Home Blog Page 98

রুডলফ জারিপভের – সাইবারনেটিক মিউজিক

১৯৫০-৬০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সাইবারনেটিক্স ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিকাশ ছিল রাজনৈতিক ও দার্শনিক বাধায় আবদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে রুডলফ জারিপভের অ্যালগরিদমিক সংগীত রচনার কাজ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

নরবার্ট উইনারের প্রতিষ্ঠিত সাইবারনেটিক্স তত্ত্ব মূলত কম্পিউটার ও জীববিজ্ঞানের ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নে এটি পুঁজিবাদী পশ্চিমের ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হয়। বিশেষ করে ট্রোফিম লাইসেঙ্কোর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আধুনিক জেনেটিক্স ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানগুলোকে “বুর্জোয়া ষড়যন্ত্র” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই মনোভাব সাইবারনেটিক্সকেও ‘বুর্জোয়া’ তকমা দিয়ে গবেষণার বাইরে ঠেলে দেয়।

স্তালিনের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তিত হয়। ১৯৫৫ সালে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সাইবারনেটিক্সের উপর আনুষ্ঠানিক সেমিনার শুরু হয়, যা এই ক্ষেত্রের গবেষণাকে বৈধতা দেয়। ঠিক তখনই রুডলফ জারিপভ তার অ্যালগরিদমিক সংগীত রচনার কাজ শুরু করেন।

জারিপভের কাজের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সংগীতের নিয়মগুলোকে গণিতের ভাষায় রূপান্তর করা এবং কম্পিউটারে সেগুলো প্রয়োগ করা। তাঁর ১৯৬০ সালের একাডেমিক প্রকাশনায় সংগীতের প্রতিটি ফ্রেজের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মাবলী বর্ণিত হয়েছে, যেমন কর্ডের ব্যবহার, ইন্টারভালের সীমাবদ্ধতা এবং সুরের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ। যদিও এই নিয়মগুলো প্রযুক্তিগতভাবে কঠোর, জারিপভের সংগীতজ্ঞ মনোভাব সৃষ্টিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় নান্দনিকতা বজায় রেখেছিল।

এই কাজের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন সংগীত রচনা কেবল আবেগনির্ভর সৃষ্টিশীলতা নয়, বরং নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ও নিয়মের মধ্য দিয়ে গঠিত একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া। এটি সাইবারনেটিক্সের মূল তত্ত্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে জটিল সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য ফিডব্যাক ব্যবস্থার গুরুত্ব থাকে।

সোভিয়েত ইউনিয়নে সাইবারনেটিক্সের বিরুদ্ধে প্রচার ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ছিল মূলত একটি দার্শনিক ও আদর্শগত বিরোধ। সাইবারনেটিক্সের বহুমাত্রিকতা এবং জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগের সম্ভাবনা সোভিয়েত আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। বিশেষ করে, মানুষের শ্রমের গুরুত্ব কমিয়ে যন্ত্রের আধিপত্য বিস্তারকে তারা বিপজ্জনক মনে করেছিল।

এই দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও স্তালিনের মৃত্যুর পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে কিছুটা মুক্ততা আসে, যা জারিপভের মতো বিজ্ঞানীদের কাজের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে। তাঁর ‘ইউরাল চ্যান্টস’ সোভিয়েত প্রেক্ষাপটে প্রথম কার্যকর অ্যালগরিদমিক সংগীতচর্চার নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃতি পায়।

বর্তমান যুগে সংগীত রচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ব্যাপক। ডিপ লার্নিং ও নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংগীতের বিশাল ডাটাসেট থেকে শেখার মাধ্যমে নতুন সুর তৈরি করা হচ্ছে। ট্রান্সফরমার মডেল যেমন ChatGPT-এর মতো ভাষা মডেল সংগীতের স্ট্রাকচার অনুকরণ করে নতুন সৃষ্টি করছে।তবে এই প্রযুক্তির উন্নতির মধ্যেও অনেক সংগীতজ্ঞ হতাশ। তারা মনে করেন, এআই-র তৈরি সংগীত অনেক সময় মানব সৃষ্টিশীলতার গভীরতা ও আবেগের অভাব বোধ করে। জন সাপকোর মতো সংগীতজ্ঞরা এআই-র সংগীতকে “তৃতীয় শ্রেণীর অনুকরণ” হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা প্রযুক্তির অপব্যবহার।

জারিপভের কাজ থেকে আমরা দেখতে পাই সংগীত রচনার প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি একটি সহায়ক হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু সৃজনশীলতার মূল উৎস মানুষের আবেগ ও বোধ। জারিপভ নিজে বলেছেন, “যন্ত্র ও সাইবারনেটিক পদ্ধতি মানুষের সৃষ্টিশীলতার রহস্য উন্মোচনে শক্তিশালী সহায়ক, কিন্তু সংগীত তৈরির শিল্প মানুষেরই।”

রুডলফ জারিপভের অ্যালগরিদমিক সংগীত রচনা সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠোর রাজনৈতিক পরিবেশে প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। তার কাজ সাইবারনেটিক্সের দার্শনিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সংগীতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তার চিন্তাধারা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন মানবিক সৃষ্টিশীলতা ও নান্দনিকতার স্থান অপরিবর্তিত থাকবে।

চাটুকারিতা নাকি মোকাবিলা – বিশ্বনেতারা কীভাবে সামলাবেন ট্রাম্পকে ?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন। এই সফর ছিল বিশ্বমঞ্চে তিনি নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করতে চান, তার একটি নিখুঁত উদাহরণ। এসময় তাকে দেওয়া হয়েছে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা, পেয়েছেন শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ও প্রশংসায় ভরা বক্তব্য।

উপসাগরীয় অঞ্চলের শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পকে এমন সম্মান দিলেও বিশ্বের সব দেশ কিন্তু একই পথে হাঁটেনি। কয়েক সপ্তাহ ধরে চীন তো কোনও প্রশংসাই করেইনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও আগ্রহ দেখায়নি বেইজিং। উভয় দেশের আরোপিত শাস্তিমূলক শুল্ক বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি করলেও চীন ছিল নীরব।

