্ত করার শক্তির জন্য ব্যয় হবে,” বলেছেন কেলেমন যিনি Heirloom Carbon Technologies নামে একটি কোম্পানি চালু করতে সাহায্য করেছেন যা অনুরূপ প্রযুক্তির উপর কাজ করছে।

কানান তার প্রক্রিয়াটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে চান। যেখানে পোড়ানো খনিজগুলো কৃষকদের জন্য সার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। শেষ পর্যন্ত বন্দি করা কার্বন নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে ধুয়ে যাবে এবং সেখানে জমা হবে। তিনি তার রসায়ন জীবনের শুরু করেছিলেন আণবিক জীববিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে এবং প্রথমদিকে খনিজ বা পাথরের প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তিনি বলেন “আমি দীর্ঘদিন ধরে খনিজ ও পাথরকে নিয়ে ঠিক এভাবেই ভেবেছি,”।


‘বুঝতে আমি-ই পারিনি’ : আসিফ নজরুল

আত্মপ্রকাশ করা তরুণদের নতুন দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। শুক্রবার দুপুরের দিকে আসিফ নজরুল নিজের ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ‘২০২৪এর ভুয়া নির্বাচনের পর খুব মন খারাপ করে থাকতাম। এমন সময় আখতার একদিন আইন বিভাগে এল। বলে কয়ে আমি তাকে বাড়ি থেকে ঢাকায় আনিয়ে মাস্টার্স শেষ করতে রাজি করিয়েছিলাম। কিন্তু এরপরও ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নাই তার মধ্যে।’ ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমার গাড়ি থামিয়ে সে সালাম দিল। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইল। আমি বিরক্ত হলাম। আরও বিরক্ত হলাম যখন সে বলল, নুর-রাশেদদের দল ত্যাগ করে নতুন সংগঠন করবে!

‘আমি বললাম, আবার নতুন দল! আর কতোবার মার খেতে চাও তুমি! সে মাথা নিচু করে মৃদু হাসতে থাকে। এই অদ্ভুত হাসির কোনো মানে খুঁজে পেলাম না। বেশি কথা না বলে বাসায় চলে এলাম। কয়েক দিন পর ছাত্রলীগের হাতে মার খেয়ে তার রক্তাক্ত ছবি দেখে দুঃখ আর হতাশায় বুক বিদীর্ণ হলো। সে কি বুঝতে পারছে না কিছু হবে না আর এসব করে! ‘বুঝতে আমি-ই পারিনি। নতুন সংগঠন করার কয়েক মাসের মাথায় তারা এক অসম্ভবকে সম্ভব করল। প্রবল প্রতাপশালী আর নির্মম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটাল। আখতারের সংগঠনের নাহিদ হয়ে উঠল এই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নেতা। উত্তাল জুলাই-এ আমার এবং আমার মতো লক্ষ মানুষের নেতা!’


‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ও ‘গণপরিষদ নির্বাচন’ কেন : সালাহ উদ্দিন আহমদ

ছাত্র-তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ এবং ‘গণপরিষদ নির্বাচন’ কেন, তা জানতে চেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ। শনিবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সেকেন্ড রিপাবলিক কখন হয়, গণপরিষদ কেন হবে? সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি নতুন বন্ধুদের বলতে চাই, সেকেন্ড রিপাবলিকৃআমাদের বর্তমান রিপাবলিক কি অসুস্থ হয়ে গেছে? সেকেন্ড রিপাবলিক কখন হয়? রিপাবলিক হচ্ছে, যেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তাঁদের একটা নমিন্যাল অথবা ইলেকটেড হেড দ্য স্টেট থাকবে। সেটা কি আমাদের নেই? গণপরিষদ কেন হবে? এর মধ্যে তো আরও একটি উদ্দেশ্য আছে।’

তিনি বলেন, ‘যারা গণপরিষদের বিষয় সামনে আনছে, যারা সেকেন্ড রিপাবলিকের বিষয় সামনে আনছে, হয় তারা বোঝে না অথবা বুঝেও আমাদের এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরও দীর্ঘায়িত অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মধ্যে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র আছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, যে সময়ে দেশে কোনো সংবিধান রচিত থাকে না, মানে একটা নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, তখন গণপরিষদের প্রয়োজন হয়। গণপরিষদের সদস্যরা সংবিধান প্রণয়ন করেন, যে সংবিধানের ভিত্তিতে পরে সংসদ নির্বাচন হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে গণপরিষদ নির্বাচনের জন্য আমরা কী নতুনভাবে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি? রাষ্ট্র তো স্বাধীন আছে। আমরা একটি স্বাধীন – সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।’

