Home Blog Page 84

উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া সব সংস্কার ও অগ্রগতিই ব্যর্থ হবে

শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে চাইলে একটি দেশের সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণার বিস্তার। উন্নত বিশ্বে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিকাশের মাধ্যমে জ্ঞানভাণ্ডার যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি তারা বিশ্বমঞ্চে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছেছে। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা খাত বরাবরই নানা সংকট ও অনিয়মের শিকার, যার মূল কারণ রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতা।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নানান সংস্কার এলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন। প্রতিটি সরকার তাদের আদর্শ অনুযায়ী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে, যার ফলে পাঠ্যক্রমে বারবার পরিবর্তন এসেছে। এতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, একটি মুক্তচিন্তার, সচেতন ও মানবিক প্রজন্ম তৈরিতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাঠ্যক্রমে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আধিপত্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংকীর্ণ মানসিকতা সৃষ্টি করছে।

শুধু পাঠ্যক্রম নয়, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও রাজনৈতিক প্রভাব সুস্পষ্ট। অনেক সময় যোগ্যতা ও মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই নিয়োগের প্রধান বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেকে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে আসীন হন, যা উচ্চশিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্যাশা ছিল, উচ্চশিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায়নি।টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অস্থিরতা আজও অব্যাহত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞানার্জন ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষা ব্যয় অযথা বেড়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সমাজের মধ্যেও রাজনৈতিক বিভাজন প্রকট। শিক্ষক নিয়োগে দলীয় পদ-পদবি, আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্ব এবং গোষ্ঠীগত আনুগত্যকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যার ফলে গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও একাডেমিক উৎকর্ষতা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগে বাধ্য হন, যা প্রমাণ করে এসব নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। যদি এসব ব্যক্তির যথেষ্ট একাডেমিক অবদান থাকত, তবে তাদের এত রাজনীতির সময় হতো না।

ছাত্ররাজনীতি বর্তমানে আর আদর্শ ভিত্তিক নয়; বরং তা চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতার রূপ নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবের বলয়ে বন্দি। যার ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, এবং ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ।

এই সংকট নিরসনে সরকারের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক পদে মেধা, গবেষণা ও একাডেমিক পারফরম্যান্সকে মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগও দরকার। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষাখাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য একটি সর্বাত্মক রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বার্তা না আসে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তবে এ খাতে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আশা করা যাবে না।উচ্চশিক্ষা খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম শুধু আর্থিক অপচয় নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করছে। যদি শিক্ষার্থীরা এমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠে যেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতি স্বাভাবিক ঘটনা, তাহলে তারা ভবিষ্যতে এসব অপসংস্কৃতি মেনেই সমাজে প্রবেশ করবে। এটি একটি জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

অতএব, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধ করে একটি স্বচ্ছ, নৈতিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনসচেতনতার সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন।

ট্রাম্পের আর্থিক নীতিতে হতাশ – ইলন মাস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম আর্থিক নীতির প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেন ইলন মাস্ক। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে জিততে সহায়তা করলেও এবার তার বিল নিয়ে ‘হতাশা’ প্রকাশ করেছেন এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে স্বল্প ভোটের ব্যবধানে পাস হয়েছে ট্রাম্পের ‘বিগ, বিউটিফুল বিল’। এই বিলে বহু ট্রিলিয়ন ডলারের কর ছাড় এবং প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির অঙ্গীকার রয়েছে। এখন এটি সিনেটে পাঠানো হবে।

মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাস্ক বলেছেন, আমি হতাশ, কারণ বিলটি আসলে বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে দিচ্ছে, কমাচ্ছে না।

মাস্ক আরও বলেন, এই বিল ‘ডোজ’ টিমের কাজকেও নস্যাৎ করছে। ডোজ (ডিওজিই) হলো ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’—সরকারি ব্যয় কমাতে ট্রাম্প প্রশাসনের গঠিত উপদেষ্টা সংস্থা, যার নেতৃত্বে ছিলেন মাস্ক নিজেই। এই সংস্থার অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা বন্ধসহ অনেক খাতের খরচ কমানো শুরু হয়েছিল।

