Home Blog Page 143

টিকটক এবং প্রযুক্তিগত বৈশ্বিকীকরণ এক নতুন রাজনৈতিক লড়াই

২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রাত ১০:৩০ টার দিকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম TikTok মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় চৌদ্দ ঘণ্টা পর্যন্ত আমেরিকান ব্যবহারকারীরা TikTok ব্যবহার করতে পারেনি। তবে কিছু সময় পর এটি পুনরায় চালু হয়, কিন্তু এই ছোট্ট সময়ের বন্ধের পরও, TikTok এবং তার চীনা প্রতিষ্ঠান ByteDance খুব বড় ধরনের কোনো ফলস্বরূপ পরিণতি ভোগ করেনি। তবে গত বছর এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একটি আইন স্বাক্ষর করেছিলেন, আমেরিকান অংশীদারদের কাছে অন্তত কিছু অংশে TikTok-কে বিক্রি করতে হবে, অথবা এটি যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হবে। এই আইনের ফলে TikTok এবং ByteDance এর সামনে এক নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথগ্রহণের আগে তিনি TikTok এবং তার সমর্থক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি TikTok নিষিদ্ধ করবেন না, যদিও তার প্রথম প্রশাসনই TikTok-এর উপর চীনা সরকারের প্রভাবের কারণে একটি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যেটি TikTok-এর সময়সীমা ৭৫ দিন বাড়িয়ে দেয়। এই সিদ্ধান্তের পর, ৪ এপ্রিল ট্রাম্প আবার ৭৫ দিন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, ফলে TikTok এর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ByteDance এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি শীঘ্রই হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল, যা একটি মার্কিন স্পিনঅফ কোম্পানির মাধ্যমে TikTok-এর মালিকানা শেয়ার পুনর্বিন্যস্ত করবে। কিন্তু গত সপ্তাহে, ট্রাম্প যখন এক বৈশ্বিক শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা দেন, চীনা পক্ষ চুক্তি চূড়ান্ত করতে আগ্রহী হয়নি। ট্রাম্প বলেন, ‘চীন শুল্কের কারণে চুক্তি পরিবর্তন করেছে। যদি আমি শুল্ক কিছুটা কমিয়ে দিই, তারা ১৫ মিনিটের মধ্যে চুক্তি অনুমোদন করবে।’

TikTok এর এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের সংকট নয়; এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক লড়াইয়ের প্রতিফলন। TikTok বর্তমানে এক ধরণের প্রযুক্তিগত অস্থিরতায় রয়েছে। এটি একদিকে কার্যকর এবং অন্যদিকে কার্যকরীভাবে অবৈধ। এই লড়াই শুধু একটি অ্যাপের ভবিষ্যত নিয়ে নয়, বরং প্রযুক্তি ও তথ্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এক বৃহত্তর দ্বন্দ্বের অংশ।

বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি গত কয়েক দশকে বৈশ্বিকীকরণের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। গুগল, ফেসবুক, এবং অ্যাপল এর আইফোন ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ তাদের ডিজিটাল জীবন চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির সফলতা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এক সময়ে মার্কিন সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলি ম্যাকডোনাল্ডস বা স্টারবাক্সের মতো আন্তর্জাতিক চেইনগুলির মতো বৈশ্বিক প্রসার লাভ করেছিল। এইভাবে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি বৈশ্বিক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

তবে আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির উপর জাতীয়তাবাদী এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। একদিকে প্রযুক্তি শিল্প বিশ্বের নানা দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারগুলি এসব কোম্পানির প্রযুক্তিকে তাদের নিজস্ব জাতীয় আগ্রহে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে প্রযুক্তিগত আধিপত্যের জন্য একটি বড় যুদ্ধ চলছে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক লড়াই নয়, বরং একটি রাজনৈতিক লড়াইও।

এরই মধ্যে হংকংয়ের দার্শনিক ইউক হুই তার ‘Machine and Sovereignty’ বইয়ে প্রযুক্তিগত বৈশ্বিকীকরণের বিপরীতে ‘টেকনোেডাইভার্সিটি’ নামে একটি নতুন ধারণা প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তিগত বৈশ্বিকীকরণের পরিবর্তে, একাধিক প্রযুক্তি একে অপরের সাথে সহাবস্থান করতে পারে, প্রতিটি প্রযুক্তি তার নিজস্ব ডিজাইন এবং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। এটি একটি নতুন ধরনের ডিজিটাল প্রতিযোগিতা এবং সঞ্চালনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যেখানে একাধিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা করবে এবং বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে।

TikTok-এর ওপর যে আলোচনা চলছে, তা শুধুমাত্র একটি অ্যাপের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না, বরং একটি বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ, প্রযুক্তির উপর রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। TikTok-এর বিক্রির বিষয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তা বাস্তবতায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে আধিপত্যের লড়াইয়ের প্রতিফলন। একদিকে আমেরিকা চাইছে TikTok এর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে, অন্যদিকে চীনও এর প্রযুক্তির ওপর তাদের প্রভাব বজায় রাখতে চায়। বিশেষ করে TikTok-এর বিষয়ে এই লড়াই, প্রযুক্তির ভবিষ্যত এবং তার নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। যদি সত্যিই ‘টেকনোেডাইভার্সিটি’ বা প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এটি বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন ধরনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যেখানে একাধিক দেশ এবং তাদের প্রযুক্তি কোম্পানি নিজেদের মতো করে প্রযুক্তি তৈরি এবং ব্যবহার করবে।



যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু নীতির বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজ্যগুলির জলবায়ু নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত পদক্ষেপ হিসেবে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। এই আদেশের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন দেশজুড়ে রাজ্যগুলির শক্তি ও পরিবেশ নীতির উপর হস্তক্ষেপ করতে চায়, যার মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করার জন্য পাস করা আইনগুলোকে বাধাগ্রস্ত করা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই পদক্ষেপটি দেশের শক্তি উৎপাদন বৃদ্ধির এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘকালীন অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।

নির্বাহী আদেশের মূল লক্ষ্য: ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা এমন রাজ্য আইনগুলো চিহ্নিত করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন, ESG (Environmental, Social, Governance), পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং কার্বন নির্গমন বিষয়ক। এই আইনগুলোকে পর্যালোচনা করে এবং যেগুলোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা ব্লক করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের মতে এসব রাজ্য আইনগুলি আমেরিকার শক্তি আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, নিউইয়র্ক এবং ভারমন্টের মতো রাজ্যগুলির আইনগুলির কথা, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলিকে জলবায়ু পরিবর্তনে অবদান রাখার জন্য জরিমানা করা হয়।

নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, ‘অনেক রাজ্য ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বা শক্তি নীতির নামে এমন আইন তৈরি করেছে, যা দেশের শক্তি উৎপাদন এবং নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।’ তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাপ-অ্যান্ড-ট্রেড নীতি এবং রাজ্যগুলো দ্বারা তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, যা, তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি উৎপাদন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হচুল এবং নিউ মেক্সিকোর গভর্নর মিশেল লুজান গ্রিশাম, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন, তারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে রাজ্যগুলির পরিবেশগত নীতি বাস্তবায়নের অধিকার খর্ব করা যাবে না। তারা বলেছেন, ‘আমরা জলবায়ু সংকটের সমাধান এগিয়ে নিয়ে যাব, যা আমেরিকানদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করবে, পরিচ্ছন্ন শক্তি অর্থনীতি বৃদ্ধি করবে এবং ভবিষ্যতকে আরও স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ করবে।’

অন্যদিকে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট (API) এই নির্বাহী আদেশকে স্বাগত জানিয়েছে। API’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রায়ান মেয়ারস বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পদক্ষেপ রাজ্যগুলিকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে, যারা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।’ ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, এই পদক্ষেপটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাধা সৃষ্টি করবে এবং পরিবেশ সুরক্ষা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির বিকাশের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে। রিপাবলিকানদের মতে এটি শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ, যা দেশের অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখবে।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু পরিবেশ নীতির সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি উৎপাদন এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি বড় সিদ্ধান্তের বিষয়। এখন সময় বলে দেবে যে, এই পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হবে এবং কীভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি নীতি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করবে।



মানব মস্তিষ্কের গতি ও তার বিভ্রমের সম্পর্ক

মানুষের মস্তিষ্কের শক্তি সম্পর্কে আমাদের মাঝে অনেক ধারণা রয়েছে। আমরা প্রায়ই মনে করি আমাদের চিন্তা ও অনুভূতিগুলি যথেষ্ট সমৃদ্ধ, কিন্তু সেই চিন্তা ও অনুভূতিগুলিকে বাস্তব সময়ের মধ্যে যথাযথভাবে প্রকাশ করা আমাদের জন্য একধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

অনেকেই এটিকে “ব্যান্ডউইথ সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এই বিষয়ে এলন মাস্ক একধরণের সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। মাস্কের এক দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হল, এমন একটি ইন্টারফেস তৈরি করা যা মানুষের মস্তিষ্ককে সরাসরি কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত করতে দেবে, যাতে কথা বলার বা লেখার মতো ধীর গতির মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা এই ধারণাটির একেবারে বিপরীত ফলাফল প্রকাশ করেছে।

Neuron জার্নালে প্রকাশিত নিউরোসায়েন্সে নতুন একটি গবেষণা দেখিয়েছে মানব মস্তিষ্কের গতি খুব ধীর। গবেষণাটি অনুসারে, মানুষের স্মৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কল্পনা করার গতি প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১০ বিট। বিপরীতে মানব সংবেদনশীলতা সিস্টেমের কাজ করার গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় এক বিলিয়ন বিট, যা আমাদের মস্তিষ্কের কাজের গতি থেকে প্রায় ১০০,০০০,০০০ গুণ দ্রুত।গবেষকদের মতে এই বিশাল গ্যাপটি মানুষের মনে এমন একটি বিভ্রম তৈরি করে যে, আমরা একসাথে অসীম চিন্তা করতে পারি, যদিও বাস্তবে আমরা একে একে শুধুমাত্র একটি করে চিন্তা করতে সক্ষম।

এই গতি ব্যবধানটি “মাস্ক বিভ্রম” হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ, এলন মাস্কের মতো উদ্যোক্তারা যেভাবে মনে করেন যে তাদের মস্তিষ্কের চিন্তা প্রচুর গতি নিয়ে কাজ করছে, তা বাস্তবতা থেকে অনেকটাই দূরে। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (Caltech) নিউরোসায়েন্টিস্ট মার্কাস মেইস্টার এবং তার সহলেখক জিয়েউ ঝেং এই গবেষণার মাধ্যমে এই বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।গবেষণার মতে, মস্তিষ্কের কাজের গতি অত্যন্ত ধীর এবং এটি একসময় শুধুমাত্র একটি কাজ করতে পারে। তা সে চিন্তা হোক কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ। মানুষের মস্তিষ্কের কাজের গতি প্রতি সেকেন্ডে ১০ বিটে সীমাবদ্ধ, যা একেবারেই সীমিত। সুতরাং যদি এলন মাস্ক তার মস্তিষ্ককে একটি কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত করতে সক্ষম হন, তবে তিনি যা আশা করছেন, তা হবে না। তার মস্তিষ্কের গতি তেমন বেড়ে যাবে না, কারণ তার মস্তিষ্কের কাজের গতি যে ধীর, সে বিষয়টি প্রকৃতিরই একটি সীমাবদ্ধতা।

এটি দেখায় যে, আমরা যতই প্রযুক্তির উন্নতি করি না কেন আমাদের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা এক জায়গাতেই থাকবে। নতুন প্রযুক্তি বা নানাবিধ উদ্ভাবন সত্ত্বেও, মস্তিষ্কের গতি এবং কাজের সীমাবদ্ধতা একে অপরকে অতিক্রম করতে পারবে না। মানব মস্তিষ্ক কেবল একবারে একটি চিন্তা বা কাজ করতে সক্ষম এবং এই সীমাবদ্ধতা মানুষকে জটিল কাজ করার জন্য বাধাগ্রস্ত করে। মস্তিষ্কের গতি যেমন ধীর, তেমনি মানব সংবেদনশীলতা সিস্টেম-যেমন চোখ, গন্ধ, শোেনা ইত্যাদি-অনেক দ্রুত কাজ করে। এই সিস্টেমগুলি প্রতি সেকেন্ডে এক বিলিয়ন বিট তথ্য প্রক্রিয়া করে, যা আমাদের মস্তিষ্কের কাজের গতির চেয়ে অনেক বেশি। এই বৈপরীত্যের কারণে মানুষ মনে করে, তাদের চারপাশের প্রতিটি বিশদ বিবরণ তারা সম্পূর্ণ ভাবে দেখতে বা শুনতে পারে। কিন্তু বাস্তবে, এটি সম্পূর্ণ সত্য নয়।আমাদের চোখের মাধ্যমে যে পরিমাণ তথ্য আমরা দেখতে পাই, তা একেবারেই সীমিত। আমাদের দৃষ্টি কেন্দ্রের বাইরে কী হচ্ছে, তা আমরা ঠিকভাবে দেখতে বা বুঝতে পারি না।

মেইস্টার বলেন, আমাদের চোখ যেহেতু যেকোনো বিস্তারিত ফোকাস করতে পারে, তাই আমরা ভুলভাবে মনে করি যে, আমরা সব কিছু একসাথে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের যে সীমাবদ্ধতা, তা আমাদের সত্যি সত্যি মাত্র একটি বিষয় বা চিন্তা উপলব্ধি করতে বাধা দেয়। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কেন মানুষ এক সময় একাধিক চিন্তা করতে পারে না। কেন আমাদের মস্তিষ্ক একসাথে ১০০০টি চিন্তা ধারণ করতে পারে না, যদিও প্রতি চিন্তা প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১০ বিটের গতি সম্পন্ন? এটি এক গভীর রহস্য এবং বিজ্ঞানীরা এখনো এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর খুঁজে পাননি। তবে, এটি মানুষের মন এবং মস্তিষ্কের কাজের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এখন গবেষকদের উদ্দেশ্য হলো মস্তিষ্কের এই সীমাবদ্ধতা বুঝে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। তারা বিশ্বাস করেন আমাদের মস্তিষ্কের গতির সাথে আমাদের সংবেদনশীলতা সিস্টেমের গতি মিলিয়ে, বিজ্ঞানীরা নতুন তথ্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি বের করতে পারবেন। কিন্তু তাও এটি মানব মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতাকে পুরোপুরি অতিক্রম করবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। এলন মাস্কের মতো উদ্ভাবকরা যেভাবে তাদের মস্তিষ্কের কাজের গতি বৃদ্ধির আশা করেন, তা বাস্তবতা থেকে বেশ দূরে। গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে, মানব মস্তিষ্কের গতি সীমাবদ্ধ এবং এটি একসাথে একাধিক চিন্তা বা কাজ করতে অক্ষম। তবে বিজ্ঞানীরা এই সীমাবদ্ধতার ওপর গবেষণা চালিয়ে আরও অনেক কিছু শিখতে সক্ষম হতে পারেন এবং এটি প্রযুক্তি এবং মস্তিষ্ক সম্পর্কিত আমাদের ভবিষ্যৎ ধারণাকে পুনরায় পর্যালোচনা করতে সাহায্য করবে।






দেশের জিডিপি বেড়েছে ১.৫ লাখ কোটি টাকা

গত অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতি কিছুটা গতিপথ বদলেছে। এতে টাকার অঙ্কে জিডিপি বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। বর্তমান নানা সমস্যার মধ্যে দেশের অর্থনীতি সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, এটিই একধরনের সান্ত্বনা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রতিবেদন তথ্যমতে, এই সময়ে চলতি মূল্যে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৪ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ছিল ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বেড়েছে দেশের জিডিপির আকার। স্থির মূল্যে জিডিপির আকার ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। যা এ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৮ লাখ ৪ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছর পর প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও তা এতটা উল্লেখযোগ্য নয়। তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। প্রতিবেদন তথ্যানুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি কিছুটা স্থবিরতা দেখিয়েছিল।গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি অনেকটাই অচল হয়ে পড়ে, তবে সরকারের পদক্ষেপের ফলে দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কিছুটা সচল হয়। ফলে এই সামান্য উন্নতি।


উচ্চ রক্তচাপ কমাবে যেসব খাবার

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার বর্তমান সময়ের অন্যতম একটি স্বাস্থ্য সমস্যা, এটি বিশ্বের ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষকে প্রভাবিত করে। সাধারণত সিস্টলিক ব্লাড প্রেসার (SBP) যদি ১৩০ mm Hg বা তার বেশি এবং ডায়াস্টলিক প্রেসার (উইচ) যদি ৮০ mm Hg বা তার বেশি হয়, তবে সেটি উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে ধরা হয়। ঔষধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও ডায়েট পরিবর্তনের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশেষত, পটাসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ কিছু খাবার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

এখানে উচ্চ রক্তচাপ কমাতে উপকারী খাবারের তালিকা দেওয়া হলো-
সিট্রাস ফল
কমলা, লেবু ও জাম্বুরার মতো সিট্রাস ফলগুলো ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে গ্রেপফুট কিছু ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে, তাই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
স্যামন ও চর্বিযুক্ত মাছ
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে ভরপুর স্যামন, ম্যাকারেল ইত্যাদি মাছ প্রদাহ হ্রাস করে এবং রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে।

শাকসবজি
স্বিস চার্ড ও পালং শাক পটাসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের ভালো উৎস। এগুলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বাদাম ও বীজ
কুমড়োর বিচি, চিয়া, আখরোট, আমন্ড ইত্যাদি বাদামে ফাইবার ও আর্জিনিন থাকে, যা রক্তনালিকে প্রসারিত করে রক্তচাপ কমায়।
ডাল ও লেগুম
মসুর, ছোলা, মটরশুঁটির মতো ডাল জাতীয় খাবার পটাসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম সরবরাহ করে, যা হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারী।

বেরি জাতীয় ফল
ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, গ্রেপস ইত্যাদিতে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তপ্রবাহ ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
অ্যামারাস্থ ও অন্যান্য পূর্ণ শস্য
অ্যামারান্থ, ওটস, ব্রাউন রাইস, কোয়িনোয়া ইত্যাদি শস্য উচ্চ ম্যাগনেশিয়ামের উৎস এবং উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে সহায়ক।
জলপাই তেল
জলপাই তেলে থাকা ওলেইক অ্যাসিড ও পলিফেনলস রক্তচাপ হ্রাস করতে পারে।
গাজর
গাজরে থাকা উদ্ভিজ্জ যৌগগুলো রক্তনালির কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে, যা রক্তচাপ কমায়।

ডিম
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সাপ্তাহে ৫টি বা তার বেশি ডিম খেলে সিস্টলিক প্রেসার কিছুটা কমে।
টমেটো ও এর প্রোডাক্টস
টমেটোতে থাকা লাইকোপিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
ব্রকোলি
ব্রকোলি ফ্ল্যাভোনয়েড অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর, যা রক্তনালিকে প্রসারিত করে রক্তচাপ কমায়।
দই
দই পটাসিয়াম ও ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

মসলা ও হার্বস
রসুন, আদা, দারুচিনি, এলাচ, ধনেপাতা ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
আলু
আলুতে প্রচুর পটাসিয়াম থাকে, যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে কার্যকর।
কিউই
কিউইতে ভিটামিন C, পটাসিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা রক্তচাপ কমানোর প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে কাজ করে।

লীন মাংস
স্কিনবিহীন মুরগির মাংস, টার্কি বা পাতলা গরুর মাংস প্রোটিনের পাশাপাশি পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং DASH ডায়েটের অংশ হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে বা প্রতিরোধ করতে খাদ্যাভ্যাসে সচেতন পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। উপরোক্ত খাবারগুলো নিয়মিত খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। তবে যে কোনো খাদ্য পরিবর্তনের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


ঘুমের মধ্যেই খু*ন ভূতের ছায়া নাকি স্লিপ প্যারাসোমনিয়া

২০০৮ সালে কানাডায় কেনেথ পার্কস নামের একজন ব্যক্তি তার শাশুড়িকে হত্যা করেন এবং শ্বশুরকে মারাত্মকভাবে আহত করেন।পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি ঘুমের মধ্যে ছিলেন। আদালতে চিকিৎসকরা প্রমাণ দেন, পার্কস “স্বয়ংক্রিয় ঘুম অবস্থায়” এবং ঘটনার কোনো স্মৃতি তার ছিল না। বিচারকও তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। একই ধরনের আরেকটি কেস ঘটে ১৯৯৭ সালে ইংল্যান্ডে, যেখানে ব্রায়ান থমাস নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যা করেন। পরে তিনি জানান, তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন তার স্ত্রী এক চোরে পরিণত হয়েছে। আদালতে প্রমাণ হয়, তিনি ছিলেন ঘুমের ভেতরে এক ধরণের ‘REM sleep behavior disorder’-এ আক্রান্ত। তাকেও দোষমুক্ত করা হয়।

২০১০ সালে ফ্লোরিডার স্কট ফ্যালার নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ছুরি দিয়ে হত্যা করেন এবং দুই সন্তানকে আহত করেন। ঘটনার সময় তিনি ঘুমাচ্ছিলেন বলে দাবি করেন। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তার আচরণ ছিল অসংলগ্ন এবং স্মৃতি বিভ্রান্ত। তদন্তে দেখা যায়, তিনি PTSD এবং ঘন ঘন স্লিপওয়াকিংয়ের সমস্যায় ভুগছিলেন। আদালতে একদল নিউরো-সাইকোলজিস্ট ব্যাখ্যা দেন, তার মস্তিষ্ক REM ঘুমের সময় সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় ছিল না। শেষ পর্যন্ত মামলাটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক বিবেচনায় মুলতবি রাখা হয়। এই কেসটি প্রমাণ করে, স্লিপ প্যারাসোমনিয়ার মধ্যে শুধু নিছক আচরণ নয়, ব্যক্তির মানসিক ইতিহাস, ট্রমা এবং ঘুমের গঠনও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।

ঘুম একটি নিরাপদ আশ্রয়, শরীর ও মস্তিষ্কের আরামের জায়গা। কিন্তু কখনও কখনও সেই ঘুমই হয়ে ওঠে ভয়ংকর। ইতিহাস জুড়ে অনেক ঘটনা রেকর্ড হয়েছে যেখানে মানুষ ঘুমের মধ্যে অপরাধ করেছে, তাও আবার স্মৃতিচিহ্নহীনভাবে। এই অদ্ভুত ও ভয়াবহ অবস্থার নাম স্লিপ প্যারাসমনিয়া (Sleep Parasomnia)। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এটি কি নিছকই নিউরোলজিক্যাল সমস্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অদৃশ্য কোনো শক্তির ছায়া?

কী এই ‘স্লিপ প্যারাসমনিয়া’?
স্লিপ প্যারাসমনিয়া একটি স্লিপ ডিসঅর্ডার, যেখানে ব্যক্তি ঘুমের মধ্যে অচেতনভাবে বিভিন্ন ধরনের আচরণ করে-চলাফেরা, কথা বলা, এমনকি সহিংস কাজ। এই ধরনের ঘুমজনিত অস্বাভাবিক আচরণ সাধারণত REM (Rapid Eye Movement) এবং Non-REM ঘুমের মধ্যে ঘটে থাকে। Harvard Sleep Center অনুযায়ী প্যারাসোমনিয়ার আওতায় পড়ে, স্লিপওয়াকিং (ঘুমের মধ্যে হাঁটা), স্লিপ টেরর (হঠাৎ চিৎকার করে জেগে ওঠা), সেক্সোমনিয়া (ঘুমের মধ্যে যৌন কার্যকলাপ)

বিজ্ঞান কী বলে?
American Journal of Psychiatry অনুযায়ী, এই ধরণের প্যারাসোমনিয়া নিউরোলজিক্যাল ও সাইকিয়াট্রিক কারণে হতে পারে।মানুষের মস্তিষ্কের Limbic Szstem ঘুমের সময়ও কখনও সক্রিয় থাকে, যার ফলে সাড়া দেওয়ার মতো আচরণ তৈরি হয়। কিন্তু Prefrontal Cortex যেহেতু নিষ্ক্রিয় থাকে, তাই কোনো সিদ্ধান্ত বা মূল্যায়নের বোধ থাকে না। ফলস্বরূপ ব্যক্তি অচেতনভাবেই সহিংস হতে পারে। Forensic Psychology Studies-এ বলা হয়েছে, এই ধরনের ঘটনাগুলোর বিচার করা খুব কঠিন, কারণ এতে ব্যাক্তির ইচ্ছা বা মতলব থাকে না। এটি এক ধরনের “অটোম্যাটিজম”-যেখানে ব্যক্তি নিজেই নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

অনেক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয়, ঘুমের সময় আত্মা শরীর ছেড়ে যায় এবং সেই সময় দুর্বলতা তৈরি হয়। যা কোনো অশরীরী শক্তি দখল করতে পারে। বাংলায় যাকে বলে “ভূতে চাপা”-তা অনেকাংশে স্লিপ পারালাইসিসের মতো হলেও প্যারাসোমনিয়ার ক্ষেত্রেও এমন ব্যাখ্যা দেয়া হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অভাব সেখানে ঘুমের মধ্যে সহিংসতা বা অদ্ভুত আচরণকে ভূতের কাজ বলে মনে করা হয়। কিছু তান্ত্রিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘুমের সময় ব্যক্তির উপর দখল নিতে পারে কোন আত্মা বা অপশক্তি। এগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও ঘটনাগুলোর রহস্যময়তা এই বিশ্বাসকে জিইয়ে রাখে।

যখন কেউ ঘুমের মধ্যে অপরাধ করে এবং তার কোনো স্মৃতি থাকে না, তখন আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠে। সে কি দায়ী? আদালত কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে? অনেক সময় মেডিকেল রিপোর্ট ও নিউরোসাইকোলজিকাল বিশ্লেষণই একমাত্র ভরসা হয়। তবে আইনশাস্ত্র এই ধরনের কেসে দ্বিধায় থাকে। ঘুমের মধ্যে খুন একটি জটিল, বিভ্রান্তিকর এবং ভীতিকর বাস্তবতা। বিজ্ঞান এর ব্যাখ্যা দেয়-মস্তিষ্কের বৈকল্য, REM ডিসঅর্ডার, অথবা প্যারাসোমনিয়া। কিন্তু প্রতিটি ঘটনা যেন এক একটি অজানা পর্দা উন্মোচন করে, যেখানে বিজ্ঞান থেমে যায় এবং কল্পনা শুরু হয়। হয়তো এইসব ঘুমের গল্প আমাদের দেখিয়ে দেয়, মানুষ এখনও তার নিজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক নয়!


