Home Blog Page 20

সমুদ্রের নিম্নচাপের মুখে কক্সবাজারের ইলিশ

কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর জেটিঘাটে এখন ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও সাগরে ইলিশের দেখা নেই। তিন বছর আগেও যেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ত, এখন সেখানে জাল ফেলে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। এই আকস্মিক ইলিশশূন্যতায় জেলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। প্রায় সাত শতাধিক মাছ ধরার ট্রলার বর্তমানে অলস অবস্থায় ঘাটে নোঙর করা রয়েছে।

জেলেরা জানান, এক ট্রিপে সাগরে পাঁচ থেকে সাত দিন থাকতে হয়, যার খরচ প্রায় চার লাখ টাকা। অথচ মাছ বিক্রি করে আয় হচ্ছে এক লাখ টাকারও কম, যা জ্বালানি খরচও মেটাতে পারছে না। এই লোকসানের কারণে অনেক ট্রলারই সাগরে যাচ্ছে না। এখানকার প্রায় ৭০ শতাংশ জেলে পরিবারে এখন দুবেলা খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ আহরণ দিন দিন কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ৩,৯৭৫ মেট্রিক টন ইলিশ বিক্রি হয়েছিল, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২,৫৫৬ মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ বিক্রি হয়েছে মাত্র ১,৬২৮ মেট্রিক টন। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৬৭ মেট্রিক টনে। এই ইলিশের ঘাটতি সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গবেষক এবং ট্রলার মালিকেরা এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ এবং প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। এর পাশাপাশি গভীর সাগরে দেশি-বিদেশি ট্রলিং জাহাজের আনাগোনা বেড়েছে। এসব জাহাজ নিষিদ্ধ ট্রলিং জাল, কারেন্ট জাল ও বেহেন্দি জালের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ আহরণ করছে, যা সামগ্রিকভাবে ইলিশের প্রজাতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

কক্সবাজারের জেলেদের আয় ও জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ছে। সাগরে ইলিশ শূন্য হওয়ার ফলে ট্রলার পরিচালনা ব্যয় ও লাভের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। জেলেরা দীর্ঘ সময় সাগরে থাকলেও ইলিশ ধরা না পড়ায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে ইলিশ সংরক্ষণ, ট্রলিং নিয়ন্ত্রণ ও সাগরের পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য গবেষণা, আইনানুগ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ বান্ধব জাল ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ইলিশের প্রজনন ও সংখ্যার পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় এবং জেলেদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকে।

‘রাহুল-প্রিয়াঙ্কা মডেলে’ ছেলেমেয়েকে দলীয় নেতৃত্বে আনছেন শেখ হাসিনা

বিবিসি বাংলার দিল্লি প্রতিনিধির রিপোর্টে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল – এই দুজনকেই নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন।

পাশাপাশি এখানে একটা ভূমিকা থাকবে শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিরও।

এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তাদের দলীয় নেতৃত্বে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নিয়ে যে ‘মডেল’টা অনুসরণ করছে, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও নিজের ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঠিক সেটাই করতে চাইছেন ভারতে অবস্থানরত ৭৮ বছর বয়সী দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে মাত্র মাসদুয়েক আগেও দিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) ‘রিজিওনাল ডিরেক্টর’ পদে ছিলেন সায়মা ওয়াজেদ, কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্তৃপক্ষ তাকে অনির্দিষ্টকালীন ছুটিতে পাঠানোর পর শেখ হাসিনার কন্যা এখন পুরাদস্তুর রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ এখন মার্কিন নাগরিক ও আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা, তবে মায়ের পর দলের প্রধান মুখ ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনিই। দেশ-বিদেশের মিডিয়াকে সাক্ষাৎকারও দিচ্ছেন ঘন ঘন।

কিন্তু সায়মা ওয়াজেদ যেহেতু মায়ের সঙ্গে একই শহরে ও একই টাইম জোনে রয়েছেন, শেখ হাসিনাকে তিনি সরাসরি সাহায্য করতে পারছেন অনেক বেশি। অনলাইনে মায়ের দেওয়া ভাষণের খসড়া তৈরিতে, কর্মসূচির ক্যালেন্ডার স্থির করতেও সাহায্য করছেন।

এমন কী, বাইরের দর্শনার্থীদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরাসরি দেখা করার ক্ষেত্রে যেহেতু অনেক বিধিনিষেধ আছে – তাই সে কাজটাও এখন অনেকাংশেই সায়মা ওয়াজেদের ওপর বর্তেছে। গত দু’মাসে তিনি বেশ কয়েকবার এরকম বৈঠকও করেছেন। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে, তবে তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি।

এই মুহূর্তে রাহুল গান্ধীকে একেবারে সামনে এবং প্রিয়াঙ্কাকে ঠিক তার পেছনে রেখে যেভাবে ভারতের প্রধান বিরোধী দলটি পরিচালিত হচ্ছে – শেখ হাসিনা সেই ‘মডেল’টাই আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে চাইছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

শেখ হাসিনার এই তথাকথিত ‘সাকসেসন প্ল্যান’ নিয়ে বিবিসি বাংলা ভারতে ও ভারতের বাইরে অবস্থানরত বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বলেছে।

তারা অনেকেই দলীয় নেতৃত্বে এই ‘রাহুল-প্রিয়াঙ্কা’ মডেল অনুসরণ করার বিষয়টি নিয়ে অবহিত, এবং বিবিসির কাছে সেটি নিশ্চিতও করেছেন। কিন্তু এই বিষয়টি আওয়ামী লীগের ভেতরে এতটাই স্পর্শকাতর একটি ইস্যু, যে তারা কেউই এটি নিয়ে ‘অন রেকর্ড’ মুখ খুলতে চাননি।

