Home Blog Page 187

দেশে চাকরি কেড়ে নিচ্ছে এআই

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) প্রতিষ্ঠান স্কাইটেক সলিউশনস একটি সাফল্যমণ্ডিত প্রকল্প চালু করেছিল। যার মাধ্যমে ৫০ জনেরও বেশি কর্মী ঘণ্টায় সাড়ে আট ডলার ইনকাম করতে পারতেন। তাদের কাজ ছিল উবার ফ্রেইট পরিষেবার চালান তৈরি এবং তা কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম) সিস্টেমে আপলোড করা। এই কাজটি গ্রাহকের মতামত এবং সন্তুষ্টি বাড়াতে সহায়ক ছিল এবং ব্যবসার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। কিন্তু গত বছর থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বিপ্লব ঘটিয়েছে, যার ফলে এই প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। স্কাইটেকের প্রতিষ্ঠাতা মুসনাদ ই আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, “এআই অটোমেশন এখন বেশিরভাগ কাজ করছে, আর কর্মীরা শুধুমাত্র মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবেন।” এর ফলস্বরূপ, কর্মী সংখ্যা ৫৫ থেকে কমে ১০ জনে নেমে এসেছে।

এআই দ্বারা ডেটা এন্ট্রি এবং কাস্টমার সাপোর্টের মতো রুটিন কাজ স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় বিপিও খাতে কর্মী সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।এই পরিবর্তন দেশটির বিপিও খাতকে বড় ধরনের সংকটে ফেলে দিয়েছে, কারণ বেশিরভাগ কর্মী সাধারণত স্বল্প-দক্ষতার প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ করতেন। এআই প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই বিপিও খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। মুসনাদ ই আহমেদ জানিয়েছেন গত দেড় বছরে ৩০ শতাংশ এন্ট্রি-লেভেল কর্মী তাদের চাকরি হারিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে, যেসব কাজ পূর্বে মানুষের মাধ্যমে করা হতো, সেগুলি এখন এআই-এর মাধ্যমে হয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, গ্রাহক সহায়তা, সেবা বিক্রি, এবং বিপণন পরিষেবার কাজ এখন বেশিরভাগই এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।

এআইয়ের মাধ্যমে পিৎজা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ফোনে অর্ডার নিতে সক্ষম হচ্ছে, যেখানে গ্রাহকরা কোন ধরনের পিৎজা চান তা এআই জানাতে পারে। একাধিক প্রতিষ্ঠানের এআই ব্যবহারের ফলে তারা এন্ট্রি-লেভেল কাজের চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে, প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ দক্ষতার কাজগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, যেমন স্টেটমেন্ট প্রসেসিং, ব্যালেন্স ট্রান্সফার এবং গোপনীয় তথ্য পরিচালনা, যেগুলোর জন্য দক্ষ কর্মী প্রয়োজন। এই পরিবর্তনগুলো বিপ্লব ঘটাচ্ছে বাংলাদেশে বিপিও খাতের কর্মসংস্থানে ।গ্রাফিকপিপলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ ইলাহী জানিয়েছেন, এআই স্বয়ংক্রিয় ইমেজ এডিটিং ও ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভাল কাজে কর্মদক্ষতা বাড়াচ্ছে। তবে, কিছু প্রতিষ্ঠানের মতে এআই সব চাকরি দখল করবে না, কাজের গতিও বাড়াবে।

এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির সাথে সাথে কর্মসংস্থানের কাঠামো বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়‍্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর সভাপতি রাসেল টি আহমেদ বলেন, “এআইয়ের কারণে কর্মঘণ্টা নির্ধারণে পরিবর্তন আসছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কাজের সময় কমিয়ে আনছে।” বাংলায় এআইয়ের দক্ষতা এখনও তেমন উন্নত না হলেও ভবিষ্যতে এটি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্টাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের সভাপতি ওয়াহিদ শরীফ মনে করেন, “এন্ট্রি-লেভেলের চাকরিগুলো বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, তবে বাংলায় এর প্রভাব এখনও পরিলক্ষিত হয়নি।”

বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। মুসনাদ ই আহমেদ ও বেসিসের সভাপতি রাসেল টি আহমেদ উভয়ই মনে করেন, “সরকার এবং ব্যবসায়িক খাতের নেতারা দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে, বাংলাদেশ দ্রুত একটি নতুন বিপ্লবের মুখে পড়বে।” এই পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের বিপিও খাতের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে, যা ভবিষ্যতের জন্য গভীরভাবে ভাবনার বিষয়।

ক্যারিয়ারে উন্নতির পাঁচটি টিপস

আপনি যদি প্রথম চাকরি জীবনে অফিসে ছোট পদে জয়েন করেন তবে এক্ষেত্রে ব্যাথিত না হয়ে ভাবতে হবে আপনার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ! সঠিক মনোভাব এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে এখান থেকেই আপনি আপনার ক্যারিয়ারে সফলতা অর্জন করতে পারেন। এখানে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ টিপস দেওয়া হলো যেগুলো পেশাগত জীবনে উন্নতি আনতে সহায়ক হবে। উপকারিতা থেকে শেখার মনোভাব রাখুন
মনে রাখবেন, যত ছোট পদে কাজ করছেন তত বেশি শেখার সুযোগ রয়েছে আপনার। প্রতিটি কাজের মধ্যেই নতুন কিছু শেখার সুযোগ থাকে।যেগুলো পরবর্তীতে আপনার ক্যারিয়ারের উন্নতিতে সহায়ক হবে। তাই যে কাজই দেওয়া হোক, সেগুলির মধ্যে কিছু না কিছু শেখার মনোভাব রাখুন।

দক্ষতা এবং কাজের প্রতি নিবেদন প্রদর্শন করুন আপনি যদি নিজের কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও প্রতিশ্রুতি দেখান তবে অন্যরা আপনার প্রতি বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা রাখবে। নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে হলে প্রতিদিন পরিশ্রমী হতে হবে এবং নতুন কিছু শেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। নেতৃত্বের গুণাবলী তৈরি করুন যদিও আপনি একটি ছোট পদে আছেন তবুও নেতৃত্বের গুণাবলী তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহকর্মীদের যেকোনো সাহায্য করতে এবং সমস্যা সমাধান করতে প্রস্তুত থাকুন। এভাবে আপনি ধীরে ধীরে সবার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবেন।

নেটওয়ার্কিং করুন আপনার কাজের পরিবেশে বিভিন্ন মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন। অফিসে নেটওয়ার্কিং করা আপনাকে নতুন সুযোগ এবং জানাশোনা তৈরি করতে সাহায্য করবে। এটি আপনার ক্যারিয়ারে সফলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
পেশাদার মনোভাব বজায় রাখুন আপনার পদ যাই হোক, সর্বদা পেশাদার মনোভাব বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, সময়ানুবর্তিতা এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করলে আপনি সকলের কাছে ভালো প্রভাব ফেলবেন, এটিও ক্যারিয়ার উন্নতিতে সাহায্য করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ‘স্বাধীনতা’র ডাক জার্মানির পরবর্তী চ্যান্সেলরের

নির্বাচনে জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে ইউরোপকে মুক্ত করার ডাক দিয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর – ইলেক্ট ফ্রিডরিখ মের্জ। জার্মানির নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হস্তক্ষেপেরও সমালোচনা করেছেন তিনি। রোববার এক টেলিভিশন আলোচনায় মের্জ বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হবে যত দ্রুত সম্ভব ইউরোপকে শক্তিশালী করা, যাতে ধাপে ধাপে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি।’ ৬৯ বছর বয়সী মের্জ আরও বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি, আমাকে টেলিভিশনে এমন কিছু বলতে হবে। কিন্তু গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের পর এটা বলতেই হয়, মার্কিনিরাড়অন্তত তাদের বর্তমান প্রশাসন যে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত না, তা একেবারে স্পষ্ট।’ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপেরও সমালোচনা করেন তিনি।

‘ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপ কোনো অংশেই মস্কোর হস্তক্ষেপের চেয়ে কম নাটকীয়, আগ্রাসী বা অবমাননাকর না। আমরা দুই দিক থেকেই ব্যাপক চাপের মুখে আছি। যে কারণে আমার প্রধান অগ্রাধিকার হবে ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ করা,’ বলেন তিনি। নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইলন মাস্ক জার্মানির অতি ডানপন্থি দল এবং ‘নব্য-নাৎসি’ হিসেবে সমালোচিত অল্টারনেট ফর জার্মানিকে (এএফডি) সমর্থন দেন। মাস্কের এই সমর্থন ভালোভাবে নেয়নি জার্মানির কোনো রাজনৈতিক দল।

গৃহকর্মীদের অধিকার স্বীকৃতি ও সুরক্ষার লড়াই

শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের শ্রমশক্তির পরিমাণ ৭কোটি ৩৭ লাখ। এ শ্রমশক্তি বিভক্ত হয়ে আছে ৪০৫ ধরনের কাজে। সেখানে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে ৪৬টি খাতে। বাকিগুলো সরকারি হিসাবে নেই। শ্রম খাতের সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেছেন, “শ্রমশক্তির বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে থাকলেও সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে মাত্র ৪৬টি খাতে। গৃহকর্মীরা এর বাইরে থেকে গেছেন, যা তাদের সুরক্ষাহীন করে রেখেছে।”

গৃহকর্মীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক না এখনও। গৃহকর্ম একটি অপরিহার্য শ্রম হলেও সমাজে এটি অবহেলিত।রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “আমাদের সমাজে যে কাজগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়, সেগুলোকেই অবহেলা করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও গৃহকর্মীরা তার অন্যতম উদাহরণ।” গৃহকর্মীরা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। এ খাতে নিয়োজিত প্রায় ২০ থেকে ৪০ লাখ শ্রমিক প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

২০১৫ সালে সরকার “গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি” প্রণয়ন করলেও তা আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি। রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও আইন না থাকায় গৃহকর্মীরা সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। শ্রম আইনের একটি ধারা বলছে, এটি সব শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য। আবার অন্য একটি ধারা বলছে, গৃহকর্মীরা এর আওতায় পড়বে না। এই দ্বৈত নীতির কারণেই শ্রম খাতে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে।” গৃহকর্মীদের আইনি স্বীকৃতি না দেওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত মালিকপক্ষ চায় না তারা মজুরি ও অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হোক। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে অনেকেই গৃহকর্মীদের ন্যায্য মজুরি দিতে চান না। রাজেকুজ্জামান রতনের মতে, “আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণি গৃহকর্মীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দিতে সক্ষম নয়।”

বাংলাদেশের শ্রম আইনে ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ থাকলেও গৃহকর্মীরা এর বাইরে রয়েছেন। দেশে প্রায় ৭কোটি ৩৭ লাখ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৩৪ লাখ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় রয়েছেন। অর্থাৎ, শ্রমিকদের ৮৫ শতাংশই অসংগঠিত। রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “শ্রমিকরা যখন সংগঠিত হতে পারে না, তখন তারা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে পারে না। মালিকরা পুঁজি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার কারণে শক্তিশালী। কিন্তু শ্রমিকরা অসংগঠিত ও দুর্বল।” রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “সংস্কার কমিশনের লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা। আমাদের সুপারিশ হবে, গৃহকর্মীদের শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন ও হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবসরের পর তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার প্রদান করতে হবে।”

অনেক সময় সরকার শ্রমিক আন্দোলনকে “ষড়যন্ত্র” হিসেবে দেখায়। তবে রাজেকুজ্জামান রতন মনে করেন, শ্রমিকদের আন্দোলন মূলত তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের চেষ্টা। তিনি বলেন, “শ্রমিকরা যদি সন্তুষ্ট থাকত, তাহলে বাইরের কোনো শক্তি তাদের উসকানি দিতে পারত না। সরকারকে উচিত শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা যাতে অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়।” বাংলাদেশের শ্রম সংস্কার নিয়ে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। গৃহকর্মীরা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবাহে বড় ভূমিকা রাখলেও তারা সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতির অভাবে নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। শ্রম আইন সংশোধন করে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা দিতে হবে যেন তারা মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।


বিএনপি কঠোর উদারীকরণ ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাণিজ্য চালু করবে : আমীর খসরু ; অভ্যন্তরীণ বাজার নির্ভর শিল্পায়নে মনোযোগ দিন : রেহমান সোবহান

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ – সিপিডি আয়োজিত ‘রিকমেন্ডেশন বাই দ্য টাস্ক ফোর্স অন রিস্ট্র্যাটেজিসিং দ্য ইকোনমি’ শীর্ষ সেমিনারে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন – রপ্তানি বহুমুখী করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তার ভাষ্য, “আপনি যদি চীনের মতো দেশগুলো দেখেন, চীন মূলত তার শিল্পায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে তাদের বিলিয়ন ডলারের একটি অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল। চীনে আসা এফডিআইয়ের প্রধান প্রাথমিক আকর্ষণ ছিল চীনা বাজারে প্রবেশ করা। “অটোমোবাইল নির্মাতাদের সবাই চীনে এসেছিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে চীনকে অটোমোবাইলের বৃহত্তম প্রস্তুতকারক বানিয়েছিল। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার এর প্রধান আকর্ষণ ছিল। ইলেকট্রনিক গাড়ির ক্ষেত্রে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রপ্তানিকারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।”

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেন, “সর্বোপরি, আপনার যদি ১৭৫ মিলিয়ন মানুষ থাকে এবং এই অভ্যন্তরীণ বাজার প্রতি বছর ৬% হারে বৃদ্ধি পায়, এটি অবশ্যই একটি খুব আকর্ষণীয় বাজার। যারা বাংলাদেশে এফডিআই নিয়ে এসেছে তারাও সেই বাজারকে লক্ষ্য করে এসেছে। তাই এই বাজারটি পর্যাপ্তভাবে কাজে লাগানো হয়েছে কি না, এই নির্দিষ্ট বাজারে গুণগত উন্নতি করা যেতে পারে কি না এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে পরিপক্ব হওয়া এবং তারপর রপ্তানিতে পাঠানো যেতে পারে এমন পণ্য যেমন-সাইকেলওয়ালটন থেকে আসা দেশীয় ইলেকট্রনিক পণ্য এবং এই ধরনের পণ্য, … রপ্তানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের দিকে ফোকাস কারা উচিত।” সেমিনারে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন-বিএনপি ক্ষমতায় এলে উদার ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাণিজ্যে জোর দিবে; সেক্ষেত্রে ‘কঠিন সংস্কারের’ পথে হাঁটবে।

বিএনপি সরকারের সাবেক এ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন-‘উই আর গোয়িং টু সিরিয়াস সিরিয়াস ডি-রেগুলেশন। সিরিয়াস লিবারালাইজেশন। ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রে, ইকোনমির ক্ষেত্রে আমরা গভর্নমেন্টের রোল কমিয়ে আনব অ্যাবসলিউটলি।” তিনি বলেন, “বালাদেশের ইকোনমির রিক্যালিব্রেট, রিসেট যদি করতে হয়, প্রথমেই নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও উদারীকরণ করতে হবে অর্থনীতির। তখন দেশে কনফিডেন্স বাড়বে, বিদেশিদের কনফিডেন্স বাড়বে এবং এটাই একমাত্র পন্থা সামনে আগানোর। এটা হবে যন্ত্রণাদায়ক, কঠিন সংস্কার। এখানে হয়ত কিছু প্রতিরোধও থাকবে এবং ভালোভাবে জানি, বাংলাদেশ এটা বাদ দিতে পারবে না।”

তিনি আরো বলেন, “যদি কোনো পণ্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়, সে তা আমদানি করুক, স্থানীয় সম্পদ দিয়ে হোক বা আঞ্চলিক সম্পদ ব্যবহার করে হোক, সেই শিল্প সত্যিকার অর্থে টেকসই হবে। নইলে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়া যা বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং ভোক্তার ওপর প্রভাব ফেলবে, তা হবে ক্ষতিকর।” তাঁর ভাষ্য- “আমাদের পার্টিতে একটি গভীর আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে এবং এই বিষয়ে আমরা একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি… আমাদের অর্থনৈতিক নীতি… আমাদের সংস্কার কর্মসূচির মধ্যে থাকবে। এ সবই আমাদের অর্থনৈতিক নীতির প্রতিফলন হবে।”


