Home Blog Page 137

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় AI কিভাবে সহায়ক হতে পারে?

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন একটি জ্বলন্ত সংকট। গড় তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে, বরফ গলছে, সাগরের জলস্তর উঠছে, এবং জলবায়ুগত দুর্যোগ—ঝড়, খরা, বন্যা—ক্রমশ ঘন ঘন ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এই সংকট মোকাবিলায় Artificial Intelligence (AI) বর্তমানে অন্যতম সম্ভাবনাময় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—AI কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইকে বাস্তব ও কার্যকর করে তুলতে পারে? জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ গতিপথ বুঝতে হলে বিশাল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ জরুরি—যেমন, তাপমাত্রা, বাতাসের গতি, সাগরের স্তর, বনাঞ্চলের পরিবর্তন ইত্যাদি। এই বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় ব্যয় করে, আবার ত্রুটির সম্ভাবনাও থাকে। কিন্তু AI-এর মাধ্যমে হাজার হাজার গিগাবাইট ডেটা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ করা যায়, যা সঠিক পূর্বাভাস তৈরি করতে সাহায্য করে। ফলে দুর্যোগ আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং তার প্রস্তুতিও নেওয়া যায় আগেভাগেই।

সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তির মতো পুনঃনবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবস্থাপনাও অনেক জটিল। কখন সূর্য উঠবে বা বায়ু প্রবাহ কেমন হবে, তার উপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। AI এই পূর্বাভাস দিতে পারে এবং সেই অনুযায়ী শক্তি উৎপাদন ও সংরক্ষণে সহায়তা করে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমে যায় সাথে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি হচ্ছে কৃষি। AI-চালিত ড্রোন বা সেন্সরের সাহায্যে মাটি, আর্দ্রতা, রোগব্যাধি ইত্যাদির তথ্য সংগ্রহ করে চাষীদের জন্য কার্যকরী পরামর্শ দেওয়া যায়। একইভাবে স্যাটেলাইট ডেটা ও AI-ভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বনাঞ্চলের ধ্বংস ও অবৈধ লগিং আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়, যা পরিবেশ রক্ষায় অপরিহার্য।

শহরের যানজট, তাপদূষণ এবং শক্তি অপচয়ের অন্যতম কারণ। AI-নির্ভর smart city নকশায় ট্রাফিক মডেল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সর্বোত্তম পদ্ধতি নির্ধারণ করা যায়। এর মাধ্যমে শহরগুলো কার্বন নির্গমন কমিয়ে আরও টেকসই হতে পারে। বিশ্বের বহু দেশে জলবায়ু নীতিমালা গঠনের সময় সঠিক তথ্য ও প্রভাব বিশ্লেষণ অনুপস্থিত থাকে। AI-ভিত্তিক climate simulation ও impact modeling নীতিনির্ধারকদের হাতে যথার্থ উপাত্ত তুলে ধরতে পারে, যা বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হয়। সঠিক ব্যবহার করতে পারলে আমাদের জন্য AI একটি হাতিয়ার। আবার সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে এটি পরিবেশের জন্য হুমকিও হয়ে উঠতে পারে (যেমন, অতিরিক্ত শক্তি খরচ করে এমন AI মডেল)। তবে যতক্ষণ আমরা এটিকে একটি টুল হিসেবে বিবেচনা করি এবং মানবিক ও নীতিনৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করি, ততক্ষণ এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের অন্যতম শক্তিশালী সহযোগী হতে পারে।

মার্কিন হামলায় ইয়েমেনে নিহত ১২৩ , ফিলিস্তিনের পাশে অটল হুতিরা

ইয়েমেনি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অভিযানে এ পর্যন্ত মোট ১২৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা। সংবাদমাধ্যমটির তথ্যমতে, মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই মার্কিন অভিযানে এখন পর্যন্ত আহত হয়েছেন প্রায় ২৫০ নাগরিক। যাদের মধ্যে রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইয়েমেনি ভূখণ্ডে তাদের হামলার একমাত্র লক্ষ্য হুতিরা। তবে ইয়েমেনি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে মূলত বেসামরিকদেরই লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

ওয়াশিংটনের দাবি, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা এবং লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলরত বাণিজ্য জাহাজগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করা হবে। তবে হুতি বিদ্রোহীরা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের দাবি, হুতিদের সঙ্গে না পেরে বেসামরিক কর্মকর্তা এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সেনারা। গোষ্ঠীটি মার্কিন প্রশাসনকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন ও অবরোধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হুতিদের সামরিক অভিযান চলবেই। একে ফিলিস্তিনের প্রতি নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব বলেও অভিহিত করে তারা।

রোববারও ইসরায়েলি ভূখণ্ডে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১টি ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায় — আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। এ সময় জেরুজালেম ও তেল আবিবে সাইরেন বেজে ওঠে। এক বিবৃতিতে হুতি গোষ্ঠী বলে, ‘ইসরায়েলি শত্রু এবং আমেরিকানদের বুঝতে হবে যে — ইয়েমেনের নেতৃত্ব, জনগণ ও সেনাবাহিনী কখনোই ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানানো বন্ধ করবে না। পরিণাম যা-ই হোক কখনোই পিছু হটবে না ইয়েমেন।’