নিজের ছেলেমেয়েকে অঘোষিতভাবে দলের নেতৃত্বে একেবারে সামনের সারিতে নিয়ে আসার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ পরিচালনার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন সভাপতি শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা, সায়মা ওয়াজেদ দিল্লিতে (বা দিল্লির উপকণ্ঠে), সজীব ওয়াজেদ আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় এবং দলের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ নেতা কলকাতায় – এভাবেই একটি ত্রিভুজাকার যৌথ নেতৃত্বর মধ্যে দিয়ে এই মুহূর্তে দলটির দৈনন্দিন কাজকর্ম চলছে।

কিন্তু কাগজে-কলমে এখনও যিনি আওয়ামী লগের সাধারণ সম্পাদকের পদে আছেন, সেই ওবায়দুল কাদের দলের এই নতুন কাঠামোতে একেবারেই উপেক্ষিত। প্রায় দশ মাস আগে ভারতে চলে এলেও তিনি এখনও দলীয় সভাপতির দেখাই পাননি বলে বিবিসি নিশ্চিত হতে পেরেছে।

শেখ হাসিনা বরং বেশি ভরসা রাখছেন দলের তিনজন নেতার ওপর – যারা প্রত্যেকেই আপাতত কলকাতায়। এরা হলেন বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, একদা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আ.ফ.ম. বাহাউদ্দিন নাসিম এবং আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক।

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতে তাদের সশরীরে দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। তবে আপাতত তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করার কাজটি করছেন সায়মা ওয়াজেদ।

অন্য দিকে সজীব ওয়াজেদের নেতৃত্বে আমেরিকায় আর একটি টিম কাজ করছেন দলের অনুকূলে ‘ন্যারেটিভ নির্মাণ’ (বয়ান তৈরি) এবং বিদেশের সংবাদমাধ্যমে আওয়ামী লীগের বক্তব্য তুলে ধরতে।

ক্যাথরিন অফ সিয়েনা’র ‘ন্যায়বিচার’

প্রায় ৭০০ বছর আগে সিয়েনার ক্যাথরিন একটি চিঠি লিখেছিলেন যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন কেন ধনী ও দরিদ্রদের জন্য বিচার ব্যবস্থা ভিন্নভাবে কাজ করে। তার এই বিশ্লেষণ আজও প্রাসঙ্গিক?

ক্যাথরিন শুরুতে বলেছেন ধনীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ প্রায়শই উপেক্ষা করা হয় কারণ যারা শাসন করেন তাদের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত আত্মস্বার্থ কাজ করে। তারা ধনীদের অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি নিতে চান না, কারণ ধনীরা তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং তাদের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।

তিনি লিখেছেন “এই কারণেই প্রায়শই বিচার ব্যর্থ হয়। মানুষ নিজের পদমর্যাদা হারানোর ভয় পায়। তাই অন্যদের অপ্রসন্ন না করার জন্য, তারা তাদের ভুল কাজগুলো গোপন রেখে এমন একটি ক্ষতে মলম লাগায় যা সেই মুহূর্তেই পুড়িয়ে ফেলা প্রয়োজন। তারা তোষামোদকারীদের ভুল কাজ দেখতে না পাওয়ার ভান করে।”

এর বিপরীতে দরিদ্রদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে নির্মম কঠোরতা দেখা যায়।

“দরিদ্রদের প্রতি, যাদের তারা তুচ্ছ মনে করে এবং যাদের তারা ভয় পায় না, তারা তখন বিচারের প্রতি প্রচণ্ড উৎসাহ দেখায় এবং কোনো দয়া বা সহানুভূতি দেখায় না, ছোটখাটো ভুলের জন্যও কঠোর শাস্তি দেয়।”

ক্ষমতাহীনদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে শাসকের কোনো ঝুঁকি থাকে না, তাই তাদের দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করা ধনীদের দ্বারা সংঘটিত অন্যায় থেকে মনোযোগ সরাতে সাহায্য করে এবং জনসাধারণের চোখে শাসকের নৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

তাহলে এই বিচার ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার সমাধান কী? ক্যাথরিন এমন শাসকদের নিয়োগের পক্ষে কথা বলেছেন যারা আত্মপ্রেম থেকে মুক্ত এবং আইন-শৃঙ্খলা নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিচালনার জন্য নিবেদিত।

সুতরাং শাসকের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক চরিত্র সম্পূর্ণভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং শাসকদের বিচার করার জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হওয়া উচিত।

ক্যাথরিন প্রায় ৭০০ বছর আগে এই যুক্তিগুলো দিয়েছিলেন। আমরা তার কথা মেনে চলেছি? নিরপেক্ষভাবে শাসন করার জন্য আমরা কি সমাজকে এমনভাবে সাজাতে পেরেছি যাতে এমন শাসক তৈরি হয়? এই ধরনের অগ্রগতি কি সম্ভব?

নাকি আমাদের কেবল ক্যাথরিনের পুরনো প্রবাদটি নিয়েই বাঁচতে হবে – “ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে, চরম ক্ষমতা চরমভাবে কলুষিত করে”?

