Home Blog Page 36

পাখিরা যেভাবে পিঁপড়াকে জীবন্ত ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে

অ্যান্টিং কি এবং কোন পাখিরা এটি করে?

অ্যান্টিং হলো একটি বিশেষ পরিচর্যার আচরণ, যেখানে ব্লু জে, আমেরিকান রবিন, ইউরোপীয় স্টারলিং এবং অ্যান্টবার্ডের মতো পাখিরা তাদের পালকের ওপর পিঁপড়ে মাখে। এটি পরজীবী দূর করা, ত্বক শান্ত করা এবং কখনও কখনও পিঁপড়েগুলোকে খাদ্য হিসেবে প্রস্তুত করার জন্য করা হয়।

অ্যান্টিংয়ের দুই ধরন: প্যাসিভ এবং অ্যাক্টিভ

অ্যাক্টিভ অ্যান্টিংয়ের সময় পাখিরা তাদের ঠোঁট দিয়ে পিঁপড়া ধরে, সেগুলোকে হালকাভাবে পিষে ফর্মিক অ্যাসিড বের করে এবং পালকের ওপর ঘষে। প্যাসিভ অ্যান্টিংয়ে পাখিরা এমনভাবে বসে থাকে যাতে পিঁপড়ারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পালকের ওপর হেঁটে বেড়াতে পারে।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় পাখিরা কেন অ্যান্টিং করে?

অ্যান্টিং পাখিদের পরজীবী ধ্বংস বা দূরে রাখতে সাহায্য করে, পালক পাল্টানোর সময় ত্বকের জ্বালা কমায়, পালক পরিচর্যায় কাজ করে, পিঁপড়ে খাওয়ার আগে তাদের অ্যাসিড ঝুড়ি নিষ্ক্রিয় করে এবং সংবেদনশীলতা বাড়ায়। তবে এর পূর্ণ উদ্দেশ্য এখনো কিছুটা রহস্যময়।

নির্দিষ্ট পিঁপড়ার প্রতি সহজাত আচরণ ও পছন্দ

গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিং পাখিদের একটি সহজাত প্রবৃত্তি, যা ফর্মিক অ্যাসিডযুক্ত পিঁপড়া (যেমন ফর্মিকা গোত্রের পিঁপড়া) দ্বারা উদ্দীপিত হয়।পাখিরা খুব সাবধানে পিঁপড়ার অ্যাসিড থলি খালি করে, যা তাদের খাওয়ার জন্য নিরাপদ ও সুস্বাদু করে তোলে এবং হজমযোগ্য অংশগুলো অক্ষত থাকে।

বাস্তুসংস্থানগত গুরুত্ব এবং এর ব্যাপকতা

বিশ্বব্যাপী ২০০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির মধ্যে, বিশেষ করে গায়ক পাখিদের মধ্যে অ্যান্টিং করার ঘটনা সর্বাধিক রেকর্ড করা হয়েছে। এটি পাখি এবং পিঁপড়ার মধ্যে এক আকর্ষণীয় সহ-বিবর্তনমূলক সম্পর্ক প্রকাশ করে। এই আচরণ পাখিদের টিকে থাকতে সাহায্য করে এবং এটি প্রকৃতির নিজস্ব উপায়ে পরজীবী নিয়ন্ত্রণ ও প্রাণী স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা দেয়।

ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে নতুন ভূরাজনৈতিক সংকেত, রুশ-ভারত-চীন ত্রিমুখী জোটের পুনর্জন্ম?

১৯৯৮ সালে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভগেনি প্রিমাকভ রাশিয়া, ভারত ও চীনের ত্রিমুখী জোট গড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, যা মার্কিন একাধিপত্যের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল। ২০০০-এর দশকে এ উদ্যোগ কিছুটা এগুলেও পরবর্তীতে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে তা হিমঘরে পড়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক মার্কিন শুল্ক নীতির প্রভাবে আবারও এই ত্রিমুখী জোট গঠনের সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-ঝড় ও কূটনৈতিক চাপের কারণে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক বর্তমানে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। বিশেষত রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন শুল্ক আরোপ করায় ভারতকে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে হয়তো দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতার পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

২০২০ সালের চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা অবনতি হয়েছিল। তবে এবার চলতি মাসের শেষে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনে গিয়ে শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর সূচনা হতে পারে। এর পাশাপাশি মানস সরোবর যাত্রা পুনরায় শুরু এবং পর্যটক ভিসা প্রদানও শুরু হয়েছে, যা সম্পর্কের ইতিবাচক সংকেত।

মার্কিন শুল্কের জেরে ভারতীয় পণ্যে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ধীরগতি আসতে পারে, নতুন অস্ত্র কেনার পরিকল্পনা স্থগিত হয়েছে এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হয়েছে। ভারতের এই অসন্তুষ্টি প্রকাশ পাওয়াই এখনো এর প্রাথমিক চিহ্ন।

রাশিয়া এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মস্কো ভারতের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে, যার মধ্যে এস-৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য। রাশিয়া-ভারত-চীন ত্রিপাক্ষিক জোট পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা নতুন করে জোরালো হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কূটনৈতিক বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।

কার্নেগি এনডাউমেন্টের সিনিয়র ফেলো অ্যাশলি টেলিস বলেন, ‘ভারত এখন এক ফাঁদে রয়েছে। ট্রাম্পের চাপে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমালে সেটা ট্রাম্পের ব্ল্যাকমেইলের মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে, যা গত ২৫ বছরের কূটনৈতিক সাফল্যকে উল্টে দিতে পারে।’

আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, যদি ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপের মুখে চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি চীনের প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ করে দেবে, যা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকি।

সাবেক মার্কিন দূত নিকি হ্যালি সতর্ক করে বলেছেন, ‘চীনের প্রতি নরম হয়ে ভারতের মতো শক্তিশালী মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা উচিত নয়।’ এ অবস্থায় ভারত দুই ধ্রুবকের মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি।

মার্কিন শুল্ক নীতি এবং কূটনৈতিক চাপ শুধু ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে নয়, বরং চীন-ভারত-রাশিয়া ত্রিপাক্ষিক জোট গঠনের সম্ভাবনাকেও উসকে দিচ্ছে। এ অবস্থার বাস্তবায়ন এশিয়ার কৌশলগত পরিমণ্ডলে বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নতুন করে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

ক্রুসেড কি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের কারণ?

বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য, প্রায় এক হাজার বছর ধরে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিরাজমান ছিল। ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন মহান কনস্টান্টিনোপল শহরটি প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি রচিত হয়। কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) ছিল সেই সময়ের একটি বিশ্বমানের নগর, যা রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

৯ম থেকে ১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত ছিল। বারবার সীমান্তে আক্রমণের মুখোমুখি হলেও সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ থাকার কারণে এটি মধ্যযুগীয় বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল।

এ সময়ে মুসলিম শাসিত সেলজুক তুর্কদের দ্রুত বিস্তার ঘটেছিল, যারা বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের অংশ দখল করতে শুরু করেছিল। তাদের এই বিস্তার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সেই পরিস্থিতিতে ১০৯৫ সালে পোপ উরবান দ্বিতীয় প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধের ঘোষণা দেন। এই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম শাসিত পবিত্র ভূমি খ্রিস্টান বাহিনীর মাধ্যমে মুক্ত করা। এই ক্রুসেড যুদ্ধে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ভূমিকা ও প্রভাব অনেক দিক থেকে ছিল জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম ক্রুসেডের আগে বাইজান্টাইন সম্রাট আলেকজান্ডার কমেনাস পোপ ও পশ্চিম ইউরোপীয় শাসকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। মুসলিম শাসকরা পূর্ব ভূমিতে দ্রুত এগিয়ে আসছিলেন, তাই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দরকার ছিল ইউরোপের খ্রিস্টান সামরিক সাহায্য। পোপ উরবান দ্বিতীয় মূলত পশ্চিম ইউরোপের বাহিনীকে সংগঠিত করে মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে চাইছিলেন। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রতিও আশায় ছিল এই যুদ্ধে হারানো অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। কিছু সময়ের জন্য পশ্চিম ইউরোপ ও বাইজান্টাইনের স্বার্থের মিল তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক ততটা মসৃণ ছিল না।

ক্রুসেডারদের মাঝে ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ওপর একটি ধরনের সন্দেহ এবং অবিশ্বাস, কারণ তারা মনে করত বাইজান্টাইন তাদের প্রকৃত সহযোগী নন। একইসঙ্গে বাইজান্টাইন কর্তৃপক্ষের কূটনৈতিক অসতর্কতা ও সময়ের দুর্বল নেতৃত্ব ক্রুসেডারদের বিরূপ মনোভাব বাড়িয়ে তোলে।

প্রথম ক্রুসেড (১০৯৬-১০৯৯) সফলভাবে মুসলিম শাসিত জেরুজালেম দখল করে। যদিও এই অঞ্চল সরাসরি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসেনি, এই অভিযানের ফলে বাইজান্টাইনের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হয়। পশ্চিম ইউরোপীয় শক্তিগুলো ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থ অন্তত সাময়িকভাবে মিলে যায়।

এরপরের ক্রুসেডগুলোতে পরিস্থিতি বদলে যায়। বিশেষত দ্বিতীয় (১১৫৪-১১৭২) ও চতুর্থ (১২০২-১২০৪) ক্রুসেডে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়। চতুর্থ ক্রুসেডের সময় ক্রুসেডাররা পোপের নির্দেশ অমান্য করে কনস্টান্টিনোপল দখল করে এবং লুটপাট চালায়। এই ঘটনা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ওপর একটি বড় ধাক্কা ছিল। শহরের ধ্বংস ও অভিজাত নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলে। সাম্রাজ্যের দুর্বলতা এই লুটপাটের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা পরবর্তী শতাব্দীর রাজনীতিতে অনেক প্রভাব ফেলে।