তবে প্রশংসা না পেলেও ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পিছু হটেন। গত সোমবার লেক জেনেভার তীরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তারা পারস্পরিক শুল্ক আরোপে নাটকীয়ভাবে হ্রাস করার সিদ্ধান্তে পৌঁছান।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে— চাটুকারিতা নাকি মোকাবিলা? ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর প্রায় চার মাস কেটে গেছে, কিন্তু এখনও বিশ্বনেতারা দ্বিধায় ভুগছেন, তাকে কীভাবে সামলাবেন।

ট্রাম্প একজন খামখেয়ালি ও অপ্রত্যাশিত নেতা। তার লক্ষ্য বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা। তিনি বাণিজ্য থেকে শুরু করে সংঘর্ষ নিষ্পত্তি পর্যন্ত সবখানেই চুক্তি করতে চান।

কিছু দেশ উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো পথ বেছে নিচ্ছে—বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিচ্ছে এবং ট্রাম্পের অহংবোধকে তুষ্ট করতে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করছে। অন্যদিকে কিছু দেশ সরাসরি বিরোধিতা করছে এবং আরও বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

যুক্তরাজ্য ট্রাম্পকে শান্ত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে এবং দ্রুত একটি বাণিজ্য চুক্তিও করতে সক্ষম হয়েছে। এই চুক্তি কয়েকটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকলেও প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পকে বলেন, “এটি আপনার নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক।”

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একেবারেই আলাদা পথে হাঁটছে। তারা মনে করে, দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি লাভবান হবে। অবশ্য এ পথে কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।

বিশ্বনেতারা বুঝে গেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হতে পারে, তবে তা পুনর্গঠন করাও সম্ভব। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখন ট্রাম্পের সঙ্গে আগের চেয়ে ভালো সম্পর্কে রয়েছেন। যদিও ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল।

ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেন নিয়ে তুলনামূলকভাবে নরম অবস্থান নিয়েছেন। যদিও এর আগে তিনি কিয়েভের প্রতি বিরূপ ছিলেন এবং রাশিয়ার একপেশে শান্তিচুক্তির দাবি সমর্থন করেছিলেন। ট্রাম্পের এই পরিবর্তিত মনোভাব ইউরোপীয় দেশগুলোর আশাবাদ বাড়িয়েছে। তারা আশা করছে, বাণিজ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও ট্রাম্প হয়তো এখন থেকে কিছুটা নমনীয় হবেন।

চীনের রেনমিন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ওয়াং ইওয়েই বলেন, “ট্রাম্পের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে চীনের সফল প্রতিরোধের একটি শিক্ষা হলো—তাকে খুশি করতে গিয়ে নতি স্বীকার করা যাবে না।” তার মতে, বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার পক্ষে থাকা দেশগুলোর উচিত ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকা।

নিউইয়র্কভিত্তিক ফার্স্ট ঈগল ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক ইদান্না অ্যাপিও বলেন, “বিশ্বের খুব বেশি দেশ চীনের কৌশল সরাসরি অনুসরণ করতে পারবে না। কারণ তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা চীনের মতো নয়। তবে শিক্ষা হলো—ট্রাম্প পর্যাপ্ত চাপ অনুভব করলে পিছু হটেন। সেক্ষেত্রে নিজ দেশে কিছুটা ক্ষতি মেনে নেওয়া সার্থক হতে পারে।”

হাডসন ইনস্টিটিউটের রাফ বলেন, “চীন একটি ভিন্ন শ্রেণির দেশ। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে তারা বাণিজ্য নিয়ে এমনভাবে সংঘাতে যেতে পারে, যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা পারবে না।”

আইফোনের কারখানা ভারতে নয় , যুক্তরাষ্ট্রে করতে বললেন – ট্রাম্প

ভারত থেকে আইফোনের অ্যাসেম্বলিং ফ্যাক্টরি তথা সংযোজন কারখানা যদি যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করা হয়, তাহলে দেশটি কর্মসংস্থান হারাবে। তবে এর চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতি হবে আইফোনের প্রস্তুতকারক অ্যাপল আর যুক্তরাষ্ট্রের—এমনটাই মন্তব্য করেছেন গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব।

এএফপির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সফরে কাতারে অবস্থানের সময় অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও টিম কুকের উদ্দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আপনি বছরের পর বছর ধরে চীনে যতগুলো কারখানা বানিয়েছেন, আমরা সেগুলো মেনে নিয়েছি। আমরা চাই না আপনি ভারতে (কারখানা) পণ্য তৈরি করেন। আমরা চাই আপনি সেগুলো, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করেন।’

দ্য ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কারখানায় কেবল আইফোনের চূড়ান্ত সংযোজন হয়। এতে কম মুনাফা হলেও কার্যক্রমটি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।

জিটিআরআইয়ের প্রতিবেদনে এক হাজার ডলারের একটি আইফোনের মূল্যপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী বলা হয়েছে, কোয়ালকম ও বোর্ডকমের মতো মার্কিন কোম্পানি ৮০ ডলার, তাইওয়ান চিপ উৎপাদনের জন্য ১৫০ ডলার, দক্ষিণ কোরিয়া ওএলইডি ও মেমোরির জন্য ৯০ ডলার এবং জাপান ক্যামেরার জন্য ৮৫ ডলার আয় করে। জার্মানি, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া পায় ৪৫ ডলার।

ভারত ও চীন মাত্র ৩০ ডলার পায়, যা মোট মূল্যের ৩ শতাংশের কম। যদিও আইফোন চূড়ান্ত সংযোজনের প্রধান স্থান ভারত। এতে মূল্য সংযোজন কম হলেও কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীনে প্রায় ৩ লাখ এবং ভারতে ৬০ হাজার কর্মী আইফোন সংযোজনের কাজে নিযুক্ত রয়েছেন।

