Home Blog Page 77

মানুষের মতো শব্দ করে কাঁদতে পারে গাছ?

বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের গাছগাছালি রয়েছে যাদের নিয়ে নানা রকম লোককথা ও মিথ প্রচলিত। এর মধ্যে অন্যতম একটি গাছ হলো ‘ম্যাড্রাক’ বা ‘মানুষের মতো গাছ’, এটি আফ্রিকার নির্দিষ্ট অঞ্চলে পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই গাছ দেখতে মানুষের মতো এবং যখন এটি কাটা হয় তখন এর ভেতর থেকে শিশুর কান্নার মতো আওয়াজ শোনা যায়। এই ধারণাটি অনেকের কৌতূহল জাগিয়ে তোলে এবং গাছটির বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক দিক নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তাও তৈরি করে।

ম্যাড্রাক গাছের বৈজ্ঞানিক প্রামাণিক তথ্য খুবই সীমিত। আফ্রিকার বনাঞ্চলে এমন কোনো গাছের অস্তিত্বের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট গবেষণার অভাব রয়েছে। তবে গাছের আকৃতি ও গঠন নিয়ে মানুষের কল্পনা ও মিথ প্রচলিত রয়েছে। ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ‘অশ্বত্থ’ বা পিপল গাছ (Ficus religiosa) বহু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহন করে, যেখানে গাছের পাতা বা শাখার শব্দকে নানা আধ্যাত্মিক অর্থে দেখা হয়। কিন্তু ম্যাড্রাকের ক্ষেত্রে কান্নার আওয়াজের গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মেলেনি।

গাছ কাটার সময় কান্নার মতো শব্দ শোনার ঘটনা প্রকৃতিতে বিরল নয়। বেশ কিছু গাছের শাখা বা পাতা ঝড়লে বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণ হয়ে শব্দ হয়, যা কানে ভিন্নরকম শোনায়। পল গাছের পাতার লেজের সাথে ফলকের আঘাতেই ঝমঝম শব্দ শোনা যায়। তবে শিশুর কান্নার মতো সুনির্দিষ্ট শব্দের উৎপত্তি গাছ থেকে হওয়া সম্ভব নয়, গাছের অভ্যন্তরে কোনো স্নায়ুতন্ত্র বা প্রাণী নেই যা এমন শব্দ করতে পারে। এই ধরনের শব্দের উৎস হতে পারে বাতাসের প্রবাহ, গাছের কাঠের ফাটল বা আশেপাশের পরিবেশের অন্যান্য শব্দ।

ম্যাড্রাক গাছের কান্নার আওয়াজের গল্পটি মূলত লোককথা ও কল্পনার ফল। আফ্রিকার বিভিন্ন উপজাতি ও সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে গাছের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস ও কাহিনী প্রচলিত। অনেক সময় প্রকৃতির অদ্ভুত ঘটনা বা শব্দকে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে গল্প তৈরি হয়।চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও মিডিয়ায় এই ধরনের গল্প আরও প্রসারিত হয়। হ্যারি পটার সিরিজে ‘ম্যাড্রাক’ গাছকে চিৎকার করতে দেখা যায়, বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।

উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ব ও পরিবেশগত গবেষণার মাধ্যমে গাছের গঠন, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করা হয়। এমন গবেষণা গাছের অদ্ভুত আচরণ বা শব্দের উৎস নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে। আফ্রিকার বনাঞ্চলে ম্যাড্রাকের মতো গাছের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও তার আচরণ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করলে এই মিথের পেছনের সত্য উদঘাটন সম্ভব।

শিকার থেকে শিল্পে প্রাচীন জাপানের ‘জোমন সংস্কৃতি’

জাপানের প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসে জোমন সংস্কৃতি এক অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। খ্রিস্টপূর্ব ১৪,০০০ থেকে ৩০০ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সংস্কৃতি ছিলো বিশ্বের প্রাচীনতম মৃৎশিল্প ঐতিহ্যের অন্যতম উদাহরণ এবং শিকার-জমায়েত জীবনের সাথে নান্দনিক শিল্পের নিখুঁত সংমিশ্রণ।

বরফ যুগের শেষে জলবায়ু উষ্ণ হতে শুরু করলে, জাপান দ্বীপপুঞ্জ মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয় এবং এই নতুন পরিবেশেই জোমন সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে জোমন জনগণ মূলত শিকার, মাছ ধরা, ও বনজ সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যমে জীবনধারা গড়ে তোলে।

প্রথমদিকে ধারণা ছিল জোমনরা কেবলমাত্র যাযাবর, তবে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় (যেমন সান্নাই মারুয়ামা গ্রাম) দেখা যায় তারা স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছিল এবং একটি তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন করেছিল। তাদের গড় আয়ু ছিল ৩০ বছর এবং জনসংখ্যা সর্বাধিক ২,৬০,০০০ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সামাজিক কাঠামোতে শ্রেণিবিভাজনের স্পষ্ট প্রমাণ নেই, তবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আচার-অনুষ্ঠানে পুরোহিত বা যাজকদের বিশেষ ভূমিকা ছিল।