নিওলিবারেল হেজেমনি ও বৈশ্বিক শাসনের রূপরেখা

0

নিওলিবারেলিজম একটি বহুব্যাখ্যাযোগ্য ধারণা, যার উৎপত্তি একদিকে যেমন ২০শ শতকের ইউরোপীয় বৌদ্ধিক আন্দোলনের ফাঁকে, অন্যদিকে তেমনি এটি ১৯৭০-৮০ এর দশকে অ্যাংলো-আমেরিকান রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক মতাদর্শ নয়, রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তির সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের একটি রাজনৈতিক প্রকল্পও বটে। এই প্রবন্ধে নিওলিবারেলিজমের ইতিহাসকে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে: ইউরোপীয় বৌদ্ধিক সূত্র, অ্যাংলো-আমেরিকান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং লাতিন আমেরিকান অভিজ্ঞতা।

নিওলিবারেল আদর্শ প্রথম গড়ে ওঠে ২০ শতকের প্রথমভাগে, এমন এক সময়ে যখন সাম্রাজ্যিক কাঠামো ভেঙে পড়ছিল এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিশ্বজুড়ে শক্তি অর্জন করছিল। ঐতিহাসিক কুইন স্লোবোডিয়ানের গবেষণা, Globalists: The End of Empire and the Birth of Neoliberalism (২০১৮), এই প্রবণতাকে বিশ্লেষণ করে দেখান যে ইউরোপীয় এলিটরা, বিশেষত অস্ট্রিয়ান অর্থনীতিবিদ লুডভিগ ভন মিসেস এবং ফ্রেডরিখ হায়েক, বিশ্বাস করতেন যে উদীয়মান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই তারা এমন এক বিশ্বব্যবস্থা কল্পনা করেন যেখানে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও আইন ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করবে।

মন্ট পেলেরিন সোসাইটি, জেনেভার লীগ অব নেশনস বা ভিয়েনা চেম্বার অফ কমার্সের মত প্রতিষ্ঠানগুলির আর্কাইভে প্রবেশ করে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন যে নিওলিবারেল চিন্তাধারা “মার্কেট সেভিং” মিশনের ওপর গঠিত, যা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে জাতির নাগরিকত্ব ধারণার বিরোধী ছিল। ইউরোপের তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিওলিবারেলিজমের ইতিহাস অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক এবং রাজনৈতিকভাবে অধিক স্পষ্ট। ঐতিহাসিক গ্যারি গারস্টলের মতে, নিওলিবারেল অর্ডারের বিকাশ শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে, যখন কেইনসীয় রাষ্ট্র মুদ্রাস্ফীতি, মন্দা এবং রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে ভুগছিল। এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে, রোনাল্ড রেগান ও মার্গারেট থ্যাচারের মতো নেতারা সরকারী নিয়ন্ত্রণ থেকে বাজারকে মুক্ত করার প্রকল্প শুরু করেন। বিশ্বব্যাপী এই প্রকল্পকে সহায়তা করেছিল GATT, IMF, এবং WTO-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যা একধরনের সুপ্রান্যাশনাল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে।

তবে মার্কিন বৌদ্ধিক পরিসরে একধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে নিওলিবারেলিজমের সেই যুগ এখন শেষ হয়েছে। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলা, গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণের চিত্র হিসেবে, নিওলিবারেল রাজনৈতিক সর্বসম্মতির অবসানকে চিহ্নিত করে। ইউরোপীয় ও মার্কিন ইতিহাসের বিপরীতে, লাতিন আমেরিকা নিওলিবারেল নীতির প্রয়োগক্ষেত্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। চিলির পিনোশে শাসন, মেক্সিকোতে বেসরকারিকরণ এবং বলিভিয়ায় জলের অধিকার সংকট—সবই নিওলিবারেল নীতিমালার উদাহরণ। তবু মার্কিন একাডেমিক গবেষণাগুলিতে এই অঞ্চলের অনুপস্থিতি লক্ষণীয়, যা একটি স্পষ্ট নস্টালজিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে: মনে করা হয় যেন একসময় নিওলিবারেল সময় ছিল এবং এখন তা নেই।

এটা ভুলে যাওয়া হয় যে ‘নিওলিবারেলিজম’ শুধু একটি নীতির নাম নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা—যা অনেক জাতির মানুষের জন্য বৈষম্য, শোষণ এবং প্রতিরোধের বাস্তবতা বহন করে। যেমন মেক্সিকোতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা একজন লেখিকার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, নিওলিবারেল শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় ছিল না, তা ছিল স্কুলের কাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি, এমনকি ছাত্রদের দায়িত্ববোধের মাধ্যমেও অনুরণিত।

নিওলিবারেলিজমের ইতিহাস একরৈখিক নয় বরং বহুস্তরীয়, ভূগোলভিত্তিক ও রাজনৈতিক পটভূমিসম্পন্ন পরিবর্তনশীল প্রকল্প। ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক বৃত্তে এর শিকড় থাকলেও, নিওলিবারেলিজম বাস্তবায়িত হয়েছে মূলত অ্যাংলো-আমেরিকান রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলে। একাডেমিক আলোচনায় এই অঞ্চলগুলোর অন্তর্ভুক্তি নিছক উপস্থাপন নয়, ইতিহাসের বৈশ্বিক জটিলতাকে বোঝার একটি নৈতিক ও তাত্ত্বিক প্রয়োজন।