এদিকে সংযোজন কাজ যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হলে অ্যাপলের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। এ কাজের জন্য ভারতে একজন কর্মী মাসিক গড় বেতন পান প্রায় ২৯০ ডলার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ন্যূনতম মজুরি আইনের অধীনে এটি ১৩ গুণ বেড়ে ২ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

তাতে প্রতিটি আইফোনের সংযোজন ব্যয় ৩০ ডলার থেকে একলাফে ৩৯০ ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে অ্যাপলের প্রতিটি ডিভাইস বিক্রির বিপরীতে পাওয়া মুনাফা ৪৫০ ডলার থেকে কমে একলাফে মাত্র ৬০ ডলারে নেমে আসতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে যদি আইফোনের দাম বাড়ানো হয়, তা আবার মার্কিন ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অ্যাপলের ৮৫ শতাংশ আইফোন এখন চীনে সংযোজন হয়। ভারতে হয় মাত্র ১৫ শতাংশ। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিবৃতি অবশ্য ভারতকে চলমান বাণিজ্য আলোচনায় চাপ দেওয়ার কৌশলও হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।


রাগনারক – নর্স পুরাণের মহাকাব্যিক প্রলয় ও পুনর্জন্মের মহাজাগরণ

প্রাচীন নর্স পুরাণের অন্যতম প্রখ্যাত কাহিনী রাগনারক কেবল একটি মহাযুদ্ধের বর্ণনা নয়, এক জটিল দার্শনিক ধারণা, যেখানে ধ্বংস ও পুনর্জন্মের এক জটিল চক্র ফুটে ওঠে। “দেবতাদের সন্ধ্যা” বা “দেবতাদের পরিণতি” হিসেবে পরিচিত এই রাগনারক বর্ণনা করে সেই শেষ যুদ্ধের কাহিনী, যেখানে দেবতা, দৈত্য ও বিভিন্ন মহাজাগতিক প্রাণীর মধ্যকার সংঘাত পৃথিবীকে ধ্বংসে নিয়ে যাবে, তবে সেই ধ্বংসের মধ্য দিয়েই নতুন পৃথিবীর সূচনা ঘটবে।

রাগনারকের গল্প প্রাচীন আইসল্যান্ডীয় সাহিত্য পোয়েটিক এড্ডা ও প্রোউস এড্ডা থেকে পাওয়া যায়। এখানে বলা হয়েছে, দীর্ঘ তিন বছরের নির্মম শীত ফিম্বুলউইন্টার পৃথিবীকে ঢেকে রাখবে। তখন মানুষ নৈতিকভাবে অবক্ষয় লাভ করবে, যেখানে পরিবার, সমাজ ও সম্প্রদায়ের বন্ধন ভেঙে পড়বে। একদিকে দেবতারা, অন্যদিকে দৈত্যরা এবং তাদের অনুসারীরা মহাযুদ্ধে লিপ্ত হবে।

এই যুদ্ধে প্রধান দেবতা ওডিন মারা যাবে ভয়ংকর নেকড়ে ফেনরির হাতে। বজ্রদেবতা থর ধ্বংস করবে মহাসাপ যোরমুঙ্গান্দকে, কিন্তু বিষের কারণেও নিজেই প্রাণ হারাবে। প্রতারক দেবতা লোকি ও ঈশ্বর হেইমডাল পরস্পরকে হত্যা করবে। সবশেষে আগুনের দৈত্য সুরতর আগুনের একটি মহাজাগতিক শিখায় পুরো বিশ্বকে জ্বালিয়ে দেবে।

তবে এই পরিণতি চূড়ান্ত নয়, পৃথিবী থেকে মৃত্তিকা উঠে আবার নতুন জীবন ফিরে আসবে, বেঁচে থাকা দুই মানুষ লিফ ও লিফথ্রাসির মানব জাতির পুনর্জন্ম ঘটাবে এবং কিছু দেবতাও ফিরে আসবে।

রাগনারক কেবল এক প্রলয়কাহিনী নয়, এটি গভীর দার্শনিক মেসেজ বহন করে। নর্স মিথোলজিতে সময়কে একটি বৃত্তাকার বা চক্রাকার প্রক্রিয়া হিসেবে ধরা হয়, যেখানে প্রত্যেক প্রলয়ের পরই নতুন সূচনা হয়। ধ্বংস ও সৃষ্টি এক অপরিহার্য সম্পর্কের দুই ধাপ, যা জীবন ও জগতের চিরন্তন চক্রকে প্রতিফলিত করে।

লোকির মুক্তি ও ধ্বংসের আগমন মানুষের অন্তর্গত অশুভ ও বিশৃঙ্খলার প্রতীক। লোকির শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলা অর্থ নৈতিক ও সামাজিক নিয়মের অবক্ষয়। সেই সাথে ফেনরির ও যোরমুঙ্গান্দের আগমন বিশ্বব্যবস্থার বিপর্যয়কে নির্দেশ করে।

সুরতরের আগুন পৃথিবীকে দগ্ধ করে ধ্বংস করা হলো এক প্রবল চেতনার প্রতীক—পুরাতন সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে নতুন এক অচেনা পৃথিবীর জন্ম। এটি এক ধরণের পুনর্জাগরণের আগুন, যা প্রাচীন নর্স বিশ্বাসে পবিত্র ও অপরিহার্য।

রাগনারক কাহিনী প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কঠোর, যুদ্ধপ্রবণ এবং কঠিন জীবনযাপনের সমাজ থেকে উদ্ভূত। সেখানকার মানুষদের জন্য জীবন ছিল অস্থির ও অসম্মানজনক মৃত্যু অতি সাধারণ। তারা বিশ্বাস করতেন যে দেবতারা প্রলয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বের পুনর্গঠন ঘটায়। এই বিশ্বাস তাদের সাহসী ও লড়াকু মনোভাবের উৎস ছিল।

