কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলায় রাষ্ট্রীয় মদদ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান। তবে, দেশটির নেতারা প্রায়ই স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে থাকেন। পাশাপাশি পাকিস্তান স্বীকার করেছে, ১৯৯০-এর দশকে তারা কিছু জঙ্গি গোষ্ঠীকে অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।
২২ এপ্রিল কাশ্মীরে হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ বলেন, লস্কর-ই-তৈয়বার মতো সংগঠনগুলো এখন নিষ্ক্রিয়।
জিহাদপন্থি গোষ্ঠীগুলোর বিশ্লেষক ও লাহোর-ভিত্তিক গবেষক মাজিদ নিজামী জানান, আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) চাপের মুখে পাকিস্তান লস্কর-ই-তৈয়বার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং সংগঠনটির অর্থ-সম্পদ জব্দ করেছে। ভারতের কড়া সীমান্ত নিরাপত্তার কারণে নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে অনুপ্রবেশ এখন ‘প্রায় অসম্ভব’ হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন নিজামী।
কাশ্মীর সংকটের সূচনা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজন থেকে। ওই সময় ধর্মভিত্তিক দুটি দেশের জন্ম হয়—হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান। ওই বছর অক্টোবরে কাশ্মীরের মুসলিম-প্রধান রাজ্যের হিন্দু শাসক রাজ্যটিকে ভারতে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীরকে নিজের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং সামরিকভাবে তা দখল করার চেষ্টা চালায়। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে কাশ্মীর ভাগ হয়ে যায়।
১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর,ওই যুদ্ধবিরতির রেখাই ‘লাইন অব কন্ট্রোল'(এলওসি) নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে ভারত কাশ্মীরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, বাকি অংশ পাকিস্তানের দখলে রয়েছে। তবে এই বিরোধ এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
কাশ্মীরের ভারত-শাসিত অংশে বিদ্রোহ ১৯৮০-এর দশকে শুরু হয়, যা মূলত স্থানীয় অসন্তোষের ফলে তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে পাকিস্তান কিছু গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে শুরু করে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
১৯৮৭ সালের স্থানীয় নির্বাচন ব্যাপকভাবে কারচুপি হিসেবে দেখা হয়, যেখানে মুসলিম দলগুলোর জোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানি-এর রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি বলেন, ‘এর ফলে কাশ্মীরের রাজনৈতিক কর্মীরা মনে করতে শুরু করেন, তারা আর ভোটে তাদের রাজনৈতিক দাবি পূরণ করতে পারবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে মূলত স্থানীয় বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে, তবে পরবর্তীতে পাকিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো এই বিদ্রোহে জড়িত হয়।’
যেসব কাশ্মীরভিত্তিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে কিছু কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়েছিল। আবার কিছু ভারতের কাশ্মীর অংশকে পাকিস্তানে যুক্ত করতে চেয়েছিল।
১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তান কাশ্মীর ও নিজ দেশের মধ্যে বেশ কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করে। পরে এই সহযোগিতার বিষয়টি বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তাও স্বীকার করেন, যার মধ্যে সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মুশারফও ছিলেন।
২০০২ সালের পর বিদ্রোহের মাত্রা কিছুটা কমে আসে, পাকিস্তান কিছু প্রধান সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করে, যদিও লস্কর-ই-তৈয়বা কিংবা জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো সংগঠন বিভিন্ন ছদ্মনামে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। এরপর একে একে সন্ত্রাস বিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ভারতের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে ৯/১১-এর পরবর্তী হস্তক্ষেপের চাপের ফল ছিল।
শান্তি প্রক্রিয়া ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলা পরবর্তী সময়ে ভেঙে যায়। এ হামলায় ১৬৬ জন নিহত হন এবং এর জন্য লস্কর-ই-তৈয়বাকে দায়ী করা হয়।
কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা
কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। বহুবার সামরিক অভিযান, পুলিশি দমন-পীড়ন ও সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের পর থেকে কাশ্মীর বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে সামরিকীকৃত এলাকা হিসেবে রয়ে গেছে।
২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতের সংবিধানের এক অংশ বাতিল করে, যা জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে আংশিক স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পূর্ণ একীভূত করার চেষ্টা করা হয়, যা মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার অংশ ছিল।
তার সরকার নয়াদিল্লি থেকে অঞ্চলটি সরাসরি শাসন করতে শুরু করে, ওই অঞ্চলে বিশাল নিরাপত্তা উপস্থিতি আনা হয় এবং বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার মানুষ, এমনকি রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়; গণতন্ত্র স্থগিত রাখা হয়।
পাকিস্তান ভারতের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। তবে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরেও সহিংসতা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ভারত শাসিত কাশ্মীরে সরাসরি শাসন সহিংসতার মাত্রা কমিয়ে দিয়েছে। গত বছর ভোটগ্রহণও পুনরায় শুরু হয়েছে। তবে মোদির দলকে নিয়ে কাশ্মীরিদের মধ্যে অসন্তোষ রয়ে গেছে, বিশেষ করে কাশ্মীরিদের জীবনে তাদের কঠোর নজরদারির কারণে।