জাপানি গাড়ির শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনলেন – ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার জাপানি গাড়ি ও অন্যান্য পণ্যের শুল্ক কমানোর জন্য একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন।এই সিদ্ধান্ত জাপানের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, জাপানি গাড়ির ওপর বর্তমান ২৭.৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামানো হবে। এছাড়া অন্যান্য অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শুল্কহারও ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

বাণিজ্য চুক্তির এ পদক্ষেপ জাপানের জন্য একটি বড় জয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। টোকিও থেকে আসা শুল্ক বিষয়ক দূত ওয়াশিংটনে এসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জাপানের শীর্ষ সরকারি মুখপাত্র ইয়োশিমাসা হায়াশি জানান, তারা এই নির্বাহী আদেশকে স্বাগত জানাচ্ছে এবং এটি চুক্তির দৃঢ় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।

উল্লেখযোগ্য যে, জুলাই মাসের শেষ দিকে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা করলেও বিস্তারিত বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। গত আগস্টে ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করার সময় জাপানি পণ্যের ওপরও বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত হয়েছিল। জাপানি দূত রয়োসেই আকাজাওয়া আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই নিয়ম সংশোধন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, ৭ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। এছাড়া সংশোধিত বিধান ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত হওয়ার সাত দিনের মধ্যে প্রযোজ্য হবে। ট্রাম্পের আদেশে দেশভিত্তিক শুল্ক ছাড়াও খাত-ভিত্তিক শুল্কও উল্লেখ করা হয়েছে।গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, যা বিদ্যমান ২.৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে যোগ হয়ে মোট শুল্ককে ২৭.৫ শতাংশে উন্নীত করেছিল। এই উচ্চ শুল্ক জাপানের অটোমোবাইল শিল্পের জন্য বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জাপানি দূত আকাজাওয়া ওয়াশিংটনে বলেন, ১৫ শতাংশ শুল্ক ‘তবুও শিল্পের ক্ষতি করবে’। তিনি উল্লেখ করেন, জাপান সরকার আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সফরে আকাজাওয়া ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী জাপানের ৫৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা করবেন। ট্রাম্প এই বিনিয়োগ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৯০ শতাংশ মুনাফা রাখবে বলে জানিয়েছেন। তবে জাপান জানিয়েছে, বিনিয়োগের বড় অংশ ঋণ ও ঋণ গ্যারান্টি হিসেবে হবে।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে জাপানকে আরও বেশি আমেরিকান চাল আমদানি করতে চাপ দিয়ে আসছেন। এছাড়া ইশিবা জানিয়েছেন যে টোকিও ওয়াশিংটনে একটি চিঠি পাঠিয়েছে, যেখানে তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জাপানে আমন্ত্রণ জানিয়ে উভয় দেশের মধ্যে একটি সোনালি যুগ গড়ার প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে।

পোশাক শিল্পে পানি-সাশ্রয়ী ডিজাইন কিভাবে সম্ভব?

জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাস্টেইনেবল ফ্যাশন বা টেকসই পোশাক শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এই শিল্পের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো পানির অত্যধিক ব্যবহার। World Wildlife Fund (WWF) এবং Pew Research Center এর তথ্য মতে- একটি জিন্স প্যান্ট তৈরিতে প্রায় ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ লিটার পানি লাগে, যা একজন মানুষের কয়েক বছরের পানির চাহিদার সমান। এই পরিসংখ্যান আমাদের পোশাক শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। পানি-সাশ্রয়ী ডিজাইন টেকনিকগুলো হলো এমন একটি পথ, যা কেবল পানি সংরক্ষণই করে না, বরং পোশাক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও পরিবেশবান্ধব এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলে।

পোশাক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পানির ব্যবহার বিভিন্ন ধাপে ছড়িয়ে আছে। প্রধানত তুলা চাষে, ডাইং বা রং করার প্রক্রিয়ায় এবং ফিনিশিংয়ে প্রচুর পানি ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের মোট কৃষি জমির ২.৫% তুলা চাষের জন্য ব্যবহৃত হলেও, মোট ব্যবহৃত কীটনাশকের ১৬% এবং মোট ব্যবহৃত পানির প্রায় ৩% এর বেশি তুলা চাষে লাগে। এটি হলো পানির অপচয়ের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ধাপ।

ডাইং ও ফিনিশিং ধাপটি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে পানি-নিবিড় অংশ। ঐতিহ্যবাহী ডাইং পদ্ধতিতে প্রচুর পানি ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ডাইং এর পর কাপড় ধোয়া, ফিনিশিং করা এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ায়ও প্রচুর পানি লাগে। ব্যবহৃত এই পানি প্রায়শই দূষিত হয়ে নদী-নালা এবং অন্যান্য জলাশয়কে দূষিত করে।

এই অত্যধিক পানির ব্যবহার এবং দূষণ পোশাক শিল্পকে পরিবেশের জন্য একটি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পানি-সাশ্রয়ী ডিজাইন কৌশলগুলো অপরিহার্য।

পোশাক শিল্পে পানি সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন কৌশল ব্যবহৃত হয়।

কয়েকটি প্রধান কৌশল হলো –

জিরো ওয়েস্ট ডিজাইন

জিরো ওয়েস্ট ডিজাইন হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে প্যাটার্ন কাটার সময় কাপড়ের অপচয় শূন্যের কাছাকাছি আনা হয়। ঐতিহ্যবাহী প্যাটার্ন কাটিংয়ে সাধারণত ১৫-২০% কাপড় নষ্ট হয়। এই ডিজাইন কৌশল শুধুমাত্র কাপড় বাঁচায় না, বরং প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ওয়াশিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণও কমায়। জিরো ওয়েস্ট ডিজাইনাররা প্যাটার্নকে এমনভাবে সাজান, যাতে কোনো অংশ বাদ না যায় এবং প্রতিটি টুকরা ব্যবহার করা হয়। এটি একটি সৃজনশীল এবং চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া, যা সাস্টেইনেবল ফ্যাশনের মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।

