Home Blog Page 189

বাংলাদেশ – ভারত সম্পর্ক জয়শঙ্করের কথার জবাব দিলেন : তৌহিদ হোসেন

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশকেই সামাল দিতে হবে। তবে ভারতের আতিথেয়তায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য যে আগুনে ঘৃতাহুতি, এটা স্বীকৃত। একইভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু, বাংলাদেশেরই বিষয়।এটি ভারতের বিষয় হতে পারে না। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সোমবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই প্রতিক্রিয়া জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

এস জয়শঙ্করের বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলবে, সে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের খুব স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এ ব্যাপারে আছে। আমরা ভারতের সঙ্গে গুড ওয়ার্কিং রিলেশন চাই। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এই সম্পর্ক।’ ভারত কেমন সম্পর্ক চায়, সে সিদ্ধান্ত ভারত নেবে উল্লেখ করে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘তবে উনি (এস জয়শঙ্কর) কিছু বলেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্নজন সরকারের ভেতর থেকে কথাবার্তা বলছেন। আমি এটার (জয়শঙ্করের বক্তব্য) ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত বিচার করতে চাই না। এ রকম কথা আমাদের এখান থেকে বলছে, ওনাদের ওখান (ভারত) থেকেও বলছে।

ওনাদের মুখ্যমন্ত্রী তো পারলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠিয়ে দেন। ওনাদের একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তো অহরহ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বলছেন। এগুলো চলতে থাকবে ধরে নিয়েই তো আমরা সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করছি। কাজেই আমাদের অবস্থান হলো আশপাশ থেকে দু-চারজন কী বলল না বলল, সেটাতে মনোযোগ না দিয়ে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করি।’ তিনি বলেন, ‘(তারা) যে কাউকে ভিসা না দিলে আমাদের কিছু বলার নেই। ভিসা দেওয়া হচ্ছে না বা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমরা তো বিকল্প খুঁজে বের করবোই। এগুলো হচ্ছে স্বাভাবিকতা। আমরা ভালো সম্পর্ক চাই। কিন্তু কোনো ধরনের সমস্যা যদি থাকে আমাদের বিকল্প দেখতে হবে।’


মানুষের মাংসের বেসাতি : সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ , সাংবাদিক ও অনুবাদক

” … বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে, এদেশের বড় অংশের তরুণরা দেশ ছাড়তে চায়। এই রাষ্ট্র ধনী কিংবা দরিদ্র, কারও জন্যই সুখকর হয়ে ওঠেনি। উচ্চশিক্ষা লাভ করা তরুণরা এই দেশে যথেষ্ট সুযোগ পায় না, নিজেদের মেধার বিকাশ বা মূল্যায়ন হয় না। তাই সুযোগের আশায় তারা দেশ ছাড়ে। অন্যদিকে, দরিদ্র- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় যাদের পল্লীতে ঈশ্বর পর্যন্ত থাকে না, তারা দেশ ছাড়ে নিতান্ত বাধ্য হয়ে। অনেকের যথেষ্ট চাকরির সুযোগ নেই, ব্যবসার পরিবেশ নেই, এমনকি মানবিক মর্যাদা পর্যন্ত নেই। এইসব দরিদ্র তরুণরা নিজের শেকড় উপড়ে ফেলে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথ পাড়ি দিয়ে বিদেশ যায়। কেউ কেউ মরুভূমির তপ্ত রোদে অল্প কিছু পয়সার আশায় উট চড়ায়, দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে অমানবিক জীবনযাপন করে প্রবল অত্যাচার আর গ্লানি সয়ে।

কেউ কেউ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চায় ছোট নৌকায়, এরপর অবৈধ অভিবাসী হয়ে চোর-পুলিশ খেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে। জঙ্গলে, মরুভূমিতে দিনের পর দিন না খেয়ে, বিভ্রান্ত বেদিশা হয়ে ঘোরে, যদি কোনোমতে সেইসব স্বপ্নের দেশে গিয়ে পরিবারের জন্য কিছু উপার্জন করে পাঠানো যায়। এই অসহায় মানুষগুলোকে দিয়ে ব্যবসা করে সুযোগসন্ধানী দালালরা। … এই যে অগণিত যুবকের বিদেশ যাওয়ার ঢল, তারা কি জানেন না আশু বিপদের কথা ? এত এত উদাহরণ দেখেও কি তাদের টনক নড়ে না ? নিশ্চয়ই তারা জানেন। তবুও, অসহায়ত্ব তাদের বেশিরভাগকে সেদিকে ঠেলে দেয়।

… তৃতীয় বিশ্বের অভাগা বাংলাদেশ যেন গোটা দুনিয়ায় মানুষের মাংসের সাপ্লায়ার। সস্তা শ্রমই এদেশের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। … ইউরোপের শিল্পবিপ্লব শুরুই হয়েছিল শেকড় উপড়ে ফেলার এই প্রক্রিয়া দিয়ে।… কার্ল মার্কস দেখান আসলে কীভাবে এর মাধ্যমে শ্রমিকের উপার্জিত ভ্যালু চুরি করে পুঁজিপতিরা টাকার পাহাড় বানায় আর অসহায় শ্রমিকরা আরও অসহায় হয়। … মানুষকে তার সমাজ, পরিবার, পরিজন থেকে বিভিন্ন পলিসির মাধ্যমে সম্পূর্ণ শেকড়শূন্য করার পরই সে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিজের শ্রম বেচতে যায়। এই মানুষগুলোই যদি দেশে থাকত, তবে রাষ্ট্র বৈদেশিক মুদ্রা পেত না। আর তা না পেলে তার কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ত।