নিয়ানডারথালদের বিলুপ্তি এবং হোমো স্যাপিয়েন্সের টিকে থাকার রহস্য

শতাব্দী ধরে নিয়ানডারথাল মানুষ বৈজ্ঞানিকদের জন্য একটি বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। এই প্রাচীন হোমিনিন প্রজাতিটি প্রায় ৫০০,০০০ বছর ধরে পৃথিবী জুড়ে বসবাস করেছিল এবং প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে হঠাৎ হারিয়ে যায়। তাদের বিলুপ্তির কারণ আজও এক রহস্য। যার ওপর আর্কিওলজিস্টরা বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে আসছেন। সম্প্রতি লুডোভিক স্লিমাক এবং তার দল এমন কিছু চমকপ্রদ নতুন তথ্য উন্মোচন করেছেন যা আমাদের নিয়ানডারথালদের জীবন, তাদের বিলুপ্তির কারণ এবং হোমো স্যাপিয়েন্সের ইতিহাস সম্পর্কে গভীরতর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করছে।

নিয়ানডারথালরা প্রায় ৪০০,০০০ বছর আগে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে অভিবাসন করে। যেটাকে ইতিহাসে মানবতার জন্মস্থান বলা হয়।এতদিন ধরে সাধারণ ধারণা ছিল যে হোমো স্যাপিয়েন্স আফ্রিকা থেকে ইউরোপে একক একটি ঢেউয়ে অভিবাসন করেছিল প্রায় ৪২,০০০ বছর আগে, এবং এটাই ছিল নিয়ানডারথালদের বিলুপ্তির কারণ। কিন্তু স্লিমাকের সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণার মাধ্যমে এই ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

নিয়ানডারথালদের নিয়ে নতুন গবেষণার আলোতে দেখা যায় ২০২২ সালে স্লিমাক তার গবেষণা প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি রোন ভ্যালির মড্রিন গরট থেকে একটি হোমো স্যাপিয়েন্স দাঁতের সন্ধান পেয়েছিলেন তারা। এই গবেষণা পর্যালোচনার মাধ্যমে স্লিমাক এমন একটি সময়রেখা প্রকাশ করেন যা আমাদের পূর্ব ধারণাগুলোকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। তিনি দাবি করেন হোমো স্যাপিয়েন্সের ইউরোপে অভিবাসন একটি একক ঢেউয়ে ঘটেনি। বরং তিনটি ঢেউ ছিল যার মধ্যে শেষটি প্রায় ৪২,০০০ বছর আগে ঘটেছিল। স্লিমাকের গবেষণা ধারণা দেয় যে হোমো স্যাপিয়েন্সরা ইউরোপে প্রায় ১০,০০০ বছর আগে পৌঁছেছিল এবং তারা নিয়ানডারথালদের সাথে অনেক বেশি সময় ধরে একসাথে বসবাস করেছিল। নিয়ানডারথালদের বিলুপ্তি এবং হোমো স্যাপিয়েন্সের টিকে থাকার জন্য স্লিমাক একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পরীক্ষা করেছেনড়তাদের তৈরি সরঞ্জাম।

স্লিমাকের গবেষণা দেখায় দুটি মানব প্রজাতির তৈরি সরঞ্জামের মধ্যে সিস্টেম্যাটিক পার্থক্য ছিল। যা তাদের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি লেবাননের কসার ‘আকিল গুহার খনন করা ফ্লিন্ট টুলস এবং ফ্রান্সের টুলসগুলোর তুলনা করেন। স্লিমাক লক্ষ করেন হোমো স্যাপিয়েন্সের সরঞ্জামগুলো একে অপরের সাথে একইরকম ছিল। যা তাদের উন্নত মানসম্মতকরণ এবং সিরিজ আকারে উৎপাদনের প্রবণতা প্রকাশ করে। অন্যদিকে নিয়ানডারথালদের সরঞ্জামগুলো একে অপর থেকে আলাদা ছিল এটি তাদের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার অভাবের ইঙ্গিত দেয়।

