Home Blog Page 114

‘স্বাস্থ্যখাতে’ আমূল সংস্কারের সুপারিশ কমিশনের

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই সংকটাপন্ন। সরকারের বিনিয়োগের অভাব, চিকিৎসক সংকট, সেবার বৈষম্য এবং দুর্বল শাসন ব্যবস্থা এসব কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অনেকটা বিপদমুক্ত হতে পারছে না। এসব সমস্যার সমাধান করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন।

এই কমিশনটির নেতৃত্বে আছেন দেশের খ্যাতনামা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। গতকাল এই ১২ সদস্যবিশিষ্ট কমিশনটি তাদের সুপারিশসমূহ বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে একটি প্রতিবেদন আকারে জমা দেয়। এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত, সকলের জন্য সমানভাবে পৌঁছানোর একটি পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।

কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ ছিল, সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (PHC) সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করুক এবং তা জনগণের জন্য বিনামূল্যে সরবরাহ করা হোক। তারা এমন একটি স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা তৈরি করতে চায় যা পুরোপুরি জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হবে। এর পাশাপাশি, শহরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় উন্নত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, এবং স্বাস্থ্যের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সেবা গঠন করা উচিত বলে তারা মন্তব্য করেছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সরকারি খাতের মধ্যে একটি বৃহৎ রদবদল আনা। কমিশন প্রস্তাব করেছে, বর্তমান স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠন করা হোক এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিণত করা হোক। এক্ষেত্রে সরকারী এবং বেসরকারি সকল খাতের সমন্বয় ঘটানোর ওপরও জোর দেয়া হয়েছে।

কমিশন আরও সুপারিশ করেছে যে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অর্থনৈতিক বরাদ্দ বাড়ানো উচিত এবং এই বরাদ্দ যেন দেশের জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ হয়। আর সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালগুলোর মান উন্নয়ন করার জন্য নিয়মিত মান যাচাইয়ের ব্যবস্থাও গঠন করা প্রস্তাবিত হয়েছে।

এছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করার মাধ্যমে, দেশের চিকিৎসা খাতকে আরও আধুনিক এবং সবার জন্য সহজলভ্য করে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা। এতে করে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষদের সংখ্যা কমবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক হবে।

অধ্যাপক ইউনুস প্রতিবেদনটি গ্রহণ করার পর দ্রুত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যখাতের সমস্যাগুলো বহুদিনের, যদি আমরা এই প্রতিবেদন থেকে সমাধান বের করতে পারি, তবে তা হবে একেবারে যুগান্তকারী পরিবর্তন।” এমন একটি সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা, যেটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে, জনগণের জন্য আরও সাশ্রয়ী, কার্যকর এবং উন্নত করতে সাহায্য করবে, তা যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেজন্য সকল পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

সাংবাধিকতাকে মুক্ত করতে হবে : তথ্য উপদেষ্টা , মাহফুজ আলম

তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গতকাল জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে যেসব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ইস্যু হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, ‘‘গত ১৫ বছরে এমন কিছু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং নির্যাতনের পক্ষে একতরফা বর্ণনা প্রচার করেছে।’’

তথ্য অধিদপ্তর ও প্রকাশনা বিভাগের মিলনায়তনে বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট আয়োজিত ‘‘ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতন’’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
মাহফুজ আলম বলেন, ‘‘আমরা তদন্ত করব, কখন এবং কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পেয়েছে এবং কীভাবে এরা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ও হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম দিয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘যদি আমরা পেশাদার, উচ্চমানের সাংবাদিকতা চাই, তবে ভালো ও খারাপের পার্থক্য নির্ধারণ করতে হবে।’’

তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমি অবাক হই যখন দেখি কিছু পত্রিকা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ শব্দবন্ধ ব্যবহার না করে শুধু ‘জুলাই আন্দোলন’ বলে। জনগণের অভ্যুত্থানকে স্বীকার না করে তারা এটিকে শুধু ‘শাসন পরিবর্তন’ বলে চালিয়ে দেয়… এটা ভারতের বর্ণনা।’’

তিনি সতর্ক করেন, এমন প্রবণতা চলতে থাকলে সরকার নয়, জনগণ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোই তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, জনপ্রিয় গণমাধ্যমগুলো তাদের সার্কুলেশনের ভিত্তিতে বেশি সরকারি সুবিধা পাবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার চায় না সাংবাদিকরা সরকারের পক্ষে লিখুক।

তিনি জানান, তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে বিচারাধীন ২৬৬ জন সাংবাদিকের তথ্য রয়েছে। এসব মামলার প্রকৃতি যাচাই করে দেখা হবে সেগুলো হয়রানিমূলক কি না। প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা প্রত্যাহার করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নির্যাতিত সাংবাদিকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
জয় জয় দিনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগের সময়ে দায়েরকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রত্যাহার করুক। এইসব মামলার শিকাররা এখনও মানসিক ও আর্থিকভাবে ভুগছে।’’

আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (পরবর্তীকালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) প্রথম মামলা আমার বিরুদ্ধে হয়েছিল হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনামলে।’’ তিনি যোগ করেন, ‘‘ফ্যাসিজম ও মুক্ত গণমাধ্যম পাশাপাশি থাকতে পারে না।’’
মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, সাংবাদিকতার আর্থিক স্বতন্ত্রতা জরুরি। তাঁর ভাষ্য, ‘‘গণমাধ্যম সাধারণ ব্যবসা নয়। এটি ব্যাংকের মতো লাভবান হতে হবে না। তবে গণমাধ্যমের টিকে থাকার মতো আয় থাকতে হবে। তাদের স্বনির্ভর হতে হবে এবং সরকারি অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হওয়া চলবে না।’’

বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি , বিপন্ন করছে অটল মূল্যস্ফীতি

বাংলাদেশ আট মাস ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে রয়েছে। এই সময়কালে রেমিটেন্স, রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থনীতি কিছুটা শক্তিশালী থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি হয়নি। মূল্যস্ফীতির অগ্রগতির ফলে নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যেটি তাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় আঘাত হানছে।

অত্যাধিক মূল্যস্ফীতি এবং বাড়তে থাকা দারিদ্র্য –

বর্তমানে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন। প্রায় ২৫ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯% এর বেশি রয়েছে এবং FY25 অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি মন্দার দিকে এগোচ্ছে, যা সবচেয়ে দুর্বল জনগণের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, FY25 এর মধ্যে আরও প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি অতিমাত্রার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। এই মানুষগুলো এমন অবস্থায় পৌঁছাবে, যেখানে তারা দৈনিক $২.১৫ এরও কম আয়ে বেঁচে থাকবে।

মূল্যস্ফীতির পেছনে কী কারণ?

