Home Blog Page 145

মানবসভ্যতা কি এলিয়েনের তৈরি ?

মানবজাতির উৎপত্তি নিয়ে বহু গবেষণা, তত্ত্ব এবং মতবাদ রয়েছে, যার মধ্যে কিছু বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক এবং কিছু অতিপ্রাকৃত বা কল্পনাশক্তির উদ্ভব। এসবের মধ্যে জেকারিয়া সিচিনের তত্ত্বটি বিশেষভাবে বিতর্কিত এবং আকর্ষণীয়। সিচিন রুশ-ইজরায়েলী লেখক এবং প্রাচীন ইতিহাসের গবেষক। তিনি তার বইগুলিতে দাবি করেছেন মানুষের সৃষ্টি ছিল একটি জেনেটিক প্রকৌশলের ফলস্বরূপ, যা সম্পন্ন হয়েছিল প্রাচীন এলিয়েনদের দ্বারা। এই তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে তিনি প্রাচীন সুমেরীয় গ্রন্থাবলী এবং শিলালিপির অনুবাদকে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তিনি বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে এলিয়েনদের আগমন এবং মানবজাতির বিবর্তনে তাদের ভূমিকার প্রমাণ বহন করে।

সিচিনের মতে পৃথিবীতে এলিয়েনরা নিবারু নামক একটি গ্রহ থেকে এসেছিল। তারা মানুষের প্রাথমিক রূপ হোমো এরেকটাস থেকে আধুনিক মানুষ তৈরি করতে সহায়তা করেছে। এই এলিয়েনরা প্রায় ৪৫০,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সোনালি খনি থেকে সোনা সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে তারা পৃথিবীতে তাদের কলোনি স্থাপন করেছিল। সিচিন দাবি করেন, এই এলিয়েনরা তাদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য হোমো এরেকটাসে ঢেলে দিয়েছিল, যাতে তারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হয় এবং তাদের প্রয়োজনীয় সোনা খনন করতে পারে।

সিচিনের তত্ত্বের মূল ভিত্তি প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার শিলালিপি এবং চিত্রকলাগুলিতে নিহিত। সুমেরীয়রা পৃথিবীর প্রথম উন্নত সভ্যতা গঠন করেছিল এবং তাদের লিখিত ভাষায় কিছু এমন তথ্য রয়েছে, যা সিচিন দাবি করেন তা এলিয়েনদের অস্তিত্ব এবং তাদের পৃথিবীতে আগমনের প্রমাণ সরবরাহ করে। বিশেষ করে সিচিনের উল্লেখযোগ্য একটি বই “”দ্য টোয়েলফ প্ল্যানেট”” -এ তিনি নিবারু গ্রহের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে নিবারু একটি দীর্ঘ অল্লিপটিক অরবিটে ঘুরতে থাকে এবং প্রায় ৩,৬০০ বছরে একবার পৃথিবীর কাছ দিয়ে চলে আসে। সিচিনের দাবি, এই গ্রহের অধিবাসীরা প্রায় ৯ ফুট উচ্চতার ছিল এবং তারা মহাকাশযান ব্যবহার করে পৃথিবীতে এসেছিল।

সিচিনের তত্ত্বে মানব বিবর্তনের বিষয়টি একেবারে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ তার স্বাভাবিক বিবর্তন দ্বারা নয় বরং এলিয়েনদের দ্বারা জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত এবং উন্নত হয়েছে। এই এলিয়েনরা সুমেরীয় দেবতা হিসেবে পরিচিত ছিল এবং তাদের শাসন ও জ্ঞান দিয়ে পৃথিবীতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের মধ্যে অনেক দেবতা যেমন এনকি, যাকে সুমেরীয়রা বিজ্ঞানের দেবতা হিসেবে পূজা করতো, তাদের কাছ থেকেই পৃথিবীতে জ্ঞান এবং প্রযুক্তি ছড়িয়েছিল।

সিচিনের মতে, এই এলিয়েনরা কেবলমাত্র মানুষের জ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতি ঘটানোর জন্যই পৃথিবীতে আসেননি, তারা সুমেরীয়দের হাতে সোনা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে প্রাচীন সভ্যতাগুলির বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। সুমেরীয়দের কৃষি ও চাষাবাদ সম্পর্কে যা জানা যায়, তা সিচিনের মতে এলিয়েনদেরই প্রদত্ত জ্ঞান ছিল, যেগুলো পরবর্তীতে পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

সিচিনের তত্ত্বটি কিছু পাঠক ও অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও, এটি প্রচুর বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিচিনের অনুবাদ এবং ব্যাখ্যাকে ভুল এবং পুঁজিবাদী অভিলাষী বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, সিচিনের কাজ প্রাচীন সভ্যতার সত্যিকারের ইতিহাস থেকে বিচ্যুত এবং প্রচলিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মতো। বিশেষ করে সুমেরীয় শিলালিপি এবং চিত্রকলার অনেক অনুবাদ সঠিক নয় এবং এটি সিচিনের নিজের অনুমান ও কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।

প্রাচীন গ্রন্থাবলীর একটি বৃহৎ অংশ মিথ এবং প্রতীকী ভাষায় লেখা ছিল, যেগুলো সিচিনের মতো লেখকরা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন, সুমেরীয়রা তাদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রকৃতির ঘটনাগুলিকে ব্যাখ্যা করেছে, সেগুলো সিচিন ভিন্নভাবে ধরেছেন। সিচিনের তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা কম হলেও এটি মানব ইতিহাস এবং সভ্যতার উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ সৃষ্টি করেছে। তাঁর তত্ত্বটি এমন এক আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষের সৃষ্টি, বিবর্তন এবং মহাকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্নগুলিকে নতুনভাবে উত্থাপন করে। সম্ভবত সিচিনের মতবাদ ইতিহাসের একটি রহস্যময় অধ্যায় হিসেবে রয়ে যাবে, যেগুলো আমাদের অতীতের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৌতূহল সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে।



আপনার বিষণ্ণতার জন্য দায়ী হতে পারে চিনিও !

প্রাকৃতিকভাবেই ফল, সবজি ও শস্যের মতো জটিল শর্করায় চিনি থাকে। আবার পাস্তা, কেক, বেক করা খাবার, রুটি, কোমলপানীয় ও ক্যান্ডির মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারেও থাকে অতিরিক্ত চিনি। তাই প্রতিদিন কী খাচ্ছেন, আর তার প্রভাব কীভাবে আপনার শরীর ও মনের উপর পড়ছে-তা জানা জরুরি। বিশেষ করে যখন বিষয়টি হতাশা বা বিষণ্ণতার মতো মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

চিনির সঙ্গে হতাশার সম্পর্ক – প্রথমে শুনতে অবাক লাগলেও, আপনার প্রতিদিনের চিনিমাখা চা বা কোমল পানীয় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হতে পারে। সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের মস্তিষ্কে – বিশেষ করে মুড রেগুলেটিং হরমোনগুলোর ওপর। চিনি শরীরে প্রবেশ করার পর দ্রুত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ায়। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে আপনি সাময়িক এক ধরনের আনন্দ বা উদ্দীপনা অনুভব করেন-যাকে অনেকেই বলেন “sugar rush”। এই সময় শরীরে ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যেটি হলো আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত একটি নিউরোট্রান্সমিটার। তবে এই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে আবার নেমে গেলে, আপনি ক্লান্তি, বিরক্তি বা মনমরা ভাব অনুভব করতে পারেন। এই ওঠানামা চলতে থাকলে তা মুডকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থির করে তোলে, সৃষ্টি করে মানসিক অবসাদ বা হতাশার।

ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিতভাবে উচ্চমাত্রায় চিনি গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগের হার অনেক বেশি। গবেষণাটিতে ৮,০০০ পুরুষ ও নারীর খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, দিনে অন্তত ৬৭ গ্রাম চিনি গ্রহণকারীদের মধ্যে পরবর্তী পাঁচ বছরে হতাশা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ২৩% বেশি। চিনির আরেকটি নেতিবাচক প্রভাব হলো, এটি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই প্রদাহ মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।নিউরোইনফ্ল্যামেশন বা মস্তিষ্কে প্রদাহ, সেরোটোনিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতা ব্যাহত করে, যা হতাশা সৃষ্টি বা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আপনি ধীরে ধীরে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন, যদিও আপনি হয়তো বুঝতেই পারেন না যে এটি আপনার খাবারের কারণেই হচ্ছে।

চিনির প্রতি নির্ভরতা বা আসক্তি আরও একটি বড় সমস্যা। কারণ বারবার চিনি খাওয়ার ফলে মস্তিষ্ক নতুন করে ডোপামিনের অপেক্ষা করে, যা চিনি না পেলে মুড ডাউন করে দেয়। এতে করে আপনি বারবার মিষ্টিজাত খাবারের দিকে ঝুঁকেন এক ধরনের চক্র তৈরি হয়, যেটি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হলো চিনি খাওয়ার প্রভাব সবাই একভাবে অনুভব করেন না।পুরুষদের মধ্যে এই প্রভাব নারীদের তুলনায় বেশি তীব্র হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, হরমোনগত পার্থক্যের কারণে পুরুষদের মস্তিষ্কে চিনির প্রভাব আরও গভীরভাবে পড়ে, বিশেষ করে হতাশার সূচনাপর্বে।

চিনি কি মাদক?
এক গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের চিনি গ্রহণকারী অংশ বারবার উচ্চমাত্রার চিনি গ্রহণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না। ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষামূলক গবেষণায় এমনও দেখা গেছে যে, চিনি কখনো কখনো কোকেনের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। অর্থাৎ চিনির প্রতি আসক্তি কেবল অভ্যাস নয়-এটি হতে পারে নেশার মতোই শক্তিশালী। পানীয় থেকে সস, চকলেট থেকে স্যান্ডউইচ-প্রতিদিনের প্রায় সব খাবারেই লুকিয়ে থাকে চিনি। তাই ধীরে ধীরে কমিয়ে আনাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

প্রদাহ ও হতাশার অদৃশ্য যোগসূত্র
প্রাকৃতিক ফল ও সবজি দিয়ে তৈরি খাদ্যতালিকা শরীরের প্রদাহ কমায়। বিপরীতে, প্রক্রিয়াজাত ও চিনিযুক্ত খাবার প্রদাহ বাড়ায়। আর দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গে রয়েছে ক্যানসার, হাঁপানি, বিপাকীয় সমস্যা ও হতাশার সংযোগ। গবেষণামতে, হতাশা ও প্রদাহের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে-যেমন, ঘুমে ব্যাঘাত, খাবারে অরুচি বা অতিরিক্ত খাওয়া, দেহে অস্বাভাবিক ব্যথা অনুভব ইত্যাদি। তাই চিনিমুক্ত ডায়েট মানেই শুধু ওজন কমানো নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও যত্ন নেওয়া ।

বেক করা খাবারও দায়ী
মাফিন, পেস্ট্রি, ডোনাটের মতো বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত বেক করা খাবার খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি এগুলো হতে পারে হতাশার উৎস।স্পেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিমাত্রায় বেক করা খাবার খাওয়ার সঙ্গে হতাশার ঝুঁকি ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এর পেছনে মূল দায়ী ট্রান্স ফ্যাট, যা প্রদাহের অন্যতম কারণ এবং হৃদ্ রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। বাজারের প্রায় সব বেক করা খাবারে এই ফ্যাট থাকে।

চিনিকে ‘না’ বলার উপায়

  • কোমল পানীয়, সোেডা, এনার্জি ড্রিংক বাদ দিন। চিনি ছাড়া চা, সাধারণ পানি বা লেবুর রস মেশানো পানি খান।
  • খেজুর, তাজা ফল বা এক টুকরো ডার্ক চকলেট হতে পারে বিকল্প।
  • ভালো শর্করা বেছে নিন: হোল গ্রেইন বা গোটা দানার শস্য খান।
  • ফুড লেবেল পড়ুন, কেনার আগে খাবারের উপকরণ তালিকায় নজর দিন। চিনি থাকলে বেছে নিন বিকল্প।
  • পরিবার বা বন্ধুর সঙ্গে ‘চিনি ছাড়ার চ্যালেঞ্জ’ নিন। দুই সপ্তাহ চেষ্টা করলেই শরীর ও মনের ইতিবাচক পরিবর্তন টের পাবেন।
    চিনির প্রতি নির্ভরতা কমানো মানে শুধু রোগ প্রতিরোধ নয়, নিজেকে আরো হালকা, ফুরফুরে ও নিয়ন্ত্রিত রাখা। এখনই শুরু করুন, ক্ষতিকর মিষ্টির অভ্যাস বদলান।



বিএনপি কি তরুণ প্রজন্মের চাওয়া বুঝতে পারছে : আলতাফ পারভেজ , লেখক ও গবেষক

“… বাংলাদেশে গত দেড় দশক মানুষ স্বচ্ছ নির্বাচন চেয়ে চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, সেটা সত্য। কিন্তু চব্বিশের অভ্যুত্থান সেই চাওয়ার সঙ্গে আরও বহু আকাঙ্ক্ষা যুক্ত করেছে। চব্বিশ এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। এক নতুন তরুণ সমাজের উত্থান ঘটিয়েছে। এ মুহূর্তে দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী প্রায় সোয়া তিন কোটি। আরেকভাবে দেখা যায়, ২৯-এর কম বয়সী জনসংখ্যাই দেশে ৫৭ ভাগ। এদের সবাই ভোটার নয়। কিন্তু এরাই তো আজ ও আগামীকালের বাংলাদেশ। এখনকার সমাজ ও রাজনীতিতে এই ৫৭ ভাগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্গ। চব্বিশ এদের বিশেষভাবে পাল্টে দিয়েছে। পরিবারতন্ত্রের ছায়ায় বড় হওয়া এতদিনকার রাজনৈতিক আবহে তারা সন্তুষ্ট নয়। অচিন্তনীয় এক অর্জনে তারা সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্ম।

… বাংলাদেশে চব্বিশে বিপ্লব ঘটে যায়নি-এটা সত্য; কিন্তু বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। বিপ্লবী পার্টি থাকলে অনায়াসে এখানে পুরোনো এস্টাবলিশমেন্টকে ছুড়ে ফেলে দেশ এগিয়ে যেতে পারত। এস্টাবলিশমেন্টের সৌভাগ্য সেটা হয়নি। তাই বলে রাজপথে জন্ম নেওয়া বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করে কেউ এগিয়ে যেতে চাইলে সেটা শেখ হাসিনার মতোই একরোখা আচরণ হবে। বিএনপির সঙ্গে আজকের শহুরে – শিক্ষিত – মধ্যবিত্ত -উচ্চবিত্ত তারুণ্যের এখানেই মতাদর্শিক দূরত্ব দেখা যাচ্ছে। এই দূরত্ব সংঘাতের চেহারা নিয়ে তেতে উঠছে।… তারেক রহমান ও তাঁর দল নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগের মতো করে এ রকম দ্বন্দ্বে জিততে চান না। কিন্তু বিএনপির মেঠো সংগঠক ও কর্মী দল সেটা চাইতে পারেন। ছাত্র নেতৃত্বকেও সেদিকে উসকে দিতে পারে কেউ। এই শঙ্কার সুরাহা কী?

এর ফলে যে অবস্থা তৈরি হবে বা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেখানে কট্টরপন্থীরা ‘সম্ভাবনা’ দেখছে। গত আট মাসে তারা আট বছরের চেয়ে বেশি এগিয়েছে। নির্বাচনে দক্ষিণপন্থী দলগুলো কত আসন পাবে, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু তাদের ভোেট যে অনেক বাড়বে সে বিষয়ে সমাজমনস্ক কেউ দ্বিমত করবে না। আবার ‘ভোট’ বাড়ার চেয়েও বড় ঘটনা হলো সামাজিক শাসকের জায়গায় নিজেদের স্থাপন করতে পারা। কিন্তু একটা ‘থিওলজিক্যাল স্টেট’ কি আদৌ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল? যদি তা না হয় তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রাতারাতি মধ্য-বাম মেরুকরণ থেকে মধ্য-ডান মেরুকরণে বদলে যাওয়াকে কে থামাবে?

… প্রশ্ন হলো, দেশের প্রধান দলের দাবিদার বিএনপি এবং তার নেতৃত্বও চব্বিশকে এভাবে বিকৃত হতে দেবে কি না? ছাত্র-তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে ৩১ দফাকে আরও সময়োপযোগী ও বিস্তারিত করতে সমস্যা কোথায়? রাজনীতি তো মানুষের জন্য। তাহলে ৩০-অনূর্ধ্ব ৫৭ ভাগের সঙ্গে বিএনপির সংলাপ হতে সমস্যা কোথায়? ১৯৭২-৭৩ এর প্রধান রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় দেশ ও সমাজকে পুনর্গঠন এবং পাকিস্তানি ধাঁচের রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার করতে না পেরে যদি ব্যর্থ হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৫-এর প্রধান দলও চব্বিশের আকাঙ্ক্ষায় নিজেকে পুনর্গঠন করতে না পারলে বিধ্বংসী ফল আসবে। ক্ষমতায় না থেকেও নিশ্চিতভাবে বিএনপি ঐতিহাসিক সেই দায়ভারের মুখোমুখি। বাংলাদেশকে বদলে দিতে হলে বিএনপিকেও অনেকখানি বদলে যেতে হবে।

বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন। কিন্তু নির্বাচনের আগে আগে সমানতালে দ্রুত আরও কিছু প্রয়োজন মনে করছে তরুণ সমাজ।… কাজিয়া নয়, জিততে হবে অভ্যুত্থানের সব শক্তিকে। তা না হলে শেষ বিচারে দক্ষিণপন্থা জিতবে। বাংলাদেশ হারবে। “




রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন রাখাইনের আরাকান আর্মির মনোভাব কী ?

গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যের অধিকাংশ এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সরকার অনেকখানিই দুর্বল। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়টি এখন আর শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নেই। খোদ সরকারি কর্মকর্তারাও এই জটিলতার কথা স্বীকার করছেন। আরাকান এলাকায় এখন পক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি, মিয়ানমার সরকার এবং চীন। সেখানে বিশেষ করে খনিজ সম্পদে চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সমান নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত হবে কি না। এটি বরাবরই তীব্র বিতর্কের বিষয় ছিল। ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও তৎপরতা এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।

আরাকান আর্মি মূলত জাতিগত রাখাইন বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা রাখাইনে স্বায়ত্তশাসন বা ‘কনফেডারেট স্ট্যাটাস’-এর জন্য লড়াই করছে। আর রোহিঙ্গারা প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক বেশ জটিল এবং প্রায়শই উত্তেজনাপূর্ণ। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং সরকার তাদের ‘বাঙালি’ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে। বৌদ্ধ-মুসলিম ঐতিহাসিক বিভেদের কারণে নাগরিকত্ব আইনের পর আরাকান আর্মির প্রতি রোহিঙ্গাদের অবিশ্বাস প্রবল হয়।

রোহিঙ্গা প্রশ্নে আরাকান আর্মিও জান্তা সরকারের বয়ানেরই প্রতিধ্বনি করেছে বিভিন্ন সময়। যেমন ২০১৬ সালের একটি বিজ্ঞপ্তিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের ‘নৃশংস বাঙালি মুসলিম সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করে তারা। এই বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই রোহিঙ্গাদের রাখাইনের স্থানীয় হিসেবে নয়, বরং বহিরাগত হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং আরাকান আর্মির ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সঙ্গে মিলে অপারেশন ১০২৭-এ অংশগ্রহণের (অক্টোবর ২০২৩-এ শুরু) পর থেকে আরাকান আর্মি রাখাইনের বাসিন্দাদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান নরম করে। সম্ভবত আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং স্থানীয় সমর্থন অর্জনের কৌশল হিসেবেই তারা বয়ান পরিবর্তন করে।

আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের তাদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২১ সালে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এর উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তারা নৃগোষ্ঠীগত জাতীয়তাবাদের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি দেয়। এতে ধারণা করা যায়, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে গ্রহণ করলেও তাদের স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক পরিচয় স্বীকার করতে বা সমান মর্যাদা দিতে রাজি হবে না, যদি না রোহিঙ্গারা শুধু ‘রাখাইন জনগোষ্ঠী’ হিসেবে নিজেদের আত্মীকরণে রাজি হয়।

২০২৪ সালের শুরু থেকে জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ শুরু করেছে। বিনিময়ে নাগরিকত্ব বা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু আরাকান আর্মি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। উল্টো তারা রোহিঙ্গাদের কামানের গোলা বহনকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এদিকে আরসা এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মতো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী জান্তার সঙ্গে মৈত্রী করেছে। তারা আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। যেমন ২০২৪ সালের এপ্রিলে বুথিডংয়ে রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মি মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়েছে।

আরাকান আর্মির ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি বা তাদের জাতীয়তাবাদী অবস্থানে পরিবর্তন ছাড়া রোহিঙ্গাদের একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে সমান অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসিত রাখাইনে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। অবশ্য আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের তাদের শাসনের অধীন বাসিন্দা হিসেবে মেনে নিতে পারে, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন বজায় রাখতে সীমিত অধিকার দিতেও রাজি হতে পারে।রাখাইনে প্রশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরাকান আর্মির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বক্তব্য বিবৃতির ভঙ্গি তেমনটাই ইঙ্গিত দেয়। তবে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং শর্তহীনভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা এসবে স্পষ্ট যে আরাকান আর্মি শাসিত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হবে শর্তাধীন। এর মধ্যে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় বর্জন অন্যতম।


পলাতক আওয়ামী নেতারা ব্যবসা টেকাতে অংশীদার খুঁজছেন

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ওসমান পরিবারের ব্যবসা-বাণিজ্যের অংশীদার হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্য। যিনি এখন পরিবারটির বাড়ি, গাড়িসহ সম্পত্তির দেখভাল করছেন। এক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের আরেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম দস্তগীর গাজী। স্থানীয় বিএনপির দুটি গ্রুপের মধ্যে তীব্র বিবাদ থাকায় অংশীদার নির্ধারণে বেগ পেতে হচ্ছে বলে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়।আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, তাজুল ইসলাম, মাহবুব-উল আলম হানিফ, নসরুল হামিদসহ অনেকে অংশীদার খুঁজছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িকভাবে প্রভাবশালী এক ডজনের বেশি আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। তারা বলেছেন, গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারাও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগের ব্যবসা ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। সরকারি প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিয়ে সেগুলো অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দিতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঠিকাদারি ব্যবসা সম্ভব নয়। তবে যেসব ব্যবসায়ী জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত তাদের শিল্প-কারখানাও ঠিকমতো চলছে না। সালমান এফ রহমানের মতো বড় ব্যবসায়ীর কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে অংশীদার ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে থাকা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। অন্যরা সম্পদ বিক্রি করে বিদেশে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন।

রাপা নুইয়ের মোয়াই মূর্তি ঐতিহাসিক ধ্বংস না ধারাবাহিকতা ?

২০১৭ সালের মে মাসে, একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল রাপা নুই দ্বীপে অভিযান পরিচালনা করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দ্বীপের প্রাচীন মূর্তি এবং ইতিহাস নিয়ে নতুন করে গবেষণা করা। তারা দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি এবং পর্যবেক্ষণ চালিয়ে একটি চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেন।

গবেষকরা জানিয়েছিলেন, ৩৫টি মোয়াই মূর্তির নতুন অবস্থান চিহ্নিত করেছেন, যা পূর্বে জানানো হয়নি। তবে তাদের কাজটি শুধু পুরাতাত্ত্বিক নয়, সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রশ্নগুলোকে পুনরায় উত্থাপন করে। কেন একসময় এত বিপুল সংখ্যক মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল এবং কীভাবে, কেন বা কখন এগুলো ভেঙে পড়েছিল?

এই বাস্তব ঘটনা রাপা নুইয়ের ইতিহাসের জটিলতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। প্রায় ৯০০টি মোয়াই মূর্তি-যেগুলো পাথরের বিশাল মাথা এবং কখনও কখনও দেহ নিয়ে সাজানো-এগুলো এক সময় দ্বীপবাসীর ক্ষমতা, আধ্যাত্মিকতা এবং সামাজিক শ্রেণির প্রতীক ছিল। ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা ১৮শ শতকে প্রথম রাপা নুই দ্বীপে এসে যখন এগুলো দেখতে পায়, তখন তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখে। কেন এসব মূর্তি ভেঙে পড়ল, তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব তৈরি হয়েছে, এবং আজও এটি বিশ্বব্যাপী আলোচিত একটি বিষয়।

রাপা নুই দ্বীপের ইতিহাস নিয়ে একটি অন্যতম জনপ্রিয় তত্ত্ব হাজির করেছেন জ্যারেড ডায়মন্ড তার বই Collapse (২০০৫)-এ। তিনি দাবি করেন, একসময় রাপা নুই ছিল একটি সবুজ বনানীপূর্ণ দ্বীপ, যেখানে পলিনেশিয়ানরা একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলেছিল। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিকাজের অতিরিক্ত চাহিদা, এবং অপ্রত্যাশিতভাবে বন উজাড়ের ফলে দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়।মোয়াই মূর্তির নির্মাণ ও পরিবহন প্রক্রিয়া গাছের কাঠের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এবং গাছের অভাবে এ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এক পর্যায়ে মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যার ফলে দ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় ১৫,০০০ থেকে কমে যায় ৩,০০০-এ।

ডায়মন্ডের এই ‘ধ্বংস’ তত্ত্ব দীর্ঘকাল ধরে জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু বিগত এক দশক ধরে কার্ল লিপো এবং টেরি হান্টসহ অন্য কিছু গবেষক একে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তারা দাবি করেন, রাপা নুইয়ের ধ্বংসের যে গল্প ডায়মন্ড বলেন তা আসলে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের মিথ্যাচারের ফল। তাদের মতে, দ্বীপে কখনোই অতিরিক্ত জনসংখ্যা ছিল না বরং জনসংখ্যা সব সময়ই ৩,০০০-এর আশেপাশে ছিল। তারা আরো বলেন, মোয়াই পরিবহন প্রক্রিয়া গাছের কাঠের উপর নির্ভরশীল ছিল না, এগুলো ‘হাঁটিয়ে’ বা দড়ি দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। এর প্রমাণ হিসেবে তারা The Statues That Walked (২০১১) বইতে একটি নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যেখানে বলা হয় মোয়াইগুলোকে দুই পাশে দোল খাইয়ে নিয়ে যাওয়া হতো ।

তবে এই তত্ত্বও বেশ বিতর্কিত। রাপা নুইয়ে মানবিক পরিবেশগত ধ্বংসের একটি প্রতীক হিসেবে, ডায়মন্ডের তত্ত্ব এখনও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য। তার ধারণা যে, পরিবেশের উপর মানুষের অত্যধিক চাপ এবং কাঠের নিঃশেষে সংঘাত ও সামাজিক অবনতি ঘটেছিল-এটা অনেক দৃষ্টিকোণ থেকেই সমর্থন পেয়েছে। তবে লিপো ও হান্টের ধারণা যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই নিশ্চিত নয়। তাদের গবেষণায় তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন দিক উন্মোচন করেছেন, তা হলো রাপা নুইয়ে ইঁদুরের উপস্থিতি, যারা গাছের বীজ খেয়ে ফেলত এবং নতুন গাছ জন্মাতে দিত না, এটি পরিবেশগত বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে।

সম্প্রতি, ২০২৪ সালে, লিপো ও হান্ট এক নতুন গবেষণায় জানিয়েছেন, রাপা নুই দ্বীপে পাওয়া ওবসিডিয়ান তৈরি mata’a নামে একটি সরঞ্জাম, পূর্বে যেটিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে মনে করা হতো, তা আসলে কৃষিকাজ এবং আচার-অনুষ্ঠানিক কাজের জন্য ব্যবহৃত হত।এটি তাদের ধারাবাহিকতা তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করে, যেখানে বলা হয়েছে যে রাপা নুইয়ের মানুষের মধ্যে কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ ছিল না, সমাজটি একপ্রকার স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল, পরবর্তীতে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের আগমনের পর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই গবেষণা মিডিয়া এবং জনসাধারণের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হতে পারে। সংবাদমাধ্যমগুলো শিরোনামে বলেছে: “ইস্টার দ্বীপে সংঘর্ষের ফলে ধ্বংস হয়নি,” এটি সঠিক নয়। লিপো এবং হান্ট নিজেদের গবেষণায় বলেছেন: “এটা বলার নয় যে দ্বীপে কোনো সহিংসতা বা সংগ্রাম ছিল না, যেখানে mata’a যুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণ দেয় না।”

তাহলে কী আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত? বর্তমানে, অধিকাংশ গবেষক এবং ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, রাপা নুই দ্বীপে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর মানুষ সামাজিক এবং পরিবেশগতভাবে এক ধরনের ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছিল। তবে লিপো ও হান্টের তত্ত্বকে সমর্থন করেও আমরা এ বিষয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। একক কোনো গবেষণা বা বিশ্লেষণ কোনো প্রাচীন সমাজের ইতিহাসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না।

আজও রাপা নুইয়ের সেই মোয়াই মূর্তিগুলো প্রমাণ করছে ইতিহাস কখনো সরল এবং একরৈখিক হয় না। একে বোঝাতে চাইলে আমাদের সেই ইতিহাসের পেছনে লুকানো নানা দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণার বিবেচনায় নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে। ইতিহাসের সত্য এত সহজে ধরা দেয় না, আর প্রকৃত ইতিহাস জানার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হয়।




ম্যানিপুলেটরদের সঙ্গ কেন ক্ষতিকর ? কীভাবে চিনবেন ?

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ম্যানিপুলেটর’ এমন ব্যক্তি, যে নিজের সুবিধা হাসিল করার জন্য অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই ধরনের মানুষের সান্নিধ্য আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মমর্যাদার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তারা যতটা না বন্ধুর মুখোশ পরে আমাদের পাশে থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে শোষকের ভূমিকায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বুঝতেই পারেন না যে, তিনি প্রতিনিয়ত একজন কৌশলী মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। তাই ম্যানিপুলেটরদের চেনা অত্যন্ত জরুরি।
গ্যাসলাইটিং
এদের অন্যতম কৌশল হলো গ্যাসলাইটিং। তারা নিজেদের ভুল ঢাকতে অপরকে দোষ দেয়। একটি ঘটনা যেমন ঘটেছিল, তারা সেটিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করে, যেন আপনি নিজেই সন্দেহে পড়ে যান-আপনার স্মৃতিই কি ভুল?

অপরকে অপরাধবোধে ভোগানো
আপনি যদি নিজের সীমারেখা তৈরি করতে চান, তারা আপনাকে আত্মকেন্দ্রিক প্রমাণ করতে চায়, যাতে আপনি অপরাধবোধে ভোগেন ।

নিষ্ক্রিয় আক্রমণাত্মক আচরণ – এরা খোলাখুলি কথা না বলে ব্যাঙ্গ, নিরবতা ও সূক্ষ্ম খোঁচায় কষ্ট দেয়।

লাভ বম্বিং
প্রথমে অতিরিক্ত খেয়াল রাখা, বারবার টেক্সট পাঠানো, উপহারে ভরিয়ে দেওয়া-সবই আপনাকে নিয়ন্ত্রণের ফাঁদ। কিন্তু দুর্দিনে তারা অদৃশ্য হয়ে যায়।

ভিকটিম সাজা ও দোষ অন্যের ওপর চাপানো
তারা নিজের কাজের দায় নেয় না, বরং নিজেকে সবসময় ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করে।

ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন ও নির্ভরশীল করে তোলা
এরা আপনার ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে এবং ধীরে ধীরে আপনাকে মানসিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বেই শান্তি।


জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা ছাড়া হলো আমেরিকায়

মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু, জিকা ও ইয়েলো ফিভার বিশ্বের বহু অঞ্চলে জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম হুমকি হয়ে উঠেছে। এই রোগগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বহু দশক ধরে নানা কৌশল গ্রহণ করা হলেও, মশা দমন কার্যক্রমে এখনো টেকসই সমাধান পাওয়া যায়নি।তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা ছাড়া হয়েছে পরিবেশে, যার লক্ষ্য হলো রোগবাহী মশার জনসংখ্যা ধ্বংস করা।

এই প্রকল্পের সূচনা হয়েছে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে, যেখানে অবফবং ধবমুঢ়ঃর প্রজাতির জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত পুরুষ মশা পরিবেশে ছাড়া হয়েছে। এই প্রজাতির মশা যদিও মোট স্থানীয় মশার মাত্র ৪ শতাংশ গঠন করে, তবে মানুষের মধ্যে মশাবাহিত রোগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে এই পুরুষ মশাগুলো এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যাতে তারা বন্য নারী মশার সঙ্গে প্রজনন করলে তাদের স্ত্রীসন্তান লার্ভা অবস্থায় মারা যায়। কেবল পুরুষ সন্তান বেঁচে থাকে এবং পরবর্তী প্রজন্মে একই জিন বহন করে।যেহেতু কেবল নারী মশাই মানুষকে কামড়ায় এবং রোগ ছড়ায়, তাই স্ত্রী মশার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ কমানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই পদক্ষেপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটি রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত কীটনাশকের কারণে অনেক মশা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে, ফলে ঐ পদ্ধতিগুলো এখন অনেকাংশেই অকার্যকর। অন্যদিকে এই জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা নির্দিষ্ট প্রজাতিকে লক্ষ্য করে কাজ করে, তাই পরিবেশে অন্যান্য প্রজাতির ওপর এর প্রভাব কম। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বায়োটেকনোলজি কোম্পানি ভীরঃবপ, যারা এর আগেও ব্রাজিল, কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ, পানামা ও মালয়েশিয়ায় সফলভাবে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করেছে। এসব দেশে অবফবং ধবমুঢ়ঃর মশার সংখ্যা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল, এটি এই কৌশলের কার্যকারিতা প্রমাণ করে।

তবে এই প্রকল্প নিয়ে বিতর্কও কম নয়। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা এবং পরিবেশবাদী সংগঠন এই ধরনের জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত জীব মুক্তভাবে পরিবেশে ছাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এই প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত।বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব আশঙ্কা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে গবেষণা চালানো উচিত, তবে প্রাথমিক ফলাফলগুলো আশাব্যঞ্জক। এই প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রে জিএম জীব নিয়ে পরিচালিত আরও কিছু পরীক্ষার অংশ, যেমন নিউ ইয়র্কে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ডায়মন্ডব্যাক মথ এবং অ্যারিজোনায় পিঙ্ক বলওয়ার্ম। সব মিলিয়ে এই উদ্যোগগুলো একটি নতুন ধরনের পরিবেশবান্ধব, লক্ষ্যভিত্তিক রোেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সূচনা হতে পারে।

জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশার পরিবেশে ছাড়া একদিকে যেমন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহসী প্রয়োগ, অন্যদিকে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য আশার আলো। যদি এই পদ্ধতি সফল হয়, তাহলে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে এটি হতে পারে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এর নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা ও নজরদারি চালানো জরুরি। এমন প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্কতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলেই তা মানবজাতির জন্য আশীর্বাদে পরিণত হতে পারে।




‘আওয়ারস অব লুই’ পাণ্ডুলিপির হারানো পাতার সন্ধান

১৪৯৮ সালের দিকে ফ্রান্সের রাজা দ্বাদশ লুইয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি অলঙ্কৃত প্রার্থনার বই, যার নাম ‘আওয়ারস অব লুই’। এটি কেবল একটি ধর্মীয় পাণ্ডুলিপিই না, বরং এক ধরনের চিত্রময় শিল্পকর্ম-যার প্রতিটি পাতায় ছিল সূক্ষ্ম হাতে আঁকা মিনিয়েচার ছবি। এই অনন্যসাধারণ বইটি তৈরি করেছিলেন ফরাসি রাজদরবারের খ্যাতিমান শিল্পী জ্যাঁ বোর্দিশোঁ, যিনি মধ্যযুগীয় চিত্রকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত।

মধ্যযুগীয় ইউরোপে প্রার্থনার জন্য ব্যবহৃত হাতে লেখা এবং হাতে আঁকা বইগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ছিল। ‘আওয়ারস অব লুই’ তেমনই এক দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বইটির পরিণতিও হয়েছে বহু মধ্যযুগীয় শিল্পকর্মের মতোই বিচ্ছিন্ন ও বিলুপ্তির পথে।

১৭ শতকের শেষে কিংবা ১৮ শতকের শুরুতে বইটি ইংল্যান্ডে পৌঁছায়। সেখানে এক পর্যায়ে বইটির পৃষ্ঠাগুলো আলাদা করে বিক্রি করে দেওয়া হয়, যার ফলে এর সামগ্রিক গঠন নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে ‘আওয়ারস অব লুই’-এর মাত্র ১৬টি চিত্রচূড়ান্ত পৃষ্ঠা বিভিন্ন জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে আছে। লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরি এবং ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, ফ্রান্সের ল্যুভর, ফিলাডেলফিয়ার ফ্রি লাইব্রেরি ও আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে।

২০০৩ সালে গেটি মিউজিয়াম এই হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্মের তিনটি মিনিয়েচার সংগ্রহ করে। এই তিনটি চিত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল “দ্য প্রেজেন্টেশন ইন দ্য টেম্পল”, “বাথশেবা বাথিং”, এবং একটি অনির্ধারিত চিত্র যেখানে রাজা দ্বাদশ লুই চারজন সাধুর মাঝে বসে প্রার্থনায় মগ্ন। তবে তৃতীয় চিত্রটি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা দেখতে পান-এটি অসম্পূর্ণ। কারণ চিত্রের চরিত্রগুলোর দৃষ্টি বাম পাশে নিবদ্ধ, যেন তারা কিছু একটা দেখছে, কিন্তু সেটি ছবিতে নেই। তখনই অনুমান করা হয়, এটির বাকি অংশ হারিয়ে গেছে।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অবশেষে ২০১৮ সালে ফ্রান্সের এক ছোট্ট নিলাম ঘরে সান্দ্রা হিন্ডম্যান নামের এক শিল্প ব্যবসায়ী একটি মধ্যযুগীয় চিত্র খুঁজে পান। চিত্রটি দেখে তাঁর মনে হয় এটি সম্ভবত জ্যাঁ বোর্দিশোঁর আঁকা কাজ। তিনি যোগাযোগ করেন শিল্প ইতিহাসবিদ নিকোলাস হিন্ডম্যান-এর সঙ্গে। হিন্ডম্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হন-এটাই সেই হারিয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা। এরপর তিনি গেটির প্রবীণ কিউরেটর এলিজাবেথ মরিসনকে বিষয়টি জানান। চিত্রটি ছিল ‘দ্য লামেন্টেশন’-একটি আবেগময় ধর্মীয় চিত্র, যেখানে কুমারী মেরি যিশুর নিথর, রক্তাক্ত দেহকে কোলে নিয়ে শোকে স্তব্ধ। তাঁর আশেপাশে শোকাহত শিষ্যরা দাঁড়িয়ে। চিত্রটির বর্ণনা, দৃষ্টির অভিমুখ এবং রঙের ব্যবহারের সঙ্গে দ্বাদশ লুইয়ের প্রার্থনার ছবিটির মিল এতটাই প্রকট ছিল যে, স্পষ্ট হয়ে যায় এটি আসলে একটি বৃহত্তর চিত্রের অংশ।

তবে রহস্য এখানেই শেষ নয়। দুটি চিত্র পুনরায় পাশাপাশি রেখে গবেষকরা আবিষ্কার করেন, দুটোর সোনালি ফ্রেমের উপরিভাগ কাটা।ধারণা করা হয় প্রথমে ‘দ্য লামেন্টেশন’ পাতাটি হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে ছোট করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন বোঝা যায় এটি আসলে দ্বাদশ লুইয়ের চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তখন সেটির উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে দ্বাদশ লুইয়ের চিত্রটিকেও কেটে ফেলা হয়।দুটি বিচ্ছিন্ন চিত্র অবশেষে প্রায় দুই শতাব্দী পর একত্রিত হলো। একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় যেন নতুন করে জীবিত হলো। গেটি মিউজিয়াম তাদের ” Our Voices, Our Getty: Reflecting on Manuscripts ” প্রদর্শনীতে এই দুই চিত্রকে প্রথমবারের মতো একত্রে উপস্থাপন করছে।

এই ঘটনা শুধু একটি শিল্পকর্মের পুনর্মিলন নয়, বরং একটি বিস্মৃত ইতিহাসের পুনরুদ্ধার। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুই আবার ফিরে আসতে পারে, যদি অনুসন্ধান যথাযথ হয়-আর চোখে থাকে আবেগ, ভালোবাসা ও সতর্ক দৃষ্টি। ‘আওয়ারস অব লুই’ এখন আর শুধু এক বিচ্ছিন্ন পাণ্ডুলিপি নয়, বরং মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় শিল্পচর্চার জীবন্ত দলিল।





বিএনপির ‘মৌলবাদ’ বলা নিয়ে আপত্তি হেফাজতের !

শনিবার রাতে গুলশানের কার্যালয়ে বিএনপির সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের এক বৈঠকে বিএনপির নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ‘মৌলবাদ’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন হেফাজত নেতারা। এ ব্যাপারে তাঁরা বিএনপির নেতাদের সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছেন। হেফাজতে ইসলামের আগ্রহে এ মতবিনিময় হয় বলে প্রথম আলো জানিয়েছে। বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘মৌলবাদের উত্থান’ -সম্পর্কিত বিএনপির নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জানান হেফাজতে ইসলামের নেতারা। তাঁরা বিএনপির নেতাদের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আশা করেননি বলেও উল্লেখ করেন। তাঁদের ভাষ্য, বিএনপি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বলতে পারে, এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।

এ পর্যায়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁরা মৌলবাদী বলতে জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়েছেন। এ সময় হেফাজতের নেতারা বলেন এতে শুধু জামায়াত নয়, সব ইসলামপন্থীদের আঘাত করা হচ্ছে। জানা গেছে, মতবিনিময়ে বিএনপির নেতারা আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে হেফাজতে ইসলামের সমর্থন চান। হেফাজতের নেতারা এর সঙ্গে একমত পোষণ করে। তবে তাঁরা নির্বাচনে আগে সংস্কার সম্পন্ন করা, সংগঠনের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারসহ আওয়ামী লীগের গণহত্যার বিচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সংবিধানের মূলনীতি থেকে ‘বহুত্ববাদ’ বাদ দেওয়া এবং ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটি বিএনপির প্রস্তাবে যুক্ত করতে অনুরোধ জানান। এ ছাড়া গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দলগতভাবে আওয়ামী লীগের বিচার, রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার অনুরোধ জানান। বৈঠকে অংশ নেওয়া হেফাজতে ইসলামের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এ দাবির সঙ্গে বিএনপি একমত পোষণ করেছে। তবে কৌশলগত কারণে তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলবেন না। ‘মৌলবাদ’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।