তিনি বলেন, ‘যাঁরা সেকেন্ড রিপাবলিকের ঘোষণাপত্র তাঁদের দলীয় ঘোষণাপত্রে রেখেছেন, সেটা ওখানে থাক। যারা গণপরিষদের মধ্য দিয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে চান, সেটা আপনারা যখন পারবেন করবেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণে আর যাতে কোনো বিলম্ব না হয়, সে জন্য আমরা যাতে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখিড়এটাই আমাদের আহ্বান।’ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, যারা জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা বলছে, তাদের একটি মতলব আছে।’ সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা আপনাকে অতি শিগগির জাতীয় সংসদের নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রদান করতে হবে। যদি আপনি কোনো বাহানায় এই মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রদান না করেন, তাহলে সেটা আমরা রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো বসে নির্ধারণ করব আমরা কোন প্রক্রিয়ায় এগোব।’


মানুষ কেন পাশে শুয়ে থাকা বধুটি আর শিশুটিকে ফেলে এক গাছি দড়ি হাতে জীবনের ইতি টানতে যায় ! মার্ক্স অন সুইসাইড

আত্মহত্যা একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, যা মনস্তাত্ত্বিক নৈতিক এবং সামাজিক কারণে ঘটতে পারে। তবে এটি শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ বা বিপর্যয়ের ফলস্বরূপ নয় বরং সমাজের কাঠামোগত সমস্যা এবং অর্থনৈতিক শোষণের ফলও হতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কার্ল মার্কসের “পুখে অন সুইসাইড” প্রবন্ধটি সমাজতাত্ত্বিকভাবে আত্মহত্যার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে। মার্কস মূলত পুঁজিবাদী সমাজের সমালোচক হয়ে আত্মহত্যাকে কেবলমাত্র এক ব্যক্তির দুর্দশার ফল হিসেবে না দেখে এটিকে পুঁজিবাদী সমাজের শ্রেণীভেদ, শোষণ এবং বৈষম্যের কারণে তৈরি হওয়া একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।

জ্যাক পুখে ছিলেন ফরাসি পুলিশের একজন প্রশাসক। তিনি তার পুলিশ জীবনের আত্মহত্যা কেস থেকে তুলে আনা লেখায় আত্মহত্যাকে মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক এবং নৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আত্মহত্যার কারণে হিসেবে নানা ধরনের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সমস্যাকে দেখেছেন, যেমন- দুঃখ, অবসাদ, অপমান, আর্থিক সমস্যা বা জৈবিক সম্পর্কের অস্থিরতা। পুখের লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সংগ্রহ এবং তা বিশ্লেষণ করা। তাঁর মতে মানুষ যখন আত্মহত্যা করে তখন তার মূল কারণ অন্তর্নিহিত মেন্টাল সিচুয়েশন, যেটি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। তিনি আত্মহত্যাকে ব্যক্তি বিশেষের নৈতিক এবং মানসিক ব্যর্থতা হিসেবেই দেখেন। কিন্তু আত্মহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের বা রাষ্ট্রের কোনো দায়ভার অনুভব করেননি। তাঁর লেখায় আত্মহত্যাকে মূলত একটি পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে সামাজিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভাবিত হলেও তাদের গভীর বিশ্লেষণ বা সমালোচনা তেমন দেখা যায়নি।

কিন্তু মার্কস “পুখে অন সুইসাইড”- এ পুখের বিশ্লেষণকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত দুঃখ বা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে না দেখিয়ে এটি সমাজের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকরা শোষিত এবং বিচ্ছিন্ন। এই শোষণ এবং বিচ্ছিন্নতা মানুষকে এক গভীর অর্থহীনতার অনুভূতি দেয়। যা অনেক সময় ভিক্টিমদের আত্মহত্যার মতো চরম পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যেতে পারে। নগর জীবনে সকাল বিকাল বাসা ভাড়া আর দুইবেলা খেয়ে বাঁচার জন্য প্রতিদিন অফিস বাড়ি দৌড়াদৌড়ি করা -মানুষটা এক রাতে জীবনের প্রবল অন্তসারশূন্যতা অনুভব করে জীবনানন্দের “আট বছর আগের একদিন” কবিতার মতো পাশে শুয়ে থাকা বধূটি আর শিশুটিকে ফেলে এক গাছি দড়ি হাতে অশ্বত্থের গাছে ঝুলে পড়তে যায়।

