একদিন হঠাৎ আকাশের গায়ে ভেসে উঠল এক শহরের অবয়ব-টাওয়ার, সেতু, ভবন আর অজস্র আলো। ঘটনাটি ২০১৫ সালের চীনের জিয়াংশি প্রদেশে। হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে দেখে সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য, যেন অন্য এক মাত্রা থেকে উঠে এসেছে এক রহস্যময় শহর।সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রে হইচই পড়ে যায়, এটি কি অন্য কোনো মহাবিশ্ব? না কি এলিয়েনদের প্রযুক্তি?
এই রোমাঞ্চকর ঘটনার পেছনে রয়েছে এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা “ফাতা মর্গানা” নামে পরিচিত এক ধরনের অপটিক্যাল বিভ্রম। কিন্তু এর গভীরে ডুবে গেলে আমরা খুঁজে পাই কেবল বিজ্ঞানের প্রান্তেই থেমে থাকা নয়, বরং হাজার বছরের পুরনো লোককাহিনি, কল্পনাপ্রবণতা এবং মানবিক বিস্ময়ের এক জগৎ।
ফাতা মর্গানা হল একটি জটিল প্রকারের সুপিরিয়র অপটিক্যাল বিভ্রম, যা নির্দিষ্ট আবহাওয়া পরিস্থিতিতে দেখা যায়। যখন ঠান্ডা ঘন বায়ুর স্তরের উপর গরম বায়ুর স্তর তৈরি হয়, তখন আলো তার গতিপথ বেঁকিয়ে দেয়। এই বেঁকানো আলোর প্রতিফলন আমাদের চোখে এমনভাবে পৌঁছায় যেন দূরবর্তী কোনো বস্তু আকাশে ভেসে আছে। শহর, জাহাজ, পাহাড় এমনকি মানুষ পর্যন্ত এই বিভ্রমে ভিন্ন রূপে দেখা দিতে পারে।
চীনের ঘটনার সময় আবহাওয়া ছিল খুবই আদর্শ এই ধরনের বিভ্রমের জন্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, আশেপাশের কোনো আধুনিক শহরের প্রতিচ্ছবি ওই অঞ্চলের আকাশে ভেসে উঠেছিল, যেটিকে সাধারণ চোখে বাস্তব শহর বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের চোখে এটি ছিল এক অলৌকিক দর্শন, যা তাদের কল্পনার জগতে তৈরি করেছিল বহু প্রশ্ন। এই ঘটনাটি নতুন নয়। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ এমন দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে। রাশিয়ার কিংবদন্তি শহর কিতেজ তার একটি দৃষ্টান্ত।কথিত আছে, এই শহরটি তেরো শতকের দিকে মঙ্গোল আক্রমণের সময় লেক স্বেতলোইয়ারের নিচে ডুবে যায়। তবে এটি একেবারে অদৃশ্য হয়নি-পবিত্র হৃদয়ের মানুষরা এখনও সেই শহরের ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পায়, কখনো কুয়াশায় তার গম্বুজ ঝলসে ওঠে।
এই শহরটিকে ঘিরে রুশ সমাজে গড়ে উঠেছে এক অলৌকিক বিশ্বাস ও জাতীয় চেতনার প্রতীক। কিতেজের মতোই চীনের আকাশে ভেসে ওঠা শহর মানুষের কল্পনায় তৈরি করেছে অন্য এক বাস্তবতা-যা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অতীত বলে মনে হয়। ২০১৫ সালের পর আরও কিছু অঞ্চলে ভাসমান শহরের মতো দৃশ্য দেখা গেছে। কেউ বলছে এটি এক ধরনের আন্তঃমাত্রিক জানালা, কেউ বা বলছে এটি মানুষের চেতনার সাথে যুক্ত এক ধরণের ‘মাস হ্যালুসিনেশন’। কল্পবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টি আরও রোমাঞ্চকর হয়। যদি সত্যিই একাধিক মাত্রা থাকে, তবে সেই শহরগুলো কি আমাদের সাথে কোনওভাবে যোগাযোগ করছে?
তবে বাস্তববাদীরা বলছেন, এসবই আবহাওয়াজনিত কারণে তৈরি হওয়া অপটিক্যাল বিভ্রম। কিন্তু প্রশ্ন থাকে-কেন এই বিভ্রমগুলো এত নিখুঁত হয়? কেনইবা বহু মানুষের মধ্যে একইসাথে একই দৃশ্যের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়? বিজ্ঞান এখনও এসব প্রশ্নের সব উত্তর দেয়নি। আমরা যখন ডিজিটাল বাস্তবতা, এআই, ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মধ্যে বাস করছি, তখন প্রকৃতির এই রহস্যময় খেলাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিস্ময়ের স্থান এখনও জীবিত। ফাতা মর্গানার মতো বিভ্রম আমাদের চোখকে ধোঁকা দিলেও, তা আমাদের কল্পনাকে জাগিয়ে তোলে। এই কল্পনা থেকেই জন্ম নেয় গল্প, বিশ্বাস, এবং এমনকি সভ্যতার গতিপথ।
ভাসমান শহরের গল্প শুধুই এক দিনের বিভ্রম নয়; এটি এক হাজার বছরের পুরনো মানুষের বিস্ময়, কল্পনা এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মিলনস্থল। বিজ্ঞান ব্যাখ্যা দিতে পারেডকিন্তু ব্যাখ্যার পরেও থেকে যায় এক ধরনের অনুভূতি, যা যুক্তির চেয়েও গভীর।


