Home Blog Page 79

মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ অভিশপ্ত লোককাহিনি

১. উম্মে সিবিয়ান – শিশুচোর জ্বিন রাণী

মধ্যপ্রাচ্যের গর্ভবতী নারীদের মধ্যে একটি গভীর আতঙ্কের নাম “উম্মে সিবিয়ান”। বিশ্বাস করা হয়, এই মহিলা জ্বিন নবজাতক শিশুদের চুরি করে খেয়ে ফেলে বা তাদের অসুস্থ করে তোলে। আরবদের মধ্যে প্রচলিত আছে, উম্মে সিবিয়ান বিশেষভাবে গর্ভবতী নারীদের পেছনে লেগে থাকে। তার মুখ সাধারণত পর্দা বা কালো কাপড়ে ঢাকা এবং পা ঘোড়ার মতো। কেউ কেউ বলেন সে বাতাসের মতো ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। রাতের বেলায় শিশুরা যদি অকারণে কাঁদে, তবে অনেকে মনে করে এটি উম্মে সিবিয়ানের উপস্থিতির লক্ষণ। মুসলিম ঘরগুলোতে তাই খাটের নিচে ছুরি রাখা, নবজাতকের মাথার কাছে তাবিজ ঝুলিয়ে রাখা এবং রাতে সুরা পড়া এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদেরা বলেন, এটি সম্ভবত প্রসব-পরবর্তী মানসিক উদ্বেগের প্রতিফলন। তবে লোকবিশ্বাসে উম্মে সিবিয়ান আজও জীবন্ত এক আতঙ্ক।

২. আল-নাদাহা – মরুভূমির মায়াবী ডাক

মিশরের গ্রামীণ নাইল ডেল্টার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শতাব্দী ধরে ঘুরে বেড়ায় ‘আল-নাদাহা’ নামের এক আত্মা। সে এক মায়াবী রমণী, যার কণ্ঠস্বর এতটাই আকর্ষণীয় যে রাতে একাকী পুরুষরা তার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারে না। সাধারণত সে নদীর তীরে বা ফসলের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকে, মুখ আংশিক ঢাকা। কেউ সাড়া দিলে সে ধীরে ধীরে তাকে কাছে টেনে নেয়, চোখে চোখ রাখে, আর এরপর তারা নিখোঁজ হয়ে যায়। কেউ কেউ ফিরে এলেও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অনেকে বলেন সে আসলে এক আত্মহত্যা করা তরুণী, যার আত্মা আজও প্রতিশোধ নিতে ঘুরে বেড়ায়। আবার অনেকে মনে করে, সে এক জ্বিন যাকে প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকার আত্মা মনে করা হয়। এই কাহিনী নারীকে ভয় ও কামনার এক দ্বৈত রূপে উপস্থাপন করে যেখানে আকর্ষণের শেষ ফলাফল নিঃস্বতা বা মৃত্যু।

৩. সোনালী সাপের অভিশাপ

ইরাক ও প্রাচীন পারস্য অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা একটি কাহিনিতে আছে, নির্জন মরুভূমিতে এক রহস্যময় সোনালী সাপের অস্তিত্ব, যা ধন-সম্পদের রূপ ধরে মানুষের লোভ পরীক্ষা করে। যেকোনো ব্যক্তি যদি সেই সাপকে হত্যা করে বা ধরার চেষ্টা করে, তার ওপর নামে ভয়ানক অভিশাপ। কাহিনী অনুযায়ী, যে ঘরে সোনালী সাপ হত্যা করা হয়, সেখানে অচিরেই একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে—শিশুর মৃত্যু, পাগল হয়ে যাওয়া, আগুন লেগে যাওয়া। লোকেরা বিশ্বাস করে এই সাপ আসলে এক পরীর রূপ; যারা তার প্রেম প্রত্যাখ্যান করে বা তাকে হত্যা করতে চায়, তাদের সে ধ্বংস করে। গ্রামে আজও অনেক পুরনো পরিবার আছে যারা নিজেদের ধ্বংসের জন্য এই অভিশাপকে দায়ী করে। এই কাহিনী লোভ, রহস্যময় নারীসত্তা এবং অবমাননার প্রতিফলন, যা লোকসমাজে নৈতিক শিক্ষা ও ভয় গেঁথে দেয়।

৪. মৃত্যুর আগাম দূত

ইয়েমেন ও ওমানের সীমান্তবর্তী পর্বতাঞ্চলে বহু পুরনো একটি লোককাহিনী আজও স্থানীয়দের আতঙ্কিত করে রাখে। “বাবা ইয়াগান” নামের এক রহস্যময় সত্তা নির্দিষ্ট এক গুহার প্রহরী বলে বিশ্বাস করা হয়। স্থানীয়রা বলে কেউ যদি সেই গুহার সামনে রাতে একা ঘুমিয়ে পড়ে, তবে ঘুমের ভেতর বাবার মতো এক পুরুষ কণ্ঠে শুনতে পায়, “তোমার সময় ফুরিয়েছে।” সেই ব্যক্তি জেগে উঠে ভাবেও এটি কল্পনা কিন্তু ঠিক সাত দিনের মধ্যে সে মৃত্যু বা ভয়ংকর দুর্ঘটনার শিকার হয়। কেউ কেউ মৃত্যুর আগে অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে, ঘরের দেয়ালে আঁকতে থাকে অস্পষ্ট প্রতীক, কাঁদতে থাকে অজানা ভাষায়। কিছু মানুষের চোখ দিয়ে কালো তরল বের হওয়ার কথাও বলা হয়। গবেষকেরা একে “psychic premonition” বললেও স্থানীয় বিশ্বাসে বাবা ইয়াগান আসলে মৃত্যুর দূত যিনি অপরাধীদের আত্মা নিতে ফিরে আসেন।