রাগনারক তাদের কাছে ছিল ভবিষ্যতের অন্ধকার দুর্যোগের পূর্বাভাস, যাকে পার হয়ে নতুন এক যুগের সূচনা হবে। এটি একটি শক্তিশালী জীবন-বিমুখতা নয় বরং একটি জীবনের পুনর্নবীকরণের কাহিনী, যেখানে মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও আশা জাগে।

আজকের দিনে রাগনারকের ধারণা শুধু নর্স পুরাণের অংশ নয়, বরং বিশ্বজনীন প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। আধুনিক সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং গেমিং জগতেও রাগনারকের থিম ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। যেমন মার্কিন মার্ভেল সিনেমা ‘থর: রাগনারক’ এর গল্পভিত্তি যদিও অনেকাংশে পৃথক, তবুও এতে ধ্বংস ও পুনর্জন্মের রাগনারক থিম স্পষ্ট।

গবেষকরা মনে করেন, রাগনারক কেবল ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং একটি মানবজীবনের চিরন্তন সত্যের প্রতিফলন যেখানে প্রতিটি জীবনের শেষে মৃত্যু আসে, কিন্তু তারপরেই নতুন সূচনা।

রাগনারক কাহিনী প্রাচীন নর্সদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের একটি পরম্পরাগত চিত্র যা আজও মানব ইতিহাস ও দর্শনে গুরুত্ব বহন করে। ধ্বংস ও পুনর্জন্মের এই মহাকাব্যিক চক্র আমাদের শেখায় যে, শেষের অন্ধকারেও থাকে নতুন সূর্যের আলোর সম্ভাবনা। এটি শুধু পুরাতন দেবতাদের যুদ্ধের গল্প নয়, বরং মানব জীবনের, প্রকৃতির এবং মহাবিশ্বের চিরন্তন বৃত্তাকার গতির এক দার্শনিক বর্ণনা।

এতদিন পর্যন্ত ‘অপ্রয়োজনীয়’ মনে করা হতো , এমন একটি মানব অঙ্গ আবিষ্কার

এক সময় ধারণা করা হতো কিছু শারীরিক অঙ্গের কোনো বিশেষ কার্যকারিতা নেই। নারীদেহের একটি অঙ্গ রিটে ওভারি (Rete Ovarii)—তেমনই একটি দীর্ঘদিন অবহেলিত অংশ, যাকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান আবারও প্রমাণ করলো প্রকৃতিতে কিছুই আসলে অপ্রয়োজনীয় নয়।

সম্প্রতি eLife নামক জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঙ্গটি ovary-র কার্যক্রম ও নারীর উর্বরতা রক্ষা করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণাটি মূলত ইঁদুরের উপর চালানো হলেও, এর ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

কী এই রিটে ওভারিই?

রিটে ওভারিই মূলত একটি সূক্ষ্ম নালী-নির্মিত নেটওয়ার্ক, যা ডিম্বাশয়ের পাশে অবস্থান করে। অতীতে এর কোনও কার্যকর ভূমিকা পাওয়া যায়নি বলেই এটিকে ‘বিকাশগত অবশিষ্টাংশ’ (vestigial organ) হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঙ্গটি ডিম্বাশয়ের আশেপাশে থাকা প্রোটিনসমৃদ্ধ তরল নিয়ন্ত্রণ করে এবং হরমোন যেমন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের সংকেত বুঝতে পারে।

গবেষকরা রিটে ওভারি-কে তিনটি স্বতন্ত্র অংশে বিভক্ত করতে পেরেছেন এবং দেখেছেন যে প্রতিটি অংশই ডিম্বাণু তৈরির জৈবিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন তৈরি করে। এমনকি এই অঙ্গটি “অ্যান্টেনা”-র মতো কাজ করে, অর্থাৎ শরীরের ভিতরে hormonal পরিবর্তনের সংকেত গ্রহণ করে এবং সেগুলো ডিম্বাশয়ে পাঠিয়ে তার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।

এই নতুন তথ্যগুলো শুধু একটি অঙ্গকে পুনর্মূল্যায়ন করাই নয়, বরং নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নতুন দিক উন্মোচন করছে। যদি দেখা যায়, রিটে ওভারি অঙ্গটি সরিয়ে দিলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরাসরি প্রভাব পড়ে, তবে তা আরও স্পষ্ট করে দেবে যে এই অবহেলিত অঙ্গটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

যেহেতু রিটে ওভারি কেবল ইঁদুরে নয়, অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীতে দেখা যায় এবং প্রজননের প্রাথমিক বিকাশ প্রক্রিয়াগুলো সাধারণত প্রায় একই রকম হয় তাই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মানব দেহেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

৭০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের , নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে ওমান –

ওমান মধ্যপ্রাচ্যের একটি তেল-নির্ভর দেশ, যার মরুভূমি আর গ্রীষ্মপ্রধান জলবায়ু বছরের প্রায় পুরোটা সময় সূর্যের তীব্র আলোয় ঝলমল করে। এই আলোক-সাশ্রয়ী ভূপ্রকৃতি এখন এক বিপ্লবের মুখোমুখি, সেটা হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব। সম্প্রতি ওমান সরকার এবং ইউনাইটেড সোলার পলিসিলিকন যৌথভাবে একটি ৭০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ফটোভোলটাইক (PV) সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের চুক্তি করেছে, যার মাধ্যমে দেশটি নবায়নযোগ্য শক্তির এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

এই প্রকল্পটি শুধু একটি সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সোলার ভ্যালু চেইন’ গঠনের পরিকল্পনার অংশ। ইউনাইটেড সোলার পলিসিলিকন একটি চীনা প্রতিষ্ঠান, যারা উচ্চমানের পলিসিলিকন তৈরি করে, যা সৌর প্যানেল তৈরির অপরিহার্য উপাদান। ওমানের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি OQ এর সঙ্গে তাদের এই যৌথ উদ্যোগ দেশটির ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে ওমানে স্থানীয়ভাবে পলিসিলিকন উৎপাদন থেকে শুরু করে সৌর প্যানেল নির্মাণ, এবং শেষ পর্যন্ত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ এই পুরো চক্র দেশীয়ভাবে পরিচালিত হবে। এর ফলে ওমান শুধু সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদক নয়, বরং প্রযুক্তি ও জ্বালানি রপ্তানিকারক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

