Home Blog Page 34

ঋণখেলাপিরা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থ উপদেষ্টা

আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাংকের ঋণখেলাপিদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ আয়োজিত ‘ইউ পেনশন অ্যাপ’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে। “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করার জন্য যা যা লাগে, আমরা সব সাপোর্ট দেব”বলে যোগ করেন তিনি। ঋণখেলাপিদের প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, “থিওরেটিক্যালি ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন দেখভাল করবে।”

নির্বাচনে কালো টাকা নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি এখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আসেনি, তবে নির্বাচন কমিশন এ নিয়ে কাজ করবে। কালো টাকার উৎস অনেকটা বন্ধ হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আগে ব্যাংকের মালিক, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক, সংবাদপত্রের মালিক, ফ্ল্যাটের মালিক সব একই ব্যক্তি হতো। এখন মোটামুটি চেক অ্যান্ড ব্যালান্স হচ্ছে।”

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্পর্ক তুলে ধরে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, রাজনীতিবিদরা যদি অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন বা ভোট প্রদানের উৎসাহ দেন, তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু করার থাকবে না।

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর “ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না” মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “রাজনৈতিক বক্তব্য তারা রাখুক। আমিও বামপন্থী রাজনীতি করেছি, তখন কত বক্তব্য দিয়েছি হল বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ইত্যাদি, কিছুই বন্ধ হয়নি।”

সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, সরকারি কর্মচারী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এ স্কিমের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এছাড়া কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে অর্থ উপদেষ্টা একদিকে নির্বাচনে ঋণখেলাপিদের অংশগ্রহণ রোধের অবস্থান স্পষ্ট করলেন, অন্যদিকে কালো টাকা নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুরুত্বের দিকটিও তুলে ধরলেন। তার মন্তব্য অনুযায়ী একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে শুধু আইনগত পদক্ষেপ নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাও অপরিহার্য।

কোনো পানি, রাসায়নিক বা শ্রম ছাড়াই ধুলোবালি তাত্ক্ষণিকভাবে দূর করে – স্বয়ংক্রিয় পরিষ্কারক কাচ

ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী উদ্ভাবন

চীনের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একটি আলট্রা-পাতলা (0.62 মিমি), স্বচ্ছ কাচ তৈরি করেছেন যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধুলো মুছে ফেলে। কেবল ১০ সেকেন্ডে ৯৮% ধুলো দূর করতে সক্ষম, এবং এর জন্য পানি, রাসায়নিক বা শ্রমের প্রয়োজন হয় না।

কীভাবে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র পরিষ্কারের কাজ করে

কাচের ভিতরে এমন ইলেকট্রোড স্থাপন করা হয়েছে যা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে। এই ক্ষেত্র ধূলিকণাগুলোকে চার্জ করায়, ফলে ধুলো কণাগুলো ঝাঁপ দেয় ও কাচের পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে যায়। এতে জৈব এবং অজৈব ধুলো উভয়ই পরিষ্কার হয়।

ধুলো প্রতিরোধে কণার ঢাল প্রভাব

পরিষ্কারের বাইরে, সক্রিয় বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র বাতাসে থাকা চার্জযুক্ত ধূলিকণাকে দূরে রাখে। ফলে নতুন ধুলো জমা হওয়ার হার প্রায় ৯০% কমে যায়। এই প্রভাবের ফলে এমনকি ধুলোময় পরিবেশ বা ধুলো ঝড়ের সময়েও কাচগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পরিষ্কার থাকে।

উচ্চ স্বচ্ছতা ও শক্তি সাশ্রয়ী

এই কাচ দৃশ্যমান আলো সহজে যেতে দেয় এবং ইনফ্রারেড আলোর ওপর এর প্রভাব খুবই কম। তাই এটি সৌর প্যানেল, বহুতল ভবনের জানালা, গাড়ির উইন্ডশিল্ড এবং গ্রিনহাউসের জন্য খুবই উপযুক্ত। এটি স্বচ্ছতা ও শক্তি দক্ষতা দুটোই বজায় রাখে।

বৃহৎ পরিসরে কম খরচে উৎপাদন

সাধারণ উপকরণ ব্যবহার করে সহজ শিল্প প্রক্রিয়ার মাধ্যমে (লেজার খোদাই করা ইনডিয়াম টিন অক্সাইড ইলেকট্রোড, ডায়েলেকট্রিক PET ফিল্ম দ্বারা আচ্ছাদিত) এটি তৈরি করা যায়। বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না, ফলে বড় পরিসরে উৎপাদন সম্ভব এবং খরচও কম।

বিদ্যমান পদ্ধতির চেয়ে সুবিধা ও বহুমুখী ব্যবহার

পানি বা আর্দ্রতার ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় পরিষ্কারক পৃষ্ঠের থেকে ভিন্ন এই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র কৌশলটি শুকনো ও ধুলোময় পরিস্থিতিতেও অত্যন্ত কার্যকর। এটি পরিষ্কারের খরচ এবং ঝুঁকি দুটোই কমিয়ে দেয়, যা সৌর পার্ক, সুউচ্চ ভবন, গাড়ি এবং আরও অনেক কিছুর রক্ষণাবেক্ষণে সহায়ক।

বিবিসি’র তদন্ত – রাশিয়ায় হাজার হাজার উত্তর কোরিয়ান শ্রমিককে দাসপ্রথার মতো শর্তে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ায় তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। দেশটির বহু পুরুষ নিহত বা সামরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় নির্মাণ, আইটি ও পোশাক খাতগুলোতে স্থানীয় শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকট মোকাবেলায় উত্তর কোরিয়ার হাজার হাজার নাগরিককে রাশিয়ায় কাজ করতে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি । তবে তাদের কাজের পরিবেশকে দাসপ্রথার মতো উল্লেখ করেছেন পালিয়ে আসা শ্রমিকরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন নির্মাণস্থলে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদেরকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা হয়। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কাজের স্থলে নিয়ে আসা হয় এবং তাদেরকে কাজের স্থান বা পরিবেশ সম্পর্কে কাউকে কিছু বলার অনুমতি দেওয়া হয় না। শ্রমিকদের কাজের সময়সূচি অত্যন্ত কঠোর: ভোর ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয়। বছরে ছুটি মাত্র দুই দিন। শ্রমিকদের ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই কাজের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তেন বা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। তবে সুপারভাইজাররা তাদেরকে শারীরিকভাবে শাস্তি দিত। এমন কঠোর পরিবেশে শ্রমিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ কোরিয়ার দোং-আ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাং দং-ওয়ান উল্লেখ করেছেন, শ্রমিকরা অন্ধকারে সীমিত সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে কাজ করেন এবং নিরাপত্তার জন্য রাতে আলো বন্ধ রাখা হয়।

পালিয়ে আসা শ্রমিকরা জানান, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের নজরদারিতে দিন-রাত নির্মাণস্থলে আটকে থাকতে হয়। তারা নোংরা শিপিং কনটেইনারে ঘুমোতে বাধ্য হন, যেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে শীত নিবারণের জন্য মাত্র ত্রিপল ব্যবহার করা হয়।

জাতিসংঘ ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিক বিদেশে পাঠানো নিয়ন্ত্রণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে রাশিয়ার তীব্র চাহিদা ও জাতিসংঘের নজর এড়াতে, উত্তর কোরিয়ার সরকার সীমিত আয়ের বড় অংশ রাষ্ট্রের হাতে দেয়। শ্রমিকরা হাতে মাত্র ১০০-২০০ ডলার পেয়েছেন এবং দেশে ফেরার আগে এই পারিশ্রমিকও পান না।

পালানো শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, দেশটিতে ফিরতে চাওয়া শ্রমিকদের প্রতি নিয়মিত দমননীতি আরোপ করা হয়েছে। কিম জং উনের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করতে তাদের বাধ্যতামূলক কর্মশালায় অংশ নিতে হয়। আগে মাসে একবার দলের সঙ্গে ছুটি কাটানোর সুযোগ থাকলেও বর্তমানে তা সীমিত করা হয়েছে।

গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার শ্রমিক সংকটের এই পরিস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের ব্যবহার একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল।তারা সস্তা, কঠোর পরিশ্রমী এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সের্গেই শোইগু প্রকাশ করেছেন যে, উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের পুনর্নির্মাণ প্রকল্পেও পাঠানো হবে।

পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই শ্রমিকরা ভয়াবহ, বিপজ্জনক এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করছেন। এটি কেবল রাশিয়ার শ্রমিক সংকট মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না, বরং উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে।

নাজিম হিকমেত – যিনি কারাগারকে কাগজে পরিণত করে সাম্রাজ্যের ভয় ভেঙেছিলেন গড়েছিলেন মানুষের মুক্তির মানচিত্র : সেম এরচিয়েস, তুর্কি সাংবাদিক, সম্পাদক এবং প্রকাশক

নাজিম হিকমেতকে তুর্কি সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে ধরা হয়। তিনি ১৯২০-এর দশকে প্রথম কবিতা প্রকাশ করেন, ৩০ ও ৪০-এর দশকে খ্যাতি পান, ৬০-এর দশকে একধরনের ‘কাল্ট’ মর্যাদা অর্জন করেন এবং ১৯৬৩ সালে অল্প বয়সেই মারা যান। হিকমেতের কবিতা ছিল একেবারেই নতুন ধরণের, এর আগে তুর্কি সাহিত্য এমন কিছু দেখেনি। তাঁর ছন্দ, শক্তি আর সৃজনশীলতা এমনকি তাঁর সাহিত্যিক বিরোধীদেরও মুগ্ধ করেছিল। সাহসী বুদ্ধিজীবী ও প্রভাবশালী কবি হিসেবে তিনি অসংখ্য পাঠকের মন জয় করেন।

জীবনের পুরোটা সময় তিনি কমিউনিস্ট কবি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে জীবনের বড় একটি অংশ তাঁকে কারাগারে কাটাতে হয়। তবু তাঁর জীবন ছিল গভীর ভালোবাসা আর দীর্ঘ নির্বাসনে ভরপুর।

তিনি মূলত বামপন্থী মহলে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দশকে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ আগের মতো আকর্ষণীয় না হলেও, নাজিম হিকমেতের জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। এর বড় কারণ তাঁর কবিতার উচ্চ মান এবং তাঁর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব ও জীবনযাপন। এখনও তাঁর কবিতা পড়া হয়, তাঁকে নিয়ে নতুন বই লেখা হচ্ছে এবং তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে প্রদর্শনী আয়োজন করা হচ্ছে।

সম্প্রতি লিটারাতুর পাবলিকেশনস নাজিম হিকমেতকে নিয়ে তিনটি বই প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে দুটি লিখেছেন আতিলা বিরকিয়ে “Clouds Pass by Calling Your Name, Piraye” এবং “The Poet was in Istanbul”। প্রথম বইটিতে ১৯৪৫ সালে বুরসা কারাগার থেকে স্ত্রী পিরায়েকে লেখা হিকমেতের কবিতাগুলো (সংকলন: Poems Between 9 p.m. and 10 p.m.) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যদিও বিরকিয়ে বলেছেন এটি সমালোচনামূলক গ্রন্থ নয়, তবুও তিনি কবিতাগুলোর সময়কাল, প্রেক্ষাপট, এবং বিশেষ করে পিরায়েকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। বইটির ভঙ্গি কখনও প্রবন্ধ, কখনও বর্ণনা, আবার কখনও সমালোচনার মিশ্রণ—যা বিরকিয়ের অন্যান্য লেখার ধরণেও দেখা যায়।

অন্য বই “The Poet was in Istanbul” একটি অল্প-পরিচিত ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা। ১৯২৭ সালে নাজিম মস্কো থেকে ইস্তানবুলে এক রহস্যময় যাত্রা করেছিলেন। ইলিচ নামের ফেরিতে করে আসা এই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল, সে বছরের কমিউনিস্ট পার্টি অব তুরস্কের (টিকে‌পি) ব্যাপক গ্রেপ্তারের পর ছত্রভঙ্গ হওয়া সেলগুলো পুনর্গঠন করা। যেহেতু তাঁর আগেই ১৫ বছরের কঠোর শ্রমের সাজা হয়েছিল, নিশ্চিতভাবে জানা যায় না তিনি ইস্তানবুলে নেমেছিলেন কি না। এ যাত্রা সম্পর্কে আমরা কেবল তাঁর হাসান আলি এদিজকে লেখা চিঠি থেকে জানতে পারি। সেই চিঠির ওপর ভিত্তি করেই বিরকিয়ে এক ধরনের নভেল্লা আকারে গল্পটি সাজিয়েছেন—ফেরিতে নাজিম, ইউক্রেনীয় স্ত্রী যাকে তিনি পেছনে ফেলে এসেছেন, তার জন্য এবং ইস্তানবুলের জন্য গভীর আকুলতা, দায়িত্ব পালন আর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়—সব মিলিয়ে চারটি অধ্যায়: কবি, সচিব (হাসান আলি এদিজ), নারী (স্ত্রী ইয়েলেনা ইউলচেঙ্কো, যিনি কয়েক বছর পর এক মহামারিতে মারা যান) এবং কাল্পনিক চরিত্র সাংবাদিক (লেখকের প্রতীক)। বিরকিয়ে মনে করেন, টিকে‌পির সঙ্গে নাজিমের সম্পর্ক অনেক জীবনীতে উপেক্ষিত হয়েছে, আর এই রহস্যময় ও রোমান্টিক ফেরি-ভ্রমণই তাঁকে বইটি লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে। (পরবর্তীতে একই জাহাজ ট্রটস্কিকে দুই বছরের নির্বাসনের জন্য ইস্তানবুলে নিয়ে আসে।)

যেমন সব কাল্ট সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে হয়, নাজিমকে নিয়েও দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন—কারও কাছে তিনি প্রথমে কবি, কারও কাছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আবার কারও কাছে ব্যক্তিত্ব নিজেই মুখ্য। এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে সময় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে একজন শিল্পীর জন্ম প্রক্রিয়া বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বই লিখেছেন গোকসেল আইমাজ—“A Great River – Nazım Hikmet and Landscapes”। এটি ২০১০ সালে প্রথম প্রকাশিত “Nazım Hikmet and the Country” গ্রন্থের নতুন সংস্করণ, যা ২০১৩ সালে নাজিম হিকমেত গবেষণা পুরস্কার পেয়েছিল।

সাংস্কৃতিক সমাজতত্ত্ব নিয়ে কাজের জন্য পরিচিত গোকসেল আইমাজ নাজিমের মহাকাব্যধর্মী কবিতা “Human Landscapes from My Country” বিশ্লেষণ করেছেন। শিলার, মিশলে, মার্কুস, আদর্নো এবং বিশেষত বুরদিয়ুর মতো চিন্তকদের ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে তিনি নাজিমকে ব্যাখ্যা করেছেন। বইটিতে নাজিমকে এমন এক শিল্পী হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি জীবন ও আশার পক্ষে দাঁড়িয়ে আনাতোলিয়ার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়েছেন এবং সময়ের পরিবর্তনকে নিজে প্রভাবিত করেছেন।

গোকসেল আইমাজের মতে, নাজিমের সাহিত্যিক শক্তি কেবল জন্মগত প্রতিভার কারণে নয়—“প্রতিভা একটি সামাজিক উপাদান।” তাঁর মতে, নাজিমের সৃষ্টিশীলতার প্রধান চালিকা শক্তি ছিল তাঁর কমিউনিস্ট পরিচয়, যা তিনি নির্ভীকভাবে ঘোষণা করতেন এবং যা তাঁর শিল্পকে প্রভাবিত করেছে। তবে এখানে মূল বিষয় তাঁর বিশ্বাস নয়, বরং সেই বিশ্বাস তাঁর জীবনে কী করেছে।

নাজিম ছিলেন আত্মনির্ভরশীল ও স্বাধীনচেতা। তিনি পারিবারিক প্রভাব, রাজনৈতিক সংযোগ বা সমাজতান্ত্রিক ব্লকের সুযোগ কোনো কিছুর ওপর নির্ভর করেননি। সমালোচনামূলক, অমিল ও লড়াকু মনোভাব তাঁর কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। সাংবাদিক ও লেখক অকতায় আকবালের মতে, তিনি তরুণ লেখকদের কাছে “এক ধরনের নায়ক” ছিলেন। তবে নাজিম নিজেকে “সাহিত্যিক শ্রমিক” বলেই দেখতেন। দেশের মানুষের প্রতি সহমর্মিতা আর উচ্চবিত্তের প্রতি নৈতিক ক্ষোভ মিলিয়ে তিনি ১৯৩৯ সালে লেখা শুরু করেন “Human Landscapes from My Country” যা অনেকে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা মনে করেন। কিন্তু বইটি তুরস্কে ১৯৬০-এর দশকেই প্রথম প্রকাশ পায়। তাঁর কবিতা দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ছিল এমনকি পড়াটাও অপরাধ গণ্য হতো। তবু এই নিষেধাজ্ঞা তাঁকে ভুলিয়ে দেয়নি; বরং হয়তো মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।