বর্তমান বিশ্বে যদি নিওলিবারেল যুগের পরবর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করা হয়ে থাকে, তবে এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গেলে আমাদের সেই সব অঞ্চলের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্রে আনতে হবে, যারা নিওলিবারেল প্রকল্পের বাস্তবিক শিকার ও সমালোচক উভয়ই । প্রবন্ধটি একাডেমিক কনটেক্সটে আলোচনার উপযোগী। চাইলে আমি এটির জন্য রেফারেন্স বা ফুটনোট স্টাইলেও সাজাতে পারি। যদি চান, এটিকে PDF বা পাণ্ডুলিপি আকারে রূপান্তর করে দিতে পারি।

নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন কেন প্রয়োজন : কল্লোল মোস্তফা , লেখক , রাজনীতি ও বিশ্লেষক

… বাংলাদেশের সংসদে নারীর জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংসদে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে নারী আসনগুলো বণ্টন করা হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, কন্যা বা আশীর্বাদপুষ্টরা এগুলোয় মনোনীত হন। অনেক ক্ষেত্রে মনোনয়ন পেতে মোটা অংকের অর্থের লেনদেন ঘটে। ফলে এর মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নারীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। … এ কারণেই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন—উভয় কমিশনের পক্ষ থেকেই সংসদে ১০০ সংরক্ষিত আসনে নারীর সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এ সুপারিশ অনুসারে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করে সংসদের মোট আসন সংখ্যা ৪০০ করা হবে এবং সেখান থেকে ১০০ আসন লটারি বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে চিহ্নিত করে নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।

এ আসনগুলোয় কেবল নারীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অন্য ৩০০ আসনে নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকবে। দ্বিতীয়বার, অর্থাৎ পরবর্তী নির্বাচনে অন্য ১০০টি আসনে শুধু নারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এভাবে চারটি মেয়াদে প্রতিটি আসন থেকে একজন নারী যোগ্যতার ভিত্তিতে অন্য নারীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ পাবেন। কমিশন মনে করে, এভাবে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে বিদ্যমান সংরক্ষিত ব্যবস্থার অনেক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। কারণ :

প্রথমত, সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত নারীদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা থাকবে এবং এসব নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তারা পরবর্তী সময়ে পুরুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবেন। দ্বিতীয়ত, এ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যপদ আর ‘ফায়দা’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। নারীদের নিজস্ব যোগ্যতা ও দক্ষতাই হবে নির্বাচিত হওয়ার মূল মাপকাঠি। তৃতীয়ত, ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব সংসদ সদস্য একই দায়দায়িত্ব, ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। ফলে নারী সদস্যরা আর আলংকারিক হিসেবে গণ্য হবেন না এবং তাদের হীনমন্যতায় ভুগতে হবে না।

চতুর্থত, ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সংরক্ষিত আসনের নারীরা ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ হবেন; শুধু দল বা দলের প্রধানের কাছে নয়। পঞ্চমত, চারটি নির্বাচনী চক্রে বা চার টার্মে প্রত্যেক আসন থেকে অন্তত একবার একজন নারী সরাসরি যোগ্যতার ভিত্তিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে সারা দেশ থেকে একঝাঁক নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি হওয়ার দ্বার উন্মোচন হবে। কমিশন তার সুপারিশের পক্ষে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। ভারতের পঞ্চায়েত বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ ধরনের ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি বহুদিন থেকেই চালু আছে। এ পদ্ধতির কারণে ভারতের পঞ্চায়েতে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বেড়েছে।

… ভারতীয় পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০ হাজার জনের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, এ সংরক্ষণ পদ্ধতি অনেক নারীকে (৪৩%) প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশগ্রহণে উদ্দীপ্ত করেছে। বেশির ভাগ নারী প্রতিনিধির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আগে তাদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা অত্যন্ত সীমিত ছিল এবং প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মধ্য দিয়েই তাদের সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের সূচনা ঘটে। এ কারণেই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০০ সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রেই নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ৩৩ শতাংশ সংরক্ষিত আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ করেছে। এছাড়া জনমত জরিপ থেকেও নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের পক্ষে মতামত পাওয়া গেছে।

… বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেন্ডার বৈষম্যের অবসান ঘটাতে এবং রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও নাগরিক অধিকার কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা থাকা দরকার। “

বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত জনগণকেই নিতে হবে : মার্কিন মুখপাত্র