গাজার ১০০০ যুদ্ধাহতকে সাময়িক আশ্রয় দিতে চায় ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বলেছেন, গাজায় যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দিতে তার দেশ প্রস্তুত। বুধবার মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্ক সফরে রওনা হওয়ার আগে তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে গাজার প্রায় ১,০০০ ফিলিস্তিনিকে আশ্রয় দেওয়া হতে পারে। ‘আমরা আহতদের, মানসিকভাবে বিপর্যস্তদের এবং অনাথদের সরিয়ে আনতে প্রস্তুত। তারা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলে এবং গাজায় ফেরার মতো নিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি হলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে,’ বলেন প্রাবোও। তিনি জানান, কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদের ইন্দোনেশিয়ায় সরিয়ে নেওয়া যায় তা নিয়ে ফিলিস্তিনি ও অন্য পক্ষগুলোর সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করার জন্য তিনি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ নয়, তবে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান থেকেই ইন্দোনেশিয়া সংঘাত নিরসনে তার ভূমিকা বাড়াতে চায়। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়া ইন্দোনেশিয়া এরই মধ্যে গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট এর আগেও বলেছিলেন, প্রয়োজনে গাজায় শান্তিরক্ষী সেনা পাঠাতে প্রস্তুত তার দেশ।


ট্যারিফ যুদ্ধে এর আগে যেভাবে হেরেছিল যুক্তরাষ্ট্র

ট্যারিফ মূলত শুল্ক, যা একটি দেশ অন্য দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপ করে। শুরুতে এই ট্যারিফ বা শুল্ক মূলত আরোপ করা হতো রাজস্ব আদায় বাড়াতে। এর বাইরে ট্যারিফ বসানো হয় স্থানীয় শিল্পকে সংরক্ষণ দেওয়ার জন্য। আর এখন ট্যারিফ বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে বাণিজ্যনীতি প্রয়োগের একটি অস্ত্র হিসেবে। একটা সময় ছিল, যখন বিশ্বব্যাপীই রাজস্ব আদায়ের প্রধান উৎস ছিল এই ট্যারিফ। যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। ১৭৯৮ থেকে ১৯১৩ সময়ে ট্যারিফ বা আমদানি শুল্ক থেকে আয় ছিল তাদের মোট ফেডারেল আয়ের ৫০ থেকে ৯০% পর্যন্ত। আর এখন সেই আয় কমে হয়েছে ২%। আসলে ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সংরক্ষণবাদ থেকে আস্তে আস্তে সরে এসেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ভূমিকা ছিল। দেশটিতে ৭০% পণ্য যায় বিনা শুল্কে। সেই যুক্তরাষ্ট্রই এখন বিশ্বজুড়ে শুরু করে দিয়েছে ট্যারিফ-যুদ্ধ।

রাজস্ব আয় বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল ইনকাম ট্যাক্স বা আয়করব্যবস্থা চালু করেছিল ১৯১৩ সালে। তখনো আয়ের মূল উৎস ছিল নানা ধরনের আমদানি শুল্ক। তবে যুক্তরাষ্ট্র বড় আকারে ট্যারিফ-যুদ্ধ শুরু করেছিল ১৯৩০ সালের মহামন্দার সময়। এর আগেই অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শুল্ক আরোপ করে রেখেছিল। ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে কংগ্রেস ফোর্ডনি-ম্যাককাম্বার অ্যাক্ট পাস করেছিল, যার মাধ্যমে ট্যারিফের হার ৪০ শতাংশে বাড়ানো হয়। ইউরোপের দেশগুলো তখনই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। এর মধ্যে অবশ্য ইউরোেপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা শুরু করে এবং কৃষিপণ্য উৎপাদনও বাড়তে থাকে। এতেই সমস্যা বৃদ্ধি পায় যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য উৎপাদকেরা তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে এবং অতিরিক্ত উৎপাদন হওয়ার কারণে কৃষিপণ্যের দামও কমে যায়। তখনই দেশটির কৃষিপণ্যকে সংরক্ষণ করার জোরালো দাবি উঠতে থাকে।

১৯২৯ সালে শেয়ারবাজারের ধস থেকে দেখা দেয় মহামন্দা। সংরক্ষণবাদীরা তখন শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ট্যারিফ বাড়িয়ে মার্কিন পণ্যকে সংরক্ষণ দিতে ১৯৩০ সালে দ্য স্মট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট ৪৪-৪২ ভোটে পাস হয়। এর মাধ্যমে সব দেশের জন্য ট্যারিফ আরও ২০% বাড়ানো হয়। অন্তত এক হাজার অর্থনীতিবিদ সে সময় এই আইনে ভেটো দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করেছিলেন। সেবার অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ-যুদ্ধের পরিণতি ভালো হয়নি; বরং তিক্ত বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। দ্য সুট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট পাস হওয়ার দুই বছরের মধ্যে ইউরোপের বড় বড় অর্থনীতির দেশ সমানসংখ্যক পাল্টা-শুল্ক আরোপ করে।পাল্টা-ট্যারিফ আরোপের ফলে ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে বিশ্ববাণিজ্য দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়। বহুসংখ্যক ব্যাংকের পতন ঘটে।বলা হয়, বিশ্ববাণিজ্যে একা হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র।

নতুন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট দায়িত্ব নিয়েই ট্যারিফ কমানোসহ এ থেকে বের হতে আলোচনা শুরু করেন। অবশেষে ১৯৩৪ সালে রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টস অ্যাক্ট পাস করা হয়। এর মাধ্যমে শুল্কহার কমান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এবং বাণিজ্য উদারীকরণকে এগিয়ে নেন। অর্থাৎ প্রথম ট্যারিফ-যুদ্ধে পরাজয় হয় যুক্তরাষ্ট্রের। এটা ঠিক যে দ্য স্পুট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্টের কারণে ১৯৩০ সালের মহামন্দা হয়নি। শেয়ারবাজার ধস থেকে মহামন্দার শুরু। তবে এই আইন মহামন্দাকে আরও গভীর করছিল। সেই যুক্তরাষ্ট্র আবারও ট্যারিফ-যুদ্ধ শুরু করেছে। এর পরিণতিও কি ১৯৩০ সালের মতোই হবে?



ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল , পোশাক রফতানি কারকরা সমস্যা দেখছেন না

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ভারতের মধ্য দিয়ে বিমানবন্দর ও বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এতে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে কোনো প্রভাব পড়বে না।’ এতে জরুরি প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যসহ পশ্চিমের ক্রেতাদের কাছে দ্রুত রপ্তানি পণ্য পাঠাতে ভারতের বিমান ও স্থলবন্দরের বিকল্প ব্যবহারের পথ বন্ধ হল। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ কয়েকটি ভারতীয় বিমানবন্দর ব্যবহার করা হতো। ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশ এই সুবিধা পাচ্ছে। ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক সমিতি (এইপিসি) দীর্ঘদিন ধরেই এই ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল।

এইপিসির চেয়ারম্যান সুধীর সেখড়ির মতে, টেক্সটাইল রপ্তানিতে বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করায় এখন ভারতীয় বিমানবন্দরগুলোতে ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের জন্য বেশি জায়গা তৈরি হবে। রপ্তানিকারকরা বলেছেন, এতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে তেমন প্রভাব না পড়লেও ক্রেতা দেশের কাছে পণ্য সরবরাহের বিকল্প এক পথ কমে যাবে। রপ্তানি সক্ষমতা কিছুটা হলেও সংকুচিত হবে। দুটি কারণে মূলত ভারতের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা তৈরি পোশাক বা অন্য পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে থাকেন। এর মধ্যে প্রথমটি হচেছ, কলকাতা থেকে পাঠানোর খরচ কম এবং সেখান থেকে পশ্চিমা দেশের প্রায় সবগুলো রুটে সরাসরি পণ্য পরিবহন সম্ভব।

দ্বিতীয়টি হচেছ, হরতাল, বন্যা বা দুর্যোগের মত সময়ে দ্রুত ও সময়মত ক্রেতা দেশের কাছে পণ্য পৌঁছাতে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা ভারতের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরকে ব্যবহার করেন। ভারত এ সুবিধা বাতিল করলেও পোশাক খাতের খুব একটা সমস্যা হবে না মনে করছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। তারা বিকল্প হিসেবে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালদ্বীপ, পাকিস্তান বা দুবাইয়ের বিমানবন্দর ব্যবহারের কথা বলেন। তবে এতে খরচ খুব একটা না বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের পথগুলো সংকুচিত হবে। ভারত থেকে পাঠালে যে সময় বাঁচত, এখন তা হবে না। সবশেষ ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় ঢাকার বিমানবন্দরে কার্গো চাপ বেড়ে গেলে কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা অধিক পরিমাণের পণ্য ক্রেতার কাছে পাঠিয়েছিলেন।

পণ্য তৈরিতে কোনো কারণে দেরি হলে ক্রেতারা উড়োজাহাজে পাঠানোর অনুরোধ করেন। তখন ক্রেতার স্বার্থে উদ্যোক্তাদের সেই অনুরোধ রাখতে হয়। এ খাতের আরেক উদ্যোক্তা বলেন, ঢাকার চেয়ে কম খরচে কার্গো ভাড়া নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় ভারতে। কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে প্রতিকেজি পণ্য পাঠানোর খরচ দুই থেকে আড়াই ডলার। সেখানে বাংলাদেশে তা ৫-৬ ডলার।


সাইকেডেলিক সংস্কৃতির গোপন পক্ষপাত

সাইকেডেলিক শব্দটা শুনলেই আমাদের মনে আসে রঙিন আলো, চেতনার বিকৃতি আর বাস্তবতার সীমানা ভেঙে ফেলার এক অভিজ্ঞতা।কিন্তু এই রহস্যময় জগতের জানালা যখন খুলে যায়, দেখা যায়-তার পাশ দাঁড়িয়ে আছে মূলত এক শ্রেণির মানুষই: পুরুষ, শ্বেতাঙ্গ এবং কলেজশিক্ষিত।

এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক সাইকেডেলিক ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই ঠিক এই পরিচয়ের মধ্যেই পড়েন। এমনটি নতুন কিছু নয়। ১৯৬০-এর দশকের সাইকেডেলিক বিপ্লব থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত-অ্যালডাস হাক্সলি, টিমোথি লিয়ারি, টেরেন্স ম্যাককেনা কিংবা হ্যামিল্টন মরিস-সবাই ছিলেন পুরুষ, সাদা, এবং শিক্ষিত। প্রশ্নটা উঠেই যায়, এই অভিজ্ঞতা যদি আত্মার মুক্তি দেয়, চেতনার অন্তর্গত সত্য উন্মোচন করে, তবে তা এত সীমিত গোষ্ঠীর ভেতরেই কেন আটকে আছে?

এই একচেটিয়া অবস্থান শুধু সামাজিক বৈষম্যের ফল নয়, বরং সাইকেডেলিক গবেষণার ইতিহাসেই রয়েছে লিঙ্গ ও জাতিগত পক্ষপাতের ছাপ। ষাটের দশকের গবেষকরা যেমন সমকামিতাকে “চিকিৎসাযোগ্য অসুস্থতা” হিসেবে LSD দিয়ে ‘সারাতে’ চেয়েছিলেন, তেমনই প্রাথমিক গবেষণাগুলো পুরুষদের “বীরত্বপূর্ণ আত্ম-পরীক্ষা” হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যেখানে নারীর জন্য ছিল লজ্জা, ভয় এবং সামাজিক জটিলতা।

১৮শ শতকের শেষ দিকে নাইট্রাস অক্সাইড নিয়ে ব্রিটিশ গবেষকরা যখন প্রথম পরীক্ষায় নামেন, তখন এক নারী অংশগ্রহণকারী গ্যাস নেওয়ার পর অস্থির হয়ে রাস্তায় দৌড়ে যান, আর তারপর অন্য নারীরা ভয় পেয়ে সরে দাঁড়ান। সেই একই গ্যাস নিয়ে গবেষক হাম্পি ডেভি
যখন চিৎকার করে বলেন, “চিন্তা ছাড়া কিছুই নেই!”, তখন সেটি তাকে এনে দেয় খ্যাতি, পুরস্কার, আর বিজ্ঞান সমাজে জায়গা। এই দ্বৈত মানদণ্ড শুধু ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ভাষাতেও ছড়িয়ে আছে। সাইকেডেলিক ট্রিপ রিপোের্ট, অর্থাৎ ড্রাগ নেওয়ার পরকার অভিজ্ঞতার বিবরণ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে বাঁধা। সময়, রঙ, দৃশ্য, শব্দ-সবকিছুকে সংক্ষিপ্ত বৈজ্ঞানিক ভাষায় প্রকাশ করা হয়। এটি মূলত এক পুরুষতান্ত্রিক, মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে অভিজ্ঞতা মানেই ‘ডেটা’।

এই কাঠামোতে নারী কণ্ঠস্বর প্রায় অনুপস্থিত। ১৯১৪ সালে ম্যাবেল ডজ লুহান নামের এক নিউ ইয়র্কের সমাজসেবী পিয়োটে গ্রহণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন তার স্মৃতিকথায়। সেখানে তিনি শুধু দৃশ্য-শব্দ নয় বরং সামাজিক সম্পর্ক, শক্তির খেলা, নিয়ন্ত্রণ আর বিদ্রোহ এই সমস্ত কিছু তুলে ধরেন। তার ভাষা ছিল প্রাণবন্ত, জটিল, আর সামাজিকভাবে জড়িত। অথচ এই ধরনের বয়ানকে ‘বৈজ্ঞানিক’ ধরা হয়নি। পরবর্তী শতাব্দীতেও নারী গবেষকদের সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা গবেষণার মূলধারায় ঠাঁই পায়নি। LSD-র ব্যবহার নিয়ে আনা’ইস নিন বা লরা হাক্সলির লেখাগুলো চুপিচুপি থেকে গেছে, যখন লিয়ারির ‘চেতনার বিপ্লব’ হয়ে উঠেছে জনমনে চিরস্থায়ী।

তবে সময় বদলাচ্ছে। আজকের সাইকেডেলিক সংস্কৃতিতে নতুন কণ্ঠস্বর উঠে আসছে-নারী, আদিবাসী, LGBTQ+ সম্প্রদায়ের মানুষ, এবং অশ্বেতাঙ্গ ব্যবহারকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করছেন। লন্ডনের ‘Breaking Convention’ বা সান ফ্রান্সিসকোর ‘Queering Psychedelics’ এর মতো সম্মেলনে এখন এসব কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।চক্রুনা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা বিয়া লাবাতে যেমন বলছেন, ‘আমরা চাই জ্ঞানের উপনিবেশভিত্তিক কাঠামো ভেঙে দিতে, যেখানে সাদা, সোজা, চিকিৎসক-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও আধিপত্য করছে।’

আসলে চেতনার এই জানালা খোলা থাকে তাদের জন্যই, যাদের হাতে থাকে সময়, নিরাপদ সামাজিক অবস্থান, আইনি সুরক্ষা, আর অর্থনৈতিক স্থিতি-যা এখনও বিশ্বব্যাপী অনিয়মিতভাবে বিতরণ হয়েছে। সেই কারণে আজও সাইকেডেলিক সংস্কৃতিতে সাদা, কলেজ-শিক্ষিত পুরুষের আধিপত্য স্পষ্ট। যদি একদিন এই সুযোগগুলো সমানভাবে ছড়িয়ে যায়, তাহলে হয়তো দেখা যাবে-চেতনার অজানা রাজ্যে প্রবেশ করছে সেই সমস্ত মানুষ, যারা বরাবর সমাজের প্রান্তে থেকেছে। যারা প্রতিদিনই বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়।সাইকেডেলিক যদি সত্যিই হয় ‘আত্মার দর্পণ’, তবে তার আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত সব চেহারা-সব পরিচয়, সব অভিজ্ঞতা।