জোমন সংস্কৃতির সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিক হচ্ছে তাদের মৃৎশিল্প। “জোমন” শব্দের অর্থ ‘দড়ির ছাপ’, যা তাদের পাত্র ও মূর্তিতে দেখা যায়। এই দড়ি-নকশা কেবল নান্দনিকতা নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রতীক। তারা বিভিন্ন আকার ও নকশার পাত্র, পুতুল (dogū), অলংকার, এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র নির্মাণ করেছিল। এই মৃৎশিল্পে জাপানের প্রাচীনতম শিল্প-সৃজনশীলতার ছাপ স্পষ্ট।

জোমনরা প্রধানত শিকার, মাছ ধরা ও বনজ ফলমূল, বাদাম, কন্দমূল সংগ্রহের উপর নির্ভর করলেও, পরবর্তী পর্যায়ে কিছু অঞ্চলে সীমিত পরিসরে কৃষিকাজের চর্চা শুরু হয়। তারা পাথর, হাড়, শামুকের খোল, শিং ইত্যাদি দিয়ে বিভিন্ন অস্ত্র, সরঞ্জাম ও অলংকার তৈরি করত। এছাড়া সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও বিনিময় ব্যবস্থারও প্রমাণ পাওয়া যায়।

জোমন সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বড় আকারের কাঠামো, অলংকৃত মূর্তি ও প্রতীকী শিল্পকর্ম তাদের আধ্যাত্মিক জীবন ও সমাজে ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব নির্দেশ করে। বিশেষ করে মৃৎশিল্পে নারীর প্রতিকৃতি ও উর্বরতার প্রতীকী উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যায়। জোমন সংস্কৃতি শুধু জাপানের নয়, বরং মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। তাদের মৃৎশিল্প, প্রযুক্তি, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় চর্চা বিশ্ব সভ্যতার বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

শিকার-জমায়েত জীবনধারার সাথে নান্দনিক শিল্পের সংমিশ্রণ, স্থায়ী বসতি ও সামাজিক সমতা—এসবই জোমন সংস্কৃতিকে অন্যান্য সমসাময়িক সংস্কৃতি থেকে আলাদা করেছে। জোমন সংস্কৃতি প্রমাণ করে, মানব সভ্যতার বিকাশে শুধু কৃষি নয়, বরং শিকার-জমায়েত সমাজেও শিল্প, ধর্ম ও সামাজিক সংগঠনের গভীরতা থাকতে পারে। এই সংস্কৃতি আজও জাপানের সাংস্কৃতিক চেতনা ও শিল্প-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কতটা বৈষম্যবিরোধী হলো এবারের বাজেট : কল্লোল মোস্তফা, লেখক ও বিশ্লেষক

“… বাজেটে যেসব খাতের সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করা যায়, তার মধ্যে রয়েছে করব্যবস্থা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ। দেশে বিদ্যমান করব্যবস্থা বৈষম্যমূলক। কারণ, ধনীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আহরণের বদলে দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভ্যাট ও শুল্কের মতো পরোক্ষ কর আদায়ে জোর দেওয়া হয়।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় ও বরাদ্দ করা অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করতে না পারায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়ের বেশির ভাগটা আসে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে, যা দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের পক্ষে বহন করা কঠিন। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ অপ্রতুল, অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিভিন্ন কমিশন, কমিটি ও টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে এসব খাতে বৈষম্য দূর করতে বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো এবারের বাজেটে এসব সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

… বাজেটে বিভিন্ন ধরনের কর, শুল্ক, ভ্যাটের হ্রাস-বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হলেও সব মিলিয়ে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা আগের মতোই রয়ে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার যত কর আহরণ করবে, তার ৬৩.৫%ই পরোক্ষ কর, যা ভ্যাট ও শুল্ক হিসেবে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে যাবে।

… স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের ১৫% বা জিডিপির ৫% বরাদ্দের সুপারিশ করেছে।…স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, যা বাজেটের ৫.৩%। টাকার অঙ্কে বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় ৫০০ কোটি টাকা বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে কমেছে।

… শিক্ষা বিষয়ে কোনো কমিশন গঠন করা না হলেও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল, যার মধ্যে রয়েছে ‘মিড-ডে মিল’ চালু, খাতা-কলম-ব্যাগ ইত্যাদি শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য বর্ধিত হারে অর্থসহায়তা প্রদান ইত্যাদি। কিছু উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর জন্য ২ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ গত বাজেটের তুলনায় ৩ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা কমে গেছে।

… এবারের বাজেটে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা—সব মিলিয়ে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ টাকার অঙ্কে কিছুটা বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে বরাবরের মতোই কমেছে। বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৫৩%।

… এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের কোনো কোনো কর্মসূচিতে ভাতার পরিমাণ ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা কিছুসংখ্যক বাড়ানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। যেমন বয়স্ক ভাতার মাসিক হার ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা কিংবা বিধবা ভাতা ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা করা হলেও তা জাতীয় দারিদ্র্যসীমার আয়ের মাত্র ১৫%।

… সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এমন যেসব কর্মসূচি অর্থনীতি-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স কমিটি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল, তার মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন, কৃষি খাতে ভর্তুকি, সঞ্চয়পত্রের সুদ, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ ইত্যাদি।সঞ্চয়পত্রের সুদ ছাড়া বাকিগুলো বরাবরের মতো এবারের বাজেটেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের পেনশন বাবদ ৩৫ হাজার ২৮২ কোটি, কৃষি ভর্তুকি বাবদ ১৭ হাজার কোটি, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাবদ ৪ হাজার ৮০০ কোটি এবং পাঠ্যবই বিতরণ বাবদ ২ হাজার ১৯২ কোটি টাকা বাদ দিলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দাঁড়ায় ৫৭ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.৯২%। এই হার বিশ্বের অনেক নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ তো বটেই, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে গড় বরাদ্দের (৩.৮%) মাত্র চার ভাগের এক ভাগ।

… সরকারের কাজে সংস্কারের কোনো ছাপ পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি সরকারের নিজের গঠিত কমিশন, কমিটি ও টাস্কফোর্সের বৈষম্যবিরোধী সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে পর্যন্ত অগ্রগতি নেই। প্রত্যাশা ছিল বাজেটে তার একটা প্রতিফলন পাওয়া যাবে। কিন্তু সেটাও দেখা গেল না।

আগের ধারাবাহিকতাতেই বাজেটে কর আহরণের কাঠামো পরোক্ষ করনির্ভর রাখা হলো, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বদলে উল্টো কমানো হলো। …”

ঈদুল আজহায় স্বাস্থ্য সচেতনতা

পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের জন্য কেবল ত্যাগের মহিমাই নয়, আনন্দ, উৎসব ও সম্প্রীতির এক অনন্য সময়। এই সময় বাড়িতে বাড়িতে কোরবানির মাংস রান্না হয়, আতিথেয়তার বন্যা বয়ে যায়। তবে এই আনন্দ যেন অতি খাওয়া বা অসচেতন খাদ্যাভ্যাসের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক হওয়াও জরুরি।

ঈদের সময় আমরা অনেকেই দিনে একাধিকবার মাংস খাই এবং সাধারণত তেল-ঝাল-মসলা দেওয়া রান্নাই প্রাধান্য পায়। অথচ একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের দৈনিক মাত্র ৫০–৭৫ গ্রাম রান্না করা লাল মাংসই যথেষ্ট। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, বেশি তেল-মসলা, কিংবা ভাজাপোড়া খাবার হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে, দেখা দিতে পারে গ্যাস, অ্যাসিডিটি বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা।

চিকিৎসক ডা. গুলজার হোসেন মনে করিয়ে দেন, ঈদের মাংস খাওয়া হোক ‘স্মার্ট ও স্বাস্থ্যসম্মত’। তার পরামর্শ অনুযায়ী, মাংসের গায়ে থাকা দৃশ্যমান চর্বি রান্নার আগে কেটে বাদ দেওয়া জরুরি। রান্নায় কম তেল ও মসলা ব্যবহার করলে তা হজমে সহায়ক হয়। মাংসের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে সবজি খেলে খাবারের ভারসাম্য বজায় থাকে, হজমও সহজ হয়।

বিশেষ করে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা কিডনির সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে। চর্বিহীন গ্রিলড বা সেদ্ধ মাংস তাদের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

মাংস সংরক্ষণের দিকেও থাকতে হবে সতর্কতা। মাংস ভালোভাবে ধুয়ে, পানি ঝরিয়ে, জীবাণুমুক্ত প্যাকেটে দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখতে হবে। রান্নার আগে মাংস ভালোভাবে গরম করা ও রান্নার সময় হাত, ছুরি ও কাটার বোর্ড পরিষ্কার রাখা অপরিহার্য।

ঈদের সময় রিচ ফুড খাওয়ার ফলে গ্যাস্ট্রিক বা হজমজনিত সমস্যা থেকে রেহাই পেতে হলে লেবুপানি, টক দই, ইসবগুলের ভুষি, অথবা জিরা-আদা-পুদিনা পানীয় খাওয়া যেতে পারে। বেশি খাওয়ার বদলে ছোট ছোট ভাগে দিনে কয়েকবার খাওয়ার অভ্যাস করলে পেট থাকবে হালকা, ঈদের আনন্দও থাকবে অটুট।

জলবায়ু পরিবর্তন- তীব্র গরমে এক মাস বেশি ভুগেছে ৪০০ কোটি মানুষ

মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত এক বছরে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষকে অতিরিক্ত এক মাস তীব্র গরম সইতে হয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা, ক্লাইমেট সেন্ট্রাল এবং রেড ক্রস ৩০ মে শুক্রবার যৌথভাবে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র গরমের প্রভাবে মৃত্যু ও অসুস্থতা বেড়েছে, কৃষি পণ্যের ক্ষতি হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তীব্র গরমের বিপজ্জনক দিকগুলো তুলে ধরতে নির্দিষ্ট এলাকার ২০২৪ সালের ১ মে থেকে ২০২৫ সালের ১ মে পর্যন্ত আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত এক বছরে প্রায় ৪০০ কোটি বা ৪৯ শতাংশ মানুষ অন্তত ৩০ দিন তীব্র গরম সহ্য করেছেন। এ সময়ে তীব্র তাপপ্রবাহের ঘটনা ছিল ৬৭টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “যদিও বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় বেশি মনোযোগ পায়, তবে তাপপ্রবাহ সম্ভবত সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রভাব।” বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র গরমের কারণে যেসব মৃত্যু হয়, সেগুলোর অনেক ঘটনাই খবরের বাইরে থেকে যায় কিংবা ভুলভাবে তুলে ধরা হয়।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ু বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষকদলের সদস্য ফ্রিডরিক অটোর ভাষায়, তাপপ্রবাহ হল ‘নীরব ঘাতক’। “তাপপ্রবাহে মানুষ রাস্তায় পড়ে মারা যায় না। তারা মারা যায় হাসপাতালে; কিংবা এমন ঘরে, যেখানে তাপমাত্রা ঠিক নেই। ফলে এসব মৃত্যু অদৃশ্যই থেকে যায়।” তিনি বলেন, “প্রতি ব্যারেল তেল পোড়ানোর সঙ্গে, প্রতিটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের সঙ্গে এবং প্রতি ডিগ্রি উষ্ণতার বৃদ্ধির সঙ্গে আরও বেশি বেশি মানুষ তাপপ্রবাহের শিকার হবে।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মার্চে মধ্য এশিয়া, ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ সুদান এবং গত জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যে চরম তাপপ্রবাহ দেখা গেছে, তা জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব হতো না।

রেড ক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের কর্মকর্তা রূপ সিং বলেন, “তাপমাত্রা যে বাড়ছে, তা মানুষ বুঝতে পারছে ঠিকই, কিন্তু সেটাকে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন না। আমাদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যেমন— উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, তাপপ্রবাহের কর্মপরিকল্পনা এবং নগর অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।” গবেষকরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন আসবে এবং তীব্রতাও বাড়বে।

কোরবানির অর্থনীতি –

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় ৩১ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলছে, এ বছর ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৫৪৪টি খামারে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে দেশে এবার ৬৭ হাজার কোটি টাকার কোরবানির পশু বিক্রি হবে।

উৎসবকে সামনে রেখে এভাবেই টাকার লেনদেন বাড়ে, তাতে চাঙ্গা হয় দেশের অর্থনীতি। গরুর হাট থেকে রেমিটেন্স, মোবাইল ব্যাংকিং থেকে চামড়ার বাজার—ঈদুল আজহা ধর্মীয় উৎসব তো বটেই, সেই সঙ্গে লাখ কোটি টাকার এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞও।

বাণিজ্যিক খামারগুলোতে যেমন গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ইত্যাদি পশু লালন পালন হয়, তেমনি পরিবারকেন্দ্রিক খামারেও হয়। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কর্মব্যস্ত খামারি কিংবা কৃষকরা। গোখাদ্যকে কেন্দ্র করে হয় শত শত কোটি টাকার ব্যবসা।

পশু পরিবহনে হয় বড় বাণিজ্য। হাট ইজারা নেওয়ায় খরচ হয় কোটি কোটি টাকা। পছন্দের পশু কিনে দিতে হয় নির্ধারিত হাসিল বা কর। সেখানেও আদায় হয় শত শত কোটি টাকা।

পছন্দের পশু বাসায় আনার পর অন্তত এক দুই দিনের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। শহরাঞ্চলে এই খাবার উচ্চ মূল্যেই কিনতে হয়। এবার পশু জবাই করে মাংস প্রস্তুত করতে প্রয়োজন কসাইয়ের। তার পারিশ্রমিকতো আছেই।

ঈদুল আজহায় বিভিন্ন পশুর ৯০ থেকে এক কোটি চামড়া সংগ্রহ করা হয়, যা সারা বছরের চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ। চামড়া থেকে বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি বা ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা আয় হয়। প্রাথমিকভাবে চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন পড়ে লবণের। এসময় চাহিদা বেড়ে লবণের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, বাণিজ্য হয় কয়েক শত কোটি টাকা।

ঈদুল আজহাতে চাহিদা বাড়ে মসলা পণ্যের। বাণিজ্যের পরিমাণ কম বেশি ৩০০ কোটি টাকা বলে মোহাম্মদ আবদুল মজিদের বই ‘উৎসবের অর্থনীতি’ থেকে জানা যায়।

তাহলে দেখা যায়, শুধু কোরবানির পশুকেন্দ্রিক যে অর্থনীতি তা লাখ কোটি টাকার বেশি। অন্যান্য কিছু মিলিয়ে এর পরিমাণ আরও অনেক বেশি।

