নাৎসিরা কিভাবে গণহত্যাকে উদযাপন করত?

গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের পেছনে সাধারণত রাজনৈতিক আদর্শ, জাতিগত ঘৃণা এবং ক্ষমতার লোভের মতো বৃহৎ কারণগুলো আলোচিত হয়। কিন্তু অনেক সময় এই নৃশংসতার গভীরে এমন কিছু অপ্রীতিকর ও অপ্রত্যাশিত উপাদান থাকে যা প্রায়শই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ক্রিস্টোফার আর. ব্রাউনিং, ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহাগেন এবং অন্যান্য ইতিহাসবিদদের গবেষণা থেকে জানা যায়, নাৎসি জার্মানির হলোকাস্ট এবং রুয়ান্ডার গণহত্যার মতো ঘটনাগুলোতে মদ্যপান (alcohol consumption) একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত ভূমিকা পালন করেছিল।

নাৎসি অধিকৃত পোল্যান্ড এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে সংঘটিত গণহত্যাগুলো কেবল নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা এক ধরনের বিকৃত ‘সামাজিক অনুষ্ঠানে’ পরিণত হয়েছিল। জোহান গ্রুনার নামে একজন নাৎসি আমলার সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, ১৯৪২ সালের শুরুর দিকে ‘জার্মান হাউস’-এ একজন গেস্টাপো কর্মকর্তা তার ১,০০০তম মৃত্যুদণ্ড ‘উদযাপন’ করছিল। এই ধরনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম ছিল না। বরং নাৎসিদের বিশেষ করে শুৎজস্টাফেল (SS) এবং জার্মান পুলিশের সদস্যদের মধ্যে গণহত্যার পর উন্মত্ত উদযাপন ছিল একটি নিয়মিত প্রথা।

এই নৃশংসতার উদাহরণের কোনো অভাব নেই। একদল পুলিশ কর্মকর্তা প্রায় ৮০০ ইহুদি মৃতদেহ পোড়ানোর দায়িত্ব পেয়ে সেই সুযোগে বিয়ারের ক্যাগ থেকে পান করছিল। এমনকি মুলার নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা গর্ব করে ‘সে নিজে ইহুদিদের’ আগুন ধরানোর ‘সম্মান’ লাভ করেছিল বলে।পোল্যান্ডের প্রজেমিসল-এ এক ইহুদি মহিলার স্মৃতিচারণেও একই চিত্র উঠে আসে: তিনি পোড়া লাশের গন্ধের সাথে গেস্টাপোদের গান গাইতে এবং মদ্যপান করতে দেখেছিলেন। এই দৃশ্যগুলো প্রমাণ করে, হত্যাকারীদের কাছে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ছিল এক ধরনের ‘বিজয়’, যা উদযাপনের মাধ্যমে আরো বিকৃত আনন্দ দিত।

সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় মদ্যপান এবং ব্যক্তিগত সহিংসতা বা যৌন সহিংসতার মধ্যে সম্পর্ক দেখানো হলেও, গণহত্যামূলক অপরাধে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা এখনও সীমিত। তবে নাৎসি অপরাধীদের ক্ষেত্রে মদ্যপানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, অ্যালকোহল অপরাধীদের মধ্যেকার স্বাভাবিক নৈতিক বাধা এবং সহানুভূতি হ্রাস করে। একজন সাধারণ মানুষ সাধারণত এমন নৃশংস কাজ করতে মানসিক প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। মদ্যপান সেই প্রতিরোধ ভেঙে দেয়, যা হত্যাকাণ্ডকে সহজ করে তোলে। এই কারণেই হ্যানা সেনিকোভা তার সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন যে, SS সদস্যরা প্রথমে ভোজ এবং মদ্যপান করে নিজেদের উন্মত্ত করত এবং তারপর উন্মত্ত হত্যাকাণ্ড শুরু করত।

গণহত্যার পর মদ্যপানের আসর ছিল এক ধরনের পুরস্কার। এটি হত্যাকারীদের মধ্যে এই বার্তা দিত যে, তাদের কাজ অনুমোদিত এবং তা উদযাপনের যোগ্য। এই ব্যবস্থা তাদের ভবিষ্যতে আরও নৃশংস হতে উৎসাহিত করত।

