Home Blog Page 154

ইউক্রেনে যুদ্ধ ও অস্ত্রবিরতির নেপথ্যে কী : মোজাম্মেল হক , মার্কিন প্রবাসী লেখক

” … ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন জনগণের ট্যাক্সের অর্থ আটলান্টিকের ওপারে ভিন্ন এক মহাদেশের ভিন দেশের যুদ্ধে গোলাগুলির পেছনে উড়িয়ে দিতে রাজি নন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সর্বাগ্রে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’।…তিনি এমন নীতি অনুসরণ করতে রাজী নন, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। কাজেই মি. ট্রাম্প প্রথমবার ফোনালাপেই পুতিনকে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু পুতিন সহজ মানুষ নন। তার কথা হচ্ছে শান্তি স্থাপনে তিনি আগ্রহী, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা তিক্ত। ফ্রান্স এবং জার্মানীর দৌত্যে মিনস্ক ১ এবং মিনস্ক ২ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তাঁর পূর্ণ সম্মতি ও সহযোগিতা ছিল।

ইউক্রেন কথা দিয়েছিল, রুশ জাতিসত্বা অধ্যুষিত ডোনেটস্ক পিপলস রিপাব্লিক এবং লুহানস্ক পিপলস রিপাব্লিক ইউক্রেনের কাঠামোর ভেতরে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করবে। জাতিগত রুশ জনগণ বৈষম্যের শিকার হবে না। নব্য নাজীদের রাশিয়া বিরোধী তৎপরতা নিষিদ্ধ হবে। ইউক্রেন যথার্থ নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করবে, কোন সামরিক জোটে অন্তর্ভুক্ত হবে না। বাস্তবে দেখা গেল সবই উল্টো। ইউক্রেনের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট পেট্রো পোরশেঙ্কো পরে স্বীকার করেছেন ডোনেটস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চল পুনর্দখলের প্রস্তুতি এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য সময় দরকার ছিল। চুক্তি করেছিলেন হাতে কিছুটা সময় পাওয়ার জন্য। মধ্যস্থতাকারী ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওলান্দে এবং জার্মানীর চ্যান্সেলর মার্কেলও তা জানতেন।

পুতিনের মতে, পশ্চিমা শক্তি ইউক্রেনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। রাশিয়ার সীমান্তে ন্যাটো জোটের প্রত্যক্ষ সামরিক উপস্থিতির সাথে রাশিয়ার অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। ন্যাটো জোট রাশিয়ার ঘাড়ের উপর শ্বাস ফেলবে পুতিন তা মানতে পারেন না।…ইতিহাস হচ্ছে, নেপোলিয়ান এবং হিটলার ইউক্রেনে নিজ অবস্থান সংহত করে রাশিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, পুতিন অন্তর্নিহিত মূলগত সমস্যার সমাধান চান।

… সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক পদক্ষেপ হচ্ছে ন্যাটো জোটের পূর্বমুখী সম্প্রসারণের অবসান, ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা ও অসামরিকীকরণ (demilitarization)। তিনি কোন অজুহাতে ইউক্রেনে ন্যাটোভুক্ত দেশের সেনা উপস্থিতি মানবেন না।… ইউক্রেনের সামরিক সামর্থ্য প্রতিরক্ষার সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। ২০২২ সালে লুহানস্ক, ডোনেটস্ক, খারসন এবং ঝাপরিঝিয়ার জনগণ ইউক্রেন ত্যাগ করে রেফারেন্ডামের মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছায় রাশিয়ার সাথে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাংবিধানিকভাবে এখন তা রাশিয়ার অংশ।

মি. ট্রাম্পের বুঝতে অসুবিধে হয়নি, ইউক্রেনকে ‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ দেয়ার অন্য অর্থ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। পুতিনের বিবেচনা তাই।কিন্তু যে জেলেনস্কি এবং তার ইউরোপীয় পৃষ্ঠপোষকেরা যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবে গড়িমসি করছিলেন, তারাই এখন উঠে পড়ে লেগেছেন ট্রাম্পের অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব কত দ্রুত কার্যকর করা যায়। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন এখন চালকের আসনে। … সামরিক পোষাক গায়ে পুতিন প্রথমবারের মত কুরস্ক ঘুরে এসেছেন। যুদ্ধের গতিবেগ বজায় রেখে ত্বরিত অগ্রসর হবেন, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কে ফেরৎ যাবেন, এ নিয়ে উভয় সংকট। ট্রাম্পের প্রস্তাবে রাজি হলে রাশিয়ার উপর পশ্চিমা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার অবসান হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ব্যাংকে গচ্ছিত ৬০০ বিলিয়ন রিজার্ভের অর্থ ফেরত পেতে তা সাহায্য করবে।

… পুতিন ইউক্রেন প্রশ্নে পশ্চিম ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য সম্পর্কে সজাগ। ইউরোপের ইচ্ছা যুদ্ধ অব্যহত থাকুক, যেন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া রক্তক্ষরণ হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া একক সামর্থ্যে যুদ্ধ চালু রাখার ক্ষমতা ইউরোপের নেই। ইউরোপ সুযোগ খুজছে, কি করে ট্রাম্পকে পুতিনের বিরুদ্ধে লাগিয়ে রাখা যায়। ট্রাম্প চান যুদ্ধের অবসান। তিনি মনে করেন ইউক্রেন যুদ্ধ লোকসানী কারবার, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োেগ বিশাল, মুনাফা স্বল্প, ফায়দা প্রধানত ইউরোপের। কিন্তু তাদের বিনিয়োগ নামমাত্র ।

রাশিয়া নয়, ট্রাম্প মনে করেন চীন হচ্ছে প্রধান প্রতিযোগী। চীন উঠছে, উর্ধগতি অব্যাহত থাকলে সে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে প্রধান বিশ্বশক্তি রূপে আবির্ভূত হবে। রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের মত বৈশ্বিক মতাদর্শগত চ্যালেঞ্জ নয়, ভাংগনের পর পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার অর্থনৈতিক পশ্চাদভূমি হারিয়ে সে বিপাকে। পুতিন তাকে নিজের পায়ের উপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। তাকে চীনের দিকে ঠেলে দেওয়া নির্বোধের কাজ। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক হচ্ছে বাধ্যতামূলক বৈবাহিক সম্পর্ক, তাঁর পূর্বসুরীর ভুল সিদ্ধান্তের ফল।’ তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই না রাশিয়া ও চীন একত্রিত হোক।’ ‘চীনকে একপাশে সরিয়ে রাখা উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু তা হতেও পারে।’ ‘রাশিয়ার লোক সংখ্যা স্বল্প, বিশ্বের বৃহত্তম দেশ। চীন হচ্ছে আয়তনে ক্ষুদ্র, জনসংখ্যা বিপুল।তাদের স্বাভাবিক অবস্থান ও প্রবণতা পারস্পরিক বৈরিতার।’