২০২৬ সালের অবাধ নির্বাচনে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানালেন – প্রধান উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে কাজ করছে, যাতে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া যায়। তিনি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, “ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ, তাদের কাছেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দেব।”

বুধবার মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়া ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় (ইউকেএম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই বক্তব্য দেন তিনি। সামাজিক ব্যবসা প্রসারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়টি তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। চ্যান্সেলর ও নেগেরি সেমবিলান দারুল খুসুস রাজ্যের সুলতান তুংকু মুহরিজ ইবনি আলমারহুম তুংকু মুনাওয়িরর কাছ থেকে তিনি সনদ গ্রহণ করেন।

সম্মাননা প্রসঙ্গে ইউনূস বলেন, এই স্বীকৃতি তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণে তার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি স্মরণ করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থান দেশের জাতীয় পরিচয় ও ভবিষ্যতের আশা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। শত শত ছাত্র-যুবক ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছেন। যে ভবিষ্যৎ মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করছে। ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সংস্কার বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, উদ্যোক্তাদের সহায়তা, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অপরিহার্য। ইউকেএমের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা আহ্বান জানান, তারা যেন বড় স্বপ্ন দেখে, সাহসীভাবে চিন্তা করে এবং সমাজকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যায়। তিনি বলেন, প্রকৃত সাফল্য শুধু নিজের অর্জনে নয়, বরং অন্যদেরও উন্নতির পথে সঙ্গে নেওয়ায় নিহিত। পৃথিবীকে বদলে দিতে সক্ষম প্রকৃত নেতা ও সমস্যা সমাধানকারীর প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে ইউনূস বলেন, প্রতিটি মানুষ অসাধারণ কিছু করার ক্ষমতা রাখে—তা হতে পারে মানুষের সেবায় ব্যবসা গড়ে তোলা, জীবন বদলে দেওয়া উদ্ভাবন বা উন্নয়নমুখী নীতি প্রণয়ন।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্পদের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবনকে বড় বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির আহ্বান জানান, যেখানে সম্পদ ন্যায্যভাবে বণ্টিত হবে এবং প্রত্যেকে মর্যাদা ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে ইউনূস বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং উন্নতির যৌথ স্বপ্নের ওপর। অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী জাম্ব্রি আবদুল কাদির ও ইউকেএমের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক সুফিয়ান জুসোহ উপস্থিত ছিলেন।

সহজ ও স্মার্ট সমাধান ওয়‍্যারলেস চার্জিং

মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ, ইয়ারফোন, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ডিভাইসগুলো চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে চার্জিং প্রযুক্তি। তবে তারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চার্জ দেওয়া অর্থাৎ তারযুক্ত চার্জিং ব্যবস্থায় অনেক অস্বস্তি এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই প্রযুক্তি বিশ্বে ‘ওয়্যারলেস চার্জিং’ বা তারবিহীন চার্জিং একটি নতুন দিগন্ত খুলেছে, যা আধুনিক ব্যবহারকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য এবং কার্যকারিতার সমাধান নিয়ে এসেছে।

ওয়্যারলেস চার্জিং মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বিদ্যুৎ তার বা কেবল ছাড়াই ডিভাইসে সরবরাহ করা হয়। এটি প্রধানত দুটি পদ্ধতিতে কাজ করে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশন ও রিজোন্যান্ট কন্ডাক্টিভ পাওয়ার ট্রান্সফার (Resonant Conductive Power Transfer)।

ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশনে চার্জার (ট্রান্সমিটার) এবং ডিভাইসের মধ্যে বিদ্যুতের চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়। চার্জার থেকে উৎপন্ন চুম্বকীয় শক্তি ডিভাইসের রিসিভার কুণ্ডলিতে ধরা পড়ে এবং বিদ্যুৎ শক্তিতে পরিণত হয়। এই পদ্ধতিতে চার্জিং হয় সীমিত দূরত্বে (সাধারণত ৪-৫ সেন্টিমিটার)।রিজোন্যান্ট কন্ডাক্টিভ পদ্ধতিতে আরও বড় দূরত্বে (১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত) চার্জ ট্রান্সফার করা সম্ভব, যা উন্নত ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করছে।

ওয়্যারলেস চার্জিং সাধারণত Qi স্ট্যান্ডার্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। Qi স্ট্যান্ডার্ড একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, যা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি নিরাপদ, দক্ষ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য।

সাধারণ ওয়্যারলেস চার্জারগুলোতে একটি ট্রান্সমিটার কুণ্ডলী থাকে, যেটি বৈদ্যুতিক শক্তি থেকে চুম্বকীয় শক্তি তৈরি করে। ব্যবহারকারীর ডিভাইস যখন চার্জারের ওপর বা কাছাকাছি রাখা হয়, তখন ডিভাইসে থাকা রিসিভার কুণ্ডলী সেই শক্তি গ্রহণ করে বিদ্যুতের রূপান্তর ঘটায়।

ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের সুবিধা তার ছাড়াই চার্জ করা যায়, তাই জটিল তার ব্যবস্থাপনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। চার্জিং পোর্টের ঘষাঘষি কম হওয়ায় ডিভাইসের পোর্ট নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম। চার্জারের ব্যবহারে কম ক্ষতি হয় পরিবেশে কারণ তার কম ব্যবহারের ফলে ইলেকট্রনিক বর্জ্যও কম হয়।