৫. নিখোঁজ হওয়ার আত্মা

সৌদি আরবের আল-কাসিম অঞ্চলের রাতের রাস্তায় এক নারীর কাহিনী ছড়িয়ে আছে, যাকে সবাই চেনে “মুখহীন রমণী” নামে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলে, সে মধ্যরাতে একা রাস্তায় হেঁটে যায় মুখ পুরোপুরি ঢাকা থাকে কালো নিকাবে। চলাফেরা স্বাভাবিক হলেও তার পাশে গাড়ি থামালে সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে মুখের দিকে ইশারা করে। কেউ যদি সাহস করে তাকে জিজ্ঞেস করে “আপনি কে?”, সে মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে বলে, “আমার জন্য থামালে ভুল করলে।” আর তখনই তার মুখ দেখা যায় একটি গভীর কালো শূন্যতা। যারা একবার এই মুখ দেখে, তারা কিছুদিনের মধ্যে দুর্ঘটনায় মারা যায়, নিখোঁজ হয় বা পাগল হয়ে যায়। এ কাহিনিটি অনেক সময় একজন ধর্ষিতা নারীর আত্মা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, যার ন্যায়বিচার হয়নি। লোকবিশ্বাসের গভীরে লুকিয়ে আছে সমাজের লুকানো অন্যায় আর তার প্রতিশোধ।

অটোইমিউন রোগে UV রশ্মির নতুন চিকিৎসা

অনেকদিন ধরেই সূর্যের অতিবেগুনি (UV) রশ্মিকে ত্বক ক্যান্সারের জন্য বিপজ্জনক বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো একটি নতুন গবেষণা সামনে এনেছে UV রশ্মি ক্ষতি নয়, বরং নিরাময়ের সম্ভাবনা বয়ে আনতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের UV রশ্মির নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য আমাদের ইমিউন সিস্টেমের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর ফলে এমন কিছু অটোইমিউন রোগ—যেমন মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (MS) ও টাইপ ১ ডায়াবেটিস—এর ঝুঁকি কমে যেতে পারে বা লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।এসব রোগে শরীর নিজের কোষ ও টিস্যুকে শত্রু মনে করে আক্রমণ করে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়।

UV রশ্মি ইমিউন সিস্টেমে কীভাবে কাজ করে, তা এখন বিজ্ঞানীরা ঘনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করছেন। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে এটি ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে প্রভাব ফেলে এবং শরীরের অতি সক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শান্ত করতে পারে। এতে করে রোগের গতি ধীর হয় এবং রোগী স্বস্তি পায়।

এরই মধ্যে কিছু গবেষণা পরীক্ষামূলকভাবে সূর্যরশ্মির সদগুণকে কাজে লাগিয়ে “UV থেরাপি” বা “লাইট থেরাপি” তৈরি করতে শুরু করেছে। এই থেরাপিগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে যাতে সূর্যের উপকারি রশ্মিগুলো কৃত্রিমভাবে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু ক্ষতিকর দিকগুলো দূরে রাখা যায়।

UV রশ্মি ভিটামিন ডি উৎপাদনে সহায়তা করে, যা ইমিউন সিস্টেমকে ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। এছাড়াও এটি কিছু ইমিউন-সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক পথকে সক্রিয় করে, যা অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া হ্রাসে ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এই নতুন ধরণের চিকিৎসা ভবিষ্যতে বিকল্প চিকিৎসা থেকে মূলধারার চিকিৎসায় পরিণত হতে পারে। চিকিৎসার অঙ্গনে সূর্যরশ্মির এই নতুন ব্যবহার হয়তো আগামী দিনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায় হয়ে উঠবে।

বাজেট ২০২৫–২৬ : মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ছায়ায়

নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম প্রস্তাবিত বাজেটের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা বলছেন এই বাজেট শুধু একটি অর্থবছরের আর্থিক দিকনির্দেশনা নয়, তা হতে চলেছে একটি সংকট-সংকেতময় সময়ের প্রতিক্রিয়াশীল রূপরেখা।

গত আড়াই বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা কমলেও তা এখনো নিম্ন আয়ের মানুষজনের জন্য স্বস্তিকর মাত্রায় আসেনি। মজুরি বাড়েনি সেই হারে, ফলে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত সবাই আয়ের সাথে ব্যয়ের বৈষম্যে পড়েছেন। এমন বাস্তবতায় বাজেটে অগ্রাধিকার পাচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষার পরিসর বাড়ানোর প্রশ্ন।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম পটভূমি ছিল কর্মসংস্থান সংকট। সরকারি খাতে কর্মসংস্থানের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৫-৬ শতাংশ। অপরদিকে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ গত এক দশক ধরে স্থবির, যার পরিণতিতে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিও স্থবির হয়ে আছে। জাতীয় আয়ের (GDP) তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ যেখানে মাত্র ২৪ শতাংশ, সেখানে কাঙ্ক্ষিত হার ৩০ শতাংশের ওপরে হওয়া দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর-জিডিপি অনুপাত, যা বর্তমানে ৮ শতাংশের নিচে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকার একদিকে যেমন ব্যয় সংকোচনে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থায়নও নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে বাজেট বরাদ্দে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে দেশের ব্যাংক স্প্রেড (ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান) ৬ শতাংশের কাছাকাছি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হলেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়িক খরচে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। যার পরিণতিতে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন, বা আকার ছোট করছেন। এ অবস্থায় বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

নীতির অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক উত্তাপও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে ইতিবাচক বার্তা দিলেই হবে না, বরং দরকার নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন। বিদেশি বিনিয়োগ নীতিমালায় নানা সুবিধা থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের বাস্তবতা এসব সুবিধার পূর্ণ সদ্ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে অর্থনীতির সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়। স্বল্পমেয়াদে বাজেটের মাধ্যমে উৎপাদন খাতে ব্যয়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার বিস্তারকে গুরুত্ব দিতে হবে। মধ্যমেয়াদে প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার, বিনিয়োগ সহজীকরণ ও নীতি-প্রয়োগে দক্ষতা। আর দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বাজেট কি আস্থা ফেরাতে পারবে?

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনের অনিশ্চয়তা, অব্যাহত আন্দোলন এবং সড়কপথে বিঘ্ন এসবই দেশের সার্বিক পরিবেশে আতঙ্ক তৈরি করছে। বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষমাণ অবস্থানে, সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। এমন বাস্তবতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট শুধু অর্থনৈতিক দলিল নয় এটি হতে চলেছে দেশের ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা ও আস্থার একটি পরীক্ষাও।

শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি, মেটামরফোসিসে স্মৃতির ধারাবাহিকতা

প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর প্রক্রিয়া হলো মেটামরফোসিস বা রূপান্তর। শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি বা অন্য কোনো পূর্ণবয়স্ক পতঙ্গের রূপান্তর একটি সম্পূর্ণ শারীরিক পুনর্গঠন। এই প্রক্রিয়ায় শুঁয়োপোকার শরীর প্রায় সম্পূর্ণরূপে গলে গুঁড়ো হয়ে যায়, তারপর সেই গুঁড়ো থেকে নতুন করে প্রজাপতির শরীর গঠিত হয়।

এই পরিবর্তন এতটাই চরম যে, মনে হয় প্রাণীর পুরনো দেহ আর থাকে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, গবেষণায় দেখা গেছে প্রজাপতি তার শুঁয়োপোকা অবস্থায় শেখা কিছু স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। এটি জীববিজ্ঞানের একটি জটিল ও রহস্যময় বিষয়, যা স্মৃতি, পরিচয় এবং চেতনার ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন মেটামরফোসিসের সময় শুঁয়োপোকার মস্তিষ্ক প্রায় সম্পূর্ণরূপে গলে যায়, তাই শুঁয়োপোকার স্মৃতি প্রজাপতির কাছে পৌঁছানো অসম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ২০০৮ সালে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা শুঁয়োপোকাদের একটি নির্দিষ্ট গন্ধের সঙ্গে হালকা শক যুক্ত করে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, যাতে তারা সেই গন্ধ থেকে দূরে থাকে। মেটামরফোসিসের পর যখন শুঁয়োপোকারা প্রজাপতিতে রূপান্তরিত হয়, তখনও তারা সেই গন্ধ থেকে দূরে থাকার প্রবণতা দেখিয়েছে। এটি প্রমাণ করে শুঁয়োপোকা অবস্থায় শেখা স্মৃতি প্রজাপতির মস্তিষ্কে রয়ে গেছে।

এই গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে মস্তিষ্কের কিছু অংশ মেটামরফোসিসের সময় টিকে থাকতে পারে এবং স্মৃতি বহন করতে পারে। এটি জীববিজ্ঞানের একটি বড় ধাঁধা, কারণ রূপান্তরের সময় শরীরের প্রায় সব অংশই পুনর্গঠিত হয়, তবুও কিছু স্মৃতি টিকে থাকে।

গবেষণায় জানা গেছে মেটামরফোসিসের সময় মস্তিষ্কের কিছু অংশ যেমন গ্যাংলিয়া বা মাশরুম বডিস (mushroom bodies) আংশিকভাবে টিকে থাকতে পারে, যা স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য দায়ী। এই গ্যাংলিয়া মস্তিষ্কের এমন অংশ যা গন্ধ ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মেটামরফোসিসের সময় মস্তিষ্কের অনেক অংশ পুনর্গঠিত হলেও এই গ্যাংলিয়াগুলো আংশিকভাবে অক্ষত থেকে স্মৃতি বহন করতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

গ্যাংলিয়া হল স্নায়ুতন্ত্রের এমন এক ধরনের গুঁড়ো আকারের স্নায়ুকোষের সমষ্টি, যা মূলত সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মেটামরফোসিসের সময় এই গ্যাংলিয়াগুলো গলে না গিয়ে আংশিকভাবে টিকে থাকলে, শুঁয়োপোকা অবস্থায় শেখা অভিজ্ঞতা প্রজাপতির মস্তিষ্কে স্থান পায়।

প্রজাপতির এই স্মৃতি সংরক্ষণ আমাদের পরিচয় ও চেতনার ধারণাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে বাধ্য করে। যদি একটি প্রাণী তার পুরনো অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে তার পরিচয় কি কেবল তার বর্তমান শারীরিক রূপের ওপর নির্ভর করে? নাকি তার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিই তার আসল পরিচয়?মেটামরফোসিসের মতো প্রক্রিয়া এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য একটি চমৎকার উদাহরণ।