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কেন এতটা ভয়াবহ? যেখানে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা সফলভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেখানে বাংলাদেশে তা এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ব্যাংক সুদহার কমানো, আমদানি নিয়ন্ত্রণের মতো প্রচলিত নীতিগুলো এখানে কার্যকর হয়নি।

চাকরি হারানো এবং মজুরি কমে যাওয়া

বিশ্বব্যাংকের ম্যাক্রো পোভার্টি আউটলুক (MPO) অনুযায়ী, FY25 এর প্রথমার্ধে প্রায় ৪% কর্মজীবী তাদের চাকরি হারিয়েছেন এবং একই সময়ে নিম্ন-দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি ২% এবং উচ্চ-দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি ০.৫% কমেছে।

পদক্ষেপ না নিলে আরও বেশি দারিদ্র্য বাড়বে

বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “অর্থনীতির সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মূল্যস্ফীতি, যা দরিদ্র জনগণের ক্রয়ক্ষমতা একেবারে শেষ করে দিয়েছে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “যতটুকু দারিদ্র্য হ্রাস করা হয়েছিল, তা আবার ফিরে আসতে পারে।”

সবচেয়ে বিপদে গ্রামাঞ্চল

মূল্যস্ফীতি গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। এক সময় কৃষির ওপর নির্ভরশীল গ্রামবাসী এখন খাদ্যবস্তুর পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। মার্চ ২০২৫-এ গ্রামীণ অখাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৯৭%-এ পৌঁছেছে, যা শহরের তুলনায় অনেক বেশি।

মজুরি স্থবিরতা এবং বৈষম্য বৃদ্ধি

গত ৩৮ মাস ধরে মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তালমিলিয়ে বাড়েনি। এর ফলে সমাজে আয়বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিচ্ছে, চলতি অর্থবছরে দেশে আয়বৈষম্য আরও বাড়বে।

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বাংলাদেশ কি সফল হবে?

বাংলাদেশের দারিদ্র্য মুক্ত হওয়ার স্বপ্ন এখনো সম্ভব। তবে এটি শুধু কথায় নয়, বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। যদি জরুরি ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশ আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য দারিদ্র্যের আবর্তে আটকে যাবে এবং এক প্রজন্মের পরিবর্তে পরবর্তী প্রজন্মও দারিদ্র্যের কবলে পড়বে।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের , মৃত্যু নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, যাকে ইতিহাস “the great conqueror” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বে তার মৃত্যু পৃথিবীকে এক গভীর শূন্যতার মধ্যে ফেলেছিল। তার মৃত্যুর পেছনে কী ঘটনা ঘটেছিল তা আজও রহস্যের মতই রয়ে গেছে।

তার মৃত্যু একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। কিছু তত্ত্বে দাবি করা হয় তাকে হত্যার মাধ্যমে তার শাসন শেষ করা হয়, আবার কিছু তত্ত্বে বলা হয় যে, তার মৃত্যু একটি স্বাভাবিক রোগজনিত কারণে ঘটেছিল। তবে যা নিশ্চিত, তা হলো আলেকজান্ডারের মৃত্যু পরবর্তী রাজনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল এবং এই তত্ত্বগুলোর বেশিরভাগই রাজনৈতিক শক্তির সংঘর্ষের ফলস্বরূপ।

বিষক্রিয়ার মাধ্যমে আলেকজান্ডারকে হত্যার তত্ত্ব সবচেয়ে প্রচলিত। এটি প্রাচীন গ্রিক এবং রোমান ইতিহাসবিদদের দ্বারা উত্থাপিত হয়েছে। ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বে আলেকজান্ডার অসুস্থ হয়ে পড়লে তার শরীরের অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। তার অস্বাভাবিক রোগের লক্ষণগুলো—যেমন তীব্র জ্বর, অতিরিক্ত ক্লান্তি, শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এসবকে বিষক্রিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন তাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তবে প্রশ্ন উঠে আসে, কেন তাকে হত্যা করা হবে? তখন আলেকজান্ডার ছিল এক শক্তিশালী শাসক এবং তার সম্রাজ্য ছিল বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। তার শত্রুরা বিশেষ করে তার সেনাপতি ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা, তার মৃত্যুতে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল। সেলিউকাস এবং পটলেমি, দুই প্রধান সেনাপতি, যাদের সাথে আলেকজান্ডারের সম্পর্ক কখনও খুবই মধুর ছিল না, তাদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই ছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আলেকজান্ডারের মৃত্যুর মাধ্যমে নিজস্ব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছিল।

আরেকটি আকর্ষণীয় তত্ত্ব যা দাবি করে আলেকজান্ডারের মৃত্যুতে সেলিউকাস নামক তার প্রধান সেনাপতির হাত ছিল। সেলিউকাস তখন গ্রীস এবং তুরস্কের মধ্যে সেলিউকিড সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া ছিলেন। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর সেলিউকাস তার ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হন। কিছু ইতিহাসবিদ বলেন, আলেকজান্ডারের মৃত্যু সেলিউকাসের হাতে পরিকল্পিত ছিল, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার জীবিত থাকা পর্যন্ত তিনি সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। সেলিউকাসের ষড়যন্ত্রের কারণ হিসেবে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হয়।