ড্রাই ডাইং ও টেকনিক

ডাইং প্রক্রিয়ায় পানি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীরা নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন। সুপারক্রিটিক্যাল কার্বন ডাই অক্সাইড (Supercritical CO2) ডাইং এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে তরল কার্বন ডাই অক্সাইডকে দ্রাবক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা পানিকে প্রতিস্থাপন করে। এই প্রক্রিয়াটি জল-মুক্ত ডাইং নামেও পরিচিত। এটি শুধু পানি সাশ্রয় করে না, বরং ডাইং এর সময় প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের পরিমাণও কমিয়ে দেয়। এছাড়া ডিজিটাল প্রিন্টিংও একটি পানি-সাশ্রয়ী বিকল্প। ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ে সরাসরি কাপড়ে রং প্রয়োগ করা হয়, যা ঐতিহ্যবাহী স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের তুলনায় অনেক কম পানি ব্যবহার করে।

লেজার ফিনিশিং ও ওজোন ওয়াশিং

জিন্স ফিনিশিংয়ে প্রচুর পানি ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যাতে ওয়াশড লুক আনা যায়। এর বিকল্প হিসেবে, লেজার ফিনিশিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। লেজার রশ্মি দিয়ে কাপড়ের উপর ফিনিশিং ডিজাইন করা হয়, যা পানি ও রাসায়নিকের ব্যবহারকে প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে।
একইভাবে ওজোন ওয়াশিং প্রযুক্তিও পানি সাশ্রয়ে কার্যকর। এটি প্রচলিত ওয়াশিং পদ্ধতির তুলনায় ৯০% পর্যন্ত পানি সাশ্রয় করে এবং ডিটারজেন্টের ব্যবহারও কমিয়ে দেয়। ওজোন ওয়াশিংয়ে ওজোন গ্যাস ব্যবহার করা হয়, যা কাপড়কে ব্লিচ করে এবং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে।

পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ

পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ যেমন রিসাইকেলড পলিয়েস্টার এবং রিসাইকেলড কটন ব্যবহার করে নতুন পোশাক তৈরি করা হয়। এই উপকরণগুলো ব্যবহার করার ফলে নতুন তুলা চাষ এবং নতুন সিন্থেটিক ফাইবার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ কমে যায়। একটি রিসাইকেলড পলিয়েস্টার টি-শার্ট তৈরিতে একটি নতুন পলিয়েস্টার টি-শার্টের তুলনায় ৭০% কম শক্তি এবং ৯০% কম পানি লাগে। এটি কেবল পানিই বাঁচায় না, বরং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডিজাইন ফর ডিউর‌্যাবিলিটি

পোশাকের জীবনচক্র বাড়ানোও একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি-সাশ্রয়ী কৌশল। যেসব পোশাক দীর্ঘদিন টেকসই হয়, সেগুলো কম ঘন ঘন প্রতিস্থাপিত হয়, ফলে নতুন পোশাক উৎপাদনে পানির প্রয়োজন কমে যায়। ডিজাইনাররা এমনভাবে পোশাক তৈরি করেন, যাতে এটি সহজে নষ্ট না হয়। তারা উচ্চ মানের উপাদান, শক্তিশালী সেলাই এবং ক্লাসিক ডিজাইন ব্যবহার করেন যা দ্রুত ফ্যাশন ট্রেন্ডের বাইরে চলে যায় না।

পানি-সাশ্রয়ী ডিজাইন টেকনিকগুলো কেবল পরিবেশগত সুবিধাই দেয় না, বরং এটি একটি টেকসই এবং লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলও তৈরি করে। নতুন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী ডিজাইন কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে ব্র্যান্ডগুলো তাদের উৎপাদন খরচ কমাতে পারে, কারণ পানি ও রাসায়নিকের ব্যবহার কমে যায়। ভোক্তারাও এখন পরিবেশ সচেতন হচ্ছেন এবং তারা এমন ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে আগ্রহী যেগুলো পরিবেশের প্রতি যত্নশীল।

পুলিশকে নিরপেক্ষ থেকে শুধু জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে : মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশকে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত বা বিশেষ সুবিধা না দিতে সতর্ক করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আয়োজিত নির্বাচনি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।

তিনি পুলিশের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা কোনও দলের দিকে ঝুঁকবেন না। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাটাই আপনার দায়িত্ব। আইন মেনে, জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে। দল নয়, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে কাজ করুন। আপনারা যদি এখন থেকেই তেল দিয়ে শুরু করেন, নির্বাচনের পর সেই তেল শেষ হয়ে যাবে। তাই যাদের কাছে যতটুকু রিসার্ভ আছে, সেটা সংরক্ষণ করুন।”

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নির্বাচনের সময় পুলিশকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে জনগণের স্বার্থে দায়িত্ব পালনের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, পুলিশকে নিরপেক্ষ থেকে শুধু জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে, যাতে যে কোনো রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাব থেকে বিরত থাকা সম্ভব হয়।

এ সময় রাজবাড়ীর ঘটনার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, “রাজবাড়ীর ঘটনা আমরা তদন্ত করে দেখছি। ইতোমধ্যে পাঁচজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হবে এবং কারা এতে জড়িত ছিল, তা জানা যাবে।”

তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “কারও অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, সেটা তদন্তে বের হবে। আগে থেকেই কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিলে তদন্তের গুরুত্ব নষ্ট হবে। তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর নির্দোষ প্রমাণিত হলে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।”

এইভাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পুলিশের মধ্যে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে সতর্কতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখার গুরুত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

