কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর জেটিঘাটে এখন ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও সাগরে ইলিশের দেখা নেই। তিন বছর আগেও যেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ত, এখন সেখানে জাল ফেলে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। এই আকস্মিক ইলিশশূন্যতায় জেলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। প্রায় সাত শতাধিক মাছ ধরার ট্রলার বর্তমানে অলস অবস্থায় ঘাটে নোঙর করা রয়েছে।
জেলেরা জানান, এক ট্রিপে সাগরে পাঁচ থেকে সাত দিন থাকতে হয়, যার খরচ প্রায় চার লাখ টাকা। অথচ মাছ বিক্রি করে আয় হচ্ছে এক লাখ টাকারও কম, যা জ্বালানি খরচও মেটাতে পারছে না। এই লোকসানের কারণে অনেক ট্রলারই সাগরে যাচ্ছে না। এখানকার প্রায় ৭০ শতাংশ জেলে পরিবারে এখন দুবেলা খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ আহরণ দিন দিন কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ৩,৯৭৫ মেট্রিক টন ইলিশ বিক্রি হয়েছিল, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২,৫৫৬ মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ বিক্রি হয়েছে মাত্র ১,৬২৮ মেট্রিক টন। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৬৭ মেট্রিক টনে। এই ইলিশের ঘাটতি সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষক এবং ট্রলার মালিকেরা এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ এবং প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। এর পাশাপাশি গভীর সাগরে দেশি-বিদেশি ট্রলিং জাহাজের আনাগোনা বেড়েছে। এসব জাহাজ নিষিদ্ধ ট্রলিং জাল, কারেন্ট জাল ও বেহেন্দি জালের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ আহরণ করছে, যা সামগ্রিকভাবে ইলিশের প্রজাতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
কক্সবাজারের জেলেদের আয় ও জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ছে। সাগরে ইলিশ শূন্য হওয়ার ফলে ট্রলার পরিচালনা ব্যয় ও লাভের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। জেলেরা দীর্ঘ সময় সাগরে থাকলেও ইলিশ ধরা না পড়ায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে ইলিশ সংরক্ষণ, ট্রলিং নিয়ন্ত্রণ ও সাগরের পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য গবেষণা, আইনানুগ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ বান্ধব জাল ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ইলিশের প্রজনন ও সংখ্যার পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় এবং জেলেদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকে।


