প্রাচীন গ্রিক দর্শন দর্শনশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের জন্মভূমি হিসেবে খ্যাত। সেই সময়ে বিশ্ব ও প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টা ছিল দর্শনের মূল উদ্দেশ্য। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের আনক্সাগোরাস এই প্রাচীন দর্শকদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট দার্শনিক, যিনি তাঁর ‘নূন্যাংশ’ বা হোমিওমেরিস (Homoeomeries) তত্ত্বের মাধ্যমে প্রাকৃতিক বস্তু ও ঘটনাবলী ব্যাখ্যার এক নতুন ধারা স্থাপন করেন। এই তত্ত্ব প্রাচীন দর্শনে পদার্থ ও পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে, যা পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক চিন্তার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আনক্সাগোরাস ছিলেন ইওনীয় প্রাক-সোফিস্টিক দার্শনিক, যিনি প্রকৃতির নানা জটিলতাকে একক তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। তার পূর্বসূরীরা যেমন হেরাক্লিটাস ‘পরিবর্তন’ ও পারমেনিডিস ‘অপরিবর্তনীয়তা’ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, আনক্সাগোরাস সেই দুই পরিপন্থী ধারণার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির সব বস্তুই বিভিন্ন ছোট ছোট অংশ থেকে গঠিত এবং এই অংশগুলোর পরিবর্তনই প্রকৃতির পরিবর্তন।
‘হোমিওমেরিস’ শব্দের অর্থ ‘সমজাতীয় অংশ’ বা ‘নূন্যাংশ’। আনক্সাগোরাস দাবি করেছিলেন যে, একটি বস্তু তার অংশবিশেষের বৈশিষ্ট্যের সাথে একই রকম গঠিত। অর্থাৎ যেকোনো পদার্থকে যতো ছোট ছোট অংশে ভাগ করো, প্রতিটি অংশ তার পুরো বস্তুর মতোই গুণাবলী বহন করে।
যদি একটি সাদা বস্তু থাকে, তার প্রতিটি নূন্যাংশও সাদা। এই ধারণাটি ‘নূন্যাংশ’ তত্ত্ব নামে পরিচিত। তিনি বলেন, সমস্ত বস্তু বিভিন্ন প্রকার নূন্যাংশের সমষ্টি। পৃথিবী, জল, বাতাস, আগুন এগুলো আলাদা না, বরং একসাথে মিশ্রিত নূন্যাংশের ভিন্ন ভিন্ন অনুপাত। তাই কোনো বস্তু সম্পূর্ণভাবে অন্য বস্তুর থেকে আলাদা নয়, বরং এতে মিশ্রিত থাকে সকল বস্তুর নূন্যাংশ। তবে যে নূন্যাংশ বেশি থাকবে, সেটির বৈশিষ্ট্য বহুলাংশে প্রকাশ পাবে।
আনক্সাগোরাস শুধু পদার্থের অংশ নিয়ে আলোচনা করেননি; তিনি ‘নূস’ ধারণাও প্রবর্তন করেন। নূস অর্থাৎ মন বা বুদ্ধি, যা সকল জটিল প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি এক প্রকার স্বতন্ত্র, অদৃশ্য শক্তি যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমন্বয় সাধন করে। এই নূস তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি প্রাচীন দর্শনে প্রথম বারে একটি অদৃশ্য বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতি দাবি করেন, যা বস্তুগত বিশ্বকে পরিচালনা করে।
আনক্সাগোরাসের ‘নূন্যাংশ’ ধারণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের অ্যাটম তত্ত্বের পূর্বসূরী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও তাঁর ধারণা পরিপূর্ণ নয়, তবে ছোট ছোট অদৃশ্য অংশের মাধ্যমে বস্তুর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে ‘অ্যাটম’ হলো অপরিবর্তনীয় মৌলিক কণা, যাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা যায় না। আনক্সাগোরাসের হোমিওমেরিস তত্ত্বের ক্ষেত্রে অংশগুলো এখনও একই রকমের গুণাবলী বহন করে, যা পরবর্তীতে অ্যাটম ধারণার সাথে পার্থক্য তৈরি করে। তবুও বস্তুকে একক ছোট অংশে ভাগ করার ভাবনাটি তাঁর যুগের জন্য যথেষ্ট এগিয়ে ছিল।
এর সঙ্গে আনক্সাগোরাসের ‘নূস’ ধারণা কসমোলজি এবং বিজ্ঞান দর্শনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। আধুনিক বিজ্ঞানে ‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ বা ‘স্মার্ট ডিজাইনার’ বিষয়টি অনেক বিতর্কিত হলেও, নূসের ধারণা প্রাচীন বিশ্বব্যবস্থার পরিচালনাকারী বুদ্ধিমত্তার রূপক হিসেবে ভাবা যেতে পারে।
আনক্সাগোরাসের তত্ত্বকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, তিনি বস্তুগত জগৎকে মৌলিক উপাদানে ভাগ করে তার গঠন বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। এই ধারা পরবর্তীকালে ডেমোক্রিটাসের অ্যাটম তত্ত্ব ও নিউটনের পদার্থবিজ্ঞানে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
তবে পার্থক্যও আছে। আনক্সাগোরাস মনে করতেন নূন্যাংশ অনন্ত ভাগযোগ্য, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান মনে করে মৌলিক কণাগুলো অপরিবর্তনীয়। তবুও তার তত্ত্ব প্রাচীন পর্যায়ে পদার্থের গঠন ও পরিবর্তন বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আনক্সাগোরাসের ‘নূন্যাংশ’ তত্ত্ব সমালোচনার থেকেও মুক্ত ছিল না। পারমেনিডিস ও প্লেটো তাঁর তত্ত্বকে নিরুৎসাহিত করেছেন। প্লেটো মনে করতেন প্রকৃত বাস্তবতা চিরন্তন এবং অবিনশ্বর, আর নূন্যাংশের মত অতি ক্ষুদ্র ও পরিবর্তনশীল ধারণা তর্কসাপেক্ষ।
তাছাড়া নূন্যাংশ ধারণা অনেক জটিল এবং কিছুটা বিমূর্ত হওয়ায় তার সঠিক প্রমাণ দেওয়া কঠিন ছিল। এ ছাড়া আনক্সাগোরাসের সময় প্রায়শই ধর্মীয় ও পৌরাণিক ব্যাখ্যাগুলো অধিক গ্রহণযোগ্য ছিল, তাই তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলো কম জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
আনক্সাগোরাসের দার্শনিক ভাবনা প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞান ও দর্শনের ধারাকে প্রভাবিত করে। তাঁর কাজ প্লেটো, অ্যারিস্টটল ও পরবর্তীকালের প্রাচীন বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বিশেষত পদার্থের মৌলিক গঠন এবং বিশ্বের স্বাভাবিক নিয়মের প্রতি তার মনোযোগ আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মের পথে সহায়ক ছিল। আধুনিক যুগে তাঁর তত্ত্বগুলো অনেকাংশে বদলে গেলেও, মৌলিকভাবে ছোট ছোট উপাদানের মাধ্যমে জগতকে বিশ্লেষণ করার ধারাটাই আজকের পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।
আনক্সাগোরাসের ‘নূন্যাংশ’ (Homoeomeries) তত্ত্ব প্রাচীন গ্রিক দর্শনে পদার্থ ও প্রকৃতির পরিবর্তন বোঝার জন্য এক যুগান্তকারী ধারণা ছিল।ছোট ছোট সমজাতীয় অংশের মাধ্যমে বস্তুর গঠন ব্যাখ্যার চেষ্টা এবং অদৃশ্য ‘নূস’ বা বুদ্ধির ধারণা তার বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তাধারাকে অনন্য করে তোলে। তত্ত্বটি পরিপূর্ণ নয় এবং তার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এটি প্রাচীন দর্শনে বিজ্ঞানের সূচনা ও বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আধুনিক বিজ্ঞান যখন বস্তুগত জগতকে ছোট কণার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করে, তখন আনক্সাগোরাসের হোমিওমেরিস তত্ত্ব তার প্রাথমিক প্রভাবকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই চিন্তাধারাটি আমাদের বোঝায়, কীভাবে মানুষের কৌতূহল ও বুদ্ধিমত্তা যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনের এক অবিচ্ছিন্ন ধারা সৃষ্টি করেছে।