গণতন্ত্র ও শিল্পের জন্মভূমি এথেন্সের অ্যাক্রোপলিস

প্রাচীন গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অ্যাক্রোপলিস, কেবল একটি পাথরের স্তূপ নয়, বরং মানব সভ্যতার এক অসাধারণ প্রতীক।এর উচ্চতা এবং স্থাপত্যশৈলী শুধু দৃষ্টিকে নয়, মনকেও আকর্ষণ করে। এটি এমন একটি স্থান যেখানে গণতন্ত্রের বীজ রোপিত হয়েছিল এবং শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল।

অ্যাক্রোপলিস শব্দের অর্থ “উচ্চ নগরী”। এটি একটি প্রাকৃতিক টিলার উপরে নির্মিত, যা এথেন্সের সুরক্ষায় একটি কৌশলগত অবস্থান প্রদান করে।প্রায় ৪০০০ বছর আগে ব্রোঞ্জ যুগে এটি একটি দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হত। কিন্তু এর স্বর্ণযুগ আসে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে, যখন এথেন্সের নেতা পেরিক্লেসের নেতৃত্বে এটি পুনর্গঠিত হয়।

পেরিক্লেসের এই সময়কালকে এথেন্সের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই সময়েই এথেন্সের গণতন্ত্র তার পূর্ণ রূপ লাভ করে এবং শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। পারস্য যুদ্ধের পর এথেন্সের বিজয় এবং তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অ্যাক্রোপলিসের পুনর্গঠনে সহায়তা করে। এই পুনর্গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এথেন্সের শক্তি ও সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করা। এই প্রকল্পটি স্থপতি ফিদিয়াসের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে কেবল একটি ধ্বংসস্তূপকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়নি, বরং মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা হয়েছিল, যা আজও আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে।

অ্যাক্রোপলিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো হলো পারথেনন, ইরেখথিয়ন, প্রোপাইলিয়া ও এথেনা নাইকি মন্দির। প্রতিটি স্থাপনার নিজস্ব ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী রয়েছে।

পারথেনন অ্যাক্রোপলিসের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। দেবী এথেনার সম্মানে এটি নির্মিত হয়। স্থপতি ইক্টিনোস ও ক্যালিক্রেটস-এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই মন্দিরটি ডরিক স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ। এর নিখুঁত অনুপাত ও ভাস্কর্যের কারুকার্য দেখে মনে হয়, এটি যেন মানবীয় নয়, দৈব সৃষ্টি। মন্দিরের ফ্রাইজে খোদাই করা ভাস্কর্যগুলো এথেনীয়দের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনীর চিত্র তুলে ধরে। এর স্থাপত্যশৈলী পরবর্তীতে ইউরোপীয় স্থাপত্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। পারথেননের প্রতিটি খুঁটিনাটি স্থাপত্যশৈলী এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছে যেন এটি দূর থেকে দেখলে চোখের কাছে পুরোপুরি নিখুঁত মনে হয়, যাকে অপটিক্যাল কারেকশন বলা হয়।

ইরেখথিয়ন মন্দিরটি অন্যান্য মন্দিরের চেয়ে ভিন্ন। এটি আয়োনিক স্থাপত্যশৈলীর একটি চমৎকার উদাহরণ। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো কারিয়াটিড (Caryatid), যেখানে ছাদের ভার বহন করছে ছয়জন নারীর ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যগুলো নারীশক্তির প্রতীক। এটি একাধিক দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত ছিল, যেমন- এথেনা ও পোসাইডন। এর অসম নকশা এটিকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছে। এই মন্দিরটি এথেন্সের প্রাচীনতম ধর্মীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, যা স্থানীয় পৌরাণিক কাহিনীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রোপাইলিয়া অ্যাক্রোপলিসে প্রবেশের জন্য এটি একটি বিশাল প্রবেশদ্বার। এটি স্থাপত্যশৈলীর এক অসাধারণ নিদর্শন। স্থপতি ম্নেসিক্লেসের নকশায় এটি নির্মিত হয় এবং এর নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যা একই সাথে দুর্গ এবং মন্দিরের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে। এর মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দর্শনার্থীরা এক পবিত্র এবং মহৎ পরিবেশে প্রবেশ করার অনুভূতি পেত। এর দুই পাশে দুটি অতিরিক্ত কক্ষ ছিল, যার একটিতে চিত্রশালা বা পিনাকোথেক ছিল, যা সেই সময়ের শিল্পকলার প্রতি এথেনীয়দের আগ্রহের প্রমাণ দেয়।

এথেনা নাইকি মন্দিরটি অ্যাক্রোপলিসের প্রবেশদ্বারের কাছে একটি উঁচু স্থানে অবস্থিত। এটি বিজয় দেবী এথেনা নাইকির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এটি আয়োনিক স্থাপত্যশৈলীর একটি চমৎকার উদাহরণ। এই মন্দিরের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এখান থেকে এথেনীয়রা তাদের শত্রুদের ওপর নজর রাখতে পারত। এই মন্দিরটি এথেন্সের বিজয়ের গৌরবগাথাকে স্মরণীয় করে রাখে।

অ্যাক্রোপলিস শুধু একটি ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল না, এটি ছিল এথেনীয় গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। এথেন্সেই প্রথম গণতন্ত্রের ধারণা বিকশিত হয়, যেখানে নাগরিকরা সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নিত। অ্যাক্রোপলিসের পাদদেশে অবস্থিত আগোরা (Agora) ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। যদিও অ্যাক্রোপলিসের উপরে সরাসরি রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো না, এর স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় তাৎপর্য এথেনীয়দের গণতন্ত্রের আদর্শকে প্রতিফলিত করে। পারথেনন ও অন্যান্য স্থাপনাগুলো এথেন্সের জনগণের গর্ব ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক ছিল, যা তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করে। এই স্থানটি এথেনীয়দের সম্মিলিত পরিচয় ও স্বাধীনতার আদর্শকে ধারণ করত।

অ্যাক্রোপলিস শুধুমাত্র গ্রিক শিল্পের প্রতীক নয়, এটি আধুনিক বিশ্বের শিল্প ও সংস্কৃতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। এর স্থাপত্যশৈলী, বিশেষ করে পারথেননের অনুপাত ও সৌন্দর্য রেনেসাঁস থেকে শুরু করে আধুনিক যুগেও স্থপতি ও শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে। রোমানরা গ্রিক স্থাপত্যকে অনুসরণ করে এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা তাদের স্থাপত্যে গ্রিক ডরিক ও আয়োনিক শৈলী ব্যবহার করে। বহু সরকারি ভবন, জাদুঘর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যে অ্যাক্রোপলিসের প্রভাব দেখা যায়।

অ্যাক্রোপলিসের ভাস্কর্যগুলো, যেমন পারথেননের ফ্রাইজে খোদাই করা ভাস্কর্য ধ্রুপদী ভাস্কর্যের এক অনন্য নিদর্শন। এই ভাস্কর্যগুলো এতটাই জীবন্ত এবং প্রাণবন্ত যে, আজও সেগুলো শিল্প সমালোচকদের বিস্মিত করে। এই ভাস্কর্যগুলো শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং এথেনীয় সমাজের জীবনযাত্রা, ধর্ম এবং পৌরাণিক কাহিনীকেও তুলে ধরে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত এলগিন মার্বেলস এই ভাস্কর্যগুলোরই অংশ, যা আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

অ্যাক্রোপলিস বহু শতাব্দী ধরে ধ্বংসের শিকার হয়েছে। যুদ্ধ, ভূমিকম্প, দূষণ এবং অযত্নের কারণে এর অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে ভেনিসীয়দের সাথে অটোমানদের যুদ্ধের সময় পারথেনন একটি গোলাবারুদের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং এতে বিস্ফোরণ ঘটে। বর্তমানে অ্যাক্রোপলিসের সংরক্ষণের জন্য গ্রিক সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এর ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামত করা হচ্ছে এবং এর মূল কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা চলছে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া, কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক নীতি অনুযায়ী নতুন উপাদান ব্যবহার করা হয় না। ২০০৯ সালে নির্মিত অ্যাক্রোপলিস মিউজিয়াম এর ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণে এবং দর্শনার্থীদের কাছে এর ইতিহাস তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই জাদুঘরটি অ্যাক্রোপলিসের নিচে অবস্থিত এবং এটি সেই সব শিল্পকর্মের বাসস্থান যা মূল স্থান থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে।

এথেন্সের অ্যাক্রোপলিস কেবল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, এটি মানব সভ্যতার এক অমূল্য দলিল। এটি গণতন্ত্র, দর্শন, শিল্প এবং স্থাপত্যের এক অসাধারণ মিলনস্থল। অ্যাক্রোপলিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের মেধা কতটা উন্নত হতে পারে এবং কীভাবে একটি সভ্যতা তার আদর্শ ও মূল্যবোধকে স্থাপত্যের মাধ্যমে অমর করে রাখতে পারে।

সবচেয়ে অসুখী প্রজন্ম কোনটা?

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা বিশেষ করে জেন-জি বিশ্বের সব বয়সী মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানসিক অশান্তি এবং হতাশার সম্মুখীন হচ্ছে। এই গবেষণাটি ৪৪টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। আগের ধারণা ছিল মধ্যবয়সী মানুষ সাধারণত মানসিক চাপের শীর্ষে থাকে, কিন্তু এই গবেষণার ফলাফল তা সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিয়েছে। তরুণদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ এবং মানসিক অশান্তির মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে তারা এখন মধ্যবয়সী এবং বৃদ্ধদের তুলনায় অনেক বেশি অসুখী হয়ে পড়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে হতাশার হার ১৯৯৩ সালে ছিল মাত্র ২.৫%, যা ২০২৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৬% এ পৌঁছেছে। একই সময়ে মহিলাদের মধ্যে এই হার ৩.২% থেকে ৯.৩% এ উন্নীত হয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। একই ধারা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও লক্ষ্য করা গেছে। তরুণরা তাদের বয়স্কদের তুলনায় আরও বেশি হতাশা, উদ্বেগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছে।

এর পেছনে নানা কারণ কাজ করছে। বর্তমান তরুণরা স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে অতিরিক্তভাবে যুক্ত। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কিছু সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দেখা ও প্রতিফলিত হওয়ায় তারা নিজের তুলনায় অন্যদের জীবনকে সর্বদা মূল্যায়ন করতে থাকে। এ কারণে আত্মসম্মানহীনতা, সামাজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তরুণদের উপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, সামাজিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করেছে।

অর্থনৈতিক চাপও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বেকারত্ব, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তাহীনতা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ এবং হতাশা বাড়াচ্ছে। শিশু ও কিশোর বয়সে মানসিক নির্যাতন বা বুলিংয়ের মতো অভিজ্ঞতাও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে, যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশেও তরুণদের মধ্যে মানসিক অশান্তি বেড়ে চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে দেখা গেছে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রায় ১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্রামীণ এলাকায় এই হার ১৬.৫%। তবে দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো অনেক সামাজিক অবহেলা এবং স্টিগমা বিদ্যমান। অনেকে মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হলেও চিকিৎসা গ্রহণে দেরি করছে বা সাহায্য চাইতে দ্বিধা করছে।

এই গবেষণার ফলাফল আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, তরুণদের মানসিক সুস্থতার দিকে আমাদের নজর দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। তাদের উদ্বেগ, হতাশা এবং চাপ মোকাবেলায় সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রহণ না করলে, পুরো সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। তরুণদের জন্য সমর্থন, সচেতনতা এবং কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তারা সুস্থ, সুখী এবং সমাজের জন্য গঠনমূলক জীবনযাপন করতে পারে।

ইউক্রেনের মন্ত্রিসভা ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাল রাশিয়া

রাতভর ইউক্রেনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সিরিদেনকো নিশ্চিত করেছেন, এই হামলায় কিয়েভের মন্ত্রীসভা ভবনের ছাদ ও ওপরের তলাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বেসামরিক মানুষদের মধ্যে দুইজন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন শিশু। এছাড়া ১৩ জন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, শনিবার রাতের এই হামলায় রাশিয়া রেকর্ডসংখ্যক ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। হামলার মোট সংখ্যা ৮০০টিরও বেশি। এগুলো অন্তত ৩৭টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। কিয়েভের কিছু আবাসিক ভবনেও আগুন লেগে স্থানীয় মানুষের জন্য চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

কিয়েভের কেন্দ্র এলাকায় এত বড় ধরনের হামলার নজির আগে দেখা যায়নি। কারণ শহরে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা পূর্বে বেশ কার্যকরভাবে হামলা প্রতিহত করত। তবুও এই হামলায় তা বড় পরিমাণে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে।

মস্কো হামলার বিষয়ে এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশ করেনি। চলমান সংঘাতে উভয় পক্ষই বেসামরিক মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলা একটি কৌশলগত বার্তা বহন করছে। তাদের মতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পশ্চিমা দেশগুলোকে ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদানে বিরত রাখার জন্য এই হুমকি বার্তা পাঠিয়েছেন।

হামলার পরপরই কিয়েভের কর্তৃপক্ষ জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্থ ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উদ্ধারকর্মীরা কাজ করছে। আন্তর্জাতিক মহল থেকেও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য যে সাম্প্রতিক এই ঘটনা যুদ্ধের জটিলতা ও নাগরিকদের ঝুঁকির মাত্রা আরও বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পুনরায় কিয়েভের দিকে ফেরাচ্ছে।

নাৎসিরা কিভাবে গণহত্যাকে উদযাপন করত?

গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের পেছনে সাধারণত রাজনৈতিক আদর্শ, জাতিগত ঘৃণা এবং ক্ষমতার লোভের মতো বৃহৎ কারণগুলো আলোচিত হয়। কিন্তু অনেক সময় এই নৃশংসতার গভীরে এমন কিছু অপ্রীতিকর ও অপ্রত্যাশিত উপাদান থাকে যা প্রায়শই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ক্রিস্টোফার আর. ব্রাউনিং, ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহাগেন এবং অন্যান্য ইতিহাসবিদদের গবেষণা থেকে জানা যায়, নাৎসি জার্মানির হলোকাস্ট এবং রুয়ান্ডার গণহত্যার মতো ঘটনাগুলোতে মদ্যপান (alcohol consumption) একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত ভূমিকা পালন করেছিল।

নাৎসি অধিকৃত পোল্যান্ড এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে সংঘটিত গণহত্যাগুলো কেবল নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা এক ধরনের বিকৃত ‘সামাজিক অনুষ্ঠানে’ পরিণত হয়েছিল। জোহান গ্রুনার নামে একজন নাৎসি আমলার সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, ১৯৪২ সালের শুরুর দিকে ‘জার্মান হাউস’-এ একজন গেস্টাপো কর্মকর্তা তার ১,০০০তম মৃত্যুদণ্ড ‘উদযাপন’ করছিল। এই ধরনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম ছিল না। বরং নাৎসিদের বিশেষ করে শুৎজস্টাফেল (SS) এবং জার্মান পুলিশের সদস্যদের মধ্যে গণহত্যার পর উন্মত্ত উদযাপন ছিল একটি নিয়মিত প্রথা।

এই নৃশংসতার উদাহরণের কোনো অভাব নেই। একদল পুলিশ কর্মকর্তা প্রায় ৮০০ ইহুদি মৃতদেহ পোড়ানোর দায়িত্ব পেয়ে সেই সুযোগে বিয়ারের ক্যাগ থেকে পান করছিল। এমনকি মুলার নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা গর্ব করে ‘সে নিজে ইহুদিদের’ আগুন ধরানোর ‘সম্মান’ লাভ করেছিল বলে।পোল্যান্ডের প্রজেমিসল-এ এক ইহুদি মহিলার স্মৃতিচারণেও একই চিত্র উঠে আসে: তিনি পোড়া লাশের গন্ধের সাথে গেস্টাপোদের গান গাইতে এবং মদ্যপান করতে দেখেছিলেন। এই দৃশ্যগুলো প্রমাণ করে, হত্যাকারীদের কাছে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ছিল এক ধরনের ‘বিজয়’, যা উদযাপনের মাধ্যমে আরো বিকৃত আনন্দ দিত।

সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় মদ্যপান এবং ব্যক্তিগত সহিংসতা বা যৌন সহিংসতার মধ্যে সম্পর্ক দেখানো হলেও, গণহত্যামূলক অপরাধে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা এখনও সীমিত। তবে নাৎসি অপরাধীদের ক্ষেত্রে মদ্যপানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, অ্যালকোহল অপরাধীদের মধ্যেকার স্বাভাবিক নৈতিক বাধা এবং সহানুভূতি হ্রাস করে। একজন সাধারণ মানুষ সাধারণত এমন নৃশংস কাজ করতে মানসিক প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। মদ্যপান সেই প্রতিরোধ ভেঙে দেয়, যা হত্যাকাণ্ডকে সহজ করে তোলে। এই কারণেই হ্যানা সেনিকোভা তার সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন যে, SS সদস্যরা প্রথমে ভোজ এবং মদ্যপান করে নিজেদের উন্মত্ত করত এবং তারপর উন্মত্ত হত্যাকাণ্ড শুরু করত।

গণহত্যার পর মদ্যপানের আসর ছিল এক ধরনের পুরস্কার। এটি হত্যাকারীদের মধ্যে এই বার্তা দিত যে, তাদের কাজ অনুমোদিত এবং তা উদযাপনের যোগ্য। এই ব্যবস্থা তাদের ভবিষ্যতে আরও নৃশংস হতে উৎসাহিত করত।

বার বা রেস্তোরাঁগুলো ছিল এমন স্থান যেখানে অপরাধীরা একত্রিত হয়ে মদ্যপান করত এবং তাদের কৃতকর্ম নিয়ে গর্ব করত। এই ধরনের আসর তাদের মধ্যে camaraderie বা গোষ্ঠীগত সংহতি তৈরি করত। মারিয়ানা কাজমিয়েরজাকের সাক্ষ্যে উঠে আসে, কীভাবে জাকশেভোতে SS সদস্যরা গণহত্যর পর ‘মাতাল হয়ে গান গাইত এবং নাচত’। এই আচারগুলো তাদের পুরুষালী কঠোরতা এবং গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করত।

নাৎসিরা শুধু হত্যাকাণ্ড উদযাপনই করত না, বরং কে কত মানুষকে হত্যা করেছে তার হিসাবও রাখত। এটি ছিল এক ধরনের বিকৃত প্রতিযোগিতা।পুলিশ ব্যাটালিয়ন ৬১-এর সদস্যরা ওয়ারশতে ইহুদি ঘেটোর বাইরে একটি বার স্থাপন করেছিল, যার নাম ছিল ‘ক্রোচমালনা’। এই বারটি শুধুমাত্র মদ্যপানের স্থান ছিল না, বরং এখানে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে হত্যার সংখ্যা নিয়ে প্রতিযোগিতা করত। একজন প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেন, “আমি জানি যে কয়েকজন [পুরুষ] তারা কতজনকে গুলি করেছে তার সঠিক হিসাব রাখত। তারা নিজেদের মধ্যেও সংখ্যা নিয়ে গর্ব করত।” পুলিশ ব্যাটালিয়ন ৬১-এর বারের দরজায় প্রায় ৫০০টি দাগ ছিল, যা নিহত ইহুদিদের সংখ্যা নির্দেশ করত। এটি প্রমাণ করে হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে একটি খেলার মতো ছিল, যার স্কোর নিয়ে তারা গর্ব করত।

গণহত্যার সাথে মদ্যপানের এই যোগসূত্র কেবল নাৎসিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় ফরাসি সাংবাদিক জিন হাটজফেল্ড তার বই ‘Machete Season’-এ এই একই ধরনের ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি হুটু হত্যাকারীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে জানতে পারেন স্থানীয় ক্যাবারেট বা বারগুলো ছিল তাদের সামাজিক আড্ডা এবং হত্যাকাণ্ড পরিকল্পনা ও উদযাপনের স্থান। একজন হত্যাকারী বলেন ‘গ্যাংটি প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত কাটাকাটি করে বেড়িয়েছে’। এমনকি একজন নারী সাক্ষী বর্ণনা করেন, লুট করা জিনিসপত্র বিতরণের পর রাতের বেলা কেমন উন্মত্ত উদযাপন চলত, যা ‘বিয়ের চেয়েও বেশি কোলাহলপূর্ণ’ ছিল। এই উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট, গণহত্যায় মদ্যপানের ভূমিকা ছিল আন্তর্জাতিক এবং একটি সাধারণ মানবীয় প্রবণতার অংশ, যা চরম সহিংসতাকে সহজ করে তোলে।

যদিও মাতাল হওয়া গণহত্যার পূর্বশর্ত ছিল না, এটা স্পষ্ট যে অ্যালকোহল এবং মদ্যপানের আচার-অনুষ্ঠান উভয় ক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এটি নাৎসি জার্মানি থেকে রুয়ান্ডা পর্যন্ত, হত্যাকারীদের মানসিক বাধা দূর করে, তাদের মধ্যে গোষ্ঠী সংহতি তৈরি করে এবং তাদের নৃশংসতাকে একটি বিকৃত সামাজিক প্রথায় পরিণত করে।

এই পর্যবেক্ষণগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় গণহত্যা কেবল আদর্শগত বা রাজনৈতিক উন্মাদনার ফল নয়। এটি এমন এক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে মানবীয় দুর্বলতা এবং বিকৃতিগুলো এক জটিল মিথস্ক্রিয়ায় নৃশংসতার জন্ম দেয়। জোহান গ্রুনার-এর ১,০০০তম হত্যাকাণ্ড উদযাপনের ঘটনাটি কেবল একটি একক উদাহরণ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সত্যের প্রতিচ্ছবি। এই সত্যটি হলো, সেই SS লোকটি কেবল তার পার্টিতে মাতাল ছিল না, বরং এক অর্থে সে হত্যাকাণ্ডের কাজটিতেই মাতাল ছিল।