Home Blog Page 140

ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল ভারতের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের নেপথ্যে যা

একবছর আগে থেকেই ভারতের রফতানিকারকরা দিল্লি হয়ে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাদের দাবি ছিল, দিল্লি বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক কার্গো টার্মিনালে বাংলাদেশি পণ্যবাহী ট্রাকের ভিড় এত বেড়ে গেছে যে, বিভিন্ন এয়ারলাইনের কার্গোতে তাদের স্লট পাওয়াই মুশকিল হয়ে গেছে এবং হ্যান্ডলিং এজেন্টরাও সুযোগ বুঝে তাদের বাড়তি মাশুল চার্জ করছেন! নিজ দেশের ব্যবসায়ীদের এমন দাবির পরও দেশটির সরকার তখন কোনও উদ্যোগ নেয়নি। একবছর পর দুই দেশের সরকার প্রধানের বৈঠকের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ভারত এমন সিদ্ধান্ত নিলো।

২০২০ সালের জুন মাসে কোভিড মহামারির লকডাউনের সময় ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রতিবেশী বাংলাদেশের রফতানিকারকরা চাইলে ভারতের বন্দরগুলো ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে তাদের পণ্য পাঠাতে পারবে – অর্থাৎ এই বন্দরগুলোকে ‘ট্রান্সশিপমেন্ট হাব’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে। অবশ্য শুরুতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এই সুবিধা খুব একটা ব্যবহার করেননি। ২০২৩ সালের শেষ তিন কোয়ার্টারেও (এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর) দিল্লি বিমানবন্দর দিয়ে যত পণ্য রফতানি হয়েছিল তার মাত্র ২% ছিল বাংলাদেশের।কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক ২০২৪ থেকে এই প্রবণতা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশি রফতানিকারকরা অনুধাবন করেন, দিল্লি বিমানবন্দর দিয়ে এয়ার কার্গো পাঠানোর অপশন অনেক বেশি। খরচও ঢাকা বা চট্টগ্রামের তুলনায় অনেক কম। তা ছাড়া তখন লোহিত সাগরে অস্থিরতা চলায় সমুদ্রপথে পণ্য পাঠাতে কেপ অব গুড হোপ হয়ে অনেক বেশি সময় লাগছিল, কাজেই আকাশপথে রফতানির চাহিদাও বাড়ছিল। গত বছরের শুরু থেকেই রোজ ৩০ থেকে ৩৫টি বাংলাদেশি পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোল সীমান্ত পেরিয়ে দিল্লি বিমানবন্দরে আসতে শুরু করেছে। ওই বছরের প্রথম কোয়ার্টারে দিল্লি দিয়ে যে প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আকাশপথে রফতানি করা হয়, তার প্রায় ১০%-ই ছিল বাংলাদেশের।

এই ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ব্যাখ্যা দিলেন বাংলাদেশকে এই সুবিধা দেওয়ার ফলে ভারতের বন্দরগুলোতে যে ‘কনজেসশন’ ও ‘ব্যাকলগ’ তৈরি হচ্ছিল, সেটা দূর করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখপাত্র অবশ্য এটাও জানালেন, নেপাল ও ভুটানের মতো দেশে ভারতের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রফতানি যেমন চলছিল সেটা তেমনই চলতে পারবে। এই একই পরিস্থিতি তো গত বছরের এই সময়েও ছিল … তাহলে তখন ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা বহাল রাখলেও এখন রাতারাতি তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হল কেন? এর জবাবে দিল্লির পর্যবেক্ষকরা দুটো কারণ দেখাচ্ছেন এক. এখন বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে তাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আর তত বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। আর দুই. অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় করা একটি মন্তব্য।

প্রথম কারণটি অবশ্য আজ নয়, গত আট মাসের ওপর ধরেই আছে। কিন্তু বেজিংয়ে চীনের বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক সভায় অধ্যাপক ইউনূস ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন সেটাই যে আসল ট্রিগারের কাজ করেছে তাতে তাদের কোনও সন্দেহ নেই! ঢাকায় ভারতের হাই-কমিশনার ছিলেন, এমন একজন সাবেক শীর্ষ কূটনীতিবিদ বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদককে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন এভাবে, ‘ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধাটা আসলে কী? এটা হল ভারতের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত সুবিধাটা একটা বন্ধু দেশকে ব্যবহার করতে দেওয়া! এখন সেই প্রতিবেশী যদি সেভেন সিস্টার্সের কথা তুলে সেই ভূগোলকেই ভারতের দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরতে চায়, তাহলে এই ধরনের পাল্টা পদক্ষেপই প্রত্যাশিত নয় কি?’





ক্রুসেড পরবর্তী জেরুজালেম – জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক অপ্রকাশিত অধ্যায়

১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই প্রথম ক্রুসেডের ইউরোপীয় বাহিনী তিন বছর দীর্ঘ অভিযানের পর জেরুজালেম দখল করে। এই বিজয়ের মাধ্যমে শুরু হয় প্রায় দুইশো বছরব্যাপী এক সময়কাল, যেখানে পবিত্র ভূমি শাসিত হয় লাতিন ক্যাথলিক অভিজাতদের দ্বারা। এই শাসনযুগে যে সমাজ গড়ে ওঠে, তা একাডেমিক পরিভাষায় ‘ফ্র্যাঙ্কিশ সমাজ’ নামে পরিচিত। অনেক সময় ধারণা করা হয় এই সমাজটি ছিল জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চার প্রতি উদাসীন। বিশিষ্ট ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ স্টিভেন রনসিম্যান তাঁর ‘A History of the Crusades’ (১৯৫১-৫৪) গ্রন্থে বলেন, ক্রুসেডার রাষ্ট্রের সমাজ ‘প্রায় পুরোপুরি সৈনিক ও বণিকদের নিয়ে গঠিত ছিল এবং উচ্চ মানের বৌদ্ধিক পরিবেশ তৈরিতে অযোগ্য ছিল।’ জার্মান ইতিহাসবিদ হান্স ই. মায়ারও বলেন, সামন্ত আইন ছাড়া মধ্যযুগীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে ফ্র্যাঙ্করা প্রায় কিছুই অবদান রাখেনি।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, জেরুজালেম রাজ্য নিজস্ব সাংস্কৃতিক অবদান রেখেছিল এবং এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জও জানানো যেতে পারে। ১২৮১ সালে জন অব অ্যান্টিওক নামের একজন পণ্ডিত Cicero-র De inventione ও Rhetorica ad Herennium নামক দুটি লাতিন গ্রন্থ ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করে উপহার দেন উইলিয়াম অব সান্তো স্তেফানো নামের এক হস্পিটালার নাইটকে। এই অনুবাদ শুধু এক অসামান্য ভাষান্তর কাজই নয়, ফরাসি ভাষার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারণ সেই সময়ে লাতিন থেকে ফরাসিতে অনুবাদ ছিল বিরল এবং একটি পূর্ণাঙ্গ রেটোরিক গ্রন্থ কখনোই আগে ফরাসিতে অনুবাদ হয়নি।

এই অনুবাদের সঙ্গে জন অব অ্যান্টিওক একটি প্রাথমিক যুক্তিবিদ্যার গ্রন্থও সংযোজন করেন, যা ছিল ফরাসি ভাষায় যুক্তিবিদ্যার এক প্রথম দৃষ্টান্ত। এই কাজটির তাৎপর্য দ্বিমুখী-একদিকে এটি ইউরোপীয় ভাষায় জ্ঞানের বিস্তারের দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে এটি ক্রুসেডার জগতের অভ্যন্তরে চিন্তাচর্চার এক বিশেষ নিদর্শন। বিশেষত লাতিন ভাষায় পর্যাপ্ত শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে স্থানীয়ভাবে অনুবাদ ও রচনার যে চেষ্টা দেখা যায়, তা এক ধরনের সাংস্কৃতিক অভিযোজনের পরিচয় দেয়। এই অভিযোজনই পরবর্তীতে ফরাসি ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে ভূমিকা রাখে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হল ১২৭১ সালে উইলিয়াম অব ট্রিপোলির লেখা Notitia de Machometo বা ‘মুহাম্মদ সম্পর্কে তথ্য’। এটি ছিল ইসলাম সম্পর্কিত এক বিস্তারিত গবেষণাধর্মী কাজ, যেখানে মুসলিম ইতিহাস, প্রথা ও ধর্মতত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়।

এই বইটির রচনার প্রেক্ষাপট থেকে দেখা যায়, তৎকালীন রাজ্যে ইসলামের প্রতি নির্দিষ্ট মহলে এক ধরণের আগ্রহ জন্মেছিল এবং কিছুসংখ্যক লাতিন ব্যক্তিত্ব আরবি ভাষায় এমন দক্ষ ছিলেন যে তারা কোরআনের যথাযথ অনুবাদ করতে পারতেন। উইলিয়াম তাঁর কাজের জন্য এমন কিছু উৎস ব্যবহার করেছেন, যেগুলো আজ আর পাওয়া যায় না। এমনকি কয়েকটি তো ইতিহাস থেকেই হারিয়ে গেছে।সুতরাং এই প্রেক্ষাপটে কিছু অল্প সংখ্যক টেক্সটের অস্তিত্ব দেখে ভুলভাবে ধরে নেওয়া যাবে না যে সেখানে জ্ঞানচর্চা ছিল ক্ষীণ।বরং বিদ্যমান গ্রন্থগুলোতে লুকিয়ে থাকা চিহ্নগুলোর দিকে নজর দিলে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী প্রজন্মের সংগৃহীত প্রাচ্য জ্ঞান সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সেখানে সক্রিয় ছিল।

তবে এটি সত্য যে এই অঞ্চলে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে লাতিনদের প্রত্যক্ষ সংযোগ খুব একটা হয়নি। প্রথম ক্রুসেডের তিক্ত অভিজ্ঞতা সম্ভবত মুসলিমদের মধ্যে লাতিনদের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি করেছিল। ফলে, পারস্পরিক বিনিময় সীমিত ছিল। এছাড়াও, মুসলিম অভিজাত শ্রেণির দেশত্যাগ, ও ইসলামিক বিদ্যাচর্চা মূলত ধর্মীয় পাঠসীমায় সীমাবদ্ধ থাকায় লাতিনরা তাদের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু শিখতে পারেনি। এর ফলে ক্রুসেডাররা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতেই এক ধরনের স্বতন্ত্র বৌদ্ধিক পরিবেশ গড়ে তোলে, যার ভিত্তি ছিল স্থানীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং পশ্চিম থেকে আগত মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে বিনিময়।

