Home Blog Page 113

হাড় থেকে শরীরের অজানা হরমোন নেটওয়ার্ক

২০ বছরেরও আগে, চিকিৎসক এবং জেনেটিসিস্ট জেরার্ড কারসেন্টি ভেবেছিলেন তিনি হাড়ের খনিজীকরণ প্রক্রিয়ার গোপন রহস্য জানেন। এই প্রক্রিয়াটিতে ক্যালসিয়াম, ফসফেট এবং অন্যান্য খনিজগুলি প্রোটিনের একটি ম্যাট্রিক্সের সাথে সংযুক্ত হয়ে হাড়কে শক্তিশালী করে তোলে।

তখন তিনি একটি ছোট প্রোটিন লক্ষ্য করেন, নাম অস্টিওক্যালসিন। যা হাড়ের কোষ তৈরি করত এবং এটি ক্যালসিয়ামের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট ছিল। এই গুণাবলীর কারণে কারসেন্টি বিশ্বাস করেছিলেন যে অস্টিওক্যালসিন হল সেই উপাদান যার মাধ্যমে হাড়ের কোষগুলি হাড়ের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তিনি নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ল্যাবে এমন ইঁদুর তৈরি করতে শুরু করেন, যাদের অস্টিওক্যালসিন জেনেটিকভাবে অনুপস্থিত ছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন যে অস্টিওক্যালসিন ছাড়া তাদের হাড় হবে ভঙ্গুর।

কিন্তু যা ঘটল তা তার প্রত্যাশার বিপরীত ছিল। হাড়ের খনিজীকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক ছিল – অস্টিওক্যালসিন না থাকলেও এই প্রক্রিয়ায় কোনও প্রভাব পড়েনি। বরং সেই ইঁদুরগুলির হাড়ের ওজন আগের চেয়ে বেশি ছিল। ফলস্বরূপ গবেষণাটি একেবারেই বিপর্যয়ের মতো মনে হচ্ছিল।

কিন্তু তখন পোস্টডক্টরাল গবেষক হাড়গুলো পরীক্ষা করতে গিয়ে একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করলেন যখন অস্টিওক্যালসিন অনুপস্থিত ছিল, তখন হাড়ে পৌঁছানোর জন্য তাকে বেশি চর্বি টিস্যু পার করতে হচ্ছিল। এটি ছিল একটি আশ্চর্যজনক ফলাফল যা কেউই প্রত্যাশা করেনি। কিভাবে হাড়ে কিছু পরিবর্তন করলেই ইঁদুরগুলি মোটা হয়ে গেল?

কারসেন্টি প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো তারা ভুল জিন সরিয়ে ফেলেছেন। যদি তারা এমন কোনো জিন মুছে ফেলেন যা চর্বি বিপাকের জন্য জরুরি এবং অস্টিওক্যালসিন ঠিক রেখে দেন, তবে এটি চর্বি এবং স্বাভাবিক হাড়ের ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু না জেনেটিক্স সঠিক ছিল। তখন কেবল একটি উপায় ছিল এই ফলাফল ব্যাখ্যা করার, অস্টিওক্যালসিন, যা হাড়ের কোষে তৈরি হয়ে রক্তে প্রবাহিত হয় এবং তারপর চর্বি টিস্যুর দিকে চলে যায়, সেখানেই এটি চর্বির আচরণকে প্রভাবিত করে। এর মানে অস্টিওক্যালসিন আসলে একটি হরমোন, যা রক্তের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে গিয়ে শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া পরিচালনা করে।

হাড় অনেক দিন ধরেই কেবল একটি অস্থায়ী কাঠামো হিসেবে পরিচিত ছিল না – একে ধাপে ধাপে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রক্তকণিকার উৎপাদন, শরীরের ক্যালসিয়ামের ডায়নামিক রিজার্ভ এবং একটি টিস্যু যা অবিরাম ভেঙে গিয়ে নতুনভাবে তৈরি হয়।

তবে এটি যে একটি অ্যান্ডোক্রাইন অর্গানও (যে কোনও অঙ্গ যা হরমোন নির্গত করে) এবং এটি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শারীরিক ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এই ধারণাটি তখন অনেক বড় ছিল। কারসেন্টি বলেছেন, “আমাদের এটি গ্রহণ করতে ১০ বছর লেগেছিল।”

কারসেন্টি এবং অন্যরা অবশেষে নিশ্চিত করেছেন যে হাড়ও হরমোন নিঃসরণ করে যা একটি প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে হাড়কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হলো যা শারীরিক বিভিন্ন অঙ্গের সাথে একটি পরস্পরগত সিস্টেমে কাজ করে। ঐতিহ্যগতভাবে অ্যান্ডোক্রাইন সিস্টেমকে মস্তিষ্কের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি উপ-নির্দেশনা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হত।

তবে এখন এটি একটি বেশি স্বাধীন এবং আন্তঃঅঙ্গ যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে অধিকাংশ অঙ্গেরই একটি কণ্ঠ রয়েছে। শরীরের অঙ্গগুলি এখন শুধুমাত্র হরমোনের লক্ষ্য নয়, বরং তা সৃষ্টি করার মাধ্যমেও কাজ করছে।

১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে কিছু ফিজিওলজিস্ট শারীরের মধ্যে রাসায়নিক বার্তাবাহকগুলো থাকার ধারণা করতে শুরু করেছিলেন। বিখ্যাত ফরাসি ফিজিওলজিস্ট ক্লড বার্নার্ড যখন শারীরিক মিলিয়ু (internal milieu) বজায় রাখার জন্য শরীরের কীভাবে কাজ করে তার ধারণা দেন, তখন তিনি সন্নিবেশিত রসায়ন (‘internal secretions’) এর গুরুত্ব তুলে ধরেন।

১৯০২ সালের ১৬ জানুয়ারি লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে প্রথম হরমোন আবিষ্কৃত হয়। এর্নেস্ট স্টার্লিং এবং উইলিয়াম বায়লিস তাদের পরীক্ষায় দেখেছিলেন যে প্যানক্রিয়াসে আলকালাইন পাচনতরল নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণকারী কোনও স্নায়ু নয়, বরং তা একটি রাসায়নিক বার্তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।

আজকে হরমোন এবং আন্তঃঅঙ্গ যোগাযোগের ধারণা আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটি আর শুধু গ্ল্যান্ডগুলির কাজ নয়, বরং পুরো শরীরের অঙ্গগুলির একে অপরের সাথে যোগাযোগের একটি প্রসারিত নেটওয়ার্কের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার আমরা বুঝতে পারছি, হরমোনের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ একে অপরকে সংকেত পাঠাচ্ছে, এবং এই সংকেতের ভিত্তিতে শরীরের সমস্ত অঙ্গ সমন্বিতভাবে কাজ করে।

পরবর্তীকালে এই ধারণা আরো সমৃদ্ধ হয় যখন ১৯৯০ এর দশকে গবেষকরা দেখেন যে চর্বির টিস্যু থেকে নিঃসৃত লেপটিন নামক হরমোনও শরীরের অন্যান্য কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে হাড়ও সেই নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তার পর, কারসেন্টির দল জানায় যে, অস্টিওক্যালসিন হরমোন পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শেষমেষ ২০১১ সালে কারসেন্টির দল তাদের একটি গবেষণায় দেখায় যে, অস্টিওক্যালসিন শুধুমাত্র হাড়ের স্বাস্থ্য নয়, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং আচরণও প্রভাবিত করে। মস্তিষ্কে অস্টিওক্যালসিনের প্রভাবের কারণে ইঁদুরগুলির মেমরি এবং মানসিক অবস্থা অত্যন্ত পরিবর্তিত ছিল।

এই সবই প্রমাণ করে যে, হাড়, চর্বি, মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গগুলির মধ্যে একটি পরস্পরজাত সম্পর্ক রয়েছে, যা একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরের সামগ্রিক কার্যক্রমে অবদান রাখে। এখন শরীরের হরমোনীয় যোগাযোগের ব্যাপ্তি এবং গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে। ২০ শতকের শুরুতে যেখানে এটি কেবল একটি সীমিত ধারণা ছিল, এখন এটি একটি বিস্তৃত এবং মৌলিক সিস্টেম হয়ে উঠেছে যা শরীরের প্রতিটি অঙ্গের মধ্যে সম্পর্কের নতুন মাত্রা যোগ করছে।

গণ-অভ্যুত্থান যে জনআশা জাগিয়েছিল , তাতে চির ধরছে : শুভ কিবরিয়া , সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

“… ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের পরে রাষ্ট্র নিয়ে মানুষের মনে নতুন আকাঙ্ক্ষা জেগেছে। মানুষ ভেবেছে সংস্কার যতটুকুই হোক আর যেভাবেই হোক, রাষ্ট্রকে হতে হবে জবাবদিহিমূলক ও যথাসম্ভব দুর্নীতিমুক্ত। এই যাত্রায় নানারকম চিড় ধরছে। কী অন্তর্বর্তী সরকার, কী ‘সংস্কারপন্থী’ দল, কী পুরোনো রাজনৈতিক দল—কেউই আর শক্তিমান ভরসা হয়ে উঠছে না।

আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে কোনো সংস্কারই আলোর মুখ দেখবে না, টেকসইও হবে না। ফলে, সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের চেয়ে যেকোনো মূল্যে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার যে তড়িঘড়ি আকাঙ্ক্ষা সেটা যত উন্মোচন হচ্ছে, ততই সংস্কার সম্ভাবনা জনমনে ম্রিয়মাণ হয়ে উঠছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র, সরকার ও গণতন্ত্র নিয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে যে নৈতিক জাগরণ দেখা গিয়েছিল, তা জনমনে প্রশংসিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের মাঠে অনুপস্থিতির কারণে বিএনপি দ্রুত সারাদেশের রাজনৈতিক শূন্যস্থান যতই পূর্ণ করতে থাকে, ততই সেই প্রশংসা ফিকে হতে থাকে।

অবারিত রাজনৈতিক সুযোগে বিএনপির অনেক কর্মী দখলদারি ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। বহিষ্কার করেও এ সমস্যা কমানো যায়নি। স্থানীয় জনগণের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। এবং তারা এর মধ্যে দিয়ে পুরোনো দিনের রাজনীতি ফিরে আসার ইঙ্গিত পাচ্ছে।

সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে অনেক বিতর্ক ও পক্ষ-বিপক্ষ দেখা যাচ্ছে।…কিন্তু সংবিধান যাদের হাতে কার্যকর হবে, সেই রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা নিয়ে আলোচনা তেমন হচ্ছে না।

আমাদের সব বড় দলের অভ্যন্তরীণ গঠনতন্ত্রে দলীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে আছে দলপ্রধানের হাতে। ফলে পরিবারতন্ত্র এবং কর্তৃত্ববাদ দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে যতটা সোচ্চার, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার বিষয়ে সংস্কার প্রশ্নে ততটাই নীরব।

আওয়ামী লীগ কীভাবে রাজনীতিতে ফিরবে অথবা শাস্তি পাবে—সে বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক ঐকমত্য নাই। এনসিপি চায় দলটি নিষিদ্ধ হোক। এ বিষয়ে বিএনপির যুক্তি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ বা আদালত, এর ফলাফল যা-ই হোক। অন্যদের অবস্থাও খুব সুস্পষ্ট নয়।

… ছাত্র-তরুণদের উদ্যোগে সরকার ও রাজনৈতিক দল গঠন—অনেকের মধ্যেই পরিবর্তনের সম্ভাবনার উৎসাহ তৈরি করেছিল। রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতিতে তারা ইতিবাচক কিছু করবেন—এমন আশাও জোরেশোরে করা হয়েছিল।

তবে সরকারি পদ এবং দলের দায়িত্বে থাকা কারও কারও কর্মকাণ্ডে সেই প্রত্যাশা দিনকে দিন কমছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে এই তরুণদের কারও কারও বিরুদ্ধে।

… ফলে গণ-অভ্যুত্থান যে জনআশা জাগিয়েছিল তাতে চিড় ধরছে।

… আমাদের প্রধানতম রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তা ও রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে নতুন মডেল নাই। বরং তারা চিরাচরিত পুরোনো মডেলেই চলতে চাইছে। অথচ বদলে গেছে বহু কিছু। দেশের রাজনীতিতে গণ-অভ্যুত্থান তো বটেই, ঘটে গেছে গণহত্যা।

এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে যে নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে, সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিন্তার সঙ্গে বয়স্ক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চিন্তার ফারাকই শুধু নয়, চিন্তার সংঘর্ষও বিদ্যমান। ফলে রাজনীতির পুরোনো মডেল আগামী দিনে প্রায় সাড়ে চার কোটি নতুন ভোটারের মনকে জয় করবে, না ভয় পাবে—সেটাও একটা প্রশ্ন। …”


নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ , পাক-ভারত উত্তেজনা কাজে লাগিয়ে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা : পাকিস্তানী সেনাপ্রধান

“পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সাধারণত দৃশ্যপটের আড়ালে থেকে কাজ করতে পছন্দ করেন। তবে কাশ্মীরকে ঘিরে ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এখন তিনিই পাকিস্তানের কণ্ঠস্বর হয়ে কঠোর ভাষায় বার্তা দিচ্ছেন।

… ভারত ও পাকিস্তানে জেনারেল মুনিরের বক্তব্যকে দেখা হচ্ছে তাঁর শক্ত অবস্থান প্রকাশ এবং জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা হিসেবে। এমন সময়ে তিনি জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন, যখন কিনা পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত।

এমনকি এসব সংকটের কারণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রতি দেশটির জনগণের দীর্ঘদিনের অটুট আনুগত্যে চিড় ধরেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বহুদিন ধরেই পর্দার আড়ালে থেকে দেশটির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তবে জেনারেল মুনিরের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়াকে কেবলই একটি রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে হচ্ছে না, এর চেয়ে বেশি কিছু এখানে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি ভারতের বিষয়ে কট্টর মনোভাব পোষণ করেন।

পাকিস্তানের দুই শীর্ষ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, তার ভিত্তিতে বিশ্লেষকেরা এমন মত দিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের কারণটা মূলত ধর্মীয়।

পেহেলগামে হামলা হওয়ার ছয় দিন আগে জেনারেল মুনির…ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে প্রবাসী পাকিস্তানিদের সামনে বক্তৃতাকালে কাশ্মীরকে দেশের ‘প্রাণশিরা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

… আসিম মুনিরের এই মন্তব্যকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উসকানিমূলক উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। কাশ্মীরকে ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা।

বর্তমান সংকট আরও বাড়বে নাকি তা থামার পথ তৈরি হবে, তা অনেকাংশে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর নির্ভর করছে।…তবে এ ক্ষেত্রে কূটনীতি খুব একটা কাজে না-ও লাগতে পারে।

কারণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করেন। তিনি নিজ দেশের এবং পাকিস্তানের মুসলিমদের হুমকি হিসেবে দেখেন।

… পেহেলগামে হামলার পর জেনারেল মুনির একেবারে স্পষ্টভাবে মতাদর্শিক ভাষায় কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

… অতীতে দেখা গেছে, ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জেনারেলরা প্রায়ই এই (দ্বি-জাতি) তত্ত্বকে সামনে এনেছেন। আবার কূটনৈতিক সমঝোতার সুযোগ আসামাত্রই তাঁরা সুর নরম করেছেন।

তবে এবার জেনারেল মুনির এই তত্ত্বকে যেভাবে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছেন এবং আরও যেসব আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন, তার মধ্যে পাকিস্তানের নীতিতে মোড় পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে ভারতীয়দের অনেকে।

… ২০১৯ সালে…জেনারেল আসিম মুনিরকে পাকিস্তানের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান পদে থেকে সরিয়ে দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পরবর্তী সময়ে ইমরান খান জেনারেল মুনিরকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন। আর তখন থেকেই তাঁদের দুজনের সম্পর্ক বৈরী হয়ে ওঠে।

সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পর ইমরান খান ২০২২ সালের এপ্রিলে ক্ষমতা হারান। সাত মাস পর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব নেন জেনারেল মুনির।

… যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হোসাইন হাক্কানি বলেন, জেনারেল মুনির গভীরভাবে ধর্মচর্চায় নিবিষ্ট—আর এটাই ভারত সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।

হাক্কানির মতে, আসিম মুনিরের কাছ থেকে সর্বোচ্চ যা আশা করা যায়, তা হলো তিনি উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজবেন। তবে সে ক্ষেত্রেও নিজের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে যাবেন।

এসবের মধ্য দিয়ে জেনারেল মুনির যেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অনেক বেশি ইসলামীকরণের চেষ্টা করছেন, যেমনটা সামরিক শাসক জেনারেল মোহাম্মদ জিয়াউল হক ১৯৮০-এর দশকে করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে জিয়াউল হক আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে জিহাদিদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়েছিলেন।

সমালোচকদের মতে, পাকিস্তানের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার ওপর ক্রমাগত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন আসিম মুনির। সেই সঙ্গে ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করছেন।

… ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেশ হস্তক্ষেপ করছে বলে মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি প্রচেষ্টা বা আলোচনা যেন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকে, তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের গোয়েন্দাপ্রধানকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এ পদটি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক মানুষদের জন্য বরাদ্দ ছিল।

এই মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে আছে। আক্রমণাত্মক বার্তা ও হুঁশিয়ারি এখন দুই পক্ষের মধ্যকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে হিসাবনিকাশে ভুল হওয়ার ঝুঁকিটা প্রকট। …”

সব খাতে ন্যায়সঙ্গত উত্তরণে , ঐক্যবদ্ধ প্রতিশ্রুতির আহ্বান : রিজওয়ানা হাসান , পরিবেশ , বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সায়েদা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, “টেকসই উন্নয়ন” শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হলেও এর প্রকৃত সংজ্ঞা ও মানদণ্ড প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে, যার ফলে গ্রীনওয়াশিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হয় যা ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত না করে বরং বিভ্রান্তি ছড়ায়।

আজ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) আয়োজিত “বাংলাদেশ জাস্ট ট্রানজিশন অ্যাকাডেমি: একটি সবুজ অর্থনীতিতে সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ” শীর্ষক সেশনে তিনি এ কথা বলেন।

রিজওয়ানা হাসান বলেন, “বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমাদের অনুসৃত মানদণ্ডও যুগোপযোগী হতে হবে। শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, প্রত্যেকটি খাত বস্ত্র, কৃষি, উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও মানদণ্ড থাকা উচিত, যাতে দেশ এককভাবে নয়, সমগ্র জাতি একসাথে এগিয়ে যেতে পারে।”

তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, বেসরকারি খাত বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে টেকসই পথে যাত্রা শুরু করলেও, এটি এখনও খণ্ডিত এবং আনুষ্ঠানিক নয়। “আমরা এখনো সম্মিলিতভাবে নির্ধারণ করতে পারিনি কী গ্রহণ করবো, আর কী প্রত্যাখ্যান করবো।”

পরিবেশ আন্দোলনে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন। “যখন আমরা পোড়া ইট শিল্পকে চ্যালেঞ্জ করি, তখন জিগজ্যাগ কিলনকে টেকসই সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ সেগুলোও বায়ু দূষণ করে, কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি সরিয়ে নেয় এবং পাহাড় কেটে পরিবেশ নষ্ট করে। চিমনির উচ্চতা বাড়ানো হয় আরেকটি সমাধান হিসেবে, যা কেবল অস্থায়ী প্যাঁচাল মাত্র।”

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ৩২টি দেশ পোড়া ইট পুরোপুরি বন্ধ করেছে। “বাংলাদেশকেও বায়ু, মাটি ও শ্রমশক্তিকে সুরক্ষা দেয়—এমন পূর্ণ বিকল্পে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।”

রিজওয়ানা হাসান খাতভিত্তিক সমস্যাগুলোকে পাশ কাটানোর প্রবণতার সমালোচনা করে বলেন, “শ্রম শোষণ থেকে শুরু করে পানির অপচয় পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই সমাধান আসে বেসরকারি খাত থেকে, কিন্তু সেগুলো বৃহত্তর পরিসরে ছড়ায় না। আমাদের কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।”
তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় প্রচেষ্টায় দিকনির্দেশনা দিতে এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে পরিবেশগত মূল্যবোধ তাদের মূল দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।

“পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) কাজকে অনেকেই প্রকল্প অনুমোদনের দপ্তর বলে ধরে নেয়। যখন আমরা পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় কোনো প্রকল্পে ‘না’ বলি, তখন আমাদের উন্নয়নের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা বদলাতে হবে,” বলেন তিনি।

রিজওয়ানা হাসান জোর দিয়ে বলেন স্থানীয় সরকার, পরিবহন, জ্বালানিসহ সব দপ্তরকে টেকসই উন্নয়নের প্রতি ঐক্যবদ্ধ প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। “ভবনের সবুজ সার্টিফিকেশন অর্থহীন যদি আমরা লিঙ্গ সংবেদনশীলতা, শ্রমিক কল্যাণ, পানি পুনর্ব্যবহার ও শক্তি দক্ষতা উপেক্ষা করি। এখনও সকাল ১০টাও হয়নি, অথচ এই কক্ষে প্রচুর কৃত্রিম আলো জ্বলছে। যথাযথ নকশা থাকলে এটি দরকার হতো না।”

তিনি বলেন, “আমরা সরকারকে লোডশেডিং বন্ধের চাপ দিই, অথচ আমরাই আমদানিকৃত শক্তি অপচয় করি। এটি শুধু নীতির বিষয় নয়—এটি মূল্যবোধ আভ্যন্তরীণ করার প্রশ্ন।”

শেষে রিজওয়ানা হাসান আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজ একযোগে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং জাতীয় নীতিনির্ধারণে দীর্ঘস্থায়ী টেকসই চর্চা নিশ্চিত করবে। “এটি শুধু একটি সরকারের কাজ নয় ভবিষ্যতের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার তৈরির প্রশ্ন,” বলেন তিনি।

তিনি পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই উত্তরণের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

৫ বছরে কৃষিজমি কমেছে ২% – চালের উৎপাদন বৃদ্ধি , জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে কমে গেছে

দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে বাড়ছে না খাদ্যশস্যের উৎপাদন। কৃষিজমি হ্রাস, উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের অভাব, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং সে অনুপাতে কৃষক আয় করতে না পারাসহ নানা কারণ কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। আর তাতে গত কয়েক বছর দেশের কৃষি খাত এক প্রকার অচলায়তনে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বড় ধাক্কা লাগতে পারে দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনায়।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ধানের আবাদ হয়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদকৃত জমি ১ কোটি ১৪ লাখ হেক্টরে নেমে আসে। অর্থাৎ সর্বশেষ ৫ বছরে আবাদকৃত জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ২%।

এর বিপরীতে ৫ বছরে হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে কেবল ৪%। আর চাল উৎপাদন মাত্র ২% বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের দুই-তিন ফসলি জমি নানাভাবে অকৃষিকাজে ব্যবহার হচ্ছে। অথচ আইনে কৃষিজমিকে অন্য কাজে ব্যবহারের সুযোগ নেই। কিন্তু সে আইনের কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

আর কৃষকের ন্যায্যমূল্যও বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। সরকারকে উদ্যোগী হয়ে মূল্যসহায়তা দিতে হবে। কেননা সিন্ডিকেটের সঙ্গে কৃষক পেরে ওঠেন না। এতে পরের বছর একই পণ্য উৎপাদনের উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন তারা।

দেশে কৃষি উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। তাতে উঠে আসে, কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় ৭ বছরে দেশে কৃষির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩%। একই সময়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম বেড়েছে ১.৩১%। ফলে কৃষি খাতে মুনাফা কমেছে।

এছাড়া ২০১১-২০ সালের মধ্যে মাটির অবক্ষয় এবং অযাচিত কৃষি পদ্ধতির কারণে জমির উর্বরতা ০.৪৪% কমেছে বলে বিআইডিএসের অন্য এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

এদিকে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের নিচে নেমে এসেছে চালের উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে বার্ষিক জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার (আরএনআই) ছিল ১.৩৩%। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, গত ৩ অর্থবছরে দেশে চালের উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১%-এর নিচে।

চালের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি এ মাত্রায় শ্লথ হয়ে আসার পেছনে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ধানের কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়াকে। এ কারণে কৃষক অন্য ফসলে ঝুঁকছেন। অনেকে আবার কৃষিই ছেড়ে দিচ্ছেন।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বে – ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু’র মৃত্যু

১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট জাপানের তাইহোকু (বর্তমান তাইপেই, তাইওয়ান) বিমানবন্দরে এক জাপানি বোমারু বিমান রানওয়ে থেকে আকাশে উড়লো।গন্তব্য ছিল সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড মাঞ্চুরিয়া। সেই বিমানে ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

