Home Blog Page 115

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস – গণহারে মামলা , স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস–২০২৫ উপলক্ষে ৪ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সংবাদপত্রের সম্পাদকেরা বক্তব্য দেন। সভাপতির বক্তব্যে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, ‘শেখ হাসিনার শাসনামল এত জনধিক্কৃত হয়েছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না। আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং আরও অনেক আইনের শিকার হয়েছিলাম। তবে বর্তমানে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা অথবা সহিংসতা-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে মামলা চলছে। এটা কীভাবে সম্ভব? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও ২০০ বা কিছু বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।

এটার অর্থ এই নয় যে কেউ দোষ করেননি। দোষ করে থাকলে সঠিকভাবে মামলা করে শাস্তি দেন এবং আমরা কোনোভাবেই তাঁর পাশে দাঁড়াব না, যদি সত্যিকার অর্থে সমাজের বিরুদ্ধে বা জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান সে রকম থাকে। কিন্তু আজকে ছয় থেকে সাত মাস হয়েছে, তাঁরা এসব মামলায় পড়েছেন। একটি কদমও এগোয়নি তদন্তের ব্যাপারে। ১৩ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার আছেন। তাঁরা যদি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তাঁদের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আজকে সাত মাস, আট মাস ধরে কারাগারে, তাঁরা জামিন পাচ্ছেন না। এখন মামলার যে প্রবণতা, তাতে ১০০ জন, ৫০ জন, ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা, তার মধ্যে একজন সাংবাদিকের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।

আইন উপদেষ্টা বলেন, আমাদের কিছু করার নেই, জনগণের অধিকার আছে মামলা করার। মেনে নিলাম মামলা করার অধিকার। কিন্তু কোনো আইনের যদি অপপ্রয়োগ হয়, তাহলে কি সরকার কিছু করবে না? সেখানেই আমার বড় প্রশ্ন।’ আলোচনা সভায় মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘যে দেশে প্রশ্ন করার জন্য সাংবাদিকের চাকরি যায়, সে দেশে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালন করছি আমরা। অবাক লাগে, আমি বিস্মিত হই, জানি না, আমি কাকে দায়ী করব?…তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে অনেকখানি। এক বছর আগে যে অবস্থা ছিল, সেই অবস্থা এখন আর নেই। অনেকখানি বদলেছে।’

সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গণতন্ত্র যদি সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। চিন্তাভাবনাগুলো গণতান্ত্রিক করতে হবে।…সংবাদমাধ্যমগুলোতে আমার কথা বললে ঠিক আছে, আর আমার কথা না বললে ঠিক নেই, এই চিন্তাভাবনাও গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করবে না।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকুক আর না থাকুক, বিএনপি গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করবে। কখনোই অন্যায়ভাবে অন্যের মতকে চাপিয়ে দেওয়াকে সমর্থন করব না।’

মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা আতঙ্কিত থাকি সাম্প্রতিক কালে প্রেসের সামনে কথা বলতে গিয়ে। মনে হচ্ছে, কোন প্রেস আমার কথাগুলো কীভাবে নেবে। তারপর তারা কীভাবে ছাপবে। অথবা সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে এটা উপস্থাপন করবে। যারা আমরা রাজনীতি করি এটা আমাদের জন্য সত্যি একটা চিন্তার বিষয়। কারণ, সাম্প্রতিক কালে চরিত্র হরণ করার যে প্রবণতা বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখা দিয়েছে, এটাতে চিন্তিত না হয়ে উপায় নেই। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গত ৫৩-৫৪ বছরের মধ্যে বর্তমানে যে সরকার ক্ষমতায় আছে, এর মতো গণমাধ্যমের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সরকার আসেনি। ভবিষ্যতে আসবে কি না, তা তিনি জানেন না।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি হস্তক্ষেপ কম ছিল, কিন্তু সামাজিক চাপ ছিল তীব্র। বিশেষ করে কিছু মিডিয়ার বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্লেষণ করা দরকার। ফ্যাসিজমের প্রভাবে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতো গণমাধ্যমেও দলীয়করণ হয়েছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ শুধু আইনি নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও হয়েছে। মিডিয়ার ভেতরে একধরনের ফ্যাসিবাদ ঢুকে গেছে, যা থেকে মুক্ত না হলে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে না। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি মুক্ত গণমাধ্যমের প্রত্যাশা সবার। কিন্তু তার আগে গণমাধ্যম সংস্কারের রূপরেখা তৈরি ও বাস্তবায়ন জরুরি। এই সংস্কার দৃশ্যমান না হলে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন — এ দেশে অভ্যুত্থানের ওপর দাঁড়ানো সরকার তৈরি হয়েছে, কিন্তু মব আক্রমণ চলছে। এখন কোনো জায়গায় মব আক্রমণের হুমকি দিলে সেই জায়গায় কার্যকর হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে কারও চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। সুতরাং এই মব আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র যদি মব আক্রমণ বন্ধ করতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রেরই তো অস্তিত্ব থাকে না।

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন – স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন ও সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের সুপারিশ

দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে এবং জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ৩২টি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কার কমিশন।

প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে :

* প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।

* এই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইন’ প্রণয়নের প্রস্তাব, যা নাগরিকদের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নির্ধারণ করবে।

* প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে (ক্ষেত্রবিশেষে ভর্তুকি মূল্যে) প্রদানের সুপারিশ।

* উপজেলা পর্যায়ে সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং জেলা হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত (টারশিয়ারি স্তরের) চিকিৎসা চালুর প্রস্তাব।

* প্রতিটি বিভাগীয় সদরে বিশ্বমানের টারশিয়ারি সেবা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সুপারিশ।

* প্রতি রোগীর জন্য গড়ে ১০ মিনিটের পরামর্শ সময় নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

* দেশের ২০ শতাংশ অতি দরিদ্র নাগরিকের জন্য সব হাসপাতালে বিনা মূল্যে সেবা প্রদানের সুপারিশ।

* সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলো পর্যায়ক্রমে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে পরিচালনার প্রস্তাব।

* অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সর্বজনীন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি ওষুধ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়ন ও বেসরকারি খাত থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সংগ্রহের প্রস্তাব।

* অ্যান্টি-ক্যানসার, অ্যান্টি-ডায়াবেটিক, অ্যান্টি-হাইপারটেনসিভ ও অত্যাবশ্যকীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর ভ্যাট এবং অন্যান্য শুল্ক ও কর শূন্য করার সুপারিশ।

* জরুরি চিকিৎসাকে বিশেষায়িত ও অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ।

* অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ফার্মেসি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এই ফার্মেসিগুলো জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের আওতায় পরিচালিত হবে।

* স্বাস্থ্য খাতের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে স্বতন্ত্র ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য)’ গঠনের প্রস্তাব। ‘বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস (বিএইচএস)’ নামে একটি নতুন সিভিল সার্ভিস গঠনের সুপারিশ।

স্টার ওয়ার্স ডে

প্রতি বছরের ৪ মে তারিখে বিশ্বজুড়ে যেন এক বিশেষ আলোড়ন তৈরি হয়। সিনেমা-প্রেমী থেকে সাধারণ দর্শক, সকলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দোকানপাট ও সংবাদমাধ্যম স্টার ওয়ার্স থিমে রঙিন হয়ে ওঠে। এই দিনটিই স্টার ওয়ার্স ডে — এক অনানুষ্ঠানিক উৎসব, যেখানে উদযাপিত হয় মহাকাব্যিক সাই-ফাই ফ্র্যাঞ্চাইজ ‘স্টার ওয়ার্স’-এর প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ।

স্টার ওয়ার্স ডে-র মূল উৎপত্তি সিনেমার আইকনিক সংলাপ “May the force be with you”-এর মজার রূপান্তর “May the 4th be with you” থেকে। ১৯৭৭ সালে প্রথম স্টার ওয়ার্স সিনেমা মুক্তির পর এই বাক্যাংশটি ধীরে ধীরে ভক্তদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি ১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচারের বিজয় উদযাপন উপলক্ষে এক রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেও “May the 4th be with you” ব্যবহৃত হয়েছিল। যদিও অনেক পুরনো ভক্ত আসল স্টার ওয়ার্স ডে হিসেবে ২৫ মে — প্রথম সিনেমার মুক্তির দিন — মনে করেন, ক্যালিফোর্নিয়া আইনসভা ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ৪ মে-কে স্টার ওয়ার্স ডে হিসেবে ঘোষণা দেয়।

প্রথমদিকে শুধু অনুরাগীদের ব্যক্তিগত কৌতুক ও সিনেমা-দেখা দিয়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ধীরে ধীরে এই দিনটি বিশ্বজুড়ে এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। ডিজনি ২০১২ সালে লুকাসফিল্ম অধিগ্রহণের পর থেকে দিনটিকে বাণিজ্যিকভাবেও গ্রহণ করেছে। তারা বিশেষ প্রদর্শনী, নতুন পণ্য ও স্টার ওয়ার্স থিমে নানা ইভেন্ট আয়োজন করে। এমনকি নিসান, জেমসন হুইস্কি-এর মতো নানা ব্র্যান্ডও তাদের প্রচারে এই দিনকে কাজে লাগায়।

তবে এই ব্যাপক বাণিজ্যায়ন সব ভক্তের মন রক্ষা করেনি। ম্যাশএবল সম্পাদক ও স্টার ওয়ার্স ইতিহাসবিদ ক্রিস টেলর নিজেকে “May the 4th গ্রিঞ্চ” বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, “আমি ভালো ড্যাড-জোক পছন্দ করি ঠিকই, তবে এটিকে কখনও কখনও বাড়াবাড়ি করা হয়।”

এ বছর স্টার ওয়ার্স ডে-তে ডিজনি ও নতুন সিরিজ Star Wars: Tales of the Underworld মুক্তি দিচ্ছে। সেইসঙ্গে চলতি Andor সিরিজের দ্বিতীয় মৌসুমও দর্শকদের মন কাড়ছে। ঘোষণা এসেছে ২০২৭ সালে রায়ান গসলিং অভিনীত নতুন স্টার ওয়ার্স সিনেমা আসছে। দোকানে এসেছে নতুন লাইটস্যাবার সেট, গয়না থেকে নানা সংগ্রহশালার পণ্য।

শুধু তাই নয় মেজর লিগ বেসবলের দলগুলোও স্টার ওয়ার্স থিমে ম্যাচ আয়োজন করেছে। সান ফ্রান্সিসকো জায়ান্টসের ম্যাচে “ওবি-ওয়েব কেনোবি” ববলহেড বিতরণ হয়েছে। জার্মানির গির্জা থেকে পেনসিলভানিয়ার নিউ হোপ শহর পর্যন্ত স্টার ওয়ার্স থিমে প্রার্থনা সভা ও শহরব্যাপী কসপ্লে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নিউ হোপ শহরে রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত হচ্ছে বিশেষ পানীয় “YodaRita”।

স্টিভ স্যানসুইট, বিশ্বের বৃহত্তম স্টার ওয়ার্স সংগ্রহশালার প্রতিষ্ঠাতা বলেন, “এটি এমন একটি দিন, যেদিন আমরা সবাই আমাদের ভক্তি ও আবেগ উদযাপন করতে পারি।” এসব প্রমাণ করে, সিনেমা কিভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এক বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক আবেগ হয়ে উঠতে পারে।

কাশ্মীর সন্ত্রাসবাদী হামলা , ভারতের উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষদের বিরুদ্ধে ডানপন্থী-হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার যুদ্ধ : স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য , সাংবাদিক , লেখক ও গবেষক

ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ, রিপাবলিক বাংলা নিউজ চ্যানেলের প্রধান অ্যাঙ্কর, ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যার শো-তে দাবি করেন যে যারা নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ (সেক্যুলার) বলে পরিচয় দেন, তাদের ভারতে থাকার অধিকার নেই এবং তারা যেন দেশ ছেড়ে চলে যান। তিনি উত্তেজনায় ফেটে পড়ে বলেন, ভারতীয় সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি মুছে ফেলা উচিত।

এপ্রিল ২২, কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে হিন্দুত্ববাদী প্রচারযন্ত্রের তৈরি সামাজিক মাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষদের লক্ষ্য করে অনবরত মৌখিক আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরে সন্ত্রাসবাদের প্রতি সম্মিলিত ঘৃণা দেখানোর পরিবর্তে দেশজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিস্ফোরণ দেখা যায়।

‘Secular’ শব্দটি গত এক দশকে হিন্দুত্ববাদী তরঙ্গে ‘sickular’ হয়ে উঠেছে—অর্থাৎ একধরনের অসুস্থতা, এবং ‘liberal’-রা ‘libtard’ নামে কটাক্ষের শিকার হয়েছে, যার অর্থ মানসিক বা সামাজিক দিক থেকে অপমানজনক একটি পরিচয়।

হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মনে করে, এই ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থীরাই ভারতের সংখ্যালঘুদের—বিশেষত মুসলিমদের—একমাত্র রক্ষাকবচ, যাদের তারা ভারতের প্রতিটি সমস্যার জন্য দায়ী মনে করে।

পাশাপাশি হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভালো করেই জানেন, মুসলমানদের সংখ্যা ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪% হওয়ায় তারা হিন্দু রাষ্ট্রের পথে বাধা হতে পারবে না। বরং হিন্দুদের মধ্যেই যারা ধর্মনিরপেক্ষতা, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির পক্ষে, তারাই হিন্দু রাষ্ট্রের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

২০২৩ সালে হিন্দুত্ববাদী শক্তির ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী চিন্তাধারার প্রতি আক্রমণ এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর প্রধান মোহন ভাগবত ‘cultural Marxists’ ও ‘wokes’—কে তাদের রাজনীতির বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে আখ্যা দেন। ‘Woke’ শব্দটির উৎপত্তি আমেরিকায়, যার অর্থ, যারা নিজেদের সচেতন ও সামাজিক-জাতিগত বৈষম্য নিয়ে সজাগ মনে করে।

অক্টোবর ২০২৩-এ বিজয়া দশমীর ভাষণে ভাগবত বলেন — এই ‘woke’রা বিশ্বজুড়ে ভালো প্রশাসনের, নৈতিক মূল্যবোধের ও সমাজিক নিয়মশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। তারা মিডিয়া ও শিক্ষাব্যবস্থাকে নিজেদের দখলে নিয়ে জাতির সংস্কৃতি ধ্বংস করে, রাজনীতি ও সমাজকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে ফেলে। এই ‘cultural Marxists’ ও ‘wokes’ মিথ্যা, বিকৃতি ও অতিরঞ্জনের মাধ্যমে সমাজে বিভেদ ও ঘৃণা ছড়ায়, যাতে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং তারা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। “এরা প্রতিটি দেশের জন্য হুমকি,” ভাগবত বলেন।

এই বক্তব্য এমন এক সময়ে আসে যখন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অন্যান্য রিপাবলিকান, ইলন মাস্কের মতো ব্যবসায়ী এবং ইতালির জর্জিয়া মেলোনি ও আর্জেন্টিনার জাভিয়ার মিলেই — এরা ‘wokism’এর বিরুদ্ধে সোচ্চার।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জর্জিয়া মেলোনি এক বক্তব্যে বলছিলেন কীভাবে রক্ষণশীলরা ‘বৈশ্বিক রাজনৈতিক বামপন্থার’ বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যৌথ লড়াই করছে। তিনি বাম ও উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদি, মিলেই ও মেলোনি-র ঐক্যের ভিত্তি তুলে ধরে বলেন –“আমরা স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা আমাদের জাতিকে ভালোবাসি। আমরা সুরক্ষিত সীমান্ত চাই…আমরা ব্যবসা ও নাগরিকদের রক্ষা করি…আমরা পারিবারিক মূল্যবোধ ও জীবনের পক্ষে দাঁড়াই। আমরা ‘ওকিজম’-এর বিরুদ্ধে লড়াই করি। আমরা আমাদের বিশ্বাস ও বাকস্বাধীনতার পবিত্র অধিকারকে রক্ষা করি। এবং আমরা কাণ্ডজ্ঞানের পক্ষে।”