যেমনটা আমরা জুলাই আন্দোলনের সময়ে দেখেছিলাম, রেমিট্যান্স বন্ধের হুমকিতে কী রকম ক্রুদ্ধ হয়েছিল হাসিনাশাহী। জাফর, রহমতদের অমানবিক জীবনের বিনিময়ে তারা ক্ষমতা সংহত করে, ওদেরই পয়সায় গুলি কিনে ওদেরই মারে, অলিগার্করা দেশে আয়েশ করে বিদেশে বেগমপাড়া বানায়। … ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বহু আগে মুক্ত হলেও, আমাদের সোনার বাংলায় সেই মানসিকতা বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তবে কি মানুষের মাংসের বেসাতি করেই এই রাষ্ট্র চলছে? এটাই কি আমাদের নিয়তি!



চেতনা আমাদের শরির – মস্তিস্কের বাইরেও অবস্থান করতে পারে !

মানব চেতনা দর্শন, মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম রহস্যময় এবং ব্যাপক আলোচিত বিষয়। এটি আত্মসচেতনতা, ধারণা এবং চিন্তার ভিত্তি। সামাজিক স্নায়ুবিজ্ঞান, যা অন্বেষণ করে কীভাবে জৈবিক প্রক্রিয়াগুলি সামাজিক আচরণ এবং প্রক্রিয়াগুলিকে প্রভাবিত করে। চেতনা এবং সামাজিক জ্ঞান কীভাবে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত তা বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো প্রদান করে।
চেতনাকে সাধারণভাবে একজন ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক অভিজ্ঞতার সচেতনতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এটি বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত যেমন জাগ্রত থাকা, আত্মসচেতনতা এবং নিজের চিন্তাগুলি পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা। দেকার্ত, কান্ট এবং হেগেলের মতো দার্শনিকরা দীর্ঘকাল ধরে এর প্রকৃতি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেছেন। যখন আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান এর জৈবিক ভিত্তি উন্মোচনের চেষ্টা করছে।

দেকার্তের দর্শন চেতনার স্বতন্ত্রতা ও আত্মপরিচয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়। ইমানুয়েল কান্ট চেতনাকে অভিজ্ঞতার কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যা সময় ও স্থানের মধ্যে আমাদের উপলব্ধির গঠন নির্ধারণ করে। অন্যদিকে হেগেল চেতনাকে ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিকাশের সাথে যুক্ত করেছেন। যেখানে চেতনার বিকাশ আত্মপরিচয় ও পারস্পরিক স্বীকৃতির উপর নির্ভর করে। চেতনা সম্পর্কে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। হ্রাসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ধারণা বলে, চেতনা সম্পূর্ণভাবে স্নায়বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভূত হয় এবং মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। অহ্রাসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি চেতনাকে শুধুমাত্র স্নায়ুবিক ক্রিয়ার ফলাফলের চেয়ে বেশি কিছু বলে মনে করে এবং সম্ভবত এটি বর্তমান বৈজ্ঞানিক বোঝার বাইরেও যেতে পারে।

তবে, বিজ্ঞানীরা বেশ কয়েকটি মস্তিষ্কের অঞ্চল চেতন অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত করেছেন, রেছেন, বিশেষ করে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, থ্যালামাস এবং ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (DMN)। স্নায়ুবৈজ্ঞানিক গবেষণা ইঙ্গিত দেয় বিভিন্ন মস্তিষ্কের অঞ্চলের পারস্পরিক সংযোগ থেকে চেতনা উদ্ভূত হয়। গ্লোবাল ওয়ার্কস্পেস থিওরি বলে যে চেতনা তখনই উদ্ভূত হয় যখন তথ্য মস্তিষ্ক জুড়ে বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারিত হয়। ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন থিওরি প্রস্তাব করে যে চেতনা একটি সিস্টেমের মধ্যে উচ্চমাত্রার সংযুক্ত তথ্যের ফলাফল। হায়ার-অর্ডার থট ধারণাটি বলে চেতনার জন্য নিম্ন-স্তরের মানসিক অবস্থার উপর উচ্চন্তরের চিন্তার প্রতিফলন প্রয়োজন।

সামাজিক স্নায়ুবিজ্ঞান এই বোঝাপড়াকে সম্প্রসারিত করে এবং ব্যাখ্যা করে কীভাবে এই চেতনাগত প্রক্রিয়াগুলি আন্তঃব্যক্তিক মিথস্ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। ১৯৯০-এর দশকে আবিষ্কৃত মিরর নিউরন এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নিউরনগুলো তখন সক্রিয় হয় যখন আমরা কোনো কাজ করি এবং যখন অন্য কাউকে একই কাজ করতে দেখি। এটি একটি ভাগ করা চেতনার অভিজ্ঞতা তৈরি করে এবং সামাজিক বন্ধন ও আবেগগত বোঝাপড়ার উন্নতি ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ যখন আমরা কারো যন্ত্রণা দেখি আমাদের মিরর নিউরন ব্যবস্থা মস্তিষ্কের সেইসব অঞ্চলে সক্রিয় হয় যা আমাদের নিজেদের ব্যথা অনুভব করার সময় সক্রিয় হয়। একইভাবে ক্রীড়াবিদরা যখন তাদের কোচের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো কৌশল অনুশীলন করেন তখন তাদের মস্তিষ্ক সেই কৌশলটি শিখতে সহায়তা করে।

থিওরি অব মাইন্ড বলতে বোঝায় আত্ম ও অপরের মানসিক অবস্থা বোঝার এবং অনুমান করার ক্ষমতা। এটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং নৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য অপরিহার‍্য। মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (mPFC), টেম্পোরোপারিয়েটাল জাংশন (TPJ), এবং সুপিরিয়র টেম্পোরাল সালকাস (STS) এই প্রক্রিয়ায় প্রধান ভূমিকা রাখে। একটি ব্যবহারিক উদাহরণ হলো যখন একজন শিক্ষক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করেন তখন শিক্ষার্থীরা তাদের উত্তর দেওয়ার আগে শিক্ষকের মানসিক অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও সফল বিক্রেতারা ক্রেতাদের আবেগ ও প্রয়োজন বুঝে তাদের কাছে পণ্য উপস্থাপন করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে যে যখন মানুষ গভীর কথোপকথনে লিপ্ত হয় বা একসাথে কাজ করে তখন তাদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ একে অপরের সাথে সমন্বিত হয়। খেলাধুলার জগতে, ফুটবল বা বাস্কেটবল টিমের খেলোয়াড়দের মধ্যে সঠিক বোঝাপড়া এবং সমন্বয় তাদের খেলার গুণগত মান বাড়িয়ে তোলে। মানব চেতনা এবং সামাজিক স্নায়ুবিজ্ঞানের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। সহানুভূতি, থিওরি অব মাইন্ড এবং নিউরাল সিক্রোনির মতো প্রক্রিয়াগুলি প্রমাণ করে যে মানব চেতনা একটি সামাজিক প্রপঞ্চ। এই সম্পর্কের গভীরতর গবেষণা কেবল মানব মনের বোঝার ক্ষেত্রেই নয় মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে মানুষের মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



হাসিনা আমলে মডেল মসজিদ নির্মাণেও লুটপাট !

সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে কমপক্ষে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। মসজিদের জন্য জায়গা অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ, ঠিকাদারি ও অন্যান্য কেনাকাটায় এসব দুর্নীতি হয়েছে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এ বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করেছেন। মডেল মসজিদ প্রকল্পে প্রাথমিক অনুসন্ধানে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের তথ্য পেয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় দুটি পৃথকভাবে এ প্রকল্পের যাবতীয় বিষয় তদন্ত করছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪ সালে প্রতিটি জেলা এবং উপজেলায় একটি করে মডেল মসজিদ তৈরি করার জন্য ৮৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। পরে শেখ হাসিনা সৌদি আরব সফরকালে দেশটির বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল-সৌদের সঙ্গে বৈঠকে এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য প্রস্তাব করেন। সৌদি সরকার এ প্রকল্পে অর্থায়নে সম্মতি দেওয়ার পর এ মডেল মসজিদ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা। যার মধ্যে সৌদি সরকারের অনুদান হিসেবে দেবার কথা ছিল ৮ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করবে বলে জানানো হয়।

সরকার এ বিষয়ে একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করে সৌদি সরকারকে প্রেরণ করে। যাতে প্রতিটি মসজিদের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে গড়ে ১৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি নিয়ে সৌদি সরকারের সন্দেহ হলে তারা নিজস্ব পদ্ধতি প্রয়োগ করে অনুসন্ধানের জন্য ঢাকার একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়। ওই সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিটি মসজিদের জন্য ৮ থেকে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব এ প্রকল্পে অর্থায়ন করতে অসম্মতি জানায়। সৌদি সরকার অর্থায়নে অপারগতা প্রকাশের পর সরকার সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় এবং দুই দফায় অর্থ বরাদ্দ বাড়িয়ে তা সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করে নেয়। শেখ হাসিনার সরকার ৩০০ মসজিদ উদ্বোধন করে গেছে। এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে ৫০টি। নির্মাণ কাজ চলছে আরো ১৮০টি মডেল মসজিদের। ২০২০ সালে এ প্রকল্পের মেয়াদ থাকলেও তার মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।



অতীত ভুলে বিএনপির সাথে সম্পর্ক চায় ভারত

জুলাই গণহত্যার অভিযোগে শিগগিরই ক্ষমতার রাজনীতিতে আসতে পারবে না ভারতের মিত্র আওয়ামী লীগ। গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থি দলগুলো নেমেছে কট্টর ভারত বিরোধিতায়। এমন অবস্থায় আগামী দিনে বিএনপি ক্ষমতায় ধরে নিয়েই দলটিকে আস্থায় আনার চেষ্টা করছে দিল্লি। পশ্চিমা এক কূটনীতিক সমকালকে বলেন – ভারত মনে করে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ছিল চরম ভারতবিরোধী। সেসময় বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের উত্থান ঘটে, বারবার দাবি করে এসেছে ভারত। বিশেষ করে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান সামনে এলে সম্পর্কের চরম অবনতি হয়।

এরপর থেকে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি ভারতের। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ যেভাবে দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকেছে, তাতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রয়োজন অনুভব করেনি দেশটি। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে বিপাকে পড়েছে ভারত। এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে বিএনপিকে ভরসা করা ছাড়া তাদের সামনে ভিন্ন সুযোগ নেই। তাই অতীত পেছনে রেখে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন থেকেই প্রস্তুত করছে দিল্লি। বিএনপিও মনে করছে, ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরিতা রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। সম্পর্ক ভালো না থাকলে কাজ ফেলে প্রতিবেশী মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকতে হবে। এ জন্য দর কষাকষির মনোভাবে রয়েছে বিএনপি।

দলটির নেতারা মনে করছেন-শিক্ষার্থী, সরকার ও জামায়াতের মতো শক্তিকে মোকাবিলা করতে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সমর্থন লাগবে। বিশেষ করে ভারতের সমর্থন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন – এটি স্পষ্ট, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না ভারত। ভারত বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচন দেখতে চাইছে। কারণ এখন নির্বাচন হলে বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সে সুযোগই কাজে লাগাতে চায় তারা। পশ্চিমা কূটনীতিকদের তথ্য অনুযায়ী-অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে, যা দিল্লির কপালে ভাঁজ ফেলছে। আবার তাইওয়ান ইস্যুতে মাঝে কিছুটা দূরত্ব হলেও বিএনপির সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব বেশ পুরোনো। আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে চীন সখ্য গড়ে তোলার আগেই জায়গাটি দখলে মরিয়া ভারত।

উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান জানুয়ারিতে এক আলোচনায় বলেন, ‘বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের সবচেয়ে চিন্তার কারণ পাকিস্তান ও জামায়াতে ইসলামী। …ভারত মনে করছে, বিএনপি এরই মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। ফলে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ভারতকে স্বস্তি দেবে।’



ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা , সেতার : হ্যারিসন ও বিটলস

বিটলসের ‘শান্ত বিটল’ নামে পরিচিত জর্জ হ্যারিসনের জীবনযাত্রা ছিল চমকপ্রদ ও বহুমাত্রিক। পশ্চিমা রকসংগীতের প্রতীক হয়ে ওঠা এই গিটারিস্ট কিভাবে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ক্রমশই ভারতের আধ্যাত্মিকতায় ডুবে গেলেন সে এক রহস্য। হ্যারিসনের সংগীতে, দর্শনে, জীবনযাপনে ভারতীয় সংস্কৃতি, সেতার ও হিন্দুধর্ম গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৬৫ সালের দিকে জর্জ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি প্রথমবার ‘Norwegian Wood’ গানে সেতার ব্যবহার করেন। এটি ছিল পশ্চিমা রকের ইতিহাসে প্রথমবার ভারতীয় কোনো বাদ্যযন্ত্রের সংযোজন। কিন্তু সেতারকে সত্যিকারের উপলব্ধি করতে হলে তো প্রয়োজন গুরু! ১৯৬৬ সালে লন্ডনে ভারতীয় কিংবদন্তি সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে পরিচিত হন জর্জ। এই পরিচয় শুধু সংগীতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না এটি তাকে ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করিয়েছিল।

জর্জ একসময় বলেছিলেন- “ সংগীতে আমি এমন কিছু খুঁজছিলাম যা আরও গভীর, আরও কোমল ও আন্তরিক।” রবিশঙ্কর তাকে কেবল সেতার বাজানোই শেখাননি শিখিয়েছেন ভারতীয় সংগীতের অন্তর্নিহিত আত্মিক দিক। সেতার বাজানোকে ধ্যানের মতো দেখতেন জর্জ।দিনের পর দিন রবিশঙ্করের সঙ্গে বসে রাগ অনুশীলন করতেন। ১৯৬৭ সালে জর্জ ও বিটলসের অন্যান্য সদস্যরা মহারিষি মহেশ যোগীর ট্রান্সেন্ডেন্টাল মেডিটেশন সম্পর্কে জানতে পারেন। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা ভারতের রিশিকেশে মহারিষির আশ্রমে ধ্যানচর্চার জন্য যান। এই সফর বিটলসের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। রিশিকেশে পৌঁছানোর পর বিটলসের জীবনযাপন যেন সম্পূর্ণ বদলে গেল। এখানে তারা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধ্যান করতেন। নিরামিষ খাবার খেতেন এবং প্রকৃতির মাঝে নিজেদের হারিয়ে ফেলতেন।

এই সময়েই বিটলস তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অ্যালবাম ‘The White Album’-এর বেশ কয়েকটি গান লিখেছিলেন। ‘Dear Prudence’, ‘Blackbird’, ‘Mother Nature’s Son’-এগুলো ছিল রিশিকেশে লেখা গান।কিন্তু কিছুদিন পর জন লেনন ও পল ম্যাককার্টনি মহারিষির আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আশ্রম ত্যাগ করেন। জর্জ থেকে যান, এবং আরও বেশি আধ্যাত্মিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন সত্যিকারের শান্তি বাইরের জগতে নয়, নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। তাকে হৃদয় খুঁড়ে বের করতে হবে। রিশিকেশ থেকে ফিরে আসার পর জর্জ ভারতীয় আধ্যাত্মিকতাকে নিজের জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে এলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ইস্কন (ISKCON – International Society for Krishna Consciousness) আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৭০ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গান ‘My Sweet Lord’ হরে কৃষ্ণ মন্ত্রের প্রতি তার ভালোবাসার প্রতিফলন। তিনি শুধু গান গেয়েই থামেননি ইস্কনের ইউরোপীয় মন্দিরগুলোর জন্য বড় অংকের অর্থ দান করেন এবং কৃষ্ণভক্তিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করেন। জর্জ হ্যারিসনের সংগীত ক্রমশ আধ্যাত্মিক হয়ে উঠতে থাকে। ‘All Things Must Pass’ (১৯৭০) অ্যালবামটিতে তার আধ্যাত্মিক চিন্তার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গানগুলোর মূলভাব ছিল জীবনের নশ্বরতা ও ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ। ‘Living in the Material World’ (১৯৭৩) এ তিনি বলেন কিভাবে এই পৃথিবী শুধুমাত্র এক পার্থিব ভ্রমণ, এবং সত্যিকারের অস্তিত্ব খুঁজতে গেলে মায়ার জগত ছাড়তে হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় জর্জ হ্যারিসন মানবতার প্রতি তার দায়বদ্ধতাও প্রকাশ করেন। রবিশঙ্করের অনুরোধে তিনি ‘Concert for Bangladesh’ সংগঠিত করেন। যা ছিল বিশ্বের প্রথম চ্যারিটি কনসার্ট। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এই কনসার্টে বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টারসহ বিশ্বের বড় বড় তারকারা অংশ নেন। এই কনসার্টের মাধ্যমে বাংলাদেশি শরণার্থীদের সহায়তায় ব্যাপক তহবিল সংগ্রহ করা হয় এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় বাংলাদেশের বিপর্যয়ের প্রতি। জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার সংহতির অনন্য নিদর্শন।

১৯৪৩ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে ২৫ই ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা জর্জ হ্যারিসন ১৯৯৭ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। মৃত্যু নিয়ে তিনি কখনো ভয় পাননি। অসুস্থতা যেন শান্তি দিতে আধ্যাত্মিকতার দুয়ার আরো খুলে দিয়েছিলো। ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তার কানে ভগবদ গীতার শ্লোক বাজানো হয়েছিল। জর্জ হ্যারিসনের জীবন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যেখানে সংগীত, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার এক অপূর্ব সংযোগ ঘটেছে। তিনি ছিলেন এক সেতুবন্ধনকারী যিনি ভারতীয় সংগীত ও দর্শনকে পশ্চিমা দুনিয়ায় জনপ্রিয় করেছিলেন।


অভ্রর উত্থান প্রযুক্তির গনতন্ত্রায়ন

একটা সময় পর্যন্ত কিবোর্ডে বাংলা টাইপ করা বেশ চ্যলেঞ্জিং ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। বাংলা টাইপিংকে সহজলভ্য এবং সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে অভ্র কিবোর্ড। ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ মেহদী হাসান খানের হাত ধরে জন্ম নেওয়া এই সফটওয়‍্যারটি শুধু একটি টাইপিং টুল নয়, এটি বাংলা ভাষার ডিজিটাল প্রসারে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২২ বছর পরে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা পেলো অভ্র। আজ বৃহস্পতিবার অভ্রর স্রষ্টা মেহদী ও তার দলের হাতে একুশে পদক তুলে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে যতটা সহজ ভাবছেন, এই কিবোর্ডের পথচলা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না।

অভ্র কিবোর্ড যেভাবে কাজ করে – অভ্র কিবোর্ড একটি ইউনিকোডভিত্তিক বাংলা টাইপিং সফটওয়‍্যার। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো ফোনেটিক টাইপিং পদ্ধতি। ব্যবহারকারী ইংরেজি অক্ষরে বাংলা শব্দের উচ্চারণ লিখলে, সফটওয়‍্যারটি তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলা বর্ণে রূপান্তর করে। উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজিতে ‘ধসর’ লিখলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘আমি’ হয়ে যায়। এ ছাড়া, অভ্রতে বিভিন্ন কিবোর্ড লেআউট (যেমন: প্রভাত, মুনীর অপটিমা, অভ্র ইজি) রয়েছে, যা পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন ব্যবহারকারীরা। উইন্ডোজ, লিনাক্স, ম্যাক, অ্যান্ড্রয়েড, আইওএসড়সব অপারেটিং সিস্টেমে সমানভাবে কাজ করে অভ্র।

বাংলা ভাষাকে সহজতর করতে অভ্র যেভাবে কাজ করেছে – অভ্র কিবোর্ডের আগে বাংলা টাইপিং ছিল জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ২০০৩ সালের আগে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা টাইপিংয়ের প্রধান মাধ্যম ছিল বিজয় কিবোর্ড, যেটি ইউনিকোড সমর্থন করত না। ফলে ইন্টারনেটে বাংলা লেখা প্রায় অসম্ভব ছিল। এ সংকট থেকেই জন্ম নেয় অভ্র। মেহদী হাসান খান নিজের উদ্যোগে ভিজ্যুয়াল বেসিক ডটনেট ব্যবহার করে ইউনিকোডভিত্তিক বাংলা টাইপিং সফটওয়্যার তৈরি করেন। এর ফোনেটিক পদ্ধতি নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য বাংলা টাইপিংকে সহজলভ্য করে তোলে। ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে অভ্রর প্রথম সংস্করণ মুক্তি পায়। অভ্র ওপেন সোর্স এবং বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।

অন্যদিকে বিজয় একটি বাণিজ্যিক সফটওয়ার। টাকা খরচ না করে আপনি বৈধভাবে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন না। বিজয়ের আগ্রাসন – ‘বিজয়’ সফটওয়‍্যারের সত্ত্বাধিকারী আনন্দ কম্পিউটার্সের প্রধান নির্বাহী আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। ২০১০ সালে প্রথম প্রকাশ্যে অভ্রকে ব্যবসায়িক হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেন তিনি। বাধা দিতে শুরু করেন এর প্রসারে।বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর এপ্রিলে একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধে অভ্রকে ইঙ্গিত করে জব্বার অভিযোগ করেন, হ্যাকাররা তার ‘বিজয়’ সফটওয়‍্যারটি চুরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অভ্র কিবোর্ডকে পাইরেটেড সফটওয়্যার হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

অভ্র কিবোর্ডের বিরুদ্ধে একাধিকবার আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন মোস্তাফা জব্বার। অভ্রকে ‘পাইরেটেড সফটওয়‍্যার’ দাবি করার পাশাপাশি এর ইউনিবিজয় লে-আউটকে তার প্যাটেন্টকৃত বিজয় কিবোর্ডের নকল বলে অভিযোগ করেন। এ নিয়ে ২০১০ সালে তিনি কপিরাইট অফিসে অভিযোগ করেন। যার ফলে মেহদী হাসান খানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয় এবং অভ্র থেকে ইউনিবিজয় লে-আউট সরিয়ে নেওয়া হয়। জব্বারের কপিরাইট ভঙ্গের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে গুগল প্লে স্টোর থেকে অভ্রভিত্তিক অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ রিদমিক কিবোর্ড সরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও পরে নতুন লেআউট নিয়ে এটি আবার প্লে স্টোরে ফিরে আসে।

ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৮ সালের মন্ত্রীসভায় টেকনোক্রেট মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন মোস্তাফা জব্বার। তথ্য ও প্রযুক্তি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। অভ্রর জনপ্রিয়তাকে বাধাগ্রস্ত করতে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সব অ্যান্ড্রয়েড ফোনে বিজয় কিবোর্ড বাধ্যতামূলক করে। তবে এর কারণ হিসেবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ জানায়, বিজয় কি-বোর্ড ‘বাংলা লেখার জাতীয় মান’ হয়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগ সব ধরনের অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনে বিজয় অ্যান্ড্রয়েড প্যাকেজ কিট বা এপিকে ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করেড়অর্থাৎ নতুন ফোন ব্যবহারকারীর হাতে যাওয়ার আগেই সেখানে থাকতে হবে বিজয় কিবোর্ড।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি – অভ্রকে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম, মাইক্রোসফট এবং সফটপিডিয়া স্বীকৃতি দিয়েছে। অভ্রর বৈশিষ্ট্য ও জনপ্রিয়তা – অভ্র মূলত ওপেন সোর্স এবং বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য একটি সফটওয়্যার। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো :
১. ফোনেটিক টাইপিং: ইংরেজি অক্ষর দিয়ে বাংলা উচ্চারণ লিখলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলায় পরিবর্তিত হয়।
২. বিভিন্ন লেআউট: অভ্রতে প্রভাত, মুনীর অপটিমা, অভ্র ইজি, জাতীয়সহ বিভিন্ন বাংলা কী-বোর্ড লেআউট রয়েছে।
৩. প্ল্যাটফর্ম স্বাধীনতা: এটি উইন্ডোজ, লিনাক্স, ম্যাক, অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস প্ল্যাটফর্মে কাজ করে।
৪. ফ্রি ও ওপেন সোর্স:
অভ্রর সোর্স কোড উন্মুক্ত, তাই এটি সহজেই উন্নয়ন করা সম্ভব।

এ সফটওয়‍্যার দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিশেষ করে ফেসবুক, ব্লগ এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বাংলা লেখার সুবিধা থাকায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এটি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। উপসংহার – বিশ্লেষকরা মনে করেন, অভ্র শুধু একটি সফটওয়‍্যার নয়, এটি একটি আন্দোলনড়বাংলা ভাষাকে মুক্ত করার আন্দোলন। এটি প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তি শুধু ব্যবসার জন্য নয়, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। মেহদী হাসান খান ও তার দলের প্রচেষ্টা বাংলা ভাষার ডিজিটাল রূপান্তরে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’ড়এ দর্শন নিয়েই অভ্র এগিয়ে চলেছে ভবিষ্যতের পথে।





গণতন্ত্রের পথ দেখিয়েছিল ফরাসি বিপ্লব

ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯) ইউরোপের ইতিহাসে এক বিপ্লবী পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক, সামাজিক, এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বিপ্লবগুলির একটি হিসেবে পরিচিত যার ফলস্বরূপ ফ্রান্সের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বিপ্লবের কারণে যেমন ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ কাঠামো বদলে গিয়েছিল তেমনি এর প্রভাব অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছিল। ফরাসি সমাজ ১৮ শতকের শেষদিকে ছিল ত্রিস্তরীয় (ত্রৈমাসিক) কাঠামো অনুসরণকারী, যা ছিল সমাজের মধ্যে তিনটি শ্রেণি :

প্রথম এস্টেট যাজক শ্রেণি। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ যারা রাজস্ব থেকে অব্যাহতি পেতেন এবং অন্যান্য অনেক বিশেষাধিকার ভোগ করতেন।তাদের কাছে বিশাল ভূমির মালিকানা ছিল এবং তারা সাধারণ জনগণের উপর প্রচুর প্রভাব বিস্তার করত। দ্বিতীয় এস্টেট অভিজাত শ্রেণি। ফ্রান্সের অভিজাত পরিবার এবং জমিদার শ্রেণি। যারা বৃহৎ জমির মালিক এবং রাজকোষ থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করতেন। এই শ্রেণির লোকেরা রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাবশালী ছিলেন এবং সাধারণ জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল না। তৃতীয় এস্টেট সাধারণ জনগণ। কৃষক, শ্রমিক, বুর্জোয়া (মধ্যবিত্ত) এবং অন্যান্য সাধারণ মানুষ যারা রাজস্ব প্রদান করতেন কিন্তু তাদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না। এই শ্রেণি ছিল সবচেয়ে বড় এবং তারা দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর প্রভাবিত অংশ।

ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল একেবারে সংকটময়। রাজা ষোড়শ লুই এবং তার পরে রাজা লুই ফিলিপের মধ্যে অপব্যয় এবং বিদেশী যুদ্ধের জন্য রাজকোষের বিপুল পরিমাণ ঋণ জমে গিয়েছিল। ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে খাদ্য সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, এবং কৃষির উৎপাদন হ্রাস পায় যা সাধারণ জনগণের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে তোলে। এই সংকট আরও বৃদ্ধি পায় রাজ পরিবারের রাজকোষের অপব্যয়ের কারণে।রাজ্যের খাজনা সংগ্রহ করতে গিয়ে সাধারণ জনগণ অব্যাহতভাবে নিঃস্ব হতে থাকে। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল রাজতন্ত্রের প্রতি জনতার অসন্তোষ। ফ্রান্সের রাজতন্ত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন রাজা কিন্তু তাঁর প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং জনগণের শোষণে অভ্যন্ত ছিল। এই পরিস্থিতি তৈরি হতে থাকে যখন রাজা ষোড়শ লুই ১৭৮৮ সালে জাতীয় সংসদে ট্যাক্স বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা তাদের বিরোধিতা জানাতে শুরু করেন এবং তাদের দাবী ছিল রাজস্ব ব্যবস্থায় সমতা আনা।

রাজা তাতে সাড়া দেননি এবং তার পরিবর্তে ১৭৮৯ সালের মে মাসে “এস্টেটস-জেনারেল” (জাতীয় সংসদ) আহ্বান করেন। তৃতীয় এস্টেট তাদের প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানোর দাবি করে এবং যখন তাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়নি তখন তারা একত্রিত হয়ে ২০ জুন টেনিস কোর্টে শপথ নেন যে তারা একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন না করা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হবেন না। এটি ছিল বিপ্লবের প্রথম পদক্ষেপ। তবে ১৪ জুলাই ১৭৮৯ সালে বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটে। এই ঘটনা বিপ্লবের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাস্তিল দুর্গ ছিল রাজতন্ত্রবাদের প্রতীক। যেখানে রাজত্বের শত্রুদের আটক রাখা হতো। বাস্তিল দুর্গের পতন জনগণের মধ্যে এক বিপ্লবী আবেগ সৃষ্টি করে, এবং এটি বিপ্লবের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

ফরাসি বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলির মধ্যে একটি ছিল ১৭৮৯ সালে “মানবাধিকার সনদ” প্রণয়ন। এই সনদে ঘোষণা করা হয় যে সব মানুষের স্বাধীনতা, সমতা, এবং ভ্রাতৃত্ব অধিকার রয়েছে। এটি ফরাসি বিপ্লবের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লবী আন্দোলনের প্রেরণা জোগায়। ১৭৯১ সালে ফ্রান্স একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। যেখানে রাজা এবং আইনসভা একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে শাসন পরিচালনা করতেন। তবে এই পরিবর্তনও সমাজে অপর্যাপ্ত ছিল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে আরও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। এই সময়ে রাজা ষোড়শ লুই এবং তার পরিবার পালানোর চেষ্টা করেন কিন্তু তারা ধরা পড়ে এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভআরও বৃদ্ধি পায়।

১৭৯২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ফ্রান্স একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিপ্লবী আন্দোলন আরও জোরালো হয় এবং রবার্পিয়ার এবং অন্যান্য বিপ্লবী নেতা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করেন। ১৭৯৩ সালে রাজা ষোড়শ লুইকে হত্যা করা হয় এবং বিপ্লবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অনেককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এটি “সন্ত্রাসের সময়কাল” নামে পরিচিত এবং এই সময়ে হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার এবং মৃত্যুদণ্ডিত হয়। ফরাসি বিপ্লব শুধুমাত্র ফ্রান্সের রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করেনি বরং এর প্রভাব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতে বিপ্লবী আবেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপ্লবের ফলে মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার, এবং আইন সবার জন্য সমান হওয়ার ধারণা বিশ্বের বহু দেশে গ্রহণ করা হয়।

এই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল রাজতন্ত্রের অবসান এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এছাড়া জনগণের ক্ষমতার বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেটি পরবর্তীতে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করজেট ফরাসি বিপ্লব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা বিশ্বের ইতিহাসে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে ফ্রান্সের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামো আমূল পরিবর্তিত হয়েছিল এবং এটি পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য প্রেরণা সৃষ্টি করে।ফরাসি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং সামাজিক সমতার ধারণা প্রতিষ্ঠা পায়। এর প্রভাব শুধু ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ ছিল না এটি বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী আবেগ ছড়িয়ে দেয় এবং আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণার প্রচার করে।