ক্রুসেডের পূর্বে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টানরা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পৃথক ছিল। বাইজান্টাইনরা ছিল অরথোডক্স খ্রিস্টান, আর পশ্চিম ইউরোপ ছিল ক্যাথলিক। এই বিভাজন ক্রুসেড যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের কারণ হয়। পশ্চিম ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের মধ্যে ছিল বাইজান্টাইনদের ওপর অবজ্ঞার মনোভাব, যাদের তারা প্রায় ‘অপর্যাপ্ত’ বা ‘বিশ্বাসঘাতক’ মনে করত। পাশাপাশি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কূটনৈতিক ভুল ও দুর্বল নেতৃত্ব এই বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

ফলে ক্রুসেড যুদ্ধ শুধুমাত্র মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল না; এটি বাইজান্টাইন ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যকার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাতেরও প্রতিফলন ছিল। এই দ্বন্দ্ব মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

চতুর্থ ক্রুসেডের পর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটে পড়ে। ১২০৪ থেকে ১২৬১ পর্যন্ত কনস্টান্টিনোপল বিভিন্ন দখলদারদের হাতে থাকে। এই সময়ে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা অনেকাংশে ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

১২৬১ সালে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার হলেও পূর্বের ঐশ্বর্য ফিরে পায়নি। ক্রুসেডের কারণে ইউরোপে নতুন শক্তির উত্থান ঘটে, যেমন ওটোমান সাম্রাজ্যের উত্থান। ১৪৫৩ সালে ওটোমানরা কনস্টান্টিনোপল দখল করে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটায়। এই পতনের পেছনে ক্রুসেড যুদ্ধের সৃষ্ট রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং বাইজান্টাইন ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও ক্রুসেড যুদ্ধের সম্পর্ক জটিল ও বহুমাত্রিক। এটি কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের সমন্বয়। ক্রুসেডের ফলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয় এবং পশ্চিম ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যকার বিভাজন বাড়ে।এই যুদ্ধের প্রভাব মধ্যযুগের ইউরোপ ও এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে গভীর পরিবর্তন আনে। ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মিলিত প্রভাবে বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে, বাইজান্টাইন ও ক্রুসেড যুদ্ধের ঘটনা শেখায় যে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য কখনো কখনো রাজনৈতিক সংঘাতের গভীর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজকের বিশ্ব রাজনীতিতেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট।

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি বদলে দিচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য

৭ই আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়া নতুন শুল্ক নীতির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নতুন নীতির ফলে ৯০টিরও বেশি দেশের পণ্যের উপর কর আরোপ করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের গড় কার্যকর শুল্কহারকে ১৯৩৩ সালের পর সর্বোচ্চ ১৮.৬%-এ নিয়ে গেছে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল মাত্র ২.৪%।

নতুন শুল্ক নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুনে শুল্ক রাজস্ব ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের মাসিক আয়ের তিনগুণ। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) অনুমান, এই শুল্ক নীতি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সরকারি ঋণ ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে সিবিও সতর্ক করেছে যে এই নীতি অর্থনীতির আকার ছোট করবে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের করছাড়ের কারণে রাজস্ব ক্ষতি শুল্ক আয়ের চেয়ে বেশি হতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল আমদানি কমানো এবং বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা। তবে শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুদ করায় ২০২৫ সালের মার্চে বাণিজ্য ঘাটতি ১৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা একটি রেকর্ড। জুনে অবশ্য তা ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এই শুল্ক নীতির ফলে বিশ্ব বাণিজ্যেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীন, যার পণ্যে এক সময় ১৪৫% শুল্ক ছিল, বর্তমানে তা কমে ৩০%-এ নেমে এসেছে। তবুও ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রফতানি ১১% কমেছে। অন্যদিকে ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং আসিয়ান দেশগুলোতে চীনের রফতানি বেড়েছে। এর ফলে অন্যান্য দেশগুলো পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি করতে আগ্রহী হচ্ছে। যেমন, যুক্তরাজ্য ও ভারত নতুন চুক্তি করেছে এবং ইইউ ইন্দোনেশিয়ার সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে উচ্চ শুল্কের কারণে আমেরিকান ভোক্তাদের জন্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি ২.৭%-এ পৌঁছেছে, যা মে মাসের ২.৪% থেকে বেশি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইসিং ল্যাবের গবেষণায় দেখা গেছে, শুল্কের ফলে প্রভাবিত পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে, যা ভোক্তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এছাড়াও সয়াবিন আমদানিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ব্রাজিলের দিকে ঝুঁকছে, যা মার্কিন কৃষকদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব বাড়াচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপথ পরিবর্তন করছে এবং আমেরিকান ভোক্তাদের উপর মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করছে। এই নীতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হবে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

অ্যাপলের ফেস আইডি, স্মার্টফোন নিরাপত্তার ভালো-মন্দ

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রাকে পরিবর্তিত করে চলেছে। স্মার্টফোনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে, তেমনি সেটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার প্রধান হাতিয়ারও বটে। এর মধ্যে অ্যাপল কোম্পানির ফেস আইডি (Face ID) প্রযুক্তি একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি কেবল ফোন আনলক করার পদ্ধতি নয়, এটি আধুনিক বায়োমেট্রিক সুরক্ষারও নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