পুতিন জানেন, ট্রাম্পের সাথে বিরোধে না জড়িয়ে সুসম্পর্ক তৈরি করতে পারলে রাশিয়া ঝামেলামুক্ত হবে। পশ্চিমা মিত্র শিবিরে ফাটল বড় হবে। যে ন্যাটো জোট তার মাথাব্যথার কারণ তাতে ভাঙ্গন ধরাও সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রবিহীন সামরিক জোট নখদন্তহীন বুড়ো বাঘ, যার শিকার ধরার ক্ষমতা নেই। পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতা ও সুসম্পর্ক সৃষ্টির পথে ইউরোপীয়দের কাঁটা বিছানোর সুযোগ করে দিতে চান না। তিনি ট্রাম্পের সাথে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বলেছেন, ইউক্রেনের তুলনায় খনিজ সম্পদে রাশিয়া অনেক বেশি সমৃদ্ধ। এ সবের উত্তোলনে মার্কিন কর্পোরেটগুলিকে তিনি সুযোগ দেবেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তা লুফে নিয়েছেন। ট্রাম্প তার পররাষ্ট্র নীতিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন সেসব খনিজ সম্পদের উৎসের নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করার উপর, যা সর্বশেষ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে নির্ধারক ভূমিকা নেবে। অন্তহীন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জেরবার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে উদ্ধার ও সুদিন ফিরিয়ে আনতে চান। কিন্তু পুতিনের জন্য মুস্কিল হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প একেক সময় একেক কথা বলেন। তার লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে নিজের জন্য যথাসম্ভব ফায়দা তোলা। বর্তমানে ট্রাম্প এমন ভূমিকায় আছেন, তিনি খেলোয়াড় এবং রেফারি শুধু নয়, খেলার নিয়মও বেঁধে দিতে চান। পুতিন নিজেও কম যান না। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত খেলা কোথায় গড়ায়।








ইরানের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কাছে একটি নতুন পরমাণু চুক্তির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ এড়ানোর প্রচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।রবিবার (২৩ মার্চ) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি। উইটকফ বলেন, আমাদের সবকিছু সামরিকভাবে সমাধান করতে হবে না। আমাদের বার্তা ইরানের প্রতি স্পষ্ট-‘আসুন আলোচনায় বসি এবং কূটনৈতিকভাবে সমাধান খুঁজে বের করি’। যদি তা সম্ভব হয়, আমরা প্রস্তুত। আর যদি না হয়, তাহলে এর বিকল্প খুব একটা ভালো কিছু হবে না।

২০১৮ সালে একতরফাভাবে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প এবং ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এই চুক্তিটি ২০১৫ সালে বিশ্ব শক্তিগুলোর সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যাতে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল এবং বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। তবে ট্রাম্পের সরে যাওয়ার পর, ইরান দ্রুত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৬০ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা ৯০ শতাংশ মাত্রার এক ধাপ নিচে এবং যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ইরান পর্যাপ্ত বিভাজনযোগ্য উপাদান সংগ্রহ করেছে যাতে একাধিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। তবে এখন পর্যন্ত তারা কোনও বোমা তৈরির প্রচেষ্টা চালায়নি।

চলতি বছরে হোয়াইট হাউজে ফিরে আসার পর থেকেই ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে আবারও ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছেন। বুধবার হোয়াইট হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তারা আবারও জানিয়েছেন, ইরানকে অবশ্যই তার পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হবে। এমনকি নিম্ন স্তরের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণও বন্ধ করতে হবে। এদিকে, একজন মার্কিন কর্মকর্তা ও দুটি সূত্রের বরাতে মার্কিন এক্সিওস পোর্টাল জানিয়েছে–ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছে লেখা চিঠিতে পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিঠিটি পাঠানোর সময় থেকে বা আলোচনা শুরু হওয়ার সময় থেকে দুই মাসের আল্টিমেটাম শুরু কি না, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু তেহরান যদি ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং সমঝোতা না করে, তাহলে ইরানের পরমাণু স্থাপনার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এরপর জাতিসংঘে ইরানি মিশন এক্স-পোস্টে একটি বিবৃতিতে বলা হয়–আলোচনার উদ্দেশ্য যদি হয় ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সম্ভাব্য সামরিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ নিরসন করা, তাহলে এ ধরনের আলোচনা বিবেচনসাপেক্ষ হতে পারে।

জাতিসংঘে ইরানি মিশন বলেছে, আলোচনার উদ্দেশ্য যদি হয় ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করে দিয়ে দাবি করা যে, বারাক ওবামা যা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন তা এখন সম্পন্ন হয়েছে, তাহলে এ ধরনের আলোচনা কখনোই হবে না। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ রোববার বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্রায়ন ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সব উপাদান ত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় তারা বিভিন্ন পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে।



স্পিনোজার দর্শনে নিয়তিবাদ , ঈশ্বর এবং প্রকৃতির সম্পর্ক

স্পিনোজা (১৬৩২-১৬৭৭) ছিলেন একজন ডাচ দার্শনিক যিনি আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো দার্শনিক নিয়তিবাদ বা ডিটারমিনিজম, যার ভিত্তিতে তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন বিশ্বে যা কিছু ঘটে তা কোনো না কোনো কারণের ফল। অর্থাৎ কোনো ঘটনাই আকস্মিক বা দৈবক্রমে সংঘটিত হয় না বরং প্রতিটি ঘটনা কোনো বিশেষ নিয়ম ও যুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হয়। তাঁর এই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ঈশ্বর, প্রকৃতি এবং মানব স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। স্পিনোজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক কাজ হলো Ethics, যেখানে তিনি এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। ঐতিহ্যগত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী ঈশ্বরকে তিনি কল্পিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেন না। তিনি বলেন, ঈশ্বর এবং প্রকৃতি এক এবং অভিন্ন।