মাস্ক আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ডোজ-এর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। সরকারের খরচ এক ট্রিলিয়ন ডলার কমাতে চুক্তি বাতিল ও সরকারি কর্মী সংখ্যা কমানোর লক্ষ্য ছিল তার। ডোজ-এর ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, এরই মধ্যে প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছে, যদিও বিবিসির বিশ্লেষণে এ দাবির পূর্ণ প্রমাণ মেলেনি। মাস্ক আরও ঘোষণা দিয়েছেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অনুদান অনেক কমিয়ে দেবেন এবং অন্তত আরও পাঁচ বছর টেসলার নেতৃত্বে থাকবেন।

শর্তসাপেক্ষে পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখবে ইরান

শর্তসাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতে রাজি হতে পারে ইরান। পারমাণবিক আলোচনা সম্পর্কে অবগত দুই ইরানি কর্মকর্তা বুধবার এ কথা জানিয়েছেন। তেহরানের জব্দকৃত বৈদেশিক অর্থ ছেড়ে দিলে ও বেসামরিক কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার মেনে নিলে চলমান পারমাণবিক কর্মসূচিতে স্থগিতাদেশ দিতে পারে, বলেছেন তারা।

রয়টার্স জানায়, ওয়াশিংটন যদি তেহরানের শর্ত মেনে নেয়, তবে শিগগিরই রাজনৈতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটা সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। এর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। তবে এই বিষয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে এখনও আলোচনা হয়নি বলেছেন এক কর্মকর্তা।

তারা দাবি করছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে নিলে এক বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখবে ইরান। আর ইতোমধ্যে সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম হয় তারা বিদেশে পাঠিয়ে দেবে, নইলে বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য জ্বালানিতে রূপান্তর করবে।

আলজাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের এ কথা জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, আমি নেতানিয়াহুকে বলেছি, এখনই হামলা করা ঠিক হবে না, কারণ আমরা সমাধানের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।

এদিকে বুধবার নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে নেতানিয়াহুর দপ্তর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভাষার জীবাশ্ম কবিতা, রূপক ও আমাদের চিন্তার গঠন

রালফ ওয়াল্ডো এমারসনের বিখ্যাত উক্তি, “ভাষা হচ্ছে জীবাশ্ম কবিতা”, এটি শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং ভাষার গভীর গঠনগত সত্যকে নির্দেশ করে। এমারসনের মতে, ভাষার প্রতিটি শব্দ, বাক্যাংশ ও প্রকাশভঙ্গি একসময় ছিল উজ্জ্বল, জীবন্ত রূপক; কালের প্রবাহে সেগুলো আজ দৈনন্দিন, প্রায় অচেতন ব্যবহারের অংশ হয়ে গেছে। নেলসন গুডম্যানের কথায়, “রূপকসমূহ তাদের নতুনত্ব হারালে ক্রমশ আক্ষরিক হয়ে ওঠে।”

ভাষা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের চিন্তাধারার কাঠামো। জর্জ লেকফ এবং মার্ক জনসনের ‘Metaphors We Live By’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, আমাদের অধিকাংশ মৌলিক ধারণা রূপকীয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা ‘আইডিয়া’ বা ‘ধারণা’ নিয়ে কথা বলি গাছপালার মতো করে—“একটি ধারণা ফলপ্রসূ”, “বীজ রোপণ”, “ভাইনে শুকিয়ে যাওয়া”—এসবই IDEAS ARE PLANTS রূপকের নিদর্শন। আবার তর্ক-বিতর্ককে আমরা যুদ্ধের মতো দেখি—“তর্ক জয়”, “পরাজিত করা”, “দুর্বল যুক্তি”—এগুলো ARGUMENT IS WAR রূপকের উদাহরণ।

লেকফ-জনসন দেখিয়েছেন, এসব রূপক শুধু ভাষায় নয় চিন্তায়ও প্রভাব ফেলে। আমরা বাস্তবিক অর্থেই তর্ককে যুদ্ধের মতো ভাবি, যার ফলে আমাদের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও মনোভাব গঠিত হয়। যদি আমরা তর্ককে নৃত্যের মতো (ARGUMENT IS DANCE) কল্পনা করি, তাহলে লক্ষ্য হবে যৌথভাবে সুন্দর কিছু সৃষ্টি করা, জয়-পরাজয় নয়। অর্থাৎ রূপক শুধু বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, বরং বাস্তবতা নির্মাণেও ভূমিকা রাখে।

রূপক আমাদের সমাজ ও বিজ্ঞানে কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা যায় বিভিন্ন গবেষণায়। উদাহরণস্বরূপ অপরাধ নিয়ে দুই ধরনের রিপোর্ট—“অপরাধ একটি ভাইরাস” বনাম “অপরাধ একটি জানোয়ার”—দুটি আলাদা রূপক। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ‘ভাইরাস’ রূপকে প্রভাবিত হন, তারা অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সংস্কার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চান; আর যারা ‘জানোয়ার’ রূপকে প্রভাবিত হন, তারা কঠোর শাস্তি ও পুলিশি ব্যবস্থা চান। অথচ অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই বুঝতে পারেন না, রূপক তাদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলেছে।

শিশুদের চিন্তা-উন্নয়নেও রূপক ও উপমার ভূমিকা অপরিসীম। ডেড্রে জেন্টনার ও কিথ হোলিওকের গবেষণায় দেখা গেছে, উপমা ও রূপকীয় চিন্তা শিশুদের যুক্তি ও পরীক্ষার ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞানেও রূপকের ভূমিকা সুস্পষ্ট; যেমন, প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা মহাবিশ্বের গঠন ব্যাখ্যা করতে রাজনৈতিক রূপক ব্যবহার করেছেন—Cosmos is a monarchy । আধুনিক বিজ্ঞানে ‘নিয়ন্ত্রক’, ‘সামরিক বাহিনী’, ‘ফ্রি-ওয়ে’ ইত্যাদি রূপক ব্যবহৃত হয় জটিল ধারণা সহজে বোঝাতে।

রূপক যেমন চিন্তা ও ভাষাকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি ভুল রূপকীয় ফ্রেমিং বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ‘ক্যান্সার যুদ্ধ’ রূপক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়—“ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”, “লড়াই জেতা”—কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই রূপক রোগীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ায়, পরাজিত হলে তারা নিজেকে ব্যর্থ মনে করেন। বিকল্প হিসেবে ‘ক্যান্সার একটি যাত্রা’ (CANCER IS A JOURNEY) রূপক রোগীদের মানসিক সুস্থতা ও ইতিবাচক মনোভাব গঠনে সহায়ক।

সমাজে নীতিনির্ধারণেও রূপকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ মহামারিতে ‘যুদ্ধ’ রূপক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে “ফ্রন্টলাইন ওয়ারিয়র”, “অদৃশ্য শত্রু”—কিন্তু এই রূপক কখনও কখনও জাতিগত বিদ্বেষ ও ভুল নীতির জন্ম দেয়। বিকল্প হিসেবে ‘আগুন’ রূপক (PANDEMIC IS A FIRE) ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে জরুরি অবস্থা ও ধ্বংসাত্মক দিকটি ফুটে ওঠে, কিন্তু যুদ্ধের নেতিবাচক দিক এড়ানো যায়।

রূপকীয় ফ্রেমিং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ অভিবাসীদের ‘সাপ’ রূপকে চিত্রিত করা হয়েছে নেতিবাচক প্রচারণায়। তাই আমাদের উচিত সচেতনভাবে রূপকের ব্যবহার ও তার প্রভাব বিশ্লেষণ করা। কারণ, ভুল রূপক শুধু চিন্তা নয়, নীতি ও আচরণকেও ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।