দর্শন ও মনোবিজ্ঞানে পরিচয় এবং স্মৃতির সম্পর্ক নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। একজন ব্যক্তি বা প্রাণীর পরিচয় কি তার দেহের ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভর করে, না কি তার স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতার ওপর? প্রজাপতির মেটামরফোসিস এই প্রশ্নকে জীববিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে তুলে ধরে।কারণ শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রূপান্তরের সময় দেহের অংশগুলো পুরোপুরি বদলে গেলেও স্মৃতি টিকে থাকে, যা পরিচয়ের ধারাবাহিকতার একটি দৃষ্টান্ত।

শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রূপান্তরের সময় স্মৃতি সংরক্ষণ কেবল জৈবিক নয়, পরিবেশগত ও বিবর্তনীয় গুরুত্বও বহন করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি মাদা প্রজাপতি তার শুঁয়োপোকা অবস্থায় যে গাছ থেকে খেয়েছিল তার গন্ধ ও বৈশিষ্ট্য মনে রাখতে পারে, তাহলে সে সেই গাছেই ডিম পাড়তে পারে।এর ফলে প্রজাতির পরিবেশ পছন্দ ও বাসস্থান নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে নতুন প্রজাতির উদ্ভবেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া শিকারি বা বিপদের প্রতি শুঁয়োপোকা অবস্থায় শেখা প্রতিক্রিয়া প্রজাপতির জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। এই স্মৃতি সংরক্ষণ বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মেটামরফোসিসের সময় মস্তিষ্কের পুনর্গঠন অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে মস্তিষ্ক যেন একটি সুতোয়ের বলের মতো গলে যায় এবং আবার নতুন করে গাঁথা হয়। এই প্রক্রিয়ায় স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য নিউরনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সংযোগ ও স্নায়ুতন্ত্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য। এটি আমাদের মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি বা নমনীয়তার একটি চমৎকার উদাহরণ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো মস্তিষ্কের কোন অংশগুলো টিকে থাকে এবং কীভাবে তারা স্মৃতির তথ্য বহন করে? গবেষকরা বিশ্বাস করেন, নিউরনের মধ্যে সাইনাপটিক সংযোগের কিছু অংশ মেটামরফোসিসের সময় অক্ষত থাকে, যা স্মৃতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে।

এই রহস্যময় প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। মেটামরফোসিসের সময় স্মৃতি সংরক্ষণের পদ্ধতি বুঝতে পারলে, তা মানুষের মস্তিষ্কের পুনরুদ্ধার ও নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এছাড়া কীভাবে মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ রিকনফিগার হয় তা বোঝার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে, মস্তিষ্কের পুনর্গঠন ও স্মৃতি সংরক্ষণের প্রক্রিয়া বোঝা গেলে, আলঝেইমার ও পারকিনসন্স রোগের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় নতুন পন্থা উদ্ভাবন সম্ভব হতে পারে। এছাড়া জীববিজ্ঞানের পাশাপাশি মনোবিজ্ঞান ও দর্শনের ক্ষেত্রেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

মেটামরফোসিসের সময় শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রূপান্তর একটি চরম শারীরিক পরিবর্তন হলেও, স্মৃতির টেকসইতা আমাদের জীববিজ্ঞানের গভীর রহস্য উন্মোচন করে। এটি প্রমাণ করে জীবনের রূপান্তর শুধু বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ স্তরেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।

AI ভিত্তিক চ্যাটবটের সীমাবদ্ধতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি বর্তমানে প্রযুক্তি জগতে আলোচিত একটি নাম। এর উত্তর দেওয়ার দক্ষতা, প্রাসঙ্গিকতা ও গোছানো ভাষা অনেককেই বিস্মিত করে। তবে এই চ্যাটবটের পেছনের প্রযুক্তি ও বিশাল প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা নেই। শুধু ব্যবহার করলেই যথেষ্ট নয় বরং এর কাজের ধরন ও সীমাবদ্ধতাও জানা জরুরি।

চ্যাটজিপিটি একধরনের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (Large Language Model – LLM)। আরও নির্দিষ্টভাবে এটি একটি ক্যাজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, যার মূল কাজ হলো পূর্ববর্তী শব্দগুলোর ভিত্তিতে পরবর্তী শব্দ কী হতে পারে, তা অনুমান করে লেখা তৈরি করা। এটি অনেকটা স্মার্টফোনের ভবিষ্যদ্বাণীমূলক লেখার মতো, তবে অনেক বেশি উন্নত ও জটিল।

আপনি যখন কোনো প্রশ্ন করেন চ্যাটজিপিটি প্রথমে সেই লেখাকে টোকেনে ভেঙে ফেলে। টোকেন হচ্ছে টেক্সটের ক্ষুদ্র একক, একটি শব্দ বা শব্দাংশ।যেমন, ‘চ্যাটজিপিটি’ শব্দটি ‘চ্যাট’ ও ‘জিপিটি’—এই দুটি টোকেনে বিভক্ত হতে পারে। এরপর চ্যাটজিপিটি এই টোকেনগুলো বিশ্লেষণ করে আপনার প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা বোঝে এবং সম্ভাব্য পরবর্তী টোকেন কোনটি হতে পারে, তা গণনা করতে থাকে। এভাবে একটির পর একটি টোকেন যোগ করে সম্পূর্ণ উত্তর তৈরি হয়, যা আপনি দেখতে পান টাইপিংয়ের মতো।

চ্যাটজিপিটির মূল শক্তি ট্রান্সফরমার নামক গভীর শিক্ষণভিত্তিক (ডিপ লার্নিং) মডেল এবং এর সেল্ফ-অ্যাটেনশন প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে চ্যাটজিপিটি বুঝতে পারে, একটি বাক্যের কোন শব্দ কোনোটার সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত। যেমন, ‘The bank will not approve the loan.’ বাক্যে ‘bank’ শব্দটি নদীর পাড় নাকি আর্থিক প্রতিষ্ঠান—তা বাক্যের অন্যান্য শব্দ দেখে চ্যাটজিপিটি নির্ধারণ করতে পারে। এই প্রযুক্তির জন্যই এটি বাক্য বা অনুচ্ছেদের প্রেক্ষাপটে শব্দের অর্থ বুঝে নিতে পারে।

চ্যাটজিপিটি বিশাল পরিমাণ তথ্য পড়ে ও বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষিত হয়েছে। প্রশিক্ষণ দুটি ধাপে চলে—প্রি-ট্রেইনিং ও ফাইন-টিউনিং। প্রথম ধাপে এটি বিপুল পরিমাণ লেখাজোখা বিশ্লেষণ করে কোন শব্দের পরে কোন শব্দ সাধারণত আসে তা শেখে। ফাইন-টিউনিং ধাপে, নির্দিষ্ট কিছু ডেটা ও মানুষের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মডেলটির আচরণ আরও উন্নত ও নিরাপদ করা হয়।

চ্যাটজিপিটি প্রতিবার উত্তর তৈরির সময় সম্ভাব্য অনেক টোকেনের মধ্যে সবচেয়ে উপযুক্তটি বেছে নেয়। তবে কখনো কখনো কয়েকটি টোকেনের সম্ভাবনা কাছাকাছি হলে যেকোনো একটি বেছে নেওয়া হয়, ফলে একই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন যুক্তিসঙ্গত উত্তর পাওয়া যায়।

তবে চ্যাটজিপিটি আসলে একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক লেখার মডেল, এর কোনো চেতনা বা সত্যিকার বোঝার ক্ষমতা নেই। এটি শুধু ডেটার মধ্যকার প্যাটার্ন দেখে পরবর্তী সম্ভাব্য শব্দ অনুমান করে চলে। তাই কখনো কখনো ভুল, অসংলগ্ন বা ভ্রান্ত তথ্য (হ্যালুসিনেশন) দিতে পারে। আবার প্রশিক্ষণ ডেটায় থাকা পক্ষপাতিত্ব বা ভুল দৃষ্টিভঙ্গিও অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।

চ্যাটজিপিটি মানুষের মতো ভাষায় উত্তর দিলেও, এটি আসলে জটিল গাণিতিক ও ভাষাগত মডেলের ওপর নির্ভরশীল একটি এআই টুল। এর সীমাবদ্ধতা ও কাজের ধরন জানা থাকলে ব্যবহারকারীরা আরও সচেতনভাবে এবং কার্যকরভাবে এআই চ্যাটবটের সুবিধা নিতে পারবেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে মানুষের অন্ত্রের জীবাণুতে

জলবায়ু পরিবর্তন মানবদেহের অন্ত্রের জীবাণুজগত বা গাট মাইক্রোবায়োমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। যা হজম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। গাট মাইক্রোবায়োম হলো অন্ত্রের ভেতরে থাকা লক্ষ লক্ষ জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার সমষ্টি, যা খাদ্য হজম, পুষ্টি শোষণ এবং ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই জীবাণুর ধরন ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আসছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, যেমন তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি।এই পরিবর্তনগুলি সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে মানুষের শরীরের মাইক্রোবায়োমে প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কিছু রোগজীবাণুর বিস্তার বাড়ছে, যা অন্ত্রের জীবাণু পরিবেশকে বদলে দেয়। উদাহরণস্বরূপ ডেঙ্গু ও ডায়রিয়ার মতো রোগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে, যা হজম প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায় এবং পুষ্টি শোষণে বাধা সৃষ্টি করে।এছাড়া অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্যহীনতা ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে, ফলে সংক্রমণ ও প্রদাহজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে অন্ত্রের অণুজীব মস্তিষ্ক ও আচরণেও প্রভাব ফেলে, তাই মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তন মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন ধরনের জীবাণু ও রোগের উদ্ভব হচ্ছে, যা মানবদেহের অন্ত্রের জীবাণু পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তন ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের মাত্রা বাড়াতে পারে, বিশেষ করে ফুসফুস, ত্বক ও অন্ত্রের ক্যান্সার। তাছাড়া দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, প্রোবায়োটিক গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অপরিহার্য। এছাড়া পরিবেশগত নীতিমালা কঠোরকরণ ও কার্বন নির্গমন হ্রাসের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানো জরুরি। গবেষণার মাধ্যমে অন্ত্রের জীবাণুর পরিবর্তন ও তার প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানুষের অন্ত্রের জীবাণুজগতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে, যা হজম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে। এই পরিবর্তন মোকাবিলায় বিজ্ঞান ও নীতিনির্ধারকদের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন, যাতে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

সংস্কার ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে বড় সংস্কার জুলাই সনদের পর, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছাড়া সংবিধান পরিবর্তন নয় : আসিফ নজরুল

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন — ‘সরকারের সংস্কার কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। যেসব সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য প্রয়োজন (প্রধানত সংবিধান সংশোধন বিষয়ক) সেই সমস্ত ক্ষেত্রে জুলাই চার্টারের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জুলাই মাসে এই চার্টার তৈরি হয়ে গেলে তার ভিত্তিতে বড় ধরনের সংস্কারগুলো করা সম্ভব হবে। সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করবে না।’

মঙ্গলবার রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এর মিলনায়তনে আয়োজিত ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (এমেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স, ২০২৫’ বিষয়ে মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করার সময় তিনি একথা বলেন।

আসিফ নজরুল বলেন — সরকারের সমস্ত সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, দেশে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই দেশের শাসকরা যেন অত্যাচারী হয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে দিতে না পারে, মানুষ যেন মামলার জটে পড়ে সর্বশ্বান্ত না হয়, উচ্চ নাগরিক সুবিধা ভোগ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, মানুষ যেন ‘ডিফাইন লিগ্যাল সিস্টেমে’ থাকতে পারে—এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন কমিশনের মাধ্যমে যেসব সংস্কার প্রস্তাব পাওয়া গেছে, সেগুলো থেকে আশু বাস্তবায়নযোগ্য শতাধিক প্রস্তাব চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন করার কাজ শুরু করা হয়েছে। শিগগির বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার প্রস্তাবগুলো আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

আইন উপদেষ্টা বলেন — সরকার ইতোমধ্যে সিপিসি (দেওয়ানি কার্যবিধি), সাইবার সুরক্ষা আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইনসহ বিভিন্ন আইন সংশোধন করেছে। শিগগিরই জুডিসিয়াল সার্ভিসের নিয়োগ বিধিমালা ও জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন সংশোধন করতে যাচ্ছে। গুম প্রতিরোধ আইন দুয়েক মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক কিছুই করার চেষ্টা করছি। কাজ করছি। তবু দেখা যাচ্ছে অনেকেই বলছেন কোথায় সংস্কার? আবার বলেন এত দ্রুততা কেন।যারা সমালোচনা করেন তাদের মানসিকতারও একটু সংস্কার প্রয়োজন। এমন অনেক কাজও আমরা করেছি যা এখন পর্যন্ত কেউ করেনি। কিছুদিন আগে প্রণীত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনের প্রশংসা করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।’

আসিফ নজরুল মনে করেন, আজকে আমাদের সমাজে সংস্কারের জন্য যে প্রত্যাশা বা চাপ তৈরি হয়েছে, সেটার তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সীমা ও সরকার কাঠামো খুব যথোপযুক্ত নয়। তাই সরকারকে অধিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

মতবিনিময়ে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনে খসড়ার ওপর সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন বলেন–এখানে যেসকল চেঞ্জ (সংশোধন) নিয়ে কথা হচ্ছে, সেগুলো যথাযথভাবে করা গেলে আমি মনে করি গত ২৫ বছর ধরে যে পরিবর্তনের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি সেটা আমরা পেয়ে যাবো।

সংস্কার সংলাপ : ৭০ অনুচ্ছেদ, নারী আসন ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রসঙ্গে আলোচনা

মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফা সংলাপের প্রথম দিনে ৭০ অনুচ্ছেদ, নারী আসন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নিয়ে আলোচনা হয়। ৭০ অনুচ্ছেদ ও স্থায়ী কমিটি নিয়ে দলগুলোর অবস্থান কাছাকাছি হলেও নারী আসন নিয়ে মতপার্থক্য দূর হয়নি।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে অর্থবিল, আস্থা-অনাস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে দলের বিরুদ্ধে এমপিদের ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা দিতে একমত হয়েছে বিএনপি, জামায়াতসহ অধিকাংশ দল। এনসিপি চায় সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন এমপিরা।

বিএনপি নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করতে রাজি। তবে সরাসরি নির্বাচন নয়, বিদ্যমান সংরক্ষিত পদ্ধতি চায় তারা। জামায়াত ভোটের অনুপাতে নারী আসনের বণ্টন চায়। এনসিপি সরাসরি নির্বাচন চায়। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস নারী আসনই চায় না। বামপন্থি দলগুলো নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন চায়।

কমিশন প্রস্তাব করেছিল, ৫০ শতাংশ কমিটির সভাপতি বিরোধী দলের এমপিরা হবেন। কিছু স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিরোধী দলকে দিতে ঐক্যমত হয়েছে।বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অধিকাংশ দল সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটি (পিএসি), সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রিভিলেজ কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের এমপিদের দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।

বৈঠক সূত্র জানায়, বিএনপি এবং প্রধান দলগুলো আগের তুলনায় নমনীয় ছিল। তবে বিএনপির মিত্র এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো কঠোর অবস্থানে ছিল। ঐকমত কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘যেসব বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছাবে, সেগুলো নিয়ে জুলাই সনদ হবে।জাতীয় সনদে কেবল সেসব প্রস্তাবই অন্তর্ভুক্ত করতে চাই, যেগুলোতে দলগুলোর সম্মতি থাকবে।’

আলোচ্যসূচিতে থাকলেও সময়ের অভাবে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়সীমা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচনের সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়নি। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা সংলাপ সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন।

সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি কমিশন সংস্কারে গঠিত কমিশনগুলোর ১৬৬ সুপারিশ নিয়ে গত মার্চ থেকে প্রথম দফার সংলাপ করে ঐকমত্য কমিশন। প্রথম দফায় ৩৩ রাজনৈতিক দল এবং জোটের সঙ্গে পৃথকভাবে বসেছিল কমিশন। দ্বিতীয় ধাপে সব দল একসঙ্গে বসছে।

স্টেফান স্যাগমাইস্টার : গ্রাফিক ডিজাইনে আত্মজিজ্ঞাসা ও নান্দনিকতার নতুন মোড়

গ্রাফিক ডিজাইন বিশ্বে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাঁরা কেবল একটি শিল্পধারার প্রতিনিধি নন, বরং সেই ধারাকে ভেঙে নতুন আঙ্গিকে নির্মাণ করেছেন। স্টেফান স্যাগমাইস্টার (Stefan Sagmeister) সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যিনি গ্রাফিক ডিজাইনকে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, তিনি এটি দিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা, নান্দনিকতা, এবং জীবনদর্শনের এক বৈপ্লবিক ভাষা নির্মাণ করেছেন।

স্যাগমাইস্টার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬২ সালে অস্ট্রিয়ার ব্রেগেঞ্জ শহরে। তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় University of Applied Arts Vienna থেকে, যেখানে তিনি গ্রাফিক ডিজাইনের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে Fulbright Scholarship নিয়ে তিনি যান যুক্তরাষ্ট্রের Pratt Institute–এ, যেখানে তাঁর চিন্তা ও নান্দনিক ঘরানা আরও বিকশিত হয়। এই শিক্ষা জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল একজন ডিজাইনার নয়, বরং এক চিন্তাশীল শিল্পীর রূপ নেন, যিনি ভিজ্যুয়াল ভাষাকে জীবন ও আত্মার প্রকাশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

১৯৯৩ সালে নিউ ইয়র্কে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ডিজাইন স্টুডিও Sagmeister Inc.। শুরু থেকেই তাঁর কাজ প্রচলিত কনভেনশন ভেঙে দেয়।ক্লায়েন্টদের মধ্যে ছিলেন Lou Reed, The Rolling Stones, HBO, AIGA প্রভৃতি। তার অ্যালবাম কভার ডিজাইনগুলো ছিলো এতটাই ব্যতিক্রমধর্মী যে তিনি দুইবার Grammy Award অর্জন করেন এবং বেশ কয়েকবার মনোনীত হন। বিশেষ করে The Rolling Stones-এর “Bridges to Babylon” এবং David Byrne & Brian Eno-এর “Everything That Happens Will Happen Today” অ্যালবাম কভার ডিজাইন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়।

স্যাগমাইস্টার নিজেকে “বিজ্ঞাপন নির্মাতা” বললেও, তাঁর কাজ কখনোই একমাত্র ব্র্যান্ডিং বা লোগো ডিজাইনে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং প্রতিটি ডিজাইনের পেছনে ছিল একটি জীবনবোধ, দর্শন এবং কখনো কখনো তীব্র আত্মজিজ্ঞাসা।

স্যাগমাইস্টারের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো AIGA Detroit poster (১৯৯৯), যেখানে তিনি নিজের শরীরে ব্লেড দিয়ে ক্লায়েন্টের তথ্য খোদাই করে পোস্টার তৈরি করেন।

২০০৪ সালে স্যাগমাইস্টার একটি ব্যক্তিগত প্রকল্প শুরু করেন, যার নাম “Things I Have Learned In My Life So Far”। এটি ছিল একটি স্ব-অনুপ্রাণিত জীবনদর্শনমূলক প্রচেষ্টা, যেখানে তিনি নানা ধরনের টিপোগ্রাফি ও ভিজ্যুয়াল ইন্সটলেশন ব্যবহার করে জীবনের শিক্ষাগুলো তুলে ধরেন।যেমন — “Worrying Solves Nothing”, “Complaining is silly. Either act or forget.” ইত্যাদি বার্তাগুলো কখনো শহরের গাছ দিয়ে তৈরি, কখনো কেক দিয়ে লেখা, কখনো রাস্তার ধুলা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা।

এই প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় তিনি TED Talk দেন, যেখানে ডিজাইনের মাধ্যমে মানব অভিজ্ঞতার দার্শনিক দিকটি তুলে ধরেন। তার বক্তব্য ছিল এক অর্থে আত্মজিজ্ঞাসার ট্রিগার, যেখানে ডিজাইনার সমাজ, দর্শক ও নিজের মধ্যকার সংলাপের অংশ।

২০১২ সালে স্যাগমাইস্টার নতুন সঙ্গী হিসেবে Jessica Walsh–কে নিয়ে শুরু করেন Sagmeister & Walsh। এই যৌথ উদ্যোগে ডিজাইন হয়ে ওঠে আরও রঙিন, সাহসী এবং রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল। এখানে টাইপোগ্রাফি, মোশন গ্রাফিক্স, ইনস্টলেশন আর অ্যানালগ ও ডিজিটাল মাধ্যমের মেলবন্ধনে নতুন এক নান্দনিক জগৎ গড়ে ওঠে।

উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে Aizone campaign, যেখানে শরীর-ভিত্তিক টাইপোগ্রাফির ব্যবহার শিল্প ও বিজ্ঞাপনের মধ্যবর্তী সীমারেখা মুছে দেয়। Sagmeister & Walsh একসাথে The Jewish Museum, Adobe, Levi’s-এর মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাজ করেছেন ।

তার তথ্যচিত্র “The Happy Film” (২০১৬) ছিল তার চিন্তার এক চূড়ান্ত প্রকাশ, যেখানে তিনি নিজেই পরীক্ষাগারে রূপান্তরিত হন। মেডিটেশন, থেরাপি ও মনোবিজ্ঞান ব্যবহার করে কীভাবে সুখ অর্জন করা যায় তা তিনি পরীক্ষা করেন এবং শিল্পের ভাষায় চিত্রায়িত করেন।

