Home Blog Page 37

অস্ট্রেলিয়ার AI কপিরাইট বিতর্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সৃষ্টিশীলতার অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে?

গত কয়েক বছর ধরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ছবি আঁকা থেকে শুরু করে গান রচনা, এমনকি লেখালেখি পর্যন্ত AI এখন সৃজনশীল ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এক জটিল ও বিতর্কিত বিষয়, কপিরাইট আইন ও ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় AI এর কপিরাইট ব্যবহারের ওপর নতুন একটি আইন প্রস্তাব হয়েছে, যা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

এই প্রস্তাবিত আইনে AI নির্মাতা সংস্থাগুলোকে কনটেন্ট নির্মাতাদের অনুমতি ছাড়াই তাদের কাজ ব্যবহার করার অধিকার দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ যেসব শিল্পী, লেখক, ফটোগ্রাফার কিংবা অন্যান্য সৃষ্টিশীল পেশাজীবী তাদের তৈরি কনটেন্ট AI মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণে ব্যবহার করলেও তারা কোনও স্বীকৃতি বা পারিশ্রমিক পাবেন না। এই আইনের পক্ষে এবং বিপক্ষে বিভিন্ন মতামত উঠে এসেছে এবং জনমত জরিপে দেখা গেছে ৭৪ শতাংশ মানুষ এই আইনের বিরোধিতা করছে।

AI মডেলগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে প্রচুর পরিমাণে ডেটা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে “মেশিন লার্নিং” মডেলগুলোকে হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ ছবি, লেখা, ভিডিও ইত্যাদি দিয়ে প্রশিক্ষিত করতে হয়। এই ডেটা সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যবহার হয় কপিরাইটযুক্ত কনটেন্টের, যা মূল নির্মাতাদের অধিকার লঙ্ঘন করে।

অনেকে যুক্তি দেন, কপিরাইট সৃষ্টিকর্তাদের সম্মতি ছাড়া ডেটা ব্যবহার করলে তা তাদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ AI যখন তাঁদের কাজ থেকে শেখে, তখন সে ভবিষ্যতে সেই কাজের অনুরূপ কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, যা সৃষ্টিকর্তার নিজস্ব কপিরাইট বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া সৃষ্টিশীলতা ও মৌলিকত্বের প্রশ্নও উঠে আসে।

অস্ট্রেলিয়ান সরকার ও AI শিল্পের একাংশ মনে করে, নতুন আইন AI এর উন্নয়নে বাধা কমাবে। কারণ ডেটার সহজলভ্যতা AI মডেলকে উন্নত ও সঠিক করতে সাহায্য করে। তারা বলছেন, AI সৃষ্টিশীলতার নতুন ধারা সৃষ্টি করছে এবং এই প্রযুক্তির প্রবৃদ্ধি থামানো বা নিয়ন্ত্রণ কঠিন। তাই এই আইনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের জন্য কপিরাইট কনটেন্ট ব্যবহারে সহজতা এনে দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিশ্চিত করা হবে।

আইন প্রস্তাবকারীরা আরও বলেন, এটি আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে খাপ খায়, যেখানে অনেক দেশে AI ও কপিরাইট ব্যবহারে কিছুটা উদার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বাণিজ্যকে প্রাধান্য দেওয়া।

অন্যদিকে শিল্পী, লেখক ও সৃষ্টিশীল পেশাজীবীদের সংগঠন এই আইনের কঠোর বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি, এই আইন হলে সৃষ্টিকর্তাদের অধিকার ও মৌলিক কাজের মূল্যায়ন হ্রাস পাবে। শিল্পীদের উপর অর্থনৈতিক চাপ পড়বে এবং সৃষ্টিশীলতা হ্রাস পেতে পারে। তাছাড়া যদি AI মডেলগুলোর প্রশিক্ষণে অনুমতি ছাড়াই কনটেন্ট ব্যবহার করা হয়, তাহলে কে ক্ষতিপূরণ দেবে?

সৃষ্টিশীল পেশাজীবীদের আয় ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। অনেক শিল্পী দাবি করছেন, AI সংস্থাগুলোকে অবশ্যই পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত, কারণ তারা তাঁদের কাজ ব্যবহার করছে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ কনটেন্ট তৈরি করবে।

জরিপে ৭৪% মানুষ এই আইনের বিরোধিতা করে বলেছেন, “সৃষ্টিকর্তাদের সম্মতি ছাড়া তাদের কাজ ব্যবহারের অধিকার AI কোম্পানির নেই।” এর ফলে সরকার ও আইন প্রণেতাদের উপর চাপ পড়েছে নতুন সমঝোতা ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা গড়ার জন্য।

অস্ট্রেলিয়ার এই আইনি বিতর্ক আসলে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ও কপিরাইট আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে AI ও কপিরাইট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা ও আইন প্রণয়ন চলছে।

অনেকে মনে করেন, AI প্রযুক্তিকে নিয়মিত এবং সুষ্ঠু করার জন্য একটি “ফেয়ার ইউজ” বা ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের নীতিমালা জরুরি, যা সৃষ্টিকর্তাদের অধিকার ও AI এর উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে।

গণমাধ্যম হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার, নতুন সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের ইঙ্গিত সরকারের

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) সম্প্রতি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা অন্তর্বর্তী সরকার গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে গত এক বছরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করার জন্য তারা দায়ী নয়।

শুক্রবার (৮ আগস্ট) এক বিবৃতিতে প্রেস উইং জানায়, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয়, কার্যক্রম বা ব্যবসায়িক দিকগুলোতে হস্তক্ষেপ করেনি। এমনকি ভুল তথ্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সম্প্রচারের বিপক্ষেও তারা ব্যতিক্রমী সংযম অনুশীলন করেছে। টেলিভিশনের টকশো ও কলামগুলোতে প্রায়শই এই সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উসকানিমূলক দাবি উত্থাপন করা হলেও, কোনো সেন্সর বা ব্যবস্থা আরোপ করা হয়নি। অভিযোগ দায়ের করা হয়নি, কিংবা উসকানি সত্ত্বেও লাইসেন্স স্থগিত করা হয়নি। বরং অতীতের সরকারের আমলে জোর করে বন্ধ করে দেওয়া কিছু গণমাধ্যমকে পুনরায় প্রকাশ বা সম্প্রচারে ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা মুক্ত গণমাধ্যম এবং বাক স্বাধীনতার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারকে তুলে ধরে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে, সীমিত প্রবেশাধিকারের দাবির বিপরীতে সাংবাদিকরা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীদের কাছে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেয়েছেন। কোনো সাংবাদিককে তাদের আউটলেট বা সম্পাদকীয় অবস্থানের কারণে সাক্ষাৎকার বা ব্রিফিং থেকে বঞ্চিত করা হয়নি।সরকার স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করে এবং তাদের আচরণে তারই প্রতিফলন দেখা যায়।

সংস্কারকৃত অ্যাক্রেডিটেশন পদ্ধতি নিয়ে নোয়াবের সমালোচনাকে প্রেস উইং ‘ভুল তথ্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা জানায় পূর্ববর্তী ব্যবস্থাটি গভীরভাবে আপস করা হয়েছিল, যেখানে বৈধ সাংবাদিকতার কার্যকারিতা ছাড়াই রাজনীতিবিদ, লবিস্ট এবং সুবিধাবাদীদের হাতে সচিবালয়ের পাস তুলে দেওয়া হয়েছিল। সরকার সেই কাঠামো ভেঙে একটি অস্থায়ী পাস সিস্টেম দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে, যা প্রকৃত সাংবাদিকদের সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। এই সংস্কারের উদ্দেশ্য প্রবেশাধিকার সীমিত করা নয়, বরং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়ার অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার করা। আগের নীতিমালায় সাংবাদিকদের জন্য সরকারের ইতিবাচক দিক তুলে ধরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, যা সংশোধন করা হয়েছে। নতুন অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

প্রেস উইং আরও উল্লেখ করে, যেসব সাংবাদিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তা সরকারি নির্দেশে নয়, বরং গণমাধ্যম মালিকদের নিজস্ব সম্পাদকীয় ও কৌশলগত কর্পোরেট পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্তের ফল। এগুলো সরকারের কোনো নির্দেশনা বা চাপ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের প্রতিফলন।

অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকসহ সব নাগরিকের শারীরিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ বছরের শুরুর দিকে মিডিয়া সংস্কার কমিশন একটি নতুন ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ সহ সংস্কারের প্রস্তাব করেছিল, যা সরকার বিবেচনা করছে। বিবৃতিতে নোয়াবকে দোষারোপ করার আগে অভ্যন্তরীণভাবে নিজেদের সদস্যদের কার্যক্রম পরীক্ষা করার এবং মজুরি শোষণ, শ্রম অধিকার অস্বীকার করা, অপর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও অসহনীয় কাজের পরিবেশের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রতি অন্যায্য ব্যবহারের জন্য জবাবদিহি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকার গণমাধ্যম যাতে ভয় বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য ‘হ্যান্ডস-অফ’ পদ্ধতি বজায় রেখেছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি মৌলিক নীতি হিসেবে তুলে ধরেছে।

হারারি মানবজাতির ইতিহাসকে এমন ভঙ্গিতে বলেন, যেন অতীত ও ভবিষ্যৎ এক অবিচ্ছিন্ন আখ্যানের দুই প্রান্ত : জাস্টিন জর্ডান, গার্ডিয়ানের সহকারী সাহিত্য সম্পাদক ও বুকার পুরস্কারের প্রাক্তন বিচারক

মানুষ প্রায় ২৪ লাখ বছর ধরে বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের নিজস্ব প্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স—যাকে লেখক আমাদের “চরমভাবে ব্যতিক্রমী মহান বানর” বলে অভিহিত করেছেন সে সময়ের মাত্র ৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১,৫০,০০০ বছর ধরে আছে। তাই যে বইয়ের নাম Sapiens, সেটিকে উপশিরোনামে “মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” বলা কিছুটা বিভ্রান্তিকর। লেখক ইউভাল নোয়া হারারি কেন বইয়ের ৯৫% অংশ আমাদের প্রজাতির ওপর দিয়েছেন, তা সহজেই বোঝা যায়: আমরা যতই আত্ম-অজ্ঞ হই না কেন, নিজেদের সম্পর্কে অন্য কোনো বিলুপ্ত মানবপ্রজাতির চেয়ে অনেক বেশি জানি। তবুও সেপিয়েন্স-এর ইতিহাস আসলে মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র অংশ।

প্রশ্ন হলো এই বিশাল ইতিহাস কি মাত্র ৪০০ পৃষ্ঠায় ধরা সম্ভব? পুরোপুরি নয়। বরং ১৪ বিলিয়ন বছরের মহাবিশ্বের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত রূপ লেখা হয়তো তুলনামূলকভাবে সহজ। হারারি কেবল অতীতে সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়েও অনেক আলোচনা করেছেন। তবে সেপিয়েন্স-এর মূল কাহিনির ধারা মোটামুটি সবাই মেনে নেবে, আর তিনি তা জীবন্তভাবে উপস্থাপন করেছেন।

আমাদের অস্তিত্বের প্রথম ভাগটা কেটেছে বেশ সাধারণভাবে; এরপর এসেছে ধারাবাহিক কয়েকটি বিপ্লব। প্রথমত, “জ্ঞানবিপ্লব”: প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে আমরা হঠাৎ আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী আচরণ শুরু করি কেন হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয় এবং দ্রুত সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ি। প্রায় ১১,০০০ বছর আগে শুরু হয় কৃষিবিপ্লব, যখন আমরা শিকার-সংগ্রহ থেকে চাষাবাদে রূপান্তরিত হই। প্রায় ৫০০ বছর আগে শুরু হয় বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, যা ২৫০ বছর আগে শিল্পবিপ্লবের জন্ম দেয়। এরপর আসে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব (প্রায় ৫০ বছর আগে), আর বর্তমানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি জীবপ্রযুক্তি বিপ্লবের শুরুতে, যা এখনো নবজাতকের মতো। হারারি মনে করেন, এই জীবপ্রযুক্তি বিপ্লবই হয়তো সেপিয়েন্স-এর সমাপ্তি ঘটাবে, আমাদের জায়গা নেবে বায়োইঞ্জিনিয়ার্ড “পোস্ট-হিউম্যান” অমর সাইবর্গরা।

এই কাঠামোর পাশাপাশি হারারি উল্লেখ করেছেন আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেমন ভাষার বিকাশ: যার ফলে আমরা বিমূর্তভাবে চিন্তা করতে শিখেছি, বৃহৎ সংখ্যায় সহযোগিতা করতে পেরেছি, আর সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আড্ডা দিতে শিখেছি। তারপর এসেছে ধর্মের উত্থান, যেখানে বহুদেববাদকে ধীরে ধীরে একেশ্বরবাদ প্রতিস্থাপন করেছে। এসেছে অর্থ ও বিশেষত ঋণের বিকাশ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্য ও বাণিজ্যের বিস্তার এবং পুঁজিবাদের উত্থান।

হারারি এসব বিশাল ও জটিল বিষয়কে ঝাঁকুনি দিয়ে, অনেক সময় চমকপ্রদ ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন। তার একটি মজার মন্তব্য “আমরা গমকে গৃহপালিত করিনি, গমই আমাদের গৃহপালিত করেছে।” মানুষের সাথে শস্যের এই চুক্তিকে তিনি “ফাউস্টীয় চুক্তি” বলেছেন যেখানে মানুষ প্রকৃতির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিঁড়ে লোভ ও বিচ্ছিন্নতার দিকে দৌড়েছে। ফল? তার মতে, কৃষিবিপ্লব ছিল “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা”—যা আমাদের দিয়েছে খারাপ খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনাহারের ঝুঁকি, ভিড়ের মধ্যে বসবাস, রোগে বেশি আক্রান্ত হওয়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং কঠোর সামাজিক স্তরবিন্যাস।হারারি এমনকি মনে করেন, পাথর যুগে আমরা হয়তো বেশি ভালো ছিলাম। তিনি আধুনিক শিল্পকারখানাভিত্তিক প্রাণী-পালনকে “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

