Home Blog Page 33

২০শ ও ২১শ শতাব্দীর উদ্বাস্তু সংকট, কীভাবে যুদ্ধ আর জলবায়ু মানুষের পরিচয় কেড়ে নিচ্ছে?

ইতিহাসের পাতায় মানবজাতির সবচেয়ে করুণ এবং যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাস্তুচ্যুতি ও উদ্বাস্তু সংকট। ২০শ এবং ২১শ শতকে এই সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় বিভাজন, যুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য এর মূল কারণ।

২০শ শতাব্দী মূলত দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং অসংখ্য আঞ্চলিক সংঘাতের সাক্ষী। এই সময়কালের উদ্বাস্তু সংকটের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এই যুদ্ধগুলো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। পুরনো সাম্রাজ্যগুলো ভেঙে নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই পরিবর্তনের ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজ নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর গ্রিক, আর্মেনিয়ান এবং তুর্কিদের মধ্যে ব্যাপক জাতিগত সংঘাত শুরু হয়, যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। এর ফলে, নান্সেন পাসপোর্ট নামক একটি আন্তর্জাতিক দলিল তৈরি করা হয়, যা রাষ্ট্রহীন উদ্বাস্তুদের চলাচলে সহায়তা করে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু ব্যবস্থাপনার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। নাৎসি জার্মানির হলোকাস্টের ফলে ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হয় হত্যা করা হয়, নয়তো দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। যুদ্ধের শেষে, জার্মানি, পোল্যান্ড এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে জাতিসংঘ (United Nations) গঠিত হয় এবং ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশন (Refugee Convention) তৈরি হয়। এই কনভেনশন উদ্বাস্তুদের আইনি সুরক্ষা প্রদান করে এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায় – যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন-নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক। স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় অসংখ্য সংঘাত শুরু হয়।

১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। এই সময় স্বাধীনতার আন্দোলন এবং নতুন জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া তীব্র আকার ধারণ করে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন অনেক সময় জাতিগত এবং রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দেয়। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়, যা আজও বিশ্বের অন্যতম বড় উদ্বাস্তু সংকট হিসেবে পরিচিত।

ভিয়েতনামের যুদ্ধ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন, এবং বিভিন্ন লাতিন আমেরিকান দেশে গৃহযুদ্ধের কারণে প্রচুর মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষে ‘বোট পিপল’ নামে পরিচিত ভিয়েতনামের শরণার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। এই সময়কালে শরণার্থী সংকট আর কেবল ইউরোপের সমস্যা ছিল না, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নেয়।

২১শ শতাব্দীতে উদ্বাস্তু সংকটের কারণগুলো আরও জটিল হয়েছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এখন বাস্তুচ্যুতির নতুন কারণ।

২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। এই যুদ্ধগুলো লক্ষ লক্ষ আফগান ও ইরাকিকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। বিশেষ করে, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে, যা সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেনে ব্যাপক মানবিক সংকটের জন্ম দেয়।

২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ২১শ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু সংকটের জন্ম দিয়েছে। প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ সিরীয় নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যার মধ্যে ৬০ লক্ষের বেশি শরণার্থী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। জার্মানি, সুইডেন, এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এর ফলে ইউরোপে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা বেড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন একটি নতুন ধরনের উদ্বাস্তু সংকট তৈরি করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল, প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এবং আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলের মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। জলবায়ু শরণার্থী (Climate refugees) নামক এই নতুন শ্রেণি আন্তর্জাতিক আইনে এখনো সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি, যা তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

২০শ ও ২১শ শতাব্দীর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উদ্বাস্তু সংকট একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবিক সংকট। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই সংকট মোকাবিলায় নিরন্তর কাজ করে গেলেও এর মূল কারণগুলো এখনো সমাধান করা সম্ভব হয়নি।

ভবিষ্যতে এই সংকট আরও বাড়তে পারে। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান জাতিগত সংঘাত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নতুন নতুন উদ্বাস্তু সংকটের জন্ম দেবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শরণার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো। আমাদের মনে রাখতে হবে, উদ্বাস্তু সংকট কোনো একটি দেশের একক সমস্যা নয়, এটি মানবজাতির সম্মিলিত সংকট। এই সংকট সমাধানে প্রতিটি দেশ এবং ব্যক্তির দায়িত্ব রয়েছে। সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতা দিয়েই কেবল এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন : ট্রাম্প-মোদীর ‘বন্ধুত্ব’ নষ্টের নেপথ্যে গরুর দুধ?

ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের ওপর ক্ষুব্ধ, কারণ তারা রাশিয়া থেকে তেল কিনছে। তবে দেশটির ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের ৫০ শতাংশ শুল্কারোপের কারণ কেবল ভূরাজনীতি নয়। কৃষি এবং দুগ্ধখাতই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের আলোচনায় সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়।

আর কৃষি নিয়ে তো রীতিমতো লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পরদিন গত ৭ আগস্ট তিনি বলেন–ভারত কখনোই কৃষক, দুগ্ধশিল্প ও জেলেদের স্বার্থে আপস করবে না।

ভারত এখন দুগ্ধশিল্পের এক পরাশক্তি। প্রায় তিন দশক ধরে দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম দুধ উৎপাদক, যা এখন বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ করে।

ভারতের সমবায়গুলো কৃষকদের দুধ কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় এবং দাম বাড়লে বোনাস দেয়। কিছু সমবায় জাতীয় পর্যায়ে বড় ব্র্যান্ডেও পরিণত হয়েছে—যেমন গুজরাটের আমুল।

তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ ভারতের বাণিজ্য অংশীদারদের দৃষ্টিতে এই শিল্পই ভারতের সমস্যার কারণ। এটি ভর্তুকিনির্ভর, দূষণকারী (মিথেন নির্গমন) এবং উচ্চ শুল্ক ও জটিল অশুল্ক বাধায় বেষ্টিত।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। গত মাসে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের আগের আলোচনায়ও এটি ছিল সবচেয়ে জটিল ইস্যুগুলোর একটি।

ভারতে প্রায় ২০ কোটি গবাদিপশুর মধ্যে ৬ কোটি ২০ লাখ দুধের গরু—গড়ে প্রতিটি খামারে ৪টিরও কম, আর জমি মাত্র এক হেক্টর। প্রায় ৮ কোটি পরিবার এক বা একাধিক গরু/মহিষ পোষে। তুলনায়, যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে মাত্র ২৪ হাজার দুগ্ধ খামার, কিন্তু প্রতিটি খামারে গরু গড়ে ৩৯০টি।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও ভারতীয় গরু ও কৃষকদের উৎপাদনশীলতা অপ্রতুল। গড়ে একটি মার্কিন গরু ভারতীয় গরুর চেয়ে সাতগুণ বেশি দুধ দেয়।

ভারত দুগ্ধচাষিদের সুরক্ষায় আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে—মাখন ও চিজে ৪০ শতাংশ, গুঁড়োদুধে ৬০ শতাংশ। ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে যে শুল্ক বাসিয়েছেন, এটি তার কাছাকাছি। ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই সুরক্ষা না থাকলে ভারতের ক্ষুদ্র খামারগুলো ধসে পড়বে।

ট্রাম্পের আলোচকরা শুধু শুল্ক নয়, আরও কিছু বিষয়ে আপত্তি করেন। ভারতে ‘নন-ভেজ মিল্ক’ আমদানি নিষিদ্ধ—যেখানে আমদানি করা পণ্যে প্রমাণপত্র দিতে হয় যে গরুকে কোনো পশুজাত খাবার, যেমন-হাড়ের গুঁড়ো খাওয়ানো হয়নি। সমালোচকেরা একে হিন্দু জাতীয়তাবাদের আড়ালে থাকা অশুল্ক বাধা বলেন।

তবে আইনটি প্রথম প্রণীত হয় ২০০৩ সালে, ইউরোপে ‘ম্যাড কাউ’ রোগের আতঙ্কের প্রতিক্রিয়ায়। তবুও, ভারত সরকার কৃষকদের সুরক্ষায় যেকোনো কৌশল ব্যবহার করবে—এ ধারণা পুরোপুরি অমূলক নয়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কৃষি সম্পাদক হরিশ দামোদরন জানান, ভারতীয় কৃষকেরা গত চার বছরে দুবার সংস্কারের প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দিয়েছেন। ২০২১ সালে দিল্লিতে দীর্ঘ আন্দোলনের পর মোদী সরকার তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ট্রাম্প কূটনৈতিক চাপ দিয়ে যে পরিবর্তন আনতে চাইছেন, সেটি সম্ভবত ব্যর্থ হবে।

(জাগো নিউজ২৪ডটকম থেকে)

গ্রিস থেকে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে ইউরোপ

২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, শুষ্ক আবহাওয়া ও প্রবল বাতাস মিলিত হয়ে এক নজিরবিহীন দাবানল সংকট তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশে বন ও ঝোপঝাড়ে ছড়িয়ে পড়া আগুন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করছে না, বরং প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, তুরস্ক, স্পেন, মন্টেনেগ্রো ও আলবেনিয়ায় ইতোমধ্যে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকির একটি জীবন্ত উদাহরণ।

তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল ও এজিয়ান উপকূলে একাধিক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অঞ্চলে প্রচুর পর্যটনকেন্দ্র থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও পর্যটকদেরও সরিয়ে নিতে হয়েছে। অগ্নিনির্বাপক বাহিনী, সেনা ও স্বেচ্ছাসেবকরা মিলিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে প্রবল গরম ও বাতাস আগুন নেভানোর কাজকে জটিল করে তুলছে। কয়েকটি গ্রামে ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

স্পেনের আন্দালুসিয়া ও ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশে গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক বড় দাবানল লেগেছে। খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে গাছপালা ও ঘাস শুকিয়ে গিয়েছে, ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন জরুরি অবস্থা জারি করে কয়েক হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছে। স্পেনের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মন্টেনেগ্রোর উত্তর ও উপকূলীয় পাহাড়ি অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। আগুনের কারণে ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যাচ্ছে, যা শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করছে। স্থানীয় দমকল বাহিনী আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। গ্রিস ও ইতালি থেকে পাঠানো অগ্নিনির্বাপক বিমান ইতোমধ্যে সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। প্রাণহানির পাশাপাশি কৃষি জমি ও পশুপালনও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

আলবেনিয়ায় বিশেষ করে পেট্রেলা ও গ্রামশ অঞ্চলে আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে একটি বিশেষ অগ্নিনির্বাপক দল, হেলিকপ্টার ও সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় ঘন বনাঞ্চল এবং দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে আগুন নেভানোর কাজ ধীরগতিতে চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি গ্রাম আংশিকভাবে পুড়ে গেছে এবং প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক দশকে ইউরোপে এ ধরনের দাবানলের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়ছে । তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘমেয়াদি খরা এবং প্রবল বাতাস এই সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, যদি বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে আগামী বছরগুলোতে এ ধরনের বিপর্যয় আরও ঘন ঘন ও মারাত্মক হবে।

তুরস্ক, স্পেন, মন্টেনেগ্রো ও আলবেনিয়ার এই দাবানল সংকট শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের প্রতিফলন। জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কার্যকর বন ব্যবস্থাপনা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের উদ্যোগ না নিলে, ইউরোপসহ সারা বিশ্বের জন্য এই হুমকি আরও মারাত্মক রূপ নেবে।

আল জাজিরা’র তদন্ত – গাজায় জাতিগত নির্মূল অভিযানে স্থানীয় বেদুইন যোদ্ধাদের ব্যবহার করছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত জুনে এক ভিডিও বার্তায় স্বীকার করেন, তাঁর দেশ গাজার ‘পপুলার ফোর্সেস’ মিলিশিয়াকে অস্ত্র ও সমর্থন দিচ্ছে হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। যদিও তিনি স্পষ্ট করে বলেননি ‘পপুলার ফোর্সেস’ বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন, বিশ্লেষকদের মতে এই গোষ্ঠীর নেতা ইয়াসির আবু শাবাবকে ইসরায়েল সমর্থন দিচ্ছে যেন গাজার জাতিগত নির্মূল অভিযানে একটি ‘ফিলিস্তিনি চেহারা’ ব্যবহার করে নিজেদের দায়মুক্ত করা যায়।

৩১ বছর বয়সী আবু শাবাব গাজার তারাবিন বেদুইন গোত্রের সদস্য। ২০১৫ সাল থেকে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে কারাবন্দী ছিলেন তিনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি আক্রমণ শুরুর পর সুযোগ নিয়ে কারাগার থেকে পালিয়ে যান। মিসরের সিনাই অঞ্চল হয়ে গাজায় মাদক পাচারকারী নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে, যা আইএসআইএল–সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। তবুও ইসরায়েল তাঁর এই পটভূমি আমলে নেয়নি। বরং তাঁকে ব্যবহার করছে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।

যুদ্ধের পরপরই প্রায় ১০০ যোদ্ধা নিয়ে ‘পপুলার ফোর্সেস’ নামে একটি মিলিশিয়া গড়ে তোলেন আবু শাবাব। যদিও তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর আর কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুভাষিক প্রচারণা চালিয়ে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এমনকি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে একটি উপসম্পাদকীয়ও প্রকাশ করেন, যেখানে দাবি করেন গাজার মানুষ আর হামাসকে চায় না। বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁকে গাজার বাইরে থেকেই পরিশীলিত মুখপাত্র হিসেবে সাজানো হয়েছে।

তবে তাঁর নিজ গোত্রই প্রকাশ্যে আবু শাবাবকে পরিত্যাগ করেছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগ এনেছে যা গাজার সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত বিরল ঘটনা। রাফায় ইসরায়েলের আক্রমণের পর তাঁর নাম ছড়াতে শুরু করে। এক মাসের মধ্যে তাঁর গ্যাং গাজার ত্রাণ লুটের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গাজায় প্রবেশ করা প্রতি ১০টি ট্রাকের মধ্যে প্রায় ৯টিই পরিকল্পিতভাবে লুট হয়েছে। শুরুতে ইসরায়েল হামাসকে দায়ী করলেও মানবিক সংস্থাগুলো ও মাঠপর্যায়ের প্রমাণে দেখা যায় এই লুটের নেতৃত্বে ছিলেন আবু শাবাব ও তাঁর দল। জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ নথিতেও তাঁকে পরিকল্পিত ও ব্যাপক লুটপাটের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ বছরের শুরুতে যুদ্ধবিরতির সময় তিনি নিখোঁজ থাকলেও মে মাসে আবার প্রকাশ্যে আসেন, যখন আন্তর্জাতিক চাপে ইসরায়েল সীমিত ত্রাণ ঢুকতে দেয়।বিশ্লেষক মুহাম্মদ শেহাদার মতে, ঠিক সেই সময় থেকেই তিনি ইসরায়েলের অনাহার নীতির মুখপাত্রে পরিণত হন যাতে ইসরায়েল ত্রাণ লুটের দায় এড়াতে পারে এবং নিজের লক্ষ্য সহজে পূরণ করতে পারে।

শুধু ত্রাণ লুট নয়, আবু শাবাবের দল গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নির্মূল পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করছে। মার্কিন নীতি বিশ্লেষক তারিক কেনি শাওয়ার মতে, ইসরায়েল তাঁর মিলিশিয়াকে শক্তিশালী করছে, যাতে তারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প–সদৃশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে ফিলিস্তিনিদের সেখানে আটকে রাখে।গত মাসে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাত্জ ছয় লাখ ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণ গাজার অস্থায়ী শিবিরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যাকে তিনি স্বেচ্ছায় অভিবাসন বলেন। আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আবু শাবাবের দল দক্ষিণ গাজায় স্থাপনা গড়ে তুলছে, যেখানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষকে পরবর্তী সময়ে মিসর বা তৃতীয় দেশে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের গাজার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার এ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং মিসর ইতিমধ্যে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। শেহাদার মতে, ইসরায়েল সরাসরি এসব ক্যাম্প পরিচালনা করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না, তাই তারা আবু শাবাবের মতো একজন ফিলিস্তিনিকে ব্যবহার করছে যিনি আরবি ভাষায় কথা বলেন, ফিলিস্তিনি পতাকা বহন করেন এবং ফিলিস্তিনিদের পোশাক পরেন।

এর পাশাপাশি, আবু শাবাব ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যাতে দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্ত গাজাবাসী তাঁর শিবিরকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ভাবেন। এসব প্রচারণা বাস্তবে ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঠেলে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল গাজার জনগণকে ধাপে ধাপে সরিয়ে দেওয়ার বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ।

সে কলম দিয়ে আমাদের যত ক্ষতি করেছে, অন্যেরা বন্দুক দিয়েও তত করতে পারেনি : ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা হত্যায় জড়িত, ফালাঙ্গে নেতা রামন রুইজ আলোনসো

১৯৩৬ সালের ১৭ আগস্ট ভোর হওয়ার আগ মুহূর্তে একজন মানুষ গাড়ি থেকে নেমে এলেন স্পেনের গ্রানাডা শহরের বাইরে ভিজনার আর আলফাকার শহরকে যুক্ত করা মাটির রাস্তার উপর। তিনি পরেছিলেন সাদা পায়জামা ও তার ওপর একটি ব্লেজার। ঘন বাঁকানো ভ্রু, কপালের মাঝখানে তীক্ষ্ণ চূড়া-আকৃতির টাক পড়া চুল, আর সামান্য ভুঁড়ি যা তাঁর ৩৮ বছরের দেহে বেশ মানিয়েই গিয়েছিল। সেদিন ছিল অমাবস্যা রাত। তিনি একা ছিলেন না, সঙ্গে ছিল পাঁচজন সৈন্য এবং আরও তিনজন বন্দি: দু’জন নৈরাজ্যবাদী বলফাইটার এবং একটি কাঠের পা-ওয়ালা সাদা চুলের এক স্কুলশিক্ষক। দুটি গাড়ির হেডলাইটের আলোয় তারা রাস্তা পেরিয়ে এক জলপাই গাছে ভরা মাঠের দিকে এগোল। সৈন্যদের হাতে ছিল Astra 900 সেমি-অটোমেটিক পিস্তল এবং জার্মান মাউজার রাইফেল। তখন বন্দিরা বুঝে গিয়েছিল তাদের আর ফিরে যাওয়া হবে না। সাদা পায়জামা পরা মানুষটি ছিলেন কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা।

এর ঠিক এক মাস আগে, ৪৩ বছর বয়সী সামরিক অফিসার ফ্রান্সিস্কো ফ্রাঙ্কো স্পেনের নবীন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান শুরু করেছিলেন।ফ্রাঙ্কো তখন স্প্যানিশ মরক্কোতে ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীর কমান্ডার, যেখানে ছিল ৪০,০০০ আফ্রিকানিস্তা সৈন্য, যাদের মধ্যে ছিল কুখ্যাত স্প্যানিশ ফরেন লিজিয়ন। অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বামপন্থী পপুলার ফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করে স্পেনকে তাদের মতে “বাঁচানো” যা আসলে পুরনো রাজতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল শাসন ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।

১৯৩১ সালে সামরিক একনায়ক মিগেল প্রিমো দে রিভেরা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর স্পেনে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়। এর পরের পাঁচ বছরে বামপন্থী সরকার নানা সংস্কার চালু করে মহিলাদের অধিকার বৃদ্ধি, ভূমিহীন কৃষকদের জন্য জমি সংস্কার, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে চার্চের প্রভাব কমানো, আর সেনাবাহিনী সংস্কার করে সামরিক আধিপত্য হ্রাস। এসবের ফলে রক্ষণশীল রাজতন্ত্রী, ক্যাথলিক চার্চ, জমিদার এবং ফ্যাসিস্ট ফালাঙ্গে পার্টির বিরোধিতা তীব্র হয়। ফ্রাঙ্কো এই সব শক্তিকে একত্রিত করে স্পেনকে পুরনো “গৌরবময়” শাসনে ফেরাতে চেয়েছিলেন। তাদের শত্রু তালিকায় ছিলেন লোরকার মতো মানুষও।

লোরকা ১৮৯৮ সালে গ্রানাডার কাছে এক সচ্ছল পরিবারে জন্মান। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী, বিপ্লবী কবি, জনপ্রিয় নাট্যকার এবং পার্টির প্রাণকেন্দ্র। তরুণ সালভাদোর দালি একবার স্বীকার করেছিলেন লোরকার ব্যক্তিত্ব এত প্রভাবশালী ছিল যে ঈর্ষায় তিনি তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। ত্রিশের দশকে লোরকা ছিলেন স্প্যানিশ ভাষার সবচেয়ে প্রিয় কবিদের একজন, যিনি ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে আন্দালুসিয়ার লোকঐতিহ্য—বিশেষত জিপসি সংস্কৃতিকে মিলিয়ে নতুন কবিতার ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। কবি পাবলো নেরুদা বলেছিলেন—“আমি আর কাউকে দেখিনি যার মধ্যে এত সহজতা ও প্রতিভা, পাখির মতো হৃদয় আর ঝরনার মতো স্বচ্ছতা মিলেছে।”

কিন্তু এই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর একাকিত্ব। এক কট্টর সমকামীবিরোধী সমাজে তিনি কখনো নিজের প্রকৃত সত্তা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারেননি। সেই বেদনা তার কবিতা ও নাটকে বিষণ্ণ প্রেম ও ব্যর্থতার ছাপ রেখে যায়। তবুও স্পেন তাকে যতই প্রত্যাখ্যান করুক, লোরকা এই দেশকে তার সমস্ত অন্ধকারসহ ভালোবেসেছিলেন।

লোরকা বলেছিলেন “স্পেনে মৃত্যু শেষ নয়, বরং উন্মুক্ত এক দৃশ্য। অন্য দেশে মৃত্যু এলে পর্দা টেনে দেওয়া হয়, এখানে খুলে দেওয়া হয়।” বুলফাইটিংয়ের ঐতিহ্যকেও তিনি মৃত্যুর এই রোমান্টিক আকর্ষণের অংশ বলেছিলেন। ১৯৩৬ সালের গ্রীষ্মে সেই মৃত্যু শহরের রাস্তায়, গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল গৃহযুদ্ধের রক্তপাতের আকারে।

ফ্রাঙ্কোর সৈন্যরা জার্মান ও ইতালীয় ট্যাঙ্ক- বিমান সহযোগে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়। বিদ্রোহীরা গণহত্যা চালায়, নারী ধর্ষণ করে, সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। ফরেন লিজিয়নের সৈন্যরা নিজেদের ডাকত “মৃত্যুর বরপুত্র” তাদের যুদ্ধধ্বনি ছিল —“মৃত্যু দীর্ঘজীবী হোক!”

গ্রানাডায় যেখানে লোরকা নিরাপদ থাকবেন ভেবেছিলেন সেখানে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়। ২০ জুলাই শহরের নবনির্বাচিত মেয়র তার দুলাভাই গ্রেফতার হন। ফালাঙ্গে গুণ্ডারা লোরকাকে বাড়ির সিঁড়ি থেকে ফেলে দেয়, চাকরকে গাছে বেঁধে পেটায়। ভীত হয়ে লোরকা আশ্রয় নেন বন্ধু কবি লুইস রোসালেস-এর বাড়িতে, যিনি বিদ্রোহী পক্ষের হলেও লোরকাকে রক্ষা করছিলেন।

কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা ঘটে। ১৬ আগস্ট বিকেলে, লোরকার দুলাভাইকে হত্যা করার খবর পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর, রামন রুইজ আলোনসো নামে এক ফালাঙ্গে নেতা ১০০ সৈন্য নিয়ে রোসালেসদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। তিনি বলেন “ও কলম দিয়ে আমাদের যত ক্ষতি করেছে, অন্যেরা বন্দুক দিয়েও তত করতে পারেনি।” লোরকাকে গ্রেফতার করে ভিজনার গ্রামের এক অস্থায়ী কারাগারে নেওয়া হয়। ভোর হওয়ার আগে লোরকা এবং তিন বন্দিকে নিয়ে যাওয়া হয় আলফাকার রাস্তার ধারে জলপাই বাগানে। সৈন্যরা পজিশন নেয়। একজন সৈন্য, যিনি পরে গর্ব করে বলেছিলেন যে লোরকাকে মাথায় গুলি করেছেন। আরেক সৈন্য সারা রাত নার্ভাস ছিলেন, বলছিলেন “এটা আমার জন্য নয়!” তবুও, গুলি ছোড়া হয়। লোরকা মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছিলেন, তারপর একজন সৈন্য কাছ থেকে গুলি করে শেষ করে দেয়।

যেন তাঁরই লেখা কবিতার পংক্তি তাঁর মৃত্যুতে সত্যি হয়ে উঠল—
“কিন্তু এখন সে ঘুমিয়ে আছে চিরদিনের জন্য
শৈবাল আর ঘাস
আস্তে আস্তে খুলে দিচ্ছে
তার খুলির ফুল
আর তার রক্ত গাইছে গান…”

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা নিহত হলেন। কিন্তু স্পেনের গৃহযুদ্ধ তখনও অনেক বাকি।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ১০টি মুদ্রা

মুদ্রার মান কেবল বৈদেশিক লেনদেনের জন্য নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি, রাজনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানের প্রতিফলন। শক্তিশালী মুদ্রা বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করে, আমদানি-রপ্তানি ব্যালান্সকে স্থিতিশীল রাখে এবং জনগণের আস্থা বাড়ায়।

কুয়েতি দিনার: তেল সম্পদ থেকে স্থিতিশীলতা

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে পরিচিত কুয়েতি দিনার। ছোট দেশ হলেও তেল রপ্তানি বিপুল রাজস্ব আনে। মুদ্রার উচ্চ মান দেশটির আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে শক্তিশালী করে। এক কুয়েতি দিনার প্রায় $3.26 মার্কিন ডলারের সমান।

বাহরাইনি দিনার: বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি ও মুদ্রার স্থিতিশীলতা

শক্তিশালী মুদ্রার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে বাহরাইনি দিনার। এক বাহরাইনি দিনার সমান $2.65 মার্কিন ডলার। তেল-নির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি দেশটি তাদের অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে সফল হয়েছে।

ওমানি রিয়াল: রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি

তৃতীয় অবস্থানে আছে ওমানি রিয়াল। এর মূল্য $2.60 মার্কিন ডলার। ওমানও মধ্যপ্রাচ্যের একটি তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ।

জর্ডানি দিনার: সীমিত সম্পদ, উচ্চ মানের চ্যালেঞ্জ

বিশ্বের চতুর্থ শক্তিশালী মুদ্রা হলো জর্ডানি দিনার। একটি জর্ডানি দিনার প্রায় $1.41 মার্কিন ডলারের সমান। দেশটি তেল ও গ্যাস রপ্তানির উপর কম নির্ভরশীল হলেও, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এর মুদ্রাকে শক্তিশালী রেখেছে।

ব্রিটিশ পাউন্ড বিশ্লেষণ:
পঞ্চম স্থানে রয়েছে ব্রিটিশ পাউন্ড, যা ১৫ শতক থেকে প্রচলিত। শতাব্দীকাল ধরে প্রচলিত মুদ্রা হওয়ায় আন্তর্জাতিক আস্থা ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। ঐতিহ্য এবং নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি মুদ্রার স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এক পাউন্ডের মূল্য প্রায় $1.33 মার্কিন ডলার।

জিব্রাল্টার পাউন্ড: ছোট ভূখণ্ড, বড় প্রভাব”

ব্রিটিশ পাউন্ডের পরেই রয়েছে জিব্রাল্টার পাউন্ড। এর মান ব্রিটিশ পাউন্ডের সাথে বাঁধা, তাই এর মূল্যও প্রায় $1.33 মার্কিন ডলার। জিব্রাল্টার হলো স্পেনের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ব্রিটিশ ভূখণ্ড।

সুইস ফ্রাঁ: নিরাপদ বিনিয়োগের মুদ্রা

সুইজারল্যান্ড এবং লিচেনস্টাইনের মুদ্রা সুইস ফ্রাঁ রয়েছে সপ্তম স্থানে। এর মূল্য $1.21 মার্কিন ডলার। সুইজারল্যান্ডের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একে একটি নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে খ্যাতি দিয়েছে।

কেম্যান ডলার ও ইউরো: বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মুদ্রার প্রভাব

কেম্যান ডলার ≈ ১.২০ USD, ইউরো ≈ ১.১৩ USD। আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগে মুদ্রার মান দেশের আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ও বাজারে প্রভাব ফেলে। বিনিয়োগের আস্থা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা এ মুদ্রার শক্তির সূচক।

মার্কিন ডলার: শক্তি, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ

মার্কিন ডলার সবচেয়ে বেশি লেনদেন ও সংরক্ষিত মুদ্রা। বৈশ্বিক তেল, স্বর্ণ ও অন্যান্য পণ্যের দাম নির্ধারণে এটি প্রধান। বিশ্লেষণ দেখায়, এ শক্তিশালী মুদ্রা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নয়, বৈশ্বিক বাজার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারও।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কৃষি খাতকে দখলে নিতে চায় : ফরিদা আখতার, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সম্প্রতি এক সতর্কবার্তায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কৃষি খাতকে দখলে নিতে চাইছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও) এবং তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে কৃষি খাতে প্রবেশ করবে, যা দেশের কৃষি স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বুধবার ঢাকায় প্রেস ইনস্টিটিউটে নাগরিক উদ্যোগ ও পিপলস হেলথ মুভমেন্ট আয়োজিত “বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্ধারণী উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণ ও দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বিষয়ে সতর্ক পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এসব মন্তব্য করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন এবং বক্তব্য দেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ড. মোশাহিদা সুলতানা, ডা. জাহেদ মাসুদ, গওহর নইম ওয়ারা ও সালাউদ্দিন বাবলু। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বরকত উল্লাহ মারুফ এবং কারিগরি বিষয়ে বক্তব্য রাখেন সানিয়া রিড স্মিথ।

ফরিদা আখতার জানান, ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনার প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, তারা কৃষিতে জিএমও আনার জন্য দৃঢ় মনোভাব নিয়েছে। তিনি বলেন, “আমার মন্ত্রণালয় কৃষি মন্ত্রণালয় না হওয়ায় আমি এ বিষয়ে সরাসরি কিছু করতে পারছি না, তবে যে কথাবার্তাগুলো হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র কৃষি খাতকে দখলে নেবে এবং তাদের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্রাজিল ও জাপান যদিও নিজেদের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আলোচনা করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনও শর্ত ঠিক করে, তা মানতেই হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট বা গোপন চুক্তি গ্রহণের বিরোধিতা জানান এবং নাগরিক হিসেবে অসহায় বোধ করছেন।

ফরিদা আখতার বাংলাদেশের মাংস আমদানি বিষয়েও সতর্কবার্তা দেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাংস আমদানি করলে বাজারে গরুর মাংসের দাম কমে ৩০০ টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে ৭০০–৮০০ টাকার মধ্যে। তবে দেশীয় গবাদিপশুর বাজারে এর প্রভাব পড়বে এবং লাখ লাখ খামারি, বিশেষ করে গরীব মহিলা উদ্যোক্তাদের ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, বিদেশি মাংস আমদানিতে জুনোটিক রোগের ঝুঁকিও রয়েছে।

উপদেষ্টা স্বতন্ত্র কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের গুরুত্বে জোর দেন। তিনি বলেন, সাগরের সি উইড ও কুচিয়া রপ্তানিতে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে এবং আমদানি কমাতে দেশীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি জরুরি। এছাড়া এলডিসি উত্তরণের ফলে শুল্ক ও জিএসপি সুবিধার প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সভায় মন্তব্য করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি দ্বিপাক্ষিক গোপন বাণিজ্য চুক্তি জনগণের সামনে প্রকাশ করতো, তবে বাংলাদেশের গোপন চুক্তির প্রথা অনেকাংশে বন্ধ হতো। তিনি এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জোর দেন। ফরিদা আখতার আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশকে স্বতন্ত্র নীতি গ্রহণ করতে হবে, দেশীয় কৃষি ও মৎস্য খাতকে শক্তিশালী করতে হবে এবং বিদেশি প্রভাব থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

পশ্চিমাদের ইতিহাস বিকৃতির আড়ালে, সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রাচীন শিক্ষার ঐতিহ্য

সাব-সাহারান আফ্রিকার ইতিহাস সাধারণত প্রায়ই পশ্চিমা শাসন বা উপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত হয়। তবে এই অঞ্চলে মধ্যযুগ থেকে প্রাচীন শিক্ষার এক উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। এর প্রধান কেন্দ্রগুলোর মধ্যে তিমবকতু (Timbuktu) এবং আলকাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয় (Al-Qarawiyyin University) অন্যতম। এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলো শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, বরং গণিত, নক্ষত্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, আইন এবং সাহিত্যেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।

তিমবকতু বর্তমান মালির মধ্যভূমি অঞ্চলে অবস্থিত, সপ্তম শতাব্দী থেকে এগারো শতকের মধ্যে একটি বাণিজ্যিক ও শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। তিমবকতুর ভৌগলিক অবস্থান সেহেল অঞ্চলের বাণিজ্যিক রুটের সংযোগস্থলে, যা এটিকে স্বর্ণ, লবণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যবাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। বাণিজ্যের এই প্রসার শিক্ষার বিকাশকে সহায়তা করে। সমৃদ্ধ বানিজ্যিক শ্রেণি শিক্ষার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে এবং স্থানীয় সমাজে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করে।

তিমবকতুর শিক্ষার কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুপরিচিত হলো সাঙ্কোরে বিশ্ববিদ্যালয় (Sankore University)। এটি মূলত ইসলামিক শিক্ষার কেন্দ্র ছিল, কিন্তু এখানে কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি তত্ত্বীয় এবং প্রায়োগিক শিক্ষাও প্রদান করা হত। শিক্ষার্থীরা প্রায়শই নক্ষত্রবিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত, আইন এবং দর্শনের মতো বিষয়েও জ্ঞান অর্জন করত। সাঙ্কোরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা হাতের লেখা পাণ্ডুলিপি (manuscripts) অধ্যয়ন করত, যা বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠ্যক্রম এবং জ্ঞান বিনিময়ের একটি মাধ্যম ছিল। এই পাণ্ডুলিপিগুলো আজও তিমবকতুর বিভিন্ন লাইব্রেরি ও সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে।

তিমবকতুর শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষক-শিষ্য সম্পর্ক। শিক্ষার্থীরা প্রায়শই শিক্ষকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করত, প্রশ্নোত্তর ও বিতর্কের মাধ্যমে শিক্ষার গভীরতা অর্জন করত। শিক্ষার এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্য অর্জনে নয়, বরং সমালোচনামূলক চিন্তাশীল হওয়ায়ও সহায়তা করত। তিমবকতুর শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই পশ্চিমা ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যদিও এটির মূল কাঠামো ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত। শিক্ষার প্রসার ও সংরক্ষণের জন্য গ্রন্থাগার এবং পাণ্ডুলিপির ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সাঙ্কোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে ধর্মীয় গ্রন্থের পাশাপাশি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা ও ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থও সংরক্ষিত হতো।শিক্ষার্থীরা এই পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন, অনুবাদ ও কপি করত, যা জ্ঞানকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দিতে সহায়তা করত। এছাড়া পাণ্ডুলিপি বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কাজ করত, যার ফলে তিমবকতুর শিক্ষার প্রভাব আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ত।

অন্যদিকে আলকাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয় মরক্কোর ফেস শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সপ্তম শতকে, আজও বিশ্বের প্রাচীনতম চলমান বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। আলকাওয়িন মুসলিম ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হলেও এখানে সাহিত্য, আইন, গণিত ও নক্ষত্রবিজ্ঞানও পড়ানো হত। এটি একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে শিক্ষার্থীরা আসত। আলকাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী জ্ঞান ও ফিকহ (Sharia Law) শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ও বাণিজ্যিক নীতিরও প্রশিক্ষণ দিত।

তিমবকতু ও আলকাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো পাণ্ডুলিপি ও গ্রন্থাগার। এই দুই শিক্ষাকেন্দ্রই বৃহৎ গ্রন্থাগার পরিচালনা করত, যেখানে ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক এবং সাহিত্যকর্ম সংরক্ষিত হতো। পাণ্ডুলিপি শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করত।শিক্ষার্থীরা এই পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন করত, কপি করত এবং প্রয়োজনে সেগুলো স্থানীয় বা আঞ্চলিক বিদ্যালয়ে বিতরণ করত। এই প্রক্রিয়া জ্ঞান সংরক্ষণ এবং সম্প্রসারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

তিমবকতু ও আলকাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সাব-সাহারান আফ্রিকার শিক্ষার ইতিহাসে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও রাখে। তিমবকতুর শিক্ষাব্যবস্থা স্থানীয় শাসক ও বাণিজ্যিক শ্রেণির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায় ও আইন প্রয়োগে সহায়তা করা হতো।

আলকাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম জ্ঞান ও সামাজিক নৈতিকতার সঙ্গে রাজনীতিকে যুক্ত করেছিল, যা স্থানীয় সমাজে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছিল।

শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি, এই দুই কেন্দ্রের আন্তর্জাতিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। সাঙ্কোরে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আলকাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয় আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত। এটি একটি প্রাচীন আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার উদাহরণ, যা মধ্যযুগীয় ইউরোপের শিক্ষার সঙ্গে তুলনীয়।

আজকের দিনে এই দুই কেন্দ্রের গুরুত্ব শুধু ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। সাঙ্কোরে বিশ্ববিদ্যালয় ও আলকাওয়িনের পাণ্ডুলিপি ও শিক্ষা পদ্ধতি আধুনিক গবেষণা, ইসলামিক স্টাডিজ এবং আফ্রিকান স্টাডিজে অপরিসীম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন, এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলো আফ্রিকান সমাজে শিক্ষার স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যা ঔপনিবেশিক যুগেও প্রভাবিত হয়েছে।

অন্তিমভাবে বলা যায়, সাব-সাহারান আফ্রিকার শিক্ষার ইতিহাস শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান বা স্থানীয় সমাজের সীমাবদ্ধ শিক্ষার গল্প নয়। তিমবকতু ও আলকাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল আন্তর্জাতিক, বহু-বিষয়ক এবং বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষা কেন্দ্র, যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল ধর্মীয় জ্ঞানই অর্জন করত না, বরং বিজ্ঞান, গণিত, আইন ও দর্শনের জ্ঞানও সমানভাবে পেত। এই কেন্দ্রগুলো প্রমাণ করে যে আফ্রিকার ইতিহাস শিক্ষার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ এবং বিশ্বমানের প্রভাবশালী ছিল, যা আধুনিক বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত।

কৃষি ঋণ সরাসরি কৃষকের কাছে যায় কিনা তদারকি করবে – বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষি ঋণ বিতরণ এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, কৃষকরা যাতে নির্ধারিত ঋণ পান এবং তা দালাল বা অনুপযুক্ত উৎসে না যায়, তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদারকি করবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ২.৬৩ শতাংশ বেশি।

গভর্নর জানিয়েছেন, এই ঋণের মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করা, যা জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর জন্য এই অর্থের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকগুলোর জন্য ২৫ হাজার ১২০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও জোর দেন, শতভাগ ঋণ কৃষকের কাছে পৌঁছানো উচিত এবং এটি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার আওতায় থাকবে।

গভর্নর কৃষির সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবদান তুলে ধরে বলেন, দেশে কৃষির অংশগ্রহণ জিডিপিতে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ হলেও কৃষিভিত্তিক খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৪০ শতাংশ। তিনি বলেন, গ্রামীণ মানুষকে শিল্পায়ন ও সেবা খাতে সম্পৃক্ত করা না হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি কৃষিনির্ভর থেকে মুক্ত হয়নি। তবে সামগ্রিক অর্থনীতি এখন আর একেবারে কৃষিনির্ভর নয়।