সমালোচকরা বলছেন, এরা ‘বাকস্বাধীনতা’র নামে ঘৃণার ভাষা স্বাভাবিক করে তুলছে। ২০২৫ সালের মার্চে ট্রাম্প হোয়াইট হাউস দখলের পর থেকে ‘wokes’, লিবারেল, বাম ও ধর্মনিরপেক্ষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে।

গত এক দশক ধরেই বিশ্বজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা আক্রমণের শিকার, ডানপন্থী পপুলিস্টরা ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে জাতীয়তাবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

২০১৮ সালে হিউম্যানিস্টস ইউকের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু কপসন বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতাও আজ হুমকির মুখে, ঠিক যেমন মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং উদার গণতন্ত্র।”

ভাগবতের ভাষায় যাদের ‘woke’ বা ‘cultural Marxists’ বলা হচ্ছে, তাদেরই ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ‘ধর্মনিরপেক্ষ-উদারপন্থী’ হিসেবে দেখে। পাহেলগাম হামলার পর তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি ধারণা দেওয়া—যদি এই তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ রক্ষাকবচ’ সরানো যায়, তাহলে সন্ত্রাসবাদও শেষ হয়ে যাবে।

আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সম্পাদক সেমন্তি ঘোষ লেখেন, “মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম না থাকলে আমরা জানতেই পারতাম না, ধর্মের নামে অধর্মের বিষ কীভাবে আমাদের মানসিকতাকে বিষিয়ে তুলেছে।”

পাহালগামে সন্ত্রাসী হামলার পরপরই কেন ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিকদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা শুরু হলো, তার একটি সহজ ব্যাখ্যা দেয়া যাক্।

গত এক দশকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী প্রভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকায় মুসলমানরা ইতোমধ্যেই কোণঠাসা, এবং সমালোচনামূলক প্রশ্ন তোলার অবস্থানে তারা নেই। কিন্তু যেসব হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে দাঁড়ান এবং হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের বিরোধিতা করেন, তারাই বিজেপি সরকারের ‘কাশ্মীর নীতি’র কথিত সাফল্য এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলার সাহস রাখেন। ফলে, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়াটাই জরুরি মনে করা হয়েছে।


আঞ্চলিক সংহতির পথে ‘APEC’

দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে শুরু হয়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (APEC)-এর প্রস্তুতিমূলক দ্বিতীয় উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। এবারের সম্মেলনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন এক জটিল ও অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করছে। বাণিজ্য যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত বিপ্লবের যুগে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য।

১৯৮৯ সালে গঠিত APEC বর্তমানে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২১টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি অর্থনৈতিক ফোরাম। এই ফোরামের সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৪৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

বর্তমানে চীন-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক বিরোধ, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাব এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ—এই সবকিছুই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

এবারের জেজু বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামসহ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নিচ্ছেন। বৈঠকটির মূল প্রতিপাদ্য “Resilient Cooperation for Sustainable and Inclusive Growth”— অর্থাৎ স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য দৃঢ় সহযোগিতা।

মূল আলোচ্য বিষয়ে রয়েছে আন্তঃদেশীয় শুল্ক কমানো, ডিজিটাল বাণিজ্য উন্নয়ন এবং এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা) খাতকে শক্তিশালী করা।
বিশেষ করে “Asia-Pacific Free Trade Area (FTAAP)” পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

সদস্য রাষ্ট্রগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ এবং সবুজ অবকাঠামো উন্নয়নে যৌথ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা— এই তিন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গৃহীত হচ্ছে।
‘Cross-Border Data Flow’ সহজীকরণ এবং সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা নির্ধারণও আলোচনায় এসেছে।

উন্নয়নশীল সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো অন্যতম এজেন্ডা।

যদিও বাংলাদেশ APEC-এর সদস্য নয়, তবুও এই ফোরামের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরাসরি প্রভাব ফেলে। APEC-এর উদ্যোগে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও সবুজ অর্থনীতি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য পরোক্ষ সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে APEC-এর নীতিনির্ধারণী দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।

জেজু বৈঠক শুধু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ নয় বরং সামগ্রিকভাবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কাঠামো গঠনের সূচনা। বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক সহযোগিতা সময়ের দাবি। এ ধরনের উদ্যোগ এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক বাণিজ্য পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

মাংস কিভাবে জলবায়ুতে প্রভাব ফেলছে ?

আজকের বৈশ্বিক খাদ্যাভ্যাস ও জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে, ‘আমরা কতটা মাংস খেতে পারি, যাতে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট না হয়?’ ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণার ফলাফল আমাদের ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গবেষকরা বলছেন, যদি আমরা পৃথিবীকে টেকসই সীমার মধ্যে রাখতে চাই, তবে প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৫৫ গ্রাম মাংস খাওয়াই গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ গড়ে দৈনিক মাত্র ৩৬ গ্রাম।

গবেষণাটিতে ১ লাখেরও বেশি খাদ্যচিত্র ও পরিবেশগত উপাদান (CO₂ নিঃসরণ, ভূমি ব্যবহার, পানি ব্যবহার ইত্যাদি) বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষক দলটি একযোগে কয়েকটি ফ্যাক্টরকে গুরুত্ব দেয় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, কৃষিজমি ব্যবহার, জৈববৈচিত্র্য ক্ষতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি। গবেষণার মূল বার্তা স্পষ্ট, বিশেষ করে লাল মাংস (গরু ও ভেড়ার মাংস) উৎপাদন ও গ্রহণ পৃথিবীর উপর অসম্ভব চাপ সৃষ্টি করছে। গরু ও ভেড়া মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড নামক গ্যাস নিঃসরণ করে, যা কার্বন ডাই–অক্সাইডের তুলনায় যথাক্রমে ৮০ গুণ ও ২৮০ গুণ বেশি তাপ আটকে রাখে।

২০২১ সালের তথ্য বলছে, গড় মার্কিন ও ইউরোপীয় নাগরিক প্রতি সপ্তাহে ১.৫-২ কেজি মাংস খেয়েছেন—যা গবেষণায় নির্ধারিত সীমার (২৫৫ গ্রাম) ছয় থেকে দশ গুণ বেশি। শুধু আমেরিকানদের খাদ্যাভ্যাস মাংস ও দুগ্ধজাত খাদ্য থেকে বছরে ১৭০ কেজি CO₂ সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। অথচ জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, ব্যক্তিপর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবেশের ভারসাম্য রাখতে হলে বছরে মাথাপিছু মোট নিঃসরণ সীমা ২ টন CO₂–এর কম হওয়া উচিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, মুরগি, মাছ, ডিম বা দুগ্ধজাত খাবার স্বল্প পরিমাণে গ্রহণ করলে তা এখনও টেকসই সীমার মধ্যে পড়ে, তবে গরু বা ভেড়ার মাংস উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ প্রতি কেজি গরুর মাংস উৎপাদনে গড়ে ২৭ কেজি CO₂ সমতুল্য গ্যাস নিঃসরণ হয়, যেখানে মুরগির মাংসে মাত্র ৬.৯ কেজি। তাছাড়া গরুর মাংস উৎপাদনে ১৫ হাজার লিটার পানি ও ৩৫ বর্গমিটার ভূমি লাগে, যেখানে মুরগির জন্য এই সংখ্যা যথাক্রমে ৪৩০০ লিটার ও ৭ বর্গমিটার।

কেন এই সীমা গুরুত্বপূর্ণ?

“Planetary Boundaries” ধারণা অনুযায়ী, মানুষকে এমনভাবে খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ করতে হবে যাতে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র ও জলবায়ু ক্ষয় না হয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, মাংস উৎপাদনের জন্য ব্যাপক জমি পরিষ্কার করতে গিয়ে বনভূমি ধ্বংস হয়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হারায় এবং মাটি–পানি দূষণ হয়। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী ৭০% কৃষিজমি এখন পশুখাদ্য উৎপাদনের পেছনে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে লাল মাংস খাওয়া কমানো, উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ বৃদ্ধি, সাস্টেইনেবল কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ এবং খাদ্য অপচয় কমাতে হবে। বিশেষ করে ‘Flexitarian diet’—অর্থাৎ প্রায়শই নিরামিষভিত্তিক খাওয়া, মাঝে মাঝে মাংস গ্রহণ—টেকসইতা ও পুষ্টির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে সহায়ক। এছাড়া প্রোটিনের বিকল্প উৎস যেমন ডাল, বাদাম, ছোলা, সয়া, মাশরুম, এমনকি ভবিষ্যতের জন্য ইনসেক্ট প্রোটিন বা ল্যাব গ্রোণ মিটও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে।

বিশ্বের জনসংখ্যা যখন ৮০০ কোটির ঘর পেরিয়েছে এবং জলবায়ু সংকট ঘনিয়ে আসছে, তখন ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস ও নীতিনির্ধারক সিদ্ধান্ত দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান এখন স্পষ্ট করে বলছে—লাল মাংসের প্রতি আমাদের আকর্ষণ কমানো না গেলে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। টেকসই ভবিষ্যতের জন্য কম মাংস, সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্পই হতে পারে উত্তরণের পথ।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা , থামানোর কোনও উপায় সরকারের নেই : শফিকুল আলম , প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব

গতকাল বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলায় সাংবাদিকদের নাম আসছে, কিন্তু সরকার এ ধরনের ঘটনা থামানোর জন্য কোনও কার্যকর উপায়ের মালিক নয়। “Bangladesh Post Monsoon Uprising: Media Landscape” শীর্ষক অনুষ্ঠানে, যা Bangladeshi Journalists in International Media কর্তৃক আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা-য় আয়োজিত হয়। শফিকুল আলম বলেন, “এটি সরকারের একটি ব্যর্থতা। আমরা জানি মামলাগুলোর অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা ভালো সাংবাদিক। কিন্তু তারা এখন হত্যা মামলার আসামি, কারণ ক্ষুব্ধ কেউ একসঙ্গে কয়েকশ’ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দিয়েছে। আমাদের বিচারিক বা পুলিশি ব্যবস্থায় এমন কোনও প্রতিকার নেই, যা দিয়ে এসব মামলা থামানো যায়।”

তিনি বলেন, “আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং আমরা আদর্শ রাষ্ট্র নই। আমাদের আইন ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। যাদের অর্থ আছে, তারা আদালতে অগ্রাধিকার পায়। আমাদের ৪,০০০ সরকারি কর্মী রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা নিয়োজিত। আমরা এখনো স্বাধীন প্রসিকিউশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি।” এটি তিনি ব্যক্তিগত মত হিসেবে স্পষ্ট করেন এবং জানান সরকারের প্রেস সচিব হিসেবে নয়, বহু বছরের একজন সাংবাদিক হিসেবে বলেছেন। শফিকুল আলম উল্লেখ করেন, একটি মামলায় এক মানবাধিকারকর্মীকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সদস্যরা হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। “এই মানুষগুলো পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিপদে ফেলতে চায়,” বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সরকার যা সর্বোচ্চ করতে পারে তা হলো—কোনও সাংবাদিককে হয়রানি বা গ্রেপ্তার না করা। প্রেস সচিব আরও বলেন, যখন বিক্ষুব্ধ জনতা সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে হুমকি দেয়, তখন সরকার শুধুমাত্র তাদের নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, “যদি কেউ সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকদের নামসহ তালিকা নিয়ে যায়, যেখানে বলা হয় তারা ফ্যাসিস্ট শক্তির সহযোগী ছিলেন, আমরা কি তাদের নাম না নিতে বলব? যদি কোনও সাংবাদিক জুলাই আন্দোলনের কর্মীদের ‘অপরাধী’ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন, তবে জনগণের অধিকার আছে তাদের নাম প্রকাশ করার।”

তিনি যোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তখনও প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমকে সুরক্ষা দিয়েছিল, যখন বিক্ষোভকারীরা তাদের কার্যালয়ের সামনে সহিংস হয়ে উঠেছিল। “যারা মব হামলার শিকার হয়েছেন, তাদের তালিকা দিন—আমরা ব্যবস্থা নেব,” বলেন আলম। তিনি বলেন, “সরকারের ভেতরে আমাদের একটি মৌলিক সম্মতি আছে—আমরা সংবাদমাধ্যমের নিয়োগ বা বরখাস্তে হস্তক্ষেপ করব না। অনেক বিএনপি ঘরানার সাংবাদিক আমার কাছে এসেছিলেন চাকরির সুপারিশ চাইতে। আমি করিনি। এখন পর্যন্ত মিডিয়া খাতে যেসব চাকরি হারিয়েছে, তাতে আমাদের কোনও ভূমিকা নেই।”

বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে, তা প্রসঙ্গে প্রেস সচিব বলেন, এটি মূলত আওয়ামী লীগ শাসনামলে সাংবাদিকতার ব্যর্থতার ফল। “সবকিছু ঘটছে কারণ সাংবাদিকতা তখন দায়িত্ব পালন করেনি। আমরা ভুল করেছি। আপনারা কীভাবে হাসিনা আমলে যে সাংবাদিকতা হয়েছে, তা উপেক্ষা করবেন? আমরা সাংবাদিকতার ব্যর্থতা পর্যালোচনার জন্য জাতিসংঘে যাওয়ার কথা ভাবছি।” তিনি আরও বলেন, আগের সরকারের সময় সংবাদমাধ্যম দমন নীতির সঙ্গে বর্তমান সাংবাদিক সংকটের তুলনা করা ঠিক হবে না।

সংসদীয় সংলাপের জন্য গঠিত কনসেনসাস কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংবাদমাধ্যম সংস্কার নিয়ে আলোচনা করবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, “আমি মনে করি, সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা একটি ভুল ছিল। এ বিষয়ে সংশোধনের জন্য আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি, যারা অ্যাক্রিডিটেশন যোগ্যতার নির্দেশিকা তৈরি করেছে।” প্রেস সচিব আরও জানান, নতুন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। “আমরা খসড়া অধ্যাদেশের সমালোচনাগুলো আমলে নিয়ে একটি নতুন খসড়া প্রস্তুত করেছি।”

মানবিক করিডোর বাংলাদেশকে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে : মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ , বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা

বাংলাদেশ-মায়ানমারের সীমান্তবর্তী সংকট নতুন মাত্রা পেতে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনে বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংগঠকদের সমিতির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত “মানবিক করিডোর” দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

হাফিজ উদ্দিন বলেন, “আমরা কি জনগণের সম্মতি ছাড়া একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি? মানুষ উদ্বিগ্ন, আমরাও।”
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মায়ানমারের সংঘাতপ্রবণ রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি আঞ্চলিক সংঘর্ষে ঠেলে দেওয়া হতে পারে, যা জনমতের বাইরে গিয়ে ঘটছে।

এছাড়া হাফিজ উদ্দিন আগামী জাতীয় নির্বাচনের নির্ধারিত সময়সূচি নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন, অন্তর্বর্তী সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছে। তার ভাষায় “আমরা ১৭ বছর ধরে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছি, কিন্তু এখনো সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো লক্ষণ নেই।”

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন ১০ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতাদের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকে ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই প্রতিশ্রুতি বদলে জুন ২০২৬-এ নেওয়া হয়েছে বলে জানান হাফিজ। “এটি রাষ্ট্রের ভাগ্য নিয়ে খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়,” মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রসঙ্গের পাশাপাশি দেশের ক্রীড়া খাতেও আওয়ামী লীগের হস্তক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা করেন হাফিজ। তিনি অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগ দেশের ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া মূল্যবোধ ক্ষুণ্ণ করছে।