তার মতে, ঈশ্বর হলেন অনন্ত এবং সর্বব্যাপী তিনি সত্তার মৌলিক রূপ। প্রকৃতি বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হল ঈশ্বরের প্রকাশ। প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনা অনিবার্যভাবে একটি পূর্বনির্ধারিত কারণ দ্বারা ঘটে। স্পিনোজার এই দৃষ্টিভঙ্গি প্যানথেইজম নামে পরিচিত, যেখানে প্রকৃতি ও ঈশ্বর অভিন্ন। তিনি যুক্তি দেন, বিশ্বে যা কিছু ঘটে তা নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন এবং কোনো কিছুই দৈবক্রমে ঘটে না।স্পিনোজা কার্যকারণ সম্পর্ককে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন এবং বলেন, প্রতিটি ঘটনা পূর্ববর্তী কারণের অনিবার্য ফল। তিনি বলেন, প্রকৃতিতে এমন কিছু নেই যেগুলো দৈবক্রমে ঘটে, বরং সবকিছু প্রকৃতির প্রয়োজনীয়তার দ্বারা সংঘটিত হয়।

স্পিনোজার মতে কারণ ব্যতীত কোনো ঘটনা ঘটতে পারে না। প্রতিটি বিষয় কোনো না কোনো পূর্ববর্তী শর্ত দ্বারা নির্ধারিত। যেমন সূর্য উদয়ের কারণ পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘূর্ণন এবং মহাকর্ষীয় টান। একইভাবে মানবিক সিদ্ধান্ত ও আচরণও নির্দিষ্ট কারণের ফল।স্পিনোজার দর্শন অনুযায়ী, প্রকৃত স্বাধীনতা মানে দৈব বা আকস্মিকতা নয় বরং প্রকৃত স্বাধীনতা হলো আমাদের নিজেদের প্রকৃতি ও প্রয়োজনীয়তা বোঝা। আমরা যদি বুঝতে পারি যে আমাদের চিন্তা ও কর্মকাণ্ড প্রকৃতির অনিবার্য নিয়মের অংশ, তবে আমরা সেগুলোর প্রকৃত কারণ উপলব্ধি করতে পারব এবং প্রকৃত স্বাধীনতার দিকে এগোতে পারব। তিনি বলেন, “A free man is he who lives under the guidance of reason.”

এই ধারণা বলে প্রকৃত জ্ঞানই আমাদের সত্যিকারের স্বাধীনতার পথ দেখায়, কারণ তখন আমরা প্রকৃতির অপরিবর্তনীয় নিয়ম বুঝতে পারি এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারি। স্পিনোজার মতে আমাদের আবেগ ও অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, কারণ সেগুলোও নির্দিষ্ট কারণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুখ বা দুঃখ আকস্মিক নয়, নির্দিষ্ট কারণের দ্বারা গঠিত। যদি আমরা আবেগের প্রকৃতি বুঝতে পারি, তবে আমরা আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হব। তিনি নৈতিকতার ক্ষেত্রে যুক্তি দেন যে, মানুষের উচিত জ্ঞানের আলোকে পরিচালিত হওয়া এবং প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী জীবনযাপন করা। যারা প্রকৃতির অনিবার্য নিয়ম বোঝে, তারা কখনো কিছুর ওপর নির্ভর করে না, তারা তাদের নিজেদের অস্তিত্বের প্রকৃত কারণ উপলব্ধি করে।

স্পিনোজার দর্শন আধুনিক বিজ্ঞানের কার্যকারণ ভিত্তিক ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিউটনের গতিসূত্র এবং আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বও কার্যকারণ ভিত্তিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। স্পিনোজার চিন্তাধারা নীতিশাস্ত্র, রাজনীতি এবং মনোবিজ্ঞানের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। স্পিনোজার এই কঠোর নিয়তিবাদ অনেকের কাছেই আপাতদৃষ্টিতে মানব স্বাধীনতার পরিপন্থী মনে হয়। কারণ যদি সবকিছু পূর্বনির্ধারিত হয় তবে ব্যক্তি কীভাবে নৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে? কিছু দার্শনিক, যেমন ইমানুয়েল কান্ট, যুক্তি দেন যে, স্বাধীনতা ও নৈতিকতা সম্ভব কেবল যদি আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকে। তবে স্পিনোজা পাল্টা যুক্তি দেন যে প্রকৃত স্বাধীনতা হলো প্রকৃতির নিয়ম বোঝা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা।

এছাড়া নীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রে স্পিনোজার চিন্তাধারা প্রশ্ন তোলে যে, যদি সবকিছু পূর্বনির্ধারিত হয়, তবে মানুষের জন্য ভালো বা খারাপের ধারণা কীভাবে কার্যকর হতে পারে? স্পিনোজার দার্শনিক চিন্তাধারা আমাদের শেখায় প্রতিটি ঘটনা কোনো না কোনো কারণের অনিবার্য ফল। তাঁর দর্শন মানব জীবনের উদ্দেশ্য, স্বাধীনতা এবং নৈতিকতা সম্পর্কে গভীর চিন্তার সুযোগ করে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃতির নিয়ম অনুসরণ করাই আমাদের প্রকৃত সুখ ও স্বাধীনতার চাবিকাঠি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আজও দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে রয়েছে এবং তা বিজ্ঞানের কার্যকারণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।




ফ্রান্সের ফার্স্ট লেডিকে নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আমেরিকায় কেন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ?

ফ্রান্স এবং আমেরিকার সম্পর্ক ইতিমধ্যে অনেক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে, আর তা আরও জটিল হতে পারে যদি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমমানুয়েল ম্যাক্রনের স্ত্রীকে নিয়ে চলা গুজবগুলির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি ডানপন্থী আমেরিকান মন্তব্যকারীরা একটি অযৌক্তিক এবং মিথ্যা গুজব ছড়িয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট পত্নী ব্রিজিট ম্যাক্রন আসলে পুরুষ ছিলেন এবং তিনি ট্রান্সজেন্ডার হয়ে তার পুরুষ পরিচয় গোপন রেখেছেন। এই গুজবটি দুই প্রধান ট্রাম্প-সমর্থক কনজারভেটিভব্যক্তি, ক্যান্ডেস এবং কার্লসন দ্বারা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভিডিওর মাধ্যমে তারা এই তত্ত্বটি প্রচার করেছেন।

