Home Blog Page 144

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক – স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস ; সরকার কি নির্বিকারই থাকবে : রাহাত মিনহাজ সহকারী অধ্যাপক , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

“ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ফ্যাসিবাদ কায়েমে মুক্তিযুদ্ধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।… জুলাই-আগস্ট হত্যাযজ্ঞের রাগ-ক্ষোভ এবং ফ্যাসিবাদের আইকন হিসেবে মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছে ছাত্র-জনতা। এটা অনেকটা স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল। … কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘর তো জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদের রক্ষণ, প্রতিপালন ও পরিচর্যা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় ধ্বংসপ্রাপ্ত এই জাদুঘরের অস্তিত্ব সরকার বেমালুম ভুলে গেছে, যা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সরকারের অসংবেদনশীল ও নির্বিকার অবস্থাকেই তুল ধরে। আমি এই সরকারকে মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী বলতে চাই না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, স্মৃতিচিহ্ন ও নানা বিষয়ে সরকার যে নির্বিকার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে যাচ্ছে, তা অবশ্যই নিন্দাযোগ্য। এটা দায়িত্বে অবহেলা।

… শেখ হাসিনার বড় ভুল ছিল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের একক কৃতিত্ব শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ালী লীগের বলে দাবি করা।অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুছে ফেলার চেষ্টাও বিকৃত চিন্তা। যেকোনো চিন্তা থেকেই কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, স্মৃতিস্মারক ও স্মৃতিচিহ্নের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে সেটাও এক ধরনের পাগলামি, অপরাধও। মনে রাখা প্রয়োজন, আপনি মানেন কিংবা না মানেন, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা। মুক্তিযুদ্ধে তার নামেই স্লোগান দিয়েছে সাড়ে সাত কোটি মানুষ। অন্তর্বর্তী সরকার যদি তাকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে, সেটা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।

… মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী এসব কাজে সারাদেশের মানুষ মর্মাহত হলেও কুম্ভকর্ণের ঘোরে নিমগ্ন অধ্যাপক ইউনূসের সরকার।… আমি আশা করি, সরকারের দ্রুত বোধোদয় হবে। তা না হলে সরকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী যে প্রচারণা আছে, তা দিনকে দিনে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেটা হয়তো জনতুষ্টিবাদের প্রেক্ষাপটে সাময়িকভাবে সরকারকে জনপ্রিয় করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফল ভালো হওয়ার কথা নয়।”



শুল্ক আরোপের সমালোচনায় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরাই

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী শুল্ক আরোপের ঘোষণা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন খোদ তাঁর ঘনিষ্ঠ ধনকুবের ব্যবসায়ী নেতারা। গত বুধবার ট্রাম্পের ওই শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর থেকে সারা বিশ্বে পুঁজিবাজারগুলোয় ব্যাপক দরপতন হচ্ছে। ট্রাম্পের সমর্থক ধনকুবের বিনিয়োগকারী বিল অকম্যান গত রোববার সতর্ক করে বলেছেন, নতুন শুল্ক আরোপ নিয়ে সামনে অগ্রসর হলে সেটা অর্থনৈতিকভাবে পরমাণু যুদ্ধ শুরু করার শামিল হবে। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছিলেন অকম্যান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাকি বিশ্বের বাণিজ্যে ভারসাম্য আনার কথা বলে ২ এপ্রিল বেশ কয়েকটি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তালিকায় থাকা কয়েকটি দেশের ওপর তিনি উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের কথা বলেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে অকম্যান লিখেছেন, যদি নতুন শুল্ক কার্যকর হয়, তবে বাণিজ্যিক বিনিয়োেগ ক্রমশ গতি হারাবে এবং ক্রেতারা অর্থ ব্যয় বন্ধ করে দেবেন। পারশিং স্কয়ার ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অকম্যান আরও বলেছেন, ‘যদি ট্রাম্প তাঁর পথ পরিবর্তন না করেন, তবে আমরা নিজেদের তৈরি করা একটি অর্থনৈতিক পরমাণু দুর্যোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।…প্রেসিডেন্ট বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়িক নেতাদের আস্থা হারাতে শুরু করেছেন।’ অন্যান্য লাখো কোটিপতি ও ধনকুবের ব্যবসায়ীরাও খোলাখুলি ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের একজন জেমি ডিমোন। তিনি জেপিমরগ্যান চেজ-এর চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনিও ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

গতকাল সোমবার ডিমোন সতর্ক করে বলেন, শুল্কের ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হওয়ার এবং বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। শেয়ারহোল্ডারদের কাছে পাঠানো বার্ষিক চিঠিতে ডিমোন আরও লেখেন, ‘সাম্প্রতিক শুল্ক খুব সম্ভবত মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি করবে এবং অনেকেই মনে করছেন, এতে মন্দার সম্ভাবনাও অনেক বাড়বে। শুল্কের কারণে মন্দা দেখা দেবে কি দেবে না, তা নিয়ে এখনো হয়তো প্রশ্নের অবকাশ আছে, কিন্তু এটা অর্থনীতির গতি হ্রাস করবে।’
আরেক কোটিপতি বিনিয়োগকারী স্ট্যানলি ডুকেনমিলার গতকাল এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, তিনি ১০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপের পক্ষে নন।

গতকাল রাতে ফিশার ইনভেস্টমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী চেয়ারম্যান ধনকুবের কেন ফিশার এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, ‘ট্রাম্প (গত) বুধবার যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা বোকামি, ভুল, চরম উদ্ধত, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাকে অবজ্ঞা করা এবং সমস্যাই নয়-এমন একটি বিষয়কে ভুল যন্ত্র দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এটা ব্যর্থ হবে এবং সমস্যা যতটা তার চেয়ে আতঙ্ক বেশি এবং এখান থেকে এটা অতিরঞ্জিত।’ এমনকি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইলন মাস্ক পর্যন্ত এ নিয়ে কথা বলেছেন। গত রোববার তিনি বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ‘শুল্কবিহীন অবস্থার’ ব্যাপারে আশাবাদী। অনলাইনে ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মাস্ক আরও বলেন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে একটি কার্যকর মুক্ত-বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি হোক, সেটা দেখতে চান তিনি।

লিবারেল ভোটাররা কোন্ দলকে ভোট দেবেন : মনোজ দে , প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

“… বাংলাদেশের মানুষদের ভোেট দেওয়ার যে প্রবণতা, তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মধ্যপন্থী দলগুলোকেই সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে এই মধ্যপন্থা গ্রহণের পেছনে নগদ লাভ-ক্ষতির সহজ হিসাবটাই কাজ করে। কেননা, এখানে নাগরিকদের রাষ্ট্রের কোনো সেবা পেতে হলেও তাঁদের রাজনৈতিক নেতাদের শরণাপন্ন হয়ে সেটা পেতে হয়। ২০০৮ থেকে ২০২৫, মাঝখানে ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সমাজে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। সমাজে অনেকখানি মেরুকরণ ঘটে গেছে। এর পেছনে বৈশ্বিক কারণ যেমন আছে, আবার অভ্যন্তরীণ কারণও আছে। মার্কিনদের ওয়ার অ্যান্ড টেররের অভিঘাত এবং আওয়ামী লীগের তীব্র দমনমূলক স্বৈরশাসন বাংলাদেশের সমাজ কিছুটা দক্ষিণ দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বিশেষ করে নাগরিক ও শহুরে তরুণদের একটা অংশের মাঝে সেটা প্রবলভাবে দৃশ্যমান।

কিন্তু এই ডান দিকে ঝুঁকে পড়া মানে ভোটের সবটাই ধর্মভিত্তিক দলগুলোর দিকে যাবে, তা নয়। কেননা, বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক প্রতিটি দলের আলাদা আইডিওলজি আছে। অনড় কাঠামোর জন্য তাদের ভোটার ভিত্তিও সুনির্দিষ্ট। মতাদর্শিক ভিন্নতা ও বিরোধের কারণেই ডানপন্থী ভোটগুলো এক প্ল্যাটফর্মে আসা সম্ভব নয়। আবার এককভাবে নির্বাচন করে আসন পাওয়া কঠিন হওয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইসলামি দলগুলো বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করতে দেখেছি। আমরা যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্পেকট্রামের দিকে তাকাই, তাহলে বিএনপি ডান দিকে ঝুঁকে থাকা মধ্যপন্থী দল। আরও ডানে আছে জামায়াতে ইসলামী। আরও ডানে হেফাজতে ইসলামসহ অন্য দলগুলো। আওয়ামী লীগ কিছু বামে ঘেঁষা মধ্যপন্থী দল। আরও বামে আছে কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থী নামে পরিচিত দলগুলো। ভোটের সমীকরণে সব সময়ই মধ্যপন্থী দলগুলোই আধিপত্য করে। সিংহভাগ ভোটার এ ধারার দলগুলোর, প্রতিই আকৃষ্ট হন।

… জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মধ্যপন্থী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বললেও এখন পর্যন্ত দলটি নিজেদের ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি দিতে পারেনি। মধ্যপন্থী রাজনীতি যে একটা মতাদর্শ, সেই অবস্থান তাদের কথা ও কাজে প্রতিফলিত হচ্ছে না। ব্যক্তির অধিকার, উদারনৈতিক গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, সুযোগের ক্ষেত্রে সাম্য-এ রকম মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়েই মধ্যপন্থী রাজনীতির ভিত গড়ে ওঠে। ডানপন্থীর সঙ্গে কিছু বামপন্থী লোককে ভেড়ানো মানেই মধ্যপন্থী রাজনীতি নয়।

… পুরোনো যে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, সেখানে দল মানে এক ব্যক্তি। সরকার মানেই এক ব্যক্তির শাসন। কে নেতা হবেন, কে এমপি হবেন, কে মন্ত্রী হবেন, সবটাই নির্ধারণ করে দেন দলের নেতা। ফলে রাজনীতি, সরকার-সবখানেই ব্যক্তিপূজা প্রতিষ্ঠা পায়। রাজনীতির এই ব্যক্তিপূজা শেষ পর্যন্ত অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ও কর্মসূচি থাকলেও সেটা কাগুজে বিষয়।

পুরোনো রাজনৈতিক চর্চাকে পেছনে ফেলে আমরা কতটা সামনে এগোতে পারব, সেটার অনেকখানিই নির্ভর করে নতুন রাজনৈতিক দলগুলো কতটা ভিন্নভাবে রাজনীতি করতে পারছে। নারী, শ্রমিক, কৃষক, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রশ্নে তারা কতটা উদারভাবে দাঁড়াতে পারছে। নতুন রাজনৈতিক দল কোথা থেকে অর্থ পাচ্ছে, নেতারা কেমন জীবন যাপন করছেন, কোন্ কোন্ প্রশ্নে তাঁরা বিবৃতি দিচ্ছেন, কোন্কোন্ ইস্যুতে তাঁরা নিশ্চুপ থাকছেন-এ সবকিছুই কিন্তু মানুষ গভীরভাবে দেখছে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের থাকা না-থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। আবার বিকল্প দল না থাকায় আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে বাধ্য হন-এমন লিবারেল ও সেক্যুলার ভোটাররাও আছেন। আমরা ধরে নিই যে, আওয়ামী লীগ না থাকলে তাদের কট্টর সমর্থকেরা ভোেট দিতে যাবেন না। এর বাইরেও বিরাট অংশের ভোটারের ভোট দেওয়ার মতো কোনো রাজনৈতিক দল নেই।