ভাষা ও চিন্তার গভীরে রূপক এক অবিচ্ছেদ্য কাঠামো। এটি শুধু সৌন্দর্য বা অলংকার নয়, বরং আমাদের ধারণা, সিদ্ধান্ত, সমাজ ও বিজ্ঞানের ভিত্তি।তাই আমাদের উচিত রূপকের যথাযথ ব্যবহার, সচেতন বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে নতুন, উপযোগী রূপক নির্মাণ। কারণ ভাষার এই ‘ফসিল কবিতা’ আমাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা ও সমাজ গঠনের চাবিকাঠি।

কর্মক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বৈষম্য ও মোকাবিলা

বর্তমান কর্মজীবনে বয়সভিত্তিক বৈষম্য বা এজিজম (Ageism) একটি অদৃশ্য কিন্তু ব্যাপক সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই এটি সঠিকভাবে চিহ্নিত হয় না, কিন্তু এর প্রভাব কর্মচারী এবং প্রতিষ্ঠানের উভয়ের ওপরই নেতিবাচক।

একটি অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, একটি প্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোনের জন্য অভ্যন্তরীণ নিউজ অ্যাপ চালু করার সময় বেশ কিছু প্রবীণ কর্মচারী এটি ডাউনলোড করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। প্রাথমিক ধারণা ছিল, প্রবীণ কর্মীরা পরিবর্তনের প্রতি অনাগ্রহী। কিন্তু পরবর্তীতে বুঝা গেলো, এই ধারণাটি বয়সভিত্তিক স্টেরিওটাইপের শিকার হওয়ার একটি উদাহরণ মাত্র। ব্যক্তিগত পছন্দ, পরিস্থিতি এবং অভ্যাসের কারণে পরিবর্তন গ্রহণে ভিন্নতা থাকতে পারে, যা বয়সের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি দুইজন মানুষের মধ্যে একজন প্রবীণদের বিরুদ্ধে বয়সভিত্তিক বৈষম্য করে থাকেন। ৪৫ বছর ও তদূর্ধ্ব কর্মীদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্যের প্রবণতা বিশ্বজুড়ে লক্ষ্য করা যায়। ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৪০% মানুষ ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের হবে। এই বয়সের মানুষরা ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত এবং স্বাস্থ্যসম্মত। তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে, যা বয়সভিত্তিক বৈষম্যের কারণে অনেক সময় হারিয়ে যায়।

বয়সভিত্তিক বৈষম্য একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা। এটি শুধু প্রবীণদের ক্ষেত্রে নয়, বরং সকল বয়সের মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক, কারণ সময়ের সাথে সবাই এই বৈষম্যের শিকার হতে পারে। বয়সভিত্তিক স্টেরিওটাইপ যেমন “বৃদ্ধরা পরিবর্তন গ্রহণে অনিচ্ছুক” বা “তরুণরা অভিজ্ঞতার অভাব” – এইসব ধারণা কর্মক্ষেত্রে বিভাজন সৃষ্টি করে। এছাড়া প্রবীণ কর্মচারীদের প্রযুক্তি গ্রহণে অনিচ্ছা বা তরুণদের কাজের প্রতি অবহেলা করাও এই বৈষম্যের অংশ হতে পারে।

বয়সভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণে কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে বয়সভিত্তিক বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এতে কর্মীরা বুঝতে পারবে কিভাবে অজান্তেই বয়সভিত্তিক পূর্বধারণা তাদের আচরণ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

বয়সকে বিবেচনায় নিয়ে বৈচিত্র্যময় কর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা করা উচিত। তরুণ ও প্রবীণ উভয় প্রজন্মের কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করলে নতুন ধারণা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটবে, যা উদ্ভাবন ও সমস্যা সমাধানে সহায়ক। প্রতিটি ব্যক্তি নিজেই তার অজান্তে থাকা বয়সভিত্তিক পক্ষপাতিত্ব চিহ্নিত করে তা মোকাবেলা করতে হবে। নিয়োগ, মূল্যায়ন এবং ব্যবস্থাপনায় বয়স নয়, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রধান্য দিতে হবে।

ঐতিহ্যগত মেন্টরিংয়ের বিপরীতে, যেখানে প্রবীণ কর্মী তরুণকে গাইড করেন, সেখানে তরুণ কর্মীরা প্রবীণদের প্রযুক্তি ও নতুন ধারণায় সাহায্য করতে পারে। এটি কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা বাড়ায়।

বয়সভিত্তিক বৈষম্য মোকাবেলায় প্রবীণ কর্মীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবর্তনের প্রতি খোলামেলা মনোভাব রাখা, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা এবং তরুণ নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে, তরুণ কর্মীদের প্রতি নেতিবাচক স্টেরিওটাইপ থেকে মুক্ত থাকা দরকার। এই পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতা কর্মক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমাতে সাহায্য করবে।

একটি সফল ও সমৃদ্ধ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে বয়সের বিচারে বৈষম্য দূর করে সকল বয়সের কর্মীদের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রবীণ কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এবং তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি একত্রিত করলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। বয়সকে বাধা নয়, বরং সম্ভাবনার এক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা উচিত।

বয়সভিত্তিক বৈষম্য শুধুমাত্র প্রবীণ কর্মীদের সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যা যা সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মোকাবেলা করতে হবে।আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের অজান্তে থাকা পক্ষপাত চিহ্নিত করে তা দূর করা, কর্মক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বৈচিত্র্যকে স্বাগত জানানো এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা। কারণ, বয়সভিত্তিক বৈষম্য একদিন আমাদের সবারই মোকাবেলা করতে হবে। তাই এখনই আমাদের সচেতনতা, সহানুভূতি ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই লড়াইয়ে জয়লাভ করতে হবে।

আগামী পাঁচ বছরে আরও রেকর্ড ভাঙবে বৈশ্বিক উষ্ণতা

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা অন্যতম আলোচিত ও উদ্বেগজনক বিষয়। সম্প্রতি বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং যুক্তরাজ্যের মেট অফিস প্রকাশিত এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে পৃথিবী আরও রেকর্ড-ভাঙা উষ্ণতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এই উষ্ণতা মানবসভ্যতা, প্রকৃতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত একটি বছর ২০২৪ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে—এমন সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো ৭০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে, এই পাঁচ বছরের গড় তাপমাত্রা প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রম করবে। অথচ ২০১৫ সালে এই চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন। জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) পোড়ানো, বন উজাড়, শিল্পকারখানার বর্জ্য ইত্যাদির কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এগুলো সূর্যের তাপ আটকে রাখে এবং পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া এল নিনো বা লা নিনা জাতীয় প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রও সাময়িকভাবে উষ্ণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে, তবে মূলত দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য মানুষই দায়ী।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিটি দশমিক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানল বাড়ছে, প্রবল বর্ষণ ও বন্যার ঘটনা বাড়ছে, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও টাইফুনের ঝুঁকি বাড়ছে, আর্কটিক অঞ্চলে বরফ দ্রুত গলছে, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, পানির সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এসব পরিবর্তনের ফলে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় ও নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী পাঁচ বছরে এসব সমস্যা আরও বাড়বে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এজন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বন সংরক্ষণ ও পুনঃবনায়ন করতে হবে, শিল্প ও পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও জীবনধারা গ্রহণ করতে হবে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নীতিমালা জোরদার করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। আগামী পাঁচ বছরে যদি বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে পৃথিবী আরও চরম আবহাওয়া ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।

নিবন্ধিত ৪৯ দল- ডিসেম্বরেই নির্বাচন চায় বিএনপিসহ ১০ নিবন্ধিত দল

0

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল ছিল ৫৫টি। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ ৫টির নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। নিবন্ধন স্থগিত আছে আওয়ামী লীগের।বিএনপিসহ ১০টি নিবন্ধিত দল আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন চায়। এই দলগুলো হলো — লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, গণফোরাম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি।

সংস্কার এবং নির্বাচনের পৃথক রোডম্যাপ দাবি করা জামায়াত বলছে, ফেব্রুয়ারি বা এপ্রিলে নির্বাচন হোক। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি বিচার-সংস্কার-নির্বাচনের রোডম্যাপ চাইছে। সংস্কার এবং বিচার দৃশ্যমান হওয়ার শর্তে গণপরিষদ নির্বাচন চায় দলটি।

নির্বাচনের দিনক্ষণ স্পষ্ট করতে রোডম্যাপ চায় নিবন্ধিত ৪টি দল। এরা হল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন ও এবি পার্টি। এই দলগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের বিরোধী নয়। আবার ডিসেম্বরের পরে নির্বাচন হলেও আপত্তি নেই।

৬টি নিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক দল সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে সময়সীমা প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করেছেন, এতে তাদের আস্থা রয়েছে। তারা হলেন — জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট ও খেলাফত আন্দোলন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ এবং চব্বিশের নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৮টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল দ্রুত নির্বাচন চায়। বাকি ১১ নিবন্ধিত দলের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি। ১২ দলীয় জোটসহ বিএনপির মিত্র আরও কয়েকটি অনিবন্ধিত দল ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চায়। তবে এসব দলের দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া দলগুলো।

জাপান সফরে থাকা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বৃহস্পতিবার নিক্কেই ফোরামের বক্তৃতায় বলেন, একটি মাত্র দল ডিসেম্বরে নির্বাচন চায়। তিনি আবারও বলেন, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। তাঁর বক্তব্যের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন — এক দল নয়; সবাই নির্বাচন চায়। শুধু একজন ব্যক্তি নির্বাচন চান না। তিনি হলেন অধ্যাপক ইউনূস।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপদেষ্টা সমকালকে বলেছেন, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে; এক দিনও দেরি হবে না। এ নিশ্চয়তার পরও শুধু বিএনপিই ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের চাপ দিচ্ছে। তারা সংস্কারের কথা বলে না। শুধু নির্বাচন চায়। অথচ সরকারের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন নয়। সংস্কার এবং বিচারও। এই উপদেষ্টা বলেন, সংস্কার না করে একটি দলের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চান না তারা। সব দলই নির্বাচনের আগে সংস্কারের কথা বলছে। শুধু বিএনপি নির্বাচন নিয়ে পড়ে আছে।

ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দাবি বিএনপি’র, কি বলছে জামায়াত ও এনসিপি?

0

নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ডিসেম্বরের বাইরে যেতে চায় না। কিন্তু জামায়াত ও এনসিপি আবার নির্বাচনের দিনক্ষণ বেঁধে দিতে রাজি নয়। তবে দিনক্ষণ বেঁধে না দিলেও জামায়াত চায় সরকার একটা রোডম্যাপ দিয়ে দিক। তবে সেটা শুধু নির্বাচন নয়, একইসঙ্গে সংস্কার বিষয়েও সরকার কবে, কী করতে চায় রোডম্যাপে সেটাও থাকতে হবে। বিএনপি যেমন নির্দিষ্ট করে ডিসেম্বরের কথা বলছে, জামায়াত সেখানে কেন সুনির্দিষ্ট দিনের কথা বলছে না?

