ইসরায়েলের উপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন, যখন ইসরায়েল প্রতিশোধ নেবে তখন তা হবে “সুনির্দিষ্ট এবং প্রাণঘাতী”। ইরান উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোকে সতর্ক করেছে যেন তাদের আকাশসীমা কোনো ধরনের হামলার জন্য ব্যবহার না হয়। এদের মধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি আরও বলেছে, যেই দেশই ইরানে আক্রমণ চালাতে ইসরাইলকে সহায়তা করবে, সেটি ইরানের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
এগুলো এখন বিবেচনায় নেওয়ার কিছু কারণ হচ্ছে, ইসরায়েলের পরিকল্পিত আক্রমণ কী রূপ নেবে তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের আলোচনা।
প্রকাশ্যেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তেলের স্থাপনায় হামলা চালিয়ে পাম্পে দাম বাড়ানোর বিষয়টিকে হোয়াইট হাউস যেমন সাধুবাদ জানাবে না, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যকে আরেকটি যুদ্ধের দিকেও টেনে নিতে চাইবে না। তাহলে এরপর কী হবে? এদিকে লেবানন, গাজা, ইয়েমেন এবং সিরিয়ায়- একযোগে ইসরায়েলের সব শত্রুদের মোকাবেলা করার দৃঢ় সংকল্পের কারণে নেতানিয়াহু সরকার পিছিয়ে আসার মানসিকতায় নেই বলে মনে হচ্ছে। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে বেছে নেওয়ার জন্য বেশ কিছু লক্ষ্য রয়েছে। এগুলোকে মোটামুটিভাবে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
: প্রচলিত সামরিক কায়দায়- লক্ষ্য হবে ঘাঁটি, যেখান থেকে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উৎক্ষেপণ করেছে। আইআরজিসির ঘাঁটিগুলোর পাশাপাশি বিমান প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারিগুলোতে আঘাত করতে পারে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যার চেষ্টা করতে পারে। : অর্থনৈতিক- ইরানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ – এর পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থা। এটি অজনপ্রিয় একটি পদক্ষেপ – সামরিক বাহিনীর উপর আক্রমণের তুলনায় সাধারণ মানুষের জীবনকে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। : পারমাণবিক – ইসরায়েলের সম্ভাব্য টার্গেট তালিকার মধ্যে রয়েছে পারচিন, ইরানের সামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির কেন্দ্রস্থল, তেহরানের গবেষণা চুল্লি, বনাব এবং রামসার। এছাড়াও আছে বুশেহর, নাতাঞ্জ, ইসফাহান এবং ফেরদোর প্রধান স্থাপনা।তাদের হিসাব-নিকাশের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে ইরানের প্রতিক্রিয়া অনুমান এবং তা কীভাবে প্রশমিত করা যায় সেটি নিয়ে কাজ করা।মঙ্গলবার ইসরায়েলি সামরিক লক্ষ্যবস্তু বলে দাবি করা স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর ইরান মনে করছে এখন হিসেব সমান হয়েছে। তবে ইসরায়েল প্রতিশোধ নিলে পাল্টা আঘাত হানবে বলে সতর্ক করেছে ইরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশ- কিয়ান বলেছেন, “এটি আমাদের সক্ষমতার একটি আভাস মাত্র।”
ইরান সামরিকভাবে ইসরায়েলকে পরাজিত করতে পারবে না। এর বিমান বাহিনী পুরনো ও জরাজীর্ণ, এর আকাশ প্রতিরক্ষা ছিদ্রযুক্ত এবং বছরের পর বছর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে লড়াই করেছে। কিন্তু এখনও ইরানের হাতে প্রচুর পরিমাণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রর পাশাপাশি বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ও মধ্যপ্রাচ্যে বহু মিত্র মিলিশিয়া রয়েছে। তাদের পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটির পরিবর্তে বেসামরিক এলাকাগুলো লক্ষ্য করতে পারে। পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনীর দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সক্ষম ছোট-বড় নৌবহর প্রস্তুত রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সংঘবদ্ধ আক্রমণে ব্যর্থ করতে সক্ষম।
নির্দেশ দেওয়া হলে এগুলো হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপন করে বিশ্ব তেলের দৈনিক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহ ব্যাহত করতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। এর পাশাপাশি, উপসাগরের আরব দিকের কুয়েত থেকে ওমান পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও রয়েছে। ইরান সতর্ক করেছে যে যদি তাদের ওপর হামলা হয় তাহলে তারা কেবল ইসরায়েলের ওপরই আঘাত হানবে না বরং আক্রমণেকে সমর্থন করা যেকোনো দেশকেও লক্ষ্যবস্তু বানাবে। এই সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো এখন তেল আবিব এবং ওয়াশিংটনের বিবেচনা করছে।