ক্যান্ডেস তার ইউটিউব চ্যানেলে প্রথমে এই গুজবটি প্রচার করেন এবং এটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তিনি একটি ভিডিও পোস্ট করেন যার শিরোনাম ছিল “ফ্রান্সের প্রথম মহিলা কি পুরুষ?” এবং এতে দাবি করেন যে ব্রিজিট ম্যাক্রন আসলে একজন পুরুষ। তিনি এক্স’এ এই ভিডিওটি প্রচার করে লেখেন, “আপনারা সবকিছু থামিয়ে এখন এটিই দেখুন! এটা কোনো রসিকতা নয়, এটি মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি!” তার এই দাবির পর এটি ট্রাম্পের মাগা আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং গুজবটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এই গুজবের মূল উৎস ছিল ২০২১ সালে ফরাসি ডানপন্থী জার্নাল “ফেত ও ডকুমেন্টস”-এ প্রকাশিত একটি আর্টিকেল, যেখানে বলা হয়েছিল ব্রিজিট এবং তার ভাই জঁ-মিশেল ট্রগনিও আসলে এক ব্যক্তিই ছিলেন। ওই আর্টিকেলে দাবি করা হয়েছিল যে, ব্রিজিট নিজেই জঁ-মিশেল ছিলেন এবং তিনি ৩০ বছর বয়সে পুরুষ থেকে নারী হয়ে ওঠেন। ক্যান্ডেস সেই আর্টিকেলটিকে উল্লেখ করে বলেন, “আমি পেশাদারী খ্যাতির উপর বাজি ধরতে পারি যে ব্রিজিট আসলে একজন পুরুষ। যে সাংবাদিক বা প্রকাশনা যারা এই দাবিকে অস্বীকার করছে, তারা প্রতারক প্রতিষ্ঠানেরই অংশ।”

তারপর থেকে ক্যান্ডেস এ নিয়ে তার ইউটিউব চ্যানেলে একাধিক ভিডিও পোস্ট করেছেন, যার মধ্যে “বিকামিং ব্রিজিট” নামক একটি সিরিজও রয়েছে। এই সিরিজটি ব্রিজিট ম্যাক্রন সম্পর্কিত তার দাবি আরও বেশি প্রচারিত করেছে এবং ভিডিওর ভিউ সংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে পিয়ার্স মর্গান এই দাবি সম্পর্কে ক্যান্ডেস-এর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই ধরনের দাবি অত্যন্ত আপত্তিকর এবং ভুল। একসময় তিনি ক্যান্ডেস-কে ১০০,০০০ ডলার দান করার প্রস্তাব দেন, যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে ব্রিজিট ম্যাক্রন একজন পুরুষ নন। তবে ক্যান্ডেস সব সমালোচনা উপেক্ষা করে তার প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে এবং নিয়মিত তার ভিডিও সিরিজের মাধ্যমে নতুন নতুন তথ্য এবং সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছেন।

প্রেসিডেন্ট এমমানুয়েল ম্যাক্রন এই গুজব সম্পর্কে মন্তব্য করেন, “সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হল মিথ্যা তথ্য এবং তৈরি করা দৃশ্যকল্প। মানুষ এসব বিশ্বাস করে এবং আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও বিঘ্ন সৃষ্টি করে।” এছাড়াও ব্রিজিট ম্যাক্রনের মেয়ে টিফেন এই গুজবগুলিকে “অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিক” এবং “হয়রানি” হিসেবে মন্তব্য করেন। ফরাসি প্রথম পরিবার এই গুজবের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা একটি মানহানি মামলা দায়ের করে, যার ফলে ক্যান্ডেস এবং তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়। এই মামলা এবং এর ফলস্বরূপ গুজবটির আরও প্রসারিত হওয়া নিশ্চিত করেছে। এছাড়া রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় মিডিয়াগুলো ক্যান্ডেস-এর ভিডিগুলো প্রচার করছে, এটা যেন তার জন্য আরও বিশেষ অর্জন হয়ে উঠেছে। এক ভিডিওতে বলেন, “আমি বুঝতে পারিনি যে, আমার নাম রুশ ভাষায় কতটা চমৎকার শোনাচ্ছে।”

বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক স্যান্ডার ভ্যান ডার লিন্ডেন বলেন, বর্তমান সময়ে মিডিয়া পরিবেশে গুজব এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং মানুষ বিভিন্ন মিডিয়া চ্যানেলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং যেসব তথ্য তারা বিশ্বাস করে সেগুলো অপরের থেকে আলাদা হতে থাকে, এতে গুজব এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলির প্রসারে সহায়ক হয়। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ জোসেফ ইউসিনস্কি মন্তব্য করেন, ক্যান্ডেস এবং কার্লসন-এর মতো ব্যক্তিত্বরা নিজেদের গুজবপ্রিয় দর্শকদের জন্য এমন বিষয় নির্বাচন করেন যা তাদের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তারা এমন কনটেন্ট তৈরি করেন যেগুলো এক শ্রেণীর দর্শকদের আশার সাথে মানানসই হয়ে যায়। এই গুজবটিও মূলত এমন একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যেখানে ক্ষমতাশালী নেতারা নিজেদের প্রকৃত চরিত্র লুকিয়ে রাখেন এবং এমন সব লিঙ্গ রাজনীতি নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা হয়।

মিথ্যা হলেও ব্রিজিট ম্যাক্রন-এর ট্রান্সজেন্ডার হওয়া সম্পর্কে গুজবটি এক বৃহত্তর রাজনৈতিক বিবেচনায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স এবং আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে ইতিমধ্যে যেসব সংকট তৈরি হয়েছে, এই গুজবটি সেই সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।বিশেষত যদি এটি ট্রাম্প সমর্থকদের দ্বারা সমর্থিত হয়, তবে তা ফ্রান্স এবং আমেরিকার মধ্যে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই গুজবের ফলস্বরূপ শুধুমাত্র রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও একটি বিভাজন সৃষ্টি হবে, যেটি বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা আরো উস্কে দিতে পারে।





একজন নার্সিসিস্টকে কিভাবে মোকাবিলা করবেন

নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার একটি দুর্লভমানসিক অবস্থা তবে নার্সিসিস্টিক ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে সম্পর্ক থাকা খুবই সাধারণ ব্যাপার। এই রোগটি অহংকার, বড়ত্ববোধ, সহানুভূতির অভাব, সুযোগসন্ধানিতা, আগ্রাসন এবং প্রতিনিয়ত প্রশংসা ও সম্মানের প্রয়োজনীয়তা দ্বারা চিহ্নিত। তবে এই রোগের কিছু অদৃশ্য দিকও আছে যা প্রথম দিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে।ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং নার্সিসিজমের গবেষক অমি ব্রুনেল বলেন “আমরা প্রথম দিকে নার্সিসিস্টদের প্রতি আকৃষ্ট হই, তারা চমকপ্রদ, মজাদার, প্রাণবন্ত! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের নেতিবাচক গুণাবলী বের হয়ে আসে।”

