সাম্প্রতিক দশকে সারা বিশ্বের জাদুঘরগুলোর সংগ্রহশালায় থাকা অনেক আদিবাসী শিল্পকর্ম ও সাংস্কৃতিক বস্তু অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে দর্শকদের চোখ থেকে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর আমেরিকার ইরোকোইস জাতির কাঠের মুখোশগুলো, কোস্ট স্যালিশদের তৈরি ধর্মীয় মুখোশ ও ঘণ্টাধ্বনি, কিংবা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ‘সিক্রেট/স্যাক্রেড’ বস্তুগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে সাধারণ প্রদর্শনী স্থান থেকে।এখন এসব সংগ্রহ মূলত সংরক্ষিত এলাকায় বা শুধু নির্দিষ্ট গোত্রের প্রভাবশালী সদস্যদের দেখার অনুমতিতেই সীমাবদ্ধ।
এই রকম পদক্ষেপগুলোর পেছনে মূল রাজনৈতিক যুক্তি হলো উপনিবেশবাদের উত্তরাধিকার চ্যালেঞ্জ করা এবং আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘর গবেষক জ্যানেট মার্স্টিন বলেন, জাদুঘরগুলোর উচিত ‘সোর্স কমিউনিটি’র সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। এখানে ‘সোের্স কমিউনিটি’ বলতে বোঝানো হয় সেই গোষ্ঠী বা জাতিগুলো যাদের ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক রয়েছে নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বস্তুগুলোর সঙ্গে। মার্স্টিন মনে করেন, ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা এবং প্রদর্শন কিভাবে হবে, সেটা নির্ধারণের অধিকার এই জনগোষ্ঠীগুলোরই থাকা উচিত।
গ্রিস বা তুরস্ক দাবি করছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে থাকা পার্থেননের মার্বেল ভাস্কর্য কিংবা হ্যালিকারনাসাসের সমাধিসৌধের ভাস্কর্যগুলো তাদের ঐতিহ্য। তেমনি উত্তর আমেরিকার আদিবাসী, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবোরিজিনাল, কিংবা কানাডার ফার্স্ট নেশন জনগণের মধ্য থেকেও অনেকেই দাবি তুলছেন-তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একমাত্র অধিকারী তারাই।
ওয়াশিংটন ডিসিতে ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত The National Museum of the American Indian (NMAI) এই ধারার একটি অন্যতম প্রতীক। জাদুঘরটি নিজেকে পরিচয়ভিত্তিক বা ‘আইডেন্টিটি মিউজিয়াম’ হিসেবে গড়ে তুলেছে। জাদুঘর নির্মাণ, সংগ্রহ নির্বাচন, প্রদর্শন এবং সংরক্ষণ-সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। একই ধারা অনুসরণ করে ১৯৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাউন্সিল অব মিউজিয়াম অ্যাসোসিয়েশনস ‘Continuous Cultures, Ongoing Responsibilities’ নীতিমালা অনুমোদন করে। যেখানে বলা হয়, আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে জাদুঘরগুলোকে সমান অংশীদারিত্বে কাজ করতে হবে।
এই উদ্যোগগুলোর পেছনে উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে সম্মানযোগ্য। ঔপনিবেশিক শাসন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। কিন্তু সমস্যাটি দেখা যায় যখন এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি একচোখা হয়ে ওঠে। যদি একটি জাদুঘর শুধুমাত্র ধনী শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের অনুমতি অনুসারে প্রদর্শনী নিয়ন্ত্রণ করত, তবে একটি ঘৃণিত বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে ব্যাপক প্রতিবাদ হতো। আজকের আইডেন্টিটি মিউজিয়ামগুলো ঠিক সেই ধাঁচেই, শুধু মাত্র ভিন্ন জাতিসত্তার প্রেক্ষাপটে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে-এই ধরণের একচেটিয়া ন্যারেটিভ কি সত্যিই সকল আদিবাসীর মতপ্রকাশকে প্রতিনিধিত্ব করে? কিংবা যাঁরা নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে চান, তাঁদের জন্য কী সুযোগ রয়েছে?
অনেক জাদুঘরে আজকাল আদিবাসীদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচারকে ‘সংবেদনশীল’ ঘোষণা করে সেই বিষয়গুলোকে জনসমক্ষে আনার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন নৃতাত্ত্বিক মাইকেল ব্রাউন উল্লেখ করেন, এর ফলে ঐতিহাসিক গবেষণা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। যেখানে এক সময় অনন্য আদিবাসী জীবনচর্চা ছিল বিস্ময়ের বিষয়, এখন তা একরকম ‘জেনেরিক স্পিরিচুয়ালিটি’-তে পর্যবসিত হয়েছে। এভাবে জাতিগত পরিচয়কে ঐতিহ্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করলে জ্ঞানচর্চার পরিসর সংকুচিত হয়। এমন এক ধারণা প্রতিষ্ঠা পায় যেখানে বাইরের কেউ কোন সংস্কৃতিকে বুঝতেই পারবে না, কারণ সে সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা তার নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি সংস্কৃতির মধ্যে দেয়াল তুলে দেয়, মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে, এমনকি শিল্পকর্ম ও দর্শকের মাঝেও ব্যবধান তৈরি করে।
নিউজিল্যান্ডের জাদুঘর Te Papa Tongarewa-এর সাবেক প্রধান নির্বাহী সেডন বেনিংটন বলেছিলেন, “পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি ও মাতাওরাঙ্গা মাওরি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে-বাকি পৃথিবী মাওরি জ্ঞান অনুধাবন করতে পারবে না।” অথচ সত্য ইতিহাস ও জ্ঞানের অনুসন্ধান কোনও নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মালিকানাধীন নয়। এটি সকল মানুষের অধিকার। প্রশ্ন করার, জানার ও ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার সার্বজনীন। সেই কারণে শুধুমাত্র ‘সাংস্কৃতিক অধিকার’ বা ‘উপজাতিগত মর্যাদা’র ভিত্তিতে জাদুঘরের দায়িত্ব নির্ধারণ না করেসমাজের সকল সদস্যের জন্য ঐতিহাসিক বস্তুর অর্থ ও অভিজ্ঞতা উন্মুক্ত করা জরুরি। শুধু এই পথেই আমরা ইতিহাসকে প্রশ্ন করতে পারব, অন্বেষণ করতে পারব, এবং সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে পারব।


