ভারতনাট্যম শুধু নৃত্যশৈলী নয়, একাধারে দক্ষিণ ভারতের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, নারীর আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তি, দেহভাষায় ঈশ্বর আরাধনা এবং ঔপনিবেশিক দমননীতির বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইতিহাস। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের গভীরে শিকড় গাড়া এই নৃত্যশৈলী সময়ের প্রবাহে যেমন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, তেমনি আবার নতুন প্রজন্মের ভাবনায় নবজাগরণের আলোয় ফিরে এসেছে।
ভারতনাট্যমের জন্ম হয়েছে দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্যের আমলে (৯ম–১৩শ শতাব্দী) তামিলনাড়ুতে। একে প্রাচীনকালে “সদির” বলা হতো এবং এটি মূলত মন্দিরের ভেতরে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত এক পবিত্র আরাধনার অংশ ছিল। দেবদাসী প্রথার সঙ্গে এটি ছিল ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই নারী শিল্পীরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতেন মন্দিরে। তাঁরা ঈশ্বরের “বিবাহিতা” হিসেবে বিবেচিত হতেন এবং নৃত্য-সংগীতের মাধ্যমে তাঁরা ভক্তি, প্রেম এবং সৃষ্টির দর্শন উপস্থাপন করতেন।
এই নৃত্যশৈলী নাট্যশাস্ত্র অনুসরণ করে গঠিত হয়েছে, যা মহর্ষি ভরত রচিত একটি সংস্কৃত গ্রন্থ। নাট্যশাস্ত্র অনুসারে, নৃত্য কেবল বিনোদন নয়, তা ছিল ধর্ম, জ্ঞান, শিক্ষা ও সমাজের নৈতিক কাঠামো রক্ষার মাধ্যম। ভারতনাট্যম তাই শুধু চিত্রবিন্যাস নয়, এটি সময়ের গভীরে প্রবাহিত হওয়া এক সাংস্কৃতিক মানচিত্র।
ভারতনাট্যম তিনটি প্রধান স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে।
১. নৃত্ত (Nritta) – বিশুদ্ধ দেহগত ছন্দ এবং গঠন
২. নৃত্য (Nritya) – ভাব ও অভিব্যক্তির সমন্বয়
৩. নাট্য (Natya) – আখ্যান বা কাহিনির উপস্থাপন
এই শৈলীতে মুখভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি (দৃষ্টিভেদ), অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গতিবিধি (করন), হাতের মুদ্রা, ও পাদ-ছন্দ সবকিছুই নিখুঁত নিয়ম অনুসরণ করে। “অভিনয় দর্পণ” গ্রন্থে এই মুদ্রাগুলোর বিশদ বিবরণ রয়েছে।
ভারতনাট্যম নৃত্যশিল্পে “ভব”, “রস” ও “অঙ্গ” এই ত্রিভূজের মাধ্যমে শিল্পী দর্শকের মনে গভীর অনুভব সৃষ্টি করেন। দর্শক শুধু দেখেন না, তাঁরা একধরনের অন্তর্জগতে প্রবেশ করেন, যেখানে নর্তকীর প্রতিটি দেহভাষা একেকটি মন্ত্রের মতো প্রভাব ফেলে।
ভারতনাট্যমের ভিতর নিহিত রয়েছে আধ্যাত্মিক দর্শন। এটি শুধুমাত্র সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং ঈশ্বরের সঙ্গে নৃত্যকারের মিলনের এক মাধ্যম। শৈব ও বৈষ্ণব ভাবধারার গভীর প্রতিফলন দেখা যায় এতে। শিবের নটরাজ রূপ বা কৃষ্ণের রাধার প্রতি প্রেম এইসব উপাখ্যান ভারতনাট্যমে মূর্ত হয়।
এই নৃত্যশিল্পে দার্শনিকভাবে “আত্মা”র প্রকাশ এবং “মায়া”র ভেদ বোঝাতে বিভিন্ন ভঙ্গিমা ব্যবহার করা হয়। এটি এক প্রকার যোগ সাধনার রূপ, যেখানে দেহ হয়ে ওঠে উপাসনার মাধ্যম। ‘অহং’ বা ইগো-এর বিলুপ্তি ঘটে যখন নর্তকী নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করেন চরিত্রে—তখন তিনি আর ব্যক্তিগত কেউ নন, তিনি হয়ে ওঠেন “লীলা”-র বাহক।
১৮শ শতক থেকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতনাট্যম ও দেবদাসী প্রথাকে “অশ্লীলতা” হিসেবে প্রচার করা হয়। খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা একে “পৌত্তলিক কুসংস্কার” হিসেবে চিহ্নিত করে বন্ধ করার চেষ্টা চলে। ১৯৪৭ সালের আগেই বহু মন্দিরে দেবদাসী প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়, আর ভারতনাট্যম হারাতে থাকে তার সামাজিক স্বীকৃতি।
কিন্তু এই প্রেক্ষাপটেই ঘটে এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীরা নতুন করে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন ভারতনাট্যমকে। তাঁরা বলেন, এটি শুধু ধর্মীয় নয়, এটি এক শিল্প, এক দেহাত্মবোধের গঠনমূলক মাধ্যম। এখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম রুক্মিণী দেবী আরুণ্ডেল, যিনি ১৯৩০-এর দশকে ভারতনাট্যমকে পুনরুজ্জীবিত করে ব্রাহ্মণ সমাজের মধ্যেও গ্রহণযোগ্য করেন। তিনি কলাক্ষেত্র ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও ভারতনাট্যম চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ভারতনাট্যমকে অনেকেই নারীর আত্মপ্রকাশের একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথাগত সমাজে যেখানে নারীকে নিঃশব্দ, আবদ্ধ ও নিষ্ক্রিয় দেখানো হয়, সেখানে ভারতনাট্যমের নর্তকী তাঁর দেহকে ভাষায় রূপান্তর করেন। মুখের একেকটি ভঙ্গি, চোখের দৃষ্টিপথ, পায়ের ছন্দ—সবই একেকটি প্রতিবাদের ভাষা। নারী এখানে ভক্ত নয় শুধু, তিনি ঈশ্বরের সমকক্ষ। তিনি সৃষ্টি, প্রেম, যন্ত্রণা এবং মুক্তির কথা বলেন নিজের শরীরের মাধ্যমে। আধুনিক নারীবাদী পাঠে ভারতনাট্যম এক ধরণের embodied liberation বা দেহমুক্তির দর্শন তুলে ধরে।
আজ ভারতনাট্যম শুধুমাত্র তামিলনাড়ুর সীমানায় আবদ্ধ নয়। এটি পেরিয়ে গেছে ভারতীয় ভূখণ্ড, পৌঁছে গেছে আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, এমনকি আফ্রিকার প্রেক্ষাগৃহেও। এটি এখন শুধু ধর্মীয় নয়, থিয়েটার, আধুনিক ব্যালে, ফিউশন আর্ট সব জায়গায় ভারতনাট্যমের ছায়া দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে বহু অনারব-অনভারতীয় নারী-পুরুষও আজ ভারতনাট্যমকে আত্মস্থ করছেন এবং একে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।
আধুনিক প্রজন্ম ভারতনাট্যমকে ব্যাখ্যা করছে নতুন ভাষায়। সমকামীতা, নারীত্ব, বৈষম্য ইত্যাদি রাজনৈতিক বিষয়ও আজ এই নৃত্যশিল্পের আখ্যান হয়ে উঠছে। এখানেই ভারতনাট্যমের বহুমাত্রিক শক্তি। এটি অতীতকে ধারণ করে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্যও খোলা।