স্লিমাকের মতে হোমো স্যাপিয়েন্সের এই মানসম্মতকরণের প্রবণতা সম্ভবত তাদের প্রগতিশীলতা এবং টিকে থাকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা প্রদান করেছিল। নিয়ানডারথালদের তুলনায় হোমো স্যাপিয়েন্সের সরঞ্জাম তৈরি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া ছিল আরও উন্নত এবং সিস্টেম্যাটিক। এটি তাদের সমাজের উন্নতির জন্য একটি বিশেষ শক্তি ছিল যেটি তাদের বিলুপ্তির মুখে টিকে থাকার ক্ষেত্রেও সহায়ক ছিল। স্লিমাকের গবেষণা আমাদের পুরনো ধারণাগুলো পুনঃমূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে এবং মানব প্রজাতির ইতিহাসের একটি নতুন দিক উন্মোচন করছে। যদিও নিয়ানডারথালদের বিলুপ্তি এখনো রহস্যময়। তবে তাদের এবং হোমো স্যাপিয়েন্সের মধ্যে পার্থক্যগুলো আমাদের উন্নতির পথে গুরুত্বপূর্ণ আলো ফেলতে সাহায্য করছে। এর ফলে আমরা আমাদের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের দিকে আরও পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে সক্ষম হবো।


খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সমস্যা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। বর্তমানে ২.৩ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে ভুগছে এবং ৩.১ বিলিয়ন মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যয় বহন করতে পারছে না। ২০১৭ সালের পর থেকে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। বিশেষত এশিয়া অঞ্চলে যেখানে ৪২৫ মিলিয়ন মানুষ অপুষ্টির শিকার। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশে ১৮.৮ মিলিয়ন মানুষ অপুষ্টির শিকার এবং ১২০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ব্যয় বহন করতে পারে না।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ৪০ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল রয়েছে এবং বাজারে পাওয়া ৬০ শতাংশ শাকসবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক পাওয়া গেছে। এই ভেজাল খাদ্য ৩৩ শতাংশ মানুষের বিভিন্ন রোগ এবং পাঁচ বছর বয়সের নিচে ৪০ শতাংশ শিশুর অসুস্থতার প্রধান কারণ। বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলার মাটিতে প্রয়োজনীয় জৈব উপাদানের অভাব রয়েছে। এটিও অনিরাপদ ফসল উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সংকট নিরসনে ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফে নামক সংস্থা প্রান্তিক কৃষকদের জৈবপদ্ধতি অনুশীলনের মাধ্যমে একটি স্থায়িত্বশীল ও সহনশীল স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে। টেকসই উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্থাটি পাঁচটি কৌশল অবলম্বন করেছে:

পার্টিসিপেটরি গ্যারান্টি সিস্টেম (PGS) প্রবর্তন করে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য নিরাপদ ও জৈব চাষাবাদের মানদণ্ড অনুসারে সার্টিফিকেশন প্রদান। জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির চর্চার মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বাড়াতে ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি ও কৌশল বাস্তবায়ন। জৈব কৃষক দল গঠন ও জৈব চাষাবাদে সহায়তা করে কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও জৈব কৃষিকে জনপ্রিয় করা। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সেবাদানকারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে নীতি নির্ধারকদের
সম্পৃক্ত করা। ভোক্তা পর্যায়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা।

ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফের প্রকল্প কার্যক্রমের ফলে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। প্রকল্প এলাকায় ৫৫ শতাংশ কৃষক জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুষ্টিসমৃদ্ধ জৈব ফসল উৎপাদন করছেন। ৬৮ শতাংশ পরিবারের খাদ্যে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রকল্পের সাথে যুক্ত ৪৫ শতাংশ কৃষকের মধ্যে ২০ শতাংশের আয় বেড়েছে বলে জানা গেছে জরিপে। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রমকে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষক, খাদ্য উদ্যোক্তা, ভোক্তা গোষ্ঠী, সার্টিফিকেশন সংস্থা, সুশীল সমাজ ও সরকারি খাতের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে যা খাদ্য নিরাপত্তার সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।