অ্যাপল প্রথমবার ২০১৭ সালে iPhone X মোবাইলে ফেস আইডি চালু করে। এটি একটি বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশন পদ্ধতি, যেখানে ব্যবহারকারীর মুখের ভৌতিক এবং কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ফোন আনলক করা হয়। ফেস আইডি ৩০,০০০ টিরও বেশি ইনফ্রারেড পয়েন্ট ব্যবহার করে মুখের গভীরতার ম্যাপ তৈরি করে, যা ৩ডি ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে সত্যিকারের মুখ চিনতে সক্ষম। এই পদ্ধতিটি ক্যামেরা ও সেন্সরের সংমিশ্রণে কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে ইনফ্রারেড ক্যামেরা, ডিপথ সেন্সর, ফ্লাড ইলিউমিনেটর ইত্যাদি।

ফেস আইডি-র সবচেয়ে বড় শক্তি হল এটি মাত্র ০.০১ সেকেন্ডে কাজ সম্পন্ন করতে পারে এবং প্রচণ্ড অন্ধকারেও সঠিকভাবে মুখ চিনতে সক্ষম। এটি ফটোকপি বা দুই মাত্রিক ছবি দ্বারা প্রতারিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। এর পাশাপাশি এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোনের স্ক্রিন অ্যানিমেশনকে সামঞ্জস্য করে, যেমন ব্যবহারকারীর দৃষ্টি নজর রাখে, তাই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চোখের দিকে ফোন খোলে না।

ফেস আইডি বায়োমেট্রিক তথ্যকে একটি নিরাপদ এলাকা হিসেবে ‘সিকিউর এনক্লেভ’ (Secure Enclave) এ সংরক্ষণ করে, যা ফোনের প্রসেসর থেকে আলাদা এবং কোনো অ্যাপ বা অপারেটিং সিস্টেম সরাসরি এক্সেস করতে পারে না। এর ফলে ব্যবহারকারীর তথ্য লিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।

অ্যাপল দাবি করে যে ফেস আইডি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডাটা কোনো ক্লাউডে আপলোড করে না, অর্থাৎ সব তথ্য ফোনের ভিতরেই নিরাপদ থাকে।এর ফলে গোপনীয়তা রক্ষা হয় এবং ডেটা চুরির ঝুঁকি কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ফেস আইডির সাথে আনলকের সম্ভাব্য ভুল মিলের হার ১-মিলিয়নে ১, অর্থাৎ অত্যন্ত নিরাপদ। তুলনামূলকভাবে পুরানো টাচ আইডি পদ্ধতির ভুল মিলের হার ছিল ৫০,০০০-এ ১।

তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে, যেমন যমজ ভাইবোন বা গ্লাস, মাস্ক ব্যবহারের সময় ফেস আইডি সঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। তবে অ্যাপল নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে এই সীমাবদ্ধতাগুলোও কমানোর চেষ্টা করছে।

ফেস আইডি ব্যবহারকারীদের জন্য অনেক সুবিধা নিয়ে এসেছে। এটি ফোন আনলক করা সহজ করে তোলে, কারণ এখন পাসওয়ার্ড বা প্যাটার্ন মনে রাখার প্রয়োজন কমে গেছে। মোবাইলে লেনদেন বা পেমেন্টের ক্ষেত্রেও ফেস আইডি দ্রুত অথেন্টিকেশন দেয়, ফলে নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যবহারকারীর সময় বাঁচে।

বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মুখ ঢেকে মাস্ক ব্যবহারের কারণে ফেস আইডির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, অ্যাপল দ্রুত আপডেট চালু করে মাস্ক পরেও আইফোন আনলকের ব্যবস্থা করেছে, যা ব্যবহারকারীদের জন্য দারুণ সুবিধাজনক হয়েছে।

ফেস আইডি প্রযুক্তি শুধুমাত্র স্মার্টফোনে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে এটি অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যেমন ল্যাপটপ, স্মার্ট হোম ডিভাইস ও ব্যাংকিং সিকিউরিটিতে ব্যবহৃত হতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিংয়ের সংমিশ্রণে এটি আরও উন্নত এবং ব্যবহারকারীর মুখের স্বাভাবিক পরিবর্তন যেমন বয়স, চুলের স্টাইল ইত্যাদি সহজে বুঝতে সক্ষম হবে।

আদিবাসীদের ভূমি ও মানবাধিকার রক্ষা করবে কে?

আদিবাসীদের ভূমি, বন ও মানবাধিকার রক্ষায় সৃষ্ট সংকট নিরসনে সরকার ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকার দাবি উঠেছে একটি সাম্প্রতিক সেমিনারে। ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভূমি, বন ও মানবাধিকার সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ: সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক এ সেমিনারে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় চলমান সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, এএলআরডি এবং আরও ১৪টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ও প্যানেল আলোচকরা একযোগে আদিবাসীদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুন নাহার, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসানসহ অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং তাঁর প্রাথমিক বক্তব্যে বলেন, “নাগরিকদের অপমান করা পাপ। আমাদের দেশে বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জাতি নেই এই বক্তব্য ভুল। আমরা সবাই এই দেশের অধিবাসী, বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।” তিনি আরও বলেন, আদিবাসী জনগণের ওপর চলমান বৈষম্য দূর করতে আদিবাসী বিষয়ক একটি কমিশন গঠন ও নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