… পুরোনো ঘরানার বামপন্থী দলগুলো শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের সাংগঠনিক ভিত্তিও নড়বড়ে ।ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকার প্রশ্নে পুরোনো বামপন্থীদের অবস্থান অনড় ও সেকেলে। সে কারণে যারা লিবারেল ও গণতান্ত্রিক, তাদের বামপন্থী দলগুলো আকৃষ্ট করতে পারে না। পরিবারতন্ত্র, জনতুষ্টিবাদ, সাংস্কৃতিক ক্যাচাল ও চরমপন্থী মতাদর্শের বাইরে ব্যক্তির অধিকার, উদারনৈতিক গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, সুযোগের ক্ষেত্রে সাম্য, নারী-কৃষক-শ্রমিক্সংখ্যালঘুর অধিকারকে জোরালোভাবে সমর্থন দেয়, এমন রাজনীতির শূন্যতা বাংলাদেশে অনেক দিনের। সেই শূন্যতা পূরণ করবে কোন্ দল?”






শিখদের সাথে বাংলা নববর্ষের কি যোগাযোগ ?

শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানকের প্রবর্তিত নানকশাহী বর্ষপঞ্জি একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা, এটি শিখ ধর্মের কালচার ও ধর্মীয় রীতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত। এই ক্যালেন্ডারের বিশেষত্ব হল ১৪ এপ্রিল তারিখে নববর্ষ উদযাপন, যেটি বাংলা সনের সঙ্গে একত্রিত হয়ে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছে। এভাবে বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্য এবং নানকশাহী বর্ষপঞ্জির সাথে প্রাচীন ঐতিহ্যের যোগাযোগ, ভারতীয় সমাজে সৌর পঞ্জিকা ব্যবহার এবং শিখ ধর্মের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।

শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক ১৫শ শতকে ধর্মীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি, শিখ সমাজের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় জীবনের পন্থা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নির্দেশে নানকশাহী বর্ষপঞ্জি প্রবর্তিত হয়, যা ১৬৪৫ সালে শিখ গুরু আরজন দেব কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়।

নানকশাহী বর্ষপঞ্জি সৌর বছর অনুসারে গঠিত এবং ১৪ এপ্রিল তারিখকে নববর্ষ হিসেবে ধরা হয়। এটি মূলত শিখ ধর্মের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় উৎসবের নির্ধারক এবং সঙ্গতিপূর্ণ একটি ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা। ১৪ এপ্রিল দিনটি ভিক্রমি সন এবং হিজরি সনের সাথে কোনও সম্পর্ক না রেখেই শুধু সৌর পঞ্জিকাকে ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছিল। এটি শিখ সমাজে চাষাবাদ, উৎসব এবং ধর্মীয় কাজকর্মের সঠিক পরিচালনা নিশ্চিত করত।

বাংলা নববর্ষের দিন ১৪ এপ্রিল এবং নানকশাহী নববর্ষ একই দিনে উদযাপিত হয়। যদিও এই দুইয়ের উৎস এবং ইতিহাস ভিন্ন, তবে তাদের মধ্যে একটি গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পূর্ব ভারতের জনগণ বিশেষত বাংলায় সৌর পঞ্জিকার ব্যবহার ছিল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় যেমন শিখ, হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে একত্রিত হয়েছিল। গবেষকরা দাবি করেন, বাংলা, অসম এবং ওড়িশা অঞ্চলে প্রাচীন সৌরনির্ভর ক্যালেন্ডারের প্রচলন ছিল, যা শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠা এবং তার পঞ্জিকা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার পূর্বে ব্যবহার হত। শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানকও এই সৌর পঞ্জিকা ব্যবস্থাকে কার্যকরী মনে করেছিলেন, কারণ এটি কৃষি-ভিত্তিক সমাজের জন্য অধিক কার্যকরী ছিল।

বাংলা, অসম ও ওড়িশার প্রাচীন ক্যালেন্ডারগুলি প্রমাণ করে, এখানে সৌর বছরের ভিত্তিতে সময় গণনার ঐতিহ্য ছিল। এই অঞ্চলে সৌর পঞ্জিকা ব্যবহৃত ছিল, যা কৃষকদের জন্য ফসল উৎপাদন এবং মৌসুমি পরিবর্তন নির্দেশ করতে সহায়ক ছিল। পূর্ব ভারতের এই পঞ্জিকা ব্যবস্থাগুলির মধ্যে কোনও না কোনও প্রভাব ছিল শিখ ধর্মের পঞ্জিকা ব্যবস্থার উপর। এটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, বাংলা সনের প্রথম দিন (পহেলা বৈশাখ) এবং নানকশাহী সনের নববর্ষের তারিখের মধ্যে একটি অসীম সাদৃশ্য রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে তফাৎ হলেও উভয়েই সৌর বছরের ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে এবং কৃষি মৌসুমের প্রারম্ভকে কেন্দ্র করে থাকে।

মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে ফসলি সন প্রবর্তন করেন, এটিও মূলত সৌর বর্ষপঞ্জির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। আকবরের এই সনটি কৃষিজীবনের সময়সীমা এবং ফসলের উৎপাদন ভিত্তিক ছিল, যা দেশের খাজনা আদায় এবং প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য সুবিধাজনক ছিল। শিখ ধর্মের নানকশাহী বর্ষপঞ্জি এবং আকবরের ফসলি সনের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে। দুটোই সৌর বর্ষ অনুসরণ করে এবং কৃষির জন্য উপযোগী। যদিও শিখ পঞ্জিকা মূলত শিখ ধর্মের আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের অনুকূল ছিল, তবুও এটি কৃষকদের সুবিধার জন্যও কার্যকর ছিল। একইভাবে আকবরের ফসলি সনও ফসল উৎপাদন এবং কৃষি সমাজের জন্য সঠিক সময়সীমা নির্ধারণ করত।

