Home Blog Page 110

সময়ের রহস্য ও বিজ্ঞানের অন্ধবিন্দু

আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর ও দুর্বোধ্য ধাঁধাগুলোর একটি হলো সময়। আমরা প্রতিনিয়ত সময়ের মধ্যে বাস করি, ” কিন্তু সময় আসলে কী” এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান এখনও দিতে পারেনি। পদার্থবিদ্যা, দর্শন ও চেতনা-বিজ্ঞান মিলেও সময়ের প্রকৃতি পুরোপুরি অনুধাবন করা যায়নি। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে ‘প্রথম কারণ’ বা ‘প্রাথমিক অবস্থা’ নামের এমন একটি বিন্দু খুঁজে বেড়াচ্ছেন, যা মহাবিশ্বের সূচনার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেবে। কিন্তু এখানেই মূল সমস্যা—এই ‘প্রথম কারণ’ নির্ধারণ করতে হলে আমাদের মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা, শক্তিক্ষেত্র, গতি ও অবস্থান সম্পর্কে নিখুঁত জ্ঞান থাকতে হবে। সমস্যা আরও গভীর। আমরা মহাবিশ্বের বাইরের কোনো ধারণাই পাই না। আমরা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নামক ‘বাক্সের’ বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকাতে পারি না, কারণ এই বাক্সই সর্বস্ব। এ কারণে ‘প্রথম কারণ’ কেবল অজানাই নয়, এটি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও মৌলিকভাবে দুর্বোধ্য।

পদার্থবিদরা সাধারণত ঘড়ির কাঁটার সময়কেই একমাত্র বাস্তব সময় হিসেবে গণ্য করেন। আমাদের ব্যক্তিগত সময়ানুভূতি—যেমন মুহূর্তের দীর্ঘতা, স্মৃতি, ভবিষ্যতের আশঙ্কা—এসবকে তারা ‘দ্বিতীয় স্তরের’ বা ‘মস্তিষ্কের গঠিত’ বিষয় বলে মনে করেন। ১৯২২ সালে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং দার্শনিক হেনরি বার্গসনের বিখ্যাত বিতর্কও এই দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, “পদার্থবিদের সময়ই একমাত্র সময়”। তবে মৃত্যুর আগে আইনস্টাইন নিজেই এই বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন, বিজ্ঞানের কাঠামোয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও সময়ানুভূতির স্থান কোথায়? কিন্তু যদি সময়ের শুরু সম্পর্কেই আমাদের প্রশ্নটি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়?

আমরা প্রায়ই ধরে নিই যে বিজ্ঞান আমাদের মহাবিশ্বের একটি সম্পূর্ণ, নিরপেক্ষ বর্ণনা দেবে, যা আমাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে আলাদা। কিন্তু এই ধারণাটিই গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ। যখন আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমে বস্তুগত জ্ঞান অর্জন করি, তখন আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার ‘পেছনের অভিজ্ঞতা’ দেখতে পাই না। আমরা ভুলে যাই যে এই সমস্ত বিজ্ঞান-জ্ঞান আমাদের উপলব্ধির মাধ্যমেই সম্ভব। এখানেই বিজ্ঞানের অন্ধবিন্দু, এমন এক বিন্দু যেখানে বিজ্ঞান নিজেই নিজেকে দেখতে পায় না। এই অন্ধবিন্দুর পেছনে আছে একটি মৌলিক বিশ্বাস, “পদার্থবিজ্ঞান যেভাবে বিশ্বকে বর্ণনা করে, সেটাই চূড়ান্ত বাস্তবতা।” কিন্তু দাবিটি কি টেকসই?

আমরা কখনোই আমাদের পর্যবেক্ষণের বাইরে কোনো শারীরিক বাস্তবতার সম্মুখীন হই না। মৌলিক কণা, সময়, জিন বা মস্তিষ্ক—সবকিছু আমাদের পরিমাপ, মডেল ও ভাষার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। বিজ্ঞান প্রকৃতিকে ‘যেমন আছে তেমন’ দেখায় না, বরং এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়। যদি আমরা বলি “শারীরিক বাস্তবতা মানেই পদার্থবিদ্যার বর্ণনা”, তবে এটি ভুল; কারণ পদার্থবিদ্যা চেতনার ব্যাখ্যা দেয় না। আর যদি বলি “ভবিষ্যতের পদার্থবিদ্যাই প্রকৃত বাস্তবতা বর্ণনা দেবে”, সেটি অর্থহীন; কারণ আমরা জানি না ভবিষ্যতের বিজ্ঞান কেমন হবে। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এমন এক বিশ্ব দেখায় যেখানে কণা ও তরঙ্গ একত্রে বিদ্যমান। গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিমাপের মাধ্যমে আমরা বাস্তবতাকেই প্রভাবিত করি। এখানে ‘পর্যবেক্ষক’-এর ভূমিকা অপরিহার্য।

কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা অনুসারে, ইলেকট্রনের তরঙ্গফাংশন কেবল পরিমাপের সময়ই বাস্তবতা পায়। অন্যদিকে ‘গোপন চলক’ তত্ত্ব (Hidden Variables) পর্যবেক্ষক-স্বাধীন বাস্তবতা বজায় রাখতে চায়, কিন্তু এতে অতিরিক্ত ও অদৃশ্য উপাদান (যেমন সমান্তরাল মহাবিশ্ব) যোগ করতে হয়।কোয়ান্টাম বায়েশিয়ানিজম (QBism), বলে—কোয়ান্টাম অবস্থার সম্ভাব্যতা আসলে বাস্তবতার অংশ নয়; বরং এটি পর্যবেক্ষকের বিশ্বাসের ডিগ্রি। QBism অনুযায়ী, বিজ্ঞান হলো সহভাগী বাস্তবতা—একটি পারস্পরিক ক্রিয়াশীল নেটওয়ার্ক, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি জড়িত। এখানে ‘বাস্তবতা’ আর পর্যবেক্ষক আলাদা নয়। চেতনা-গবেষণাতেও এই অন্ধবিন্দু প্রকট। আমরা জানি না কেন কোনো শারীরিক ব্যবস্থার ‘আমি’ বলে একটি অভিজ্ঞতা জন্মায়। বিজ্ঞান আজও চেতনা ও স্ব-সচেতনতার কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কখনোই আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে নিয়ে যায় না। বিজ্ঞান হলো পরিশীলিত মানবিক প্রচেষ্টা, যা পর্যবেক্ষণ, গণিত ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। গ্যালিলিওর ঘর্ষণহীন তল কিংবা বোরের পরমাণু মডেল—এসব প্রকৃতিতে নেই, এগুলো আমাদের মানসিক নির্মাণ। পদার্থবিদদের সময় আমাদের জীবনের সময়ানুভূতির ওপর নির্ভরশীল। মহাবিশ্বের কোনো সম্পূর্ণ বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়; বরং এটি একটি চলমান, স্ব-সংশোধনশীল আখ্যান। সময় এই আখ্যানের কাঠামো দেয়, কিন্তু এর অর্থ আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেই আসে।

অন্ধবিন্দুকে চিনতে পারা মানে এই বিভ্রম থেকে জাগরণ যে বিজ্ঞান আমাদের পরম জ্ঞান দিতে পারে। বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একে অপরের সাথে জড়িত। আমরা যদি প্রকৃতিকে কেবল বাইরের বস্তু হিসেবে দেখি, তাহলে এর গভীরতম রহস্যগুলোর সমাধান করতে পারব না। আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি, যেখানে আমরা নিজেদেরকে প্রকৃতির অভিব্যক্তি ও প্রকৃতির আত্ম-বোঝাপড়ার উৎস হিসেবে দেখব। শুধু তখনই সময়, চেতনা ও বাস্তবতার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হতে পারে।

ভারত–পাকিস্তান সংঘাত – শাসন , কূটনীতি এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার দীর্ঘ সংকট

৭ মে ২০২৫, উপমহাদেশের আকাশে আরেকবার বারুদের গন্ধ। ভারতের “অপারেশন সিন্দুর” পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পরিচালিত হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সংঘাতে মুখোমুখি হয়। ভারত দাবি করেছে, এটি ছিল কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ পর্যটক হত্যার প্রতিশোধ। পাকিস্তান পাল্টা হামলা চালিয়ে ভারতীয় ড্রোন ধ্বংস ও যুদ্ধবিমান গুলি করে নামানোর দাবি করেছে। আকাশসীমা বন্ধ, রক্তাক্ত সীমান্ত, অর্থনৈতিক বিপর্যয়—এ পরিস্থিতির গভীরে কেবল ভূ-রাজনীতি নয়; রাষ্ট্রশাসনের বুনিয়াদটাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ইতিহাস হল এক ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব, যা জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় বিভাজন এবং সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল। ১৯৪৭ সালে দুই রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই সম্পর্কের বীজে ছিল সন্দেহ, শত্রুতা এবং বিভেদ। সে থেকে কাশ্মীরের প্রশ্ন এখনও অত্যন্ত জ্বলন্ত বিষয়। ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯—এই তিনটি বড় যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক কেবল উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, বরং ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি রাষ্ট্রই একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চিন্তা করে চলেছে।

যুদ্ধের এক ধরনের অদৃশ্য ইতিহাস চলছে—যেখানে কূটনৈতিক সাফল্য তখনই আসে যখন সামরিক সংঘাতের চাপে রাষ্ট্রগুলোর নেতৃবৃন্দ একটি শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হন। ১৯৭২ সালের শিমলা চুক্তি, ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আটল বিহারী বাজপেয়ী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মধ্যে শান্তির শপথ— যদিও কোনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যুদ্ধবিরতির পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রায়শই ভেঙে গেছে, আর দুই দেশের সম্পর্ক চরম বৈরিতার দিকে গড়িয়েছে।

ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ শুধু সামরিক স্তরে ক্ষতি করে না, গভীর প্রভাব ফেলে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। যেমন, পাকিস্তানে সেনা শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস, যেখানে সামরিক শক্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে ধীরে ধীরে পুরোপুরি নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। এই সংঘাতগুলো পাকিস্তানে শাসকশ্রেণির ক্ষমতা ও জনসমর্থন বৃদ্ধির জন্য একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতেও জাতীয়তাবাদী ধারণা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, যা রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তাকে বাড়ানোর মাধ্যমে শাসনকে বৈধ করে তোলে।

এদিকে সীমান্তের উত্থান-পতন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। পাকিস্তান ভারতের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধের প্রস্তুতিতেটসামরিক বাজেটের বড় অংশ খরচ করে। একইভাবে, ভারতের ব্যাপারে–জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখার নামে, অনেক সময়েই অভ্যন্তরীণ সমালোচনা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার পথ প্রশস্ত হয়।