গতকাল মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত দেশটির জনগণই নেবে।’ বাংলাদেশে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের শাসনামলে ‘ইসলামপন্থি উগ্রবাদ’, বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্যে ওসামা বিন লাদেনের ছবি প্রদর্শন করা, কেএফসি-কোকা কোলার মতো মার্কিন ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে আক্রমণ ও ইহুদিবিদ্বেষের বিস্তার নিয়ে ব্রুসের মন্তব্য জানতে চান ওই সাংবাদিক। জবাবে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন — ‘বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যে দেশের নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা এই দেশ নিয়ে আগেও বহুবার কথা বলেছি, বিশেষ করে এখানকার সাংবাদিকদের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে। তবে এই নির্দিষ্ট প্রসঙ্গটি আমরা আলাদাভাবে বিবেচনা করব।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ নিয়ে আমি একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই—সেটি হলো, ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন বাংলাদেশের আদালত। এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার আওতাধীন একটি বিষয়। আপনি যেসব ঘটনা তুলে ধরেছেন— যেমন বিক্ষোভ-প্রতিবাদ ইত্যাদি—সবই বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের দেখভালের বিষয়, এবং তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের জনগণের মাধ্যমে। তারা এমন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেটির কথা আপনি বলছেন—এবং আমরা নিজেরাও সেসব দেখেছি।’ ব্রুস বলেন — ‘আর নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কথার কথা হিসেবে বলছি না, গণতন্ত্র সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের গুরুত্ব আছে এবং মানুষের কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ এসব দিয়েই তারা এমন সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করতে পারে, যা গত ২০–২৫ বছরে আমরা দেখেছি। কিছু লোকের কর্মকাণ্ড অনেক সময় মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করেছে। এখন অনেক দেশের জন্যই সামনে কোন পথ বেছে নেওয়া উচিত — তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।’

নববর্ষের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ইতিহাস : সৈয়দ আজিজুল হক

” … ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্বে বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যখন ঐতিহ্য-অনুসন্ধানী, তখন বাংলা নববর্ষ পালন তার অংশ হয়ে ওঠে। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে এর পরিসর ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যখন পূর্ব বাংলা হিসেবে এক ঔপনিবেশিক শাসন থেকে আরেক আধা-ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পড়ে, তখন প্রথমেই আঘাত আসে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে মাতৃভাষা বাংলার ওপর। তখন ভাষা আন্দোলনের সূত্রে বাংলাদেশের বাঙালির ঐতিহ্যচেতনা প্রবল হয়ে ওঠে। বাংলা নববর্ষ হয়ে ওঠে এই ঐতিহ্যচেতনার গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ।

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে তারা বাংলা নববর্ষ পালনকে ব্যাপকভাবে উৎসবমুখর করার অভিপ্রায়ে ওই দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। যুক্তফ্রন্ট সরকার পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যের শিকার হলে এবং পরে দেশব্যাপী সামরিক শাসন জারি হলে এই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাঙালিদের নবজাগ্রত জাতীয় চেতনা প্রতিবাদী মনোভাবে উজ্জীবিতই থাকে । সংস্কৃতির ওপর ঔপনিবেশিক আঘাতের একটি রূপ প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালনকে কেন্দ্র করে। তাতে বাঙালি সত্তার প্রতিবাদের যে দেশাত্মবোধক বলয় তৈরি হয়, তারই গর্ভ থেকে জন্ম নেয় ‘ছায়ানট’ নামের প্রতিষ্ঠানটির (১৯৬১)। বাঙালিত্বের চেতনা তীব্র হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক সরকার বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

এর মধ্যে দেশে স্বাধিকার আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার পটভূমিতে বাংলা নববর্ষ পালনে ছায়ানট একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে। ১৯৬৭ সালে বাংলা নববর্ষের প্রভাতে রমনার অশ্বত্থমূলে তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে যে ধারার সূচনা করে, তা বাংলাদেশের বাঙালিদের নববর্ষ উদ্যাপনকে নতুন তাৎপর্য দিয়েছে। প্রতিবছর তারা যেমন নিয়মিতভাবে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তেমনি সারা দেশে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের একটি জাতি-ধর্ম-বর্ণনিরপেক্ষ ধারাও প্রবলতর হয়েছে। … বাংলাদেশের সব মানুষকে একটি সাংস্কৃতিক ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করার ক্ষেত্রে—ভাষা আন্দোলন ও বাংলা নববর্ষ—এই দুটি দিবস অসাধারণ দুটি দৃষ্টান্ত।

লক্ষ করার বিষয়, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক যে পূর্ববঙ্গীয় রেনেসাঁ সংঘটিত হয়, তা বাংলাদেশের বাঙালিদের জাতীয় চেতনাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে।…পশ্চিমবঙ্গীয় নববর্ষের পূজা-পার্বণসংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রাধান্য থেকে বাংলাদেশের নববর্ষ মুক্ত—একান্তভাবেই উদার ও অসাম্প্রদায়িক। … রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারায় বাংলা নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ দিয়ে। ১৯৮৯ সালে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে এর যাত্রা শুরু হলেও এর আবেদন শুধু জাতীয় গণ্ডি ছাপিয়ে গেছে। ২০১৬ সালে ইউনেসকো এটিকে বিশ্ব-ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর জনসংশ্লিষ্টতা, জনমুখিতা, সাংগঠনিক পরম্পরা, ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণিনিরপেক্ষতা, অংশগ্রহণের সর্বজনীনতা প্রভৃতি বিবেচনায় ইউনেসকো এই স্বীকৃতি দেয়।

দেশের চারুশিল্পীরা এর আয়োজনে থাকায় চিন্তার মৌলিকত্বে, বিচিত্র মোটিফের প্রতীকী তাৎপর্যে, বর্ণাঢ্যতায়, লোক-ঐতিহ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় মঙ্গল শোভাযাত্রা দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পুরো দেশে এর কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয়ে পড়ে। … মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে সমাজের কোনো কোনো অংশ থেকে যে কিছু সমালোচনা আসেনি, তা নয়। এ বছরও বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে। কিন্তু সত্য এই যে, মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলাদেশের নববর্ষ উদযাপনের গৌরবকে আরও প্রভাববিস্তারী করে তুলেছে। … নিজ নিজ ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চা করেও বৃহত্তর পরিসরে যদি সবাই যুক্ত হতে না পারি, তাহলে আমাদের জাতীয় ঐক্য ব্যাহত হবে। দেশ বা জাতির অগ্রগতির স্বার্থে সব শ্রেণি-ধর্মের মানবের মিলনের সাংস্কৃতিক সূত্র বজায় রাখা জরুরি। বাংলা নববর্ষ সেই মিলনের পথই আমাদের সামনে এনে দেয়। বাংলাদেশের বাঙালিরাই শুধু নন, এর সঙ্গে যুক্ত হন আদিবাসীরাও। এমন মিলনসূত্র আর কোনো উৎসবে নেই। “

কীভাবে ‘আইডেন্টিটি মিউজিয়াম’ ইতিহাসকে অগম্য করে তোলে

সাম্প্রতিক দশকে সারা বিশ্বের জাদুঘরগুলোর সংগ্রহশালায় থাকা অনেক আদিবাসী শিল্পকর্ম ও সাংস্কৃতিক বস্তু অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে দর্শকদের চোখ থেকে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর আমেরিকার ইরোকোইস জাতির কাঠের মুখোশগুলো, কোস্ট স্যালিশদের তৈরি ধর্মীয় মুখোশ ও ঘণ্টাধ্বনি, কিংবা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ‘সিক্রেট/স্যাক্রেড’ বস্তুগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে সাধারণ প্রদর্শনী স্থান থেকে।এখন এসব সংগ্রহ মূলত সংরক্ষিত এলাকায় বা শুধু নির্দিষ্ট গোত্রের প্রভাবশালী সদস্যদের দেখার অনুমতিতেই সীমাবদ্ধ।

এই রকম পদক্ষেপগুলোর পেছনে মূল রাজনৈতিক যুক্তি হলো উপনিবেশবাদের উত্তরাধিকার চ্যালেঞ্জ করা এবং আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘর গবেষক জ্যানেট মার্স্টিন বলেন, জাদুঘরগুলোর উচিত ‘সোর্স কমিউনিটি’র সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। এখানে ‘সোের্স কমিউনিটি’ বলতে বোঝানো হয় সেই গোষ্ঠী বা জাতিগুলো যাদের ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক রয়েছে নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বস্তুগুলোর সঙ্গে। মার্স্টিন মনে করেন, ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা এবং প্রদর্শন কিভাবে হবে, সেটা নির্ধারণের অধিকার এই জনগোষ্ঠীগুলোরই থাকা উচিত।

গ্রিস বা তুরস্ক দাবি করছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে থাকা পার্থেননের মার্বেল ভাস্কর্য কিংবা হ্যালিকারনাসাসের সমাধিসৌধের ভাস্কর্যগুলো তাদের ঐতিহ্য। তেমনি উত্তর আমেরিকার আদিবাসী, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবোরিজিনাল, কিংবা কানাডার ফার্স্ট নেশন জনগণের মধ্য থেকেও অনেকেই দাবি তুলছেন-তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একমাত্র অধিকারী তারাই।

ওয়াশিংটন ডিসিতে ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত The National Museum of the American Indian (NMAI) এই ধারার একটি অন্যতম প্রতীক। জাদুঘরটি নিজেকে পরিচয়ভিত্তিক বা ‘আইডেন্টিটি মিউজিয়াম’ হিসেবে গড়ে তুলেছে। জাদুঘর নির্মাণ, সংগ্রহ নির্বাচন, প্রদর্শন এবং সংরক্ষণ-সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। একই ধারা অনুসরণ করে ১৯৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাউন্সিল অব মিউজিয়াম অ্যাসোসিয়েশনস ‘Continuous Cultures, Ongoing Responsibilities’ নীতিমালা অনুমোদন করে। যেখানে বলা হয়, আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে জাদুঘরগুলোকে সমান অংশীদারিত্বে কাজ করতে হবে।

এই উদ্যোগগুলোর পেছনে উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে সম্মানযোগ্য। ঔপনিবেশিক শাসন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। কিন্তু সমস্যাটি দেখা যায় যখন এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি একচোখা হয়ে ওঠে। যদি একটি জাদুঘর শুধুমাত্র ধনী শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের অনুমতি অনুসারে প্রদর্শনী নিয়ন্ত্রণ করত, তবে একটি ঘৃণিত বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে ব্যাপক প্রতিবাদ হতো। আজকের আইডেন্টিটি মিউজিয়ামগুলো ঠিক সেই ধাঁচেই, শুধু মাত্র ভিন্ন জাতিসত্তার প্রেক্ষাপটে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে-এই ধরণের একচেটিয়া ন্যারেটিভ কি সত্যিই সকল আদিবাসীর মতপ্রকাশকে প্রতিনিধিত্ব করে? কিংবা যাঁরা নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে চান, তাঁদের জন্য কী সুযোগ রয়েছে?

অনেক জাদুঘরে আজকাল আদিবাসীদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচারকে ‘সংবেদনশীল’ ঘোষণা করে সেই বিষয়গুলোকে জনসমক্ষে আনার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন নৃতাত্ত্বিক মাইকেল ব্রাউন উল্লেখ করেন, এর ফলে ঐতিহাসিক গবেষণা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। যেখানে এক সময় অনন্য আদিবাসী জীবনচর্চা ছিল বিস্ময়ের বিষয়, এখন তা একরকম ‘জেনেরিক স্পিরিচুয়ালিটি’-তে পর্যবসিত হয়েছে। এভাবে জাতিগত পরিচয়কে ঐতিহ্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করলে জ্ঞানচর্চার পরিসর সংকুচিত হয়। এমন এক ধারণা প্রতিষ্ঠা পায় যেখানে বাইরের কেউ কোন সংস্কৃতিকে বুঝতেই পারবে না, কারণ সে সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা তার নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি সংস্কৃতির মধ্যে দেয়াল তুলে দেয়, মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে, এমনকি শিল্পকর্ম ও দর্শকের মাঝেও ব্যবধান তৈরি করে।

নিউজিল্যান্ডের জাদুঘর Te Papa Tongarewa-এর সাবেক প্রধান নির্বাহী সেডন বেনিংটন বলেছিলেন, “পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি ও মাতাওরাঙ্গা মাওরি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে-বাকি পৃথিবী মাওরি জ্ঞান অনুধাবন করতে পারবে না।” অথচ সত্য ইতিহাস ও জ্ঞানের অনুসন্ধান কোনও নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মালিকানাধীন নয়। এটি সকল মানুষের অধিকার। প্রশ্ন করার, জানার ও ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার সার্বজনীন। সেই কারণে শুধুমাত্র ‘সাংস্কৃতিক অধিকার’ বা ‘উপজাতিগত মর্যাদা’র ভিত্তিতে জাদুঘরের দায়িত্ব নির্ধারণ না করেসমাজের সকল সদস্যের জন্য ঐতিহাসিক বস্তুর অর্থ ও অভিজ্ঞতা উন্মুক্ত করা জরুরি। শুধু এই পথেই আমরা ইতিহাসকে প্রশ্ন করতে পারব, অন্বেষণ করতে পারব, এবং সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে পারব।




পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথ কেন বন্ধ হয়ে আছে ?

বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে আন্তঃমহাদেশীয় যাতায়াতের ধারণা আজ আর কল্পনার বিষয় নয়। আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার উৎকর্ষতার ফলে এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পৌঁছানো এক দিনের বিষয়। তবে এর মধ্যেই কিছু ধারণা রয়েছে যেগুলোর বাস্তবতা আজও সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যে। বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রেনযাত্রা পর্তুগালের লাগোস শহর থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত তেমনই এক যাত্রা, যা ভূগোল, প্রযুক্তি ও রাজনীতির এক ক্রান্তিস্থলে দাঁড়িয়ে। প্রায় ১৮,৭৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা কার্যত অক্ষম।

এই রেলপথটি পর্তুগাল থেকে শুরু হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্য দিয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। যাত্রাপথটি অতিক্রম করে অন্তত ১৩টি দেশ, পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড, বেলারুশ, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর। এই ভ্রমণকে কেন্দ্র করে ইউরোপের আধুনিক হাই-স্পিড রেল এবং এশিয়ার দীর্ঘপথ অতিক্রমকারী আন্তঃদেশীয় ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের সমন্বয় দেখা যায়। প্রধান রুটের মধ্যে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে এবং চীন-লাওস রেলপথ অন্যতম। চীনের কুনমিং থেকে লাওস ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ এই রুটের একটি কার্যকর বাস্তবতা তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যাত্রী এই যাত্রাটি একটি ধারাবাহিক ট্রেনে করতে পারবেন না, আলাদা আলাদা রুটে আলাদা ট্রেনে উঠে এই সংযোগে পৌঁছাতে হবে।

এই ট্রেনযাত্রাটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হলো সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া ও বেলারুশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞা শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত করে, যার ফলে ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য রাশিয়া ও বেলারুশের প্রবেশ নিষিদ্ধ বা সীমিত। অথচ এই দুটি দেশ এই ট্রেন রুটের অবিচ্ছেদ্য অংশ। উল্লেখ্য রেলপথের অব্যাহত ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। একটি আন্তর্জাতিক ট্রেন যাত্রা কেবল প্রযুক্তিগত বা ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়, কূটনৈতিক সমঝোতার এক জটিল কাঠামো।

এই যাত্রাপথে অন্তত ১৩টি দেশের মধ্য দিয়ে যেতে হলে প্রয়োগযোগ্য প্রতিটি দেশের ভিসা গ্রহণ আবশ্যক। এক্ষেত্রে ইউরোপের শেঙ্গেন ভিসা কিছুটা সুবিধাজনক হলেও, রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশের জন্য আলাদা ভিসা প্রয়োজন, যার প্রত্যেকটি ভিন্ন নীতিমালার অধীন। এছাড়া প্রত্যেকটি দেশের অভ্যন্তরীণ রেলপথে আলাদা সময়সূচি, ট্রানজিট সময় ও টিকিট পদ্ধতি যাত্রাকে জটিল করে তোলে। একটি সম্পূর্ণ ট্রেন যাত্রা পরিকল্পনা করতে গেলে প্রতি দেশে একাধিকবার অবস্থান করতে হতে পারে, যার ফলে ট্রেন বদল, হোটেল বুকিং ও স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা পূর্ব-পরিকল্পিত না হলে যাত্রাটি কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এই যাত্রার আনুমানিক খরচ ১,২০০-১,৫০০ মার্কিন ডলার। তবে এতে যুক্ত হয় আলাদা টিকিট, ভিসা ফি, হোটেল খরচ, খাবার এবং অন্যান্য ব্যয়। তুলনামূলকভাবে এই ব্যয় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চেয়ে বেশি এবং সময়ও দীর্ঘতর। ফলে ভ্রমণের আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। এই যাত্রা এখনো কেবল তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। ভবিষ্যতে যদি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং আন্তঃদেশীয় রেল সহযোগিতা ও অভিবাসন নীতি আরও নমনীয় হয়, তবে এই রুট একটি কার্যকর পর্যটন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।

বৈশ্বিক পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের চিন্তার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘপথ ট্রেনযাত্রা বিমানের বিকল্প হিসেবে আবারো গুরুত্ব পেতে পারে। ইউরোপে যেমন রেল পরিবহনকে বিমানের বদলে জনপ্রিয় করা হচ্ছে, তেমনি এশিয়াতেও পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পর্তুগাল থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত ট্রেনভিত্তিক এই দীর্ঘ ভ্রমণপথটি একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, তেমনি অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের প্রতীক। এটি একধরনের ‘সম্ভব অসম্ভবতা’-যেখানে মানুষের ইচ্ছা, কৌশল ও কূটনীতি একত্রে না মিললে ভ্রমণের বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা পায় না। এই যাত্রা কেবল রেলপথে একদেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছানোর ঘটনা নয় বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও যোগাযোগ নীতির একটি বৃহৎ বিন্যাস। ভবিষ্যতের এক সম্ভাব্য বাস্তবতা হিসেবেই তাই এই ট্রেনযাত্রা আজ আমাদের গবেষণার ও কল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে।





নদী না খাল ? কেন তালিকা থেকে বাদ পড়লো সুন্দরবনের অনেক গুলো নদী ?

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, যার জলে-বাতাসে মিশে আছে বাংলাদেশের প্রাণভূমি। কিন্তু বিস্তীর্ণ এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের নদ-নদীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে এখনো সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ হয়নি। যদিও গবেষকরা এখন পর্যন্ত সুন্দরবনে ২২৭টি নদীর অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন, সরকারের খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে মাত্র ৮০টির মতো নদী। সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, ‘সুন্দরবনের অনেক জায়গায় এখনো জরিপ হয়নি। যেসব নদীর কোনো না কোনো রেকর্ড আছে, আমরা কেবল সেগুলোই তালিকাভুক্ত করছি।’ এ থেকেই বোঝা যায়, জরিপ ছাড়াই অনেক প্রকৃত নদী এখনো তালিকার বাইরে রয়ে গেছে।

বন বিভাগের পূর্ববর্তী নথিপত্রে অনেক নদীকে ‘খাল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, বিশেষ করে যেগুলো সরু বা সংযোগস্থলে রয়েছে।কিন্তু নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকি এর সঙ্গে একমত নন। তার মতে সুন্দরবনে প্রকৃত খালের অস্তিত্ব নেই, বরং স্থানীয় মৌয়াল ও বাওয়ালদের বোঝার সুবিধার্থে তারা ছোট নদীগুলোকে খাল বলতেন। মাহবুব সিদ্দিকির গবেষণা ও ২০২৩ সালে প্রকাশিত সুন্দরবন ও গাঙ্গেয় বদ্বীপের মোহনা বইয়ে ২২৭টি নদীর নামসহ বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাপিডিয়া ও এশিয়াটিক সোসাইটির তালিকায় ১৭৭টি নদীর নাম ছিল, আমি তার বাইরে আরও ৫০টি নদীর নাম সংযুক্ত করেছি। এগুলো খাল নয়, বরং আবহমানকাল থেকে নদী হিসেবে প্রবাহিত হয়ে এসেছে।’

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনা জেলার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বিদুৎ কুমার সাহা জানিয়েছেন, খুলনা অংশে ২৯টি নদী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একাধিক নাম, স্থানীয় ও কেতাবি নামের বিভ্রান্তি এবং বন বিভাগের খাল-বিষয়ক নথির কারণে যাচাই-বাছাই করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সরকারপক্ষ বলেছে, তালিকায় বাদ পড়া নদীগুলো পরবর্তীতে জরিপের ভিত্তিতে যুক্ত করা হবে। রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেনও মনে করেন, সুন্দরবনের অনেক খাল প্রকৃতপক্ষে নদীর বৈশিষ্ট্য বহন করে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয়রা যাকে খাল বলেন, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নদীই হতে পারে। ঢাকার খিদির খাল যদি কনাই নদ নামে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে পারে, তবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক খালগুলোকেও নদী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ নদীর সংজ্ঞা অনুযায়ী, এটি প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রবাহিত হতে হবে, আর সুন্দরবন তো পুরোটাই প্রাকৃতিক।’