অসুবিধা হলো তারযুক্ত চার্জিংয়ের তুলনায় ওয়্যারলেস চার্জিং কম দক্ষ, যার ফলে চার্জ হওয়ার সময় বেশি লাগে। বর্তমানে অধিকাংশ ওয়্যারলেস চার্জার খুব কাছাকাছি থাকতে হয়, দূরত্ব বেশি হলে চার্জ হয় না। চার্জিংয়ের সময় ডিভাইসের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

গত দশকে ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তি ব্যাপক উন্নত হয়েছে। স্মার্টফোন নির্মাতারা যেমন অ্যাপল, স্যামসাং, গুগল ইত্যাদি কোম্পানি তাদের ডিভাইসগুলোতে Qi স্ট্যান্ডার্ডের ওয়্যারলেস চার্জিং সিস্টেম যুক্ত করেছে। এছাড়াও স্মার্টওয়াচ, ইয়ারফোন, ব্লুটুথ স্পিকারসহ অন্যান্য গ্যাজেটেও এই প্রযুক্তি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে।

বাংলাদেশেও এখন ওয়্যারলেস চার্জার পাওয়া যায় এবং ধাপে ধাপে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। দেশে কিছু প্রতিষ্ঠানও নিজস্ব ওয়্যারলেস চার্জিং ডিভাইস তৈরি ও বিক্রয় করছে।

গবেষকরা এখন আরও দীর্ঘ দূরত্বে চার্জিং এবং দ্রুত চার্জিংয়ের দিকে কাজ করছেন। পাশাপাশি, “ওয়্যারলেস পাওয়ার নেটওয়ার্ক” তৈরির চিন্তাও চলছে, যেখানে পুরো ঘর বা অফিসে তারবিহীনভাবে যন্ত্রপাতি চার্জ হবে। তবে এর সাথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন, শক্তির অপচয় কমানো, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে মানসম্মত সামঞ্জস্যতা তৈরি করা।

বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরও কঠোর করলো ভারত

ভারত বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য আমদানিতে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বৈদেশিক বাণিজ্য মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফটি) সোমবার (১১ আগস্ট) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ভারতের ব্যবসায়ীরা এখন থেকে বাংলাদেশ থেকে চার ধরনের পাটপণ্য স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করতে পারবেন না। এসব পণ্য শুধু মুম্বাইয়ের নাভা শেবা সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি করা যাবে।

নতুন বিধিনিষেধের আওতায় যে চার ধরনের পাটপণ্য বন্ধ হয়েছে, তা হলো: ব্লিচড ও আনব্লিচড বোনা কাপড় (জুট ও অন্যান্য বাস্ট ফাইবার), জুটের টুইন, কর্ডেজ, রশি, টুইন, কর্ডেজ, রশি ও কেবল, এবং জুটের বস্তা ও ব্যাগ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই পণ্যগুলো বাংলাদেশ থেকে ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা যাবে না, শুধু সমুদ্রপথে মুম্বাইয়ের নাভা শেবা বন্দর ব্যবহৃত হবে। আগের ২৭ জুনের বিজ্ঞপ্তির অন্যান্য শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে এবং এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব পণ্যের মাত্র ১ শতাংশ সমুদ্রপথে রফতানি হয়, বাকিটা প্রায় পুরোপুরি স্থলপথে চলে। তাই নতুন বিধিনিষেধ কার্যত সহজ ও প্রচলিত রফতানি পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

এর আগে ২৭ জুন ভারত কাঁচা পাট, পাটের রোল, সুতা ও বিশেষ ধরনের কাপড়ের স্থলপথ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। ১৭ মে ভারতে পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক, কাঠের আসবাব, সুতা, ফল ও পানীয়সহ বিভিন্ন পণ্যের স্থলপথ আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এছাড়া ৯ এপ্রিল কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির সুবিধাও প্রত্যাহার করে ভারত।

বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়েছে ১৫৭ কোটি ডলারের পণ্য, যা মোট রফতানির মাত্র ৩.৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য, যার বড় অংশ শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য।

ভারতের বাণিজ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশটি থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় তুলা এবং সুতা। এছাড়া খাদ্যশস্য, খনিজ ও জ্বালানি পণ্য, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পণ্য ও সেবা আমদানিও রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই নতুন বিধিনিষেধের ফলে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রফতানি বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং পাট খাতের ব্যবসায়ীরা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন। এ ছাড়া ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন আরবদের অবদান ছাড়া ইউরোপের রেনেসাঁ অসম্ভব ছিল?

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মধ্যযুগীয় ইউরোপের সংস্কৃতিতে আরবদের প্রভাব ছিল গভীর ও বহুমুখী। ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনে আরব বংশধরদের অবদান অনস্বীকার্য। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা, দর্শন, সাহিত্য, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা – প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল।

অষ্টম শতাব্দীতে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে আরবদের প্রত্যক্ষ প্রবেশ ঘটে। এই অঞ্চলটি তখন আল-আন্দালুস নামে পরিচিত হয় এবং প্রায় আট শতাব্দী ধরে মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল। স্পেনের কর্ডোবা, সেভিল, গ্রানাডার মতো শহরগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সময় ইউরোপের অন্যান্য অংশের তুলনায় আল-আন্দালুসে জ্ঞানচর্চা অনেক এগিয়ে ছিল। কর্ডোবার গ্র্যান্ড লাইব্রেরি ছিল সে সময়ের বৃহত্তম জ্ঞানভাণ্ডারগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে হাজার হাজার বই সংরক্ষিত ছিল।

এই সময়কালে আরব বংশধররা শুধুমাত্র শাসক হিসেবেই নয়, বরং জ্ঞান ও সংস্কৃতির বাহক হিসেবেও কাজ করেছেন। তারা প্রাচীন গ্রিক, রোমান, ভারতীয় ও পারস্যের জ্ঞানকে সংরক্ষণ, অনুবাদ ও সম্প্রসারণ করেছেন। এই জ্ঞান পরবর্তীতে লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

মধ্যযুগীয় ইউরোপে আরব বংশধরদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। আরবরা ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতিকে ইউরোপে নিয়ে আসে। শূন্যের ধারণা, যা ছাড়া আধুনিক গণিত অচল, তা আরবদের মাধ্যমেই ইউরোপে প্রবেশ করে। বীজগণিত (Algebra) শব্দটি আরবি “আল-জাবর” (al-jabr) থেকে এসেছে এবং এর উদ্ভাবনে মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমির অবদান অপরিসীম।

আরব জ্যোতির্বিদরা গ্রিক জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞানকে আরও উন্নত করেন। তারা নতুন নতুন যন্ত্র, যেমন অ্যাস্ট্রোল্যাব (Astrolabe) তৈরি করেন, যা দিক নির্ণয় ও সময় গণনার জন্য ব্যবহৃত হত। টলেমির “আলমাজেস্ট” (Almagest)-এর আরবি অনুবাদ ইউরোপে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার পথ খুলে দেয়।

মধ্যযুগে আরবরা চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছিল। ইবনে সিনা (Avicenna) রচিত ‘কানুন ফি আল-তিব্ব’ (Canon of Medicine) গ্রন্থটি বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপের মেডিকেল কলেজগুলোতে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হত। এর মধ্যে রোগ নির্ণয়, সার্জারি, ফার্মাকোলজি এবং চিকিৎসার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ছিল। আরবরা হাসপাতাল (Bimaristan) প্রতিষ্ঠার ধারণা দেয়, যেখানে রোগীদের যত্ন নেওয়া হত এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।

আরবরা গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল-এর হারিয়ে যাওয়া দর্শনকে পুনরায় ইউরোপের কাছে তুলে ধরে। ইবনে রুশদ (Averroes), যাকে ইউরোপে Averroes নামে ডাকা হয়, অ্যারিস্টটলের কাজের উপর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও টীকা লিখেছিলেন। তার কাজ লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপীয় দার্শনিকদের চিন্তাধারায় বিপ্লব ঘটায়। টমাস অ্যাকুইনাস-এর মতো বিখ্যাত দার্শনিকরাও ইবনে রুশদের ব্যাখ্যা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

সাহিত্যের ক্ষেত্রেও আরবদের প্রভাব দেখা যায়। আরব্য রজনীর মতো গল্পগুলো ইউরোপীয় সাহিত্যে নতুন ধরনের বর্ণনার জন্ম দেয়। আরব বংশধরদের প্রেমের কবিতা ও সঙ্গীত ইউরোপীয় ট্রুবাডোর (Troubadour) কবিতার জন্ম দিয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।

কৃষিক্ষেত্রে আরবদের অবদান ছিল অপরিসীম। তারা জলসেচ পদ্ধতি নোরিয়া (Noria)-এর মাধ্যমে মরুভূমির মতো শুষ্ক অঞ্চলেও চাষাবাদ সম্ভব করে তোলে। কমলা, লেবু, ধান, তুলার মতো নতুন নতুন ফসল তারা ইউরোপে নিয়ে আসে। এই কৃষি বিপ্লব ইউরোপের খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, কাগজ তৈরির কৌশল চীন থেকে আরবদের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ করে। এর ফলে বই মুদ্রণ ও জ্ঞান বিতরণ সহজ হয়ে যায়, যা রেনেসাঁর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাছাড়া, বস্ত্রশিল্প, চামড়ার কাজ, গালিচা তৈরি, এবং ধাতুশিল্পে আরবদের উন্নত কৌশল ইউরোপীয় কারিগরদের প্রভাবিত করে।

আল-আন্দালুসের স্থাপত্য ইউরোপীয় স্থাপত্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। স্পেনের আলহাম্বরা প্রাসাদ ও কর্ডোবার গ্র্যান্ড মসজিদ আরব-ইসলামিক স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জ্যামিতিক প্যাটার্ন, অলঙ্কৃত খিলান, এবং রঙিন টাইলসের ব্যবহার ইউরোপীয় স্থাপত্যকে নতুন মাত্রা দেয়। এমনকি ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায় “মোগাদর” (Mogador), “খালিফা” (Caliph) এবং “তারিফ” (Tariff) এর মতো অনেক শব্দ এসেছে আরবি ভাষা থেকে।

মধ্যযুগীয় ইউরোপে আরব বংশধরদের ভূমিকা কেবল জ্ঞান ও সংস্কৃতির বাহক হিসেবেই ছিল না, বরং তারা ছিলেন উদ্ভাবক ও অগ্রদূত। তাদের মাধ্যমে গ্রিক, রোমান, ভারতীয় ও পারস্যের জ্ঞান ইউরোপে ফিরে আসে এবং রেনেসাঁর ভিত্তি তৈরি হয়। বিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা, দর্শন, সাহিত্য, কৃষি ও স্থাপত্যের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদান ইউরোপের আধুনিক রূপরেখা গঠনে সহায়তা করে। আল-আন্দালুস ছিল একটি জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন, যা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। দুর্ভাগ্যবশত, এই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানবসভ্যতার অগ্রগতি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও জাতি একে অপরের কাছে ঋণী। আরব বংশধরদের এই উজ্জ্বল অধ্যায় মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

এনাক্সোগোরাস – প্রাচীন গ্রীক দর্শনে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের সূচনা

প্রাচীন গ্রিক দর্শন দর্শনশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের জন্মভূমি হিসেবে খ্যাত। সেই সময়ে বিশ্ব ও প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টা ছিল দর্শনের মূল উদ্দেশ্য। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের আনক্সাগোরাস এই প্রাচীন দর্শকদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট দার্শনিক, যিনি তাঁর ‘নূন্যাংশ’ বা হোমিওমেরিস (Homoeomeries) তত্ত্বের মাধ্যমে প্রাকৃতিক বস্তু ও ঘটনাবলী ব্যাখ্যার এক নতুন ধারা স্থাপন করেন। এই তত্ত্ব প্রাচীন দর্শনে পদার্থ ও পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে, যা পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক চিন্তার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

আনক্সাগোরাস ছিলেন ইওনীয় প্রাক-সোফিস্টিক দার্শনিক, যিনি প্রকৃতির নানা জটিলতাকে একক তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। তার পূর্বসূরীরা যেমন হেরাক্লিটাস ‘পরিবর্তন’ ও পারমেনিডিস ‘অপরিবর্তনীয়তা’ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, আনক্সাগোরাস সেই দুই পরিপন্থী ধারণার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির সব বস্তুই বিভিন্ন ছোট ছোট অংশ থেকে গঠিত এবং এই অংশগুলোর পরিবর্তনই প্রকৃতির পরিবর্তন।

‘হোমিওমেরিস’ শব্দের অর্থ ‘সমজাতীয় অংশ’ বা ‘নূন্যাংশ’। আনক্সাগোরাস দাবি করেছিলেন যে, একটি বস্তু তার অংশবিশেষের বৈশিষ্ট্যের সাথে একই রকম গঠিত। অর্থাৎ যেকোনো পদার্থকে যতো ছোট ছোট অংশে ভাগ করো, প্রতিটি অংশ তার পুরো বস্তুর মতোই গুণাবলী বহন করে।

যদি একটি সাদা বস্তু থাকে, তার প্রতিটি নূন্যাংশও সাদা। এই ধারণাটি ‘নূন্যাংশ’ তত্ত্ব নামে পরিচিত। তিনি বলেন, সমস্ত বস্তু বিভিন্ন প্রকার নূন্যাংশের সমষ্টি। পৃথিবী, জল, বাতাস, আগুন এগুলো আলাদা না, বরং একসাথে মিশ্রিত নূন্যাংশের ভিন্ন ভিন্ন অনুপাত। তাই কোনো বস্তু সম্পূর্ণভাবে অন্য বস্তুর থেকে আলাদা নয়, বরং এতে মিশ্রিত থাকে সকল বস্তুর নূন্যাংশ। তবে যে নূন্যাংশ বেশি থাকবে, সেটির বৈশিষ্ট্য বহুলাংশে প্রকাশ পাবে।

আনক্সাগোরাস শুধু পদার্থের অংশ নিয়ে আলোচনা করেননি; তিনি ‘নূস’ ধারণাও প্রবর্তন করেন। নূস অর্থাৎ মন বা বুদ্ধি, যা সকল জটিল প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি এক প্রকার স্বতন্ত্র, অদৃশ্য শক্তি যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমন্বয় সাধন করে। এই নূস তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি প্রাচীন দর্শনে প্রথম বারে একটি অদৃশ্য বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতি দাবি করেন, যা বস্তুগত বিশ্বকে পরিচালনা করে।

আনক্সাগোরাসের ‘নূন্যাংশ’ ধারণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের অ্যাটম তত্ত্বের পূর্বসূরী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও তাঁর ধারণা পরিপূর্ণ নয়, তবে ছোট ছোট অদৃশ্য অংশের মাধ্যমে বস্তুর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে ‘অ্যাটম’ হলো অপরিবর্তনীয় মৌলিক কণা, যাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা যায় না। আনক্সাগোরাসের হোমিওমেরিস তত্ত্বের ক্ষেত্রে অংশগুলো এখনও একই রকমের গুণাবলী বহন করে, যা পরবর্তীতে অ্যাটম ধারণার সাথে পার্থক্য তৈরি করে। তবুও বস্তুকে একক ছোট অংশে ভাগ করার ভাবনাটি তাঁর যুগের জন্য যথেষ্ট এগিয়ে ছিল।

এর সঙ্গে আনক্সাগোরাসের ‘নূস’ ধারণা কসমোলজি এবং বিজ্ঞান দর্শনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। আধুনিক বিজ্ঞানে ‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ বা ‘স্মার্ট ডিজাইনার’ বিষয়টি অনেক বিতর্কিত হলেও, নূসের ধারণা প্রাচীন বিশ্বব্যবস্থার পরিচালনাকারী বুদ্ধিমত্তার রূপক হিসেবে ভাবা যেতে পারে।

আনক্সাগোরাসের তত্ত্বকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, তিনি বস্তুগত জগৎকে মৌলিক উপাদানে ভাগ করে তার গঠন বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। এই ধারা পরবর্তীকালে ডেমোক্রিটাসের অ্যাটম তত্ত্ব ও নিউটনের পদার্থবিজ্ঞানে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

তবে পার্থক্যও আছে। আনক্সাগোরাস মনে করতেন নূন্যাংশ অনন্ত ভাগযোগ্য, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান মনে করে মৌলিক কণাগুলো অপরিবর্তনীয়। তবুও তার তত্ত্ব প্রাচীন পর্যায়ে পদার্থের গঠন ও পরিবর্তন বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আনক্সাগোরাসের ‘নূন্যাংশ’ তত্ত্ব সমালোচনার থেকেও মুক্ত ছিল না। পারমেনিডিস ও প্লেটো তাঁর তত্ত্বকে নিরুৎসাহিত করেছেন। প্লেটো মনে করতেন প্রকৃত বাস্তবতা চিরন্তন এবং অবিনশ্বর, আর নূন্যাংশের মত অতি ক্ষুদ্র ও পরিবর্তনশীল ধারণা তর্কসাপেক্ষ।

