১৯৩৬ সালের ১৭ আগস্ট ভোর হওয়ার আগ মুহূর্তে একজন মানুষ গাড়ি থেকে নেমে এলেন স্পেনের গ্রানাডা শহরের বাইরে ভিজনার আর আলফাকার শহরকে যুক্ত করা মাটির রাস্তার উপর। তিনি পরেছিলেন সাদা পায়জামা ও তার ওপর একটি ব্লেজার। ঘন বাঁকানো ভ্রু, কপালের মাঝখানে তীক্ষ্ণ চূড়া-আকৃতির টাক পড়া চুল, আর সামান্য ভুঁড়ি যা তাঁর ৩৮ বছরের দেহে বেশ মানিয়েই গিয়েছিল। সেদিন ছিল অমাবস্যা রাত। তিনি একা ছিলেন না, সঙ্গে ছিল পাঁচজন সৈন্য এবং আরও তিনজন বন্দি: দু’জন নৈরাজ্যবাদী বলফাইটার এবং একটি কাঠের পা-ওয়ালা সাদা চুলের এক স্কুলশিক্ষক। দুটি গাড়ির হেডলাইটের আলোয় তারা রাস্তা পেরিয়ে এক জলপাই গাছে ভরা মাঠের দিকে এগোল। সৈন্যদের হাতে ছিল Astra 900 সেমি-অটোমেটিক পিস্তল এবং জার্মান মাউজার রাইফেল। তখন বন্দিরা বুঝে গিয়েছিল তাদের আর ফিরে যাওয়া হবে না। সাদা পায়জামা পরা মানুষটি ছিলেন কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা।
এর ঠিক এক মাস আগে, ৪৩ বছর বয়সী সামরিক অফিসার ফ্রান্সিস্কো ফ্রাঙ্কো স্পেনের নবীন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান শুরু করেছিলেন।ফ্রাঙ্কো তখন স্প্যানিশ মরক্কোতে ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীর কমান্ডার, যেখানে ছিল ৪০,০০০ আফ্রিকানিস্তা সৈন্য, যাদের মধ্যে ছিল কুখ্যাত স্প্যানিশ ফরেন লিজিয়ন। অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বামপন্থী পপুলার ফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করে স্পেনকে তাদের মতে “বাঁচানো” যা আসলে পুরনো রাজতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল শাসন ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।
১৯৩১ সালে সামরিক একনায়ক মিগেল প্রিমো দে রিভেরা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর স্পেনে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়। এর পরের পাঁচ বছরে বামপন্থী সরকার নানা সংস্কার চালু করে মহিলাদের অধিকার বৃদ্ধি, ভূমিহীন কৃষকদের জন্য জমি সংস্কার, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে চার্চের প্রভাব কমানো, আর সেনাবাহিনী সংস্কার করে সামরিক আধিপত্য হ্রাস। এসবের ফলে রক্ষণশীল রাজতন্ত্রী, ক্যাথলিক চার্চ, জমিদার এবং ফ্যাসিস্ট ফালাঙ্গে পার্টির বিরোধিতা তীব্র হয়। ফ্রাঙ্কো এই সব শক্তিকে একত্রিত করে স্পেনকে পুরনো “গৌরবময়” শাসনে ফেরাতে চেয়েছিলেন। তাদের শত্রু তালিকায় ছিলেন লোরকার মতো মানুষও।
লোরকা ১৮৯৮ সালে গ্রানাডার কাছে এক সচ্ছল পরিবারে জন্মান। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী, বিপ্লবী কবি, জনপ্রিয় নাট্যকার এবং পার্টির প্রাণকেন্দ্র। তরুণ সালভাদোর দালি একবার স্বীকার করেছিলেন লোরকার ব্যক্তিত্ব এত প্রভাবশালী ছিল যে ঈর্ষায় তিনি তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। ত্রিশের দশকে লোরকা ছিলেন স্প্যানিশ ভাষার সবচেয়ে প্রিয় কবিদের একজন, যিনি ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে আন্দালুসিয়ার লোকঐতিহ্য—বিশেষত জিপসি সংস্কৃতিকে মিলিয়ে নতুন কবিতার ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। কবি পাবলো নেরুদা বলেছিলেন—“আমি আর কাউকে দেখিনি যার মধ্যে এত সহজতা ও প্রতিভা, পাখির মতো হৃদয় আর ঝরনার মতো স্বচ্ছতা মিলেছে।”