তবে সেলিউকাসের ষড়যন্ত্রের পক্ষে একেবারে সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও তার অবস্থান এবং আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরপরই তার শক্তিশালী হওয়ার ঘটনা এটিকে একটি যৌক্তিক তত্ত্ব হিসেবে দাঁড় করায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো অলিম্পিয়াসের যুক্ত থাকার সম্ভাবনা। আলেকজান্ডারের মা অলিম্পিয়াস রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন এবং তার পুত্রের শাসনের মাধ্যমে তিনি নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চেয়েছিলেন। তার পুত্রের মৃত্যুর মাধ্যমে, অলিম্পিয়াস তার নিজের রাজত্বকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেতে পারেন বলে মনে করা হয়।

এটি অনুমাননির্ভর হলেও কিন্তু ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই তত্ত্বে বিশ্বাসীদের সংখ্যা কম নয়। তার শাসনকালে অলিম্পিয়াস অনেক সময়ই নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে রাজনৈতিক চক্রান্তের মধ্যে জড়িত ছিলেন। এরই মধ্যে তার পুত্রের মৃত্যু তাকে আরো বেশি শক্তি প্রদান করতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।

একটি সাম্প্রতিক তত্ত্ব হলো আলেকজান্ডারের মৃত্যু একটি আধ্যাত্মিক পরিণতি। প্রাচীন গ্রীসে, রাজারা এবং মহান ব্যক্তির মৃত্যুকে কখনোই সাধারণভাবে দেখা হতো না। অনেক গ্রীক ধর্মবিশ্বাসী ছিল যে, মহান পুরুষদের মৃত্যু ঈশ্বরের অভিপ্রায়ের ফলস্বরূপ। আলেকজান্ডার নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বাস করতেন এবং তার মৃত্যুর ঘটনা হয়তো ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।

তার মৃত্যুর আগে আলেকজান্ডারের প্রতি প্রজাদের পূর্ণ ভক্তি এবং তার শাসনের প্রতি তাদের আস্থা গভীর ছিল। ঈশ্বরের মাধ্যমে তার মৃত্যু একধরণের সমাপ্তি হতে পারে, যা তার মহান সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মৃত্যু ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে। তার মৃত্যুর পেছনে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব রয়েছে এবং প্রতিটি তত্ত্ব তার মৃত্যুর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক উন্মোচন করে। কি কারণে এবং কিভাবে তিনি মারা গিয়েছিলেন, তা আজও নিশ্চিত নয়। তবে তার মৃত্যুর পর যে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তা তার সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো ইতিহাসবিদদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে রয়ে গেছে এবং হয়তো ভবিষ্যতেও এটি রহস্যের ঘোরে ঘুরবে।

নারীরা কেন বেশি রক্তশূন্যতায় ভোগেন ?

বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া একটি নীরব স্বাস্থ্যসংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের অন্তত ৩০ শতাংশ এবং গর্ভবতী নারীদের ৩৭ শতাংশ এই সমস্যায় আক্রান্ত। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরো গুরুতর।

রক্তশূন্যতা বলতে সাধারণত রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কমে যাওয়া বোঝায়। নারীদের ক্ষেত্রে এর মূল কারণ হলো আয়রনের অভাব। প্রতিমাসের ঋতুস্রাবের ফলে গড়ে ৩০ থেকে ৮০ মিলিলিটার রক্ত ক্ষয় হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী ঋতুস্রাব আয়রনের ঘাটতি বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া গর্ভধারণকালীন আয়রনের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তা যদি পুষ্টির মাধ্যমে পূরণ না হয়, মা-শিশু উভয়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে।

শুধু আয়রনের ঘাটতি নয়, ভিটামিন বি ও ফলিক অ্যাসিডের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি অসুখ, ক্যানসার, অস্থিমজ্জা বা থাইরয়েডের সমস্যা, এমনকি জেনেটিক রক্তরোগ (যেমন থ্যালাসেমিয়া বা হিমোগ্লোবিন ই ট্রেইট) এসবের কারণেও রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। কৃমি সংক্রমণ, দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ সেবনজনিত পাকস্থলীর ক্ষত, পাইলস ও জরায়ুর টিউমারও আয়রনের ঘাটতির কারণ হতে পারে।

অতিরিক্ত ক্লান্তি, ত্বক ও ঠোঁট ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অল্প পরিশ্রমেই দম ধরে আসা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়ফড়– এই লক্ষণগুলো রক্তশূন্যতার সতর্ক সংকেত। তাই প্রথমেই রোগের তীব্রতা ও মূল কারণ নির্ণয় জরুরি। প্রয়োজনে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষা করানো উচিত।

প্রতিরোধে আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। কচু ও কচুশাক, পালংশাক, কলিজা, কাঁচা কলা, খেজুর ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় নিয়মিত রাখা প্রয়োজন। ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি পূরণে সবুজ ও রঙিন শাকসবজি খাওয়া উচিত। কখনও কখনও শুধুমাত্র খাবার যথেষ্ট না হলে চিকিৎসকের পরামর্শে আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে রক্তসঞ্চালন (ব্লাড ট্রান্সফিউশন)ও করতে হয়।

বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় এবং ষাটোর্ধ্ব নারীদের ক্ষেত্রে অরুচি ওজন কমে যাওয়া সহ রক্তশূন্যতার লক্ষণ দেখলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত। সচেতনতা ও সঠিক পুষ্টি গ্রহণই নারীদের এই নীরব সংকট থেকে মুক্তির পথ।

ট্রাম্পের প্রতিশ্রুত ‘সোনালী যুগ’ , যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলতার সূচনা : ক্যালাম জোনস , Deputy business editor, Guardian US

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এক নতুন ‘স্বর্ণযুগ’ নিয়ে আসবেন, যেখানে থাকবে কম দামে পণ্য, আরও বেশি চাকরি এবং ব্যাপক সম্পদ। এই সপ্তাহে তাঁর প্রথম প্রান্তিক (জানু–মার্চ) পারফরম্যান্স রিপোর্ট প্রকাশিত হলো এবং দেখা গেল, এই নতুন যুগ শুরুটা হয়েছে এক বিশৃঙ্খল অবস্থায়। গত তিন বছরে এই প্রথমবারের মতো দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) সংকুচিত হয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী সময়ে প্রবৃদ্ধি বেশ শক্তিশালী ছিল। বাণিজ্য বিকৃতি ও ভোক্তা ব্যয়ের দুর্বলতা এই ধাক্কার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাত্র ৪৩ মিনিটের মধ্যে নিজেকে এই হতাশাজনক ফলাফলের দায় থেকে দূরে সরিয়ে নেন।

নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম Truth Social-এ ট্রাম্প লেখেন— “আমাদের দেশ দ্রুত সমৃদ্ধ হবে, তবে আমাদের অবশ্যই বাইডেনের রেখে যাওয়া ‘ওভারহ্যাং’ (অর্থনৈতিক বোঝা) থেকে মুক্তি পেতে হবে। এতে কিছুটা সময় লাগবে। এই খারাপ সংখ্যাগুলোর সাথে ট্যারিফের কোনো সম্পর্ক নেই; শুধু সে (বাইডেন) আমাদের খারাপ সংখ্যা দিয়ে গেছে। কিন্তু যখন বুম শুরু হবে, তা হবে নজিরবিহীন। ধৈর্য ধরুন!!!” ট্রাম্পের ভাষ্যে, যেকোনো খারাপ অর্থনৈতিক সূচক বাইডেনের দোষ তবে ভালো ফলাফলের কৃতিত্ব তিনি নিজেই নেন।

মার্চ মাসের শক্তিশালী চাকরির প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়— “ব্যক্তিগত খাত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের নেতৃত্বে ঝড়ের বেগে ফিরছে।” সেই দিন ট্রাম্প ঘোষণা দেন—“এটা ইতিমধ্যেই কাজ করছে।” কিন্তু এপ্রিল মাসের তুলনামূলক দুর্বল চাকরির প্রতিবেদনের পর তাঁর সুর কিছুটা নরম হয়ে যায়। তিনি লেখেন—“আমি যেমন বলেছিলাম, আমরা কেবল পরিবর্তন পর্যায়ে আছি, কেবল শুরু করছি!!!” তাহলে কোনটা সত্য? আমেরিকার ‘স্বর্ণযুগ’ কি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, নাকি আরও অপেক্ষা করতে হবে? মার্কিন পণ্যের আমদানি ৪১% বেড়ে যায়, কারণ কোম্পানিগুলো আগাম ট্যারিফ এড়াতে তৎপর হয়। একই সময়ে টেকসই পণ্যে ভোক্তা ব্যয় ৩.৪% হ্রাস পায়, কারণ ভোক্তা আস্থা কমতে থাকে।

এই প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান দ্বিতীয় প্রান্তিক নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ ট্রাম্প এপ্রিলের শুরুতে বড় অংশের ট্যারিফ ঘোষণা করেন। এসব ট্যারিফ এবং এদের ঘিরে বিভ্রান্তি প্রবৃদ্ধিতে আরও বড় প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ট্রাম্পের ১০% বিশ্বব্যাপী পণ্যের ওপর এবং ১৪৫% চীনা পণ্যের ওপর হঠাৎ আরোপিত ট্যারিফ পরিস্থিতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে পাল্টে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন অলিভার অ্যালেন, প্যানথিওন ম্যাক্রোইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন—“ট্যারিফ আরোপের আগে বাড়তি কেনাকাটার যে উৎসাহ ছিল তা এখন দ্রুতই কমে আসবে। ভোক্তাদের খরচও কমবে আস্থা ও প্রকৃত আয়ের ওপর চাপের কারণে। পাশাপাশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে, আর রপ্তানি—বিশেষ করে চীনের বাজারে—প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

এখনও বলা যাচ্ছে না এই ট্যারিফ-নীতি অর্থনীতিকে সরাসরি মন্দার (টানা দুই প্রান্তিকের সংকোচন) দিকে নিয়ে যাবে কিনা। ট্রাম্পের শাসনামলে পরিস্থিতি দিনে দিনে পাল্টে যায়, একটি পূর্ণ প্রান্তিক তো অনেক দূরের কথা। ট্রাম্পের বক্তব্য আংশিক সঠিক এই প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি পতনের জন্য মূলত ট্যারিফ দায়ী নয়, কারণ অধিকাংশ ট্যারিফ দ্বিতীয় প্রান্তিকের শুরুতেই কার্যকর হয়েছে। বরং সম্ভাব্য ‘ট্রাম্পসেশন’-এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে প্রশাসনের এই ট্যারিফ প্রয়োগের ধরনে। বারবার কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ব্যাপক শুল্কের হুমকি, আবার ‘পারস্পরিক’ ট্যারিফ ঘোষণার পর একদিনের কম সময়েই তা প্রত্যাহার—এই ধরনের নাটকীয়তা ও বিভ্রান্তি বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে প্রবেশ করে গেছে। ভিতরে-বাইরে ব্যবসাগুলোর জন্য এটি অস্বস্তিকর।

ট্রাম্পের ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট একে “কৌশলগত অনিশ্চয়তা” বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন “আমরা যখন এগিয়ে যাবো, চুক্তি ঘোষণা করবো, তখন নিশ্চিততা আসবে। কিন্তু আলোচনায় নিশ্চিততা সবসময় ভালো নয়।” কিন্তু ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তাদের কাছে এই কৌশল যতই কার্যকর মনে হোক না কেন, যারা প্রতিদিন বিল দিচ্ছে, ব্যবসা বাড়াচ্ছে বা ফসল ফলাচ্ছে তাদের জন্য ফলটা আলাদা। ট্রাম্প গত নভেম্বরে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছেন। রিপাবলিকানদের ওয়াশিংটনে ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে তাঁকে এই ভোটব্যাঙ্ক টিকিয়ে রাখতে হবে।