৭০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থ, বছরে প্রায় ১২ লাখ টন কার্বন নির্গমন হ্রাস সম্ভব হবে,যা প্রায় ২ লাখ গাড়ির বার্ষিক দূষণের সমান। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সালালাহ ফ্রি জোনে নির্মিত হবে, যেখানে পর্যাপ্ত জমি, সূর্যপ্রকাশ এবং অবকাঠামো সুবিধা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় লক্ষাধিক সৌর প্যানেল বসানো হবে, যা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সৌর ফার্ম হিসেবে কাজ করবে। এটি ডিজিটাল মনিটরিং, স্মার্ট গ্রিড ইন্টিগ্রেশন এবং অটোমেটেড ক্লিনিং সিস্টেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।

ওমান সরকার তার ভিশন ২০৪০ নামক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপকল্পে জ্বালানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করতে চায়। বর্তমানে দেশটির ৭০% এর বেশি বিদ্যুৎ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আসে। এই নির্ভরতা জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ।এই সৌর প্রকল্প সেই নির্ভরতাকে কমিয়ে আনার প্রথম বৃহৎ পদক্ষেপ। Renewable Energy Development Plan অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ওমান ৩০% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করতে চায়।

এই প্রকল্পে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে হাজার হাজার লোকের সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা ওমানের যুবকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। স্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশলী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হবে। পাশাপাশি ওমান তাদের ‘নলেজ ইকোনমি’ গঠনে নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।

ওমানের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিযোগিতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সৌদি আরব ইতিমধ্যে NEOM শহরে ৫০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও Masdar City-তে ক্লিন এনার্জি ও গ্রিন সিটিজ গড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ওমানের ৭০০ মেগাওয়াট প্রকল্প তাদের একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাবে। এটি তাদের চীন, ভারত, আফ্রিকা ও ইউরোপের গ্রিন এনার্জি হাব হিসেবে জ্বালানি রপ্তানিমুখী রাজনীতি পুনর্বিন্যাস করতেও সহায়তা করবে ।

ইউনাইটেড সোলার পলিসিলিকনের এই অংশীদারিত্ব প্রযুক্তির স্থানান্তর নিশ্চিত করবে। এর ফলে ওমানের প্রকৌশলীরা আন্তর্জাতিকমানের সৌর প্রযুক্তি ব্যবহার, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। এই জ্ঞান বিনিময় ভবিষ্যতের আরো বৃহৎ প্রকল্পের জন্য প্রস্তুত করবে স্থানীয় শ্রমশক্তিকে।

এই প্রকল্প বিশ্বকে বার্তা দিচ্ছে সৌরশক্তি শুধু উন্নত দেশগুলোর একচেটিয়া নয়। মরুভূমি, তপ্ত বাতাস আর খালি জমি এই তিনটিই একত্রে নবায়নযোগ্য শক্তির সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বিনিয়োগের সাহস থাকে। ওমানের এই সাহসী পদক্ষেপ ভবিষ্যতের জন্য এক পথনির্দেশক হতে পারে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার মরু বা শুষ্ক অঞ্চলগুলোর জন্য।

ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলায় , গাজায় একদিনে নিহত ২৫০ –

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ হামলায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একদিনে এত প্রাণহানির ঘটনা চলমান যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ পর্ব বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষে গাজার দুর্দশা ও খাদ্যসংকটের কথা স্বীকার করেছেন। ট্রাম্প শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের ফিলিস্তিনিদের দিকেও নজর দিতে হবে। জানেন তো, গাজায় অনেক মানুষ না খেয়ে আছে। তাই আমাদের উভয় পক্ষকেই দেখতে হবে। ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে ভালো কিছু হবে বলে তিনি আশাবাদী।

শুক্রবারের বিমান ও কামান হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল গাজার উত্তরের শহর বেইত লাহিয়া ও জাবালিয়া শরণার্থী শিবির। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র খালিল আল-দেকরান জানান, এসব এলাকায় রাতভর হামলায় বহু নারী ও শিশুর প্রাণ গেছে।

বেইত লাহিয়ার ওপর প্যারাসুটে করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রচারপত্র ফেলেছে, যেখানে বলা হয়েছে, আপনি যেখানেই থাকুন—তাঁবু, আশ্রয়কেন্দ্র বা ভবনে—এলাকা ছেড়ে দক্ষিণে চলে যান। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা শুক্রবার গাজাজুড়ে ১৫০টির বেশি ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তু’তে হামলা চালিয়েছে।

৫ মে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, গাজায় জোরালো সামরিক অভিযান চালানো হবে। নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা পুরো গাজা উপত্যকা দখল ও মানবিক সহায়তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা অনুমোদন করে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর শেষে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির কোনও অগ্রগতি ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করেন। তার সফর শেষে এখন ইসরায়েল বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে, প্রায় ১০ লাখ গাজাবাসীকে লিবিয়ায় স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে অবগত পাঁচ কর্মকর্তার বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ এ খবর জানিয়েছে।

এই প্রতিবেদন তৈরির আগে, একাধিকবার অনুরোধ সত্ত্বেও এনবিসির কাছে কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ।

তবে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক মার্কিন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, এনবিসির প্রতিবেদনের দাবিগুলো মোটেই সত্য নয়। তিনি বলেছেন, এ ধরনের কোনও পরিকল্পনা কার্যকর করার পরিস্থিতি নেই। বাস্তবতা ভিন্ন। এমন অর্থহীন কোনও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়নি।

ধর্ম , বাণিজ্য ও সাম্রাজ্য – অষ্টাদশ শতকের ডাচ কেলভিনিজম

১৭শ শতকের শুরুতে আমস্টারডামের কয়েকজন প্রোটেস্ট্যান্ট পাদ্রি ও চ্যাপলিন ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (VOC) জাহাজে সঙ্গী হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট ছোট ডাচ বাণিজ্যিক স্থাপনায় যাত্রা শুরু করেন। এই ক্যালভিনিস্ট ধর্মযাজকরা মূলত কোম্পানির কর্মচারীদের ‘ভুল ধর্মে’ আকৃষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং স্থানীয় ‘হিথেন’ ও ‘মুর’ অর্থাৎ আদিবাসী ও মুসলিম জনগণকে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করতে গিয়েছিলেন।

এর ফলে ১৭শ শতকে ক্যালভিনিজম ইউরোপের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ১৭৯৯ সালে VOC বন্ধ হওয়ার আগেই ডাচ রিফর্মড চার্চ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ডজন ডজন গির্জা প্রতিষ্ঠা করে, শত শত স্কুল গড়ে তোলে এবং হাজার হাজার আদিবাসীকে খ্রিস্টান ধর্মে রূপান্তরিত করে।

ক্যাথলিক মিশনের শতাব্দী পর ক্যালভিনিস্টদের বৈশ্বিক প্রচেষ্টা শুরু হলেও, তাদের সংখ্যাও ছিল অনেক কম এবং ধর্মতত্ত্বের অন্যতম মূলনীতি ছিল ‘প্রিডেস্টিনেশন’ – ঈশ্বর সৃষ্টির আগেই প্রত্যেকের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে রেখেছেন। এই অবস্থায় ক্যালভিনিস্টরা কীভাবে এত বিস্তৃত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পেরেছিলেন? মূলত তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠা, ভাষা অনুবাদ ও স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এছাড়া তারা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে ইউরোপের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছিলেন।

১৬০২ সালে প্রতিষ্ঠিত VOC দ্রুত লাভজনক হয়ে ওঠে এবং এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য পরিচালনা করে। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত VOC-এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ২০ বছর পর, ডাচরা আটলান্টিক অঞ্চলের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (WIC) প্রতিষ্ঠা করে।

এই বাণিজ্যিক ও সাম্রাজ্যিক সম্প্রসারণের সঙ্গে ডাচ রিফর্মড চার্চের মিশনারি কার্যক্রম ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। ক্যালভিনিস্টরা বিশ্বাস করতেন, ডাচ প্রজাতন্ত্র ও কোম্পানিগুলোর সফলতা ঈশ্বরের ইচ্ছায় হয়েছে এবং এই সুযোগে তারা ‘হিথেন’ ও ‘মুর’দের কাছে খাঁটি খ্রিস্টধর্ম পৌঁছে দিতে পারবে। এমনকি কিছু ক্যালভিনিস্ট মনে করতেন, সঠিক বাইবেলীয় খ্রিস্টধর্ম প্রচার করলে মুসলিম ও ইহুদিদের বিশ্বব্যাপী রূপান্তর ঘটবে, যা যীশুর দ্বিতীয় আগমনকে ত্বরান্বিত করবে।

১৬০৫ থেকে ১৭৯৯ সালের মধ্যে প্রায় ১,০০০ ক্যালভিনিস্ট পাদ্রি VOC ও WIC-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন মহাদেশে ধর্মীয় প্রচার চালান। তারা শুধু কোম্পানির কর্মচারীদের সেবা করেন না, বরং আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী ও স্থানীয় জনগণকে খ্রিস্টান ধর্মে রূপান্তরিত করার চেষ্টা চালান। এটি ছিল ইউরোপের বাইরে প্রথম ও সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারি প্রচেষ্টা।

ডাচ ক্যালভিনিস্টরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ দক্ষ ছিলেন। ১৬০৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার আম্বোইনায় প্রথম VOC স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, নিউ নেদারল্যান্ড (বর্তমান নিউ ইয়র্ক), পশ্চিম আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল জুড়ে শত শত স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭০০ সালের মধ্যে শুধু ইস্ট ইন্ডিজে ৫৪টি স্কুলে ৫,১৯০ জন ছাত্র পড়াশোনা করত। শ্রীলঙ্কায় ১৬৬০-এর দশকে ৩০টি স্কুলে প্রায় ১৮,০০০ ছাত্র ছিল।

এই স্কুলগুলোতে স্থানীয় শিক্ষকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। ডাচরা স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে স্থানীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতেন, যারা শিশুদের পড়াতেন, ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন এবং অনেক সময় উপাসনা পরিচালনায় নেতৃত্ব দিতেন। এই স্থানীয় নেতৃত্ব ক্যালভিনিজমের টেকসই প্রসারে অপরিহার্য ছিল।

ক্যালভিনিস্টরা স্থানীয় ভাষায় বাইবেল, ক্যাটেকিজম ও ধর্মীয় উপদেশের অনুবাদে গুরুত্ব দেন। মালয়, তামিল ও সিংহলি ভাষায় বাইবেলের সম্পূর্ণ অনুবাদ VOC আমলে সম্পন্ন হয়। এই ভাষাগত উদ্যোগ ধর্মীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক বড় অগ্রগতি ছিল।

ডাচ রিফর্মড চার্চ বিদেশে ডজন ডজন গির্জা প্রতিষ্ঠা করে। পাদ্রি ও লে এল্ডাররা ধর্মীয় ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করতেন। ডিকনরা সমাজকল্যাণমূলক কাজ যেমন দান বিতরণ, এতিমদের দেখাশোনা ও হাসপাতাল পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন। অনেক দূরবর্তী অঞ্চলে যেখানে পাদ্রি কম, সেখানে স্থানীয় লে সদস্যরা উপাসনা পরিচালনা করতেন।

ডাচ ক্যালভিনিস্ট মিশন শুধু ধর্মীয় প্রচারেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা দাস ব্যবসা ও সাম্রাজ্যিক সহিংসতাতেও জড়িত ছিল। এই মিশনগুলো সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল, যা তাদের কার্যক্রমকে জটিল ও দ্বিমুখী করে তোলে।

ক্যালভিনিস্ট ধর্মতত্ত্বের ‘প্রিডেস্টিনেশন’ নীতি আজকের দৃষ্টিতে মিশনারি প্রচেষ্টার জন্য বাধা মনে হতে পারে। কেন জীবন ঝুঁকি নিয়ে দূর দেশে গিয়ে প্রচার করবেন, যখন ঈশ্বর ইতিমধ্যে মানুষের মুক্তি বা নরক নির্ধারণ করে রেখেছেন? তবে ১৭শ শতকের ক্যালভিনিস্টরা বাইবেলের বহু চরিত্র যেমন যোনাহ, নবী ও প্রেরিতদের উদাহরণ দিয়ে বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরের আদেশ মেনে প্রচার চালানোই তাদের কর্তব্য। তারা জানতেন অনেকেই বাণী গ্রহণ করবে না, তবুও প্রচার থামানো যাবে না।

বিশ্বব্যাপী ক্যাথলিক মিশনের বিশাল পরিসরের কারণে ডাচ ক্যালভিনিস্ট মিশনের গুরুত্ব অনেক সময় উপেক্ষিত হয়েছে। ক্যাথলিক ধর্মীয় আদেশ যেমন জেসুইট, ফ্রান্সিসকান ও ডমিনিকানরা হাজার হাজার মিশনারি পাঠিয়েছিল স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের উপনিবেশে। তুলনামূলকভাবে ডাচ ক্যালভিনিস্টদের কার্যক্রম ছোট হলেও তা ছিল দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী।

১৭শ ও ১৮শ শতকে ডাচ ক্যালভিনিস্টরা সীমিত সংখ্যক পাদ্রি ও কঠিন ধর্মতত্ত্বের মধ্যেও শিক্ষা, ভাষা অনুবাদ ও স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর জোর দিয়ে বৈশ্বিক ধর্মীয় সম্প্রসারণে সফল হন। VOC ও WIC-এর বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাদের মিশন ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল। এই মিশনগুলো ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বিশ্ব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যদিও তাদের জটিলতা ও দ্বৈত চরিত্রও স্পষ্ট। আজকের ইতিহাসবিদরা ধীরে ধীরে এই বৈশ্বিক ক্যালভিনিস্ট মিশনের গুরুত্ব ও প্রভাব অনুধাবন শুরু করেছেন, যা ১৯শ শতকের শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্বকে নতুন রূপ দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে-বাইরে অস্থিরতা দৃশ্যমান : তারেক রহমান

0

শনিবার জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন – ‘অন্তর্বর্তী সরকারের চিন্তা এবং কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জনগণ অন্ধকারে থাকায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা বাড়ছে। আমরা প্রায়ই দেখছি, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে জড়ো হচ্ছেন। মাত্র ১০ মাসের মাথায় সরকারের ভেতরে এবং বাইরে এক ধরনের অস্থিরতা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার জনগণের ভাষা, আশা-আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তেই থাকবে। আমরা মনে করি, দেশে এভাবে অস্থিরতা বাড়লে এই সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কষ্টসাধ্যই হয়ে পড়বে।’

তারেক রহমান বলেন, বিএনপিসহ দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মপরিকল্পনার রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু সরকার সেই আহ্বানে সেভাবে সাড়া দেয়নি। সরকার বরং জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ ঘোষণা না করে সুকৌশলে অল্প সংস্কার, বেশি সংস্কার এ ধরনের একটি অভিনব শর্তের বেড়াজালে আটকে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা কিংবা সামর্থ্য নিয়ে ইতোমধ্যেই হয়তো জনমনে কিছুটা হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তবুও গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের ভোটে, জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন এখনও অব্যাহত রেখেছে।’

পরিস্থিতি অযথা ঘোলাটে না করে জাতীয় নির্বাচনের সুস্পষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই হতাহতদের তালিকার চেয়ে করিডোর দেওয়া বা বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়াকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। করিডোর বা বন্দর দেওয়ার সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয়। এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ। এই সরকারের আইনগত দিক নিয়ে প্রশ্ন নেই, তবে তারা কখনোই জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার নয়।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা – অনুকরণ নাকি আসল বুদ্ধিমত্তা ?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আমাদের ভাবনা দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে পূর্ণ। আমরা কি এআই-র মাধ্যমে এক নতুন যুগের মুক্তির দ্বার উন্মোচন করেছি, নাকি নিজেরাই ডেকে এনেছি সমাজের পতন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা বারবার একটি গভীর বৈপরীত্যের মুখোমুখি হই-এআই-র বাহ্যিক চমকপ্রদ ফলাফল আমাদের মুগ্ধ করলেও, এর অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া বা ‘কিভাবে’ অংশটি নিয়ে আমরা হতাশ বা উদ্বিগ্ন হই।

জেনারেটিভ এআই বিশেষত বড় ভাষা মডেল (LLM) যেমন ChatGPT, আমাদের সামনে মানুষের মতো ভাষা ও শিল্পকর্ম উপস্থাপন করে। এসব দেখে আমরা মুগ্ধ, কিন্তু এগুলোর মধ্যে মানবিক অর্থ, নৈতিকতা কিংবা মৌলিকতা কতটা আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক সময় এআই-র শিল্পকর্মে দেখা যায়, আগের শিল্পীদের কাজ অনুকরণ বা চুরি করা হচ্ছে, যা নৈতিক ও আইনগত প্রশ্ন তোলে।

এই অনুকরণ প্রবণতা আসলে নতুন কিছু নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সূচনালগ্ন থেকেই অনুকরণ ছিল এর মূল চালিকাশক্তি। এআই-র ইতিহাস ও দর্শনের গভীরে গেলে দেখা যায়, অনুকরণকেই বুদ্ধিমত্তার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা আজকের জেনারেটিভ এআই-র সংকটের মূলেও রয়েছে।

এআই-র জনক অ্যালান ট্যুরিং ১৯৫০ সালে ‘Computing Machinery and Intelligence’ প্রবন্ধে ‘অনুকরণ খেলা’ (imitation game) ধারণা দেন। পরে এটি ‘ট্যুরিং টেস্ট’ নামে পরিচিতি পায়। ট্যুরিং-এর প্রশ্ন ছিল, “মেশিন কি চিন্তা করতে পারে?” কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই তিনি প্রশ্নটি বদলে দেন-“একটি মেশিন কি মানুষের মতো আচরণ করতে পারে, যাতে একজন মানুষ বিভ্রান্ত হয়?”

কিন্তু ট্যুরিং নিজে কখনোই বলেননি, এই অনুকরণ খেলা বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি। বরং এআই গবেষকরা এই টেস্টকেই বুদ্ধিমত্তার মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেন এবং এই ভুল ব্যাখ্যা এআই-র ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে। ২০২৩ সালেও, বিশ্বনেতারা ট্যুরিং-এর কর্মস্থল ব্লেচলি পার্কে এআই নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন, যেখানে এই টেস্টের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান ওঠে।

১৯৫৬ সালে ডার্টমাউথ কলেজে জন ম্যাকার্থি ও অন্যান্যরা একটি কর্মশালার আয়োজন করেন, যা এআই-র জন্মঘটনা হিসেবে পরিচিত। এখানে মূলত গণিতবিদ ও প্রকৌশলীরা নেতৃত্ব দেন; দর্শন, ভাষাতত্ত্ব কিংবা স্নায়ুবিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত। ফলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকল্পটি হয়ে ওঠে একেবারে প্রকৌশল ও গাণিতিক ভিত্তিক, যেখানে লক্ষ্য ছিল কিভাবে মেশিনকে মানুষের মতো আচরণ করানো যায়।

এই ওয়ার্কশপের ফলাফল ছিল প্রতীক-ভিত্তিক এআই (symbolic AI)-এর উত্থান। এখানে মূলত গাণিতিক প্রতীক ও নিয়মভিত্তিক প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে বুদ্ধিমত্তা অনুকরণের চেষ্টা করা হয়। এর ফলে সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক শাখাগুলো এআই উন্নয়ন থেকে ক্রমশ দূরে সরে যায়।

এআই-র এই অনুকরণবাদী ধারা পশ্চিমা দর্শনের দীর্ঘ ইতিহাসের ফল। রেনে ডেকার্টেস ‘I think, therefore I am’ উক্তির মাধ্যমে চিন্তার স্থানকে শরীর থেকে আলাদা করেন, আর থমাস হবস ‘reason … is nothing but reckoning’ বলে চিন্তাকে গাণিতিক গণনার সঙ্গে তুলনা করেন। এই দুই দর্শনের সংমিশ্রণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেবল গাণিতিক বা প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে কল্পনা করা সহজ হয়।

তবে বিমান বা গাড়ির মতো প্রকৌশল প্রকল্পে সফলতার পরিমাপ সহজ-কত উঁচুতে, কত দ্রুত, কতক্ষণ চলতে পারে তা মাপা যায়। কিন্তু ‘বুদ্ধিমত্তা’ বা ‘চিন্তা’-এসবের কোনো স্বাভাবিক পরিমাপ নেই। এখানেই ট্যুরিং-এর অনুকরণ খেলা এআই-র জন্য ‘সফলতা’র সহজ মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়-যতক্ষণ মেশিন মানুষের মতো আচরণ করতে পারে, ততক্ষণ তাকে বুদ্ধিমান ধরে নেওয়া যায়।

১৯৬০-এর দশকে জোসেফ ওয়েইজেনবাউম তৈরি করেন ‘ELIZA’ নামের সহজ চ্যাটবট, যা মানুষের কথোপকথন অনুকরণ করত। অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ছিল খুবই সরল, কিন্তু ব্যবহারকারীরা এটিকে মানবসদৃশ বলে ভুল করতেন। এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘ELIZA effect’-যেখানে বাহ্যিক আচরণ দেখে আমরা মেশিনকে বুদ্ধিমান বলে ধরে নিই। এই ইফেক্টের কারণে পরবর্তী কয়েক দশক এআই-র অগ্রগতি মূলত প্রতীক-ভিত্তিক নিয়মের উপর নির্ভরশীল ছিল।

এআই-র আরেকটি ধারা ছিল সাইবারনেটিক্স-যেখানে ফিডব্যাক-ভিত্তিক স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে বুদ্ধিমত্তার ছদ্মবেশে উপস্থাপন করা হয়। যেমন, একটি থার্মোস্ট্যাট নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গেলে এসি চালু করে দেয়-এটি কি বুদ্ধিমত্তা? জন ম্যাকার্থি পর্যন্ত লিখেছেন, ‘থার্মোস্ট্যাট বিশ্বাস করে ঘর ঠান্ডা বা গরম’-যদিও এটি নিছক নিয়মভিত্তিক প্রতিক্রিয়া।

এআই-র ইতিহাস ও বর্তমান প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়-আমরা এখনো অনুকরণ ও আসল বুদ্ধিমত্তার মধ্যে পার্থক্য করতে পারিনি। বাহ্যিক সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে আমরা এআই-র গভীর সীমাবদ্ধতা ও সংকট ভুলে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে এআই-র উন্নয়ন ও ব্যবহার নিয়ে আমাদের আরও গভীর, আন্তঃবিষয়ক আলোচনা দরকার-যাতে প্রযুক্তি কেবল অনুকরণ নয়, সত্যিকার অর্থে মানবিক মূল্যবোধ ও গভীরতা ধারণ করতে পারে।