প্রচলিত ইতিহাস বলে বিমানটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই ইঞ্জিন বিকল হয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। আগুনে পুড়ে সুভাষচন্দ্র গুরুতর আহত হন এবং রাতেই তাইহোকু সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর দেহ সৎকার করা হয় জাপানের রেনকোজি মন্দিরে।

কিন্তু এই অফিসিয়াল কাহিনি কি নিখুঁত সত্য? নাকি এটি একটি সুচিন্তিত মোড়ক, যেটির আড়ালে রাজনৈতিক গোপন খেলা লুকিয়ে ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা প্রবেশ করি ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও রহস্যাবৃত অধ্যায়ে— “নেতাজির মৃত্যু রহস্য”।

প্রথমত দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা খুবই কম। যারা ছিলেন তাদের বর্ণনা পরস্পরবিরোধী। জনৈক হাবিবুর রহমান এবং জাপানি কর্মকর্তা লিয়েইসো তাচিবানা বলেছিলেন, বিমানবন্দরে আগুন লাগার পর সুভাষচন্দ্র দগ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু চিকিৎসার সময় তিনি সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন এবং মৃত্যুর আগে “India is free” বলেছিলেন। কিন্তু মেডিকেল রিপোর্ট এবং মরদেহের ছবি কখনও প্রকাশ্যে আসেনি। এমনকি তাইহোকু হাসপাতালের মৃত্যুর নথিপত্রও রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়। এই তথ্য-অসামঞ্জস্য থেকেই জন্ম নেয় প্রথম সন্দেহ।

১৯৫৬ সালে ভারতের শাহনাওয়াজ কমিশন এবং ১৯৭০ সালে খোসলা কমিশনের তদন্তও নিশ্চিত প্রমাণ খুঁজে পায়নি। বরং রাশিয়া-পন্থী বিশ্লেষক ও সাংবাদিক অনুজ ধরসহ অনেক গবেষক বলেন, নেতাজি আসলে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে আশ্রয় নেন।

এর পেছনে তাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে সুভাষচন্দ্র জাপান ও জার্মানির মিত্র হয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন করে তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য সামরিক পথ বেছে নিয়েছিলেন। যুদ্ধশেষে তিনি বুঝতে পারেন, জাপানের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। ফলে পরবর্তী কৌশল হিসেবে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য নিতে চেয়েছিলেন। জানা যায় সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা এনকেভিডি (পরবর্তী কেজিবি) এর সাথে তার যোগাযোগ ছিল। অনেকে মনে করেন, নেতাজি বিমানপথে মাঞ্চুরিয়া পাড়ি দিয়ে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পৌঁছান এবং সেখান থেকে তাকে রাশিয়ায় আশ্রয় দেওয়া হয়।

১৯৯৫ সালে রাশিয়ার জাতীয় আর্কাইভ এবং সোভিয়েত যুগের কিছু নথিপত্রে নেতাজির সম্ভাব্য উপস্থিতির ইঙ্গিত মেলে। তবে ভারতীয় সরকার বারবার রাশিয়া থেকে তথ্য আনতে গড়িমসি করেছে। এই গোপনীয়তাও সন্দেহ বাড়ায়।

কেন লুকিয়ে থাকতে চাইবেন? এখানেই আসে রাজনৈতিক প্রশ্ন। ১৯৪৫-৪৭ সময়কাল ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। যদি প্রমাণিত হতো যে নেতাজি জীবিত আছেন এবং তিনি সোভিয়েতপন্থী (এবং কমিউনিস্ট শক্তি সমর্থিত), তাহলে ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর ক্ষমতার ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে পাল্টে যেতো। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর নেতৃ্ত্বাধীন কংগ্রেস কোনোভাবেই চাননি এই পরিস্থিতি। নেতাজির উপস্থিতি ব্রিটিশ প্রশাসন এবং ভবিষ্যৎ ভারতীয় নেতৃত্ব, উভয়ের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতো।

সুতরাং তত্ত্ব অনুসারে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের তৎকালীন নেতৃত্বের সমঝোতায় নেতাজি সারা জীবনের জন্য অন্তরালে থাকতে রাজি হন। ১৯৮৫ সালে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে মারা যান এক রহস্যময় সাধু, যিনি “গুমনামী বাবা” নামে পরিচিত ছিলেন। তার কক্ষে উদ্ধার হয় বহু ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, যার মধ্যে অনেকেই তাকে “নেতাজি” বলে সম্বোধন করেছেন। তার সংগ্রহে ছিল আজাদ হিন্দ বাহিনীর নথি, সুভাষচন্দ্রের পারিবারিক ছবি এবং রাশিয়ার পত্রিকা। যদিও ডিএনএ পরীক্ষা নিশ্চিত প্রমাণ দেয়নি, অনেক গবেষক মনে করেন, গুমনামী বাবাই আসলে অন্তরালে থাকা সুভাষচন্দ্র বসু।

ভারত সরকার ২০১৬ সালে নেতাজি-সংক্রান্ত ৩০০টির বেশি গোপন ফাইল প্রকাশ করে। তাতে মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, “নেতাজির মৃত্যু রহস্য থেকে মুক্তি প্রয়োজন”। এখনও পর্যন্ত নেতাজির মৃত্যু নিয়ে কোন নির্ভরযোগ্য একক সূত্রের প্রমাণ নেই। সুভাষচন্দ্র বসুর মতো এক বিপ্লবীর মৃত্যু এতটা অস্পষ্ট থেকে যাওয়া নিঃসন্দেহে রহস্যজনক। হয়তো সত্যি তিনি সোভিয়েত আশ্রয়ে বেঁচে ছিলেন। হয়তো সত্যি বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন। কিন্তু একথা নিশ্চিত, ইতিহাসের পাতায় নেতাজির শেষ অধ্যায় যতদিন অস্পষ্ট থাকবে, ততদিন এই রহস্য ভারতের রাজনৈতিক ও জনমানসে অমর থাকবে।

স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে সুস্থ রাখুন চোখ

চোখের স্বাস্থ্য শুধু বাহ্যিক যত্নে নয়, পুষ্টির মাধ্যমেও গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। বিশেষ কিছু পুষ্টি উপাদান রয়েছে যেগুলো চোখের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং চোখের বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

ভিটামিন A:

ভিটামিন A চোখের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এটি রেটিনার ‘রড’ এবং ‘কোন’ কোষের কার্যকারিতা বজায় রাখে, যা আলো গ্রহণে সহায়তা করে এবং দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে। ভিটামিন A-এর অভাব রত্ন মস্তিষ্কে অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। ভিটামিন A-এর অভাব হলে রাতে দৃষ্টি কমে যেতে পারে (নাইট ব্লাইন্ডনেস)। গাজর, মিষ্টি আলু, পালংশাক, এবং ডিমে এটি পাওয়া যায়।

ভিটামিন C:

ভিটামিন C একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা চোখের টিস্যুগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। এটি ক্যাটার্যাক্ট এবং ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (AMD) এর মতো চোখের রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন C-এর অভাব হলে চোখের কোষগুলো সুরক্ষিত থাকতে পারে না, যা দৃষ্টিশক্তি খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়। কমলা, স্ট্রবেরি, কিউই, এবং ব্রকলি এই ভিটামিনের ভাল উৎস।

ভিটামিন E:

ভিটামিন E অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা চোখের কোষে ক্ষতিকর মুক্ত র‌্যাডিকেলগুলোকে নিরোধ করে। এটি চোখের বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদী চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। এটি ক্যাটার্যাক্ট এবং গ্লকোমার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। বাদাম, সীডস, এবং সাদা শসা ভিটামিন E-এর ভালো উৎস।

জিংক (Zinc):

জিংক চোখের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। এটি রেটিনার মধ্যে ভিটামিন A কে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে সাহায্য করে, যা রাতের দৃষ্টি উন্নত করতে সহায়তা করে। জিংকের অভাব হলে ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (AMD) ও রেটিনাল ডিজেনারেশন হতে পারে। সাদা মাংস, মিষ্টি আলু, শিম, ডিম, এবং সামুদ্রিক খাবারে এটি পাওয়া যায়।

অমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড:

অমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড চোখের সুস্থতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি চোখের শুকনো সমস্যা কমাতে সাহায্য করে এবং চোখের টিস্যুগুলির আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় স্ক্রীন ব্যবহার করার পর চোখের শুষ্কতা বা ব্যথা অনুভূতি অনেকেরই হয়। অমেগা-৩ এই সমস্যা দূর করতে কার্যকরী হতে পারে। স্যামন, ম্যাকারেল, স্যাডিন, এবং চিয়া সিডে এটি পাওয়া যায়।

লুটেইন এবং জেক্সানথিন:

লুটেইন এবং জেক্সানথিন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা চোখের ক্ষতিকর রশ্মি এবং আলো থেকে চোখকে সুরক্ষা দেয়। এটি ম্যাকুলার ডিজেনারেশন এবং ক্যাটার্যাক্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। এই দুটি উপাদান মূলত পালংশাক, মরিচ এবং ক্যাপসিকাম-এ পাওয়া যায়।

ক্যাস্টর অয়েল এবং চোখের শুষ্কতা:

চোখের শুষ্কতা (Dry Eye Syndrome) একটি সাধারণ সমস্যা, বিশেষ করে যারা কম্পিউটার বা মোবাইল স্ক্রীনে অনেক সময় ব্যয় করেন। ক্যাস্টর অয়েল চোখের শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করে, কারণ এটি চোখের পৃষ্ঠে একটি শীতল, আর্দ্র প্রলেপ তৈরি করে। এতে চোখের আর্দ্রতা বজায় থাকে।

বয়সজনিত চোখের সমস্যা:

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে কিছু সমস্যা দেখা দেয়, যেমন – ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (AMD), ক্যাটার্যাক্ট, এবং প্রেসবাইওপিয়া (বয়সজনিত দৃষ্টির সমস্যা)। এই সমস্যাগুলির জন্য পুষ্টি উপাদান বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ম্যাকুলার ডিজেনারেশনে লুটেইন এবং জেক্সানথিন সহায়তা করে, এবং ক্যাটার্যাক্টে ভিটামিন C ও ভিটামিন E গুরুত্বপূর্ণ। চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পুষ্টিকর খাদ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে চোখের নানা সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত পুষ্টি ও অভ্যাসের মাধ্যমে চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেতে পারে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টিশক্তি সুস্থ থাকে।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন , বাণিজ্যযুদ্ধে চীনের ‘গোপন অস্ত্র’

যুক্তরাষ্ট্রের ১৪৫ শতাংশ শুল্কের চাপে হিমশিম খাচ্ছে চীনের রপ্তানি খাত। এতে দেশটিতে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাশের মতে, প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ চীনা কর্মী যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। আবার নোমুরা ব্যাংক বলছে, যদি এই ‘শক’ চলতে থাকে তাহলে স্বল্পমেয়াদে ৫৭ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদে ১ কোটি ৫৮ লাখ কর্মী চাকরি হারাতে পারেন। চীনের নেতারা এরই মধ্যে ক্ষতি কমানোর জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছেন। গত ২৫ এপ্রিল পলিটব্যুরোর এক বৈঠকে তারা শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেকারত্ব বিমার অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে, দেশটির জন্য এই সংকটের আরেকটি সম্ভাব্য সমাধান হলো বৃহৎ ‘গিগ অর্থনীতি’। ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ চীনের এই খাতে ব্যাপক রূপান্তর ঘটাতে পারে।

গিগ অর্থনীতি হলো এমন একটি শ্রমবাজার, যেখানে অস্থায়ী, স্বল্পমেয়াদি, চুক্তিভিত্তিক বা ফ্রিল্যান্স কাজে যুক্ত শ্রমিকরা কাজ করে থাকেন এবং এই কাজগুলো সাধারণত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাওয়া যায়। চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন জানিয়েছে, নতুন ধরনের কর্মসংস্থানে ৮ কোটি ৪০ লাখ মানুষ জড়িত, যার মধ্যে ডেলিভারি সেবা এবং রাইড হেলিং অন্তর্ভুক্ত। সরকার আরও একটি বড় পরিসংখ্যান উল্লেখ করেছে, ২০ কোটি ‘ফ্লেক্সিবল কর্মী’ আছেন, যারা স্বতন্ত্রভাবে বা আংশিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন।এর মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ মানুষ শহরের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত, যা ৭৩ কোটি ৪০ লাখ কর্মশক্তির মধ্যে একটি বড় অংশ।

মেইটুয়ান নামে একটি ডেলিভারি কোম্পানির ৭৫ লাখ কুরিয়ার রয়েছে, যারা প্রতি বছর ১ হাজার ১০০ কোটি মাকিন ডলার উপার্জন করেন। কর্মীরা তাদের কঠোর কাজকে ‘গুওডু’ (একটি অন্তর্বর্তী কাজ) হিসেবে বর্ণনা করেন। এই গিগ অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং মেইটুয়ানের কর্মী সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোম্পানিটি ভবিষ্যতে খাদ্য ও শপিং ডেলিভারির ব্যবসায় যথেষ্ট বৃদ্ধির আশা করছে। ২০২৩ সালে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এসব কোম্পানির কর্মসংস্থান এবং চাহিদায় ‘বৃদ্ধি’ নিয়ে প্রশংসা করেছেন। এখন, সরকার গিগ অর্থনীতিকে অর্থনীতির জন্য একটি নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত করতে কাজ করছে।

তাদের জন্য সহায়ক হিসেবে, গিগ অর্থনীতি কোম্পানিগুলোকে একটি ছায়া কল্যাণ ব্যবস্থা গঠন করতে উৎসাহিত করছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জেডি ডটকম তার চালকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা প্রস্তাব করেছে। মেইটুয়ান ঘোষণা করেছে, তারা ২০২৫ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে তাদের কুরিয়ারদের জন্য ধীরে ধীরে সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করবে। তবে, প্রশ্ন উঠছে—এসব সুবিধা কীভাবে অর্থায়ন হবে। কিছু চালক এই উদ্যোগ সম্পর্কে সন্দিহান এবং তারা মনে করেন, এই সুবিধাগুলোর খরচ তাদের পকেট থেকেই আসবে। দক্ষিণ চীনের কুয়ানঝো শহরে, যেখানে মেইটুয়ান তাদের পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করেছে, ৩০ বছর বয়সী এক চালক বলেন, আমরা যখন বৃদ্ধ হব, তখন শ্রমশক্তি আরও কম হবে এবং পেনশনের অর্থ আমাদের প্রজন্মকে সাহায্য করতে পারবে না।

এছাড়া, প্রযুক্তি উন্নয়নও গিগ অর্থনীতির কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি হতে পারে। মেইটুয়ান স্বয়ংক্রিয় যানবাহন এবং ড্রোনের মাধ্যমে ডেলিভারি পরীক্ষামূলকভাবে চালাচ্ছে। এগুলো যথাক্রমে ৪৯ লাখ এবং ১৪ লাখ ৫০ হাজার ডেলিভারি সম্পন্ন করেছে।

এটি দেখিয়ে দেয়, বাণিজ্যযুদ্ধ চীনের শাসকদের অভিযোজন করতে বাধ্য করছে। উচ্চ-প্রযুক্তির কর্মীদের নিয়ে আধুনিক শ্রমশক্তির স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তাদের হাতে এখন কম-প্রযুক্তির বিশাল বাহিনীও আছে।

চীনে কেন নতুন সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়েছে : ফ্রান্সেসকো সিসি , ইতালীয় লেখক

“ষাট বছর আগে চীনে যেভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়েছিল, তা ছিল বিশৃঙ্খল, সহিংস ও অগোছালো। কিন্তু এবার চীন সংস্কৃতিগত পরিবর্তনের যে উদ্যোগটি নিয়েছে, তা অনেক বেশি পরিকল্পিত, গোছানো এবং শক্ত অবস্থান থেকে পরিচালিত হচ্ছে।

চীন এখন দেশের ভেতরে পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজস্ব সংস্কৃতিকে জোরদার করছে। অনেকের মতে, এটি এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। চীন হয়তো দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজের মতো করে টিকে থাকার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘চীন একটি নতুন একাডেমিক শাখা চালু করেছে। এর উদ্দেশ্য জাতিগত গবেষণায় পশ্চিমা পক্ষপাত দূর করা এবং একক জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের বয়ানকে মজবুত করা।’

চীনের জাতীয় জাতিগত-বিষয়ক কমিশনের পরিচালক পান ইউয়ে বলেছেন, ‘চীনের জাদুঘরগুলোর উচিত সব ধরনের ভুল ইতিহাসভিত্তিক ধারণার বিরোধিতা করা। বিশেষ করে হান ও অ-হান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ তৈরির যেকোনো চেষ্টা রুখে দেওয়া।’

পান ইউয়ে পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযানেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাই এই উদ্যোগকে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর লক্ষ্য হচ্ছে—জাতীয় ঐক্য মজবুত করা, জাতিগত বিভাজন কমিয়ে আনা এবং ধীরে ধীরে বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাব দূর করা।

… বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এখনো চীনকে পশ্চিমা ঘরানার ভাষা ও চিন্তা ব্যবহার করতে হয়। কারণ, বিশ্ব তো এখনো ‘চীনকেন্দ্রিক’ ভাবনায় অভ্যস্ত নয়।

পাঁচ শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক কাঠামোকে সরিয়ে দিতে চাইলে সময় লাগবে। আর যদি আমেরিকা পিছিয়ে পড়ে এবং চীন সেই শূন্যতা পূরণ করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই পশ্চিমা ভাবভাষায় কথা বলতে জানতে হবে। তা না হলে তাদের কেউ বুঝবে না। চীনও অন্যদের বুঝতে পারবে না।

… চীন এখন সংস্কৃতিকে পুনর্বিন্যাস করছে, নতুন ক্যাটাগরিতে সাজাচ্ছে। তারা তা করতে চাইছে সংঘাতের বদলে সামগ্রিক সমাধানমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তারা মনে করে, গোটা বিশ্বব্যবস্থারই পুনর্গঠন দরকার। এর মানে এই নয় যে সমাধানটা নিখুঁত হবে। কিন্তু সমস্যার অস্তিত্ব যে প্রকট, তা অস্বীকার করা যাবে না।

প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রও কি তার মাদক সমস্যা বা বাণিজ্য দ্বন্দ্বের মতো অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো মোকাবিলায় এমন কোনো সামগ্রিক ভাবনা ভাবছে? নাকি কেবল বাইরের দিকেই শত্রু খুঁজে বেড়াচ্ছে? এই সংকটগুলো চীনকে ঘিরে হলেও সেগুলোর সমাধান কেবল চীন দিয়ে হবে না।”