তাছাড়া নূন্যাংশ ধারণা অনেক জটিল এবং কিছুটা বিমূর্ত হওয়ায় তার সঠিক প্রমাণ দেওয়া কঠিন ছিল। এ ছাড়া আনক্সাগোরাসের সময় প্রায়শই ধর্মীয় ও পৌরাণিক ব্যাখ্যাগুলো অধিক গ্রহণযোগ্য ছিল, তাই তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলো কম জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

আনক্সাগোরাসের দার্শনিক ভাবনা প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞান ও দর্শনের ধারাকে প্রভাবিত করে। তাঁর কাজ প্লেটো, অ্যারিস্টটল ও পরবর্তীকালের প্রাচীন বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বিশেষত পদার্থের মৌলিক গঠন এবং বিশ্বের স্বাভাবিক নিয়মের প্রতি তার মনোযোগ আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মের পথে সহায়ক ছিল। আধুনিক যুগে তাঁর তত্ত্বগুলো অনেকাংশে বদলে গেলেও, মৌলিকভাবে ছোট ছোট উপাদানের মাধ্যমে জগতকে বিশ্লেষণ করার ধারাটাই আজকের পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।

আনক্সাগোরাসের ‘নূন্যাংশ’ (Homoeomeries) তত্ত্ব প্রাচীন গ্রিক দর্শনে পদার্থ ও প্রকৃতির পরিবর্তন বোঝার জন্য এক যুগান্তকারী ধারণা ছিল।ছোট ছোট সমজাতীয় অংশের মাধ্যমে বস্তুর গঠন ব্যাখ্যার চেষ্টা এবং অদৃশ্য ‘নূস’ বা বুদ্ধির ধারণা তার বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তাধারাকে অনন্য করে তোলে। তত্ত্বটি পরিপূর্ণ নয় এবং তার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এটি প্রাচীন দর্শনে বিজ্ঞানের সূচনা ও বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আধুনিক বিজ্ঞান যখন বস্তুগত জগতকে ছোট কণার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করে, তখন আনক্সাগোরাসের হোমিওমেরিস তত্ত্ব তার প্রাথমিক প্রভাবকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই চিন্তাধারাটি আমাদের বোঝায়, কীভাবে মানুষের কৌতূহল ও বুদ্ধিমত্তা যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনের এক অবিচ্ছিন্ন ধারা সৃষ্টি করেছে।

বিআইজিডির জরিপ – ৪৮.৫০ শতাংশ ভোটার কাকে ভোট দেবেন এই প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ত

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-এর ‘পালস সার্ভে ৩’-এর জরিপে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন, এই প্রশ্নে সিদ্ধান্তহীন মানুষের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮.৫০ শতাংশ, যা গত বছরের অক্টোবরে ছিল ৩৮ শতাংশ। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তায়ও ভাটা পড়েছে। এই জরিপটি গত ১ থেকে ২০ জুলাই, ২০২৫ তারিখে দেশের ৫ হাজার ৪৮৯ জন মানুষের ওপর পরিচালিত হয়।

জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি যে তারা কাকে ভোট দেবেন। এই হার আট মাসের ব্যবধানে ১০.৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ১৪.৪০ শতাংশ মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম জানাতে চাননি এবং ১.৭০ শতাংশ মানুষ ভোট না দেওয়ার কথা বলেছেন। এই বিশাল সংখ্যক সিদ্ধান্তহীন ও অনাগ্রহী ভোটার দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

জরিপে রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তার চিত্রও উঠে এসেছে। আট মাস আগে ১৬.৩০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা বললেও, বর্তমানে এই হার কমে ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনও ১১.৩০ শতাংশ থেকে কমে ১০.৪০ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থন ২ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ২.৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।

ক্ষমতাসীন দল (যদিও বর্তমানে নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগের সমর্থন ৮.৯০ শতাংশ থেকে কমে ৭.৩০ শতাংশ হয়েছে। অন্যান্য দল, যেমন জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য ইসলামি দলের সমর্থনও কমেছে। তবে কোন দলের প্রার্থী জিতবে বলে মনে করেন, এই প্রশ্নের উত্তরে ৩৮ শতাংশ মানুষ বিএনপির কথা বলেছেন, যা তাদের মাঠ পর্যায়ে এখনো শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ৪২ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশ রাজনৈতিকভাবে সঠিক পথে এগোচ্ছে, যা গত বছরের অক্টোবরের ৫৬ শতাংশের তুলনায় কম। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ কিছুটা বেড়েছে, ৪৩ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমের প্রতি জনগণের সমর্থন কিছুটা কমেছে, তাদের কাজের মূল্যায়নে গত অক্টোবরে ৬৮ শতাংশ নম্বর দিলেও এখন তা কমে ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ মানুষ ভালোভাবে সংস্কার করার পর নির্বাচন চান। ১৭ শতাংশ মানুষ কিছু জরুরি সংস্কার করে নির্বাচন চান এবং ১৪ শতাংশ মানুষ সংস্কার বাদ দিয়ে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোর মধ্যে ৩০ শতাংশ মানুষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ১৬ শতাংশ আইন ও বিচার ব্যবস্থার উন্নতি এবং ১৭ শতাংশ দুর্নীতি দমনের কথা বলেছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে ৩২ শতাংশ মানুষ ফেব্রুয়ারী নয়, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চান।

বিআইজিডির এই জরিপ থেকে স্পষ্ট যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জনগণ এখনো দ্বিধাগ্রস্ত। সিদ্ধান্তহীনতার হার বৃদ্ধি এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন হ্রাস প্রমাণ করে ভোটাররা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্ক বার্তা। জনগণের আস্থা ও সমর্থন পুনরুদ্ধারে দলগুলোকে তাদের কৌশল ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।