জন অব অ্যান্টিওক ও উইলিয়াম অব ট্রিপোলির মতো ব্যক্তিত্বেরা সম্ভবত লাতিন পূর্বাঞ্চলেরই সন্তান এবং সেখানেই শিক্ষালাভ করেছিলেন। তাঁদের কাজ ইউরোপের সমসাময়িক চিন্তাধারার তুলনায়ও অভিনব ও প্রগতিশীল ছিল। তাঁদের পেছনে ছিল এক স্বতন্ত্র পরিবেশ, যেখানে লাতিন শিক্ষার সীমাবদ্ধতা থেকেই বিকশিত হয় ভাষাগত ও দার্শনিক পরীক্ষাধর্মী চর্চা। এই বৌদ্ধিক পরিবেশ যদিও ইউরোপের মূল কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, তবু তা এক প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে নতুন চিন্তা ও রীতির বিকাশে অনন্য ভূমিকা রাখে। এই প্রেক্ষাপটে জেরুজালেম রাজ্যকে একটি সাংস্কৃতিক শূন্যভূমি বলা ভুল। যদিও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তবু এই রাজ্য এক অনন্য সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবেশ গড়ে তুলেছিল, যা মধ্যযুগীয় ইতিহাসে ‘প্রান্তিক অঞ্চল’ হিসেবে আলোচনার দাবি রাখে। এই ধরনের অঞ্চলগুলো প্রায়ই কেন্দ্রের তুলনায় অধিক পরীক্ষামূলক ও বহুমুখী চিন্তার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সবশেষে এই আলোচনার বৃহত্তর তাৎপর্য হলো-জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ‘প্রান্তিক অঞ্চল’সমূহও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় কেন্দ্রীয় বৌদ্ধিক শ্রেণি নতুন ধারার প্রতিবন্ধক হয়, যেখানে প্রান্তিক অঞ্চল তুলনামূলকভাবে উদার ও পরীক্ষামূলক চর্চার সুযোগ তৈরি করে। অ্যাকরের মতো শহর শুধু একটি সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, বরং মধ্যযুগীয় ইউরোপ ও ইসলামী দুনিয়ার মধ্যে জ্ঞানচর্চার এক সংযোগবিন্দু হয়ে উঠেছিল। সুতরাং ইতিহাসে এই ধরনের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোও গভীর মনোযোগের দাবিদার। বিশেষ করে যখন আমরা বুঝতে চাই কীভাবে জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে, রূপান্তরিত হয় এবং কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত স্থানেও নতুন প্রাণ পায়।








চীনা পণ্যে উচ্চ শুল্ক – বাংলাদেশের সামনে সুযোগ

বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকেরা বলছেন, উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অধিকাংশ পণ্যে চীনের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা থাকবে না। ফলে চীন থেকে মার্কিন ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ সরাবে। সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগও স্থানান্তরিত হবে।চীনের ব্যবসা নিতে হলে বাংলাদেশের দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ লাগবে। ব্যবসা সহজীকরণেও সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।পাল্টা শুল্ক স্থগিত হওয়ায় আগামী তিন মাস যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক থাকছে। তাতে পোশাক রফতানিতে গড় মোট শুল্ক হবে ২৫ শতাংশ। তার বিপরীতে চীনের পণ্যে নতুন শুল্ক বসেছে ১৪৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে চীন। তারপর রয়েছে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া।রপ্তানিকারকেরা বলছেন, উচ্চ শুল্ক আরোপের পর চীনের তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ স্থগিত করতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান। চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপকে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ মনে করেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি ও টিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ হিল রাকিব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চীনের ব্যবসা নিতে আমাদের প্রতিযোগী দেশও চেষ্টা করবে। তবে আমাদের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, যা অনেকের নেই। ঠিকমতো কাজ করতে পারলে আগামী ১০ বছরের জন্য সম্ভাবনা খুলে যাবে।’

আব্দুল্লাহ হিল রাকিব আরও বলেন, ‘চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে নজর দিচ্ছে। তারা অনেক কম দাম প্রস্তাব করছে। কারণ, দেশটির সরকার প্রচুর ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে আমাদের যেসব প্রতিষ্ঠান শুধু ইইউ বাজারে পণ্য রপ্তানি করে তাদের প্রতিযোগিতা বেড়ে যেতে পারে।’ বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা থাকবে। তাতে স্বল্প মেয়াদে পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। তবে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের জন্য সোনালি সময় আসবে। কারণ, চীন থেকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ দুটোই সরবে। চীন আগামী দিনে যতই দর-কষাকষি করুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অতিরিক্ত শুল্ক শূন্য হবে না।’

জানতে চাইলে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহির প্রথম আলোকে বলেন, ‘চীন থেকে রপ্তানি হওয়া উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্রয়াদেশ সরবে। আমাদের সেসব পণ্য উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করতে হবে। চীন থেকে বিনিয়োগ সরবে। তার একটি অংশের গন্তব্য হবে বাংলাদেশ। তবে বিনিয়োগ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষায়িত পোশাক, কৃত্রিম তন্ত্র, ইলেকট্রনিকস, জুতা, খেলনা পণ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। তবে তার আগে পাল্টা শুল্ক থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’




মধ্যপ্রাচ্যে কোন্ কোন্ দেশে রয়েছে মার্কিন ঘাঁটি?