তবে জরিপ বলছে, এই গোষ্ঠীগুলো উদ্বিগ্ন। PBS News/NPR/Marist-এর জরিপ অনুসারে, ৪৮% গ্রামীণ ভোটার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অসন্তুষ্ট। একইভাবে বার্ষিক আয় $৫০,০০০-এর কম এমন ৫৭% ভোটারও তাঁর পারফরম্যান্সে অসন্তুষ্ট। উদ্বেগ বাড়তে থাকায় ট্রাম্প ঝুঁকি লঘু করার চেষ্টা করছেন। সপ্তাহের এক বিচিত্র মুহূর্তে তিনি খালি দোকানের তাকের ঝুঁকিকে হালকা করে দেখান। তিনি বলেন “হয়তো বাচ্চারা ৩০টা পুতুলের বদলে ২টা পুতুল পাবে, আপনি জানেন তো। আর হয়তো এই দুইটা পুতুল আগের চেয়ে কয়েক ডলার বেশি দামি হবে।” তিনি আরও বলেন “চীনের জাহাজগুলো নানা জিনিসপত্র বোঝাই করে এসেছে, যার অনেক কিছুই কিন্তু আমাদের প্রয়োজন নেই।”

সাধারণত মার্কিন ভোক্তারাই ঠিক করেন, তাঁরা কী কিনবেন আর কী কিনবেন না তাদের প্রেসিডেন্ট নয়। এমন একজন ব্যক্তি, যার সম্পদ ও ভাবমূর্তি বিলাসিতার ওপর গড়ে উঠেছে, তাঁর মুখে এমন মন্তব্য বেশ অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। New York Post যেটি সাধারণত ট্রাম্প-ঘেঁষা, তাদের শিরোনাম ছিল—“বার্বি কম কিনুন।” এখনও ট্রাম্পের জন্য সময় রয়েছে। তবে ইতিমধ্যেই বাইডেন ‘ওভারহ্যাং’ যুক্তি ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার রায় দেবেন মার্কিন ভোটাররাই প্রেসিডেন্ট নন।

পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন – ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রী

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারের প্রধানমন্ত্রী আহমাদ বিন মুবারক পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। শনিবার এক্স-এ এক পোস্টের মাধ্যমে জানান, তিনি তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে না পারায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সূত্র জানায়, দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে বিন মুবারক সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (PLC) প্রধান রাশাদ আল আলিমি এবং কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এএফপিকে দেওয়া বক্তব্যে দুই মন্ত্রী ও কাউন্সিলের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও সঠিক প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না”—বিন মুবারকের পদত্যাগপত্র থেকে উদ্ধৃতি।

২০১৪ সালে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর সরকার দক্ষিণের এডেনে সরিয়ে নেওয়া হয়। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সরকারকে সমর্থন দিয়ে হস্তক্ষেপ করে, তবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য মেলেনি। বর্তমানে হুথিরা ইয়েমেনের অধিকাংশ জনবহুল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। পদত্যাগপত্রে বিন মুবারক উল্লেখ করেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি স্বল্প সময়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কার এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানসহ অনেক সাফল্য অর্জন করেছেন। তবে মার্কিনভিত্তিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাসা বলেন, “বিন মুবারক ক্রমাগত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সঙ্গে সংঘাতে ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকলেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা চান। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে তোলে।”

সরকারি সূত্র আরও জানায়, বিন মুবারক দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ স্থগিত করেছিলেন। এ কারণে তাঁর সঙ্গে মন্ত্রী ও কাউন্সিল সদস্যদের দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। ২০১৫ সালে হুথিরা তাঁকে অপহরণ করে কয়েকদিন আটকে রেখেছিল। পরে তিনি প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ ও জাতিসংঘে ইয়েমেনের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন এবং ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ পান। বিশ্লেষক আল-বাসার মতে, বিন মুবারকের বিদায় “সরকারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা প্রশমিত করবে এবং বিভক্তি কমাবে—এটি সরকারকে ঐক্যবদ্ধ করার দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।”

২০১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ইয়েমেনের যুদ্ধ লক্ষাধিক প্রাণহানি ঘটিয়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। যদিও ২০২২ সালে জাতিসংঘ-সমর্থিত ছয় মাসের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা কমে আসে। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর থেকে হুথিরা ইসরায়েল ও লাল সাগর-আডেন উপসাগরে জাহাজ টার্গেট করে আক্রমণ শুরু করে। মার্চে গাজায় মানবিক সহায়তা অবরোধের প্রতিবাদে হুথিরা আক্রমণ পুনরায় শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। বিন মুবারকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ইয়েমেন সরকারের অভ্যন্তরীণ জটিলতা কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন সময়ই বলে দেবে।

প্যাঞ্জিয়া – পৃথিবীর সুপারমহাদেশের রহস্য ও এর ভাঙন

পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে প্যাঞ্জিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি আমাদের পৃথিবী এবং মহাদেশগুলোর আজকের অবস্থান বুঝতে সহায়তা করে। প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সমস্ত মহাদেশ একত্রিত হয়ে গঠন করেছিল একটি বিশাল সুপারমহাদেশ, যার নাম ছিল প্যাঞ্জিয়া। এটি পৃথিবীর ইতিহাসের একটি মাইলফলক, যার সৃষ্টি, পরিবর্তন এবং ভাঙ্গন ভবিষ্যত গবেষণার জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

প্যাঞ্জিয়া ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে বৃহৎ সুপারমহাদেশ। এটি প্রায় ৩৩০ থেকে ২১০ মিলিয়ন বছর আগে পার্মিয়ান (Permian) এবং ট্রায়াসিক (Triassic) যুগে গঠিত হয়েছিল। এই সুপারমহাদেশটি প্যানথালাসা নামের একটি বিশাল মহাসাগর ও আজকের সমস্ত মহাদেশ একত্রিত করেছিল। পৃথিবীর বর্তমান মহাসাগর এবং ভূমির অবস্থা পরিবর্তিত হওয়ার আগে পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক গঠন ছিল অনেক ভিন্ন। প্যাঞ্জিয়ার ভেতরে বিস্তৃত ছিল বিশাল বন, পাহাড়, মরুভূমি এবং জলাভূমি, যা পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল।

