শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরের প্রথম মার্চ মাস এটি। স্বাধীনতার এ মাস উদযাপনের সময় পরিবর্তিত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে।… কোনো একক দল বা ব্যক্তি নয়, গণযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণের হাতেই ফিরে আসুক। ২০১৩ সালে দেশে দুটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে-একটি শাহবাগ আন্দোলন ও আরেকটি হেফাজত আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের নব্য বয়ান তৈরি ও সেই বয়ান অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক লাভ তুলে আনতে সহযোগিতা করে। এটি একটি চমকপ্রদ বিষয় যে শাহবাগ আন্দোলনের প্রকৃতপক্ষে শুরু হয়েছিল সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনকে আওয়ামী লীগের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে রূপান্তরিত করা হয়।
এই আন্দোলনের শুরু হয় আওয়ামী সরকারের সঙ্গে জামায়াতের একধরনের আঁতাত হচ্ছে, এ সন্দেহে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলে এই সন্দেহের সূত্রপাত হয়। কীভাবে একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের মদদপুষ্ট আন্দোলনে পরিণত হলো, তা বুঝতে হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহা বয়ান ও শত্রু নির্মাণের কাঠামোটি বুঝতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের বয়ান অনুযায়ী আওয়ামী লীগই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র অভিভাবক বা দেখভাল করার কর্তৃত্বের অধিকারী, তাই শেষ পর্যন্ত আন্দোলন তাদের পকেটস্থ হয়।
শাহবাগ আন্দোলনে সরকার কীভাবে মিত্রে পরিণত হলো, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে যখন আলোচনা ও প্রতিবাদের দরকার ছিল, তখন কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠী হেফাজতের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হলো। হেফাজতের অপ্রয়োজনীয় আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক মূল বিষয় থেকে নজর সরিয়ে দিল। আওয়ামী লীগ সরকার শক্তি প্রয়োগ করে হেফাজতের ঢাকায় অবস্থানকে বানচাল করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাদেরকে কাছে টেনে নিয়েছে। এভাবে শাহবাগ ও হেফাজত দুই আপাত পরস্পরবিরোধী গোষ্ঠী কট্টর জাতীয়তাবাদ ও ধর্মকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের সমাজে ঘৃণার চর্চা বাড়ায়। তৈরি হয় বাইনারি বিভাজন এবং দুটি মেরু। সমাজের এই অসহিষ্ণু বিভাজন ‘সেক্যুলার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া আওয়ামী লীগের ইসলামপন্থীদের প্রতিরোধের নামে যেকোনো মূল্যে বিকল্পহীন হিসেবে ক্ষমতায় টিকে থাকাকে জায়েজ করে।
৫ আগস্টের পর জুলাই অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ঢেকে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, প্রথমে বিএনপি এবং পরে নতুন দল এনসিপি মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টাকে রুখে দেয়। ‘২৪ ও ‘৭১ যে একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতা, তা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও কিছু কট্টরপন্থী ছাড়া বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলেরই ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এই ঐকমত্যকে কাজে লাগিয়ে ও একক মহা বয়ানকে ভেঙে দিয়ে আওয়ামী লীগের হাত থেকে মুক্তিযুদ্ধকে সাধারণ জনগণের হাতে তুলে দিতে হবে।