খাদ্য নিরাপত্তার এই সংকট নিরসনে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। জৈব কৃষি ও জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।



বিবিসির প্রতিবেদন : ঢাকাকে কাছে টানার চেষ্টায় বেইজিং

বাংলাদেশের ২২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সোমবার ১০ দিনের সফরে চীন গেছে। এই দলে রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের সদস্য, শিক্ষাবিদ এবং সাংবাদিকেরা রয়েছেন। প্রতিনিধি দলের এক নেতা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন, তাঁরা চীন সরকার ও ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে বেইজিং। এই সফরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপি-র জ্যেষ্ঠ নেতা আব্দুল মঈন খান। প্রতিনিধি দলের অধিকাংশই বিএনপি ও তাদের জোটের সদস্য। প্রতিনিধি দলে গত বছরের জুলাই-আগস্টে হয়ে যাওয়া গণ-আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদেরও প্রতিনিধি আছেন।

হাসিনার পতনের পর চীন বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতা, কর্মী ও প্রতিনিধি দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদার করেছে, যার মধ্যে ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। এর আগে, গত বছরের শেষ দিকে বেইজিং বিএনপির একটি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়েছিল। এই সফরের আগে জানুয়ারিতে বেইজিংয়ে অন্তর্বতী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠক করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক শূন্যতা এবং ভারতীয় প্রভাবের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে চীন বাংলাদেশে তার অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে চীনই সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগই চীনের রপ্তানি। এ ছাড়া, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ৭০ শতাংশের বেশি আসে চীন থেকে। অন্যদিকে, চীনের তৎপরতার তুলনায় ভারত গত ছয় মাসে অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম যোগাযোগ করেছে।

১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় হাসিনার সরকার দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। সমালোচকদের মতে, তিনি ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে তিনি বেইজিংয়ের সঙ্গেও কৌশলগত ভারসাম্য রেখেছিলেন। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে এটি দেখা যাচ্ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশড়শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালের মতো বাংলাদেশও এখন দিল্লি ও বেইজিংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বেইজিংয়ের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও চীনা বিশ্লেষক ঝোউ বো বিবিসিকে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে, ভারতের পুরো উপমহাদেশকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।’

বিডিআর বিদ্রোহের তদন্ত – বিচার স্বচ্ছতা ও গতি কেমন ?

২০০৯ সালের পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহের প্রায় দেড় দশক পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বতী সরকার জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। কমিশনের লক্ষ্য পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং জড়িতদের চিহ্নিত করা।বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা সহ ৭৪ জন নিহত হন। এর পরপরই হত্যা ও বিস্ফোরণ আইনে মামলা করা হয়, যার রায়ে ১৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শুরু থেকেই বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও তাদের নাম তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

গত বছরের ২৪শে ডিসেম্বর কমিশন গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ৬০ দিন পেরিয়ে গেছে এবং কমিশন বলছে যে তাদের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আল ম ফজলুর রহমান জানিয়েছেন যে, সেনা ও বিডিআর কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী ও তৎকালীন দায়িত্বশীল সেনা কর্মকর্তাদের অন্তত ৩৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বেঁচে নেই, পাশাপাশি আলামতও অনেকাংশে নষ্ট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় প্রকৃত সত্য কতটুকু উদঘাটন সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে কমিশন বলছে, তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে এবং যাদের প্রয়োজন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার কমিশনের কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও, দণ্ডপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্যরা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, কমিশন এখন পর্যন্ত তাদের কারও সঙ্গে কথা বলেনি, যা তদন্তের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। বিদ্রোহের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও বিদেশি সংস্থার হাত থাকার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনরা দাবি করছেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক নেতা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং তাদের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কমিশন বলছে, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

কমিশন তদন্তের স্বার্থে কিছু ব্যক্তির বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে, তবে তাদের নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তারা আশ্বাস দিয়েছেন যে, প্রয়োজন হলে সাজাপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলা হবে। দীর্ঘদিন পর হলেও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত নিহতদের স্বজনদের জন্য আশার সঞ্চার করেছে। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্যদের বক্তব্য শোনা না হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাবে। কমিশন তাদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবে কি না এবং সত্যিই প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।


জীবনের অর্থহীনতার দর্শন বা নিহিলিজমের শুরু হয় কোথায় ?

২০ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার তাঁর কাজের মধ্যে অস্তিত্ব, বাস্তবতা এবং অর্থের সম্পর্ক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর “মেটাফিজিক্স এবং নিহিলিজম” বইটি এই ধরনের ভাবনা এবং চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। এখানে হাইডেগার মেটাফিজিক্সের ধারণা এবং এর নিহিলিজমের সাথে সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেন, যা তাঁর দর্শনীয়তায় নতুন এক আলোর রেখা নিয়ে আসে। মেটাফিজিক্স শব্দটি সাধারণত অস্তিত্ব ও বাস্তবতার মৌলিক প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে। ঐতিহ্যগত দার্শনিক চিন্তায় মেটাফিজিক্সকে পৃথিবী এবং আধ্যাত্মিক জগতের সম্পর্কের ভিত্তিতে আলোচনা করা হয়। তবে হাইডেগার এ ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই সত্যটি তুলে ধরেন যে, বাস্তবতার প্রকৃতি এবং মানুষের অস্তিত্বকে বোঝার জন্য মেটাফিজিক্স সঠিক উপায় নয়।

হাইডেগারের মতে, মেটাফিজিক্স ঐতিহ্যগতভাবে “আস্তিত্বের” এবং “অস্তিত্বের অর্থ” সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করে এসেছে। এটি মানুষকে কেবল বাহ্যিক জগতের দিকে ধাবিত করে, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ অস্তিত্বের গভীরে পৌঁছানোর দিকে মনোনিবেশ করেনি। তাই তিনি মেটাফিজিক্সকে একটি সীমাবদ্ধ এবং একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করেন। নিহিলিজম মানুষের জীবনের অর্থহীনতা এবং অস্তিত্বের শূন্যতা প্রতিফলিত করে। হাইডেগার নিহিলিজমকে মেতা ফিজিক্সের সাথে সম্পর্কিত একটি গভীর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে আধুনিক সমাজে মানুষ তার অস্তিত্বের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে গেছে এবং জীবনের আধ্যাত্মিক মূল্যহীনতার দিকে চলে গেছে।

হাইডেগার মনে করেন আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানুষের জীবনের প্রকৃত প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করেছে। যার ফলে এক ধরনের নিহিলিস্টিক মনোভাব তৈরি হয়েছে। আধুনিক মানুষ শুধুমাত্র বাহ্যিক সুবিধা এবং ভোগের দিকে মনোযোগী হয়ে পড়েছে ফলে তারা নিজেদের আসল অস্তিত্ব এবং এর অর্থ থেকে দূরে সরে গেছে। হাইডেগার তার লেখায় মেটাফিজিক্স এবং নিহিলিজমের মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে মেটাফিজিক্সের ঐতিহ্যগত ধারণাগুলি মানব জীবনের প্রকৃত উপলব্ধি এবং অর্থ খোঁজার প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছে। মেটাফিজিক্স যদি মানুষের অস্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে এটি অবশেষে নিহিলিজমের দিকে নিয়ে যায়-যেখানে জীবনকে অর্থহীন এবং শূন্য বলে মনে হয়।

মার্টিন হাইডেগার এর “মেটাফিজিক্স এবং নিহিলিজম” বইটি এক ধরনের দার্শনিক জ্ঞান এবং আধুনিক মানবতার সংকটের একটি গভীর বিশ্লেষণ। এখানে তিনি মানুষের অস্তিত্ব, অর্থ এবং বাস্তবতার সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। যেগুলো আজকের দুনিয়ায় প্রাসঙ্গিক এবং প্রভাবশালী। হাইডেগারের এই চিন্তা-ধারা আমাদের বর্তমান সমাজের ভেতরকার শূন্যতা এবং অর্থহীনতার দিকে আরও মনোযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং মানুষের অস্তিত্বের গভীরতর উপলব্ধি খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।