তাই মাক্স মূলত আত্মহত্যাকে পুঁজিবাদী সমাজের একটি ফলস্বরূপই দেখেন, যেখানে শ্রমিকরা নিজের শ্রমের ফল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং এত স্ট্রাগলের পরও সমাজে তাদের কোনো স্থান বা মূল্য থাকে না। এই সমাজে মানুষের পরিচয় নির্ধারণ হয় শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে। ফলে শ্রমিকদের মানবিকতা এবং মর্যাদা লুপ্ত হয়ে যায় এবং তারা শুধুমাত্র এক ধরনের যন্ত্রে পরিণত হয়। এ বিচ্ছিন্নতা এবং হতাশা মানুষের মধ্যে এক ধরনের অক্ষমতা সৃষ্টি করে, যা আত্মহত্যার মতো বিপর্যয়ের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘকাল ধরে পুঁজিবাদের ভিক্টিম হতে থাকা কিছু কিছু মানুষও ধীরে ধীরে নিজেরাই একেকজন ফ্যাসিস্ট হয়ে চারপাশের মানুষের মধ্যে নিজেকে জাহির করতে গিয়ে অন্য ভোক্তভুগীদের সুইসাইডের দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য করে।

মার্কসের দৃষ্টিকোণ অনুসারে পুঁজিবাদী অর্থনীতি মানুষকে শুধুমাত্র উপকরণগত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে এবং এতে মানুষের সামাজিক ও মানবিক সম্পর্কগুলো বিপর্যন্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো দুঃখজনকভাবে ভেঙে পড়ে এবং আত্মহত্যার প্রেরণা বৃদ্ধি পায়। শ্রমিক জীবনের শোষণ, কর্মের প্রতি উদাসীনতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ও চারপাশের নিচু ভঙ্গি তাকে এক অন্ধকার যাত্রায় নিয়ে যায় যেখানে আত্মহত্যাই একমাত্র উপায় মনে হতে পারে। মার্কসের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নিউ মডার্ন সোসাইটিতেও প্রাসঙ্গিক, যেখানে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতি মানুষের মধ্যে হতাশা, অবসাদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি করছে। মার্কসের বিশ্লেষণ আমাদের শেখায় আত্মহত্যার সমস্যা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অবস্থা নয়। এটি সমাজের একটি বৃহত্তর সংকট, যা সমাজের কাঠামো, অর্থনীতি এবং শ্রেণী সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত।

সমাজের পারস্পরিক শোষণভঙ্গি, শ্রেণীভেদ এবং অর্থনৈতিক শোষণ দূর না হলে আত্মহত্যার সমস্যা কখনই সমাধান হবে না। “পুখে অন সুইসাইড” প্রবন্ধে মার্কস পুখের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে মূল্যায়ন করেছেন। এই দৃষ্টিকোণটি আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয় আত্মহত্যার মূল কারণ শুধুমাত্র ব্যক্তির মানসিক অবস্থা নয়, একটি বৃহত্তর সমাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, যার সমাধান ফ্যাসিস্ট কাঠামোর সংস্কারেই নিহিত।




‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ নতুন দলের স্লোগান ? কীভাবে এল ?

নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের প্রায় সব শীর্ষ নেতা বক্তব্যের ইতি টেনেছেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি দিয়ে। তবে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ওই স্লোগান দেননি। কৌতূহল তৈরি হয়েছে যে, স্লোগানটি কি জাতীয় নাগরিক পার্টি দলীয় স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করেছে।জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি জাতীয় নাগরিক পার্টির দলীয় স্লোগান নয়। যেহেতু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি বেশ আলোচিত ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এখনো আমরা এই স্লোগানটি বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যবহার করছি।’

