জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী কৃষিকাজ ও পরিবেশ ব্যবস্থায় যে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হচ্ছে, তার অন্যতম দৃষ্টান্ত ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের মাটির অবক্ষয়। ২০২৫ সালের ইউরোপীয় এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি (EEA) এবং যুক্তরাজ্যের ন্যাচারাল ইংল্যান্ড কর্তৃক প্রকাশিত যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৬০% এবং যুক্তরাজ্যের ৪০% কৃষিজমি বর্তমানে গুরুতর মাটির অবক্ষয়ের শিকার। এই সংকটের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, বাস্তুসংস্থান ও জলবায়ু স্থিতিশীলতা একযোগে হুমকির মুখে পড়েছে।
মাটির অবক্ষয় বলতে বোঝায় এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ভূ-উপরিস্থিত মাটির গঠন, রাসায়নিক গুণাগুণ ও জৈব বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। ইউরোপীয় এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর EU অঞ্চলে আনুমানিক ৯৭০ মিলিয়ন টন মাটি ক্ষয়ে যায়, যা খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সাধন করে।
FAO (Food and Agriculture Organization)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, মাটির এক সেন্টিমিটার গঠিত হতে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বছর সময় লাগে, অথচ বর্তমান হার অনুযায়ী প্রতি ১৬ সেকেন্ডে বিশ্বব্যাপী এক ফুটবল মাঠ সমান উর্বর মাটি হারিয়ে যাচ্ছে।
১৯৬০ সালের পর থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে উচ্চফলনশীল শস্য (HYV) ও মনোকালচারের প্রসার ঘটে। প্রতিবছর একই জমিতে একই ধরনের ফসল চাষের ফলে মাটির পুষ্টি উপাদান একঘেয়ে ভাবে নিঃশেষিত হচ্ছে।
২০০০-২০২০ সালের মধ্যে ইউরোপে নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের ব্যবহার ২৫% বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির জীববৈচিত্র্য ৪০-৬০% পর্যন্ত কমে যায়।
ইউরোস্ট্যাট (Eurostat)-এর তথ্য মতে, ২০১০-২০২০ সালে প্রতি বছর ইউরোপে গড়ে ৯৭০ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি নগরায়নের কারণে হারিয়ে গেছে। এতে ভূমির অনুর্বরতা দ্রুত বেড়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের Joint Research Centre (JRC) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপে গম উৎপাদন ১০-১৭% কমে যেতে পারে মাটির অবক্ষয়ের কারণে।
২০২৩ সালের Nature Climate Change জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, অবক্ষয়যুক্ত মাটি প্রতি হেক্টরে বছরে ১-৩ টন কম কার্বন ধরে রাখতে পারে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
অবক্ষয়িত জমি থেকে নাইট্রেট ও ফসফেট মিশ্রিত পানির প্রবাহ নদী ও জলাধার দূষণ করে। EU Water Framework Directive অনুযায়ী, ৪০% নদী-জলাশয় ইতোমধ্যে এই দূষণের শিকার।
কম চাষ, মাটির আবরণ রক্ষা ও ফসল আবর্তনের সমন্বয়ে গঠিত এই পদ্ধতিটি ইতোমধ্যে ফ্রান্স ও জার্মানিতে পরীক্ষামূলকভাবে ২০% জমিতে কার্যকর।
বিজ্ঞানসম্মত তথ্যের ভিত্তিতে সারের সঠিক মাত্রা নিরূপণ ও জমির প্রয়োজনমতো পানিপ্রয়োগ প্রযুক্তি বর্তমানে যুক্তরাজ্যের রথামস্টেড ইনস্টিটিউট (Rothamsted Institute)-এ গবেষণাধীন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২১ সালের Soil Strategy অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে EU অঞ্চলের সমস্ত মাটিকে ‘Healthy Soil’ ক্যাটাগরিতে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের কৃষিজমিতে মাটির অবক্ষয় একটি বহুমাত্রিক বৈজ্ঞানিক, পরিবেশগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ। FAO-এর মতে, “Healthy soil is the foundation of food systems.” তাই অবিলম্বে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিপদ্ধতি, পরিবেশসম্মত নীতি এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে এই সংকট মোকাবিলা অপরিহার্য। বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক দক্ষিণ দেশগুলোর জন্যও এটি সতর্কসংকেত—কারণ একই ধরনের কৃষিনীতি আমাদের মাটিতেও অনুরূপ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।