শিখ ধর্মের প্রভাব এবং নানকশাহী পঞ্জিকার গুরুত্ব
শিখ ধর্মের প্রবর্তিত নানকশাহী বর্ষপঞ্জি শুধু শিখ সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বরং তার প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপরও ছিল। ১৪ এপ্রিল নববর্ষের উৎসব শিখ ধর্মের পাশাপাশি, বাংলা, অসম এবং অন্যান্য অঞ্চলের লোকদের জন্যও ঐতিহ্যবাহী একটি দিন হয়ে ওঠে। এটি পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তর সংস্কৃতিতে স্থান পায়, যেখানে বাঙালি সম্প্রদায় পহেলা বৈশাখ হিসেবে এই দিনটিকে আনন্দের সাথে উদযাপন করে।

উপসংহার
নানকশাহী বর্ষপঞ্জি এবং বাংলা নববর্ষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পূর্ব ভারতের জনগণ সৌর পঞ্জিকার ব্যবহারে এক ধরণের ঐতিহ্য বজায় রেখেছিল, যা পরবর্তীতে শিখ ধর্ম এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সময়ে আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। শিখ ধর্মের গুরুরা যে পঞ্জিকা প্রবর্তন করেছিলেন, তা শুধু ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বই বহন করেনি, বরং এটি কৃষি সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলা নববর্ষ ও নানকশাহী বর্ষপঞ্জি একই দিনে উদযাপিত হওয়ায়, দুই সংস্কৃতির মধ্যে একটি সেতুবন্ধনের কাজ করে, যা আমাদের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক শিকড়ের দিকে ফিরে যাওয়ার এক সুন্দর সুযোগ প্রদান করে।





হাজার বছরের মরীচিকার গল্প ফাতা মর্গানা

একদিন হঠাৎ আকাশের গায়ে ভেসে উঠল এক শহরের অবয়ব-টাওয়ার, সেতু, ভবন আর অজস্র আলো। ঘটনাটি ২০১৫ সালের চীনের জিয়াংশি প্রদেশে। হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে দেখে সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য, যেন অন্য এক মাত্রা থেকে উঠে এসেছে এক রহস্যময় শহর।সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রে হইচই পড়ে যায়, এটি কি অন্য কোনো মহাবিশ্ব? না কি এলিয়েনদের প্রযুক্তি?

এই রোমাঞ্চকর ঘটনার পেছনে রয়েছে এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা “ফাতা মর্গানা” নামে পরিচিত এক ধরনের অপটিক্যাল বিভ্রম। কিন্তু এর গভীরে ডুবে গেলে আমরা খুঁজে পাই কেবল বিজ্ঞানের প্রান্তেই থেমে থাকা নয়, বরং হাজার বছরের পুরনো লোককাহিনি, কল্পনাপ্রবণতা এবং মানবিক বিস্ময়ের এক জগৎ।

ফাতা মর্গানা হল একটি জটিল প্রকারের সুপিরিয়র অপটিক্যাল বিভ্রম, যা নির্দিষ্ট আবহাওয়া পরিস্থিতিতে দেখা যায়। যখন ঠান্ডা ঘন বায়ুর স্তরের উপর গরম বায়ুর স্তর তৈরি হয়, তখন আলো তার গতিপথ বেঁকিয়ে দেয়। এই বেঁকানো আলোর প্রতিফলন আমাদের চোখে এমনভাবে পৌঁছায় যেন দূরবর্তী কোনো বস্তু আকাশে ভেসে আছে। শহর, জাহাজ, পাহাড় এমনকি মানুষ পর্যন্ত এই বিভ্রমে ভিন্ন রূপে দেখা দিতে পারে।

চীনের ঘটনার সময় আবহাওয়া ছিল খুবই আদর্শ এই ধরনের বিভ্রমের জন্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, আশেপাশের কোনো আধুনিক শহরের প্রতিচ্ছবি ওই অঞ্চলের আকাশে ভেসে উঠেছিল, যেটিকে সাধারণ চোখে বাস্তব শহর বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের চোখে এটি ছিল এক অলৌকিক দর্শন, যা তাদের কল্পনার জগতে তৈরি করেছিল বহু প্রশ্ন। এই ঘটনাটি নতুন নয়। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ এমন দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে। রাশিয়ার কিংবদন্তি শহর কিতেজ তার একটি দৃষ্টান্ত।কথিত আছে, এই শহরটি তেরো শতকের দিকে মঙ্গোল আক্রমণের সময় লেক স্বেতলোইয়ারের নিচে ডুবে যায়। তবে এটি একেবারে অদৃশ্য হয়নি-পবিত্র হৃদয়ের মানুষরা এখনও সেই শহরের ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পায়, কখনো কুয়াশায় তার গম্বুজ ঝলসে ওঠে।

এই শহরটিকে ঘিরে রুশ সমাজে গড়ে উঠেছে এক অলৌকিক বিশ্বাস ও জাতীয় চেতনার প্রতীক। কিতেজের মতোই চীনের আকাশে ভেসে ওঠা শহর মানুষের কল্পনায় তৈরি করেছে অন্য এক বাস্তবতা-যা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অতীত বলে মনে হয়। ২০১৫ সালের পর আরও কিছু অঞ্চলে ভাসমান শহরের মতো দৃশ্য দেখা গেছে। কেউ বলছে এটি এক ধরনের আন্তঃমাত্রিক জানালা, কেউ বা বলছে এটি মানুষের চেতনার সাথে যুক্ত এক ধরণের ‘মাস হ্যালুসিনেশন’। কল্পবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টি আরও রোমাঞ্চকর হয়। যদি সত্যিই একাধিক মাত্রা থাকে, তবে সেই শহরগুলো কি আমাদের সাথে কোনওভাবে যোগাযোগ করছে?