প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে প্যাঞ্জিয়ার ভাঙ্গন শুরু হয়। এটি প্রাথমিকভাবে লরাসিয়া (Laurasia) এবং গন্ডওয়ানা (Gondwana) নামে দুটি প্রধান মহাদেশে বিভক্ত হয়। লরাসিয়া গঠিত হয়েছিল উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার অংশ নিয়ে, আর গন্ডওয়ানা ছিল দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, এবং অ্যান্টার্কটিকার সমন্বয়ে।

প্যাঞ্জিয়ার ভাঙ্গন প্রক্রিয়া পৃথিবীর ভেতরের শক্তি দ্বারা প্রভাবিত। পৃথিবীর ভূত্বক মূলত একটি শক্ত শেলের মতো, যার নিচে অবস্থিত ম্যান্টল এক ধরনের গলিত ম্যাগমা দ্বারা পূর্ণ। এই ম্যাগমা পৃথিবীর তাপমাত্রা এবং চাপের কারণে চলাচল করতে থাকে। টেকটনিক প্লেট নামে পরিচিত এই শক্ত শিলার টুকরোগুলো পৃথিবীর ভূত্বকের উপরে ভাসমান, এবং এগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, বিচ্ছিন্নতা এবং সরে যাওয়ার কারণে মহাদেশগুলো একে অপর থেকে আলাদা হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াই প্যাঞ্জিয়ার ভাঙ্গন ঘটায় এবং আজকের মহাদেশের অবস্থান তৈরি হয়।
আলফ্রেড ভেগেনার এবং মহাদেশীয় সঞ্চালন তত্ত্ব

প্যাঞ্জিয়ার অস্তিত্ব প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী আলফ্রেড ভেগেনার (Alfred Wegener), তিনি ১৯১২ সালে তাঁর “মহাদেশীয় সঞ্চালন তত্ত্ব” (Theory of Continental Drift) উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে পৃথিবীর বর্তমান মহাদেশগুলো একসময় একটি বৃহৎ ভূখণ্ডের অংশ ছিল, যা ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। ভেগেনার বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ উপস্থাপন করেছিলেন, যেমন মহাদেশগুলোর উপকূলরেখা ও জীবাশ্মের সাদৃশ্য, যা তাঁর তত্ত্বের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, তিনি দেখান যে দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার উপকূলের রেখা একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং এসব অঞ্চলে একে অপরের মতো একই ধরনের বিলুপ্ত জীবাশ্মও পাওয়া যায়।

তবে ভেগেনারের তত্ত্বটি তৎকালীন বিজ্ঞানী সমাজে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়নি, কারণ তিনি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি যে মহাদেশগুলো কীভাবে সরতে পারে। তবে তাঁর কাজটি পরবর্তীকালে পৃথিবী সম্পর্কিত গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ তা টেকটনিক প্লেট তত্ত্ব এবং আধুনিক ভূতাত্ত্বিক জ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।

১৯৬০-এর দশকে ভূকম্পন এবং সমুদ্রতল গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন পৃথিবীর ভূত্বক ৭-৮টি প্রধান টেকটনিক প্লেট দ্বারা গঠিত। এগুলোর মধ্যে অক্ষীয় গতির ফলে মহাদেশগুলো একে অপরের দিকে চলে যাচ্ছে, আবার কখনও একে অপর থেকে আলাদা হচ্ছে। এই গতির পেছনে রয়েছে ম্যান্টল কনভেকশন (Mantle Convection), স্ল্যাব পুল (Slab Pull) এবং রিজ পুশ (Ridge Push) এর মতো প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াগুলির মাধ্যমে পৃথিবীর ভূত্বক চলতে থাকে, যার ফলস্বরূপ মহাদেশগুলো তাদের স্থান পরিবর্তন করে।

প্যাঞ্জিয়ার ভাঙ্গন ও মহাদেশগুলোর বিচ্ছিন্নতা টেকটনিক প্লেট তত্ত্ব দ্বারা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, যে ভূতাত্ত্বিক শক্তি পৃথিবীর অভ্যন্তরে কাজ করে তা পৃথিবীর সারা ভূগোল পরিবর্তন করতে পারে এবং একক একটি সুপারমহাদেশ এক সময়ে ভেঙে ছোট ছোট মহাদেশে পরিণত হতে পারে।

প্যাঞ্জিয়ার ভাঙ্গন পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ুর পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যখন মহাদেশগুলো বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল, তখন পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তিত হতে শুরু করে এবং একে একে বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ পৃথকভাবে বিবর্তিত হয়। একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে জীবাশ্মের সাহায্যে প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাস এবং ভৌগোলিক পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছু জানতে সাহায্য হয়। প্যাঞ্জিয়ার বিচ্ছিন্নতা এবং মহাদেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জীববৈচিত্র্য পরিবর্তনও ঘটে — যেমন পের্মিয়ান-ট্রায়াসিক মহাবিলুপ্তি এবং পরে জুরাসিক যুগের ডাইনোসর যুগ।

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর টেকটনিক প্লেটের চলাচল অব্যাহত থাকবে এবং ২৫-৩০ কোটি বছর পর আবারও একটি নতুন সুপারমহাদেশ গঠিত হতে পারে। এ সম্ভাব্য সুপারমহাদেশের নাম প্যাঞ্জিয়া প্রোক্সিমা (Pangaea Proxima) হতে পারে, যা পৃথিবীর নতুন ভূগোল গঠন করবে। তবে এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে কীভাবে ঘটবে তা এখনো গবেষণাধীন।

প্যাঞ্জিয়া পৃথিবীর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আমাদের বর্তমান মহাদেশগুলোর অবস্থান এবং পৃথিবীর ভূগোল পরিবর্তনের কারণকে সঠিকভাবে বোঝার সুযোগ দিয়েছে। আলফ্রেড ভেগেনারের মহাদেশীয় সঞ্চালন তত্ত্ব এবং পরবর্তী টেকটনিক প্লেট তত্ত্বের আবির্ভাবের মাধ্যমে আজকের পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধারণা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়েছে। প্যাঞ্জিয়ার ভাঙ্গন ও মহাদেশগুলোর বিচ্ছিন্নতার ফলে যে পৃথিবী আমরা এখন দেখছি, তা চিরকালই পরিবর্তনশীল, আর এই পরিবর্তন একটি অবিচ্ছেদ্য প্রক্রিয়া।

শরণার্থীরা কীভাবে যে সমাজে যোগ দেয় , সে সমাজ পরিবর্তন করতে পারে ?