কৃষি ঋণ আদায়ের নীতিমালা সম্পর্কেও গভর্নর জানান, কৃষকের সুবিধার জন্য ঋণ প্রদানের সময়কাল ও শর্তে কিছু পরিবর্তন বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দেন, যদি একটি শস্য ঘরে উঠতে চার মাস সময় লাগে, তবে অতিরিক্ত দুই মাসের সময় বিবেচনা করে ক্রপ সার্কেল নির্ধারণ করা উচিত। পাশাপাশি সুদ মওকুফের নীতিমালা নিয়ে ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে কৃষি বীমা সম্পর্কেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি জানান, দেশের বর্তমান ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা ও যোগ্যতার কারণে কৃষি বীমা ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে এ খাতের প্রসার তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। তবে কোম্পানিগুলো সক্ষম হলে এটি স্বাগত জানানো হবে।

এছাড়া গভর্নর দেশের আমদানি নীতিতে সরকারের ভুলের বিষয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শস্যের মূল্য বিশ্ববাজারের তুলনায় অতিরিক্ত উচ্চ না হওয়ার জন্য আমদানির প্রক্রিয়াকে আগে থেকেই কার্যকর করা উচিত। তিনি মনে করিয়ে দেন, দাম বেড়ে গেলে পরে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়ে জানতে চাইলে গভর্নর জানান, প্রক্রিয়াটি চলমান আছে। কিছু ব্যাংককে একীভূত করতে হবে এবং এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আমানতকারীদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

সমগ্র বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি ঋণের যথাযথ বিতরণ, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সমন্বয় এবং ব্যাংকিং সেক্টরে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে। কৃষকের স্বার্থ ও দেশের অর্থনৈতিক সুস্থতা নিশ্চিত করাই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য।

সহজ, দ্রুত ও প্রফেশনাল ডিজাইন তৈরির অনলাইন টুল ‘Canva’

ডিজিটাল যুগে গ্রাফিক ডিজাইন এখন আর শুধুমাত্র পেশাদারদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। সহজ, দ্রুত এবং প্রফেশনাল মানের ডিজাইন তৈরি করার জন্য Canva নামক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে বিপ্লব ঘটিয়েছে। ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে প্রতিষ্ঠিত এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত একটি সহজ ও ব্যবহারবান্ধব গ্রাফিক ডিজাইন টুল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। কিন্তু কয়েক বছরেই এটি শিক্ষা, ব্যবসা, মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ব্যক্তিগত প্রোজেক্টের ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

Canva-এর ব্যবহারকারীর জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ইন্টারফেসের সরলতা। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে নতুন ব্যবহারকারীরাও কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রফেশনাল মানের পোস্টার, প্রেজেন্টেশন, সোশ্যাল মিডিয়া গ্রাফিক, লোগো বা ইনফোগ্রাফিক তৈরি করতে পারেন। Canva-এর ড্র্যাগ-অ্যান্ড-ড্রপ ফিচার এবং হাজার হাজার প্রিফ্যাব্রিকেটেড টেমপ্লেট নতুন ডিজাইনারদের জন্য কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে।

দ্বিতীয়ত Canva প্রযুক্তিগত দিক থেকে ক্লাউড-বেসড প্ল্যাটফর্ম। ব্যবহারকারীরা যে কোনো ডিভাইস থেকে লগইন করে তাদের ডিজাইন অ্যাক্সেস, এডিট এবং শেয়ার করতে পারেন। এটি শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা এবং ছোট ব্যবসার জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। এছাড়াও Canva-এর রিয়েল-টাইম কো-অথারিং ফিচার দলীয় কাজকে সহজ করে তোলে, যেখানে একাধিক ব্যবহারকারী একই প্রোজেক্টে একসাথে কাজ করতে পারেন।

Canva-এর বিভিন্ন প্রিমিয়াম ফিচার ও ইন্টিগ্রেশন এটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। এটি ফটো এডিটিং, অ্যানিমেশন, ভিডিও ক্রিয়েশন, এবং ব্র্যান্ড কিট ম্যানেজমেন্টের মতো ফিচার সরবরাহ করে। এছাড়া Canva বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, যেমন ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব, এবং লিঙ্কডইনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে ডিজাইন শেয়ার করার সুবিধা দেয়।

একাডেমিক ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে Canva-এর গুরুত্বও তুলনাহীন। দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা Canva ব্যবহার করে আরও সহজে এবং দ্রুত প্রেজেন্টেশন ও প্রজেক্ট তৈরি করতে পারে। শিক্ষকেরা এটি ব্যবহার করে শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় ভিজ্যুয়াল ইন্টারঅ্যাকশন বৃদ্ধি করতে পারেন। একইভাবে, ছোট ব্যবসায়ী ও মার্কেটিং টিমরা Canva ব্যবহার করে কম খরচে আকর্ষণীয় ব্র্যান্ড কনটেন্ট তৈরি করতে সক্ষম হয়, যা তাদের ডিজিটাল উপস্থিতি শক্তিশালী করে।

তবে Canva-এর কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। উচ্চমানের গ্রাফিক ডিজাইন বা জটিল ভেক্টর আর্ট তৈরির ক্ষেত্রে পেশাদার সফটওয়্যারের মতো ফাংশনালিটি পাওয়া যায় না। এছাড়াও প্রিমিয়াম টেমপ্লেট ও ফিচার ব্যবহারের জন্য সাবস্ক্রিপশন প্রয়োজন, যা সব ব্যবহারকারীর জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

সার্বিকভাবে Canva ডিজিটাল গ্রাফিক ডিজাইনের দুনিয়ায় একটি ক্রান্তিকালীন উদ্ভাবন। এটি প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ব্যবহারকারীদের জন্য ডিজাইন প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত এবং সাশ্রয়ী করেছে। শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার বা সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার যেকোনো প্রফেশনাল বা অ-প্রফেশনাল ব্যবহারকারী Canva-এর সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল পরিবেশে Canva-এর মতো টুলগুলো কেবল সহজতা প্রদান করছে না, বরং ডিজাইনের মান ও সম্ভাবনাকেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিচ্ছে।