সমতল আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের আহবায়ক উজ্জ্বল আজিম তাঁর প্রবন্ধে তুলে ধরেন, বাংলাদেশের আদিবাসীরা এখনও সাংবিধানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত, যা তাদের ওপর বৈষম্যের এক বড় কারণ। ঐতিহ্যগত ভূমি জোরপূর্বক দখল, দলিল জালিয়াতি এবং ঘর উচ্ছেদ তাদের জীবনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণসহ মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত। মাতৃভাষায় শিক্ষার অভাব ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাবে আদিবাসীদের জীবনমান দুর্বল হচ্ছে।

উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরে সেই উদ্যোগগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি, ফলে আদিবাসীদের অধিকার ও সুরক্ষা এখন অগ্রাধিকার তালিকা থেকে প্রায় বাদ পড়েছে। প্রকৃত অর্থে যেসব সংস্কারের প্রয়োজন ছিল, সেগুলো এখনও অনুল্লিখিত রয়েছে।

সেমিনারে বক্তারা সরকার এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করে আদিবাসীদের ভূমি, বন ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।আদিবাসী জনগণের জন্য ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষায় প্রয়োজন সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন, কার্যকর কমিশন গঠন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মতো বাস্তব পদক্ষেপ। আদিবাসীদের স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা রক্ষা করে বাংলাদেশে সাম্য ও ঐক্যের বুনিয়াদ মজবুত করার প্রত্যয় প্রকাশ করেন সব অংশগ্রহণকারী।

বিপ্লবের ডাক ও লেনিনের সমালোচনায় মায়াকোভস্কির কবিতা ‘১৫০ মিলিয়ন’

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির “150,000,000” (রুশ: Sto pyat’desyat millionov) কবিতাটি ১৯১৯ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে রচিত একটি বিপ্লবী কবিতা, যা ১৯২১ সালে প্রকাশিত হয়। এটি রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে তৈরি এবং রুশ জনগণের বিপ্লবী চেতনা তুলে ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা হয়েছিল।মায়াকোভস্কি তার কবিতার মাধ্যমে শুধু সমাজ পরিবর্তনের ডাক দেননি, তিনি তার সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে এই কবিতার সাহিত্যিক মূল্যায়ন এবং এর প্রভাব নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিতর্কও হয়েছে।

“150,000,000” কবিতাটি মায়াকোভস্কি ১৯১৯ সালের প্রথমার্ধে শুরু করেন, এবং ১৯২০ সালের মার্চ মাসে সম্পন্ন করেন। কবিতার কাজের শিরোনামগুলো ছিল ভিন্ন ভিন্ন: “The Will of the Millions” (ভলিয়া মিলিয়নোভ), “The Tale of Ivan” (বিলিনা অব ইভানে), এবং “Ivan The Bylina. The Revolutionary Epic” (ইভান বিলিনা। ইপোস রেভোলিউটসিয়ি)। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে এটি গসিজদাত (Gosizdat) প্রকাশনী থেকে ছাপা হয়, যদিও প্রথম সংস্করণে লেখকের নাম ছিল না। এতে কবিতার প্রথম দুটি স্তবকে স্পষ্ট করে বলা হয়: “150 মিলিয়ন হল এই কবিতার মালিকের নাম / বুলেট হল ছন্দ, আগুনের রাইম বাড়ি বাড়ি ঝাঁপিয়ে পড়ছে। / 150 মিলিয়ন আমার মুখ দিয়ে কথা বলে / জনতা কাগজের উপর পদক্ষেপের পাথর হয়ে চলেছে।” এই অংশ থেকে বোঝা যায়, কবিতার মালিকানা কোনো এক ব্যক্তির নয়, বরং ১৫০ মিলিয়ন মানুষের, অর্থাৎ গোটা জনগণের।

এই কবিতায় মায়াকোভস্কি রুশ জনগণের বিপ্লবী শক্তিকে প্রতিফলিত করার জন্য “ইভান” নামে একটি কাল্পনিক চরিত্র ব্যবহার করেছেন, যা মূলত সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব। কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই “ইভান” এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের মধ্যে সংঘটিত প্রতীকী যুদ্ধ।উইলসন এখানে পুঁজিবাদের প্রতীক এবং শোষক শক্তির রূপে উপস্থাপিত হয়। মায়াকোভস্কি কবিতার মাধ্যমে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে “ইভান” রুশ বিপ্লবের সংগ্রামী মানুষের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। এই যুদ্ধের চিত্রায়ন কেবলমাত্র রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত নয়; এটি একটি আদর্শিক যুদ্ধ, যেখানে শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন সমাজ গঠনের ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়। কবিতার ভাষা অত্যন্ত তীব্র, শক্তিশালী এবং রোমাঞ্চকর, যা বিপ্লবের উত্তেজনা এবং মানুষের উদ্দীপনা প্রকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কবিতার শৈলী এবং ছন্দ-তাল মায়াকোভস্কির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রূপক এবং আগ্রাসী ভাষার মাধ্যমে বিপ্লবের আবেগ ও উত্তেজনাকে জীবন্ত করে তোলে।

সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে “150,000,000” কবিতাটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। বিপ্লবী চেতনার শক্তিশালী প্রকাশ হিসেবে একাংশ সমালোচক কবিতাটির প্রশংসা করেছেন, যেখানে ভাষার তীব্রতা এবং রূপকের গভীরতা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। কবিতাটি রুশ সাহিত্যে একটি নতুন ধারার সূচনা করেছে, যেখানে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার সঙ্গে আধুনিক কবিতার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। অন্যদিকে সোভিয়েত বিপ্লবী নেতা ভ্লাদিমির লেনিন কবিতাটিকে “অহংকারী এবং সন্দেহজনক” বলে অভিহিত করেছিলেন। লেনিনের মতে, কবিতায় বিপ্লবের বাস্তব সংগ্রামের প্রকৃত চিত্র এবং সাধারণ মানুষের সংগ্রামের গভীরতা প্রতিফলিত হয়নি। তার দৃষ্টিতে কবিতার ভাষা ও ভাব প্রকাশ কখনো কখনো অতিরঞ্জিত এবং ব্যক্তিগত অহংকার দ্বারা প্রভাবিত ছিল, যা বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত। এই সমালোচনা থেকে বোঝা যায়, সাহিত্যিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সে সময়ের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে কবিতাটির গ্রহণযোগ্যতা ছিল সীমিত।

বর্তমান সময়ে, যখন বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্দোলন লক্ষ্য করা যায়, “150,000,000” কবিতার প্রতীকী অর্থ নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কবিতায় উল্লিখিত “ইভান” এবং “উইলসন” চরিত্রগুলো আধুনিক সমাজে ক্ষমতা, শোষণ ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে। মায়াকোভস্কির এই বিপ্লবী চেতনা আজকের সময়েও জনসাধারণের মধ্যে সমতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

বিশেষ করে আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই কবিতার ভাবনা এবং ভাষা নতুন প্রজন্মের মধ্যে আন্দোলনের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। বিপ্লবী ভাষা এবং সংগ্রামের কথা বলা কবিতাটি, যদিও এক সময় সীমিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেখা, তার মৌলিক চেতনা আজও অর্থপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক।

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির “150,000,000” কবিতা কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এটি একটি সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের আয়না ।কবিতাটি বিপ্লবী চেতনার প্রতীক হিসেবে উচ্চকিত হলেও, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কিছু সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে। তার ভাষা ও রূপক চিত্র বিপ্লবের উত্তেজনা এবং মানুষের সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটিয়েছে, যা আধুনিক সমাজেও প্রাসঙ্গিক।

এই কবিতার মাধ্যমে মায়াকোভস্কি যে বিপ্লবী চেতনা এবং জনগণের সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েছেন, তা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজকের বিশ্বে যেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি জোরালো, সেখানে “150,000,000” কবিতার বার্তা ও ভাষা নতুন প্রজন্মের মধ্যে আন্দোলন ও পরিবর্তনের চেতনা উদ্রেক করতে পারে।

গ্রামীণ মিশরের নারীরা কীভাবে কবিতার মাধ্যমে মৃতদের সাথে কথা বলতেন?

গ্রামীণ মিশরে নারীদের শোকগীত (আল-আদিদ) এক শক্তিশালী সত্য প্রকাশ করে: মৃত্যু কোনো দূরের ঘটনা নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে নিঃশব্দে জড়ানো একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের কবিতার মাধ্যমে, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানেই শুধু শোক করা নয় বরং সেই ক্ষতি নিয়ে বাঁচতেই শিখে নেয়া।

অনেক মিশরীয়দের জন্য, মৃত্যু বিদায়ের নাম নয় ,এক অবিরাম চলমান প্রক্রিয়া। প্রাচীন বিশ্বাসের সাথে গাঁথা এই ধারণা আজও গ্রামীণ শোকগীতে প্রতিধ্বনিত হয়, যেখানে নারীরা মৃতদের সাথে এমনভাবে কথা বলেন যেন তারা কখনোই চলে যাননি। তাদের কাছে জীবন ছিলো পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি।

একসময় এ ধরনের গ্রামীণ শোকগীতকে অবমূল্যায়ন বা নিষিদ্ধ করা হতো, আজ তা মিশরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। লেমিয়া তেফউইক-এর মতো গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই কবিতাময় রীতি নারীদের জীবনের বড় বড় মুহূর্ত বিশেষ করে মৃত্যুর বেদনা সামলাতে সাহায্য করত এবং বাস্তবতার অতীতেও তারা আবেগের একটি নিরাপদ জায়গা পেয়েছিলেন।

গ্রামীণ মিশরের শোকগীতে দৈনন্দিন কাজ যেমন দুপুরের খাবার তৈরি করা বা কফি ফোঁটানো শোক স্মরণে পবিত্র কাজ হয়ে ওঠে। পুনরাবৃত্তি ও রূপক ব্যবহার করে বেদনা জীবন্ত হয়ে ওঠে আর মৃতরা স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। এই কবিতা শুধু শোক প্রকাশ করে না, বরং স্মৃতিকেও জীবন্ত করে তোলে এবং ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ হয়ে ওঠে।