তিনি প্রকাশ করেন, ক্রিকেট সুপারস্টার শাকিব আল হাসানকে তিনি পূর্বে পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত না হন। “শাকিব এখন বিপদে রয়েছে কারণ সে সেই পরামর্শ শোনেনি। এখন ঢাকায় সম্মানের সাথে চলাফেরাও তার জন্য কঠিন হতে পারে,” বলেন হাফিজ। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রাক্তন ক্রিকেটার তামিম ইকবালকেও রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

আধুনিক বাংলা থিয়েটারে নারীর স্বর –

বাংলা থিয়েটার বরাবরই সমাজ-রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলক। তবে নারীর স্বর—অর্থাৎ নারীর জীবন-অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মপরিচয় প্রথমদিককার নাট্যচর্চায় প্রান্তিক ও প্রতীকী রূপেই অবস্থান করেছিল। ১৯৮০-৯০ দশকে বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাব এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সামাজিক-রাজনৈতিক রূপান্তরের ফলে থিয়েটারেও এক নতুন নারীবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। নারী-চরিত্র আর নিছক কাহিনির অনুসঙ্গ নয় বরং তারা হয়ে ওঠে প্রধান কাহিনির বাহক ও ক্ষমতায়নের প্রতীক।

১৯৮০-এর দশক বাংলাদেশের থিয়েটার ইতিহাসে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এ সময় গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের মাধ্যমে নাট্যচর্চা রাজনৈতিক-সামাজিক বার্তা বহন করতে শুরু করে। নারীর স্বর যদিও এখনও মূলধারায় প্রান্তিক, তবু সেলিম আল দীনের চাকা (১৯৯০) ও মামুনুর রশীদের কিত্তনখোলা (১৯৮৮)-তে নারী চরিত্র শুধু শোষিত নয়, বরং ঐতিহ্য-সংকটে অস্তিত্বসংকটে পতিত এক স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবেও চিত্রিত হয় ।

এই সময়ের নাট্যচর্চায় নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন ফেরদৌসী মজুমদার ও সারা যাকের, যারা শুধু অভিনেত্রী নন, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যচিন্তাবিদ হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। তাদের কাজ নারীর দেহ-রাজনীতি, সামাজিক নিপীড়ন ও আত্মপরিচয়ের জটিলতাকে থিয়েটারের ভাষায় উপস্থাপন করে। তবে নাট্যদলগুলোর কাঠামোতে তখনও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকটতা ছিল। নারীবাদী গবেষক তানভীর রহমান উল্লেখ করেন, ‘‘মঞ্চের নারী চরিত্রের স্বাধীনতা তখনও পুরুষ নির্দেশকের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল ছিল।’’

২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, পোশাকশিল্পের প্রসার ও নারীর শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ফলে সামাজিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসে। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় থিয়েটারে।

শবনম ফেরদৌসীর নারীর কথা (২০০৮)-তে নারীর মৌখিক ইতিহাস ভিত্তিক নাট্যরূপান্তর নারীর কণ্ঠস্বরকে মঞ্চের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসে। গবেষক সুলতানা দেখিয়েছেন, ‘‘এ সময়ের থিয়েটার নারীর দৈনন্দিন জীবন, শ্রম ও যৌন-রাজনীতিকে নিয়ে সাহসী আলাপ শুরু করে।’’

আরও উল্লেখযোগ্য এই সময় নতুন প্রজন্মের নারী নাট্যনির্দেশক ও নাট্যকর্মীরা (যেমন: নওশাবা আহমেদ, নূর ইমরান মিঠু) নারীবাদী থিয়েটারকে একক অভিনয়, সমষ্টিগত নারীনির্ভর প্রযোজনা ও ইন্টার‍্যাকটিভ থিয়েটারের মাধ্যমে সম্প্রসারিত করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারীর কণ্ঠ থিয়েটারে বহুমাত্রিক ও আন্তঃসংস্কৃতি চরিত্র পেয়েছে। Me Too Monologues (BD) (২০১৯) এবং নাট্যদল ‘কথা’র ক্লান্ত নারী (২০২২)-এর মতো প্রযোজনায় নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যৌন হয়রানি ও সামাজিক নিপীড়নের জীবন্ত চিত্রায়ন লক্ষণীয়।

নারী কণ্ঠ এখন কেবল পুরুষ-নির্মিত চরিত্র নয়, বরং নারী নিজেই কাহিনির নির্মাতা, পারফরমার ও দৃষ্টিকোণ নির্ধারক। লরা মুলভের (Mulvey, 1975) ‘Gaze Theory’-এর আলোকে বলতে গেলে, মঞ্চে নারীর পুরুষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা ‘অবজেক্ট’ ইমেজ এখন পাল্টে গিয়ে নারীর আত্মপ্রকাশের বিষয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে।

গবেষক নাসরিন-এর গবেষণা অনুসারে, সাম্প্রতিককালে থিয়েটার থেরাপি, ডিজিটাল পারফরম্যান্স ও আন্তঃসাংস্কৃতিক নাট্যপ্রচেষ্টা নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও বিশ্বায়ন-উত্তর নারীবাদী ডিসকোর্সকে বাংলাদেশি থিয়েটারে সংহত করছে। বিশেষ করে Drama Therapy পদ্ধতিতে যৌন নিপীড়নপীড়িত নারী কিংবা ট্রমাভুক্ত নারীরা নিজেদের কণ্ঠকে অভিনয়ের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করছেন।