তার মতে, আমাদের আবেগ ও ইচ্ছার মৌলিক কাঠামো এসব বিপ্লবের পরও বদলায়নি—“আমাদের খাদ্যাভ্যাস, সংঘাত, যৌনতা সবই সেই শিকারি-সংগ্রাহক মস্তিষ্কের ফল, যা আজকের মহাশহর, বিমান, ফোন ও কম্পিউটারের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে।” উদাহরণস্বরূপ, আমাদের চিনি ও চর্বির প্রতি প্রবল আকর্ষণই আমাদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করেছে। একইভাবে পর্নোগ্রাফি ভোগও একধরনের অতিভোজনের মতো, যদি মস্তিষ্ককে শরীরের মতো দেখা যেত তাহলে আসক্তদের মস্তিষ্ক দেখতে মোটা মানুষের শরীরের মতো হতো।

হারারি বলেন, বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য “গিলগামেশ প্রকল্প” মানুষকে অমর বা “ইমমর্টাল” করা। তবে ইমমর্টাল মানে অমর নয়, কারণ সহিংসতায় মৃত্যু সম্ভবই থাকবে। তার আশঙ্কা, এই অবস্থায় আমরা হয়তো অতিরিক্ত ভীরু হয়ে যাবো, প্রিয়জনের মৃত্যু আরও অসহনীয় হবে, আর সবকিছুতেই একসময় বিরক্তি এসে যাবে। যেমন টলকিনের এলফরা ভাবত যে মৃত্যুই মানুষের জন্য এক বিশেষ উপহার। কবি ফিলিপ লারকিনের ভাষায়, “সব কিছুর নীচে বিস্মৃতির আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে।”

এমনকি এই সব সমস্যা বাদ দিলেও, ইমমর্টাল হওয়া সুখের নিশ্চয়তা দেয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন সুখের মাত্রা আমাদের বস্তুগত অবস্থার সাথে খুব বেশি সম্পর্কিত নয়। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেলে টাকা সুখ দেয়, কিন্তু এর পর আর তেমন পার্থক্য করে না। লটারি জেতার আনন্দও গড়ে দেড় বছরের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

হারারি বারবার বলেন, হয়তো আজকের সেপিয়েন্স-এর জীবন ১৫,০০০ বছর আগের মানুষের জীবনের চেয়ে খারাপ। তার বই অনেক জায়গায় আকর্ষণীয় ও সুন্দরভাবে লেখা হলেও, ক্রমে অসতর্কতা, অতিরঞ্জন ও চমকপ্রদ শিরোনামের জন্য মান কমে যায়। যেমন, নাভারিনো যুদ্ধের তার বিবরণ বিকৃত ও অসম্পূর্ণ উইকিপিডিয়া পড়লেই তা বোঝা যাবে।

আধুনিক উদার সংস্কৃতির সমালোচনায়ও তিনি প্রায়শই অতিরঞ্জিত বা ভ্রান্ত মন্তব্য করেন যেমন “সব মানবতাবাদী মানুষকে পূজা করে” বা “লিবারেল হিউম্যানিজম একধরনের ধর্ম”—যা বাস্তবতার সাথে খাপ খায় না।

আলো ও ইলেকট্রনের তরঙ্গ-কণার দ্বৈত প্রকৃতি নিরূপণে – Double Slit Experiment

শুরুটা কোথা থেকে?

১৮০১ সালে বিজ্ঞানী থমাস ইয়াং আলোর প্রকৃতি বুঝতে পরীক্ষাটি শুরু করেন। তিনি জানতে চাইলেন আলো কি শুধুই কণা, না কি তরঙ্গের মতোও আচরণ করে?

পরীক্ষার উপকরণ

একটা যন্ত্র থেকে আলোর কণা বা ইলেকট্রন বের হয়। এগুলো দুইটা ছোট ছোট ছিদ্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য একটা পাতলা দেয়ালের সামনে আসে। ওই দেয়ালের পেছনে একটা স্ক্রিন রাখা যেখানে আলোর ছায়া পড়ে।

কেমন ছিল পরীক্ষার পরিকল্পনা?

আলোর কণা বা ইলেকট্রন দুটো ছিদ্র দিয়ে যায়। প্রত্যাশা ছিল স্ক্রিনে দুটো আলোর দাগ বা দুটি আলোর রেখা দেখা যাবে।

চমকপ্রদ ফলাফল

কিন্তু স্ক্রিনে অনেকগুলো উজ্জ্বল ও অন্ধকার রেখার প্যাটার্ন দেখা যায়। এটি কেবলই তরঙ্গেরই বৈশিষ্ট্য। তরঙ্গ দুই ছিদ্র থেকে ছড়িয়ে পড়ে মিলেমিশে আলোর মতো একটি নিদর্শন তৈরি করে।

তরঙ্গ ও কণার দ্বৈত প্রকৃতি

পরবর্তীতে জানা যায়, শুধু আলো নয় ইলেকট্রনসহ যেকোনো ছোট কণাও একই প্যাটার্ন তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, কণা যেমন আছে তেমনি তরঙ্গের মতোও আচরণ করে।

একক কণার পরীক্ষা

এক সময় এক এক করে ইলেকট্রন পাঠিয়ে দেখা যায় ধীরে ধীরে স্ক্রিনে তরঙ্গের প্যাটার্ন তৈরি হয়। এটা বোঝায়, একটি কণা একই সাথে দুটি পথ ধরে যেতে পারে।

পর্যবেক্ষণের অবদান

যখন কোন ছিদ্র দিয়ে কণা যাচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন প্যাটার্ন বদলে যায় এবং কণা কণা হিসেবেই আচরণ করে। অর্থাৎ, পর্যবেক্ষণই বস্তুকে কণায় পরিণত করে।

কোয়ান্টামের গুরুত্ব

এই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, প্রকৃতির বস্তু তরঙ্গ আর কণার দ্বৈত চরিত্র ধারণ করে এবং আমাদের পর্যবেক্ষণই তাদের আচরণ পরিবর্তন করে। এটি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।

আজকের যুগে গুরুত্ব

Double Slit Experiment আধুনিক প্রযুক্তির যেমন কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম এনক্রিপশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিপ্লবাত্মক ভূমিকা রাখে।

CNN বিশ্লেষণ – সম্ভাব্য যে পাঁচ উপায়ে শেষ হতে পারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জটিল পরিবেশে আবারো আলোচনায় এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্ভাব্য বৈঠক। আগামী ১৫ আগস্ট আলাস্কায় এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই সময়ে তারা কেন একে অপরের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসতে চান? এই বৈঠকের পেছনে রয়েছে যুদ্ধ সমাপ্তির সম্ভাবনা, কূটনৈতিক কৌশল, এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলার বিভিন্ন উদ্দেশ্য।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ব্যক্তিত্ব ও কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে সমাধানের একটি পথ তৈরি করতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন, বৈঠকের মাধ্যমে মস্কোর অটল অবস্থান ভেঙে ফেলা সম্ভব । ট্রাম্প মনে করেন ক্রেমলিনকে যুদ্ধ থামাতে রাজি করানো গেলে, পশ্চিমা জোট এবং ইউক্রেনের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি আসতে পারে। অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন তার অবস্থান অনেক কঠোর রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি স্পষ্ট করেছেন, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের জনগণ এক এবং রুশ সেনা যেখানে পৌঁছাবে সেখানই রাশিয়ার ভূমি। এটি এক ধরনের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক সংকেত যা যুদ্ধবিরতি কিংবা আঞ্চলিক বিভাজনের বিরোধিতা করে।