তবে বাস্তববাদীরা বলছেন, এসবই আবহাওয়াজনিত কারণে তৈরি হওয়া অপটিক্যাল বিভ্রম। কিন্তু প্রশ্ন থাকে-কেন এই বিভ্রমগুলো এত নিখুঁত হয়? কেনইবা বহু মানুষের মধ্যে একইসাথে একই দৃশ্যের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়? বিজ্ঞান এখনও এসব প্রশ্নের সব উত্তর দেয়নি। আমরা যখন ডিজিটাল বাস্তবতা, এআই, ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মধ্যে বাস করছি, তখন প্রকৃতির এই রহস্যময় খেলাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিস্ময়ের স্থান এখনও জীবিত। ফাতা মর্গানার মতো বিভ্রম আমাদের চোখকে ধোঁকা দিলেও, তা আমাদের কল্পনাকে জাগিয়ে তোলে। এই কল্পনা থেকেই জন্ম নেয় গল্প, বিশ্বাস, এবং এমনকি সভ্যতার গতিপথ।

ভাসমান শহরের গল্প শুধুই এক দিনের বিভ্রম নয়; এটি এক হাজার বছরের পুরনো মানুষের বিস্ময়, কল্পনা এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মিলনস্থল। বিজ্ঞান ব্যাখ্যা দিতে পারেডকিন্তু ব্যাখ্যার পরেও থেকে যায় এক ধরনের অনুভূতি, যা যুক্তির চেয়েও গভীর।



চাপ বাড়লে ক্ষুধা বাড়ে ? জানুন স্ট্রেস ইটিং এর আসল কারণ

অফিসের কাজের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা ব্যক্তিগত উদ্বেগ-যখন মন খুব বেশি চাপে থাকে, তখন অনেকেই দেখা যায় খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিশেষ করে চিপস, চকোলেট, কেক বা ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। এই আচরণকে বলা হয় ‘স্ট্রেস ইটিং’ বা মানসিক চাপের কারণে অতিরিক্ত খাওয়া। এটি শুধু ওজন বৃদ্ধি বা শারীরিক সমস্যার কারণই নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে। পুষ্টিবিদদের মতে, স্ট্রেস ইটিং কোনো অভ্যাসগত দুর্বলতা নয়, এটি একটি জৈবিক প্রতিক্রিয়া। যখন আমরা মানসিক চাপে থাকি, তখন শরীরে কর্টিসল নামক এক ধরনের স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হয়। এই হরমোন আমাদের দেহে উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাওয়ার ইচ্ছা জাগায়, বিশেষ করে চিনি ও চর্বি সমৃদ্ধ খাবার। চকোলেট বা চিপস তখন মনে হয় স্বস্তির উৎস।

পুষ্টিবিদ আফরোজা সুলতানা বলেন, “চিনিযুক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার খেলে মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা কিছুক্ষণের জন্য আনন্দ বা স্বস্তি তৈরি করে। ফলে আমরা বারবার এমন খাবারের দিকে হাত বাড়াই, যদিও তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।” স্ট্রেস ইটিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি প্রায়ই অজান্তেই ঘটে। আপনি বুঝে উঠার আগেই হয়তো এক প্যাকেট চিপস শেষ, তারপর একটুকরো চকোলেট, তারপর আরেকটা। এটি ধীরে ধীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ, ওজন বৃদ্ধি, হজমের সমস্যা ও ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

এই সমস্যার সমাধানে কিছু ধাপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, নিজের খাওয়ার অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। প্রতিবার খাওয়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন-আপনি সত্যিই ক্ষুধার্ত, না কি শুধু মন খারাপ? পাশাপাশি মেডিটেশন, ব্যায়াম বা মনোযোগ সরানোর জন্য বই পড়া, গান শোনা বা প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটানো সহায়ক হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজেকে দোষ না দিয়ে, নিজের অনুভূতিকে বুঝে, ধীরে ধীরে সুস্থ অভ্যাস গড়ে তোলা। স্ট্রেস থাকবে, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া যেন আমাদের আরও দুর্বল না করে-সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

২০২৫ সালে ইতিহাসের রেকর্ড করা গরম মাস পার করছে অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইতিহাসের সবচেয়ে গরম ১২ মাসের পর্ব পেরিয়েছে, যেখানে মার্চ মাসে গড় তাপমাত্রা ছিল ২.৪১°০ বেশি, যেটি আগের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। আবহাওয়া ব্যুরো নিশ্চিত করেছে যে ১৯১০ সাল থেকে তাদের ডেটা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হওয়া ১২ মাসের গড় তাপমাত্রা ছিল ১.৬১°০ বেশি, যা আগের রেকর্ড ১.৫১°C (২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত) কে ছাড়িয়ে গেছে। মার্চ ২০২৫ এর গরমের পরিসংখ্যান আরো চমকপ্রদ। গত মাসে তাপমাত্রা ২.৪১°C গড়ে বাড়ে, যা ২০১৯ সালের মার্চের ২.০৩°C রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। মার্চ মাসে রাতের তাপমাত্রাও ছিল রেকর্ড ভাঙা, যা ২.৫৩°০ বেশি ছিল ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের গড়ের তুলনায়। এই পরিসংখ্যান অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে মার্চ মাসের সবচেয়ে গরম রাতের তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড হয়ে গেছে।

এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া ২০২৪-২৫ সালের বসন্ত গ্রীষ্মকালেও নতুন এক গরমের ইতিহাস তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাস গড়ে ১.৯৮°০ তাপমাত্রা ছিল বেশি। একে বলা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে গরম বসন্ত-গ্রীষ্মকাল। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এএনইউ) জলবায়ু বিজ্ঞানী প্রফেসর সারাহ পার্কিন্স-কিকপ্যাট্রিক এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, “এটা একরকম একই ঘটনার ভিন্ন বছর। আমি নিশ্চিত সবাই এখন ক্লান্ত, কারণ এই রেকর্ডগুলো বারবার ভাঙছে। এখন এটা অত্যন্ত পূর্বানুমেয়।” তার মতে, এই রেকর্ড-ভাঙা তাপমাত্রাগুলোর পেছনে মূলত বৈশ্বিক উত্তাপ এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনই দায়ী।

ড. সাইমন গ্রেইনজার, আবহাওয়া ব্যুরোর সিনিয়র ক্লাইমেটোলজিস্ট জানিয়েছেন যে ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাস ছিল গরমতম, যেখানে গড় তাপমাত্রা ছিল ২.০৮°০ বেশি। এটা ২০১৯ সালের প্রথম তিন মাসের সাথে সমান। তিনি বলেন, “এটা এখন পর্যন্ত গরমতম ১২ মাস। এটা বেশ আশ্চর্যজনক যে আমরা এই রেকর্ডটিকে দশমিক এক ডিগ্রী বেশি ছাড়িয়ে গেছি।” এই গরম আবহাওয়ার কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে। নিউ সাউথ ওয়েলস এবং সাউথ অস্ট্রেলিয়া তাদের গড় তাপমাত্রায় মার্চ মাসের রেকর্ড ভেঙেছে, যেখানে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া তার গড় তাপমাত্রা, ন্যূনতম তাপমাত্রা এবং সর্বাধিক তাপমাত্রা মিলিয়ে মার্চ মাসের সবচেয়ে গরম রেকর্ড করেছে। তবে তাস্মানিয়া এবং ভিক্টোরিয়া বাদে অন্যান্য রাজ্যে মার্চ মাসে রাত্রিকালীন তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙা হয়েছে।

ড. অ্যান্ড্রু কিং, মেলবোের্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী, জানিয়েছেন ১২ মাসের রেকর্ডটি উল্লেখযোগ্যভাবে ভেঙে গেছে, কারণ এটি পুরো মহাদেশ জুড়ে গড় হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা এখন পৃথিবীকে দ্রুত গরম করছি এবং আমরা এখনও রেকর্ড পরিমাণ CO2 বায়ুমণ্ডলে ছাড়ছি।” এই রেকর্ড-ভাঙা তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে পার্কিন্স-কিকপ্যাট্রিক বলেন, “আমরা শুধু আরও গরম হচ্ছি। এই রেকর্ডগুলি গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা জলবায়ু পরিবর্তন। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে কোনো একটি মৌসুম জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, তবে আমরা জানি যে সব কিছুই ধারাবাহিকভাবে গরম হচ্ছে।”

তবে বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রেও কিছু ভিন্ন ছবি দেখা গেছে। কুইন্সল্যান্ডের মার্চ ছিল তার তৃতীয় সবচেয়ে শীতল মার্চ। অন্যত্র বৃষ্টিপাত ছিল গড়, কিন্তু তাস্মানিয়া ছিল তার ১২তম সবচেয়ে গরম মার্চ। অস্ট্রেলিয়া এখন আরও একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তাপমাত্রার বৃদ্ধিতে নয়, বৃষ্টিপাত এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিশাল পরিবর্তন আনছে। এই রেকর্ড-ভাঙা তাপমাত্রার ঘটনা কেবল অস্ট্রেলিয়ার জন্য না, সারা বিশ্বের জন্য একটি সংকেত যে আমরা এক গুরুতর জলবায়ু সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।


ধর্ষণ সংস্কৃতির একাল সেকাল

১৯৯৫ সালের জনপ্রিয় হলিউড সিনেমা Braveheart – এ এক দৃশ্যের কথা মনে করুন। স্কটিশ এক কৃষকের বিয়ের দিন, ইংরেজ সৈন্যরা হঠাৎ হাজির হয়। তারা বরকে আলাদা করে জিম্মি করে, আর কনেকে ধরে নিয়ে যায় এক প্রভুর ঘরে। বিয়ের প্রথম রাতের যৌন অধিকারের (Prima Nocte) নামে কনে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়। সিনেমার ভাষায় এটি রাজা এডওয়ার্ডের ‘পুরোনো প্রথা’ পুনঃপ্রবর্তন তথাকথিত আইনসঙ্গত ধর্ষণ। তবে ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ‘প্রথম রাতের অধিকার’ বিষয়টি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, মধ্যযুগীয় স্কটল্যান্ড বা ইংল্যান্ডে এর কোনো প্রমাণ মেলে না। এটা ছিল ইংরেজ দখলদারিত্বের নৃশংসতা প্রকাশের এক নাটকীয় কৌশল। কিন্তু সিনেমা আমাদের মনে এমন একটা ধারণা গেঁথে দেয়-মধ্যযুগ মানেই অন্ধকার, বর্বরতা, আর ধর্ষণের স্বাভাবিকীকরণ।

এই ধরনের চিত্রায়ন শুধু যে ইতিহাসকে বিকৃত করে তা-ই নয়, বরং আমাদের সময়কে মিথ্যা ‘সভ্যতার উচ্চতায়’ বসিয়ে দেয়। প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি আমরা মধ্যযুগ থেকে এতটা এগিয়ে গেছি? নাকি ধর্ষণ নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আজও সেই পুরনো পথেই হাঁটছে?
মধ্যযুগে ধর্ষণ: আইন ও বাস্তবতা
১২শ থেকে ১৬শ শতকের মধ্যে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে ধর্ষণ ছিল ফৌজদারি অপরাধ। নারীরা নিজেরাই আদালতে গিয়ে অভিযোগ করতে পারতেন, বাবার বা স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন হতো না। অনেক সময় এই মামলাগুলোর রায় ভুক্তভোগীর পক্ষে যেত।উদাহরণস্বরূপ, গ্লাসগোের পরিচারিকা ইসাবেল বার্ন জন অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন। আদালত অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে শহর থেকে নির্বাসিত করে।