১৬শ শতকের শেষভাগে যখন স্পেন উত্তর আমেরিকায় তাদের উপনিবেশ বিস্তারের সংগ্রামে লিপ্ত, তখন এক নতুন সামাজিক বাস্তবতার জন্ম হতে শুরু করে — শরণার্থী সংকট। যদিও সংখ্যায় সামান্য, অথচ রাজনৈতিক দিক থেকে এরা ছিল এক অস্বস্তিকর ও স্পর্শকাতর শক্তি। ফ্লোরিডার সেন্ট অগাস্টিন ছিল স্পেনীয় ফ্লোরিডার মূল ঘাঁটি, যেখানে ১৭শ শতকের শেষ দিকে ছোট ছোট দলে শরণার্থীরা এসে পৌঁছাতে শুরু করে। শুরুর দিকে এরা ছিল প্রায় অদৃশ্য, সম্পদের দাবিতে ছিল না তেমন চাপ।

তবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে শরণার্থীরা কখনোই কেবল মানবিক সমস্যা হয়ে থাকে না; তারা অধিকতর গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন তুলে নিয়ে আসে।

শরণার্থীরা এসেছিলেন বর্তমান ফ্লোরিডা ও জর্জিয়া অঞ্চলের আপালাচি, তিমুকুয়া, চাকাটো, ইয়ামাসি, আয়িস, মায়াকা ও জোরোরো আদিবাসী জনগোষ্ঠী থেকে। প্রথমদিকে সংখ্যা ছিল স্বল্প, তবে ১৮শ শতাব্দীর শুরুতে এই প্রবাহ গতি পায়। ১৭০২-১৩ সালের আমেরিকায় ‘কুইন অ্যানের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত স্পেনীয় উত্তরাধিকারের যুদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলকে এক উত্তাল অস্থিরতার মধ্যে ফেলে। ইংরেজ, স্পেনীয় ও ফরাসি শক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ছায়ায় স্থানীয় আদিবাসী জনগণ আক্রান্ত হয়। ইংরেজদের মিত্র জাতিগুলো, বিশেষ করে ইয়ামাসি, ক্রিক ও আপালাচিকোলা — স্পেনীয় নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে দফায় দফায় আক্রমণ চালায়। ১৭০৪ সালের জানুয়ারিতে তাদের নেতৃত্বে স্পেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আপালাচিতে এক ভয়ঙ্কর হামলা হয়।

এই আক্রমণ ছিল নির্মম ও ভয়াবহ। দগ্ধ ও ছিন্নভিন্ন দেহ, নারীদের উপর নিষ্ঠুরতা ও শিশুদের হত্যা, এমন দৃশ্য স্থায়ী আতঙ্ক রোপণ করে। হাজারো আপালাচি তাদের ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ এই আপালাচি শরণার্থীরা পূর্ববর্তী শরণার্থীদের মতো স্পেনের বাইরের কেউ ছিলেন না; তারা ছিল স্পেনীয় সিংহাসনের আনুগত্যশীল প্রজাপর্যায়। অতএব তাদের প্রতি সহানুভূতি ছিল নিছক মানবিকতা নয় বরং স্পেনীয় সাম্রাজ্যের নৈতিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন। শাসক যদি নিজ প্রজাদের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে তার ভূমি-দখলের ন্যায়সঙ্গতা কোথায়?

১৭০৬ সালে স্পেনের প্রধান সামরিক ঘাঁটি ও ধর্মপ্রচারের কেন্দ্র সান লুইস, একযোগে আক্রমণে পতিত হয়। শরণার্থীদের আশ্রয়, খাদ্য কিংবা সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ স্পেনীয়রা অঞ্চলটি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। শাসনক্ষমতা দুর্বল হতে থাকে। যেসব জাতিগোষ্ঠী আগে অপরিচিত বা অপরাধপ্রবণ বলে হেয় করা হতো তাদের উপস্থিতি এতদিন পর্যন্ত উপেক্ষিত ছিল। কিন্তু যখন স্পেনীয় শাসক-শ্রেণির সদস্যরাও উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে, তখন বাস্তবতা পাল্টায়।

এই মোড় পরিবর্তনের মুহূর্তে স্পেনীয় প্রশাসনের বোধোদয় ঘটে। তারা ভাবে শরণার্থীরা কেবল বোঝা নয়, বরং সম্ভাব্য মিত্র। তাদের গ্রহণ করলে শত্রুপক্ষ দুর্বল হবে। কারণ তারা ইংরেজ বা তাদের মিত্রদের প্রতি অনুগত নয়। স্পেন বুঝে, শরণার্থীদের প্রত্যাখ্যান মানেই শত্রুর হাতে তাদের ঠেলে দেওয়া। সুতরাং তাদের অন্তর্ভুক্ত করা, সামরিক ও সামাজিক শক্তি বৃদ্ধির একটি কৌশল।

শরণার্থীদের বাস্তবিক দাবি ছিল সরল, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকা। অথচ এই সহজ চাহিদাগুলোই স্পেনীয় সাম্রাজ্যের দৃঢ়তার পরীক্ষা নেয়। সাম্রাজ্য তো কেবল ভূখণ্ডের সীমানা দিয়ে টিকে থাকে না, সে টিকে থাকে প্রজাদের আনুগত্য আর সুরক্ষার চুক্তিতে। ফ্লোরিডার ঘটনা এই প্রাচীন সত্যটি নতুন করে উন্মোচিত করে।

আধুনিক শরণার্থী সংকটের সঙ্গে সরাসরি তুলনা অনুচিত হলেও, এ ইতিহাস আমাদের বুঝিয়ে দেয় শরণার্থীর সমস্যা ও সাম্রাজ্যবাদ একসাথে গড়ে ওঠে। আদিবাসী শরণার্থীরা স্পেনীয় কর্মকর্তাদের বাধ্য করেছিল পুনর্বিবেচনা করতে, কাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, কাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে? কেবল ভূখণ্ড দখল যথেষ্ট, নাকি মানবসম্পদ দখলই আসল কর্তৃত্বের চাবিকাঠি?

শাসনক্ষমতার এই পরীক্ষা শুধু ফ্লোরিডার ক্ষুদ্র দৃশ্যপটে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল এক বৃহত্তর বৈশ্বিক সংগ্রামের প্রতিফলন। যেখানে শরণার্থীরা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধিপত্যের গল্প কখনো সাদা-কালো হয় না। বরং ছিন্নমূল মানুষরাই প্রকৃতপক্ষে দেখায় ক্ষমতার গভীর ও জটিল সংযোগগুলো কীভাবে জড়িয়ে থাকে, এমনকি যখন গোটা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে থাকে।

এটি আমাদের ভাবিয়ে তোলে — আজকের বিশ্বে, যখন নতুন নতুন শরণার্থী স্রোত জন্ম নিচ্ছে, তখন আমরা কি শরণার্থীদের দেখব বোঝা হিসেবে, নাকি সম্ভাব্য মানবিক ও রাজনৈতিক সেতু হিসেবে?

জলবায়ু সংকটে , ঝুঁকির মুখে কফির উৎপাদন

সকালের এক কাপ গরম কফি বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষের দিনের শুরুতেই এক অবিচ্ছেদ্য অভ্যাস। কিন্তু এই আরামদায়ক পানীয়টির ভবিষ্যৎ এখন আর নিশ্চিন্ত নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন কফি শিল্পের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা ও রোগবালাই কফি উৎপাদনকে বিপর্যস্ত করছে। ফলে বাজারে কফির দাম বাড়ছে, উৎপাদক দেশগুলো অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও অভ্যাসও পাল্টে যাচ্ছে।

বিশ্বের প্রধান কফি উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, কলম্বিয়া ও ইথিওপিয়া। এই দেশগুলো সাধারণত বিষুবরেখার দুই পাশে অবস্থিত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬০০–২,০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত পাহাড়ি অঞ্চলে কফি উৎপন্ন হয়। এই অঞ্চলে তুলনামূলক ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়া, নির্দিষ্ট মাত্রার বৃষ্টিপাত এবং উর্বর মাটি কফি চাষের জন্য উপযুক্ত।

কিন্তু গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১.২°C বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কফি চাষের জন্য উপযোগী অঞ্চল সংকুচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমান কফি উৎপাদনের ৫০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশেষ করে আরাবিকা (Arabica) জাতের কফি তাপ ও রোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, এটি বিশ্বব্যাপী ৬০% বাজার দখল করে আছে।

কফি গাছের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ১৮–২৩°C। কিন্তু এখন অনেক অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৩০°C ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্রাজিলে ২০২৪ সালে নজিরবিহীন খরা ও আকস্মিক তুষারপাতের ফলে আরাবিকা ফলন ৩০% কমেছে। একই সঙ্গে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া Coffee Leaf Rust নামক ছত্রাকের বিস্তার বাড়িয়েছে।

১৯৭০–এর দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় দেখা দেওয়া এই রোগ এখন আফ্রিকা ও এশিয়ায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। ছত্রাকটি গাছের পাতা নষ্ট করে, ফলে গাছ দুর্বল হয় এবং ফলন কমে যায়।

অন্যদিকে Coffee Berry Borer নামক এক ক্ষতিকর পোকাও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ২°C তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এই পোকার জীবনচক্র বছরে ১–২ বার থেকে বেড়ে ৪–৫ বার হচ্ছে।

এই উৎপাদন সংকট সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারকে প্রভাবিত করছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কফির আন্তর্জাতিক মূল্য ৪০–৪৫% পর্যন্ত বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রতি পাউন্ড আরাবিকা কফির মূল্য ২.৮০ ডলার থেকে বেড়ে ৪.১০ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—যারা বড় আমদানিকারক তাদের বাজারে কফি পানীয় ও স্পেশালটি কফির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশেও কফি শপ সংস্কৃতি ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। দেশে মূলত ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিল থেকে রোস্ট কফি ও গ্রিন বিন আমদানি করা হয়।

বর্তমানে ইন্সট্যান্ট কফি ও স্পেশালটি কফির দাম ২০–২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, উচ্চ আমদানী খরচ, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং উৎপাদক দেশের সংকটের কারণে দেশীয় বাজারে দাম বাড়তমান

বিশ্বব্যাপী গবেষকরা Heat-resistant Coffee Varieties (তাপ সহনশীল জাত) উদ্ভাবনের কাজ করছেন। ইতোমধ্যে Starmaya Hybrid এবং Centroamericano Hybrid জাতের কফি পরীক্ষামূলকভাবে চাষ হচ্ছে।

এছাড়া Agroforestry (বনভিত্তিক কৃষি) পদ্ধতি অর্থাৎ ছায়াযুক্ত পরিবেশে কফি চাষ করে উষ্ণতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের টেকসই কৃষি কৌশল কফি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

ভোক্তাদের মধ্যেও ক্লাইমেট-স্মার্ট কফি অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব উৎপাদিত কফির চাহিদা বাড়ছে। Fairtrade, Rainforest Alliance–এর মতো সংস্থাগুলো এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছে।

কফি এখন আর শুধু একটি পানীয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও পরিবেশের এক আন্তঃসংযুক্ত প্রতীক। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কফি শিল্পের সংকটকে আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলছে। শুধু কৃষি নয়, আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও ভোক্তা সংস্কৃতিও যে জলবায়ুর করুণায়, সেটাও স্পষ্ট হচ্ছে।