বিবিসি বাংলাকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “আমরা তো বলেছি রমজানের আগে নির্বাচনের কথা। যদি সেটা না হয় তাহলে এপ্রিলের মধ্যে যেন হয় সেটাও বলেছি। কিন্তু আমরা নির্দিষ্ট দিন বেঁধে দিতে চাই না। কারণ আমরা একেকটি দল যদি একেকটি মাস এবং দিনের জন্য জোরাজুরি করি তাহলে তো সেখানে সরকারের যারা সিদ্ধান্ত নেবে তাদের জন্য এক ধরনের কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হবে।”

তবে বিএনপির মতো জামায়াতও এখন বলছে, সরকার যখনই নির্বাচন দিক, সেটার রোডম্যাপ এখনই দিয়ে দেয়া উচিত। জামায়াতের নায়েবে আমীর সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহম্মদ তাহের বলছিলেন, “রোডম্যাপ না দিলে মানুষের মধ্যে যে একটা অনিশ্চয়তা আছে, (নির্বাচন) হবে কি হবে না, নানারকম ষড়যন্ত্রের কথাও বলা হয় সেগুলো থেকে যাবে।”

তিনি আরো বলেন, “এখানে মূল ক্রাইসিস যেটা সেটা হচ্ছে আস্থার সংকট। বিএনপি বা কোনো কোনো রাজনৈতিক দল মনে করছেন, এই সরকার আদৌ কোনো নির্বাচন দেবে কিনা। রোডম্যাপ হয়ে গেলে এই আস্থার সংকট থাকবে না। দলগুলো নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।”

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত দল এনসিপিও সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন, সংস্কার ও বিচার – এই তিনটি বিষয়ে রোডম্যাপ একসঙ্গে প্রকাশ করা উচিত বলে জানিয়েছে।

তবে বিএনপি যেখানে এখনই রোডম্যাপ চায়, এনসিপি সেখানে এই মুহূর্তেই রোডম্যাপ দরকার তেমনটা মনে করছে না। বরং এনসিপি জোর দিচ্ছে, দলগুলোর মধ্যে আগে ঐক্য প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে একমত হওয়ার ওপর।

জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বিবিসি বাংলাকে বলেন, “দেখেন, বিএনপি নির্দিষ্টভাবে ডিসেম্বরে নির্বাচন চাচ্ছে। এখানে ইসলামী আন্দোলন, জামায়াত, গণঅধিকার পরিষদ কিংবা এনসিপি–আমরা চাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হোক।তারপরে কোনো দল চায় সরাসরি ভোটে নির্বাচন, কোনো দল চায় সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচন”।

“ফলে এই যে দাবিগুলো এগুলো নিয়ে তো এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো একজায়গায় আসেনি।…ফলে হুট করে যে সরকার এখন নির্বাচনের একটা দিন ঘোষণা করবে, এটা তো সরকারের জন্য কঠিন। তাছাড়া যখনই সংস্কার এবং বিচার থেকে শুধু নির্বাচনের দিকেই ফোকাস করাটা শুরু হবে, তখন দেখা যাবে যে এই সংস্কারের চিন্তা-ভাবনা এক্সিকিউট করাটা সরকারের জন্য দুরূহ হবে,” যুক্ত করেন তিনি। ফলে নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি আছে এটা স্পষ্ট।

গাজা চাপিয়ে দেয়া ক্ষুধার শিকার : জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন — ইসরায়েলের কারণে গাজার মানুষেরা অনাহারে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি মনে করেন, এ কারণেই গাজায় ইসরায়েলি হামলা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে।

বিবিসির পক্ষ থেকে ফ্লেচারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এ ‘জোরপূর্বক অনাহার’ যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে কিনা। উত্তরে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা যুদ্ধাপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। অবশ্যই, এ বিষয়ে আদালত চূড়ান্ত রায় দেবেন। আর শেষ পর্যন্ত ইতিহাসই এর বিচার করবে।’

টম ফ্লেচার বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা দেখছি সীমান্তে খাবার রাখা হয়েছে। কিন্তু সীমান্তের ওপারে গাজার মানুষেরা অনাহারে দিন কাটালেও, সে খাবার সেখানে পৌঁছাতে দেওয়া হচ্ছে না। আমরা শুনছি যে ইসরায়েলি মন্ত্রীরা বলছেন, গাজার মানুষদের ওপর চাপ তৈরি করার জন্য এমনটা করা হচ্ছে।’