কিন্তু এই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর একাকিত্ব। এক কট্টর সমকামীবিরোধী সমাজে তিনি কখনো নিজের প্রকৃত সত্তা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারেননি। সেই বেদনা তার কবিতা ও নাটকে বিষণ্ণ প্রেম ও ব্যর্থতার ছাপ রেখে যায়। তবুও স্পেন তাকে যতই প্রত্যাখ্যান করুক, লোরকা এই দেশকে তার সমস্ত অন্ধকারসহ ভালোবেসেছিলেন।
লোরকা বলেছিলেন “স্পেনে মৃত্যু শেষ নয়, বরং উন্মুক্ত এক দৃশ্য। অন্য দেশে মৃত্যু এলে পর্দা টেনে দেওয়া হয়, এখানে খুলে দেওয়া হয়।” বুলফাইটিংয়ের ঐতিহ্যকেও তিনি মৃত্যুর এই রোমান্টিক আকর্ষণের অংশ বলেছিলেন। ১৯৩৬ সালের গ্রীষ্মে সেই মৃত্যু শহরের রাস্তায়, গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল গৃহযুদ্ধের রক্তপাতের আকারে।
ফ্রাঙ্কোর সৈন্যরা জার্মান ও ইতালীয় ট্যাঙ্ক- বিমান সহযোগে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়। বিদ্রোহীরা গণহত্যা চালায়, নারী ধর্ষণ করে, সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। ফরেন লিজিয়নের সৈন্যরা নিজেদের ডাকত “মৃত্যুর বরপুত্র” তাদের যুদ্ধধ্বনি ছিল —“মৃত্যু দীর্ঘজীবী হোক!”
গ্রানাডায় যেখানে লোরকা নিরাপদ থাকবেন ভেবেছিলেন সেখানে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়। ২০ জুলাই শহরের নবনির্বাচিত মেয়র তার দুলাভাই গ্রেফতার হন। ফালাঙ্গে গুণ্ডারা লোরকাকে বাড়ির সিঁড়ি থেকে ফেলে দেয়, চাকরকে গাছে বেঁধে পেটায়। ভীত হয়ে লোরকা আশ্রয় নেন বন্ধু কবি লুইস রোসালেস-এর বাড়িতে, যিনি বিদ্রোহী পক্ষের হলেও লোরকাকে রক্ষা করছিলেন।
কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা ঘটে। ১৬ আগস্ট বিকেলে, লোরকার দুলাভাইকে হত্যা করার খবর পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর, রামন রুইজ আলোনসো নামে এক ফালাঙ্গে নেতা ১০০ সৈন্য নিয়ে রোসালেসদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। তিনি বলেন “ও কলম দিয়ে আমাদের যত ক্ষতি করেছে, অন্যেরা বন্দুক দিয়েও তত করতে পারেনি।” লোরকাকে গ্রেফতার করে ভিজনার গ্রামের এক অস্থায়ী কারাগারে নেওয়া হয়। ভোর হওয়ার আগে লোরকা এবং তিন বন্দিকে নিয়ে যাওয়া হয় আলফাকার রাস্তার ধারে জলপাই বাগানে। সৈন্যরা পজিশন নেয়। একজন সৈন্য, যিনি পরে গর্ব করে বলেছিলেন যে লোরকাকে মাথায় গুলি করেছেন। আরেক সৈন্য সারা রাত নার্ভাস ছিলেন, বলছিলেন “এটা আমার জন্য নয়!” তবুও, গুলি ছোড়া হয়। লোরকা মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছিলেন, তারপর একজন সৈন্য কাছ থেকে গুলি করে শেষ করে দেয়।
যেন তাঁরই লেখা কবিতার পংক্তি তাঁর মৃত্যুতে সত্যি হয়ে উঠল—
“কিন্তু এখন সে ঘুমিয়ে আছে চিরদিনের জন্য
শৈবাল আর ঘাস
আস্তে আস্তে খুলে দিচ্ছে
তার খুলির ফুল
আর তার রক্ত গাইছে গান…”
ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা নিহত হলেন। কিন্তু স্পেনের গৃহযুদ্ধ তখনও অনেক বাকি।


