বাংলা থিয়েটার বরাবরই সমাজ-রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলক। তবে নারীর স্বর—অর্থাৎ নারীর জীবন-অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মপরিচয় প্রথমদিককার নাট্যচর্চায় প্রান্তিক ও প্রতীকী রূপেই অবস্থান করেছিল। ১৯৮০-৯০ দশকে বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাব এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সামাজিক-রাজনৈতিক রূপান্তরের ফলে থিয়েটারেও এক নতুন নারীবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। নারী-চরিত্র আর নিছক কাহিনির অনুসঙ্গ নয় বরং তারা হয়ে ওঠে প্রধান কাহিনির বাহক ও ক্ষমতায়নের প্রতীক।
১৯৮০-এর দশক বাংলাদেশের থিয়েটার ইতিহাসে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এ সময় গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের মাধ্যমে নাট্যচর্চা রাজনৈতিক-সামাজিক বার্তা বহন করতে শুরু করে। নারীর স্বর যদিও এখনও মূলধারায় প্রান্তিক, তবু সেলিম আল দীনের চাকা (১৯৯০) ও মামুনুর রশীদের কিত্তনখোলা (১৯৮৮)-তে নারী চরিত্র শুধু শোষিত নয়, বরং ঐতিহ্য-সংকটে অস্তিত্বসংকটে পতিত এক স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবেও চিত্রিত হয় ।
এই সময়ের নাট্যচর্চায় নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন ফেরদৌসী মজুমদার ও সারা যাকের, যারা শুধু অভিনেত্রী নন, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যচিন্তাবিদ হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। তাদের কাজ নারীর দেহ-রাজনীতি, সামাজিক নিপীড়ন ও আত্মপরিচয়ের জটিলতাকে থিয়েটারের ভাষায় উপস্থাপন করে। তবে নাট্যদলগুলোর কাঠামোতে তখনও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকটতা ছিল। নারীবাদী গবেষক তানভীর রহমান উল্লেখ করেন, ‘‘মঞ্চের নারী চরিত্রের স্বাধীনতা তখনও পুরুষ নির্দেশকের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল ছিল।’’
২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, পোশাকশিল্পের প্রসার ও নারীর শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ফলে সামাজিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসে। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় থিয়েটারে।
শবনম ফেরদৌসীর নারীর কথা (২০০৮)-তে নারীর মৌখিক ইতিহাস ভিত্তিক নাট্যরূপান্তর নারীর কণ্ঠস্বরকে মঞ্চের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসে। গবেষক সুলতানা দেখিয়েছেন, ‘‘এ সময়ের থিয়েটার নারীর দৈনন্দিন জীবন, শ্রম ও যৌন-রাজনীতিকে নিয়ে সাহসী আলাপ শুরু করে।’’
আরও উল্লেখযোগ্য এই সময় নতুন প্রজন্মের নারী নাট্যনির্দেশক ও নাট্যকর্মীরা (যেমন: নওশাবা আহমেদ, নূর ইমরান মিঠু) নারীবাদী থিয়েটারকে একক অভিনয়, সমষ্টিগত নারীনির্ভর প্রযোজনা ও ইন্টার্যাকটিভ থিয়েটারের মাধ্যমে সম্প্রসারিত করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারীর কণ্ঠ থিয়েটারে বহুমাত্রিক ও আন্তঃসংস্কৃতি চরিত্র পেয়েছে। Me Too Monologues (BD) (২০১৯) এবং নাট্যদল ‘কথা’র ক্লান্ত নারী (২০২২)-এর মতো প্রযোজনায় নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যৌন হয়রানি ও সামাজিক নিপীড়নের জীবন্ত চিত্রায়ন লক্ষণীয়।
নারী কণ্ঠ এখন কেবল পুরুষ-নির্মিত চরিত্র নয়, বরং নারী নিজেই কাহিনির নির্মাতা, পারফরমার ও দৃষ্টিকোণ নির্ধারক। লরা মুলভের (Mulvey, 1975) ‘Gaze Theory’-এর আলোকে বলতে গেলে, মঞ্চে নারীর পুরুষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা ‘অবজেক্ট’ ইমেজ এখন পাল্টে গিয়ে নারীর আত্মপ্রকাশের বিষয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে।
গবেষক নাসরিন-এর গবেষণা অনুসারে, সাম্প্রতিককালে থিয়েটার থেরাপি, ডিজিটাল পারফরম্যান্স ও আন্তঃসাংস্কৃতিক নাট্যপ্রচেষ্টা নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও বিশ্বায়ন-উত্তর নারীবাদী ডিসকোর্সকে বাংলাদেশি থিয়েটারে সংহত করছে। বিশেষ করে Drama Therapy পদ্ধতিতে যৌন নিপীড়নপীড়িত নারী কিংবা ট্রমাভুক্ত নারীরা নিজেদের কণ্ঠকে অভিনয়ের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করছেন।
আধুনিক বাংলা থিয়েটারে নারীর স্বর এখন আর নিছক প্রতীক নয়, বরং নারীর নিজস্ব ইতিহাস, দেহ-রাজনীতি ও আত্মপরিচয়ের জটিলতাকে প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠেছে। যদিও নাট্যচর্চায় পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বাধা এখনও একেবারে দূর হয়নি, তবুও নারীনির্ভর থিয়েটার প্রযোজনার উত্থান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে মঞ্চ এখন নারীর নিজের কণ্ঠস্বরের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল থিয়েটার, ইন্টার্যাকটিভ নাটক ও আন্তঃসংস্কৃতি নারীবাদী থিয়েটার এই প্রবণতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।