পুতিনের আসল লক্ষ্য সময় গ্রহণ এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টিই। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মে মাসে দেয়া নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরিবর্তে তার পক্ষ থেকে দু’বার স্বল্পস্থায়ী ও একতরফা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এসেছে, যা কূটনৈতিক ভাবে খুবই সীমিত মূল্যবান। গ্রীষ্মকালীন সামরিক অভিযানে রাশিয়ার বাহিনী ফ্রন্টলাইনে অগ্রগতি লাভ করায়, পুতিন এখন বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। এই অবস্থান থেকে তিনি হয়তো আলোচনায় বসবেন, তবে যুদ্ধের সমাধান নিয়ে নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান শক্ত করার জন্য।

যদি বৈঠক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ও রাশিয়ার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন। মূল উদ্দেশ্য হবে যুদ্ধের অবসান নিশ্চিত করা। কিন্তু গত মে মাসে ইস্তাম্বুলে একই ফরম্যাট রাশিয়া প্রত্যাখ্যান করেছিল, যা এই ধরনের আলোচনা কতটা সহজ হবে তার ইঙ্গিত দেয়। পুতিন হয়তো ট্রাম্পকে মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ঝোঁকাতে চাইবেন, যাতে রুশ দাবিগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আলোচনা থেকে পাঁচটি সম্ভাব্য পথ সামনে আসতে পারে, যা যুদ্ধের ভবিষ্যত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রথমত, নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বর্তমানে খুবই ক্ষীণ। পুতিন বর্তমানে ফ্রন্টলাইন ধরে রাখতে চাইছেন এবং যুদ্ধবিরতির বিষয়ে প্রায় অসম্মতি প্রকাশ করেছেন। মে মাসে পশ্চিমা দেশগুলো নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বছরের শুরুতে ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতিও সফল হয়নি। ক্রেমলিন এখন ছোট ছোট সামরিক সাফল্যকে বড় কৌশলগত সুবিধায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বাস্তববাদী সমঝোতা ও শীতকালে নতুন আলোচনা হতে পারে। যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে, ফ্রন্টলাইন ‘ফ্রিজ’ হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যেই রুশ বাহিনী পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় দখল বাড়াতে পারে, যা তাদের অবস্থানকে শক্ত করবে। ২০২৬ সালেও যুদ্ধ অব্যাহত থাকতে পারে অথবা কূটনৈতিকভাবে রাশিয়া স্থায়ী দখলের পথে হাঁটবে। এ সময় ইউক্রেনের নির্বাচনের প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে জেলেনস্কির বৈধতা সংকটে ফেলা হতে পারে এবং রাশিয়াপন্থী প্রার্থীর প্রবেশ ঘটতে পারে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি পশ্চিমা সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকে এবং ইউক্রেন ফ্রন্টলাইনে বড় ছাড় না দিয়ে টিকে থাকে, তাহলে রাশিয়ার সামরিক অগ্রগতি সীমাবদ্ধ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুতিন আলোচনায় বসতে বাধ্য হতে পারেন। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো একটি ‘রিএশিউরেন্স ফোর্স’ পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে, যা কিয়েভসহ বড় শহরে নিরাপত্তা ও পুনর্গঠন কাজে সাহায্য করবে এবং মস্কোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চাপ দেবে। এটি ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চতুর্থত, ইউক্রেন ও ন্যাটোর জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় আসতে পারে যদি বৈঠকের পর পুতিন পশ্চিমা ঐক্য ভাঙতে সক্ষম হন এবং রাশিয়া-মার্কিন সম্পর্ক উন্নত হয়। এ অবস্থায় ইউক্রেন একা পড়ে যাবে, কারণ মার্কিন সহায়তা ছাড়া ইউরোপ যুদ্ধের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে না। পূর্বাঞ্চলের রুশ অগ্রগতি ইউক্রেনীয় বাহিনীর পতনে পরিণত হতে পারে, যার ফলে কিয়েভও হুমকির মুখে পড়বে। জনবল সংকট ও জেলেনস্কির বড় সেনা মোতায়েনের দাবি দেশীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করবে। ন্যাটো যদি ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দিতে ব্যর্থ হয়, ইউক্রেনের স্বাধীনতা সংকটে পড়তে পারে।

পঞ্চমত, পুতিনের জন্য আফগানিস্তানের মতো বিপর্যয়ের আশঙ্কাও থেকে গেছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে ক্রমাগত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় চীন-রাশিয়া সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে, ভারতের বাজারে ক্ষতি হতে পারে এবং রাশিয়ার রিজার্ভ তহবিল শেষ হতে পারে। ক্রমাগত কূটনৈতিক সমাধান প্রত্যাখ্যান করায় মস্কোর অভিজাত মহলে অসন্তোষ বেড়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে পশ্চিমা নীতি রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে আরো কঠোর হতে পারে। সোভিয়েতদের আফগানিস্তানে আটকে যাওয়া পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি পুতিনের জন্য বিপদজনক হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধবিরতি ও স্থিতিশীলতার সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তবে বৈঠকের ফলাফল কী হবে, তা যুদ্ধের বর্তমান গতি, পক্ষগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক জোটের সমর্থনের ওপর নির্ভর করবে। অনেকেই মনে করছেন, পশ্চিমা জোট ও ইউক্রেনের ঐক্যই এখন সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি, যা যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারণ করবে। আর পুতিনের কৌশল ও ট্রাম্পের উদ্যোগ এই সংঘাতের পরবর্তী রূপরেখা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

মিউটস্কোপ – সিনেমার জন্মলগ্নে এক বিস্মৃত যন্ত্র

চলচ্চিত্রের ইতিহাস মানেই শুধু লুমিয়ের ব্রাদার্স বা টমাস এডিসনের কীর্তি নয়। সিনেমার উন্মোচন পর্বে এমন অনেক উদ্ভাবন ছিল, যা সময়ের গহ্বরে হারিয়ে গেছে বা অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত হয়েছে। মিউটস্কোপ এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র যা একসময় সিনেমার মতোই দর্শককে আলোড়িত করেছিল, কিন্তু আজ এটি অনেকটাই বিস্মৃত।

মিউটস্কোপের আবিষ্কারের শিকড় প্রোথিত ছিল টমাস এডিসনের কিনটোস্কোপ-এর বাণিজ্যিক সাফল্যের মধ্যে। কিনটোস্কোপ ছিল একটি একক দর্শকের জন্য তৈরি যন্ত্র, যেখানে একটি ছিদ্র দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে চলমান ছবি দেখা যেত। ১৮৯৪ সালে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা এডিসনকে সিনেমার জনক হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। কিন্তু এডিসনের সাবেক কর্মচারী, ব্রিটিশ-আমেরিকান উদ্ভাবক উইলিয়াম কেনেডি ডিকসন এবং তার সহযোগী হারম্যান ক্যাসলার একটি ভিন্ন ধারণা নিয়ে কাজ করছিলেন। তারা এমন একটি যন্ত্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা কিনটোস্কোপের থেকে সহজ, সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য হবে। ফলস্বরূপ ১৮৯৫ সালে তারা আমেরিকান বায়োগ্রাফ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরের বছরই মিউটস্কোপের পেটেন্ট নেন।

মিউটস্কোপের মূল আকর্ষণ ছিল এর সরল এবং কার্যকর কার্যপ্রণালী। কিনটোস্কোপ যেখানে ফিল্মের একটি দীর্ঘ স্ট্রিপ ব্যবহার করত, মিউটস্কোপ সেখানে ব্যবহার করত ছবির কার্ড। এটি ছিল একটি বৃহৎ আকারের ফ্লিপবুকের মতো। কার্ডবোর্ডের তৈরি এই কার্ডগুলোতে স্থিরচিত্রগুলো একে একে সাজানো থাকত। একজন দর্শক যখন হ্যান্ডেলটি ঘোরাতেন, তখন একটি লিভারের সাহায্যে কার্ডগুলো দ্রুত উল্টানো হতো, যার ফলে চোখের সামনে একটি চলমান ছবির মায়া তৈরি হতো।

মিউটস্কোপের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এর স্থায়িত্ব। সেলুলয়েড ফিল্ম সময়ের সাথে সাথে ভঙ্গুর হয়ে যেত, কিন্তু মোটা কার্ডবোর্ডের কার্ডগুলো ছিল অনেক বেশি টেকসই। এটি ছিল মিউটস্কোপের দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ। এর যন্ত্রাংশও ছিল কিনটোস্কোপের তুলনায় অনেক কম জটিল, ফলে রক্ষণাবেক্ষণ করাও সহজ ছিল। বিশেষ করে বিনোদন কেন্দ্র, সমুদ্র সৈকত, এবং পার্কগুলোতে যেখানে যন্ত্রগুলো বারবার ব্যবহৃত হতো, সেখানে এর স্থায়িত্ব এটিকে এক অনন্য বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দেয়।

১৯০০-এর দশকের শুরুতে মিউটস্কোপ ছিল বিনোদনের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। এটি প্রধানত আর্কেড, পিয়ার এবং অন্যান্য পাবলিক প্লেসে রাখা হতো।এক পয়সা বা এক নিকেল দিয়ে দর্শক একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলমান ছবি দেখতে পারতেন। মিউটস্কোপের মাধ্যমে দেখানো চলচ্চিত্রগুলো সাধারণত ছিল হাস্যরসাত্মক স্কেচ, অ্যাক্রোব্যাটিকসের কৌশল, ছোটখাটো নৃত্য পরিবেশনা, বা তখনকার সময়ের বিখ্যাত মানুষদের সংক্ষিপ্ত চিত্র।মাঝে মাঝে কিছুটা সাহসী বা “রিস্কি” ছবিও দেখানো হতো, যা এটিকে একটি কৌতূহলোদ্দীপক মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

মিউটস্কোপের এই সাফল্য প্রমাণ করে সাধারণ মানুষ একটি নতুন ধরনের ভিজ্যুয়াল বিনোদনের জন্য কতটা আগ্রহী ছিল। যদিও এটি লুমিয়ের ব্রাদার্সের প্রজেকশন সিনেমার মতো বৃহৎ পরিসরে দেখানো হতো না, কিন্তু এটি ছিল ব্যক্তিগত বিনোদনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। সিনেমার মতোই মিউটস্কোপও মানুষকে গল্পের জগতে নিয়ে যেত, তাদের হাসাতো, ভয় দেখাতো বা আনন্দ দিত। এটি প্রজেকশন সিনেমার সমান্তরাল একটি ধারা তৈরি করেছিল, যা ছোট ছোট শহরের মানুষের কাছে বিনোদন পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মিউটস্কোপের বাণিজ্যিক সাফল্য আমেরিকান বায়োগ্রাফ কোম্পানিকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে এই কোম্পানিটিই দীর্ঘস্থায়ী চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেয় এবং ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথ-এর মতো বিখ্যাত পরিচালকদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। এক অর্থে, মিউটস্কোপের আয় থেকেই তাদের বৃহৎ পরিসরের চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।

১৯১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মিউটস্কোপের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ ছিল প্রজেকশন সিনেমার দ্রুত অগ্রগতি। সিনেমা হলগুলোতে যখন দর্শক একসাথে বসে একটি বড় পর্দায় গল্প দেখতে শুরু করল, তখন একক দর্শকের জন্য তৈরি মিউটস্কোপের আবেদন ম্লান হয়ে গেল। চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশলও অনেক উন্নত হয়েছিল। চলচ্চিত্রের গল্প বলার ধরণ, দৈর্ঘ্য এবং প্রযুক্তির উন্নতি মিউটস্কোপের সীমিত এবং সংক্ষিপ্ত গল্পের ধারাকে ছাপিয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিউটস্কোপের বাণিজ্যিক ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপরও কিছু আর্কেড বা পুরোনো বিনোদন কেন্দ্রে এটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে ছিল। তবে সিনেমার বিকাশ, টকি ফিল্মের আগমন এবং প্রযুক্তির অবিচ্ছিন্ন অগ্রগতির ফলে মিউটস্কোপ তার ঐতিহাসিক ভূমিকা হারিয়ে ফেলে।

তবে মিউটস্কোপকে কেবল একটি প্রাচীন যন্ত্র হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি ছিল সিনেমার বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মানুষের মধ্যে চলমান ছবি দেখার চাহিদা ছিল প্রবল, এবং এই চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন উদ্ভাবন সমসাময়িককালে বিদ্যমান ছিল। মিউটস্কোপ ছিল একটি স্বাধীন উদ্ভাবন, যা সিনেমার মূলধারার পাশাপাশি নিজস্ব একটি বাজার তৈরি করেছিল এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও বাণিজ্যিকীকরণের একটি সুন্দর উদাহরণ স্থাপন করেছিল। আজকের দিনে মিউটস্কোপ একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সিনেমার জন্ম শুধু একটি একক উদ্ভাবকের হাতে হয়নি, বরং এটি ছিল একাধিক উদ্ভাবক এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন যন্ত্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। মিউটস্কোপ তাই কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি এক ঐতিহাসিক অধ্যায় যা চলচ্চিত্রের জন্মলগ্নের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আজও গবেষণার দাবি রাখে।

৩ডি প্রিন্টিং কি পারবে বদলে দিতে আবাসনের ধারনা?