ইরানে হামলা চালানোর ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে। এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে কাতারে। এটির নাম আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঘাঁটিতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা রয়েছেন। অঞ্চলটির আরও যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো হলো বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। সব মিলিয়ে এসব ঘাঁটিতে সাধারণ সময়ে প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন সেনা থাকেন। কিন্তু বড় কোনো অভিযানের সময়ে তা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে হামলা শুরুর পর ২০১১ সাল নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল এক লাখের বেশি। আর ২০০৩ সালে ইরাক হামলার পর ২০০৭ সালের মধ্যে এসব ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি।

উল্লিখিত দেশগুলোর বাইরে সিরিয়ার ছোট ছোট দু-একটি ঘাঁটিতে প্রায় দুই হাজার মার্কিন সেনা রয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশই উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় অবস্থান করছেন। ইরাকে রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা। যাঁদের একটি বড় অংশ থাকেন রাজধানী বাগদাদের তৃতীয় ইউএস ইউনিয়ন বা ফরোয়ার্ড অপারেটিং বেজে (এফওবি)। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বিপুল ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি উড়োজাহাজবাহী যুদ্ধবিমান রয়েছে। প্রতিটিতে রয়েছে কয়েক হাজার সেনা ও বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান। সুনির্দিষ্ট কোনো কারণে নয়; বরং ভিন্ন একাধিক কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেনা মোতায়েন রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরাকের মতো কিছু দেশে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা।কিন্তু গত কয়েক বছরে সেখানে অবস্থানকারী মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ইরানের সমর্থনপুষ্ট সেনারা হামলা চালিয়েছেন। ফলে তাঁদের ওপরও পাল্টা হামলা চালিয়েছেন মার্কিন সেনারা। অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র জর্ডানে কয়েক শ মার্কিন প্রশিক্ষক অবস্থান করছেন। তাঁরা বছরজুড়ে ব্যাপক মহড়ার আয়োজন করে থাকেন। কাতার ও ইউএইতে মূলত দেশ দুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মার্কিন সেনা রাখা হয়েছে। তাঁরা দেশ দুটির সেনাদের প্রশিক্ষণ দেন। দেশ দুটি মার্কিন সেনা রাখার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, অঞ্চলটি সামরিক কোনো অভিযানে প্রয়োজন হলে তাঁদের সহায়তা নেওয়া।

ট্রাম্প গত মাসে ইয়েমেনের হুতিদের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব বোমা হামলায় ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছে। তবে কোন কোন দেশ থেকে এসব উড়োজাহাজ উড্ডয়ন করেছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগন সম্প্রতি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত মার্চে ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে অতিরিক্ত ছয়টি বি-২ বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে পেন্টাগন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দিলে এখান থেকে ইরানে দ্রুত হামলা চালাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।


প্রধান উপদেষ্টার প্রতি বিএনপি – ‘ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিন’

আগামী ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার যে তাগিদ দিয়েছেন, তার সঙ্গে একমত নয় বিএনপি। তারা ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন চায়। বিএনপি এর বাইরে অন্য কোনো সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে বলে জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ। সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার তাগিদের বিষয়ে আমরা একমত নই। আমরা এ বছরের ডিসেম্বরের আগে নির্বাচন দাবি করি। আশা করি, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেবেন।’

সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা আমাদের কাছে পূর্বে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে তিনি সব কার্যক্রম চালাচ্ছেন। আমরা সেটা জাতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর অনুরোধ করেছিলাম, যাতে জাতি আশ্বস্ত হয়, গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি যাতে কোনো ষড়যন্ত্রের সুযোগ না পায়। কিন্তু তিনি অন্য একটি ফোরামে গিয়ে নির্বাচন ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে করার কথা বলেন। আমরা এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। উনি এখনো সে কথা বললে আমরা তাঁর সঙ্গে একমত নই।’ বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টা যদি ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে থাকেন, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাঁরা কোনো কর্মসূচি দেবেন কি না। সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আগামী ১৬ এপ্রিল আমরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বসব। আমরা জানতে চাইব, আসলে উনি কী চাইছেন।’


দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নববর্ষ উৎসবের ঐক্য জ্যোতির্বিদ্যা, রাজনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

ধরুন, আপনি হাজার বছর আগেকার ভারতবর্ষে গঙ্গার পাড়ের কৃষক। মাঠের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন, সূর্য প্রতিদিন একটু করে সরে যাচ্ছে পশ্চিমে, শস্যের মাথা নুয়ে পড়েছে, বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ। আপনি জানেন এই সূর্যই বলে দেবে কখন বীজ বোনা যাবে, কখন খাজনা দিতে হবে, আর কখন উৎসব-পার্বণ ঘনিয়ে আসবে।তবে আপনি একা নন। মিশর, ব্যাবিলন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড-সবখানেই একেকজন কৃষক ঠিক এই সূর্যের চলনে সময়ের ছন্দ বুঝে নিচ্ছে। তারা জানে, নতুন বছর শুরু হয়েছে।