এর মধ্যে আছে উৎসবকে কেন্দ্র করে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। আবার ঈদের ছুটির পর কর্মস্থলে ফিরে আসা। এ বাবদও প্রচুর অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে।

এছাড়া উৎসব কেন্দ্রিক অর্থনীতিকে বড় চাঞ্চল্য তৈরি করেন প্রবাসীরা। কোরবানি পশু কেনাকে কেন্দ্র করে ঈদুল আজহায় কিংবা অন্যান্য কেনাকাটায় ঈদুল ফিতরে পরিবারের জন্য অন্য মাসের তুলনায় বেশি অর্থ পাঠিয়ে থাকেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসবে বহু পণ্য ও সেবায় মূল্যছাড় দেয়া হয়। এতে ভোক্তারা উৎসাহী হয়ে তাদের লেনদেনের পরিমাণ বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই উৎসবকে কেন্দ্র করে সব কিছুর দাম বা খরচ বেড়ে যায়। বাড়তি এই খরচ নির্দিষ্ট মানুষের আয়ে প্রভাব ফেলে।

চার গুণ বেশি CO2 শোষণ করতে পারে ‘মস’

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর বৈশ্বিক সমস্যা, যার মূল কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের অতিরিক্ত নিঃসরণ। পরিবেশগত স্থিতিশীলতা রক্ষায় গাছপালা CO2 শোষণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মস (Moss) গাছের তুলনায় চার গুণ বেশি CO2 শোষণ করতে সক্ষম এবং এটি মাটির প্রয়োজন ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো মসকে আধুনিক নগরায়নের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি সম্ভাবনাময় উদ্ভিদ হিসেবে প্রমাণ করেছে।

মস হলো একটি ছোট আকারের ব্রায়োফাইট উদ্ভিদ, যা সাধারণত মাটির উপর, পাথরের ফাঁকে বা অন্যান্য কঠিন পৃষ্ঠে জন্মায়। মাটির প্রয়োজন ছাড়াই বেঁচে থাকার ক্ষমতা মসকে শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সবুজায়নের জন্য উপযুক্ত করে তোলে, যেখানে মাটির অভাব থাকে। মসের এই বিশেষত্ব নগর পরিবেশে কার্বন শোষণ বৃদ্ধিতে নতুন ধারণা প্রদান করে।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, মস গাছের তুলনায় চার গুণ বেশি CO2 শোষণ করতে পারে। অর্থাৎ একই পরিমাণ এলাকায় মস গাছের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একটি কার্যকরী সমাধান হতে পারে। এছাড়া মসের উপস্থিতি নগর এলাকায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। এটি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে তাপ শোষণ করে শহরের তাপমাত্রা প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনে, যা গ্রীষ্মকালে শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পানি শোষণের ক্ষেত্রে মস অত্যন্ত দক্ষ। এটি নিজের ওজনের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ পর্যন্ত পানি ধারণ করতে সক্ষম, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে আর্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি মস বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকর কণা ও দূষণ উপাদান শোষণ করে শহরের বায়ুমণ্ডলকে পরিশুদ্ধ রাখে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো নগর পরিবেশে মসের বহুমুখী প্রভাবকে প্রমাণ করে।

তবে এই মূল্যবান উদ্ভিদটি নগর ব্যবস্থাপনায় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। সাধারণত মসকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে সরিয়ে ফেলা হয়, যা পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিকর। মসের সংরক্ষণ ও ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে নগর পরিবেশের গুণগত মান উন্নত করা সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত নগর যেমন টোকিও, সিয়াটল এবং ইউরোপীয় শহরগুলো ইতোমধ্যেই মসের ব্যবহার শুরু করেছে। তারা নগরের দেয়াল, ছাদ এবং অন্যান্য পৃষ্ঠে মস লাগিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বায়ু পরিশোধন করছে, যা টেকসই নগরায়নের দিক থেকে একটি উদাহরণ।

মস একটি প্রাচীন ব্রায়োফাইট উদ্ভিদ হলেও আধুনিক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অত্যন্ত কার্যকর। এটি গাছের তুলনায় চার গুণ বেশি CO2 শোষণ করে, মাটির প্রয়োজন ছাড়াই বেঁচে থাকে এবং নগর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর পরিবেশ উন্নয়নের জন্য মসকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ ও প্রচার করা উচিত। এটি পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি কার্যকরী এবং সহজলভ্য উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মন্দিরের চাতাল থেকে কিভাবে বিশ্বমঞ্চে উঠে এলো ‘ভারতনাট্যম’?