এক সময় মানুষের ঘর বানানো মানেই ছিল দিনভর ইট, বালু, রড ও সিমেন্টের শব্দ। গরমে-ধুলোয় জর্জরিত নির্মাণশ্রমিকদের ধৈর্য আর ঘামে দাঁড়িয়ে যেতো একেকটি চার দেয়ালের স্বপ্ন। কিন্তু যদি বলা হয়, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় একেকটি পূর্ণাঙ্গ বসতবাড়ি গড়ে উঠছে কোনো মানুষ ছাড়াই, কোনো ইট ছাড়াই—তবে সেটা কি কল্পবিজ্ঞান মনে হয়? না, এটাই বর্তমান বাস্তবতা। ৩ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ঘর নির্মাণের দুনিয়ায় এমন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, যা আবাসন চিন্তাকে আমূল বদলে দিতে শুরু করেছে।

৩ডি প্রিন্টিং বলতে অনেকেই বুঝেন ছোট কোনো বস্তু একটি খেলনা কিংবা প্রোটোটাইপ, ছাপানো যন্ত্রে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিই যখন আকারে বাড়ে এবং প্রিন্টারটি হয়ে যায় বিশাল এক রোবোটিক কাঠামো, তখন সেটি একটি ঘরও তৈরি করে ফেলতে পারে। এই ঘর ‘তৈরি’ হয় না, বরং ‘ছাপা’ হয় ঠিক বই ছাপার মতোই, শুধু কাগজ নয়, এখানে ছাপা হয় কংক্রিট বা বিশেষ মিশ্রণ। এই কাজের পেছনে থাকে এক জটিল সফটওয়্যার Computer-Aided Design (CAD)। আর্কিটেক্ট যেভাবে ঘরের নকশা কাগজে আঁকেন, CAD সফটওয়্যারে সেই নকশা ডিজিটালি তৈরি করা হয়। এরপর বিশেষ ৩ডি প্রিন্টার সেই ডিজাইন অনুযায়ী এক স্তর করে নির্মাণ উপাদান বসাতে থাকে, যতক্ষণ না দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়, জানালা তৈরি হয়, দরজার জায়গা খালি থাকে।

এই ঘর তৈরির জন্য সাধারণ সিমেন্ট ব্যবহার করা যায় না। কারণ ৩ডি প্রিন্টিংয়ে উপকরণটিকে খুব দ্রুত শুকাতে ও জমতে হয়, যেন পরবর্তী স্তর বসাতে বিলম্ব না হয়। এজন্য তৈরি হয়েছে বিশেষ ধরনের ফাস্ট-ড্রাইং কংক্রিট মিক্সচার। এটি শক্ত, টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং পুনঃব্যবহারযোগ্য।প্রিন্টারটি দেখতে অনেকটা বিশালাকৃতির গ্যান্ট্রি সিস্টেম বা রোবোটিক বাহুর মতো। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজাইন পড়তে পারে এবং প্রিন্ট করতে পারে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। কোন অংশে কতটা উপাদান দরকার, কোথায় ফাঁকা রাখতে হবে, এসব কিছুই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত।

একটি ৩ডি প্রিন্টিং হাউস নির্মাণে সময় লাগে গড়ে ২৪–৪৮ ঘণ্টা। আর খরচ? সাধারণ পদ্ধতিতে একই আকৃতির ঘর বানাতে যেখানে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে এই প্রযুক্তিতে সেটা অর্ধেক বা তারও কমে এসে দাঁড়ায়। শ্রমিক লাগবে না, কাঠামো অনেক সহজ এবং অপচয় প্রায় নেই বললেই চলে। এক কথায়, ৩ডি প্রিন্টিং ভবিষ্যতের সেই নির্মাণ পদ্ধতি, যা ব্যয়ের বোঝা কমাবে এবং সময় বাঁচাবে। বিশেষত প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ঘর বানাতে এই প্রযুক্তির বিকল্প নেই।

বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তি পরীক্ষিত ও প্রমাণিত। যুক্তরাষ্ট্রের ICON নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালে টেক্সাসে গড়ে তোলে “Village of the Future” নামে একটি সম্পূর্ণ ৩ডি প্রিন্টেড আবাসন এলাকা। রাশিয়ার Apis Cor মাত্র ২৪ ঘণ্টায় একটি ৪০০ বর্গফুটের ঘর বানিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে। ভারতের চেন্নাই শহরে ইতোমধ্যে সরকারি উদ্যোগে ৩ডি প্রিন্টেড ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। আরব আমিরাতে ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি দপ্তরের ২৫% ভবন ৩ডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে গড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর্কিটেকচার ফার্ম এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এগিয়ে এসেছে।

৩ডি প্রিন্টিং হাউস কেবল দ্রুত ও সাশ্রয়ী নয়, এটি পরিবেশবান্ধবও। অপচয় নেই বললেই চলে, ব্যবহার হয় কম সিমেন্ট ও জল, এবং কার্বন নিঃসরণ হয় অনেক কম। ভবিষ্যতের নির্মাণ যখন টেকসই হতে হবে, তখন এই প্রযুক্তি হয়ে উঠবে আবশ্যক।

চ্যালেঞ্জ কোথায়?

তবে এই প্রযুক্তির বড় চ্যালেঞ্জ এর শুরুতেই। প্রযুক্তি আমদানির খরচ এখনো অনেক বেশি। দক্ষ অপারেটর ও সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে।আইনি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড এখনো নির্ধারিত নয় অনেক দেশে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাধাগুলো দূর হওয়া সময়ের ব্যাপার। প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হবে, ততই এটি গণমানুষের নাগালে আসবে।

Chungking Express ভালোবাসা নয়, ভালোবাসার শূন্যতা নিয়ে কথা বলে : রজার এবার্ট, লেখক ও চলচ্চিত্র সমালোচক

গত গ্রীষ্মে UCLA-তে একটি প্রদর্শনীর সময় কোয়েন্টিন টারান্টিনো “Chungking Express” সিনেমাটি দেখানোর আগে বলেছিলেন, তিনি যখন এটি ভিডিওতে দেখেন, তখন হঠাৎ করে কেঁদে ফেলেছিলেন। তবে সেটা দুঃখে নয়, তিনি বলেন, “আমি এতটা আনন্দিত ছিলাম যে একটা সিনেমাকে এতটা ভালোবাসতে পারছি বলেই কেঁদে ফেলি।”

আমি সিনেমাটি দেখতে গিয়ে একবারও রুমাল বের করিনি, আর টারান্টিনোর মতো এতটা ভালোও লাগেনি, কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি সে কেন কেঁদেছিল।কারণ এই সিনেমাটি সেই দর্শকদের জন্য, যারা সিনেমাকে শুধু গল্প বা তারকাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সিনেমার ভেতরের শিল্প ও নির্মাণের প্রতি ভালোবাসা থেকে দেখেন। এটি দৈনন্দিন দর্শকদের জন্য নয় এবং সম্ভবত একবার দেখলেই এর সব রহস্য ধরা পড়ে না। কিন্তু সিনেমাটির মাধ্যমে হংকংভিত্তিক নির্মাতা ওং কার-ওয়াই নিজেকে জঁ-লুক গদারের ঘরানার একজন পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি গল্পের ঘটনাক্রমের চেয়ে গল্পের উপাদানগুলো নিয়ে বেশি আগ্রহী। সেটাই তিনি দেখিয়েছেন—একটি সিনেমায় দুটি আলাদা কিন্তু কিছুটা মিল থাকা গল্প বলে, যেগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো সংযোগ নেই। গল্পগুলো ঘটে হংকংয়ের ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, নাইটক্লাব, কংক্রিট প্লাজা আর পপ সংস্কৃতির পটভূমিতে। এক নায়িকা স্বর্ণকেশী উইগ আর কালো চশমা পরে, আরেকজন সারাক্ষণ “California Dreamin’” গানটি শুনে। সিনেমাটির ভিজ্যুয়াল শটগুলো কখনো সাধারণ ফিল্ম, কখনো ভিডিও, কখনোবা পিক্সেল ঝাপসা—সব সময়েই যেন ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে। মনে হয়, চরিত্রদের জীবনধারাই মিডিয়ার কাঁচামালের মতো ছিঁড়ে টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