নববর্ষ কেবল একটি দিন নয়, একটি প্রতীক, একটি সময়চক্রের পুনর্জন্ম। প্রতিটি সমাজ, প্রতিটি ক্যালেন্ডার নিজের মতো করে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বের নানা সংস্কৃতিতে নববর্ষ উদযাপন হয় বছরের একেবারে নির্দিষ্ট একটি সময়ে, ১৩ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে। কেন? এই প্রশ্ন আমাদের নিয়ে যায় জ্যোতির্বিদ্যার গভীরে, সূর্যের অবস্থান, কৃষির ঋতুচক্র, রাজনীতি এবং ধর্মের ছায়ায়।

জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সূর্য প্রবেশ করে মেষ রাশিতে, এই ঘটনাকে বলা হয় Solar Ingress into Aries।সৌর জ্যোতিষ মতে এটাই প্রকৃত নববর্ষ, কারণ এটি সূর্যের নতুন রাশিচক্রে প্রবেশ এবং ঋতুর পরিবর্তনের সূচনা ঘটায়। এই সময় পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলে দিন ও রাত প্রায় সমান হয়। বহু সংস্কৃতির কাছে এটি জীবন ও সময়ের পুনর্জাগরণ। ফলে যেসব সভ্যতা সৌর ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে তাদের নববর্ষ প্রায়শই এই সময়েই আসে।

সময়ের ধারণা মানব সভ্যতার এক আদিম অনুসন্ধান। প্রাচীন মিশরীয়রা সূর্যের ভিত্তিতে ৩৬৫ দিনের ক্যালেন্ডার তৈরি করে, ব্যাবিলনীয়রা চন্দ্র ও সৌর উভয় চলনের ওপর নির্ভর করে সময় নির্ধারণ করে। ভারতের উপমহাদেশে গড়ে ওঠে সৌরসিদ্ধান্ত নামক জ্যোতির্বিদ্যাভিত্তিক গ্রন্থ, যেখানে সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান দিয়ে বছর গণনার পদ্ধতি নির্ধারিত হয়। এই ক্যালেন্ডারগুলো কেবল সময় পরিমাপের জন্য ছিল না, বরং ধীরে ধীরে কৃষিকাজ, ধর্মীয় উৎসব এবং শাসন ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তিও হয়ে ওঠে।আমাদের পহেলা বৈশাখ, ভারতের পাঞ্জাবের বৈশাখী, কেরালার বিষু, তামিলনাড়ুর পুতান্ডু, নেপালের নববর্ষ, শ্রীলঙ্কার আলুথ আউরুদ্দা, থাইল্যান্ডের সংক্রান, লাওসের পি মা লাও এবং কম্বোডিয়ার চোল চনাম থমাই-সব নববর্ষ উৎসবই ঘটে এপ্রিলের ১৩ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে। এই মিল কোনো ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা নয়, এক গভীর জ্যোতির্বিদ্যা ও কৃষিনির্ভর বাস্তবতার ফল।

সূর্য যখন মেষ রাশিতে প্রবেশ করে, তখনই এই সব অঞ্চলে নতুন বছরের সূচনা হিসেবে তা বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, বহু জাতি-রাষ্ট্র, ধর্ম ও সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও, আকাশের সূর্য তাদের সবাইকে এক অভিন্ন সময়চক্রে বেঁধে রাখে। বাংলা নববর্ষ আজ আমাদের উৎসব, গান, আলপনা, পান্তাভাত আর বৈশাখী মেলায় আবদ্ধ হলেও তার জন্ম কিন্তু ছিল গভীরভাবে জ্যোতির্বিদ্যার সঙ্গে সংযুক্ত।মুঘল সম্রাট আকবর ফসলি সন প্রবর্তন করেন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে, কারণ হিজরি চান্দ্রবর্ষ এ অঞ্চলের কৃষির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। সেই ফসলি সনকেই সংস্কৃতির সুতোয় বুনে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাংলার নববর্ষ। কিন্তু এর ঐতিহ্য আরও প্রাচীন। প্রাচীন বঙ্গদেশে সূর্য-নির্ভর কৃষিজীবন রীতিমতো ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে গাঁথা ছিল। বসন্তের শেষে, গ্রীষ্মের দ্বারপ্রান্তে এই নববর্ষ ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নবচুক্তি।

আজ আমরা বৈশাখকে দেখি কেবল সাংস্কৃতিক চোখে, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে সময় গণনার এক বিজ্ঞানসম্মত সৌরসূত্রও।শাসকরা কেবল ভূমির নয়, সময়ের ওপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। আকবরের ফসলি সন, প্রাচীন রোমের গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার কিংবা পারস্যে নওরোজের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সবই প্রমাণ করে যে ক্যালেন্ডার নির্ধারণ ছিল রাজনীতির এক সূক্ষ্ম হাতিয়ার। প্রশাসনিক প্রয়োজনে সূর্যভিত্তিক সময় গণনা চালু হলেও, তা ধীরে ধীরে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপ নেয়। নববর্ষের সময় শুধু খাজনা বা কৃষি নয়, বহু সংস্কৃতিতে এটি আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের সময়ও বটে। ইহুদিদের রোশ হাশানাহ, পারসিদের নওরোজ, বৌদ্ধদের থিংইয়ান, হিন্দু নববর্ষ-সব উৎসবেই দেখা যায় আত্মশুদ্ধি, পূর্বপুরুষ স্মরণ এবং শুভ সূচনার তীব্র উপস্থিতি।

কেউ কেউ আগুনের মধ্যে দিয়ে আত্মাকে বিশুদ্ধ করে, কেউ ফুল ও ফল উৎসর্গ করে জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। আবার কেউ পবিত্র জল ছিটিয়ে পাপ ধুয়ে ফেলে। মাথার উপরের সূর্য এখানে কেবল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু নয়, বরং আধ্যাত্মিক আলোর প্রতীক।আজকের বিশ্বে আমরা ১ জানুয়ারিকেই ইংরেজি ‘নিউ ইয়ার’ বলি, কারণ গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার একটি বৈশ্বিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অঞ্চলভিত্তিক সৌর ও চন্দ্র নববর্ষ এখনও টিকে আছে, লোকায়ত সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে। বিশ্বায়ন যেখানে একরৈখিক সময় ধারণা চাপিয়ে দেয়, সেখানে বাংলা নববর্ষ বা সংক্রান্তি জাতীয় উৎসবগুলো দেখায় সংস্কৃতি কীভাবে নিজস্ব ছন্দে বেঁচে থাকতে জানে। সময় এখানে কেবল ঘড়ির কাঁটা নয়, বরং শিকড় ধরে জেগে থাকা গান, রং, খাবার আর স্মৃতির ধারক।

তাহলে সূর্য কি কেবল আলো আনে, না কি ক্যালেন্ডারের প্রাণও?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের ঐতিহাসিক উপলব্ধিতেই লুকানো। সূর্য তার নির্ধারিত পথে চলে, কিন্তু মানুষের চেতনার ইতিহাসে সে হয়ে ওঠে সময়ের পথনির্দেশক। নববর্ষ তাই কেবল একটি তারিখ নয়, একটি চক্রের সমাপ্তি ও আরেকটির সূচনা। এই চক্রে আছে আকাশের নীতি, মাটির টান, শাসকের শৃঙ্খল আর মানুষের কল্পনার রঙ। আর এই সব মিলেই গড়ে ওঠে এক জ্যোতির্বিদ্যাগত সংস্কৃতি-যেখানে সূর্য শুধু আলো নয়, ইতিহাসের ছন্দ রচয়িতা।




মাতারবাড়িতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের চুড়ান্ত চুক্তি এ মাসেই

অনুমোদনের ৫ বছর পর কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য চূড়ান্ত চুক্তি আগামী ২২ এপ্রিল ঢাকায় স্বাক্ষরিত হবে জাপানের দুই খ্যাতনামা নির্মাণ ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানেরসাথে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই নির্মাণকাজ শুরু হবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২৯ সালের মধ্যেই বন্দরটি চালু করা যাবে। এ প্রকল্পে অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধান করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। মাতারবাড়ি বন্দর প্রকল্পটি ২০২০ সালে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুমোদিত হলেও ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জের কারণে বিলম্বিত হয়।

বন্দরটি চালু হলে বড় আকারের জাহাজগুলো সরাসরি নোঙর করতে পারবে। এ সুবিধা বর্তমানে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামেও নেই। এতে করে জাহাজ চলাচলের সময় ও খরচ উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ১০ মিটার গভীরতার (ড্রাফট), ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের এবং ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার জাহাজ চলাচল করতে পারে। এর তুলনায় মাতারবাড়ি বন্দরের প্রথম পর্যায়েই ১৬ মিটার গভীরতার জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা থাকবে। কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, গভীর সমুদ্রবন্দরটি চট্টগ্রামের তুলনায় জাহাজ পরিবহনে খরচ ৫৭% এবং সময় ৬০% পর্যন্ত কমিয়ে আনবে।

বর্তমানে এক টিইইউ (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার পরিবহনে গড়ে ৩ হাজার ডলার খরচ হয় এবং ইউরোপে চালান পৌঁছাতে ৪০ থেকে ৪২ দিন সময় লাগে। কিন্তু গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে ৮ হাজার ২০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার বড় কনটেইনার জাহাজগুলো সরাসরি নোঙর করতে পারবে। এতে করে ডেলিভারির সময় ১৬ থেকে ১৭ দিন কমে আসবে এবং খরচ নেমে আসবে ১ হাজার ৩০০ ডলারের নিচে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে এটি কেবল বড় আকারের জাহাজই ধারণ করতে পারবে না, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবেও কাজ করবে।প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের পণ্য পরিবহনের জন্য এ বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। তাছাড়া, ইউরোপ বা আমেরিকাগামী বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজগুলোর আর সিঙ্গাপুর, কলম্বো বা মালয়েশিয়ার মাধ্যমে ফিডার ভেসেল ট্রানজিটের প্রয়োজন পড়বে না।’




যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক স্থগিত , ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানালেন ড. ইউনুস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি চীন ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। এই ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।বিবৃতিতে ড. ইউনূস লেখেন, ‘আমাদের অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দেওয়ায় মহামান্য প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ। আপনার বাণিজ্য এজেন্ডার সমর্থনে আমরা আপনার প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাব।’

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে গত ৭ এপ্রিল ড. ইউনূস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রেরণ করেন, যেখানে তিনি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টাপাল্টি শুল্ক পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। চিঠিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেন, অন্তত ৯০ দিনের জন্য এই শুল্ক স্থগিত রাখা হোক, যাতে উভয় দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায় এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। চিঠিতে ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি একজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি আগ্রহ তুলে ধরা। বাংলাদেশই প্রথম দেশ হিসেবে মার্কিন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করে এবং যৌথভাবে কাজ করার প্রস্তাব দেয়।

এছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, যা মার্কিন এলএনজি রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যড়বিশেষ করে তুলা, গম, ভুট্টা ও সয়াবিন-আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা মার্কিন কৃষকদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করবে। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত সংরক্ষণাগার (বন্ডেড ওয়্যারহাউস) চালু করার পরিকল্পনা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে বাংলাদেশি বাজারে প্রবেশ করতে পারে। পাশাপাশি, গ্যাস টারবাইন, সেমিকন্ডাক্টর ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মতো শীর্ষ মার্কিন রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ কমানোর কাজও চলমান রয়েছে।

ড. ইউনূস আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ পণ্যের ওপর বাংলাদেশে শুল্কহার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম। এছাড়া, অশুল্ক বাধা দূর করার জন্য বাংলাদেশ কিছু পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে এবং প্যাকেজিং, লেবেলিং ও সনদ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজতর করেছে। কাস্টমস ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলেও তিনি জানান। চিঠিতে উল্লেখযোগ্য একটি দিক ছিল বাংলাদেশে স্টারলিংক চালুর অগ্রগতি। ড. ইউনূস জানান, এই প্রক্রিয়ার বেশিরভাগ অংশ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে আরও বৃহৎ বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সবশেষে ড. ইউনূস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেন যে, উল্লিখিত সব কার্যক্রম চলতি ত্রৈমাসিকের মধ্যেই বাস্তবায়িত হবে।এজন্য সামান্য সময় প্রার্থনা করে তিনি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে আরোপিত পাল্টা শুল্ক তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিবৃতিতে জানান, ৭৫টিরও বেশি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং কেউ প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বলেই তিনি এই শুল্ক স্থগিতের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই ৯০ দিনের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর থাকবে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসকৃত। এই পদক্ষেপকে পর্যবেক্ষকরা যুক্তরাষ্ট্র-বিশ্ব বাণিজ্য সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করছেন।






জলবায়ুর সীমানা অতিক্রম ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঊর্ধ্বসীমা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ

দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছিলেন-গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়ে, তবে পৃথিবী এক বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে। ২০২৫ সালে এসে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা এই গুরুত্বপূর্ণ সীমা অতিক্রম করেছে। এই তথ্য শুধু পরিসংখ্যান নয় বরং একটি ভয়াবহ বাস্তবতা। এটি এমন এক সংকেত যা আমাদের বলছে-জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি এখনকার ভয়াবহতা।

প্রাক-শিল্প যুগ বলতে সাধারণত ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের সময়কালকে বোঝায়। সেই সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় গভীর পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন। এই সীমাটি পার হলে আরও ঘন ঘন এবং আরও মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন-মহাবন্যা, ভয়ঙ্কর খরা, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানলের সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো অঞ্চলে অবস্থিত নিম্নাঞ্চল ও উন্নয়নশীল দেশসমূহ। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এই পরিবর্তনের ভয়াবহ চিত্র ইতোমধ্যেই প্রত্যক্ষ করছে।

কীভাবে অতিক্রম করল এই সীমা?
২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এখনো থামেনি। শিল্প, যানবাহন, বন উজাড় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহারের কারণে এই গ্যাসসমূহ বায়ুমণ্ডলে জমে থেকে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়াচ্ছে। এই প্রবণতা রোধে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল-প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বন সংরক্ষণ-তা যথেষ্ট ছিল না বা বাস্তবায়ন পর্যাপ্ত হয়নি।

এবার এর ফলাফল কী হতে পারে?
বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বরফ গলছে গ্রিনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার মতো স্থানগুলোতে। অনেক দ্বীপ রাষ্ট্র ইতোমধ্যেই জলডুবির আশঙ্কায় স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কৃষিজমি হারানোর ফলে খাদ্য সংকট, জল সংকট, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ এবং জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা আগামী দশকে ভয়াবহভাবে বাড়তে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো-এই পরিবর্তন যদি স্থায়ী হয়ে যায়, তবে একে ফিরিয়ে আনা হবে প্রায় অসম্ভব। এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস, নবায়নযোগ্য শক্তির উপর জোর, বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ এখন আর বিকল্প নয় বরং একমাত্র পথ।