২০২৫ এ বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক সংকট এবং বৈশ্বিক চাপের কারণে প্রবৃদ্ধি কমে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকালের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি বিবৃতি অনুযায়ী, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪-৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। শিল্প উৎপাদনে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বন্যা, শ্রমিক অসন্তোষ এবং গ্যাস সংকটের কারণে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। “২০২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আশাব্যঞ্জক নয়,” বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর পুনরুদ্ধারের বৈষম্যকে তুলে ধরছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অভ্যন্তরীণ সংকট এবং বৈশ্বিক চাপের কারণে বাংলাদেশের পুনরুদ্ধারের পথ কঠিন হয়ে উঠেছে। আগামী কয়েক মাস দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ে নীতি সংস্কার, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপনের চেষ্টা করতে হবে। উল্লেখ্য, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা সাম্প্রতিক সরকারের আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। মহামারির পর শেখ হাসিনা সরকারের সময় অর্থনীতি ধীরগতির ছিল, এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪.২২ শতাংশে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার ও রেমিট্যান্স-নির্ভর দেশগুলোর দুর্বল অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা এটির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এক ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন এবং পরবর্তী সরকার পরিবর্তন বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, যা ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করে। এর ফলে ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে মাত্র ১.৮১ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের প্রান্তিকের ৩.৯১ শতাংশ থেকে অনেক কম। ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) টানা দ্বিতীয় মাসের জন্য কমে আসায় বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে এবং জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। “বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যার মাধ্যমে চলতি অর্থবছরের শেষে মূল্যস্ফীতি ২০০-৩০০ বেসিস পয়েন্ট কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে, বিশেষ করে যদি সরবরাহজনিত চাপ অব্যাহত থাকে,” বলেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে প্রবৃদ্ধি ২০২৬ অর্থবছরে আবার ৬ শতাংশ বা তার বেশি হতে পারে। বিশ্বব্যাপী উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধিও মন্থর হতে পারে। ২০২৩ সালে এসব দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৪.৪ শতাংশ থাকলেও, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা কমে ৪.২ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। চীনের রিয়েল এস্টেট সংকট ভোক্তা আস্থার নিম্নগতি এবং ভারতের মহামারী-পরবর্তী চাহিদা হ্রাস এই প্রবৃদ্ধি হ্রাসের প্রধান কারণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র ভারতই ২০২৫ সালে ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, পোশাক রপ্তানির শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং ঈদসহ দুটি ধর্মীয় উৎসবের কারণে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সামগ্রিক মন্দাভাব কিছুটা প্রশমিত করতে পারে।বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান ঋণখেলাপি (NPL), মন্থর আমানত প্রবৃদ্ধি এবং দুর্বল ঋণ পুনরুদ্ধারের ফলে আরও প্রকট হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ইন্টারব্যাংক মার্কেটে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে এবং কিছু ব্যাংককে সাময়িক তারল্য সহায়তা প্রদান করেছে। ঋণখেলাপির ঊর্ধ্বগতি ব্যাংকিং খাতের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং ২০২৫ সালে ঋণখেলাপির হার মোট ঋণের ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। “ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত ফাঁকফোকর এবং অর্থ পাচার ও অবৈধ মূলধন বহির্গমনের মতো অপব্যবহার এসব সমস্যার মূল কারণ,” বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ঋণ শ্রেণিবিন্যাস, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। “নিয়ন্ত্রক তদারকি আরও জোরদার করা এবং এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়,” বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।




স্থানীয় সরকার অচল , সড়ক – পরিচ্ছন্নতাসহ নাগরিক সেবা বেহাল

সরকার পতনের পর অনেক জনপ্রতিনিধি পালিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় সরকারগুলোর কার্যক্রম। দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট সংস্কার, স্যানিটেশন, পানি সরবরাহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সনদ প্রদানসহ সেবামূলক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এতে বাড়ছে জনঅসন্তোষ। অতীতে মেয়রদের কার্যক্রম থাকত মাঠ পর্যায়ে। বর্তমানে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বসানো হলেও মাঠ পর্যায়ে তাদের কোনো তদারকি নেই। এদিকে, অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোয় কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে হয়। কিন্তু এই কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকার কারণেও মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট ওয়াসার কার্যক্রমেও চলছে গতিহীনতা।

ইউনিয়ন পরিষদগুলোর জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা হয়নি। তবে তাদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। তাদের অনেকেই পলাতক। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, আগে পৌরসভার কাউন্সিলররাও এলাকার রাস্তাঘাট-সড়কবাতির জন্য মন্ত্রণালয়ে তদবির করতে আসতেন। এখন কেউ আসেন না। কাউন্সিলর ও মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁর পক্ষে এই অতিরিক্ত কাজ পরিচালনা করা কঠিন। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারগুলো জনপ্রতিনিধিশূন্য থাকায় উন্নয়ন কার‍্যক্রম থমকে পড়েছে। রাস্তা মেরামত, পরিচ্ছন্নতা, সড়কবাতি, মশক নিয়ন্ত্রণসহ নানা ধরনের কাজ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আগে সরাসরি তদারক করতেন।

সিটি করপোরেশনগুলোতে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের দায়িত্ব আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের (আনিক) দেওয়া হয়েছে। এখন একজন কর্মকর্তাকে নিজস্ব দাপ্তরিক কাজ ছাড়াও ১০ থেকে ১৫টি ওয়ার্ডের কার্যক্রম তদারকি করতে হচ্ছে। এতে কোনো কাজই ঠিকমতো হচ্ছে না। স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আগে জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিতেন। সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সেগুলো বাস্তবায়ন হতো। গত ছয় মাসে একটিও নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। আগে মেয়র-কাউন্সিলররা তাদের স্বার্থেই এসব প্রকল্প গ্রহণ ও বরাদ্দের জন্য সর্বক্ষণ তদবির-সুপারিশ করতেন। সংশ্লিষ্টদের মত, দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন বা সব স্তরে জনঘনিষ্ঠ প্রশাসক নিয়োগ জরুরি। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তা আটকে আছে।