যদি আপনি সিনেমাটির স্টাইল ও নির্মাণ লক্ষ্য করেন, যদি ভাবেন পরিচালক কী বোঝাতে চাইছেন, তবে “Chungking Express” কাজ করে। কিন্তু যদি কেবল গল্পের পেছনে ছুটে যান, আপনি হতাশ হতে পারেন।

প্রথম গল্পে দেখা যায় পুলিশ অফিসার হে চিউ-উ (টাকেশি কানেশিরো), যিনি রাতের হংকং শহরে ঘুরে বেড়ান, একা, বিষণ্ণ, সদ্য হারানো প্রেমিকাকে মনে করেন। তিনি নিজেকে ৩০ দিন সময় দেন নতুন কাউকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। সেই সময়ের হিসেব রাখতে তিনি পাইনঅ্যাপেল ক্যানের মেয়াদ ব্যবহার করেন। হঠাৎ এক রহস্যময়ী নারী তার জীবনে আসে উইগ পরা সেই নারী (ব্রিজিট লিন), যিনি মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত।

আমরা ভাবি, এদের মধ্যে সম্পর্কটা হয়তো কোনো অপরাধ-নাটকের মতো গড়াবে। কিন্তু হঠাৎ করেই সিনেমাটি সম্পূর্ণ নতুন এক গল্পে চলে যায় নতুন এক দম্পতির দিকে। প্রথম পুলিশ যে ফাস্ট ফুড দোকানে যেত, সেখানে কাজ করা এক ওয়েট্রেস (ফেই ওয়াং) আরেক পুলিশ (টোনি লেয়ং)-এর প্রতি আসক্ত। কিন্তু সেই পুলিশ তার দিকে তেমন মনোযোগ দেয় না। ওয়েট্রেসটি তার ফ্ল্যাটের চাবি পায়, আর সে অজান্তেই সেখানে গিয়ে ঘর পরিষ্কার করে, নতুনভাবে সাজায়, এমনকি ক্যানের লেবেল পর্যন্ত বদলে দেয়।

এই দুটি গল্পই শহরের ভিড়ে একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও সম্পর্কের খোঁজের কথা বলে। সিনেমাটি অনেকটা মিউজিক ভিডিওর মতো স্টাইলে নির্মিত, যার মধ্যে গদার-ধর্মী সাইন, স্লোগান, পপ গান আর ক্যাসাভেটসের মতো স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ ও অবস্থা রয়েছে। এখানে চরিত্ররা কোথায় যাবে তা মুখ্য নয়—তাদের যাত্রাটাই মূল বিষয়। মনে হয়, তারা সবাই যেন কৃত্রিম জীবনে এক ধরণের পাগলামির ধার ঘেঁষে চলেছে, যেখানে আসল অনুভব সবসময় এক ধাপ দূরে থেকে যায়।

টারান্টিনো এই সিনেমাটি এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে, মিরাম্যাক্সের সঙ্গে চুক্তি করে নিজেই একটি বিতরণ সংস্থা শুরু করেন। তার প্রথম দুটি ছবি ছিল “Chungking Express” ও ওং কার-ওয়াইয়ের আরেকটি সিনেমা।

বর্তমানে হংকং সিনেমার বাজারে জন উ ও জ্যাকি চ্যানের মতো বাণিজ্যিক পরিচালকেরা রাজত্ব করছেন। কিন্তু ওং কার-ওয়াই সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনি একজন শিল্পনির্দেশক, যিনি সিনেমার ভাষা নিয়ে খেলা করেন। টুকরো টুকরো গল্প উপাদানগুলো তিনি পপ সংস্কৃতির ব্লেন্ডারে ঘুরিয়ে একটা নতুন রূপ দেন।

১৯৬০ ও ৭০ দশকে যখন গদার জনপ্রিয় ছিলেন, তখন সিনেমা সমাজ ও রিপার্টরি থিয়েটার ছিলো যারা এই ধরনের চলচ্চিত্রচর্চা করত। আজকের অনেক তরুণ দর্শক, যারা কেবল ভিডিও স্টোরের সীমিত পছন্দে বড় হয়েছে, তারা হয়তো “Chungking Express”-এর গভীরতা না বুঝে বিভ্রান্ত হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এমন সিনেমা মূলত মস্তিষ্কের জন্য হৃদয়ের জন্য নয়। আপনি এটি উপভোগ করবেন যদি সিনেমা সম্পর্কে আপনার জ্ঞান থাকে, জীবন সম্পর্কে সিনেমাটি কী জানে, সেটা বড় নয়। আর যাই হোক, বক্স অফিস রিপোর্ট দেখে টারান্টিনো হয়তো আবার কাঁদবেন।

পিঁপড়েরা প্রকৃতির ক্ষুদ্র সার্জন, জরুরি অস্ত্রোপচারও করে তারা!

পিঁপড়েরা জীবন রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার করে – ফ্লোরিডার কার্পেন্টার পিঁপড়েরা একমাত্র প্রাণী যারা নিয়মিতভাবে আহত সঙ্গীর পা পরিষ্কার করে বা কেটে ফেলে জীবন বাঁচায়।

পিঁপড়েরা কীভাবে চিহ্নিত করে আর সিদ্ধান্ত নেয় – আঘাত কোথায় হয়েছে তার উপর নির্ভর করে চিকিৎসা ঠিক করে পিঁপড়েরা। উরুতে আঘাত পেলে তা পরিষ্কার করে কেটে ফেলে, আর পায়ের নিচের অংশে (অ্যাঙ্কেল) আঘাত পেলে শুধু পরিষ্কার করে। এই বুদ্ধিদীপ্ত পদ্ধতিই বাঁচার সম্ভাবনা বাড়ায়।

চিকিৎসার ধাপ কেমন – চিকিৎসা শুরু হয় মুখ দিয়ে ক্ষত ধুয়ে পরিষ্কার করার মাধ্যমে। উরুর আঘাতে পা কেটে ফেলা হয়— পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে এটা করতে তাদের কমপক্ষে ৪০ মিনিট, কখনো ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে।

বেঁচে থাকার হার ও সামাজিক বুদ্ধিমত্তা – যাদের পা কাটা হয়, তাদের ৯০-৯৫% বেঁচে যায়। শুধু পরিষ্কার করা হলে বাঁচে ৭৫%। কোনো চিকিৎসা না পেলে বেঁচে থাকার হার নেমে যায় ১৫-৪০%-এ। যাদের পা কাটা হয়, তারা বেশিরভাগই আবার আগের মতো কাজ শুরু করে দেয়—প্রমাণ করে, কী অসাধারণ সামাজিক চিকিৎসা পদ্ধতি গড়ে তুলেছে এই ক্ষুদ্র পিঁপড়েরা।