পৃথিবীর মহাসাগর এক সময় সবুজ ছিল এবং আবারও রঙ বদলে যেতে পারে

পৃথিবীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অংশ মহাসাগরের দ্বারা আচ্ছাদিত, যার জন্য মহাকাশ থেকে আমাদের গ্রহকে একটি ফ্যাকাশে নীল বিন্দুর মতো দেখায়। তবে সম্প্রতি এক জাপানি গবেষক দলের দাবি, পৃথিবীর অতীতের মহাসাগরছিল সবুজ। এই নতুন গবেষণা “Nature” সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে মহাসাগরের রঙের পরিবর্তন এবং পৃথিবীতে জীবন তথা ফটোসিনথেসিসের উত্থানের সাথে সম্পর্কিত একটি নতুন ধারণা তুলে ধরছে।

গবেষণার মূল ধারণা হল, প্রাচীন পৃথিবীর মহাসাগরের রঙ ছিল সবুজ, যা সম্ভবত তার রাসায়নিক গঠন এবং প্রথম জীবের ফটোসিনথেটিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। ব্যান্ডেড আয়রন ফর্মেশন পৃথিবীর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা পৃথিবীর প্রাচীন মহাসাগরের পরিবেশ এবং জীবনের প্রথম ধাপগুলির একটি অসাধারণ ইতিহাস বহন করে। এই শিলাস্তরের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে পৃথিবীর পুরানো মহাসাগরের রঙের একটি রহস্য।

আর্কিয়ান যুগ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আনুমানিক ৩.৮ থেকে ১.৮ বিলিয়ন বছর আগে ঘটেছিল। এ সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর ছিল অক্সিজেনবিহীন। এ যুগে পৃথিবীতে এককোষী জীবনের উত্থান ঘটে এবং এই প্রথম জীবের মধ্যে ফটোসিনথেসিসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে এটি ছিল এক ধরনের “অ্যানারোবিক ফটোসিনথেসিস”, যেখানে অক্সিজেনের উপস্থিতি ছিল না। এ ধরনের ফটোসিনথেসিসের ফলস্বরূপ অক্সিজেন গ্যাস তৈরি হয় এবং তা সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত আয়রনের সাথে বিক্রিয়া করে অক্সিডাইজড আয়রন তৈরি করতে থাকে। এক পর্যায়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন গ্যাসের উপস্থিতি শুরু হয়।

এই অক্সিজেনের প্রভাবে আয়রন অক্সিডাইজড হয়ে লাল রঙের আয়রন তৈরি করতে থাকে,যেগুলো ধীরে ধীরে মহাসাগরের পানির রঙ পরিবর্তন করতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই প্রক্রিয়া ঘটলে মহাসাগরের রঙ ছিল সবুজ, কারণ তখনকার মহাসাগরের পানি ছিল উচ্চমাত্রার আয়রন ধারণকারী, যা সবুজাভ আভা সৃষ্টি করত।

এই বিষয়ে নতুন গবেষণার ফলাফলগুলি একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছে যে, পৃথিবী যখন ফ্যাকাশে সবুজ রঙের মহাসাগরের অধিকারী ছিল, তখন ফটোসিনথেসিসের প্রথম বস্তুগুলি পৃথিবীর জীবনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

নতুন গবেষণায়, বিশেষ করে জাপানি বিজ্ঞানীরা ইওও জিমা দ্বীপের চারপাশের পানির সবুজাভ আভা নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই পানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া ঘটছিল, যেটি নীল-সবুজ শৈবালের উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। যদিও তাদের নাম নীল-সবুজ শৈবাল, তারা আসলে আধুনিক ব্যাকটেরিয়া, এবং ফটোসিনথেসিসের জন্য ক্লোরোফিলের সাথে phycoerythrobilin (PEB) নামক দ্বিতীয় একটি রঞ্জক ব্যবহার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, PEB রঞ্জক জলজ পরিবেশে বেশি দক্ষ, যা সবুজ রঙের পানিতে বেড়ে উঠতে সাহায্য করত।

এভাবে প্রমাণিত হয়, আর্কিয়ান যুগে পানির মধ্যে বেশি পরিমাণে আয়রন উপস্থিত ছিল এবং তা ফটোসিনথেসিসের মাধ্যমে জীবনের উত্থানে সহায়ক ছিল। এই সময়ে, যখন ফটোসিনথেটিক জীবগুলো বিকশিত হচ্ছিল, তখন মহাসাগরের পানির রঙ ধীরে ধীরে সবুজ হতে শুরু করেছিল।

গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাসাগরের রঙের পরিবর্তন মূলত পানির রাসায়নিক গঠন এবং জীবনের সক্রিয়তার ওপর নির্ভর করে। একবার মহাসাগরের সমস্ত আয়রন অক্সিডাইজড হয়ে গেলে, মুক্ত অক্সিজেন মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত হতে শুরু করে। সেই সময়ে পৃথিবীটির আকাশে প্রথমবারের মতো অক্সিজেনের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। ফলে পৃথিবী তখন তার প্রাচীন সবুজ রঙ ছেড়ে নীল রঙে রূপান্তরিত হয়।

এই পরিবর্তনগুলো ঘটছিল ধীরে ধীরে এবং আর্কিয়ান যুগ স্থায়ী ছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন বছর। মহাসাগরের রঙ সম্ভবত সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হত এবং একে একে বিভিন্ন রঙের সূচনা করত। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন পরবর্তী সময়ে মহাসাগরের রঙ কখনও কখনও সবুজ, কখনও বা লাল হতে পারে, যা জৈবিক এবং রসায়নগত পরিবর্তনগুলির উপর নির্ভর করবে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে পৃথিবীর মহাসাগরের রঙ আবার বদলাতে পারে। যদি পৃথিবী আরও উত্তপ্ত হয়ে যায়, তখন স্যালফারের মাত্রা বাড়বে এবং পৃথিবীর মহাসাগর বেগুনি রঙ ধারণ করতে পারে। তাছাড়া যদি আয়রনের স্তর বৃদ্ধি পায়, তবে মহাসাগরের রঙ আবার সবুজ হতে পারে।

এভাবে পৃথিবীর মহাসাগরের রঙের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতে পারে, যা পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে ধারাবাহিকভাবে ঘটে থাকে। আমরা যদি এখন ভাবি তবে মহাসাগরের রঙের পরিবর্তন শুধুমাত্র পৃথিবী নয়, অন্যান্য গ্রহগুলোর ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় হতে পারে।