১৫৬১ সালে স্কটল্যান্ডের এক আদালতে ধর্ষককে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। ১৪০৫ সালে এক মা ও তার দুই কন্যা তাদের ধর্ষককে শারীরিকভাবে আঘাত করে প্রতিশোধ নেয়, এবং তারা পরবর্তীতে ক্ষমা পায়। এসব ঘটনাগুলো প্রমাণ করে-মধ্যযুগে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ছিল, আর সমাজও সেটা কিছুটা হলেও স্বীকৃতি দিত। তবে এসব সত্ত্বেও বাস্তবতা ছিল কঠিন। ধর্ষণের অভিযোগ করতে হলে নারীদের তাৎক্ষণিকভাবে ও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে হতো, এবং তা বারবার নানা কর্তৃপক্ষের সামনে বলতে হতো। শারীরিক আঘাত, ছেঁড়া জামা, বা রক্তাক্ত চুল না থাকলে অভিযোগ গ্রহণ করা হতো না।এইসব প্রমাণ না থাকলে আদালত ধর্ষণকে ‘সম্মতিমূলক সম্পর্ক’ হিসেবে ধরে নিত। পূর্বে যদি কোনো যৌন সম্পর্ক থাকত, তাহলে পরবর্তী ধর্ষণের অভিযোগ সহজেই বাতিল হয়ে যেত।

একটি ভয়াবহ উদাহরণ হলো ১৩০০ সালের দিকে ১১ বছর বয়সী জোয়ান সেলার-এর ঘটনা। সে অভিযোগ করেছিল যে, এক ব্যক্তি তাকে একটি কুঁড়েঘরে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। আদালত তার বক্তব্যে কিছু তারিখের অসঙ্গতি খুঁজে পায় এবং অভিযোগ বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে জোয়ানকেই জরিমানা করা হয় এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, আইনি কাঠামো থাকলেও তা ভুক্তভোগীদের জন্য কতটা প্রতিকূল ছিল। ধর্ষণের দায়প্রমাণের পুরো ভারটাই চাপিয়ে দেওয়া হতো নারীর উপর এবং প্রমাণের মাপকাঠি ছিল প্রায় অসম্ভব। একটি ভয়ানক অথচ প্রচলিত বিশ্বাস ছিল-যদি ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ হয়, তবে সেটা ধর্ষণ ছিল না। কারণ নারী যদি ‘আসলে না চাইত’, তাহলে তার গর্ভধারণ হতো না। ১৩১৩ সালের একটি মামলায় এই যুক্তি আদালতে গৃহীত হয়। এই ধারণা কেবল মধ্যযুগেই নয়, আধুনিক সময়েও ফিরে এসেছে।

২০১২ সালে মার্কিন রাজনীতিবিদ টড অ্যাকিন বলেন, ‘প্রকৃত ধর্ষণে নারীর শরীর নিজেই গর্ভধারণ প্রতিরোধ করে।’ এই বক্তব্য শুধুই ভ্রান্ত নয়, তা মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের জীবন্ত নমুনা। মধ্যযুগীয় ধর্ষণ সংস্কৃতির মূল ভিত্তি ছিল-নারীকে অবিশ্বাস করা, নারীকে কামুক হিসেবে দেখা ও নারী-পুরুষের সম্মতির সীমাকে ঘোলা করে ফেলা। সেইসব মানসিকতা আজও টিকে আছে, কেবল একটু পাল্টানো রূপে। Netflix সিরিজ Unbelievable (২০১৯) বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে বানানো, যেখানে এক তরুণী ধর্ষণের অভিযোগ করার পর পুলিশ তাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করে। পরে জানা যায়, সে ঠিকই বলেছিল। ২০২১ সালে মার্কিন কংগ্রেসওমেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ যখন যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, তখন অনেকেই সেটাকে ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে উড়িয়ে দেন।

এইসব ঘটনা দেখায়-আমরা হয়তো প্রযুক্তিতে, আইনকাঠামোয় উন্নত হয়েছি, কিন্তু মানসিকতায় অনেকটাই মধ্যযুগে আটকে আছি।ধর্ষণ কোনো নতুন সমস্যা নয়। সমাজ ও আইনের কাঠামোর মধ্যেই আজও এমন কিছু বিশ্বাস ও আচরণ গেঁথে আছে, যা ধর্ষণকে নিরুৎসাহিত না করে বরং লুকিয়ে রাখে, অবিশ্বাস করে, আর ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করে। মধ্যযুগীয় ধর্ষণ সংস্কৃতি ছিল অন্ধকার এক অধ্যায়, কিন্তু তা আমাদের বর্তমান সময়কে বিশ্লেষণের জন্য একটি দর্পণও বটে। আজকের প্রগতিশীল সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হবে, যখন আমরা এই উত্তরাধিকারকে স্বীকার করব এবং প্রতিটি কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে শিখব। যে কণ্ঠ আজও বলে, ‘আমার শরীর, আমার সম্মতি।’




বাংলাদেশের পোশাকে শুল্ক আরোপ করা উচিত হয়নি : পল ক্রুগম্যান , নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ

বাংলাদেশের পোশাকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপ করা উচিত হয়নি। এ ধরনের সিদ্ধান্তে মার্কিন ক্রেতাদের জীবন বিঘ্নিত হবে।এতে মার্কিন নাগরিকদের জীবন আরও নিরাপদ হবে-সেই সম্ভাবনা নেই, বরং মার্কিনদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে

জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বন্ধুস্থানীয় ও প্রতিবেশী দেশেও উৎপাদন করা প্রয়োজন, এতে সরবরাহব্যবস্থার ওপর ভরসা করা যায়। এই উভয় বিবেচনায় বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কানাডা ও মেক্সিকোর মতো দেশের পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা ঠিক হয়নি।
পল ক্রুগম্যান
নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ

যদি ভেবে দেখতে চান, বাণিজ্য-ঘাটতি দূর করতে পারলে আমরা ঠিক কী পরিমাণ অতিরিক্ত উৎপাদন করব। তখন এমন হতে পারে যে, উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানের হার মোট কর্মসংস্থানের ১০ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠবে। একসময় আমাদের কর্মসংস্থানের যে ৩০ শতাংশই হতো উৎপাদন খাতে, তা আর হবে না। মোদ্দা কথা হলো উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো অটোমেশন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য-ঘাটতি নয়। পাল্টা শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি প্রসঙ্গে পল ক্রুগম্যান

সব দেশই কিছু না কিছু পণ্য উৎপাদন করে। যে পণ্য এক দেশ তৈরি করে না, সেটা তারা আরেক দেশ থেকে আমদানি করে। এখন কথা হচ্ছে, প্রতিটি দেশের সঙ্গেই যে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, এর কোনো কথা নেই। কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য-ঘাটতি থাকার অর্থ এই নয়, যে দেশের হাতে উদ্বৃত্ত আছে, সেই দেশ অন্যায্য বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের মানুষেরা এসব বিশ্বাস করেন।
পল ক্রুগম্যান
বাণিজ্য-ঘাটতি প্রসঙ্গে

বাণিজ্য-ঘাটতিকে সংশ্লিষ্ট দেশের আমদানি দিয়ে ভাগ করে শুল্ক হার নির্ধারণ করা এবং তার অর্ধেক হারে সেই দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করা-এই পদ্ধতি অবাস্তব।
পল ক্রুগম্যান
শুল্ক নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে প্রসঙ্গে



বাংলাদেশের নদীতে চীনের সহায়তা ভালো না মন্দ : ড. নজরুল ইসলাম জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান এবং এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক

… চীনে অবস্থানকালে প্রধান উপদেষ্টা চীনা কোম্পানির মাধ্যমেই তিস্তাবিষয়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, চীনের পানিসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি চীনের কাছে বাংলাদেশের নদ-নদীবিষয়ক ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার জন্য বিদেশি সরকার কিংবা সংস্থা দ্বারা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের অতীত অভিজ্ঞতা তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। … পঞ্চাশের দশকে ক্রুগ কমিশনের সুপারিশক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (আইইসিও) বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৬৪ সালে দুই খণ্ডের মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করে।

… নদ-নদীর প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে আইইসিও যে পন্থার প্রচলন করে, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয় ‘বাণিজ্যিক পন্থা’। বদ্বীপের জন্য এর সুনির্দিষ্ট রূপ হলো ‘বেষ্টনী পন্থা’। এই পন্থার মূল লক্ষ্য হলো, প্লাবনভূমিকে নদীখাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। সেই লক্ষ্যে সারা দেশে অসংখ্য বেড়িবাঁধ, সুইসগেটসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। … খালি চোখেও আইইসিওর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলাফল স্পষ্ট; দেশের নদী ব্যবস্থা বিপর্যন্ত। অসংখ্য নদী হারিয়ে গেছে, বাকিগুলোও মুমূর্ষু। একদিকে নদীখাতগুলো ভরাট করা হয়েছে, অন্যদিকে প্লাবন ভূমির অবক্ষয় সাধিত হয়েছে। … এখন যেমন আমরা নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়ে চীনের প্রতি আকর্ষিত হচ্ছি, আগে আকর্ষণ ছিল নেদারল্যান্ডসের প্রতি।

…বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার মূল করণীয় হলো, প্রবাহের ঋতুভেদ মোকাবিলা এবং পলিবালুর সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করা।নেদারল্যান্ডসের জন্য এই দুই করণীয়র একটিও প্রাসঙ্গিক নয়। … নেদারল্যান্ডসের মতো চীনের নদ-নদীর পরিস্থিতিও বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। নদ-নদীর প্রতি চীন অত্যন্ত আগ্রাসী বাণিজ্যিক পন্থা অনুসরণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে তার পরিণতি ভালো হয়নি। এ নিয়ে সেই দেশে সমালোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

বাংলাদেশের তিস্তা নদীর জন্য পাওয়ার চায়না যে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, তাতেও আমরা আগ্রাসী বাণিজ্যিক পন্থার প্রতিফলন দেখি। এই পরিকল্পনায় তিস্তার মতো একটি বেনুনী নদীর গড় প্রন্থ একলাফে আনুমানিক ৩ হাজার মিটার থেকে ৮১৬ মিটারে হ্রাসের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার স্থায়িত্বশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ। … সব মিলিয়ে বলতে হচ্ছে যে, বাংলাদেশের নদ-নদীর পরিস্থিতি ভিন্ন। সে জন্য প্রয়োজন ভিন্ন দর্শন ও পন্থা। বাংলাদেশের জন্য উপযোগী হলো, নদ-নদীর প্রতি প্রকৃতিসম্মত ও উন্মুক্ত পন্থা এবং দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে পাড় স্থিতিশীলকরণ।

অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, বিদেশিদের পক্ষে বাংলাদেশের এই বিশেষ পরিস্থিতি ও প্রয়োজন হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। বস্তুত, অতীতে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিস্তাবিষয়ক পাওয়ার চায়না প্রণীত প্রকল্প ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের নদ-নদী ব্যবস্থাপনায় আবার কোনো বিদেশি কোম্পানিনির্ভর প্রয়াস যে সফল হবে, সে বিষয়ে আশাবাদী হওয়া কঠিন।