“… ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের পরে রাষ্ট্র নিয়ে মানুষের মনে নতুন আকাঙ্ক্ষা জেগেছে। মানুষ ভেবেছে সংস্কার যতটুকুই হোক আর যেভাবেই হোক, রাষ্ট্রকে হতে হবে জবাবদিহিমূলক ও যথাসম্ভব দুর্নীতিমুক্ত। এই যাত্রায় নানারকম চিড় ধরছে। কী অন্তর্বর্তী সরকার, কী ‘সংস্কারপন্থী’ দল, কী পুরোনো রাজনৈতিক দল—কেউই আর শক্তিমান ভরসা হয়ে উঠছে না।
আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে কোনো সংস্কারই আলোর মুখ দেখবে না, টেকসইও হবে না। ফলে, সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের চেয়ে যেকোনো মূল্যে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার যে তড়িঘড়ি আকাঙ্ক্ষা সেটা যত উন্মোচন হচ্ছে, ততই সংস্কার সম্ভাবনা জনমনে ম্রিয়মাণ হয়ে উঠছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র, সরকার ও গণতন্ত্র নিয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে যে নৈতিক জাগরণ দেখা গিয়েছিল, তা জনমনে প্রশংসিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের মাঠে অনুপস্থিতির কারণে বিএনপি দ্রুত সারাদেশের রাজনৈতিক শূন্যস্থান যতই পূর্ণ করতে থাকে, ততই সেই প্রশংসা ফিকে হতে থাকে।
অবারিত রাজনৈতিক সুযোগে বিএনপির অনেক কর্মী দখলদারি ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। বহিষ্কার করেও এ সমস্যা কমানো যায়নি। স্থানীয় জনগণের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। এবং তারা এর মধ্যে দিয়ে পুরোনো দিনের রাজনীতি ফিরে আসার ইঙ্গিত পাচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে অনেক বিতর্ক ও পক্ষ-বিপক্ষ দেখা যাচ্ছে।…কিন্তু সংবিধান যাদের হাতে কার্যকর হবে, সেই রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা নিয়ে আলোচনা তেমন হচ্ছে না।
আমাদের সব বড় দলের অভ্যন্তরীণ গঠনতন্ত্রে দলীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে আছে দলপ্রধানের হাতে। ফলে পরিবারতন্ত্র এবং কর্তৃত্ববাদ দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে যতটা সোচ্চার, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার বিষয়ে সংস্কার প্রশ্নে ততটাই নীরব।
আওয়ামী লীগ কীভাবে রাজনীতিতে ফিরবে অথবা শাস্তি পাবে—সে বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক ঐকমত্য নাই। এনসিপি চায় দলটি নিষিদ্ধ হোক। এ বিষয়ে বিএনপির যুক্তি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ বা আদালত, এর ফলাফল যা-ই হোক। অন্যদের অবস্থাও খুব সুস্পষ্ট নয়।
… ছাত্র-তরুণদের উদ্যোগে সরকার ও রাজনৈতিক দল গঠন—অনেকের মধ্যেই পরিবর্তনের সম্ভাবনার উৎসাহ তৈরি করেছিল। রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতিতে তারা ইতিবাচক কিছু করবেন—এমন আশাও জোরেশোরে করা হয়েছিল।
তবে সরকারি পদ এবং দলের দায়িত্বে থাকা কারও কারও কর্মকাণ্ডে সেই প্রত্যাশা দিনকে দিন কমছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে এই তরুণদের কারও কারও বিরুদ্ধে।
… ফলে গণ-অভ্যুত্থান যে জনআশা জাগিয়েছিল তাতে চিড় ধরছে।
… আমাদের প্রধানতম রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তা ও রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে নতুন মডেল নাই। বরং তারা চিরাচরিত পুরোনো মডেলেই চলতে চাইছে। অথচ বদলে গেছে বহু কিছু। দেশের রাজনীতিতে গণ-অভ্যুত্থান তো বটেই, ঘটে গেছে গণহত্যা।
এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে যে নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে, সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিন্তার সঙ্গে বয়স্ক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চিন্তার ফারাকই শুধু নয়, চিন্তার সংঘর্ষও বিদ্যমান। ফলে রাজনীতির পুরোনো মডেল আগামী দিনে প্রায় সাড়ে চার কোটি নতুন ভোটারের মনকে জয় করবে, না ভয় পাবে—সেটাও একটা প্রশ্ন। …”