ব্রুনেল ব্যাখ্যা করেন, নার্সিসিস্টরা “নিজেকে কেন্দ্র করে চিন্তা করেন, তারা অধিকারী, এবং প্রায়ই তারা মনে করেন যে পৃথিবী তাদের চারপাশে ঘোরে।” তবে সবার মধ্যে এটি এক রকম প্রকাশ পায় না। তিন ধরনের নার্সিসিজমের বর্ণনা করা হয়েছে, এজেন্টিক নার্সিসিজম, কমিউনাল নার্সিসিজম, এবং ভলনারেবল নার্সিসিজম। এজেন্টিক নার্সিসিজম সবচেয়ে পরিচিত এবং ক্ষতিকর ধরনের। এই ধরনের নার্সিসিস্টরা নিজেদের কৃতিত্ব ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে অত্যধিক আত্মবিশ্বাসী এবং অন্যদের তুলনায় নিজেকে অনেক উচ্চতর হিসেবে দেখেন। তারা নিজেদের ইমেজ রক্ষা করতে অন্যদের ক্ষমতা ও মনের অবস্থানকে তুচ্ছ মনে করেন। তারা আত্মপ্রচার করতে সদা তৎপর, বড় বড় স্বপ্ন দেখেন, এবং প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য কাজের পরিবেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী।

কমিউনাল নার্সিসিজম ভিন্ন ধরনের, যেখানে এই ব্যক্তিরা অন্যদের সাহায্য করার মাধ্যমে প্রশংসা ও আদর অর্জন করতে চান। তারা খুব সহানুভূতিশীল ও সাহায্যকারী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেন, তবে এর পিছনে তাদের আসল উদ্দেশ্য থাকে আরও ভালোবাসা ও প্রশংসা পাওয়ার বাসনা। ভলনারেবল নার্সিসিজম সবচেয়ে দুর্বল ধরনের। এখানে ব্যক্তিরা গভীর নিম্নমানবিকতাবোধের জন্য আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করেন এবং নানা ধরনের মানসিক অসন্তোষে ভোগেন। তারা খুব রক্ষণশীল, উদ্বিগ্ন, এবং বিষণ্ণ থাকতে পারেন। নার্সিসিজমের কারণ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তবে এই বিষয়ক গবেষণা এখনও খুব শক্তিশালী নয়। গবেষকরা সাধারণত মনে করেন যে নার্সিসিজম মূলত পরিবেশগত কারণেই তৈরি হয়, বিশেষত পরিবারের আচরণের কারণে।

অনেক সময় অত্যধিক প্রশংসা, অত্যধিক পিতামাতার প্রীতির ফলে একটি শিশু বড় হয়ে অহংকার ও অহংকারপূর্ণ মনোভাব তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে যদি শিশুকে অবজ্ঞা করে বা তাদের মনোভাব অবমূল্যায়ন করে তবে শিশুটি ভলনারেবল নার্সিসিজমে আক্রান্ত হতে পারে। একজন ব্যক্তি যদি কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হন, তবে তিনি হয়তো সচেতনভাবে সেটি পরিবর্তন করতে চান। কিন্তু নার্সিসিস্টরা নিজেদের বিশেষত্বের উপর এতটাই বিশ্বাসী থাকেন যে তারা পরিবর্তন চায় না। তারা জানেন যে অন্যরা তাদের বিরক্তিকর মনে করে, তবে তারা এটি নিজেদের ভুল হিসেবে মনে করে না বরং মনে করে অন্যরা তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত।

তবে কিছু গবেষণা দেখায় যে, নার্সিসিজমের কিছু অংশ পরিবর্তন হতে পারে। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যদি নার্সিসিস্টদের কাউকে সহানুভূতি বা ভালবাসা প্রদর্শন করতে বলা হয়, তবে তারা কিছু সময়ের জন্য তাদের আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে। নার্সিসিস্টদের সাথে সম্পর্ক রাখা কঠিন হতে পারে, তবে এটি কিছু ক্ষেত্রে উন্নত করা সম্ভব। তবে এসব আলোচনা প্রায়শই যন্ত্রণার মধ্যে শেষ হয়। ব্রুনেল বলেন, অনেক সময়, সেরা উপায় হলো সম্পর্কটি সমাপ্ত করা। যদি কোনও সম্পর্ক মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অবিলম্বে শেষ করা উচিত। নর্ষিসিস্টিক সম্পর্কের সাথে জীবনের যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো নিজের ক্ষমতাকে বুঝে নেয়া এবং আগের ভুলগুলি থেকে শিক্ষা নেয়া।





মিয়ানমারকে নিয়ে ট্রাম্প এখন কী করবেন : বার্টিল লিন্টনার সুইডিশ সাংবাদিক , লেখক

“সম্প্রতি মস্কো-ওয়াশিংটনের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অক্ষ। আবার রাশিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের জান্তার রয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং গণতন্ত্রকামীরা আশঙ্কা করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার মিয়ানমার নীতি নিয়ে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের আগে, যুক্তরাষ্ট্র ছিল জান্তা এবং স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলের তীব্র সমালোচক এবং মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলনের এক প্রধান সমর্থক। এখন, ট্রাম্প প্রশাসন সেসব সমর্থন বন্ধ করে দিয়েছে। … প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প কি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলকে কাজে লাগানো শুরু করবে নিজের প্রয়োজনে? কাউন্সিলকে যদি আমেরিকা একঘরে করতে চায় তাহলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী চীনের দিকে চলে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই।

… হয়তো আমেরিকা কাউন্সিলকে চীন থেকে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য যা প্রয়োজন তাই করবে। এর মধ্যে সম্ভবত তেল ও গ্যাসের মতো অর্থনৈতিক সুবিধাও থাকতে পারে। … ২০০০-এর দশকের শুরুতে, তখনকার বার্মিজ জান্তা রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। তারা হয়ে ওঠে রুশ সামরিক সরঞ্জাম কেনার এক বড় ক্রেতা। জান্তা এই পদক্ষেপ নিয়েছিল মূলত চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য। তারপর থেকে বিশেষ করে ২০২১ সালে নেপিডোয় সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং রাশিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। মিয়ানমারের শাসকেরা একাধিকবার ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মস্কোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বাসযোগ্য এশীয় মিত্র। ট্রাম্প এমন কোন শক্তিকে সমর্থন করবেন, যারা মিয়ানমারে সেনাশাসনের অবসান দেখতে চায়, তার সম্ভাবনা কম। … ইউরোপীয় ইউনিয়ন সত্যিই কি যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁকা জায়গা পূর্ণ করতে পারবে? ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো এত সম্পদ নেই। এই বিশ্বব্যাপী অনিশ্চিত সময়ে, এটা স্পষ্ট যে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী মানুষের সামনে আরও কঠিন সময় আসছে “





পায়রা বন্দর অর্থনীতির জন্য বিষফোঁড়া – পরিকল্পনা উপদেষ্টা

পটুয়াখালীর পায়রাকে সমুদ্রের অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছিল পতিত বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। বলা হয়েছিল, পায়রাকে দেশের লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এজন্য সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হয়। তবে গভীরতা না মেলায় ২০২১ সালে পায়রাকে গভীর সমুদ্রবন্দর করার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পায়রা বন্দর প্রকল্পকে অর্থনীতির জন্য বিষফোঁড়া বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেছেন পায়রায় সমুদ্র বা নদীবন্দর নয়; বরং একটি ঘাট হতে পারত। বিপুল বিনিয়োগ ও ব্যয়ের পর এখন প্রকল্পটি থেকে সরে আসাও যাচ্ছে না। কিন্তু আমরা এটা শুরু করতাম না।

রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথাগুলো বলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সভায় বলা হয়, বালি ও পলি জমার তীব্র ঝুঁকিতে আছে পায়রা সমুদ্র বন্দর। যা এর ভবিষ্যতকে চ্যালেঞ্জে ফেলবে। তিনি বলেন, ‘সেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকায় প্রকল্পটি বাদ দেয়া যাচ্ছে না। সেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে গিয়ে সুন্দরবনের একটি অংশ নষ্ট হয়েছে। এখন আবার ইয়ার্ড, জেটি ও সংযোগ সড়ক করা লাগবে। এভাবে চলতেই থাকবে। ব্যয়বহুল ড্রেজিং মেশিন কেনা হচ্ছে। সারা বছর ড্রেজিং করতে হবে। এখন এটার কোনো উত্তম সমাধান নেই। এটা অর্থনীতির জন্য বিষফোঁড়ার মতো। অনেক বিনিয়োগ করে সেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হয়েছে, চাইলেই সেটা বন্ধ করা যাবে না।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, প্রকল্পটি শর্ত সাপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কারণ, এই প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যেতে পারে। তবে বন্ধ করে দেওয়ার আগে ওইখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা পরিবহনের সুবিধার্থে কিছু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আপতত প্রকল্পটি চালু থাকবে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় পায়রা নদীতীরে কয়লাভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থান। আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি উৎপাদনে রয়েছে, একটি উৎপাদনের অপেক্ষায় ও আরেকটি নির্মাণাধীন।

চ্যানেলের গভীরতা নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে পায়রায় নির্মাণাধীন কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য, বড় জাহাজ চলাচল করতে না পারলে এ বন্দর বাণিজ্যিকভাবে কখনো লাভজনক হবে না।সেক্ষেত্রে বড় জাহাজ থেকে লাইটারে করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা নিতে খরচ বেড়ে যাবে। আর খরচ বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে বিদ্যুতের দামেও।


মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে থাকুক জনগণের মালিকানা : ড. সাইমুম পারভেজ স্কুল অব থিওলজি , রিলিজিয়ন ও সোসাইটির জ্যেষ্ঠ গবেষক

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরের প্রথম মার্চ মাস এটি। স্বাধীনতার এ মাস উদযাপনের সময় পরিবর্তিত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে।… কোনো একক দল বা ব্যক্তি নয়, গণযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণের হাতেই ফিরে আসুক। ২০১৩ সালে দেশে দুটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে-একটি শাহবাগ আন্দোলন ও আরেকটি হেফাজত আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের নব্য বয়ান তৈরি ও সেই বয়ান অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক লাভ তুলে আনতে সহযোগিতা করে। এটি একটি চমকপ্রদ বিষয় যে শাহবাগ আন্দোলনের প্রকৃতপক্ষে শুরু হয়েছিল সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনকে আওয়ামী লীগের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে রূপান্তরিত করা হয়।

এই আন্দোলনের শুরু হয় আওয়ামী সরকারের সঙ্গে জামায়াতের একধরনের আঁতাত হচ্ছে, এ সন্দেহে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলে এই সন্দেহের সূত্রপাত হয়। কীভাবে একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের মদদপুষ্ট আন্দোলনে পরিণত হলো, তা বুঝতে হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহা বয়ান ও শত্রু নির্মাণের কাঠামোটি বুঝতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের বয়ান অনুযায়ী আওয়ামী লীগই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র অভিভাবক বা দেখভাল করার কর্তৃত্বের অধিকারী, তাই শেষ পর্যন্ত আন্দোলন তাদের পকেটস্থ হয়।

শাহবাগ আন্দোলনে সরকার কীভাবে মিত্রে পরিণত হলো, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে যখন আলোচনা ও প্রতিবাদের দরকার ছিল, তখন কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠী হেফাজতের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হলো। হেফাজতের অপ্রয়োজনীয় আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক মূল বিষয় থেকে নজর সরিয়ে দিল। আওয়ামী লীগ সরকার শক্তি প্রয়োগ করে হেফাজতের ঢাকায় অবস্থানকে বানচাল করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাদেরকে কাছে টেনে নিয়েছে। এভাবে শাহবাগ ও হেফাজত দুই আপাত পরস্পরবিরোধী গোষ্ঠী কট্টর জাতীয়তাবাদ ও ধর্মকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের সমাজে ঘৃণার চর্চা বাড়ায়। তৈরি হয় বাইনারি বিভাজন এবং দুটি মেরু। সমাজের এই অসহিষ্ণু বিভাজন ‘সেক্যুলার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া আওয়ামী লীগের ইসলামপন্থীদের প্রতিরোধের নামে যেকোনো মূল্যে বিকল্পহীন হিসেবে ক্ষমতায় টিকে থাকাকে জায়েজ করে।

৫ আগস্টের পর জুলাই অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ঢেকে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, প্রথমে বিএনপি এবং পরে নতুন দল এনসিপি মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টাকে রুখে দেয়। ‘২৪ ও ‘৭১ যে একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতা, তা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও কিছু কট্টরপন্থী ছাড়া বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলেরই ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এই ঐকমত্যকে কাজে লাগিয়ে ও একক মহা বয়ানকে ভেঙে দিয়ে আওয়ামী লীগের হাত থেকে মুক্তিযুদ্ধকে সাধারণ জনগণের হাতে তুলে দিতে হবে।



ক্যান্সারের বিরুদ্ধে জীবাণুর ব্যবহার , অবশেষে আলোর মুখ দেখার পথে

এমন একটা পৃথিবী চিন্তা করুন যেখানে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে !এবার এমনটাই ঘটছে এবং কিছু বিজ্ঞানী এভাবেই কাজ করছেন। তারা জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারড জীবাণুর মাধ্যমে ক্যান্সার কোষগুলিকে লক্ষ্য করে তা ধ্বংস করার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে শুরু করেছেন। ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে ক্যান্সার চিকিৎসার ইতিহাস ১৮৬০ এর দশকে প্রথম শুরু হয়। উইলিয়াম বি. কোলে নামক এক বিজ্ঞানী স্ট্রেপটোকোক্কাস নামক জীবাণু এক কিশোরী রোগীর শরীরে ইনজেক্ট করেন। এই কিশোরীটি অচিকিৎসাযোগ্য হাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে এই অপ্রথাগত পদ্ধতিটি ক্যান্সারের টিউমার সঙ্কুচিত হতে সাহায্য করেছিল, এটি ছিল ইমিউনোথেরাপির প্রথম উদাহরণ।

পরবর্তীতে নিউ ইয়র্কের মেমোরিয়াল হাসপাতালের বোন টিউমার সার্ভিসের প্রধান হিসেবে কোলে ১,০০০ এরও বেশি ক্যান্সার রোগীকে ব্যাকটেরিয়া বা ব্যাকটেরিয়ার উৎপাদিত টক্সিন ইনজেক্ট করেছিলেন। এই টক্সিনগুলো পরে ‘কোলি টক্সিন’ হিসেবে পরিচিতি পায়।প্রথম দিকে এটি আশাজনক সাফল্য দেখালেও পরবর্তী বছরগুলোতে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে রেডিয়েশন থেরাপি এবং কেমোথেরাপির বিকাশ কোলে’র কাজকে ছাপিয়ে যায় এবং তার পদ্ধতি নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তবে আধুনিক ইমিউনোলজি কোলে’র অনেক তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণ করেছে। সাথে দেখিয়েছে কিছু ক্যান্সার সত্যিই ইমিউন সিস্টেমের উন্নতির প্রতি খুবই সংবেদনশীল, যেগুলো আমরা আজকের দিনে রোগীদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করতে পারি। এবার ব্যাকটেরিয়া ভিত্তিক ক্যান্সার থেরাপি কীভাবে কাজ করে?

এই থেরাপিগুলি কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিশেষ ক্ষমতাকে কাজে লাগায়, যেমন-ক্যান্সারের টিউমারের ভেতরে বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষমতা।ক্যান্সারের চারপাশে থাকা অক্সিজেনের অভাব, অ্যাসিডিক পরিবেশ এবং মৃত টিস্যু-এই টিউমার মাইক্রোএনভায়রনমেন্ট ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। একবার টিউমারে প্রবেশ করার পর, ব্যাকটেরিয়া সরাসরি ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করতে পারে অথবা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তুলতে পারে। তবে এই পদ্ধতি গ্রহণের পথে বেশ কিছু বাধাও রয়েছে।

প্রথমত নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, কারণ জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলে তা ক্ষতিকর হতে পারে। তাই গবেষকরা ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতিকে অতি সতর্কতার সাথে দুর্বল করে নিশ্চিত করেছেন যাতে তা স্বাস্থ্যকর টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এছাড়া ব্যাকটেরিয়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণ এবং টিউমারে তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করা, এমনকি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাইক্রোবায়োম নামে পরিচিত ব্যাকটেরিয়া অলরেডি আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে থাকে। ফলে নতুন ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করালে এটি প্রাকৃতিক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এছাড়া কিভাবে ব্যাকটেরিয়া ক্যান্সারের মাইক্রোএনভায়রনমেন্ট এবং ইমিউন সিস্টেমের সাথে এডজাস্ট করে সেসব আমরা এখনও সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারিনি।

এখনও অনেক বাধা থাকা সত্ত্বেও, সাইনটিফিক ক্ষেত্রগুলির উন্নয়ন, বিশেষত সিন্থেটিক বায়োলজি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এই ক্ষেত্রটিকে নতুন জীবন দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন ব্যাকটেরিয়াকে আরও উন্নত ফাংশন প্রদান করতে সক্ষম। যেমন-স্পেসিফিক অ্যান্টি-ক্যান্সার এজেন্টগুলো টিউমারের মধ্যে সরাসরি উৎপাদন ও বিতরণ করা। এই লক্ষ্যভিত্তিক পদ্ধতি ক্যান্সার চিকিৎসার কিছু সীমাবদ্ধতা, যেমন সাইড-এফেক্ট এবং গভীর টিউমার টিস্যুতে পৌঁছানোর সমস্যা অতিক্রম করতে সাহায্য করতে পারে। একাধিক গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে ব্যাকটেরিয়া ভিত্তিক থেরাপি বিশেষ করে সলিড টিউমার, যেমন কলোন ক্যান্সার, ডিম্বাশয় ক্যান্সার এবং মেটাস্টেটিক ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে।

যেখানে আমরা সবচেয়ে ভাল প্রমাণ পেয়েছি তা হলো ব্যাকটেরিয়া ও নিয়মিত ব্যবহার করা ইমিউনোথেরাপি ওষুধের সাথে একত্রে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করতে পারে। সম্প্রতি কিছু গবেষক ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেন ব্যাবহার করে, যা ক্যান্সারের কোষগুলোকে চিনতে এবং আক্রমণ করতে সক্ষম ইমিউন সেলের কাছে ছোট টিউমার প্রোটিনের টুকরো সরবরাহ করেছে। এই পদ্ধতিটি পরীক্ষামূলক প্রাণীদের মধ্যে টিউমার সঙ্কুচিত করতে এবং কখনও কখনও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। যতই চ্যালেঞ্জ থাকুক না কেন, ব্যাকটেরিয়া ভিত্তিক ক্যান্সার থেরাপির সম্ভাবনা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আমাদের টিউমার বায়োলজি এবং ব্যাকটেরিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে বোঝাপড়া উন্নত হলে আমরা ক্যান্সার চিকিৎসার একটি নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারি।

গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হলে, ব্যাকটেরিয়া ভিত্তিক এই থেরাপি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী নতুন অস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এটি ইমিউনোথেরাপি ও কেমোথেরাপির মতো বিদ্যমান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর সাথে সমন্বয় করে আরও কার্যকরী হতে পারে।





দ্য ব্রুটালিস্ট শিল্প , সংগ্রাম এবং সামাজিক দ্বন্দ্বের চিত্র

ব্র্যাডি করবেটের সিনেমা ‘দ্য ব্রুটালিস্ট’-এর প্রথম দৃশ্যে যখন লাসলো তোথ নিউ ইয়র্কের স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভটি দেখে, সেটি উল্টো দেখা যায়! ১৯৪৭ সালে হাঙ্গেরি থেকে আসা এক ইহুদি-হাঙ্গেরিয়ান স্থপতি, যিনি হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফিরে নতুন জীবন শুরু করতে আমেরিকায় পৌঁছেছেন। স্মৃতিস্তম্ভটি উল্টো দেখা গেলেও এটি তোথের দৃষ্টিকোণের ভুল ভঙ্গির কারণে এমনটা মনে হয় বলে মনে করেন তিনি। তবে আমেরিকার ঐতিহাসিক অভিবাসী অভ্যর্থনার এ দৃশ্যের উল্টো প্রেক্ষাপট, আমেরিকান স্বপ্নের কল্পনাকে ধ্বংস করে দেয়।

‘দ্য ব্রুটালিস্ট’ ১০টি অস্কার মনোনয়ন পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সেরা ছবি, সেরা পরিচালক এবং সেরা অভিনেতা এড্রিয়ান ব্রডি, যিনি তোথ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। যদিও সিনেমাটি ঐতিহাসিক পটভূমিতে নির্মিত হলেও এর কাহিনী কল্পিত। তোথ বুখেনওয়াল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বেঁচে ছিলেন, তার স্ত্রী এর্জেৎবেটের সঙ্গে যুদ্ধের সময় আলাদা হয়ে যান এবং আশা করেন যে তিনি আমেরিকায় তার কাছে আসবেন। তোথের পূর্ববর্তী জীবনে তিনি জার্মানির বাউহাউস স্কুলের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং বুদাপেস্টে আধুনিক স্থাপত্যের বড় বড় জনসাধারণের ভবন নির্মাণ করেছিলেন।

তবে আমেরিকায় নতুন জীবন শুরু করার তাঁর আশা বাস্তবে পরিণত হতে পারে না। তিনি শ্রমিকের কাজ শুরু করেন এবং পরে পেনসিলভানিয়ার উদ্যোক্তা হ্যারিসন লি ভ্যান বুরেন (গাই পিয়েরস) থেকে এক বড় মাপের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের প্রস্তাব পান। তবে একে একে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তোথ একজন ইহুদি বহিরাগত হিসেবে এই শ্বেতাঙ্গ প্রটেস্ট্যান্ট সমাজে স্থান পেতে পারবেন না। ১৯৫০ দশকের ব্রুটালিস্ট স্থাপত্য আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত অভিবাসী জীবন এবং শিল্পীর সংগ্রামের এক অসাধারণ মেটাফোর হিসেবে ‘দ্য ব্রুটালিস্ট’ সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। করবেটের মতে শিল্পী এবং অভিবাসীর অভিজ্ঞতা একসঙ্গে চলে। অভিবাসী হয়ে যদি কেউ আমেরিকার উপকণ্ঠে বসবাস করতে আসে এবং তারা সকলের মতো দেখতে না হয়, তাহলে তাদের যেন তাড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করে!

ব্রুটালিস্ট স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল, অনেকেই তার স্থাপত্যকে অপছন্দ করেছিল এবং তা ভেঙে ফেলার দাবি করেছিল।করবেটের উদ্দেশ্য ছিল সে সময়ের যুদ্ধোত্তর মনোবিজ্ঞান এবং স্থাপত্যের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরা। তিনি একে একে ব্রুটালিস্ট স্থাপত্যের ভিত্তি নির্মাণকারীদের ইতিহাস পড়েন এবং বুঝতে পারেন, অনেক ডিজাইনার তাদের জীবনযাপন বা যুদ্ধের কারণে অনেক সৃজনশীল কাজ অব্যাহত রাখতে পারেননি।

তোথ বাউহাউস স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন এবং একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যে কষ্ট এবং যন্ত্রণা নিয়ে তার এটি নির্মাণ করতে হয়েছিল, তা চলচ্চিত্রে অবিস্মরণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া, ‘দ্য ব্রুটালিস্ট’-এ দাঁড়িয়ে তুথের সংগ্রাম সত্যিকার অর্থেই অভিবাসী জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। বিশেষত ১৯৪০ সালের আমেরিকায় ইহুদি অভিবাসীদের জন্য কঠোর শর্তে ভিসা প্রক্রিয়া এবং সামাজিক বৈষম্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তোথের গল্পে আমরা দেখতে পাই যখন সে ইতিবাচকভাবে নতুন জীবন শুরু করার জন্য কাজ করছে, তখন তাকে শ্বেতাঙ্গ, ক্যাথলিক সমাজে তুচ্ছ বা অপমানিত করা হচ্ছে।

সিনেমার গল্পে এক দৃষ্টান্তমূলকভাবে তোথের সৃজনশীলতার সঙ্গে তার অভিবাসী জীবনের অব্যক্ত যন্ত্রণা একত্রিত হয়ে ওঠে, যা আমাদের সত্যিকার অর্থে একজন শিল্পী এবং অভিবাসীর সংগ্রাম ও কষ্টের মধ্যে এক আত্মবিশ্বাসী প্রতীক হিসেবে প্রতিস্থাপন করে। তার নির্মিত ভবন নাজি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের অব্যক্ত যন্ত্রণার প্রতিফলন, শেষ পর্যন্ত তার শিল্পী আত্মাকে প্রকাশ করে এবং এমন একটি সমাজের মধ্যে তার সৃজনশীল শক্তির সংগ্রামের পুরস্কার হিসেবে তার চিরস্থায়ী কাজটি থাকে।

‘দ্য ব্রুটালিস্ট’ শুধুমাত্র এক শিল্পীর জীবনের কাহিনী নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাস, একটি সমাজের সৃজনশীল শক্তির সংগ্রাম এবং তাদের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টার একটি ছবি। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রতিটি সৃজনশীল উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কঠিন সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামই জীবনের অনেক দিককে পরিবর্তন করে দেয়।