” … বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে, এদেশের বড় অংশের তরুণরা দেশ ছাড়তে চায়। এই রাষ্ট্র ধনী কিংবা দরিদ্র, কারও জন্যই সুখকর হয়ে ওঠেনি। উচ্চশিক্ষা লাভ করা তরুণরা এই দেশে যথেষ্ট সুযোগ পায় না, নিজেদের মেধার বিকাশ বা মূল্যায়ন হয় না। তাই সুযোগের আশায় তারা দেশ ছাড়ে। অন্যদিকে, দরিদ্র- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় যাদের পল্লীতে ঈশ্বর পর্যন্ত থাকে না, তারা দেশ ছাড়ে নিতান্ত বাধ্য হয়ে। অনেকের যথেষ্ট চাকরির সুযোগ নেই, ব্যবসার পরিবেশ নেই, এমনকি মানবিক মর্যাদা পর্যন্ত নেই। এইসব দরিদ্র তরুণরা নিজের শেকড় উপড়ে ফেলে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথ পাড়ি দিয়ে বিদেশ যায়। কেউ কেউ মরুভূমির তপ্ত রোদে অল্প কিছু পয়সার আশায় উট চড়ায়, দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে অমানবিক জীবনযাপন করে প্রবল অত্যাচার আর গ্লানি সয়ে।
কেউ কেউ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চায় ছোট নৌকায়, এরপর অবৈধ অভিবাসী হয়ে চোর-পুলিশ খেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে। জঙ্গলে, মরুভূমিতে দিনের পর দিন না খেয়ে, বিভ্রান্ত বেদিশা হয়ে ঘোরে, যদি কোনোমতে সেইসব স্বপ্নের দেশে গিয়ে পরিবারের জন্য কিছু উপার্জন করে পাঠানো যায়। এই অসহায় মানুষগুলোকে দিয়ে ব্যবসা করে সুযোগসন্ধানী দালালরা। … এই যে অগণিত যুবকের বিদেশ যাওয়ার ঢল, তারা কি জানেন না আশু বিপদের কথা ? এত এত উদাহরণ দেখেও কি তাদের টনক নড়ে না ? নিশ্চয়ই তারা জানেন। তবুও, অসহায়ত্ব তাদের বেশিরভাগকে সেদিকে ঠেলে দেয়।
… তৃতীয় বিশ্বের অভাগা বাংলাদেশ যেন গোটা দুনিয়ায় মানুষের মাংসের সাপ্লায়ার। সস্তা শ্রমই এদেশের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। … ইউরোপের শিল্পবিপ্লব শুরুই হয়েছিল শেকড় উপড়ে ফেলার এই প্রক্রিয়া দিয়ে।… কার্ল মার্কস দেখান আসলে কীভাবে এর মাধ্যমে শ্রমিকের উপার্জিত ভ্যালু চুরি করে পুঁজিপতিরা টাকার পাহাড় বানায় আর অসহায় শ্রমিকরা আরও অসহায় হয়। … মানুষকে তার সমাজ, পরিবার, পরিজন থেকে বিভিন্ন পলিসির মাধ্যমে সম্পূর্ণ শেকড়শূন্য করার পরই সে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিজের শ্রম বেচতে যায়। এই মানুষগুলোই যদি দেশে থাকত, তবে রাষ্ট্র বৈদেশিক মুদ্রা পেত না। আর তা না পেলে তার কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ত।
যেমনটা আমরা জুলাই আন্দোলনের সময়ে দেখেছিলাম, রেমিট্যান্স বন্ধের হুমকিতে কী রকম ক্রুদ্ধ হয়েছিল হাসিনাশাহী। জাফর, রহমতদের অমানবিক জীবনের বিনিময়ে তারা ক্ষমতা সংহত করে, ওদেরই পয়সায় গুলি কিনে ওদেরই মারে, অলিগার্করা দেশে আয়েশ করে বিদেশে বেগমপাড়া বানায়। … ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বহু আগে মুক্ত হলেও, আমাদের সোনার বাংলায় সেই মানসিকতা বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তবে কি মানুষের মাংসের বেসাতি করেই এই রাষ্ট্র চলছে? এটাই কি আমাদের নিয়তি!


