গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যের অধিকাংশ এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সরকার অনেকখানিই দুর্বল। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়টি এখন আর শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নেই। খোদ সরকারি কর্মকর্তারাও এই জটিলতার কথা স্বীকার করছেন। আরাকান এলাকায় এখন পক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি, মিয়ানমার সরকার এবং চীন। সেখানে বিশেষ করে খনিজ সম্পদে চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সমান নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত হবে কি না। এটি বরাবরই তীব্র বিতর্কের বিষয় ছিল। ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও তৎপরতা এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।
আরাকান আর্মি মূলত জাতিগত রাখাইন বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা রাখাইনে স্বায়ত্তশাসন বা ‘কনফেডারেট স্ট্যাটাস’-এর জন্য লড়াই করছে। আর রোহিঙ্গারা প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক বেশ জটিল এবং প্রায়শই উত্তেজনাপূর্ণ। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং সরকার তাদের ‘বাঙালি’ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে। বৌদ্ধ-মুসলিম ঐতিহাসিক বিভেদের কারণে নাগরিকত্ব আইনের পর আরাকান আর্মির প্রতি রোহিঙ্গাদের অবিশ্বাস প্রবল হয়।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে আরাকান আর্মিও জান্তা সরকারের বয়ানেরই প্রতিধ্বনি করেছে বিভিন্ন সময়। যেমন ২০১৬ সালের একটি বিজ্ঞপ্তিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের ‘নৃশংস বাঙালি মুসলিম সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করে তারা। এই বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই রোহিঙ্গাদের রাখাইনের স্থানীয় হিসেবে নয়, বরং বহিরাগত হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং আরাকান আর্মির ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সঙ্গে মিলে অপারেশন ১০২৭-এ অংশগ্রহণের (অক্টোবর ২০২৩-এ শুরু) পর থেকে আরাকান আর্মি রাখাইনের বাসিন্দাদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান নরম করে। সম্ভবত আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং স্থানীয় সমর্থন অর্জনের কৌশল হিসেবেই তারা বয়ান পরিবর্তন করে।
আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের তাদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২১ সালে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এর উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তারা নৃগোষ্ঠীগত জাতীয়তাবাদের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি দেয়। এতে ধারণা করা যায়, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে গ্রহণ করলেও তাদের স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক পরিচয় স্বীকার করতে বা সমান মর্যাদা দিতে রাজি হবে না, যদি না রোহিঙ্গারা শুধু ‘রাখাইন জনগোষ্ঠী’ হিসেবে নিজেদের আত্মীকরণে রাজি হয়।
২০২৪ সালের শুরু থেকে জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ শুরু করেছে। বিনিময়ে নাগরিকত্ব বা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু আরাকান আর্মি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। উল্টো তারা রোহিঙ্গাদের কামানের গোলা বহনকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এদিকে আরসা এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মতো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী জান্তার সঙ্গে মৈত্রী করেছে। তারা আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। যেমন ২০২৪ সালের এপ্রিলে বুথিডংয়ে রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মি মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়েছে।
আরাকান আর্মির ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি বা তাদের জাতীয়তাবাদী অবস্থানে পরিবর্তন ছাড়া রোহিঙ্গাদের একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে সমান অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসিত রাখাইনে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। অবশ্য আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের তাদের শাসনের অধীন বাসিন্দা হিসেবে মেনে নিতে পারে, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন বজায় রাখতে সীমিত অধিকার দিতেও রাজি হতে পারে।রাখাইনে প্রশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরাকান আর্মির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বক্তব্য বিবৃতির ভঙ্গি তেমনটাই ইঙ্গিত দেয়। তবে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং শর্তহীনভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা এসবে স্পষ্ট যে আরাকান আর্মি শাসিত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হবে শর্তাধীন। এর মধ্যে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় বর্জন অন্যতম।


