যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক এখন সরকারের ব্যয় কমানোর নামে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন। এক অর্থে তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে ফেডারেল হামলার নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর লক্ষ্য হলো জনপরিষেবা খাতে সরকারের ব্যয় কমানো এবং লুণ্ঠনকারী পুঁজিবাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার জন্য যেসব সরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে, সেগুলো বাতিল করা। আসলে ধনিক শ্রেণির কর কমানোর মতলবেই ট্রাম্প ও মাস্ক ফেডারেল বাজেট কাটছাট করতে চান। এই ‘দুর্ভাগা’ শ্রেণির নাকি বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন!
… মাস্ক যে লক্ষ্য ঠিক করেছেন, তা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বলেছিলেন, তিনি ফেডারেল ব্যয়ের ৬.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছেটে ফেলবেন, যা কিনা পুরো ঐচ্ছিক বাজেটের (ঐচ্ছিক বাজেট হলো যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের সেই বাজেটের অংশ, যা কংগ্রেস প্রতিবছর নতুন করে অনুমোদন দেয় এবং পরিবর্তন করতে পারে। এই বাজেট থেকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়) চেয়েও বেশি।
ইলন মাস্কের মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার, তা হলো একটি কঠোর ব্যয় সংকোচন। আর এটি করা হলে বেশির ভাগ আমেরিকান মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন। মাস্ক ও রামাস্বামীর ব্যাপক ব্যয় সংকোচন ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার যে পরিকল্পনা, তা বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকায় জনতুষ্টিবাদী ‘নিষ্ঠুর রাজনীতির’ অংশ। এই নীতিতে শাসকের কাছে জনতার দুর্ভোগ কোনো বিষয় নয়। সেখানে সরকারের সমর্থকেরা ততক্ষণ খুশি থাকবে, যতক্ষণ তাদের শত্রুরা বিশেষ করে অভিবাসী আরও বেশি কষ্ট পেতে থাকবে।
মাস্ক নিজেও এই ঘৃণার রাজনীতির একজন নেতা। তিনি দেখিয়েছেন, ভোটাররা আসলে কেমন আছেন, তা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তারা অন্য গোষ্ঠীর তুলনায় কতটা ভালো আছেন, সেটাই মুখ্য। বিশ্বজুড়ে এখন যে শ্রেণিসংগ্রাম শুরু হয়েছে, তার মূল কারণ হলো দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর দুনিয়ায় যে সাম্যবাদী ও গণতান্ত্রিক ধারা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা ১৯৪৫-১৯৭৫ কালপর্বকে স্বাভাবিক গণতন্ত্রের যুগ বলে ভাবি। যুদ্ধের কারণে শাসকশ্রেণির ক্ষমতা দুর্বল হয়েছিল বলেই তখন সে ধরনের রাজনৈতিক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এখন দেশগুলো আবার সামন্তবাদী শাসনের দিকে ফিরে যাচ্ছে।
বিশ শতকে এমন শাসনব্যবস্থাকে ফ্যাসিবাদ বলা হতো। সেখানে ক্ষমতা ছিল ‘রাজা-সম্রাটদের’ হাতে। ট্রাম্প ও মাস্ক ঠিক ফ্যাসিবাদী কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু এ কথা সত্য, তারা আসলে সেই পুরোনো স্বৈরাচারী ধারা ফিরিয়ে আনছেন। যেসব দেশে এখনো সম্পূর্ণ স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাদের বোঝা উচিত, গণতন্ত্র আপনা আপনি আসে না। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, প্রতিবাদ ও স্বাধীন গণমাধ্যমই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। জর্জ মোনবিয়ট – দ্য গার্ডিয়ান-এর নিয়মিত লেখক