দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছিলেন-গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়ে, তবে পৃথিবী এক বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে। ২০২৫ সালে এসে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা এই গুরুত্বপূর্ণ সীমা অতিক্রম করেছে। এই তথ্য শুধু পরিসংখ্যান নয় বরং একটি ভয়াবহ বাস্তবতা। এটি এমন এক সংকেত যা আমাদের বলছে-জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি এখনকার ভয়াবহতা।
প্রাক-শিল্প যুগ বলতে সাধারণত ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের সময়কালকে বোঝায়। সেই সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় গভীর পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন। এই সীমাটি পার হলে আরও ঘন ঘন এবং আরও মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন-মহাবন্যা, ভয়ঙ্কর খরা, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানলের সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো অঞ্চলে অবস্থিত নিম্নাঞ্চল ও উন্নয়নশীল দেশসমূহ। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এই পরিবর্তনের ভয়াবহ চিত্র ইতোমধ্যেই প্রত্যক্ষ করছে।
কীভাবে অতিক্রম করল এই সীমা?
২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এখনো থামেনি। শিল্প, যানবাহন, বন উজাড় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহারের কারণে এই গ্যাসসমূহ বায়ুমণ্ডলে জমে থেকে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়াচ্ছে। এই প্রবণতা রোধে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল-প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বন সংরক্ষণ-তা যথেষ্ট ছিল না বা বাস্তবায়ন পর্যাপ্ত হয়নি।
এবার এর ফলাফল কী হতে পারে?
বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বরফ গলছে গ্রিনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার মতো স্থানগুলোতে। অনেক দ্বীপ রাষ্ট্র ইতোমধ্যেই জলডুবির আশঙ্কায় স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কৃষিজমি হারানোর ফলে খাদ্য সংকট, জল সংকট, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ এবং জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা আগামী দশকে ভয়াবহভাবে বাড়তে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো-এই পরিবর্তন যদি স্থায়ী হয়ে যায়, তবে একে ফিরিয়ে আনা হবে প্রায় অসম্ভব। এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস, নবায়নযোগ্য শক্তির উপর জোর, বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ এখন আর বিকল্প নয় বরং একমাত্র পথ।
বিশ্ব নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা, এবং সাধারণ মানুষের পরিবেশ সচেতনতা-এই তিনের সমন্বয়েই ভবিষ্যতের পথ নির্ধারিত হবে। ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যতের নির্ণায়ক সীমানা।আমরা যদি এখনই জেগে না উঠি তবে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাব একটি উত্তপ্ত, অস্থিতিশীল এবং শূন্যতায় পরিণত পৃথিবী। এখনো সময় আছে, তবে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ ইতোমধ্যে শোনা যাচ্ছে।