ভারতনাট্যম শুধু নৃত্যশৈলী নয়, একাধারে দক্ষিণ ভারতের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, নারীর আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তি, দেহভাষায় ঈশ্বর আরাধনা এবং ঔপনিবেশিক দমননীতির বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইতিহাস। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের গভীরে শিকড় গাড়া এই নৃত্যশৈলী সময়ের প্রবাহে যেমন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, তেমনি আবার নতুন প্রজন্মের ভাবনায় নবজাগরণের আলোয় ফিরে এসেছে।

ভারতনাট্যমের জন্ম হয়েছে দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্যের আমলে (৯ম–১৩শ শতাব্দী) তামিলনাড়ুতে। একে প্রাচীনকালে “সদির” বলা হতো এবং এটি মূলত মন্দিরের ভেতরে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত এক পবিত্র আরাধনার অংশ ছিল। দেবদাসী প্রথার সঙ্গে এটি ছিল ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই নারী শিল্পীরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতেন মন্দিরে। তাঁরা ঈশ্বরের “বিবাহিতা” হিসেবে বিবেচিত হতেন এবং নৃত্য-সংগীতের মাধ্যমে তাঁরা ভক্তি, প্রেম এবং সৃষ্টির দর্শন উপস্থাপন করতেন।

এই নৃত্যশৈলী নাট্যশাস্ত্র অনুসরণ করে গঠিত হয়েছে, যা মহর্ষি ভরত রচিত একটি সংস্কৃত গ্রন্থ। নাট্যশাস্ত্র অনুসারে, নৃত্য কেবল বিনোদন নয়, তা ছিল ধর্ম, জ্ঞান, শিক্ষা ও সমাজের নৈতিক কাঠামো রক্ষার মাধ্যম। ভারতনাট্যম তাই শুধু চিত্রবিন্যাস নয়, এটি সময়ের গভীরে প্রবাহিত হওয়া এক সাংস্কৃতিক মানচিত্র।

ভারতনাট্যম তিনটি প্রধান স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে।
১. নৃত্ত (Nritta) – বিশুদ্ধ দেহগত ছন্দ এবং গঠন
২. নৃত্য (Nritya) – ভাব ও অভিব্যক্তির সমন্বয়
৩. নাট্য (Natya) – আখ্যান বা কাহিনির উপস্থাপন

এই শৈলীতে মুখভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি (দৃষ্টিভেদ), অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গতিবিধি (করন), হাতের মুদ্রা, ও পাদ-ছন্দ সবকিছুই নিখুঁত নিয়ম অনুসরণ করে। “অভিনয় দর্পণ” গ্রন্থে এই মুদ্রাগুলোর বিশদ বিবরণ রয়েছে।

ভারতনাট্যম নৃত্যশিল্পে “ভব”, “রস” ও “অঙ্গ” এই ত্রিভূজের মাধ্যমে শিল্পী দর্শকের মনে গভীর অনুভব সৃষ্টি করেন। দর্শক শুধু দেখেন না, তাঁরা একধরনের অন্তর্জগতে প্রবেশ করেন, যেখানে নর্তকীর প্রতিটি দেহভাষা একেকটি মন্ত্রের মতো প্রভাব ফেলে।

ভারতনাট্যমের ভিতর নিহিত রয়েছে আধ্যাত্মিক দর্শন। এটি শুধুমাত্র সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং ঈশ্বরের সঙ্গে নৃত্যকারের মিলনের এক মাধ্যম। শৈব ও বৈষ্ণব ভাবধারার গভীর প্রতিফলন দেখা যায় এতে। শিবের নটরাজ রূপ বা কৃষ্ণের রাধার প্রতি প্রেম এইসব উপাখ্যান ভারতনাট্যমে মূর্ত হয়।

এই নৃত্যশিল্পে দার্শনিকভাবে “আত্মা”র প্রকাশ এবং “মায়া”র ভেদ বোঝাতে বিভিন্ন ভঙ্গিমা ব্যবহার করা হয়। এটি এক প্রকার যোগ সাধনার রূপ, যেখানে দেহ হয়ে ওঠে উপাসনার মাধ্যম। ‘অহং’ বা ইগো-এর বিলুপ্তি ঘটে যখন নর্তকী নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করেন চরিত্রে—তখন তিনি আর ব্যক্তিগত কেউ নন, তিনি হয়ে ওঠেন “লীলা”-র বাহক।

১৮শ শতক থেকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতনাট্যম ও দেবদাসী প্রথাকে “অশ্লীলতা” হিসেবে প্রচার করা হয়। খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা একে “পৌত্তলিক কুসংস্কার” হিসেবে চিহ্নিত করে বন্ধ করার চেষ্টা চলে। ১৯৪৭ সালের আগেই বহু মন্দিরে দেবদাসী প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়, আর ভারতনাট্যম হারাতে থাকে তার সামাজিক স্বীকৃতি।