আধুনিক বাংলা থিয়েটারে নারীর স্বর এখন আর নিছক প্রতীক নয়, বরং নারীর নিজস্ব ইতিহাস, দেহ-রাজনীতি ও আত্মপরিচয়ের জটিলতাকে প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠেছে। যদিও নাট্যচর্চায় পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বাধা এখনও একেবারে দূর হয়নি, তবুও নারীনির্ভর থিয়েটার প্রযোজনার উত্থান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে মঞ্চ এখন নারীর নিজের কণ্ঠস্বরের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল থিয়েটার, ইন্টার‍্যাকটিভ নাটক ও আন্তঃসংস্কৃতি নারীবাদী থিয়েটার এই প্রবণতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

চীনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো হারাতে পারবে না আমেরিকা : মোহাম্মদ সোলাইমান , মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক

“বার্লিন প্রাচীর ভাঙার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত জমানার সমাপ্তি হলো। সেই সময় থেকে শুরু করে ওয়াশিংটনের বর্তমান কূটনৈতিক দপ্তরগুলো একটা ভুল ধারণা নিয়ে রয়ে গেছে। আর তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বর্তমান প্রতিযোগিতা পুরোনো সোভিয়েত যুগের মতোই এক ঠান্ডা যুদ্ধের ছকে চলবে।

… বাস্তবতা হলো, চীন আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এক নয়। চীন বিচ্ছিন্ন কোনো সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নয়। বা অতিরিক্ত সামরিক ব্যয়ের চাপে জর্জরিত কোনো সাম্রাজ্য নয়। চীন একটি বিশ্বায়িত, প্রযুক্তিচালিত, সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র। চীনের আছে অর্থনৈতিক শক্তি, দক্ষ প্রশাসন এবং সাফল্যের ধারাবাহিকতা। চীন বিশ্বরাজনীতিতে মস্কোর মতো কোনো ভূমিকা নিতে রাজি নয়।

… বিশ্বরাজনীতিতে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে আমেরিকা তৈরি করেছিল এক নতুন রেসিপি। ঘেরাও, প্রতিরোধ, মতাদর্শ প্রচার এবং ধ্বংসের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করা। আজ মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা সেই পুরোনো ফর্মুলাই চীনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে চাইছেন।

কিন্তু এবার প্রতিপক্ষ সেই আগের মতো নয়। চীন কোনো দুর্বল আদর্শিক জোট নয়। সে বরং একটি টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেখানে প্রযুক্তি, পুঁজিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে কাজ করছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিমা অর্থনীতি থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন ছিল। আর চীন এখন সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে।

… ১৯৭৮ সালে দেং শিয়াও পিংয়ের নেতৃত্বে ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ’ নীতি চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চীন কখনো তার অর্থনীতিকে পশ্চিমা শর্তে পুরোপুরি উন্মুক্ত করেনি। ২০০১ সালে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় যোগ দিলেও, বেইজিং তার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিদেশি পুঁজির হাতে তুলে দেয়নি।

… চীনকে ঠান্ডা যুদ্ধের ছকে ঘেরাও করার মার্কিন কৌশল শুধু ভুল নয়, বিপজ্জনকও বটে। এই কৌশলের পেছনে একটা ধারণা কাজ করছে। আর তা হলো প্রতিপক্ষ একদিন নিজের ভেতরের সমস্যায় নিজেই ধসে পড়বে। আর তার জন্য প্রয়োজন হবে বিশ্বজুড়ে ছড়ানো ও বিপুল ব্যয়ে পরিচালিত কৌশল।

কিন্তু আজকের বাস্তবতা আলাদা। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর ১৯৫০ সালের মতো কোনো শিল্পের দিক দিয়ে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়। আমেরিকার অর্থনীতি এখন অনেকটাই পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল। অর্থাৎ শিল্পোৎপাদনের চেয়ে ডলার আধিপত্য ও আর্থিক প্রভাবের ওপর তারা নির্ভরশীল।

এর বিপরীতে চীন এখন ‘বিশ্বের কারখানা’। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, পণ্যপ্রবাহ এবং অবকাঠামো নেটওয়ার্কে চীনের অংশগ্রহণ গভীর ও বিস্তৃত।

… লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত, চীন শুধু বিশ্বায়নের অংশগ্রহণকারী নয়, তারা এখন বিশ্বপ্রযুক্তি বদলের শর্তই নির্ধারণ করছে।

… চীনের বিরুদ্ধে একটি বৈশ্বিক জোট গঠনের চিন্তা করার সময় মার্কিন জোটগুলো নিজেদের ভেতরকার অসংগতি বিবেচনায় রাখে না। পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, আরব উপসাগর কিংবা এমনকি আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যেও চীনের প্রতি মনোভাব একরকম নয়। অনেকে চীনের ভূমিকায় উদ্বিগ্ন। কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতো করে বৈশ্বিক সংঘাতে যেতে আগ্রহী নয়। কারণ, তাদের নিজেদের অর্থনীতি চীনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

… চীন আর আমেরিকার মধ্যকার এই প্রতিযোগিতা কোনো মতাদর্শের নয়। এটি প্রযুক্তি, শিল্প ও ভূরাজনীতির প্রতিযোগিতা। তাই এটিকে কোনো বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয়।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা জেতার উপায় সোভিয়েত ধাঁচের পতনের অপেক্ষা নয়। বরং দরকার যুক্তরাষ্ট্রের নিজের কৌশলগত শক্তি বজায় রাখা। নতুন করে শিল্পায়ন, সামাজিক সহনশীলতা ও একটি ন্যায্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।…”