গাজায় যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে তেল আবিবে বিক্ষোভ, যুদ্ধ সম্প্রসারণের ঘোষণা – নেতানিয়াহুর

আজ হাজার হাজার ইসরায়েলি তেল আবিবের রাস্তায় নেমে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এর একদিন আগেই ইসরায়েলি সরকার গাজা শহরে আক্রমণ করে সংঘাত বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিল। বিক্ষোভকারীরা হাতে প্ল্যাকার্ড এবং গাজায় বন্দি জিম্মিদের ছবি নিয়ে তাদের মুক্তির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

এএফপি সাংবাদিকরা অনুমান করেছেন যে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। তবে জিম্মিদের পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী একটি দল জানিয়েছে যে প্রায় ১,০০,০০০ মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান দেয়নি, তবে সাম্প্রতিক অন্য সব যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভের তুলনায় এটি ছিল অনেক বড়। একজন নিহত জিম্মির আত্মীয় শাহর মোর জহিরো এএফপিকে বলেন, “আমরা প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে সরাসরি বার্তা দিতে চাই: যদি আপনারা গাজার কোনো অংশে হামলা করেন এবং জিম্মিরা মারা যায়, নির্বাচনী প্রচারে, শহরের চত্বরে এবং প্রতিটি সময়ে ও স্থানে তবে আমরা আপনাদের পিছু ছাড়ব না।”

শুক্রবার নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজা শহর দখল করার জন্য একটি বড় অভিযানের পরিকল্পনা অনুমোদন করে, যা দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় তোলে। ইসরায়েলের কিছু মিত্রসহ বিদেশি শক্তিগুলো জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা এবং গাজার মানবিক সংকট নিরসনের জন্য একটি আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করছে। এই ব্যাপক সমালোচনা এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধের গুজব সত্ত্বেও, নেতানিয়াহু তার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। শুক্রবার রাতে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বলেন, “আমরা গাজা দখল করতে যাচ্ছি না, আমরা হামাসের কাছ থেকে গাজাকে মুক্ত করতে যাচ্ছি।”

নেতানিয়াহু গত ২২ মাস ধরে এই যুদ্ধের কারণে নিয়মিত বিক্ষোভের মুখোমুখি হচ্ছেন। অতীতে যখন জিম্মিদের ফিলিস্তিনি বন্দিদের সঙ্গে বিনিময় করা হয়েছিল, তখন অনেকে সরকারকে একই ধরনের চুক্তির জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২০২৩ সালে হামাসের আক্রমণে ২৫১ জন জিম্মিকে বন্দি করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৪৯ জন এখনো গাজায় রয়েছেন এবং সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে তাদের মধ্যে ২৭ জন মৃত।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) শনিবার গাজায় ইসরায়েলের অভিযান সম্প্রসারণের পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সরকারি ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ‘ওয়াফা’র মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পিএ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এই পরিকল্পনাকে “একটি নতুন অপরাধ” বলে উল্লেখ করেন এবং অবিলম্বে এটি বন্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি আরও বলেন, “ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে গাজা উপত্যকায় তার পূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

যে বৈঠকে গাজা শহর দখলের পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়, সেই একই বৈঠকে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজায় যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য কিছু নীতি গ্রহণ করে, যার মধ্যে একটি নতুন “প্রশাসন যা হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কেউ নয়” প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও ছিল। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হিসেবে পরিকল্পিত পিএ ইসরায়েলি-অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশে সীমিত প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে, কিন্তু হামাস-শাসিত গাজায় তাদের কোনো উপস্থিতি নেই।

ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের শনিবারের এক যৌথ বিবৃতিতে গাজা শহর দখলের সিদ্ধান্তের আবারও সমালোচনা করা হয়েছে। তারা বলেন, “এটি ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে, জিম্মিদের জীবন বিপন্ন করবে এবং বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপক স্থানান্তরের ঝুঁকি বাড়াবে।”

রাশিয়াও শনিবার এক বিবৃতিতে গাজা শহর দখলের ইসরায়েলি পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে “ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের নাটকীয় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা একটি মানবিক বিপর্যয়ের স্পষ্ট লক্ষণ।”

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬১,০০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং এই সংখ্যাকে জাতিসংঘও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। গাজার সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার গাজায় ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক ছিলেন, যারা ত্রাণ সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

সাঁওতাল বিদ্রোহ – যখন বাঙালি জমিদার হয়ে উঠল উপনিবেশের হাতিয়ার

উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাসে ১৮৫৫ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সাঁওতাল বিদ্রোহ এক বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদ হিসেবে গুরুত্ব বহন করে। এই বিদ্রোহ শুধু আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার লড়াই ছিল না, এটি বাঙালি জমিদারদের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে আদিবাসীদের সংঘর্ষের অদেখা অধ্যায়ও বটে।

সাঁওতালরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী, যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ব্যবস্থা রয়েছে। ১৮শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁরা প্রধানত ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং সিকিমের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতেন। ঐ সময় ব্রিটিশ শাসন তাদের ভূমি অধিকারকে হস্তান্তর ও পরিবর্তন করে ‘জমিদারি ব্যাবস্থা’ চালু করে।