২০২৪ সালের ২৭ মার্চ প্রকাশিত ১ হাজার ২৯৪টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা তৈরি হলেও তাতে সুন্দরবনের অনেক নদীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এই পরিস্থিতি নিয়ে নদী গবেষকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। খুলনার নদী গবেষকরা অভিযোগ করেন, সুন্দরবন, বরেন্দ্র অঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক নদী খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এরপর ৩১ মার্চ এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হলে নতুন করে সুন্দরবনের ৮০টির মতো নদী অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা-১ পরিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. রবীন কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, ‘সুন্দরবনের খুলনা অংশের ২৯টি নদীসহ প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি নদী এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ জরিপের ভিত্তিতে আরো নদী যুক্ত করা হবে।’

এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়, নদী ও খালের সংজ্ঞা নির্ধারণে কি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি অভিন্ন মানদণ্ড থাকা উচিত নয়? স্থানীয় অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং আধুনিক ভূগোলবিদ্যার সমন্বয় ছাড়া সুন্দরবনের মতো জটিল অঞ্চলকে বোঝা অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি স্পষ্ট, সুন্দরবনের নদ-নদী সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কেবল একটি কারিগরি ইস্যু নয়, এটি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জাতীয় উত্তরাধিকার সংরক্ষণের প্রশ্ন। সুন্দরবনের নদীগুলো কেবল পানিপ্রবাহ নয়, এগুলো এ অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের প্রাণরসায়ন। এসব নদী তালিকাভুক্তির মধ্য দিয়েই সুন্দরবনকে তার প্রকৃত মর্যাদা দেওয়া সম্ভব। নদী না হলে সুন্দরবন শুধু নামেই থাকবে বন, প্রাণবৈচিত্র্যে নয়। সুতরাং রাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত জরিপ এখন সময়ের দাবি।




গ্রীষ্মকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি কি করবেন ?

বসন্ত শেষে বাংলায় শুরু হয়েছে গ্রীষ্মকাল। এই ঋতুতে তীব্র তাপপ্রবাহ, শুষ্ক আবহাওয়া ও হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত ঘাম, পানিশূন্যতা ও জীবাণুর বিস্তারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এই সময়ে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি ও তার প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
সর্দি-জ্বর
গ্রীষ্মকালে অনেকেই অতিরিক্ত গরমের পর হঠাৎ ঠান্ডা পানীয় পান বা এসিতে প্রবেশের কারণে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হন। এর প্রতিকার হিসেবে ভিটামিন সি ও জিংকযুক্ত খাবার গ্রহণ, গরম পানিতে লেবু বা স্যুপ পান করা ভালো। এছাড়া ঠাণ্ডা কোমল পানীয় এড়িয়ে চলা, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা ও ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়া উচিত।

ঘামাচি
প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঘামের ফলে ত্বকে ছোট ছোট র‍্যাশ উঠতে পারে, যা ঘামাচি নামে পরিচিত। সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা, সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান, পানিশূন্যতা রোধ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাতাস চলাচলযোগ্য ঘরে থাকার মাধ্যমে ঘামাচি প্রতিরোধ করা যায়। শিশুর ক্ষেত্রে ঘন ঘন পাশ পরিবর্তন করানো জরুরি। প্রয়োজনে অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধ ব্যবহার করা গেলেও তা বিশেষজ্ঞের পরামর্শেই গ্রহণ করা উচিত।
সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার
ঋতু পরিবর্তনের সময় মন ও শরীর উভয়ের ওপর প্রভাব পড়ে। এই সময়ে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ক্লান্তি ও ঘুমজনিত সমস্যার নাম সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার (SAD)। এ সমস্যা দূর করতে পছন্দের কাজ করা, নিয়মিত ব্যায়াম ও সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে মনের ভার হালকা রাখা সম্ভব। তবে তীব্রতা বেশি হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

হিট স্ট্রোক
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় থাকলে শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে হিট স্ট্রোক হতে পারে। এটি জীবনঘাতীও হতে পারে। তাই ঢিলেঢালা হালকা পোশাক পরিধান, ছাতা বা ক্যাপ ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। কেউ হিট স্ট্রোক করলে তাকে শীতল স্থানে নিয়ে গিয়ে শরীর ভেজানো, বরফ দেওয়া এবং দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি করণীয়।
ফুড পয়জনিং
এই সময় দ্রুত খাবার নষ্ট হয়ে ফুড পয়জনিংয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। বাসি, অস্বাস্থ্যকর বা জীবাণুযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে পেটব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি হতে পারে। তাই রান্নার আগে ভালোভাবে উপকরণ ধোয়া, খাবার ঢেকে রাখা, বিশুদ্ধ পানি পান এবং পরিষ্কার থালাবাসনে খাওয়া উচিত।

সতর্কতা ও সচেতনতাই পারে এই গরমে সুস্থ থাকতে সাহায্য করতে। নিয়ম মেনে চললেই অনেক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তাই এ সময়ে নিজে সচেতন হোন এবং অন্যদেরও সচেতন করুন।