ইউক্রেন ১ জুন রাশিয়ার বিমান ঘাঁটিতে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে ইউক্রেন সম্পর্কে তৈরি হতাশাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এই হামলা ছিল একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরির চেষ্টা, যাতে আলোচনায় তারা দুর্বল না দেখায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সাফল্য সাময়িক, কারণ যুদ্ধের বাস্তবতা ভিন্ন। সব ফ্রন্টেই সেনা-রসদ-গোলার সংকটে নাস্তানাবুদ কিয়েভ।
বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএনসহ সব পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, এই হামলায় অন্তত ৪০টি যুদ্ধবিমান আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়েছে। এতে রাশিয়ার কৌশলগত বিমান সক্ষমতার অন্তত ৩৪ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে বলে ইউক্রেন দাবি করে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করেছে, হামলাগুলোর একটি বড় অংশ তারা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। আরটি, স্পুটনিকের মতো সুপরিচিত রুশ সংবাদমাধ্যমগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে খবর আসেনি।
ইউক্রেন বিশ্বাস করছে, এমন প্রতীকী হামলা রাশিয়ার রাজনৈতিক স্তরে নাড়া দিতে পারে। তারা আশা করছে, এসব উসকানির ফলে হয়তো মস্কো হঠকারী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের আরও গভীরে টেনে আনা যাবে।
সময়ের সঙ্গে ইউক্রেনের লক্ষ্য বদলে গেছে সামরিক অগ্রগতি থেকে মিডিয়া প্রভাবের দিকে। গত বছরের ব্যর্থ কুরস্ক অভিযান যেমন তা প্রমাণ করে, এসব প্রচেষ্টা যুদ্ধ জেতার জন্য নয়, বরং রাশিয়ার ধীরগতির অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার জন্য। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা এখন ত্বরান্বিত হচ্ছে। শুধু মে মাসেই ইউক্রেনের ৫৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে রুশ বাহিনী।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই শত শত ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে, যেগুলো ঠেকাতে ইউক্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল। ইউক্রেনীয় সেনারা ধীরে ধীরে পিছু হটছে। বাহিনী ছেড়ে পালানোর হার বাড়ছে। শুধু ২০২৪ সালেই ৯০ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে অননুমোদিত অনুপস্থিতি বা পালানোর অভিযোগে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসেই সেই সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার ছুঁয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে ১৫ হাজার।
অস্ত্রের জোগানও সীমিত হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাচ্ছে, আর ইউরোপের সামর্থ্য সেই ঘাটতি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু অস্ত্রের চেয়েও বড় সংকট হচ্ছে জনশক্তির অভাব। অনেক ইউক্রেনীয় ইউনিটই এখন ৪০-৫০ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের এসব ‘ড্রাম-ড্রাইভেন অ্যাটাকস’ যুদ্ধের গতিপথ বদলাতে নয়, বরং যুদ্ধকে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরে প্রভাবিত করার জন্যই। এর ফলে হয়তো পশ্চিমা দাতাদের আগ্রহ কিছুটা বাড়ে, কিন্তু মাঠে সামগ্রিক সাফল্য আসে না।
এদিকে, তুরস্কে শান্তি আলোচনায় রাশিয়া জানিয়েছে–ইউক্রেন যদি ক্রিমিয়াসহ পাঁচ অঞ্চলের দাবি ছেড়ে দেয় এবং নিজেদের সেনাবাহিনীর আকার ছোট করে আনে, তাহলেই কেবল যুদ্ধবিরতি হবে। এসব শর্ত মানাকে আত্মসমর্পণ হিসেবেই দেখছে কিয়েভ। সোমবার বৈঠকে যুদ্ধবিরতির নিকটতম সম্ভাবনা দেখা না দিলেও বন্দি বিনিময়ের ব্যাপারে একমত হয়েছে দুই পক্ষ।
ইউক্রেন এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা চাইছে রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে। কিন্তু মস্কো বলছে, বিরতির সুযোগ নিয়ে পশ্চিমারা কিয়েভকে আরও অস্ত্র সরবরাহ করে আদতে যুদ্ধকেই দীর্ঘায়িত করতে চায়। তাই যুদ্ধবিরতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পক্ষে তারা। কিয়েভ বলছে, পুতিন শান্তিতে আগ্রহী নন।
শান্তি আলোচনায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই দুই দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বসতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।