আমাদের দলীয় স্লোগান ও মূলনীতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আপাতত আত্মপ্রকাশ, কমিটি প্রকাশ আর ঘোষণাপত্র হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো সামনে চূড়ান্ত করা হবে’, বলেন তিনি।প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব ২০২২ সালের ২৯ মে ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ১৯২১ সালে মাওলানা হাসরাত মোহানি (১৮৭৫-১৯৫১) প্রথম স্লোগানটি ব্যবহার করেন। এরপরে এ স্লোগান ঠাঁই করে নেয় উপনিবেশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী ও মার্ক্সবাদী নেতা ভগত সিংয়ের কণ্ঠেও।

উর্দু ভাষার কবি হাসরাত মোহানি ছিলেন শ্রমিকনেতা, ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দিয়েছিলেন তিনি। হাসরাত মোহানি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির এক নেতার সঙ্গে প্রথম ভারতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ বা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেছিলেন।লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ বা বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক স্লোগানটি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি এখনো দেয়। এ স্লোগানটা তাঁরা (ছাত্ররা) দিচ্ছে, সেটা কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দিচ্ছে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। তাঁরা ইতিমধ্যে ক্লিয়ারলি (পরিষ্কারভাবে) বলে দিয়েছে তারা মধ্যপন্থী দল।’তিনি বলেন, ‘তাঁদের (অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র) মতে ৫ আগস্ট যদি একটি বিপ্লব হয়, সে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোকড়সেই সেন্সে (অর্থে) এ স্লোগান ঠিক আছে।’

মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে অপরাধে

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক কালে যেসব অপরাধ হয়েছে, এর বেশির ভাগ সংঘটনের সময়ে অপরাধীদের মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে দেখা গেছে। কিশোর গ্যাং এবং ছোট-বড় অনেক অপরাধীর অপরাধ কার্যক্রমের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে দুই চাকার বাহনটি।শুধু বিভিন্ন অপরাধ সংঘটন নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ক্ষেত্রেও শীর্ষে রয়েছে বাহনটি। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৭৬১টি। এতে নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬০৯ জন এবং আহত ১ হাজার ৮৩২ জন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৯৬৩ জন ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী।

মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ঢাকা মহানগর কিংবা সারা দেশে কী পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, পুলিশের কাছ থেকে সে রকম কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সংস্থাটির সদস্যরা বলছেন, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ব্যবহারের ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। এর কারণ হলো অপরাধ করার পর দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতেই অপরাধীরা এ ধরনের বাহন ব্যবহার করে।যানজটপূর্ণ সড়ক বা সংকীর্ণ গলি দিয়ে এঁকেবেঁকে দ্রুত পালানোর সুযোগ থাকে বলেই অপরাধ সংঘটনের সময়ে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরাও। এছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও এখানে ভূমিকা রয়েছে বলে অভিমত তাদের।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিতেই তো মোটরসাইকেলে মাস্তানির বিশাল একটা ভূমিকা আছে। নেতা যখন শোডাউন করতে চায়, তখন মোটরসাইকেল দিয়েই করে। সে হিসেবে কোনো কোনো তরুণ মনে করতে পারে, আমি যদি পেশিশক্তিবান হতে চাই, আমার মোটরসাইকেল দরকার। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে এভাবে পেশিশক্তি প্রদর্শন থেকেই একটা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে কিশোর-তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে অপরাধ করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। যদিও অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, পেশাদার অপরাধীরা সাধারণত অপরাধ সংঘটনের সময় নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, যেন তাদের সহজে শনাক্ত করা না যায়। ঢাকা মহানগর এলাকায় এখন প্রায় ১২ লাখ নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে। সারা দেশে সংখ্যাটি প্রায় ৪৬ লাখ।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপরাধীদের মধ্যে অপরাধ সংঘটনের পর মোটরসাইকেল ব্যবহার করে পালিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে। তবে অপরাধ মানেই যে সেটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করে হচ্ছে, বিষয়টি এমন না। অপরাধ সংঘটন বা পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অপরাধীরা আরো বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে। ঢাকায় তো কয়েক লাখ বাইকার রয়েছেন, সবাই তো আর অপরাধী নন। সামগ্রিকভাবে আমি বলব, অপরাধের সঙ্গে আসলে মোটরসাইকেলের তেমন একটা সম্পর্ক নেই।’

চীনা তরুণদের মেন্টাল হেলথ কেয়ারের নতুন সলিউশন

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মেন্টাল হেলথের চাহিদা ও সংকট বেড়েই চলেছে। মডার্ন লাইফের চাপ, প্রতিযোগিতামূলক একাডেমিক পরিবেশ, কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, প্রায় সকলকেই নিত্য নতুন মানসিক সমস্যায় ফেলছে। চীনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে এখনো সামাজিক নানা ধরণের দুঃখজনক বুলি’র ধারণা প্রচলিত, যা অনেককেই প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে বাধাগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে Al থেরাপি তরুণদের জন্য একটি নতুন ও কার্যকর সলিউশন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই Al থেরাপি মূলত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা প্রযুক্তি, যেটি ব্যবহারকারীদের সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের সমস্যা নির্ধারণ ও উপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারে। এটি সাধারণত চ্যাটবট বা ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।

চীনে Heartland নামক বিশেষ Al মানসিক স্বাস্থ্য রোবট তৈরি হয়েছে, যেটি বিশেষত শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে সাহায্য করছে।এটি উষ্ণ ও বন্ধুসুলভকথোপকথনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং ধাপে ধাপে মানসিক সমাধান প্রদান করে।Heartland-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে এবং রোবটটি তাদের আবেগগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে মানসিক প্রশিক্ষণের জন্য উপযুক্ত গাইডলাইন দেয়।

অন্যদিকে ‘DeepSeek’ Al প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তাও সেখানে এখন তুঙ্গে। প্ল্যাটফর্মটি ২৪/৭মানসিক সেবা প্রদান করে ও ব্যবহারকারীদের একান্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে নানা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান বাতলে দিতে পারে। DeepSeek-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি দ্রুত ব্যবহারকারীর কথোপকথন বিশ্লেষণ করে তাদের মানসিক অবস্থা নির্ণয় করে এবং উপযুক্ত পরামর্শও প্রদান করে। এটি অনেকের জন্য সহজলভ্য ও স্বস্তিদায়ক মূলত একটি ভার্চুয়াল কাউন্সেলিং সেবা হিসেবে কাজ করছে। কেন তরুণরা Al নির্ভর থেরাপির প্রতি আকৃষ্ট? চীনের তরুণরা Al নির্ভর থেরাপির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কয়েকটি কারণ হলো সুলভতা ও সহজলভ্যতা। পেশাদার মনোবিজ্ঞানীদের কাছে পরামর্শ নেওয়া ব্যয়বহুল হতে পারে। কিন্তু Al থেরাপি তুলনামূলকভাবে কম খরচে এবং সহজেই পাওয়া যায়।

অনেকেই তাদের মানসিক সমস্যার বিষয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। Al নির্ভর থেরাপি এই ক্ষেত্রে সবরকম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে। তাছাড়া ২৪/৭ অ্যাক্সেস পাওয়া Al থেরাপি যে কোনো সময় ও স্থানে ব্যবহার করা যায়। যেটি বিশেষত ব্যস্ত শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের জন্য উপকারী। যদিও Al নির্ভর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তরুণদের জন্য একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আমরা ধারণা করতেই পারি যে Al চ্যাটবট বা ভার্চুয়াল কাউন্সেলর সাময়িকভাবে মানসিক স্বস্তি প্রদান করতে পারলেও এটি কোনোভাবেই স্থায়ী সমাধান নয়।

একজন মনোবিজ্ঞানীর সংবেদনশীলতা ও সহানুভূতির সাথে Al প্রযুক্তির ফারাক আছেই। Al নির্ভর থেরাপি ব্যবহারকারীদের আবেগগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হলেও এটি গভীর মানসিক সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম না। ফলে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পেশাদার পরামর্শদাতার সহায়তা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। Heartland ও DeepSeek-এর মতো প্ল্যাটফর্ম তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এই প্রযুক্তির যে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।তবে এটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে উন্নত Al প্রযুক্তি ও মানবিক সংবেদনশীলতার সমন্বয়ে মেন্টাল হেলথ কেয়ারের আরও কার্যকর পদ্ধতি তৈরি হতে পারে।




সরকারি তালিকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নদীরা

বাংলাদেশে প্রবহমান নদ-নদীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক চলছেই। সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ১ হাজার ১৫৬টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। আগামী ১৪ এপ্রিল চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে। তবে এ তালিকা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যেই আপত্তি তুলেছেন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকা থেকে বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের তালিকাভুক্ত ২০০টি নদী বাদ পড়েছে। আবার নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ১৪৮টি নদীর নাম। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১৮টি নদীর নামও বাদ গেছে।

বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করছেন নদীর তালিকা নির্ধারণে গ্রহণযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরিবর্তে শুধুমাত্র কাগজ-কলমের কাজের (টেবিল ওয়ার্ক) উপর নির্ভর করা হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তালিকার মধ্যেও অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ১ হাজার ৮টি নদীর তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেসময় এটি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এমনকি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ও সেই তালিকাকে আমলে নেয়নি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন করে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়।

নদী ও প্রকৃতি গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর মতে জেলা প্রশাসন নদী নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল করছে। কিছু ছোট নদী যেগুলো খালের চেয়ে বড় এবং স্থানীয়ভাবে ‘খাড়ি’ নামে পরিচিত, সেগুলো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। অন্যদিকে কিছু নদী যেগুলো বছরের বেশির ভাগ সময় শুকিয়ে থাকে সেগুলোও তালিকায় রাখা হচ্ছে না। ফলে প্রকৃত নদীর সংখ্যা নির্ধারণ সম্ভব হচ্ছে না। মাহবুব সিদ্দিকী ৩০ বছর ধরে সরজমিনে গবেষণা করে ১ হাজার ৯০৮টি নদী চিহ্নিত করেছেন। তার মতে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার নদীগুলো সঠিকভাবে জরিপ করা হলে এই সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ২০১১ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘বাংলাদেশের নদ-নদী’ শীর্ষক ছয় খণ্ডের একটি বই প্রকাশ করেছিল যেখানে ৪০৫টি নদীর বর্ণনা ছিল। কিন্তু বর্তমান তালিকা থেকে সেই ৪০৫টির মধ্যেও ১৮টি নদীর নাম বাদ পড়েছে।

গাজীপুরের নদী নির্ধারণ কমিটির সদস্য মো. মনির হোসেন স্বীকার করেছেন নদীর সংখ্যা নির্ধারণে টেবিল ওয়ার্কের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাগজ-কলম নিয়ে বসে ঠিক করে ফেলেন কোন নদীর নাম থাকবে কোনটি বাদ যাবে। মনির হোসেন বলেন, ‘নদীর সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে হবে, প্রবীণদের মতামত নিতে হবে এবং নদীর উৎস ও পতিত মুখ সরজমিনে দেখতে হবে। তা না হলে আগের মতোই তালিকা বিতর্কিত হয়ে যাবে।’

রংপুর বিভাগের নদীর তালিকা প্রণয়নে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের সমন্বয় করা হয়েছে। এখানে জেলা পর্যায়ের প্রকৌশলীরা সরাসরি নদী পরিদর্শন করেছেন। রংপুর বিভাগীয় নদী রক্ষা কমিটির সভায় আট জেলার নদীর সংখ্যা চূড়ান্ত করা হয়। তালিকা অনুযায়ী রংপুরে ৪০টি, নীলফামারীতে ৩৭টি, লালমনিরহাটে ১৮টি, কুড়িগ্রামে ৩৫টি, গাইবান্ধায় ২৪টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৯টি, দিনাজপুরে ৩৪টি ও পঞ্চগড়ে ৫০টি নদীর নাম রয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমুল আহসান বলেছেন, ‘আমরা বিভাগীয় কমিশনারদের ২৮ তারিখের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা দিতে বলেছি। এরপর ওয়েবসাইটে তালিকা প্রকাশ করে জনসাধারণের মতামত নেওয়া হবে। ভুল-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ থাকবে।’

নদ-নদীর সংখ্যা নির্ধারণে বাংলাদেশ এখনও একটি সুনির্দিষ্ট, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পদ্ধতির অভাবে ভুগছে। কেবলমাত্র টেবিল ওয়ার্কের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করলে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে। এজন্য সরজমিনে পরিদর্শন এবং অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় যদি এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয় তবে চূড়ান্ত তালিকাও আগের মতোই বিতর্কিত হয়ে থাকবে।