কিন্তু এই প্রেক্ষাপটেই ঘটে এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীরা নতুন করে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন ভারতনাট্যমকে। তাঁরা বলেন, এটি শুধু ধর্মীয় নয়, এটি এক শিল্প, এক দেহাত্মবোধের গঠনমূলক মাধ্যম। এখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম রুক্মিণী দেবী আরুণ্ডেল, যিনি ১৯৩০-এর দশকে ভারতনাট্যমকে পুনরুজ্জীবিত করে ব্রাহ্মণ সমাজের মধ্যেও গ্রহণযোগ্য করেন। তিনি কলাক্ষেত্র ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও ভারতনাট্যম চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ভারতনাট্যমকে অনেকেই নারীর আত্মপ্রকাশের একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথাগত সমাজে যেখানে নারীকে নিঃশব্দ, আবদ্ধ ও নিষ্ক্রিয় দেখানো হয়, সেখানে ভারতনাট্যমের নর্তকী তাঁর দেহকে ভাষায় রূপান্তর করেন। মুখের একেকটি ভঙ্গি, চোখের দৃষ্টিপথ, পায়ের ছন্দ—সবই একেকটি প্রতিবাদের ভাষা। নারী এখানে ভক্ত নয় শুধু, তিনি ঈশ্বরের সমকক্ষ। তিনি সৃষ্টি, প্রেম, যন্ত্রণা এবং মুক্তির কথা বলেন নিজের শরীরের মাধ্যমে। আধুনিক নারীবাদী পাঠে ভারতনাট্যম এক ধরণের embodied liberation বা দেহমুক্তির দর্শন তুলে ধরে।

আজ ভারতনাট্যম শুধুমাত্র তামিলনাড়ুর সীমানায় আবদ্ধ নয়। এটি পেরিয়ে গেছে ভারতীয় ভূখণ্ড, পৌঁছে গেছে আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, এমনকি আফ্রিকার প্রেক্ষাগৃহেও। এটি এখন শুধু ধর্মীয় নয়, থিয়েটার, আধুনিক ব্যালে, ফিউশন আর্ট সব জায়গায় ভারতনাট্যমের ছায়া দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে বহু অনারব-অনভারতীয় নারী-পুরুষও আজ ভারতনাট্যমকে আত্মস্থ করছেন এবং একে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।

আধুনিক প্রজন্ম ভারতনাট্যমকে ব্যাখ্যা করছে নতুন ভাষায়। সমকামীতা, নারীত্ব, বৈষম্য ইত্যাদি রাজনৈতিক বিষয়ও আজ এই নৃত্যশিল্পের আখ্যান হয়ে উঠছে। এখানেই ভারতনাট্যমের বহুমাত্রিক শক্তি। এটি অতীতকে ধারণ করে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্যও খোলা।

পুতুলের গ্রাম ‘নাগোরো’

জাপানের শিকোকু দ্বীপের একটি নির্জন পাহাড়ি গ্রাম নাগোরো (Nagoro)। দেখতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে বসে থাকা কিংবা হেঁটে চলা কিছু মানুষ। কারও মাথায় টুপি, কেউ হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে, কেউবা চাষের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যায়, তারা কেউ মানুষ নয়, সবাই পুতুল। বাস্তবিকই নাগোরো সেই অদ্ভুত গ্রাম, যেখানে পুতুলেরা বসবাস করে মানুষের জায়গায় এবং মৃতদের কিংবা স্থানত্যাগকারীদের স্মৃতিকে বহন করে নিয়ে চলে। এ যেন এক “মৃত-জীবিত” সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অস্তিত্ব ও অনুপস্থিতির মাঝের সীমারেখাটি অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

নাগোরো গ্রামটি একসময় প্রায় ৩০০ জন অধিবাসীর একটি ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম ছিল। তবে বিগত কয়েক দশকে জাপানে ‘জনসংখ্যা হ্রাস ও নগরমুখী অভিবাসন’ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই গ্রাম জনশূন্য হতে শুরু করে। অধিকাংশ মানুষ কাজের খোঁজে শহরে চলে যায় বা মৃত্যুবরণ করে। বাকি থাকে শুধু পরিত্যক্ত ঘর, শুনশান রাস্তা এবং নিঃসঙ্গ পাহাড়ি নিস্তব্ধতা।

২০০৩ সালে এই পরিবর্তনের এক শৈল্পিক জবাব তৈরি করেন আয়ানো সুকিমি (Ayano Tsukimi) নামের এক নারী, যিনি শহর থেকে ফিরে নিজের গ্রামের এই শূন্যতা উপলব্ধি করে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন। তিনি তার বাবার স্মরণে একটি মানবাকৃতির পুতুল তৈরি করেন। এর পর থেকেই শুরু হয় “পুতুল বসানোর আন্দোলন”। নাগোরো গ্রামে ৩৫০+ এর বেশি পুতুল রয়েছে, যা জীবিত মানুষদের চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি।

এই পুতুলগুলো নিছক সৌন্দর্য নয়। প্রত্যেকটি একটি স্মৃতি, একটি জীবন, একটি সামাজিক চিহ্ন বহন করে। কেউ গ্রামের পুরাতন ডাক্তার, কেউ কৃষক, কেউ স্কুলের ছাত্র। পুতুলদের এই পুনর্বিন্যাস গ্রামটিকে নতুনভাবে ‘জীবন্ত’ করে তুলেছে, যদিও তারা কোনো কথা বলে না, সরে না। এই দৃশ্য সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বে “প্রতিস্থাপনীয় শোকপ্রক্রিয়া” নামে পরিচিত। যেখানে মানুষ তার হারানো আত্মীয় বা সমাজের কোনো সদস্যের শূন্যতা পূরণে বস্তুগত বা সাংস্কৃতিক প্রতীক তৈরি করে। নাগোরো এই শোকপ্রক্রিয়াকে একটি স্থায়ী ও জনসম্মুখ শিল্পে রূপ দিয়েছে।