পূর্ব জার্মানির ‘ওয়াল-পার’ হত্যার গোপন ইতিহাস

ইতিহাসের পাতায় কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলো শুধু রাজনৈতিক নয়, মানবিক বিবেকেরও পরীক্ষা। পূর্ব জার্মানির (German Democratic Republic – GDR) সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক বার্লিন দেয়াল পার হয়ে পালাতে চাওয়া নাগরিকদের ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ এমনই এক অধ্যায়, যা দীর্ঘদিন ধরে তথ্যের স্তূপে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বার্লিন দেয়াল পার হয়ে পশ্চিম জার্মানিতে পালাতে চাওয়া ব্যক্তিদের অনেককেই পূর্ব জার্মানির বাহিনী গুলি করে হত্যা করত, যাকে তারা ‘সীমান্ত সুরক্ষা’ হিসেবে আখ্যা দিত। তবে এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি ছিল চুপিসারে, বিচার ছাড়াই, পরিবার ও সমাজের অগোচরে। এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক নিপীড়নের নয়, বরং ইতিহাসের নীরব নিষ্ঠুরতার একটি প্রামাণ্য রূপ।

১৯৬১ সালে বার্লিন দেয়াল নির্মাণের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে একটি কৃত্রিম বিভাজন গড়ে ওঠে। এটি ছিল মূলত পূর্ব জার্মানি থেকে মানুষের পলায়ন ঠেকানোর একটি চেষ্টা, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক কঠোর রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রে পরিণত হয়। পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট সরকার নিজের নাগরিকদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে, সীমানা রক্ষায় গড়ে তোলে ভয়ংকর এক মারণব্যবস্থা যাকে জার্মান ভাষায় বলা হয় “Schießbefehl” (শুটিং অর্ডার)।

এই নির্দেশ অনুযায়ী, সীমান্ত রক্ষীদের আদেশ ছিল কেউ পালানোর চেষ্টা করলে, তাকে বিনা দ্বিধায় গুলি করে হত্যা করতে হবে, এমনকি সেই ব্যক্তি নারী বা শিশু হলেও।

এই ‘শুটিং অর্ডার’ কোনো বিচ্ছিন্ন আদেশ ছিল না; বরং এটি ছিল পূর্ব জার্মান সরকারের আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা নীতি। গোপন দলিলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, “সীমান্তে কোনো ব্যক্তি অনধিকার প্রবেশ বা পলায়নের চেষ্টা করলে, সরাসরি প্রাণঘাতী গুলির মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করতে হবে।”

অনুমান করা হয়, ১৯৬১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত, অন্তত ১৪০ জন ব্যক্তি বার্লিন দেয়াল পার হওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন। যদিও কিছু গবেষণা এই সংখ্যা ২০০ জন পর্যন্ত বলে অনুমান করে, যেহেতু অনেক ঘটনা গোপন রাখা হয়েছিল এবং নথিপত্র ধ্বংস করা হয়েছিল।

এই বিচারবিহীন হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে নির্মম দিক ছিল নিহতের পরিবারকে কোনো স্পষ্ট তথ্য না দেওয়া। অনেক সময় মৃতদেহ ফেরত দেওয়া হতো না, কিংবা মৃত ব্যক্তিকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বলে চিহ্নিত করা হতো। এমনকি কখনো কখনো কেবল একটি খালি কফিন দেওয়া হতো, যাতে পরিবারের সদস্যরা বুঝতেই পারতেন না কীভাবে বা কোথায় মৃত্যু হয়েছিল।

এই গোপনতা শুধু বিচারকে প্রতিহত করত না, বরং পরিবারগুলোকেও চিরদিনের জন্য এক অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দিত। তারা শোক প্রকাশ করতে পারতেন না, বিচার চাইতে পারতেন না, এমনকি অনেক সময় নিহতের কথা প্রকাশ করাও ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এই শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো ১৯৬২ সালে পিটার ফেক্টার (Peter Fechter)-এর মৃত্যু। দেয়াল টপকাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘন্টাখানেক রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি কেউ না পূর্বের রক্ষীরা, না পশ্চিমের পুলিশ। তাঁর মৃত্যু বিশ্বব্যাপী সমালোচনার জন্ম দেয়।

আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা হলো ১৯৮০ সালে Marienetta Jirkowsky নামের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর গুলিবিদ্ধ মৃত্যু। তার পরিবারকে প্রকৃত কারণ জানানো হয়নি; বলা হয়, তার মৃত্যু একটি দুর্ঘটনা।

পূর্ব জার্মানির গোপন পুলিশ Stasi (Ministerium für Staatssicherheit) এসব ঘটনার পূর্ণ নথি তৈরি করলেও সেগুলো চরম গোপনীয়তা রক্ষা করে সংরক্ষণ করত। ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়াল ভেঙে পড়ার পর অনেক নথি উদ্ধার করা গেলেও, বিশাল একটি অংশ আগেই ধ্বংস করে ফেলা হয়। পরবর্তী সময়ে গবেষকরা ডিজিটাল রিকনস্ট্রাকশন প্রযুক্তির মাধ্যমে কিছু নথি পুনর্গঠন করতে সক্ষম হন, যা এই গোপন হত্যাকাণ্ডের বিষয়গুলো আলোর মুখে আনে।

দেয়াল পতনের পর, জার্মান সরকার সীমান্ত রক্ষীদের বিরুদ্ধে বিচারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও, বেশিরভাগ সময় বিচারের মুখোমুখি হয় কেবল নীচু স্তরের কর্মীরা। অধিকাংশ উচ্চপদস্থ রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তা দায়মুক্তি পান। এর ফলে সমালোচকরা মনে করেন, এই বিচার ছিল প্রতীকী মাত্র, যা প্রকৃত দায়ের হিসাব নেয়নি।

এই গোপন হত্যা–প্রথা পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্গত একটি ভয়ানক দিককে প্রকাশ করে। এখানে রাষ্ট্র শুধুমাত্র নাগরিককে শাসন করছিল না, বরং তাদের জীবন-মৃত্যুর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

পূর্ব জার্মানির বার্লিন দেয়াল শুধুই এক প্রতীকী বিভাজন ছিল না; এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাস্তব কৌশল, যার পেছনে ছিল রক্ত, শোক ও নিঃশব্দ নিষ্ঠুরতা। যারা দেয়াল পেরিয়ে যেতে চেয়েছিল, তারা শুধু স্বাধীনতার সন্ধান করেনি, বরং তারা এক অনিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল। সেই মৃত্যুর গল্পগুলো রাষ্ট্র গোপন রেখেছিল, কিন্তু ইতিহাস তা আজ প্রকাশ করছে। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবাধিকারের নামে গোপনতা কখনোই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বিচারহীন দণ্ড কখনোই ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না। সে চুপচাপ থাকলেও, তার ছায়া ইতিহাসের গায়ে থেকে যায়।