ভারত–পাকিস্তান সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ক্ষমতা শাসনেও পরিবর্তন ঘটাতে পারে। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ভারত ও পাকিস্তানের এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। চীন-পাকিস্তান জোট শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে উঠবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-পাক বন্ডিংও কিন্তু মজবুত। এই সামরিক জোটগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা আঞ্চলিক শাসনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াতে পারে।

এছাড়াও ভারতের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। বিশ্বশক্তির কাছ থেকে ভারতে শান্তি প্রক্রিয়া চলমান রাখার জন্য চাপ বাড়ছে। ভারত যদি আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে এবং তা বিশ্ব বাণিজ্য, পরমাণু নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ একাধিক কূটনৈতিক ফ্রন্টে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ রাজনৈতিক গভর্ন্যান্সের সংস্কার। দ্বিপাক্ষিক সামরিক যোগাযোগ পুনরায় স্থাপন (ডিজিএমও, শীর্ষ সামরিক সংলাপ), আঞ্চলিক শাসন কাঠামো পুনর্গঠন, কাশ্মীর–গিলগিট অঞ্চলে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ পুনরুদ্ধার, সাংবাদিকতা, সুশীল সমাজ ও জনমতের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ।

যুদ্ধ সহজ নয়, এটি শাসন ও অস্তিত্বের সর্বোচ্চ ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যখন দুই রাষ্ট্র, দুই শাসকগোষ্ঠী নিজেদের জনতার দায়িত্ব ভুলে কেবল ক্ষমতা ও জাতীয়তাবাদের খেলায় মত্ত হয় তখন রক্তপাত শুধু সীমান্তরেখায় নয়, রাষ্ট্রশাসনের শিরায়ও ছড়িয়ে পড়ে।

আজকের ভারত–পাকিস্তান সংঘাতের আসল প্রশ্ন তাই, কাশ্মীর আর কতোটা রক্তাক্ত হলে উভয়পক্ষের সন্তুষ্টির ষোলকলা পূর্ণ হবে? উত্তর কেবল কূটনীতির বৈঠকখানায় নয়, শাসনের নৈতিক ভিত্তিতেও খুঁজতে হবে।

বিশ্বজুড়ে প্রতি ৫ জন নারীর ১ জন , কিশোরী বয়সে যৌন সহিংসতার শিকার : ল্যানসেট রিপোর্ট

বিশ্বের প্রতি ৫ জন নারীর মধ্যে ১জন এবং প্রতি ৭ জন পুরুষের মধ্যে ১জন ১৮ বছরের কম বয়সে যৌন সহিংসতার শিকার হন। এমনই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিক্যাল জার্নাল দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণায়।

‘শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার প্রকোপ এবং প্রথমবার এ ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার বয়স : অঞ্চল, বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক বৈশ্বিক বিশ্লেষণ (১৯৯০–২০২৩) ’—শীর্ষক এই গবেষণা ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (আইএইচএমই) পরিচালনা করেছে। এই গবেষণাটি ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২০৪টি অঞ্চলের বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে, যা গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ গবেষণার অংশ।

এই গবেষণাটি শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ব্যাপকতা সংক্রান্ত প্রথম বৈশ্বিক অনুমানগুলোর মধ্যে অন্যতম। গবেষকেরা লিখেছেন, ‘আমাদের অনুমান, ২০২৩ সালে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বৈশ্বিক বয়সভিত্তিক ব্যাপকতা মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ছেলেদের জন্য ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল।’

গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে এই হার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ভারতে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত। ২০২৩ সালে ভারতে ১৮ বছরের কম বয়সী ৩০ শতাংশের বেশি মেয়ে এবং ১৩ শতাংশ ছেলে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে।

আইএইচএমই-এর অধ্যাপক ও গবেষণার বরিষ্ঠ লেখক ড. ইমানুয়েলা গাকিদু বলেন, “শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব এই সমস্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ হচ্ছে। এত অল্প বয়সে এত বেশি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক, এবং এর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।”

গবেষণা বলছে, শিশু যৌন নির্যাতনের শিকাররা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ, মাদকাসক্তি, যৌন সংক্রমণ এবং এমনকি হাঁপানির মতো জটিল রোগে ভুগতে পারেন। এর প্রভাব পড়ে সামাজিক বিকাশ, শিক্ষাগত অগ্রগতি এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সাফল্যেও।

আইএইচএমই-এর সহকারী অধ্যাপক ড. লুইসা ফ্লোর বলেন, “এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে হলে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও সহায়তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিশুদের জীবনে এই অভিজ্ঞতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কমে।” গবেষণায় আরও জানা যায়, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি এবং পরিমাপে অসঙ্গতি রয়েছে।

‘আওয়ামী লীগের একটি লোকও কি বলেছে – তারা ভুল করেছে , ক্ষমা চায়’ : মঈন খান , বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য

শুক্রবার সকালে রাজধানীতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য কার্টার সেন্টার’-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন — ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কি না, সেটা তো বিএনপির বক্তব্যের বিষয় নয়। এটা নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কথা বলছে তারা তাদের বক্তব্যে বলেছে। কাজেই এখানে আমরা বিএনপি হিসাবে তো এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক নই। আমাদের মহাসচিব ইতোমধ্যে বলেছেন — এটা জনগণ সিদ্ধান্ত নেবেন আওয়ামী লীগ নির্বাচন করবে কিনা।’