বার বা রেস্তোরাঁগুলো ছিল এমন স্থান যেখানে অপরাধীরা একত্রিত হয়ে মদ্যপান করত এবং তাদের কৃতকর্ম নিয়ে গর্ব করত। এই ধরনের আসর তাদের মধ্যে camaraderie বা গোষ্ঠীগত সংহতি তৈরি করত। মারিয়ানা কাজমিয়েরজাকের সাক্ষ্যে উঠে আসে, কীভাবে জাকশেভোতে SS সদস্যরা গণহত্যর পর ‘মাতাল হয়ে গান গাইত এবং নাচত’। এই আচারগুলো তাদের পুরুষালী কঠোরতা এবং গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করত।

নাৎসিরা শুধু হত্যাকাণ্ড উদযাপনই করত না, বরং কে কত মানুষকে হত্যা করেছে তার হিসাবও রাখত। এটি ছিল এক ধরনের বিকৃত প্রতিযোগিতা।পুলিশ ব্যাটালিয়ন ৬১-এর সদস্যরা ওয়ারশতে ইহুদি ঘেটোর বাইরে একটি বার স্থাপন করেছিল, যার নাম ছিল ‘ক্রোচমালনা’। এই বারটি শুধুমাত্র মদ্যপানের স্থান ছিল না, বরং এখানে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে হত্যার সংখ্যা নিয়ে প্রতিযোগিতা করত। একজন প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেন, “আমি জানি যে কয়েকজন [পুরুষ] তারা কতজনকে গুলি করেছে তার সঠিক হিসাব রাখত। তারা নিজেদের মধ্যেও সংখ্যা নিয়ে গর্ব করত।” পুলিশ ব্যাটালিয়ন ৬১-এর বারের দরজায় প্রায় ৫০০টি দাগ ছিল, যা নিহত ইহুদিদের সংখ্যা নির্দেশ করত। এটি প্রমাণ করে হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে একটি খেলার মতো ছিল, যার স্কোর নিয়ে তারা গর্ব করত।

গণহত্যার সাথে মদ্যপানের এই যোগসূত্র কেবল নাৎসিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় ফরাসি সাংবাদিক জিন হাটজফেল্ড তার বই ‘Machete Season’-এ এই একই ধরনের ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি হুটু হত্যাকারীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে জানতে পারেন স্থানীয় ক্যাবারেট বা বারগুলো ছিল তাদের সামাজিক আড্ডা এবং হত্যাকাণ্ড পরিকল্পনা ও উদযাপনের স্থান। একজন হত্যাকারী বলেন ‘গ্যাংটি প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত কাটাকাটি করে বেড়িয়েছে’। এমনকি একজন নারী সাক্ষী বর্ণনা করেন, লুট করা জিনিসপত্র বিতরণের পর রাতের বেলা কেমন উন্মত্ত উদযাপন চলত, যা ‘বিয়ের চেয়েও বেশি কোলাহলপূর্ণ’ ছিল। এই উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট, গণহত্যায় মদ্যপানের ভূমিকা ছিল আন্তর্জাতিক এবং একটি সাধারণ মানবীয় প্রবণতার অংশ, যা চরম সহিংসতাকে সহজ করে তোলে।

যদিও মাতাল হওয়া গণহত্যার পূর্বশর্ত ছিল না, এটা স্পষ্ট যে অ্যালকোহল এবং মদ্যপানের আচার-অনুষ্ঠান উভয় ক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এটি নাৎসি জার্মানি থেকে রুয়ান্ডা পর্যন্ত, হত্যাকারীদের মানসিক বাধা দূর করে, তাদের মধ্যে গোষ্ঠী সংহতি তৈরি করে এবং তাদের নৃশংসতাকে একটি বিকৃত সামাজিক প্রথায় পরিণত করে।

এই পর্যবেক্ষণগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় গণহত্যা কেবল আদর্শগত বা রাজনৈতিক উন্মাদনার ফল নয়। এটি এমন এক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে মানবীয় দুর্বলতা এবং বিকৃতিগুলো এক জটিল মিথস্ক্রিয়ায় নৃশংসতার জন্ম দেয়। জোহান গ্রুনার-এর ১,০০০তম হত্যাকাণ্ড উদযাপনের ঘটনাটি কেবল একটি একক উদাহরণ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সত্যের প্রতিচ্ছবি। এই সত্যটি হলো, সেই SS লোকটি কেবল তার পার্টিতে মাতাল ছিল না, বরং এক অর্থে সে হত্যাকাণ্ডের কাজটিতেই মাতাল ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন