শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের শ্রমশক্তির পরিমাণ ৭কোটি ৩৭ লাখ। এ শ্রমশক্তি বিভক্ত হয়ে আছে ৪০৫ ধরনের কাজে। সেখানে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে ৪৬টি খাতে। বাকিগুলো সরকারি হিসাবে নেই। শ্রম খাতের সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেছেন, “শ্রমশক্তির বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে থাকলেও সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে মাত্র ৪৬টি খাতে। গৃহকর্মীরা এর বাইরে থেকে গেছেন, যা তাদের সুরক্ষাহীন করে রেখেছে।”
গৃহকর্মীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক না এখনও। গৃহকর্ম একটি অপরিহার্য শ্রম হলেও সমাজে এটি অবহেলিত।রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “আমাদের সমাজে যে কাজগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়, সেগুলোকেই অবহেলা করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও গৃহকর্মীরা তার অন্যতম উদাহরণ।” গৃহকর্মীরা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। এ খাতে নিয়োজিত প্রায় ২০ থেকে ৪০ লাখ শ্রমিক প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
২০১৫ সালে সরকার “গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি” প্রণয়ন করলেও তা আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি। রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও আইন না থাকায় গৃহকর্মীরা সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। শ্রম আইনের একটি ধারা বলছে, এটি সব শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য। আবার অন্য একটি ধারা বলছে, গৃহকর্মীরা এর আওতায় পড়বে না। এই দ্বৈত নীতির কারণেই শ্রম খাতে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে।” গৃহকর্মীদের আইনি স্বীকৃতি না দেওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত মালিকপক্ষ চায় না তারা মজুরি ও অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হোক। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে অনেকেই গৃহকর্মীদের ন্যায্য মজুরি দিতে চান না। রাজেকুজ্জামান রতনের মতে, “আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণি গৃহকর্মীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দিতে সক্ষম নয়।”
বাংলাদেশের শ্রম আইনে ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ থাকলেও গৃহকর্মীরা এর বাইরে রয়েছেন। দেশে প্রায় ৭কোটি ৩৭ লাখ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৩৪ লাখ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় রয়েছেন। অর্থাৎ, শ্রমিকদের ৮৫ শতাংশই অসংগঠিত। রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “শ্রমিকরা যখন সংগঠিত হতে পারে না, তখন তারা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে পারে না। মালিকরা পুঁজি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার কারণে শক্তিশালী। কিন্তু শ্রমিকরা অসংগঠিত ও দুর্বল।” রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “সংস্কার কমিশনের লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা। আমাদের সুপারিশ হবে, গৃহকর্মীদের শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন ও হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবসরের পর তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার প্রদান করতে হবে।”
অনেক সময় সরকার শ্রমিক আন্দোলনকে “ষড়যন্ত্র” হিসেবে দেখায়। তবে রাজেকুজ্জামান রতন মনে করেন, শ্রমিকদের আন্দোলন মূলত তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের চেষ্টা। তিনি বলেন, “শ্রমিকরা যদি সন্তুষ্ট থাকত, তাহলে বাইরের কোনো শক্তি তাদের উসকানি দিতে পারত না। সরকারকে উচিত শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা যাতে অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়।” বাংলাদেশের শ্রম সংস্কার নিয়ে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। গৃহকর্মীরা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবাহে বড় ভূমিকা রাখলেও তারা সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতির অভাবে নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। শ্রম আইন সংশোধন করে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা দিতে হবে যেন তারা মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।