বিএনপির সিনিয়র এই নেতা আরো বলেন, ‘আজকে ৯ মাস হয়ে গেছে। একজন আওয়ামী লীগারকে আজকে পর্যন্ত দেখাতে পারবেন কি তারা বলেছেন — দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট কায়দায় যে মানুষের ওপর জুলুম করেছে, এ দেশকে তছনছ করে দিয়েছে, লুটপাট করে নিয়েছে, তারা ভুল করেছে, তারা ক্ষমা স্বীকার করছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে, তারা আজকে জনগণের মতামতকে নিয়ে নির্বাচন করতে চায়‌। আওয়ামী লীগের একটি লোকও কি তা বলেছে? বলেনি। সুতরাং প্রশ্নটি আমাকে জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজন নাই, এর উত্তর বাংলাদেশের জনগণ দিবে।’

তিনি বলেন — ‘আমি যদি বলি এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগকে কেন জিজ্ঞেস করছেন না? তারা কি আসলেই নির্বাচন করতে চায়, তারা কি আসলেই গণতন্ত্র চায়? সেটাতো আওয়ামী লীগকে বলতে হবে।’

ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে মাটির অবক্ষয় , কমছে ফসলি ভূমি

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী কৃষিকাজ ও পরিবেশ ব্যবস্থায় যে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হচ্ছে, তার অন্যতম দৃষ্টান্ত ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের মাটির অবক্ষয়। ২০২৫ সালের ইউরোপীয় এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি (EEA) এবং যুক্তরাজ্যের ন্যাচারাল ইংল্যান্ড কর্তৃক প্রকাশিত যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৬০% এবং যুক্তরাজ্যের ৪০% কৃষিজমি বর্তমানে গুরুতর মাটির অবক্ষয়ের শিকার। এই সংকটের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, বাস্তুসংস্থান ও জলবায়ু স্থিতিশীলতা একযোগে হুমকির মুখে পড়েছে।

মাটির অবক্ষয় বলতে বোঝায় এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ভূ-উপরিস্থিত মাটির গঠন, রাসায়নিক গুণাগুণ ও জৈব বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। ইউরোপীয় এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর EU অঞ্চলে আনুমানিক ৯৭০ মিলিয়ন টন মাটি ক্ষয়ে যায়, যা খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সাধন করে।

FAO (Food and Agriculture Organization)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, মাটির এক সেন্টিমিটার গঠিত হতে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বছর সময় লাগে, অথচ বর্তমান হার অনুযায়ী প্রতি ১৬ সেকেন্ডে বিশ্বব্যাপী এক ফুটবল মাঠ সমান উর্বর মাটি হারিয়ে যাচ্ছে।

১৯৬০ সালের পর থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে উচ্চফলনশীল শস্য (HYV) ও মনোকালচারের প্রসার ঘটে। প্রতিবছর একই জমিতে একই ধরনের ফসল চাষের ফলে মাটির পুষ্টি উপাদান একঘেয়ে ভাবে নিঃশেষিত হচ্ছে।

২০০০-২০২০ সালের মধ্যে ইউরোপে নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের ব্যবহার ২৫% বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির জীববৈচিত্র্য ৪০-৬০% পর্যন্ত কমে যায়।

ইউরোস্ট্যাট (Eurostat)-এর তথ্য মতে, ২০১০-২০২০ সালে প্রতি বছর ইউরোপে গড়ে ৯৭০ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি নগরায়নের কারণে হারিয়ে গেছে। এতে ভূমির অনুর্বরতা দ্রুত বেড়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের Joint Research Centre (JRC) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপে গম উৎপাদন ১০-১৭% কমে যেতে পারে মাটির অবক্ষয়ের কারণে।

২০২৩ সালের Nature Climate Change জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, অবক্ষয়যুক্ত মাটি প্রতি হেক্টরে বছরে ১-৩ টন কম কার্বন ধরে রাখতে পারে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

অবক্ষয়িত জমি থেকে নাইট্রেট ও ফসফেট মিশ্রিত পানির প্রবাহ নদী ও জলাধার দূষণ করে। EU Water Framework Directive অনুযায়ী, ৪০% নদী-জলাশয় ইতোমধ্যে এই দূষণের শিকার।

কম চাষ, মাটির আবরণ রক্ষা ও ফসল আবর্তনের সমন্বয়ে গঠিত এই পদ্ধতিটি ইতোমধ্যে ফ্রান্স ও জার্মানিতে পরীক্ষামূলকভাবে ২০% জমিতে কার্যকর।

বিজ্ঞানসম্মত তথ্যের ভিত্তিতে সারের সঠিক মাত্রা নিরূপণ ও জমির প্রয়োজনমতো পানিপ্রয়োগ প্রযুক্তি বর্তমানে যুক্তরাজ্যের রথামস্টেড ইনস্টিটিউট (Rothamsted Institute)-এ গবেষণাধীন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২১ সালের Soil Strategy অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে EU অঞ্চলের সমস্ত মাটিকে ‘Healthy Soil’ ক্যাটাগরিতে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের কৃষিজমিতে মাটির অবক্ষয় একটি বহুমাত্রিক বৈজ্ঞানিক, পরিবেশগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ। FAO-এর মতে, “Healthy soil is the foundation of food systems.” তাই অবিলম্বে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিপদ্ধতি, পরিবেশসম্মত নীতি এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে এই সংকট মোকাবিলা অপরিহার্য। বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক দক্ষিণ দেশগুলোর জন্যও এটি সতর্কসংকেত—কারণ একই ধরনের কৃষিনীতি আমাদের মাটিতেও অনুরূপ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এলএনজি – নতুন ঔপনিবেশিক হাতিয়ার : গৌরাঙ্গ নন্দী , ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও পরিবেশ কর্মী | হাসান মেহেদী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও এনজিও নির্বাহী

” … নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস সূর্যের আলো, পানির স্রোত, বাতাস ইত্যাদি। নেট জিরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের জোর তৎপরতা থাকা উচিত হলেও, দুঃখজনকভাবে আমরা সেদিকে না গিয়ে এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি।

আগের চেয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বেড়েছে। তা ছাড়া কয়লা নিয়ে অনেক বিতর্ক বলে আমরা আরেক জীবাশ্ম গ্যাস বিশেষত এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) দিকে ঝুঁকছি।

… এর অন্যতম সুফলভোগী হবে আমেরিকা। ইতোমধ্যে এক্সিলারেট এনার্জি, কাতার এনার্জি এবং ওকিউ ট্রেডিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি করেছে। পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে ২৯ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে, যাতে বাংলাদেশ প্রতিবছর ৫০ লাখ টন এলএনজি কিনবে।

… এলএনজি আমদানি, মজুত ও বিতরণের অবকাঠামো বাংলাদেশে নেই। তাই বিদেশি ঋণ ও কোম্পানির সাহায্যে বিশেষ অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে সামিট গ্রুপ ও এক্সিলারেট এনার্জি দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসিয়েছে, যার প্রতিদিন ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস মজুত করার ক্ষমতা আছে। এ জন্য প্রতিবছর প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করতে হয়।

… পরিহাসজনক হলো, আমরা (জ্বালানি নীতিতে) অঙ্গীকার করেছি জ্বালানি স্থানান্তর অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাব। অথচ জীবাশ্ম জ্বালানি এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছি।

অঙ্গীকার অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রণোদনা দিলে, সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এর প্রসার ঘটত এবং জ্বালানি-স্বনির্ভরতাও বাড়ত।

জ্বালানি-স্বনির্ভরতার দিকে না গিয়ে আমরা জ্বালানি কোম্পানি ও সরবরাহকারী দেশগুলোর স্বার্থে শক্তিশালী দেশগুলোর ক্রীড়নকে পরিণত হচ্ছি! আর শক্তিধর দেশগুলোও এলএনজিকে নতুন ঔপনিবেশিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

… বিদ্যুতের প্রায় সবটাই কয়লা, গ্যাস ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হয়। এ ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ মাত্র ৪% মতো। অথচ অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০%, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০% এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাস্তবায়ন করতে হবে।

… তা না করে এলএনজির অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় সার্বক্ষণিক বৈদেশিক মুদ্রার চাপে থাকতে হবে, তা যে কেউ অনুভব করতে পারেন।

… উল্লিখিত এলএনজি ক্রয়চুক্তির কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রনায়করা আমাদের বাহবা দিতে শুরু করেছে। এই বাহবা যে তাদের স্বার্থ রক্ষা করার কারণে মিলছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

… দেশ দখলের পরিবর্তে আজ চলছে ব্যবসা তথা অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ।…বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যেখানে জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর, এলএনজি বর্তমানে একটি নতুন ‘জ্বালানি পণ্য’ হিসেবে আবির্ভূত।…একেবারে ঔপনিবেশিক হাতিয়ার, যা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে উদ্যত। “


কনস্টান্টিনোপলের ঈগল – ফতেহ সুলতান মুহাম্মদের মৃত্যু ও ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র

ফতেহ সুলতান মুহাম্মদ যিনি ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমানে ইস্তাম্বুল) দখল করে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে অটোমান সাম্রাজ্য বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তবে তাঁর মৃত্যু আজও একটি রহস্যময় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

যদিও ঐতিহাসিকভাবে বলা হয় তিনি ১৪৮১ সালে প্রাকৃতিক কারণে মারা গিয়েছিলেন, তবুও তাঁর মৃত্যু নিয়ে একাধিক কনস্পিরেসি থিওরি প্রচলিত রয়েছে, যেগুলো আজও ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।

ফতেহ সুলতান মুহাম্মদের মৃত্যু নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো, তিনি প্রাকৃতিক কারণে মারা গিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে ১৪৮১ সালে অসুস্থ হয়ে মারা যান। মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সেলিম প্রথম (সেলিম ইয়াভুজ) অটোমান সাম্রাজ্যের শাসক হন এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর সাম্রাজ্য আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই প্রাকৃতিক মৃত্যু সম্পর্কে তার শারীরিক অবস্থা এবং সময়কাল থেকে কিছু বিশদ তথ্য পাওয়া যায়।

তিনি দীর্ঘদিন শাসনকালে অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এবং সাম্রাজ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা তার শারীরিক এবং মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার মৃত্যুর কারণ ছিল একটি সাধারণ অসুস্থতা, যা তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য প্রকাশ করেছে। ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তার শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ ছিল। তার নেতৃত্বে বহু যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান, তুর্কি সাম্রাজ্যের জন্য বিভিন্ন প্রশাসনিক চাপ এবং আভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা তার শারীরিক অবস্থা খারাপ করে তুলেছিল।

ফতেহ সুলতান মুহাম্মদের মৃত্যু নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত কনস্পিরেসি থিওরি হলো, তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার শাসনকালে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন, এমনকি তাঁর শাসনব্যবস্থা ছিল অনেকটা স্বৈরতান্ত্রিক। কিছু ঐতিহাসিক এবং বিশেষজ্ঞের মতে, সুলতানকে হত্যা করার পেছনে রাজনীতির অন্তর্নিহিত শক্তি ছিল এবং তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াইকে সহজতর করা হয়েছিল।