এই কাজ প্রমাণ করে স্যাগমাইস্টার ডিজাইনকে শুধু পণ্যের বা ক্লায়েন্টের চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না, বরং তিনি নিজেকেও সেই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেন, যাতে শিল্প ও জীবন একে অপরকে প্রতিফলিত করে।

স্টেফান স্যাগমাইস্টার এমন একজন শিল্পী যিনি বারবার প্রমাণ করেছেন ডিজাইন কেবল চোখের খোরাক নয়, এটি আত্মার অনুবাদ। তাঁর কাজগুলো আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে টাইপোগ্রাফি হয়ে উঠতে পারে আত্মদর্শনের একটি আয়না, কীভাবে একটি পোস্টার হতে পারে রাজনীতি, দেহ ও আত্মার যৌথ প্রতিচ্ছবি। Stefan Sagmeister–এর প্রতিটি কাজ আমাদের এক নতুন জগতে নিয়ে যায়, যেখানে ডিজাইন শুধু আকর্ষণীয় নয়, অন্তর্দর্শনময়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি ‘বহুদূর’, ড্রোন হামলার চমক সত্ত্বেও যুদ্ধে সংকটে জেলেনস্কি

ইউক্রেন ১ জুন রাশিয়ার বিমান ঘাঁটিতে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে ইউক্রেন সম্পর্কে তৈরি হতাশাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এই হামলা ছিল একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরির চেষ্টা, যাতে আলোচনায় তারা দুর্বল না দেখায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সাফল্য সাময়িক, কারণ যুদ্ধের বাস্তবতা ভিন্ন। সব ফ্রন্টেই সেনা-রসদ-গোলার সংকটে নাস্তানাবুদ কিয়েভ।

বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএনসহ সব পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, এই হামলায় অন্তত ৪০টি যুদ্ধবিমান আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়েছে। এতে রাশিয়ার কৌশলগত বিমান সক্ষমতার অন্তত ৩৪ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে বলে ইউক্রেন দাবি করে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করেছে, হামলাগুলোর একটি বড় অংশ তারা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। আরটি, স্পুটনিকের মতো সুপরিচিত রুশ সংবাদমাধ্যমগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে খবর আসেনি।

ইউক্রেন বিশ্বাস করছে, এমন প্রতীকী হামলা রাশিয়ার রাজনৈতিক স্তরে নাড়া দিতে পারে। তারা আশা করছে, এসব উসকানির ফলে হয়তো মস্কো হঠকারী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের আরও গভীরে টেনে আনা যাবে।

সময়ের সঙ্গে ইউক্রেনের লক্ষ্য বদলে গেছে সামরিক অগ্রগতি থেকে মিডিয়া প্রভাবের দিকে। গত বছরের ব্যর্থ কুরস্ক অভিযান যেমন তা প্রমাণ করে, এসব প্রচেষ্টা যুদ্ধ জেতার জন্য নয়, বরং রাশিয়ার ধীরগতির অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার জন্য। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা এখন ত্বরান্বিত হচ্ছে। শুধু মে মাসেই ইউক্রেনের ৫৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে রুশ বাহিনী।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই শত শত ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে, যেগুলো ঠেকাতে ইউক্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল। ইউক্রেনীয় সেনারা ধীরে ধীরে পিছু হটছে। বাহিনী ছেড়ে পালানোর হার বাড়ছে। শুধু ২০২৪ সালেই ৯০ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে অননুমোদিত অনুপস্থিতি বা পালানোর অভিযোগে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসেই সেই সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার ছুঁয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে ১৫ হাজার।

অস্ত্রের জোগানও সীমিত হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাচ্ছে, আর ইউরোপের সামর্থ্য সেই ঘাটতি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু অস্ত্রের চেয়েও বড় সংকট হচ্ছে জনশক্তির অভাব। অনেক ইউক্রেনীয় ইউনিটই এখন ৪০-৫০ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের এসব ‘ড্রাম-ড্রাইভেন অ্যাটাকস’ যুদ্ধের গতিপথ বদলাতে নয়, বরং যুদ্ধকে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরে প্রভাবিত করার জন্যই। এর ফলে হয়তো পশ্চিমা দাতাদের আগ্রহ কিছুটা বাড়ে, কিন্তু মাঠে সামগ্রিক সাফল্য আসে না।

এদিকে, তুরস্কে শান্তি আলোচনায় রাশিয়া জানিয়েছে–ইউক্রেন যদি ক্রিমিয়াসহ পাঁচ অঞ্চলের দাবি ছেড়ে দেয় এবং নিজেদের সেনাবাহিনীর আকার ছোট করে আনে, তাহলেই কেবল যুদ্ধবিরতি হবে। এসব শর্ত মানাকে আত্মসমর্পণ হিসেবেই দেখছে কিয়েভ। সোমবার বৈঠকে যুদ্ধবিরতির নিকটতম সম্ভাবনা দেখা না দিলেও বন্দি বিনিময়ের ব্যাপারে একমত হয়েছে দুই পক্ষ।

ইউক্রেন এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা চাইছে রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে। কিন্তু মস্কো বলছে, বিরতির সুযোগ নিয়ে পশ্চিমারা কিয়েভকে আরও অস্ত্র সরবরাহ করে আদতে যুদ্ধকেই দীর্ঘায়িত করতে চায়। তাই যুদ্ধবিরতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পক্ষে তারা। কিয়েভ বলছে, পুতিন শান্তিতে আগ্রহী নন।

শান্তি আলোচনায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই দুই দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বসতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।