নাগোরোর গ্রামটি একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর জাপানের কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে, আবার অন্যদিকে এটি একধরনের “সাংস্কৃতিক স্মৃতির সংগ্রহশালা”।প্রতিটি পুতুল যেন হারিয়ে যাওয়া একেকটি আত্মার নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি। এখানে “উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছিটকে পড়া” মানুষের অস্তিত্ব অদ্ভুত এক শিল্পরূপে রূপান্তরিত হয়েছে।

এই পুতুলগুলোকে “স্ট্যাচু” বলাও ভুল হবে। এগুলো একটি চলমান নাট্যরূপ। স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-পুতুলেরা শিক্ষককে ঘিরে বসে আছে, মাঠে কৃষক-পুতুল ফসল তুলছে, একজন মহিলা পুতুল বাসস্ট্যান্ডে কারো অপেক্ষায় বসে আছে। প্রতিটি অবস্থান বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিকৃতি। কেউ আসে না তবু এই নাটক প্রতিদিন চলে। এই নির্মাণকে কেউ কেউ বলেন “জীবন্ত ইনস্টলেশন আর্ট”।

নাগোরো এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি পর্যটন কেন্দ্র। শত শত পর্যটক বছরে সেখানে গিয়ে পুতুলদের দেখে মুগ্ধ হয় এবং ছবি তোলে। এই ধারা গ্রামের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রভাবে হলেও নতুন প্রাণ আনছে।

নাগোরো কেবল একটি পরিত্যক্ত গ্রাম নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রশ্নচিহ্ন—”একটি সমাজ কখন মৃত বলে ধরা হয়?” যদি সেখানে কেউ না থাকে, তবুও যদি স্মৃতি, চিহ্ন ও প্রতীক বেঁচে থাকে, তবে কি তা সমাজ নয়? নাগোরোর প্রতিটি পুতুল যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কেবল জীবিত থাকলেই সমাজ গড়ে না—সমাজ গড়ে স্মৃতি, সম্পর্ক, এবং তাদের প্রতিকৃতি দিয়ে। মানুষহীন এই গ্রামে পুতুলেরা সেই মানবিক সমাজেরই এক প্রেতপ্রতিচ্ছবি, যারা হারিয়ে গেছে কিন্তু মুছে যায়নি।

ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপ- ইউক্রেনের হামলার জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার পুতিনের, ট্রাম্পের আশঙ্কা এখনই আসছে না শান্তি

ইউক্রেনের ড্রোন হামলার জবাবে রাশিয়াকে ব্যবস্থা নিতেই হবে–এমন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় ফোনালাপের পরও যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এই আলোচনা থেকে ‘তাৎক্ষণিক শান্তি’ আসবে না।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে রাশিয়ার বিমানঘাঁটিতে ইউক্রেনের হামলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি পুতিনকে পাল্টা হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাননি বলেও নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প। বরং আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কথা হয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এই বিষয়ে গড়িমসি করছে এবং রাশিয়া এবিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

ফোনালাপে পুতিন বলেন — যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে ইউক্রেন শুধু সময় নিতে চায়, যাতে তারা পশ্চিমা অস্ত্রের মজুদ বাড়াতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘ওদের পুরস্কার দেওয়ার কিছু নেই।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের সন্ত্রাসী হামলায় রাশিয়ার রেললাইন ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলেনস্কি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রস্তাবিত ‘পুতিন-জেলেনস্কি-ট্রাম্প ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে’ অংশ নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।

পুতিন অবশ্য এই প্রস্তাবে ইতিবাচক নন। বরং তিনি ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এ অবস্থায় আলোচনার পরিবেশ নেই।’

একইদিন ব্রাসেলসে ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা বিষয়ে ৫২ দেশের একটি বৈঠকে ইউরোপীয় দেশগুলো নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে যৌথ পরিকল্পনা এবং সরবরাহ জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে এ বৈঠকে।

এদিকে, বিমানঘাঁটিতে ইউক্রেইনের সাম্প্রতিক হামলায় পশ্চিমাদের সম্পৃক্ততা আছে, রাশিয়া এমনটা মনে করে কিনা–এ প্রশ্নের জবাবে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা মঙ্গলবার বলেছেন, পশ্চিমারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, লক্ষ্যবস্তুর কো-অর্ডিনেট দিয়েছে, হামলার নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং সক্রিয়ভাবে ইউক্রেইনকে উসকে দিয়েছে।

“কিইভের শাসকদের হাতে বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে এ ধরনের হামলায় যে পশ্চিমারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয়ভাবেই জড়িত, এসবেই তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে,” বলেছেন তিনি।