অনেকের মতে তাঁর শাসনকালে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল এবং কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাঁর শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তারা হয়তো ক্ষমতার জন্য ষড়যন্ত্র করে সুলতানকে হত্যা করতে পারে। এই ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল তার শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। সুলতান যদি মারা যান তাহলে তাদের জন্য ক্ষমতার দখল করা সহজ হয়ে যাবে, এমন ধারণাও ছিল।

এছাড়া কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, সুলতানকে সম্ভবত কেউ তাকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেছিল, কারণ তৎকালীন সময়ের ইতিহাসে এমন ঘটনা নিতান্ত অস্বাভাবিক ছিল না। আরও একটি তত্ত্ব দাবি করে, তাঁর মৃত্যুর সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের ফলাফলও তার শারীরিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। সেই সময়ের সামরিক অভিযান এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল, যা তার মৃত্যুকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

আরেকটি কনস্পিরেসি থিওরি হলো, ফতেহ সুলতান মুহাম্মদ আসলে মারা যাননি বরং তিনি তার মৃত্যু গোপন রেখেছিলেন। এই থিওরিটি একটু অদ্ভুত মনে হলেও এটি কিছু বিশেষজ্ঞের দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। তারা মনে করেন, সুলতান কৌশলে তার মৃত্যু দেখিয়ে এক নতুন পরিচয়ে জীবন শুরু করেছিলেন। কিছু ইতিহাসবিদের মতে, তিনি মারা যাওয়ার পরও যে কোনো পরিস্থিতিতে তার অবস্থা গোপন রাখার জন্য তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

এই তত্ত্বের অনুসারীরা দাবি করেন, ফতেহ সুলতান তাঁর শাসনকালে এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে, তার শাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এমনকি তাকে মৃত হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে, যাতে তিনি গোপনে থেকে নতুন জীবন শুরু করতে পারেন। এ ধরনের গোপনীয়তা অনেক রাজনীতিক এবং শাসকদের জন্য প্রচলিত ছিল, বিশেষ করে তাদের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলির ওপর কোনো ধরনের নিরাপত্তা জটিলতা না থাকলে।

এটি অবশ্য কল্পনা হলেও, সেই সময়কার সাম্রাজ্যিক রাজনীতি এবং গোপন অপারেশনগুলির পরিপ্রেক্ষিতে, সুলতান মৃত্যুর পরও কিছু গোপন উদ্যোগ নিয়েছিলেন এমন ধারণাও সত্যি হতে পারে। এই থিওরি অনুসারে, সুলতান হয়তো নিজেই তার মৃত্যুকে ছদ্মবেশে পরিণত করেছিলেন, এমনকি সেজন্য তার মৃত্যু সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

ফতেহ সুলতান মুহাম্মদের মৃত্যুর পর রাজ্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থা ও ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। সুলতান মারা যাওয়ার পর, তার পুত্র সেলিম প্রথম ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু সে সময়ে রাজনীতির মাঠ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। সুলতানের মৃত্যুর পর কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক দাবি করেন যে, সুলতানের শাসনকে শেষ করার জন্য একাধিক গোপন ষড়যন্ত্র হয়েছিল, যা তার শাসনকালের শেষ সময়ে ঘটেছিল।

এই পরিস্থিতি একটি নতুন রাজনৈতিক চাল তৈরি করতে সহায়ক হয়েছিল, যেখানে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পরবর্তী শাসক হিসেবে নিজেদের দাবী প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ছিল। সুলতান মুহাম্মদের মৃত্যুর পর এ ধরনের ক্ষমতার লড়াই এবং কৌশলের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছিল, যা সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ রূপ নিয়েছিল।

ফতেহ সুলতান মুহাম্মদ, যিনি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে সমাপ্ত করে অটোমান সাম্রাজ্যকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, তাঁর মৃত্যু আজও একটি রহস্যের। যদিও ঐতিহাসিকভাবে তাঁর মৃত্যু প্রাকৃতিক কারণে ঘটেছিল বলে ধরা হয়, তবুও কনস্পিরেসি থিওরি এবং গোপন ষড়যন্ত্রের গল্পগুলি আজও ইতিহাসের অন্ধকার দিকগুলোর দিকে আঙ্গুল তোলে।

তার মৃত্যুর পর রাজনীতির গেম, ক্ষমতার যুদ্ধ এবং সামরিক পরিকল্পনাগুলির মধ্যে কী ঘটেছিল, তা আজও এক রহস্যই রয়ে গেছে। ফতেহ সুলতান মুহাম্মদের মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন এবং কনস্পিরেসি থিওরি আজও তুর্কি ইতিহাসের একটি অজানা অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে, যা কেবল ইতিহাসবিদদের কাছেই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী অনেকের কাছে একটি রহস্যময় আলোচনা হিসেবে থেকে গেছে।

ওভারথিঙ্কিং বন্ধ করার উপায় –

ওভারথিঙ্কিং বা অতিরিক্ত চিন্তা করা একটি সাধারণ মানসিক অবস্থা, যা আমাদের শান্তি, উৎপাদনশীলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। অতীতে ঘটে যাওয়া বিষয় বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তা করতে করতে আমরা অনেক সময় একটা চিন্তার চক্করে পড়ে যাই। যদিও কিছু চিন্তা করা স্বাভাবিক, তবে যখন এটি অতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন তা উদ্বেগ ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে কিছু কার্যকর কৌশল অবলম্বন করলে আমরা এই চিন্তার চক্কর থেকে মুক্তি পেতে পারি এবং মানসিক শান্তি ফিরে পেতে পারি।

মাইন্ডফুলনেস চর্চা
মাইন্ডফুলনেস বা সচেতনতা চর্চার মাধ্যমে আমরা বর্তমাণে মনোযোগী হতে শিখি। অতীতের ভুল বা ভবিষ্যতের চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে মাইন্ডফুলনেস খুবই কার্যকর। শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দিন বা চারপাশের পরিবেশে মনোযোগী হোন, এটি আপনার চিন্তা কমাতে সহায়তা করবে।

“চিন্তা করার সময়” নির্ধারণ

যদি আপনি বেশি চিন্তা করেন, তবে দিনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করুন যেখানে আপনি আপনার চিন্তাগুলি পূর্ণরূপে ভাবতে পারবেন। এই সময় পার হলে, পরবর্তী সময়ের জন্য চিন্তা বন্ধ করার চেষ্টা করুন। এটি আপনার চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।

চিন্তার উৎস চিহ্নিত

ওভারথিঙ্কিং সাধারণত কোনো অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তার কারণে হয়। আপনার চিন্তাগুলির উৎস চিহ্নিত করুন এবং সেগুলি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করুন। যদি আপনার চিন্তা বাস্তবিক না হয়, তবে সেগুলিকে অমূলক মনে করে বাদ দিন।

কিছু পদক্ষেপ

যে বিষয়ে চিন্তা করছেন, সে সম্পর্কে কোনো পদক্ষেপ নিন। পদক্ষেপ নেওয়া আপনাকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে এবং চিন্তা কমাতে সাহায্য করবে। চিন্তা যখন অনেক হয়, তখন সেগুলিকে বাস্তবে রূপ দিতে চেষ্টা করুন।

শারীরিক কার্যক্রম
ব্যায়াম বা হাঁটা আপনার চিন্তা থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। শারীরিক কার্যক্রম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং আপনার মনকে পরিষ্কার রাখে। এটি আপনার চিন্তা কমিয়ে দেয় এবং আপনাকে শান্তি দেয়।

লিখে ফেলুন
আপনার চিন্তা এবং অনুভূতিগুলো লিখে ফেললে তা মাথা থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। একটি জার্নালে আপনার চিন্তা লিখুন, যাতে আপনি সেগুলিকে বাইরে থেকে দেখতে পারেন এবং বুঝতে পারেন। যদি অতিরিক্ত চিন্তা বা উদ্বেগ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে এবং আপনার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তবে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। থেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে আপনি আপনার চিন্তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিখতে পারবেন। এই কৌশলগুলো অনুসরণ করলে আপনি আপনার মানসিক শান্তি ফিরে পেতে পারেন এবং অতিরিক্ত চিন্তা কমাতে সক্ষম হবেন। মাইন্ডফুলনেস, পদক্ষেপ নেওয়া, বা পেশাদার সহায়তা—যেকোনো একটি উপায় বেছে নিয়ে আপনি চিন্তা কমানোর পথে এগিয়ে যেতে পারবেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমস এর এক্সপ্লেইনার – পাকিস্তান কী কাশ্মীরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেছে?

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলায় রাষ্ট্রীয় মদদ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান। তবে, দেশটির নেতারা প্রায়ই স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে থাকেন। পাশাপাশি পাকিস্তান স্বীকার করেছে, ১৯৯০-এর দশকে তারা কিছু জঙ্গি গোষ্ঠীকে অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।

২২ এপ্রিল কাশ্মীরে হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ বলেন, লস্কর-ই-তৈয়বার মতো সংগঠনগুলো এখন নিষ্ক্রিয়।

জিহাদপন্থি গোষ্ঠীগুলোর বিশ্লেষক ও লাহোর-ভিত্তিক গবেষক মাজিদ নিজামী জানান, আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) চাপের মুখে পাকিস্তান লস্কর-ই-তৈয়বার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং সংগঠনটির অর্থ-সম্পদ জব্দ করেছে। ভারতের কড়া সীমান্ত নিরাপত্তার কারণে নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে অনুপ্রবেশ এখন ‘প্রায় অসম্ভব’ হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন নিজামী।

কাশ্মীর সংকটের সূচনা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজন থেকে। ওই সময় ধর্মভিত্তিক দুটি দেশের জন্ম হয়—হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান। ওই বছর অক্টোবরে কাশ্মীরের মুসলিম-প্রধান রাজ্যের হিন্দু শাসক রাজ্যটিকে ভারতে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীরকে নিজের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং সামরিকভাবে তা দখল করার চেষ্টা চালায়। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে কাশ্মীর ভাগ হয়ে যায়।

১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর,ওই যুদ্ধবিরতির রেখাই ‘লাইন অব কন্ট্রোল'(এলওসি) নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে ভারত কাশ্মীরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, বাকি অংশ পাকিস্তানের দখলে রয়েছে। তবে এই বিরোধ এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

কাশ্মীরের ভারত-শাসিত অংশে বিদ্রোহ ১৯৮০-এর দশকে শুরু হয়, যা মূলত স্থানীয় অসন্তোষের ফলে তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে পাকিস্তান কিছু গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে শুরু করে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

১৯৮৭ সালের স্থানীয় নির্বাচন ব্যাপকভাবে কারচুপি হিসেবে দেখা হয়, যেখানে মুসলিম দলগুলোর জোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানি-এর রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি বলেন, ‘এর ফলে কাশ্মীরের রাজনৈতিক কর্মীরা মনে করতে শুরু করেন, তারা আর ভোটে তাদের রাজনৈতিক দাবি পূরণ করতে পারবেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে মূলত স্থানীয় বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে, তবে পরবর্তীতে পাকিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো এই বিদ্রোহে জড়িত হয়।’

যেসব কাশ্মীরভিত্তিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে কিছু কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়েছিল। আবার কিছু ভারতের কাশ্মীর অংশকে পাকিস্তানে যুক্ত করতে চেয়েছিল।

১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তান কাশ্মীর ও নিজ দেশের মধ্যে বেশ কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করে। পরে এই সহযোগিতার বিষয়টি বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তাও স্বীকার করেন, যার মধ্যে সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মুশারফও ছিলেন।

২০০২ সালের পর বিদ্রোহের মাত্রা কিছুটা কমে আসে, পাকিস্তান কিছু প্রধান সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করে, যদিও লস্কর-ই-তৈয়বা কিংবা জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো সংগঠন বিভিন্ন ছদ্মনামে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। এরপর একে একে সন্ত্রাস বিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ভারতের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে ৯/১১-এর পরবর্তী হস্তক্ষেপের চাপের ফল ছিল।

শান্তি প্রক্রিয়া ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলা পরবর্তী সময়ে ভেঙে যায়। এ হামলায় ১৬৬ জন নিহত হন এবং এর জন্য লস্কর-ই-তৈয়বাকে দায়ী করা হয়।

কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা
কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। বহুবার সামরিক অভিযান, পুলিশি দমন-পীড়ন ও সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের পর থেকে কাশ্মীর বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে সামরিকীকৃত এলাকা হিসেবে রয়ে গেছে।

২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতের সংবিধানের এক অংশ বাতিল করে, যা জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে আংশিক স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পূর্ণ একীভূত করার চেষ্টা করা হয়, যা মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার অংশ ছিল।

তার সরকার নয়াদিল্লি থেকে অঞ্চলটি সরাসরি শাসন করতে শুরু করে, ওই অঞ্চলে বিশাল নিরাপত্তা উপস্থিতি আনা হয় এবং বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার মানুষ, এমনকি রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়; গণতন্ত্র স্থগিত রাখা হয়।

পাকিস্তান ভারতের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। তবে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরেও সহিংসতা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

ভারত শাসিত কাশ্মীরে সরাসরি শাসন সহিংসতার মাত্রা কমিয়ে দিয়েছে। গত বছর ভোটগ্রহণও পুনরায় শুরু হয়েছে। তবে মোদির দলকে নিয়ে কাশ্মীরিদের মধ্যে অসন্তোষ রয়ে গেছে, বিশেষ করে কাশ্মীরিদের জীবনে তাদের কঠোর নজরদারির কারণে।

ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাত , কোন্ দেশ কি প্রতিক্রিয়া জানালো ?

ভারত-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘এটি লজ্জার। আমি আশা করি এটি খুব দ্রুত শেষ হবে। আমার মনে হয় অতীতের কিছু ঘটনার উপর ভিত্তি করে মানুষ জানত যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। তারা (ভারত ও পাকিস্তান) দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি (এই পরিস্থিতি) শেষ হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটারে) লিখেছেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরিস্থিতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আশা করি এই পরিস্থিতির দ্রুত শেষ হবে এবং ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃত্ব আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে যাবে।’

ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, হামলার পর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, ‘চীন মনে করছে, পাকিস্তানে ভারতের সামরিক অভিযান দুঃখজনক। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন। দুইপক্ষকে শান্তি ও স্থিতিশীলতার বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করার, শান্ত থাকার, সংযম প্রদর্শনের এবং পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে, এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

চীনের মুখপাত্র আরো বলেন, ‘চীন সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতা করে। ভারত ও পাকিস্তান এমন দুই প্রতিবেশী, যাদের আলাদা করা যায় না এবং তারা চীনের প্রতিবেশীও।’

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বিগ্ন প্রকাশ করেছে রাশিয়া। পাশাপাশি দেশ দুইটিকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সব ধরনের সন্ত্রাসবাদেরও নিন্দা জানিয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় সামরিক অভিযান নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ মহাসচিব। দুই দেশকেই সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান তিনি। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সামরিক সংঘাত বিশ্ব বহন করতে পারে না।’

ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রুভেন আজার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘ভারতের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে ইসরায়েল। সন্ত্রাসীদের জানা উচিত, নিরপরা্রৃ মানুষের বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ করে পার পেৃয়ে তাদের লুকানোৃর কোনও জায়গা নেই।’

জাপানের মন্ত্রিপরিষদের প্রধান সচিব ইয়োশিমাসা হায়াশি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জ়াপান তীব্র নিন্দা জানায়। একইসঙ্গে আমাদের উদ্বেগ, পরিস্থিতি আরও প্রতিশোধমূলক অবস্থানের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আমরা ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই সংযম প্রদর্শন এবং সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্য জোরালোভাবে আহ্বান জানাচ্ছি।’

দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর ভারত ও পাকিস্তানকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে ফ্রান্স।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন সুলতান বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ভারত ও পাকিস্তানকে সংযম প্রদর্শন, উত্তেজনা কমাতে এবং আরও উত্তেজনা রোধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কূটনীতি এবং সংলাপই শান্তিপূর্ণভাবে সংকট সমাধানের এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধির জন্য জাতিগুলোর অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’