সাঁওতালরা মূলত কৃষিপ্রধান জনগোষ্ঠী। তাঁরা নিজেরা জমি চাষ করত এবং তাদের সমাজে জমি ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদার উৎস। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে বাঙালি জমিদারদের সংযুক্ত হয়ে জমির অধিকারে নতুন শোষণ ব্যবস্থার সূচনা হয়।

বাঙালি জমিদাররা ঐ সময়ের মূল ভূমি মালিক ও কর আদায়কারী। তাঁরা ব্রিটিশ শাসকের আশ্রয়ে নিজেদের ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় উৎসাহী ছিলেন। জমিদাররা সাঁওতালদের জমি অধিকার হরণ ও তাদের ওপর ঋণ চাপিয়ে নিজেদের ক্ষমতা শক্তিশালী করেন। তাঁরা ছিলেন ঋণদাতা, মধ্যস্বত্বভোগী এবং কখনও কখনও ভূমিদস্যু।

জমিদাররা ‘বন্দোবস্তি’ ব্যবস্থা চালু করে সাঁওতালদের জমিতে কৃষিকাজ ও কর দিতে বাধ্য করে। কর না দেওয়ার ফলে আদিবাসীদের জমি বাজেয়াপ্ত হওয়া বা ঋণের বোঝায় দাসত্বের মতো অবস্থায় পড়া ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহের মূল কারণগুলোর মধ্যে। এই জমিদারদের সাথে ব্রিটিশ প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী একযোগে কাজ করত বিদ্রোহ দমন ও শাসন বজায় রাখার জন্য।

১৮৫৫ সালের দিকে সাঁওতালরা তাদের অধিকার রক্ষায় এবং জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারী বিদ্রোহে নামেন। বড় সিদ্দিক, সিদ্দিক মারিয়া, ঝুমা বাউদী সহ অনেক নেতা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। বিদ্রোহীরা বাঙালি জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সাঁওতালরা সংগঠিত সমাজ ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের মাধ্যমে তাদের আন্দোলন সুসংগঠিত করেছিল। তাঁদের মূল দাবি ছিল জমি ও স্বাধীনতা রক্ষা এবং শোষণমুক্ত জীবন।

বাঙালি জমিদাররা এই বিদ্রোহকে নিজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্তিত্বের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে দেখে। তাঁদের ওপর সাঁওতাল বিদ্রোহীদের আক্রমণ শুরু হলে তাঁরা ব্রিটিশ শাসকদের সাহায্য চেয়ে তাঁদের পক্ষে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করেন।

ব্রিটিশরা সাঁওতাল বিদ্রোহকে শাসনহীনতা ও আইনভঙ্গ হিসাবে দেখেছিল। তাঁদের জন্য এটি একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ ছিল। বিদ্রোহ দমন করার জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

১৮৬০ সালের মধ্যে বিদ্রোহকে দমন করে এবং পরে সাঁওতাল পারগনা (Santal Parganas) নামে একটি বিশেষ প্রশাসনিক এলাকা গঠন করে। এতে আদিবাসীদের কিছু স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ দেয়া হলেও মূল কাঠামো একই থাকে।

সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসে আদিবাসীদের সংগ্রামের কথা প্রচলিত থাকলেও বাঙালি জমিদারদের ভূমিকা অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। তাঁরা শুধু শোষক বা দমনকারী নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে জোটবদ্ধ সামাজিক শক্তি ছিলেন। এই দ্বন্দ্ব বুঝতে গেলে আমাদের বাঙালি জমিদারি ব্যবস্থার জটিলতাও উপলব্ধি করতে হবে। জমিদারি ছিল একদিকে অর্থনৈতিক শ্রেণি ও সামাজিক ক্ষমতার কেন্দ্র, অন্যদিকে সেটি আদিবাসী ও কৃষক সম্প্রদায়ের উপর জোরপূর্বক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার।

সাঁওতাল বিদ্রোহ ভারতের প্রথম সংগঠিত আদিবাসী বিদ্রোহ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। এটি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বৃহৎ জনআন্দোলন ছিল, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন আদিবাসী আন্দোলনের জন্য পথ প্রশস্ত করেছিল। তবে এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বাঙালি জমিদার ও আদিবাসীদের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংঘর্ষ, যা ঔপনিবেশিক শাসনের সুবিধার্থে বহুবার ব্যবহার হয়েছে। সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে কিছু প্রশাসনিক সংস্কার আসলেও আদিবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ হয়নি।

আজকের দিনে সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাস আমাদের শেখায় কিভাবে শ্রেণিগত, সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক জটিলতা আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের মধ্যে প্রভাব ফেলে। আধুনিক বাংলাদেশ, ভারত ও বাংলাদেশের আদিবাসী সমস্যা ও জমি অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্কের মূলে এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে পুনরায় বোঝার প্রয়োজন রয়েছে। বাঙালি জমিদার বনাম আদিবাসী বিদ্রোহ শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের বর্তমান সামাজিক ন্যায় ও ভূমি নীতির আলোকে চিন্তা করার সুযোগ দেয়। আদিবাসী অধিকার ও জমিদারি শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব আজও নানা রূপে বিদ্যমান।