বিশ্ব নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা, এবং সাধারণ মানুষের পরিবেশ সচেতনতা-এই তিনের সমন্বয়েই ভবিষ্যতের পথ নির্ধারিত হবে। ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যতের নির্ণায়ক সীমানা।আমরা যদি এখনই জেগে না উঠি তবে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাব একটি উত্তপ্ত, অস্থিতিশীল এবং শূন্যতায় পরিণত পৃথিবী। এখনো সময় আছে, তবে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ ইতোমধ্যে শোনা যাচ্ছে।





দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে সামরিক বাহিনীর প্রভাব যেন আবার ঘনীভূত হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে যখন গণতন্ত্রের তৃতীয় ঢেউ এ অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্লেষকদের আশা ছিল সামরিক শাসনের যুগ পেছনে পড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সে আশাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার থেকে শুরু করে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সামরিক রাজনৈতিক প্রভাব আবারও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

১৯৬০-৮০ দশকে ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো, ফিলিপাইনের মার্কোস কিংবা থাইল্যান্ডের সামরিক জান্তারা এই অঞ্চলের স্বৈরতান্ত্রিক ইতিহাসের অংশ ছিল। তবে আজকের চিত্রে সামরিক শাসন আগের মতো সরাসরি না হলেও, ছায়ার আড়ালে কিংবা নির্বাচনের আড়ালে তারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দখল করে নিচ্ছে। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জান্তা সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। থাইল্যান্ড ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। ইন্দোনেশিয়ায় সাবেক সেনা কমান্ডার প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, যার অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। কম্বোডিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক হুন সেন তার সেনাপ্রধান সন্তান হুন মানেতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন, যিনি সেনা পটভূমি থেকে এসেছেন। ভিয়েতনামের শাসক দলের বহু সদস্যই সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর বলছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকা এসব দেশে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় পা রাখার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা মিয়ানমারের মতো দেশে সেনাবাহিনী কেবল প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিল না; তারা রাষ্ট্র নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এ বাহিনী নিজেকে রাষ্ট্রের স্থায়ী অংশ হিসেবে দেখতে শিখেছে। জাতিগত সংঘাত, বিদ্রোহ, কিংবা নিরাপত্তা সঙ্কটের মতো ইস্যু সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের মতো দেশে সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অজুহাতে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক আধিপত্যের পেছনে শুধুই নিরাপত্তাজনিত কারণ নয়, এতে জড়িত রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থও।ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনী দেশটির বড় কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যেমন টেলিকম কোম্পানি ও সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করে।কম্বোডিয়ার ক্ষমতাসীন দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই সামরিক বা পুলিশ বাহিনীর পটভূমি থেকে এসেছেন। ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্টের ভাই দেশটির অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী। এই সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস বলছে, সামরিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক গণতন্ত্রের বিকাশে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অলিগার্ক ও সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংযোগ সমাজে বৈষম্য ও দুর্নীতি বাড়াচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই সামরিক পুনরুত্থান এককভাবে স্থানীয় রাজনীতির ফল নয়, এটি বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ, যেখানে সাহেল অঞ্চলের মতো আফ্রিকান দেশ, মিসর কিংবা পাকিস্তানেও সামরিক প্রভাব পুনরায় দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং চীনের আগ্রাসী অবস্থান ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। তবে ফিলিপাইন এখনো তুলনামূলকভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পেরেছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে সামরিক ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে-১৯.২ বিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ বিলিয়ন ইউরোতে। সামরিক আধিপত্যের এই বাস্তবতায় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই ব্যতিক্রম। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সেনাবাহিনীর প্রভাব এড়িয়ে চলতে পেরেছে। ব্রুনাইয়ের রাজতান্ত্রিক কাঠামোও সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কমাতে সহায়ক হয়েছে। একইভাবে পূর্ব তিমুরে সাবেক গেরিলা নেতা জেনানা গুসমা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বটে, কিন্তু তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই।এটি একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামরিক নেতৃত্বের এই উত্থান শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে না, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতিকেও রূপান্তরিত করতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন আর শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গন্তব্য নয়, এক বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। যেখানে সামরিক বাহিনীর পুনরুত্থান, গণতন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ এক জটিল গাঁঠ গেঁথে ফেলেছে। থাইল্যান্ডের নারেসুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা পল চেম্বারসের ভাষায়, সামরিক আধিপত্য অনেক সময় নির্ভর করে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের ওপর। থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রের সমর্থন সামরিক অভ্যুত্থানকে দীর্ঘায়িত করেছে। অন্যদিকে মিয়ানমার বরাবরই সামরিক শাসনে অভ্যস্ত ছিল এবং ২০২১ সালে তারা আবারো তাদের স্বার্থ রক্ষায় ক্ষমতা দখল করেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক আধিপত্যের এই পুনরাবৃত্তি একটি গুরুতর সংকেত। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার আদর্শ এই অঞ্চলে নতুন করে হুমকির মুখে পড়ছে। যতদিন না রাজনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শক্তিশালী স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়, ততদিন এই অঞ্চলে সামরিক ছায়া রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিদায় নেবে না।