সম্প্রতি ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেন, ‘গাজার বাসিন্দারা যেন পুরোপুরি নিরুপায় হয়ে বুঝতে পারে যে তাদের কোনো আশা নেই, কিছুই পাওয়ার নেই। এবং তারা যেন অন্য কোথাও গিয়ে নতুন জীবন শুরু করার কথা ভাবতে শুরু করে।’

ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা বাড়ছে। গত মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস বলেন, গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যতটুকু হামলা করা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি মাত্রায় হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এর আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎর্স বলেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য কী, তা তিনি এখন আর বুঝতে পারছেন না।

চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতারা গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধ এবং অবিলম্বে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিতে ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর জবাবে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, এসব নেতা হামাসের পক্ষ নিচ্ছেন।

এদিকে, দক্ষিণ গাজায় মঙ্গল ও বুধবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের উদ্যোগে সম্প্রতি চালু হওয়া গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র থেকে খাবার আনতে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে ১০ ফিলিস্তিনি নিহত ও প্রায় ৬২ জন আহত হয়েছেন।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো জিএইচএফকে বর্জন করেছে। তাদের অভিযোগ, মানবিক সহায়তা কোনো ধরনের পক্ষপাত ছাড়া প্রয়োজনের ভিত্তিতে বণ্টন করতে হয়। কিন্তু মানবিক সহায়তা দেওয়ার সেই নীতিকে লঙ্ঘন করছে জিএইচএফ।

অধিকৃত ফিলিস্তিন অঞ্চলে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ সহায়তা কর্মকর্তা জনাথন হুইটল জেরুজালেমে সাংবাদিকদের বলেন — নজরদারি করে নতুন পদ্ধতিতে ত্রাণ দিচ্ছে জিএইচএফ। তারা ত্রাণকে গাজার নির্দিষ্ট এলাকা খালি করার বৃহত্তর ইসরায়েলি পরিকল্পনার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রায় তিন মাস ধরে চলা ইসরায়েলি অবরোধের পর মানবিক সংকট ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে’। সাহায্য সীমিত করার কারণে ক্ষুধার্ত মানুষের জীবন আরও হুমকির মুখে পড়ছে।

ভুয়া পরিচয়ে এক যুগ ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি

0

এক যুগ ধরে একজনের পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করেছেন আরেক ব্যক্তি। অবশেষে তদন্তে ধরার পর সম্প্রতি সেই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।জানা যায়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি হয় মো. আব্দুল ওয়ারেছ আনসারীর। তবে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ না দিয়ে যোগ দেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে। বর্তমানে তিনি নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

নিয়োগ পেয়েও মো. আব্দুল ওয়ারেছ আনসারী বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ না দেওয়ায় সেই সুযোগটিকে কাজে লাগান বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মো. শাহজাহান মিঞা। আব্দুল ওয়ারেছ আনসারীর জায়গায় নিজের ভাগনেকে নিয়োগ দেন। এ জন্য ভাগনের নাম বদলে আব্দুল ওয়ারেছ আনসারী রাখা হয়।

আবদুল ওয়ারেছ আনসারী নামে শাহজাহান মিঞার ভাগনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাকরি করেন ১২ বছর, দুটি পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন যুগ্ম পরিচালক। সম্প্রতি এক তদন্তে এই তথ্য বেরিয়ে আসার পর মো. শাহজাহান মিঞাকে বরখাস্ত ও তাঁর ভাগনের নিয়োগ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, মামা মো. শাহজাহান মিঞার সহযোগিতায় ভুয়া নাম, পরিচয় ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দেন তাঁর ভাগনে। এ জন্য নিয়োগের ছবিও বদল করা হয়। সেই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবিও পরিবর্তন করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়োগে অনিয়ম, কর্মকর্তাদের বয়স পরিবর্তনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তবে ব্যবস্থা নেওয়া হয় খুবই কম।