কাশ্মীর সন্ত্রাসবাদী হামলা , ভারতের উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষদের বিরুদ্ধে ডানপন্থী-হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার যুদ্ধ : স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য , সাংবাদিক , লেখক ও গবেষক

ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ, রিপাবলিক বাংলা নিউজ চ্যানেলের প্রধান অ্যাঙ্কর, ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যার শো-তে দাবি করেন যে যারা নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ (সেক্যুলার) বলে পরিচয় দেন, তাদের ভারতে থাকার অধিকার নেই এবং তারা যেন দেশ ছেড়ে চলে যান। তিনি উত্তেজনায় ফেটে পড়ে বলেন, ভারতীয় সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি মুছে ফেলা উচিত।

এপ্রিল ২২, কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে হিন্দুত্ববাদী প্রচারযন্ত্রের তৈরি সামাজিক মাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষদের লক্ষ্য করে অনবরত মৌখিক আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরে সন্ত্রাসবাদের প্রতি সম্মিলিত ঘৃণা দেখানোর পরিবর্তে দেশজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিস্ফোরণ দেখা যায়।

‘Secular’ শব্দটি গত এক দশকে হিন্দুত্ববাদী তরঙ্গে ‘sickular’ হয়ে উঠেছে—অর্থাৎ একধরনের অসুস্থতা, এবং ‘liberal’-রা ‘libtard’ নামে কটাক্ষের শিকার হয়েছে, যার অর্থ মানসিক বা সামাজিক দিক থেকে অপমানজনক একটি পরিচয়।

হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মনে করে, এই ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থীরাই ভারতের সংখ্যালঘুদের—বিশেষত মুসলিমদের—একমাত্র রক্ষাকবচ, যাদের তারা ভারতের প্রতিটি সমস্যার জন্য দায়ী মনে করে।

পাশাপাশি হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভালো করেই জানেন, মুসলমানদের সংখ্যা ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪% হওয়ায় তারা হিন্দু রাষ্ট্রের পথে বাধা হতে পারবে না। বরং হিন্দুদের মধ্যেই যারা ধর্মনিরপেক্ষতা, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির পক্ষে, তারাই হিন্দু রাষ্ট্রের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

২০২৩ সালে হিন্দুত্ববাদী শক্তির ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী চিন্তাধারার প্রতি আক্রমণ এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর প্রধান মোহন ভাগবত ‘cultural Marxists’ ও ‘wokes’—কে তাদের রাজনীতির বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে আখ্যা দেন। ‘Woke’ শব্দটির উৎপত্তি আমেরিকায়, যার অর্থ, যারা নিজেদের সচেতন ও সামাজিক-জাতিগত বৈষম্য নিয়ে সজাগ মনে করে।

অক্টোবর ২০২৩-এ বিজয়া দশমীর ভাষণে ভাগবত বলেন — এই ‘woke’রা বিশ্বজুড়ে ভালো প্রশাসনের, নৈতিক মূল্যবোধের ও সমাজিক নিয়মশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। তারা মিডিয়া ও শিক্ষাব্যবস্থাকে নিজেদের দখলে নিয়ে জাতির সংস্কৃতি ধ্বংস করে, রাজনীতি ও সমাজকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে ফেলে। এই ‘cultural Marxists’ ও ‘wokes’ মিথ্যা, বিকৃতি ও অতিরঞ্জনের মাধ্যমে সমাজে বিভেদ ও ঘৃণা ছড়ায়, যাতে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং তারা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। “এরা প্রতিটি দেশের জন্য হুমকি,” ভাগবত বলেন।

এই বক্তব্য এমন এক সময়ে আসে যখন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অন্যান্য রিপাবলিকান, ইলন মাস্কের মতো ব্যবসায়ী এবং ইতালির জর্জিয়া মেলোনি ও আর্জেন্টিনার জাভিয়ার মিলেই — এরা ‘wokism’এর বিরুদ্ধে সোচ্চার।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জর্জিয়া মেলোনি এক বক্তব্যে বলছিলেন কীভাবে রক্ষণশীলরা ‘বৈশ্বিক রাজনৈতিক বামপন্থার’ বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যৌথ লড়াই করছে। তিনি বাম ও উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদি, মিলেই ও মেলোনি-র ঐক্যের ভিত্তি তুলে ধরে বলেন –“আমরা স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা আমাদের জাতিকে ভালোবাসি। আমরা সুরক্ষিত সীমান্ত চাই…আমরা ব্যবসা ও নাগরিকদের রক্ষা করি…আমরা পারিবারিক মূল্যবোধ ও জীবনের পক্ষে দাঁড়াই। আমরা ‘ওকিজম’-এর বিরুদ্ধে লড়াই করি। আমরা আমাদের বিশ্বাস ও বাকস্বাধীনতার পবিত্র অধিকারকে রক্ষা করি। এবং আমরা কাণ্ডজ্ঞানের পক্ষে।”

সমালোচকরা বলছেন, এরা ‘বাকস্বাধীনতা’র নামে ঘৃণার ভাষা স্বাভাবিক করে তুলছে। ২০২৫ সালের মার্চে ট্রাম্প হোয়াইট হাউস দখলের পর থেকে ‘wokes’, লিবারেল, বাম ও ধর্মনিরপেক্ষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে।

গত এক দশক ধরেই বিশ্বজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা আক্রমণের শিকার, ডানপন্থী পপুলিস্টরা ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে জাতীয়তাবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

২০১৮ সালে হিউম্যানিস্টস ইউকের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু কপসন বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতাও আজ হুমকির মুখে, ঠিক যেমন মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং উদার গণতন্ত্র।”

ভাগবতের ভাষায় যাদের ‘woke’ বা ‘cultural Marxists’ বলা হচ্ছে, তাদেরই ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ‘ধর্মনিরপেক্ষ-উদারপন্থী’ হিসেবে দেখে। পাহেলগাম হামলার পর তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি ধারণা দেওয়া—যদি এই তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ রক্ষাকবচ’ সরানো যায়, তাহলে সন্ত্রাসবাদও শেষ হয়ে যাবে।

আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সম্পাদক সেমন্তি ঘোষ লেখেন, “মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম না থাকলে আমরা জানতেই পারতাম না, ধর্মের নামে অধর্মের বিষ কীভাবে আমাদের মানসিকতাকে বিষিয়ে তুলেছে।”

পাহালগামে সন্ত্রাসী হামলার পরপরই কেন ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিকদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা শুরু হলো, তার একটি সহজ ব্যাখ্যা দেয়া যাক্।

গত এক দশকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী প্রভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকায় মুসলমানরা ইতোমধ্যেই কোণঠাসা, এবং সমালোচনামূলক প্রশ্ন তোলার অবস্থানে তারা নেই। কিন্তু যেসব হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে দাঁড়ান এবং হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের বিরোধিতা করেন, তারাই বিজেপি সরকারের ‘কাশ্মীর নীতি’র কথিত সাফল্য এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলার সাহস রাখেন। ফলে, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়াটাই জরুরি মনে করা হয়েছে।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন