Home Blog Page 138

ভারত এখন বিএনপিকে কি চোখে দেখছে ?

২০২৪-র ৫ই অগাস্ট বাংলাদেশে যে নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটে গেছে, সেই ঘটনাপ্রবাহ বিএনপি-র সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে একটা বাঁকবদলের অবকাশ তৈরি করেছে নিঃসন্দেহে! দিল্লিতে রাজনীতি, নিরাপত্তা বা কূটনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ভারতের বিশেষ কয়েকটি ‘দাবি’ বা ‘প্রয়োজনে’ যদি বিএনপি ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে ভারতের দিক থেকেও বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে কোনও অসুবিধা থাকার কারণ নেই। যেহেতু কোণঠাসা আওয়ামী লীগের চট করে রাজনৈতিক কামব্যাকের কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এবং বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির ভালো ফল করার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা আছে-তাই খালেদা জিয়ার দলের সাথে সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজনীয়তা তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

ভারতের বিজেপি নেতারা পরিষ্কার বলছেন, বাংলাদেশে বিএনপি বা অন্য যে কোনও দলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্থাপনের মূল ভিত্তিটাই হবে ক্ষমতায় এলে তারা সে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারছেন কি না, সেটা। তারা মনে করেন-বাংলাদেশের সমস্ত হিন্দু যদি ভারতবর্ষে চলে আসতে বাধ্য হয়-তাহলে সেটা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পক্ষে কাঙ্ক্ষিত নয়। ভারতের সাউথ ব্লকে একটা বিশ্বাস আছে যে, বিএনপির ডিএনএ-তেই আছে ভারত বিরোধিতার রাজনীতি, আর দলটার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনেও এর একটা বড় ভূমিকা আছে। বিএনপি অবশ্য বলে থাকে বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা কখনোই তাদের নীতি ছিল না, তারা চায় ভারতের সঙ্গে একটি মর্যাদা ও সম্মানের সম্পর্ক।

এই অবস্থানকে যে নামেই ডাকা হোক, বিএনপি তাদের সেই পুরনো রাজনীতি থেকে এখন কতটা সরবে তা নিয়ে কিন্তু সন্দিহান দিল্লিতে অনেক পর্যবেক্ষক। ভারতের সাবেক আইপিএস কর্মকর্তা শান্তনু মুখার্জি বলেন-“ভারতের বিরুদ্ধে ওনারা বলবেনই…কেন না ওনাদের ধারণাতে ভারতকে যত ডিসক্রেডিট করা যাবে তত ওদের ভোটের পার্সেন্টেজটা বেড়ে যাবে!” কিন্তু ভোটের সময় বিএনপি যে রাজনীতিই করুক, নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এলে তাদের প্রতিবেশী ভারতকে নিয়ে অনেক ‘বাস্তববাদী’ মনোভাব নিতে হবে বলেই ভারতে অনেকে মনে করেন।

ভারতের দিক থেকে সম্পূর্ণ অন্য একটি কারণেও বিএনপি-র সঙ্গে দিল্লির এখন একটা সম্পর্ক স্থাপনের ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছে- কারণ দীর্ঘদিনের সঙ্গী জামায়াত-ই-ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব বাড়ছে। ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস বলছিলেন, “ডেফিনিটলি জামায়াত আর বিএনপির মতবিরোধগুলো এখন খুব স্পষ্ট। ওনাদের একজন বড় নেতা এটাও বলেছেন যে কোনও অ্যালায়েন্স হওয়া সম্ভব না। তো আমি নিশ্চিত যে, এই ডেভেলপমেন্টগুলো ভারত সরকার নিজেদের তরফ থেকে খুব সতর্কতার সঙ্গে দেখছে এবং অ্যাসেস করছে!” ভারতের কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকরা এখনও একান্ত আলোচনায় পরিষ্কারই বলছেন, আগামী দিনে বিএনপি-র সঙ্গে তাদের যে কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ‘শর্ত’ হতে হবে জামায়াতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সঙ্গ তাদের ত্যাগ করতেই হবে।

বিএনপি-র বিরুদ্ধে ভারতের সবচেয়ে বড় অভিযোগ –২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-র শাসনকালে আলফা-সহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে ঢালাও আশ্রয় দেয়া ও আলফার জন্য ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচারের চেষ্টা হয়েছিল। ভারতের পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সেভেন সিস্টার্সের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যদি ‘প্রশ্রয়’ না পায় কিংবা ধরা যাক চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুবিধা বহাল থাকে, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতেও ভারতের কোনও সমস্যা নেই!

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই হোক বা অন্য যে কোনও কারণেই হোক, ভারত কিন্তু এখন স্থির করেছে নির্বাচনের আগে অন্তত বাংলাদেশের বিশেষ কোনও দলের প্রতিই প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানানো হবে না, বা থাকলেও অন্তত সেটা প্রকাশ করা হবে না। এই মুহুর্তে ভারতের কৌশলটাই হলো- বাংলাদেশে যত তাড়াতাড়ি একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনে চাপ দেওয়া এবং তাতে যারাই জিতে ক্ষমতায় আসুক, তাদের সঙ্গে একটা ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ তৈরির পথ প্রস্তুত করে রাখা। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভারত যে বিএনপিকে ইতিমধ্যেই ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করেছে তাতেও কোনও ভুল নেই। এখন নির্বাচনে তারা কেমন ফল করে, ভারতের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের জায়গাগুলো কীভাবে অ্যাড্রেস করে, জামায়াত সম্বন্ধে কী মনোভাব নেয় – তার ওপরেই নির্ভর করছে এই নতুন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি।



বাঙালীর জিন অনন্য মিশ্রণ , আফ্রিকা , থ্যালাসেমিয়া ও অন্যান্য : কবীর চৌধুরী , গবেষক ও চিন্তাবিদ

বেশ ক’বছর আগে কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলার খরচ করে হিউম্যান জিনোম নিয়ে গবেষনা সম্পন্ন হয়। তারও কয়েক দশক পর বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে মানব জিনোম অ্যানালিসিস সহজলভ্য হয়ে মাত্র কয়েক শ’ ডলারে নেমে আসে। আমিও উৎসাহে নেমে পড়ি।23andme.com এ মুখের লালা পাঠিয়ে নিজের জিনোম অ্যানালিসিস করতে পাঠাই। এতে আমার মা এবং বাবার অংশের ভিন্ন ভিন্ন মাইগ্রেশন প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে – যা এই বাংলার জনগোষ্ঠীর জ্বিনগত গঠনের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। এর আগে ইথিওপিয়া নিয়ে পোস্টিং এ লিখেছিলাম আফ্রিকা মহাদেশের বাইরের অধিকাংশ মানুষের জ্বিনপুল ঐ এলাকার ছোট্ট একটি জনগোষ্ঠী থেকে এসেছে।
আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্স এর দুইবার মাইগ্রেশন হয়।

প্রথমবার প্রায় ১১০,০০০ বছর আগে, যেটা ইসরাইলে এসে শেষ হয়ে যায়। ৭৫,০০০ বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার তোরাবোেরা আগ্নেয়গিরিতে অগ্নুৎপাতের ফলে পুরো বিশ্ব কয়েক শতাব্দী অন্ধকারে ছিল। বিশ্বের জনসংখ্যা তখন কয়েক হাজারে নেমে আসে।দ্বিতীয় মাইগ্রেশন শুরু হয় তারও পরে, ৬৫,০০০ বছর আগে। বরফ যুগ তখন চরমে। প্রায় পুরো পৃথিবীটাই সাদা বরফে ঢাকা (একে Snow-Ball Earth বলা হয়ে থাকে)। আফ্রিকার কিছু অংশ এবং নিরক্ষ রেখার আশে পাশের কিছু অংশ ছাড়া। পানি প্রায় ৩০ মিটার নেমে যাওয়ায় ভূমধ্যসাগরের অংশবিশেষ তখন শুকনো।

সেই সময়, প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে আমার মায়ের এবং বাবার, দুই দিকেই ওরা বেরিয়ে আসে। মায়ের দিকের পূর্বপুরুষেরা আফ্রিকা থেকে প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে বের হয়ে সরাসরি ভারতে চলে আসে। ওদের আমরা দ্রাবিড় নামে চিনে থাকি। আর বাবার দিকে? আফ্রিকা থেকে বের হয়ে, ইউরোেপ-সাইবেরিয়া ঘুরে প্রায় ৬,০০০ বছর আগে আফগানিস্তানের ফাঁক গলে এই এলাকায় প্রবেশ করে।এদের আমরা আর্য বলে চিনে থাকি। বাংলায় আসার পথে পূর্ব এশিয়ার সাথেও কিছুটা মিলমিশ হয়। এই হচ্ছে বাঙালী। কানাডায় থাকার সময়, যদি বুঝতে পারতাম না কেউ একজন কোথাকার – তবে ধরে নিতাম সে বাংলাদেশের। অধিকাংশ সময়েই মিলে যেত।

আমাদের জিনগত গঠন ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক অবস্থানের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। আমাদের মধ্যে পশ্চিম ইউরেশীয় এবং পূর্ব ইউরেশীয় প্রভাব রয়েছে। পশ্চিম ইউরেশীয় অংশটি ইরানীয় মালভূমি এবং মেসোলিথিক শিকারী-সংগ্রাহকদের সাথে সম্পর্কিত এবং পূর্ব ইউরেশীয় প্রভাবটি তিব্বতি-বর্মী এবং খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত। বাংলার ইতিহাসে অনেকবার অনেক জাতির মাইগ্রেশন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটেছে। প্রাচীন কালে সিন্ধু সভ্যতা এবং পশ্চিমের স্টেপ হোর্ডারদের প্রভাব বাংলায় প্রবেশ করে (আমার বাবার দিককার)।

জেনেটিক মিক্স এবং এর ফলাফল
ক্রমাগত ইমিগ্রেশনের ফলে এই অঞ্চলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক মিক্সিং হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জেনেটিক ভেরিয়েশনের সমন্বয় ঘটেছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই জ্বিনগত দুর্বলতা দূর করতে সাহায্য করেছে। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব ইউরেশীয় এবং পশ্চিম ইউরেশীয় জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে বাংলার জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া তিব্বতি-বর্মী এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর সাথে মিশ্রণের ফলে বাংলার জনগণের জিনগত বৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। এই মিশ্রণ প্রক্রিয়া শুধুমাত্র জিনগত দুর্বলতাগুলি প্রশমিত করেনি বরং বাংলার জনগণের শারীরিক এবং জৈবিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে আরও উন্নত করেছে। এটি বাংলার সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের উপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

আমরা কেন ভারতীয় উপমহাদেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে কিছুটা হলেও ভিন্ন?
শুধুমাত্র আদি বাংলার মানুষের মধ্যে পুর্ব এশীয় জ্বিনগত প্রভাব ১০% বা তারও বেশী বলে ধারনা করা হয় – যা ভারতের অন্য কোন জনগোষ্ঠির মধ্যে নেই। এর দুইটি কারন প্রাচীনকালে তিব্বতি-বর্মী এবং অন্যান্য পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর মাইগ্রেশনের ফলে এই জ্বিনগত প্রভাব বাংলার জনগোষ্ঠীতে প্রবেশ করেছে। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সাংস্কৃতিক এবং জিনগত বিনিময়কে সহজ করেছে।

২০০২ সালে কানাডার ইমিগ্রেশনের অ্যাাপ্লাই করার সময় জানতে পারলাম আমার ছোট মেয়ের থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট আছে। মনে করলাম মা’র থেকে পেয়েছে। তারও প্রায় ১৫ বছর পরে আমার বাইপাস সার্জারীর সময় জানা গেল – আমিই ক্যারিয়ার। এখন এই থ্যালাসেমিয়া ট্রেইটের একটা হিস্ট্রি আছে। এই বদ্বীপ অঞ্চলে প্রতি বছরই বন্যা হোত। মশা এবং ম্যালেরিয়া, এবং ম্যালেরিয়ায় মহামারী নিত্য ঘটনা। ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য বাংলার জনগোষ্ঠীর জিনোমে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, গ্লুকোজ-৬-ফসফেট ডিহাইড্রোজেনেস (G6PD) এর অভাব ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করতে পারে।

ভিব্রিও কলেরা বাংলার জনগোষ্ঠীর জিনোমে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। কলেরা রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য বাংলার জনগোষ্ঠীর জিনগত অভিযোজন ঘটেছে। কলেরা প্রাদুর্ভাবের সময় বাংলার জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈচিত্র্য এবং অভিযোজন ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রক্তের গ্রুপ “ও” ব্যাক্তিরা কলেরা র প্রতি অন্য গ্রুপ গুলোর চাইতে অতি মাত্রায় সংবেদনশীল। ততোটা “এ”, “বি” এবং “এবি” গ্রুপের ব্যাক্তিরা নয়। রক্তের গ্রুপ “ও” -এর ব্যক্তিদের অন্ত্রের কোষে ভিব্রিও কলেরা ব্যাকটেরিয়ার টক্সিন বেশি সক্রিয়ভাবে কাজ করে, যার ফলে তারা কলেরার সংক্রমণে বেশি গুরুতর অসুস্থ হতে পারেন। পৃথিবীতে একমাত্র প্রাচীন বাংলা এবং পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে “A”. “B” – এই দুইটি গ্রুপের আবির্ভাব ও আধিক্য লক্ষ্যনীয়।

সব কথার শেষ কথা – প্রাচীন বাংলার জনগোষ্ঠী অর্থাৎ এই আমরা – আসলেই ইউনিক। হাজার হাজার বছরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাইগ্রেশন যেমন ইন্দো-আর্য্য, তিব্বতি-বর্মী, এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক, এবং এর সংগে ভৌগলিক বাস্তবতা, গত কয়েক হাজার বছরের ধর্মীয় সংস্কৃতি মিলে এই অনন্য বাঙালী জাতিগোষ্ঠী তৈরী করেছে। শুভ নববর্ষ।




দ্বিতীয় বছরের মতো শিল্পবাজারে মন্দা , ২০২৪ সালে বিক্রি কমেছে ১২%

বিশ্বব্যাপী শিল্প ও প্রাচীন সামগ্রীর বাজার টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সংকোচনের মুখে পড়েছে। আর্ট বাসেল ও ইউবিএস কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৪ সালের বার্ষিক ‘আর্ট মার্কেট রিপোর্ট অনুযায়ী, শিল্পবাজারে বিক্রির পরিমাণ ১২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে। এটি শিল্পবাজারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ধস, যা গত ১৫ বছরে তৃতীয় বৃহত্তম পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।প্রতিবেদনটির লেখক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর্টস ইকোনমিকসের প্রতিষ্ঠাতা ক্লেয়ার ম্যাকঅ্যান্ড্রু বলেন “সার্বিকভাবে শিল্পকর্মের বাজারে খুবই প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটি বছর ছিল ২০২৪ সাল।” তার ভাষায়, সংগ্রাহকদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে এবং নতুন শিল্পীদের প্রতি কৌতূহলের অভাব স্পষ্ট।

শিল্পবাজারে এ ধসের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং ক্রয়-অভ্যাসের পরিবর্তন-এই তিনটি প্রধান অনুঘটকের সম্মিলিত প্রভাবে বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ২০০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দায় যেমন বিক্রি কমেছিল ৩৬ শতাংশ এবং ২০২০ সালের কভিড-১৯ মহামারীতে কমেছিল ২২ শতাংশ, ২০২৪ সালের ১২ শতাংশ পতনও সেই ধরণেরই এক বড় ধাক্কা। বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই শিল্প ও পুরনো সামগ্রীর বিক্রির পরিমাণ কমেছে। চীনে পতনের হার সর্বোচ্চ-৩৩ শতাংশ। শিল্পবাজারের নেতৃত্বদানকারী যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি কমেছে ৯ শতাংশ। ফ্রান্স ও ইতালিতে ১০ শতাংশ করে এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৫ শতাংশ কমেছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যে পতনের হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র ৫ শতাংশ এবং দেশটি এখনও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পবাজার হিসেবে টিকে আছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সমকালীন শিল্প খাত ভয়াবহ ধাক্কা খেয়েছে। নিলামে এ খাতে বিক্রি কমেছে ৩৬ শতাংশ, যা ২০১৮ সালের পর সর্বনিম্ন। উচ্চমূল্যের শিল্পকর্মগুলোর বিক্রিতেও সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। একসময় যা ছিল বাজারের চালিকাশক্তি, সেটিই এখন ক্রেতাদের অনীহার কেন্দ্রবিন্দুতে। ক্লেয়ার ম্যাকঅ্যান্ড্রু বলেন, “এখন ক্রেতারা কেবল তাদের চেনা শিল্পীদের কাজেই আগ্রহী। নতুন কিছু জানার বা সংগ্রহের আগ্রহ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।” ফলে গ্যালারিগুলোও নির্ভর করছে মাত্র তিন-চার জন বিখ্যাত শিল্পীর ওপর, যাদের কাজ কিনতে ক্রেতারা আগ্রহী। শিল্পের জগতে একপ্রকার ‘বিভক্তি’ ও সংকীর্ণতা তৈরি হয়েছে।

তবে এ অন্ধকার চিত্রের মাঝেও কিছু আশার আলো রয়েছে। বড় মূল্যের শিল্পকর্মে বিক্রি কমলেও ছোট মূল্যের (৫০ হাজার ডলারের নিচে) শিল্পকর্মের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে। নিলামঘরগুলোর আয় কমেছে ২০ শতাংশ, তবে বিক্রির পরিমাণে কমেছে মাত্র ৪ শতাংশ, যা ইঙ্গিত করে-বেশি সংখ্যক ছোট লেনদেন হচ্ছে। একই প্রবণতা গ্যালারিগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। যেসব ডিলারের বার্ষিক টার্নওভার ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের নিচে, তাদের বিক্রি বেড়েছে ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে ১ কোটি ডলারের বেশি টার্নওভারযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমেছে ৯ শতাংশ। এর অর্থ-বাজারে ভারসাম্যপূর্ণ ও অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক এক ধারা জন্ম নিচ্ছে, যেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কিছুটা হলেও হ্রাস পাচ্ছে।

পরিবর্তনশীল সংগ্রাহক শ্রেণী ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-ধনকুবেরদের সম্পদ বেড়ে গেলেও তারা শিল্পকর্ম কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বরং তরুণ সংগ্রাহকদের মধ্যে চিত্রকর্ম কেনার প্রবণতা হ্রাস পাচ্ছে। অনেকেই এখন আধুনিক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শিল্পেই নির্ভরতা গড়ে তুলেছেন। কিন্তু এই সংগ্রাহকদের বয়স এখন ৬০ থেকে ৭০ বছর। ফলে আগামী দশকে শিল্পবাজারে এক বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এক ডিলার বলেন, “এখন অনেক ধনী মানুষ আছে যাদের শিল্পকর্ম কেনার অভিজ্ঞতা নেই। বিদ্যমান সংগ্রাহকদের ওপর নির্ভর না করে এই নতুন সম্ভাব্য শ্রেণীর কাছে কীভাবে পৌঁছানো যাবে, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ।”

সব নেতিবাচকতার মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক হলো নারী শিল্পীদের নতুন কাজ বাজারে আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করা হচ্ছে ।ম্যাকঅ্যান্ড্রর মতে, এটি “উৎসাহব্যঞ্জক প্রবণতা”। বাজারে বৈচিত্র্য আনতে নারী শিল্পীদের এ উত্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিল্পবাজারের ওঠানামা নতুন কিছু নয়। তবে বিগত এক দশকে বাজার ২০১৪ সালের শীর্ষ বিক্রির সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি শিল্প ও প্রাচীন সামগ্রীর বাজারে এক নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে, যেখানে শুধু মূল্য নয়, মানসিকতা, সংগ্রাহকদের ধরণ এবং বাজার কৌশল নিয়েও ভাবতে হচ্ছে।

অতএব শিল্পবাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে নতুন কোনো রেনেসাঁর সূচনা হবে নাকি ধীরে ধীরে আরও সংকোচন ঘটবে-তা সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, শিল্পবাজারের ভবিষ্যৎ গঠনে নতুন সংগ্রাহক শ্রেণী, উদীয়মান শিল্পী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।




যুদ্ধ বন্ধের দাবি সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর

গাজায় বন্দি জিম্মিদের মুক্তিকে অগ্রাধিকার প্রদান ও সেখানে যুদ্ধের অবসানের দাবিতে নেতানিয়াহু সরকারকে চিঠি দিয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান এহুদ বারাকসহ ১ হাজার ৫২৫ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা ও সদস্য।এহুদ বারাক ২০০৭ সালের জুন থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার আগে ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন সেনাপ্রধান।এহুদ বারাকের পাশাপাশি চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর সাবেক সেন্ট্রাল কমান্ডার চিফ আমরাম মিৎজনা, সাবেক চিফ অব স্টাফ ড্যান হালুজ, সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান আমোস মাল্কা, সাবেক সেন্ট্রাল কমান্ড অভি মিজরাহি এবং ১৪ তম আর্মোর্ড ব্রিগেডের কমান্ডার আমনন রিফের নাম উল্লেখযোগ্য।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে যারা বর্তমানে চাকরিরত আছেন, তাদের প্রায় সবাই বাহিনীর ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান ইউনিটের। এই স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে জেনারেল থেকে শুরু করে সাধারণ পদাতিক-সব পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তা ও সদস্য রয়েছেন।চিঠিতে সরকারের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ‘গাজায় অবশিষ্ট জিম্মিদের জীবন রক্ষা ও তাদের মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিন। এমনকি যদি তাদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ থামানোর প্রয়োজন হয়, তবে তা-ই করুন।’জিম্মিদের মুক্তির দাবি দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে ইসরায়েলে। দেশটির জাতীয় দৈনিক মারিভের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তাসংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে এ পর্যন্ত সরকারের কাছে ১০টি চিঠি জমা পড়েছে। এসব চিঠির মধ্যে দু’-তিনটি বাদে বাকি সবই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের।

চিঠির প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, সাক্ষরকারীদের মধ্যে যারা বর্তমানে চাকরিরত আছেন, তাদের বরখাস্ত করা হবে।এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল কয়েকদিন আগে। ইসরাইলি বিমানবাহিনীর ১০০০ সাবেক সদস্যের একটি খোলা চিঠি দিয়ে। এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, যারা যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করে এবং আমাদের শত্রুদের শক্তিশালী করে, তারা ক্ষমার অযোগ্য। তিনি চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সেনাসদস্যদের ‘প্রান্তিক’ ও ‘চরমপন্থী’ বলেও মন্তব্য করেন।এরপর তাদের সেই দাবিতে সমর্থন জানালেন ২৫০ জনের বেশি সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মী। এদের মধ্যে আছেন গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান ড্যানি ইয়াতোম, এফ্রায়িম হালেভি ও তামির পারদো।

এদিকে গাজা যুদ্ধ বন্ধ করে বন্দিদের ফিরিয়ে আনার আহ্বানে তাদের সঙ্গে শামিল হয়েছেন ইসরাইলের ২০০ সামরিক চিকিৎসক ও ১০০০ শিক্ষাবিদ। দেশটির চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে, রোববার প্রকাশিত একটি পিটিশনে তারা যুদ্ধ থামানোর দাবি জানান। তাদের মতে, যুদ্ধ এখন আর নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থে চালানো হচ্ছে। গত কয়েক দিনে অন্তত ৬টি পিটিশন প্রকাশিত হয়েছে।

পৃথিবী কি সমতল ? কারা এখনও বিশ্বাস করে ?

সমতল পৃথিবী তত্ত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত সত্যের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়াশীল বিশ্বাসব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি বহু শতাব্দী পূর্বেই প্রমাণিত, তথাপি সমসাময়িক সময়ে এই তত্ত্বের প্রতি আকৃষ্ট একটি সম্প্রদায়ের উত্থান ইঙ্গিত করে যে, এই বিশ্বাসের উৎস কেবল অজ্ঞতা নয়, বরং একটি জটিল সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল।

প্রাচীন সভ্যতায় পৃথিবী সমতল এমন বিশ্বাস ছিল। ব্যাবিলনীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতায় পৃথিবীকে একটি সমতল ডিস্ক হিসেবে কল্পনা করা হত। গ্রীক দার্শনিক পিথাগোরাস ও এরিস্টটল যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবীর গোলাকারত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্যযুগে ইসলামি দার্শনিক আল-বিরুনী ও আল-খাজিনিও একই ধারণাকে জ্যোতির্বিদ্যাগত ও গণিতভিত্তিক পন্থায় বর্ণনা করেন।

১৮শ শতাব্দীতে আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা ও নৌচলাচলের পরিপ্রেক্ষিতে গোলাকার পৃথিবীর ধারণা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯ শতকে Samuel Rowbotham-এর ‘Zetetic Astronomy’ শিরোনামে রচিত পুস্তকে পুনরায় সমতল পৃথিবীর পক্ষে যুক্তি প্রদর্শনের প্রয়াস দেখা যায়, যা পরবর্তীকালে ‘International Flat Earth Research Society’ (১৯৫৬) গঠনের মাধ্যমে একটি আধুনিক ষড়যন্ত্রমূলক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।

সমতল পৃথিবী তত্ত্ব একটি বিকল্প জ্ঞান কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করে। Michael Barkun (২০০৩) তার ‘Culture of Conspiracy’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এই ধরনের তত্ত্ব ‘stigmatized knowledge’-এর মাধ্যমে মূলধারার জ্ঞান কাঠামোকে অস্বীকার করে। এই জ্ঞানবিরোধী প্রতিক্রিয়া কেবল তথ্যগত বিভ্রান্তির ফসল নয়, এটি আধুনিকতার বিরুদ্ধে একধরনের মনোভাবগত প্রতিরোধও। Harambam ও Aupers (২০১৭) দেখিয়েছেন, এই বিশ্বাস কাঠামো মূলত আধিপত্যশীল বৈজ্ঞানিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ যেখানে ব্যক্তি অভিজ্ঞতা, দৃশ্যমানতা ও অনুভবকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চেয়ে অধিক সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসমূহের অ্যালগরিদমিক কাঠামো সমতল পৃথিবী তত্ত্বের বিস্তারে এক অনুঘটকের কাজ করেছে। Landrum, Olshansky ও Richards (২০১৯) প্রমাণ করেছেন, ইউটিউবের রিকমেন্ডেশন সিস্টেম ব্যবহারকারীদের একটি পরস্পর-বিচ্ছিন্ন তথ্যজগতে বন্দী করে, যেখানে বিকল্প ও ষড়যন্ত্রমূলক তথ্যসমূহ ক্রমাগত প্রাধান্য পায়। এই ‘filter bubble’ ব্যক্তি-মানসে একটি বিভ্রমময় বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে সমতল পৃথিবী শুধু একটি তত্ত্ব নয়, বরং একটি সামাজিক পরিচয় ও মানসিক আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।

Imhoff ও Lamberty (২০১৭) মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখান, ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা অধিকাংশ সময়েই নিজস্ব নিরাপত্তাহীনতা, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং অস্তিত্বগত শূন্যতার মুখোমুখি হন। এই সংকটে, তারা এমন একটি বিকল্প বাস্তবতায় আশ্রয় নেন যেখানে তারা ‘জাগ্রত’-অর্থাৎ, তথাকথিত ‘ঘুমন্ত’ মূলধারার সমাজের চেয়ে অধিক সচেতন। এই ‘gnostic’ অবস্থান তাদেরকে দেয় জ্ঞানের এক বিপরীতমুখী অভিজ্ঞান। সমতল পৃথিবী তত্ত্বের পুনরুৎপাদন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার যুক্তি ও অনুসন্ধানচর্চার দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে। পাঠ্যক্রমে যখন বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা ও দর্শনচর্চার পরিসর সংকুচিত হয়, তখন শিক্ষার্থীরা কেবল তথ্য মুখস্থ করে কিন্তু প্রশ্ন করতে শেখে না। ফলে, বিকল্প ও ষড়যন্ত্রমূলক বিশ্বাসভিত্তিক তত্ত্বের প্রতি তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। এ থেকে উত্তরণে প্রয়োজন আন্তঃবিষয়ক (interdisciplinary) ও দার্শনিক সংলাপভিত্তিক শিক্ষা।

সমতল পৃথিবী তত্ত্ব একটি পৌরাণিক জ্ঞান কাঠামোর পুনরুত্থান নয়; এটি আধুনিক সমাজের জ্ঞান-রাজনীতির, প্রযুক্তি-নির্মিত বাস্তবতার ও মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতার এক জটিল আন্তঃসম্পর্কীয় উপসহাপন। এটি সমাজের প্রান্তিক চেতনা, আধিপত্যবিরোধী প্রবণতা, এবং এক ধরনের অস্তিত্বগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং, এই তত্ত্বকে কেবল হাস্যকর বা বিভ্রান্তিমূলক হিসেবে প্রত্যাখ্যান না করে, সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে তার বিশ্লেষণ জরুরি।








মাইগ্রেনের ব্যথা কমাবে যেসব খাবার

মাইগ্রেন একটি প্রচলিত সমস্যা যা অনেক মানুষের জীবনে নিত্যদিন ব্যথা ও অসুবিধা সৃষ্টি করে। মাইগ্রেনের তীব্র ব্যথা বমি, আলো ও শব্দের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে কিছু খাবার ও পানীয় মাইগ্রেনের আক্রমণ কমাতে বা প্রতিরোধ করতে সহায়ক হতে পারে। প্রথমেই ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের কথা বলা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ম্যাগনেসিয়ামের অভাব মাইগ্রেনের কারণ হতে পারে। তাই ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন স্পিনাচ, বাদাম, ডাল, এবং কলা মাইগ্রেন কমাতে সহায়তা করতে পারে। দ্বিতীয়ত ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবারও মাইগ্রেনের আক্রমণ কমাতে সহায়ক। স্যামন, সার্ডিন, ফ্ল্যাক্স সিড এবং চিয়া সিডে প্রচুর ওমেগা-৩ থাকে যা প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে। এর ফলে মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং মাইগ্রেনের তীব্রতা কমে যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভিটামিন বি২ (রিবোফ্লাভিন)। এটি মস্তিষ্কের কোষের শক্তির উত্পাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং মাইগ্রেনের উপসর্গ কমাতে সহায়তা করে। ভিটামিন বি২ সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে দুধ, ডিম, এবং গরুর মাংস। হাইড্রেশন বা জলপানও মাইগ্রেনের প্রতিরোধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মাইগ্রেনের কারণ হতে পারে শরীরে পানির অভাব। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করা মাইগ্রেন কমাতে সাহায্য করতে পারে। তাছাড়া ক্যামোমিল চা ও পিপারমিন্ট চাও মাইগ্রেন কমাতে সহায়ক হতে পারে, এগুলোর মধ্যে রয়েছে শিথিলকরণকারী উপাদান যা মস্তিষ্ককে শান্ত করতে সহায়তা করে। এছাড়া সবুজ শাকসবজি যেমন পালংশাক, ব্রোকলি এবং কিপনারি প্রভৃতি খাওয়ার মাধ্যমে শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বাড়ানো যায়, এগুলো মাইগ্রেনের আক্রমণ হ্রাসে সহায়ক।

মাইগ্রেনের আক্রমণ কমানোর জন্য কিছু খাবারের সাথে সাথে প্রচুর ফলমূল যেমন কমলা, আপেল, আনারস, এবং তরমুজ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই ফলগুলিতে থাকা ভিটামিন সি এবং জলীয় উপাদান মাইগ্রেনের উপসর্গ হ্রাসে সাহায্য করে। মাইগ্রেন প্রতিরোধে ক্যাফেইন ও আলকোহল পুরোপুরি পরিহার করা গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন মাইগ্রেনের সমস্যা কমাতে কার্যকর হতে পারে।

ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে মিত্রদের হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ?

বর্তমানে চীনের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে আছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে জেতানো যাবে, ট্রাম্প নিজেও তা জানেন না। ট্রাম্পের হুমকি-ধামকির কাছে নতি স্বীকার করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না চীনের মধ্যে। ট্রাম্প প্রশাসন তাই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওপর চাপ প্রয়োগের উপায় খুঁজতে মরিয়া হয়ে পড়েছে। এর একটি উপায় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তি ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এভাবে বাজারে প্রবেশাধিকার, মেধাস্বত্ব চুরি, শিল্পখাতে গোয়েন্দাবৃত্তিসহ বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো নিরসনের পথে যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই কৌশল ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এ সপ্তাহে ফক্স বিজনেসকে বলেন, ‘জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, এমনকি ভিয়েতনামও শিগগির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শুরু করবে। সবাই এখন আলোচনার টেবিলে আসছে। চীন কার্যত ঘেরাও হয়ে গেছে।’ বেসেন্টের মতে, এসব আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হবে বাণিজ্যখাতে কীভাবে ‘চীনের ভারসাম্যহীনতা’ ভেস্তে দেওয়া যায়। ‘সেটাই হবে বড় জয়,’ বলেন বেসেন্ট। শুক্রবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটকে প্রশ্ন করা হয়, ট্রাম্প যেভাবে বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সবার সঙ্গেই একইরকম আচরণ করে যাচ্ছেন, এ অবস্থায় মিত্র দেশগুলো কেন চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করবে?

জবাবে তিনি বলেন, ‘এই প্রশ্ন আমাদের মিত্রদের করুন। তারা তো আমাদের ফোন করেই যাচ্ছে। তারা পরিষ্কার করে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে চায়। আমাদের বাজার, আমাদের ভোক্তাদের ছাড়া চলতে পারবে না তারা।’ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জোটকে দুর্বল করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ট্রাম্প। এই সপ্তাহেও একাধিকবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সমালোচনা করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘ইইউ গঠিত হয়েছিল মূলত বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য।’ এই ইউরোপবিদ্বেষ তার প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও আছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন ও ইয়েমেনে বিমান হামলা সংক্রান্ত আলোচনায় ইউরোপের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

উত্তর আমেরিকায় একটি বাণিজ্যিক জোট করে চীনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলাটা দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে বারবার কানাডা দখলের হুমকি দিয়েছেন, মেক্সিকোর ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করে সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ করেছেন। মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের এমন আচরণ এবারই প্রথম না। ২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের দিনেই ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন তিনি। এই জোটে মেক্সিকো, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্ররাষ্ট্র ছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারকে যুক্ত করার জন্য পরিকল্পিত ট্রান্সআটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপও বাতিল করেছেন ট্রাম্প।

ওবামা প্রশাসনের অধীনে কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেসন ফারম্যান বৃহস্পতিবার সিএনএনকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এমন এক দেশ হয়ে উঠেছে যাকে বিশ্বের কোনো দেশই আর বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার মনে করে না। এই বিশ্বাসযোগ্যতা আবার ফিরে আসবে কি না-তা আমি জানি না।’



ওমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক ‘সংকট সমাধানে এক ধাপ অগ্রগতি’

ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওমানের রাজধানী মাসকটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফা বৈঠক ‘ইতিবাচক’ ও ‘গঠনমূলক’ হয়েছে বলে জানিয়েছে দুই পক্ষই। ওমানের অনুষ্ঠিত আড়াইঘণ্টার বৈঠকে আরাগচি ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে আলোচনার নেতৃত্ব দেন ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ। ২০১৮ সালের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। শনিবারে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই পক্ষই আবার আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের প্রথম এই বৈঠক শান্ত ও ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ফলপ্রসূ হয়েছে। আরাকচি জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পমেয়াদে একটি চুক্তি চায়। ‘আমরা কেবল আলোচনার জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে চাই না’, বলেন তিনি।

বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। অত্যন্ত জটিল বিষয়গুলোতে দুপক্ষেরই স্বার্থ সমুন্নত রাখতে বৈঠকে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন উইটকফ। সংকট সমাধানে এক ধাপ এগোলাম আমরা। ইরান জোর দিয়ে বলেছে, এই আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু হবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে দেশটির সামরিক সক্ষমতা বা মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রতিরক্ষা বলয় নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। বিবিসি জানায়, দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে আলাদা আলাদা কক্ষে বসে আলোচনা হয়েছে। দুই প্রতিনিধি দলের কাছে একে অপরের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি।

যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই ওমানে ইরানের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনা চেয়ে আসছিল। তবে ইরান বরাবরই পরোক্ষ আলোচনার পক্ষে ছিল। বৈঠক শুরুর আগে প্রাথমিকভাবে আরাগচি এবং উইটকফ কেবল কয়েক মিনিট ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদরের উপস্থিতিতে সরাসরি কথা বলেছিলেন। পরে বৈঠকটি আলাদা কক্ষে বসে হয়। ইরানের কট্টরপন্থিদের চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক এড়িয়ে গেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি। এমনকি বৈঠকের কোনও ছবিও তোলা হয়নি। কোনো চুক্তি না হলে ইরানে বোমা মারার হুমকি আগেই দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এর পাল্টায় ইরান সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হয়েছে। এদিকে, বৈঠকের পরও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেছেন, ‘আমি চাই, ইরান একটা অসাধারণ এবং সুখী দেশে পরিণত হোক। কিন্তু তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না। আমি সেটা কোনোভাবেই চাই না।’



অ্যাপল কেন চীনের বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না

আইফোনের সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত চীনের বিকল্প হিসেবে উপযুক্ত কোনো দেশ খুঁজে পায়নি অ্যাপল। উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীনের দক্ষ জনশক্তি, সুসংগঠিত অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অ্যাপলকে দেশটির ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য করেছে। এমন বাস্তবতায় সম্প্রতি কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য, বিশেষ করে স্মার্টফোন ও কম্পিউটারে নতুন করে আরোপিত শুল্ক অব্যাহতি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশনের এক ঘোষণায় জানানো হয়, এসব পণ্য ট্রাম্পের ঘোষিত বৈশ্বিক ১০% এবং চীনের ওপর আরোপিত ১২৫% শুল্ক থেকে মুক্ত থাকবে। এই অব্যাহতির ফলে অ্যাপলের ওপর আপাতত চাপ কিছুটা কমলেও, দীর্ঘ মেয়াদে চীনের বিকল্প খোঁজার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে।

চীনের শিল্প অবকাঠামো অতুলনীয়। শেনজেন ও ঝেংঝোর মতো শহরে বিশাল কারখানা (যেমন: ফক্সকনের ‘আইফোন সিটি’) রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর কয়েক শ মিলিয়ন ডিভাইস উৎপাদন করা যায়। এই ব্যবস্থায় হাজার হাজার বিশেষায়িত সরবরাহকারী রয়েছে, যারা ডিসপ্লে, ব্যাটারি, সেন্সর ইত্যাদি সরবরাহ করে এবং এরা সবাই একে অপরের কাছাকাছি অবস্থিত। আইফোন লঞ্চের সময় ও দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষমতা চীনের বিশাল দক্ষ শ্রমিক এবং দক্ষ লজিস্টিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে। অন্য কোনো দেশ এই দক্ষতা ও গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না।

চীনে মজুরি বেড়েছে। ২০২৪ সালে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় ৫-১০ ডলার মজুরি দিতে হতো, যা এক দশক আগে ১-২ ডলার ছিল। তবে এরপরও উৎপাদন খরচ ভারত, ভিয়েতনাম বা মেক্সিকোর তুলনায় কম। এর কারণ হলো-চীনে বড় পরিসরে উৎপাদনে খরচ কম পড়ে এবং দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার ফলে সরবরাহকারীদের সঙ্গে অ্যাপলের ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে চীন সরকার নানা ধরনের সুবিধা দেয়। যেমন: কর ছাড় ও সস্তা জমি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে চীনের শ্রমিকেরা নির্ভুলভাবে পণ্য উৎপাদন করে থাকে, যা অ্যাপলের জটিল পণ্য তৈরির জন্য অপরিহার্য। এই অভিজ্ঞতা তাদের দ্রুত সমস্যা সমাধান এবং কম ত্রুটিযুক্ত পণ্য উৎপাদন করতে সাহায্য করে।

চীন থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলে চীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে, যা অ্যাপলের বিশাল বাজার (২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বিক্রয়ের মধ্যে চীনে ২০% বা প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার) ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই অ্যাপলের কৌশল হলো-ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য আনা। ভারত এখন আইফোনের ১০-১৫% উৎপাদন করে (২০১৮ সালে যা ছিল ১%)। ভিয়েতনামে এয়ারপড এবং কিছু ম্যাকবুক তৈরি হয়, আর থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া ছোট ছোট উপাদান উৎপাদন করছে। তবে চীন এখনো আইফোন উৎপাদনের প্রায় ৮০% নিয়ন্ত্রণ করে। অ্যাপলের সিইও টিম কুক ২০১৭ সালে ফরচুনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘চীনে উৎপাদনের জন্য একটি অবিশ্বাস্য ব্যবস্থা রয়েছে। এটি শুধু খরচ নয়; দক্ষতা এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের সক্ষমতার বিষয়। এটি টুল, নির্ভুলতা, পেশাগত দক্ষতার একটি অনন্য সমন্বয়।’

অ্যাপল চীনের বিকল্প খুঁজে পায়নি কারণ কোনো একক দেশ উৎপাদন ক্ষমতার তিনটি মূল উপাদান-পরিসর, দক্ষতা এবং গতি একসঙ্গে অর্জন করতে পারছে না। বৈচিত্র্যকরণ একটি ধীর এবং ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া, এবং চীনে দশকব্যাপী গড়ে ওঠা অ্যাপলের সরবরাহ চেইনের আধিপত্য ভূ-রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত থাকবে।





বিশ্বজুড়ে AI চিপ উৎপাদনে চার গুণ বেশি কার্বন নিঃসরণ

বিশ্বের প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত চিপ উৎপাদন একটি নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে এআই চিপ উৎপাদন। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, এসব চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন পরিবেশে ব্যাপক পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ ঘটাচ্ছে, যা বৈশ্বিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রিনপিসের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে এআই চিপ উৎপাদনে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় চার গুণ বেড়ে গেছে। এই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) এবং মেমোরি ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয় এবং এর অধিকাংশ উৎপাদন দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানে হয়ে থাকে। এই দেশগুলোর বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, ফলে এখানকার উৎপাদন কার্যক্রম বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তির বিকাশের ফলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে। গ্রিনপিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই খাতে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুতের চাহিদা ১৭০ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এই চাহিদার বৃদ্ধি বিশেষ করে ডাটা সেন্টারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, যেগুলো প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে। এই ডাটা সেন্টারগুলোতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সাধারণত জীবাশ্ম জ্বালানির উৎস থেকে আসে, যা পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ান নতুন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছে। যদিও এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, তবে এর ফলে পরিবেশে আরও বেশি কার্বন নিঃসরণ হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া সম্প্রতি চার গিগাওয়াট গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা পরিবেশগত ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে এআই-নির্ভর ডাটা সেন্টারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্বিগুণ বেড়ে যেতে পারে। আইইএর বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তির বৃদ্ধি এবং ডাটা সেন্টারের বিদ্যুৎ খরচের কারণে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, সিমেন্ট বা রাসায়নিক উৎপাদনের মতো ভারী শিল্পের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎ খরচকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে এআই খাতের বিদ্যুৎ চাহিদা। গ্রিনপিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডাটা সেন্টারগুলো থেকে বিদ্যুতের চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা হতে পারে, যা জাপানের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও বেশি।

একদিকে যেমন এআই প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসছে, তেমনি এটি পরিবেশের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে, যা ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এআই প্রযুক্তির সমর্থকদের দাবি, প্রযুক্তিটি বৈজ্ঞানিক উ দ্ভাবন ত্বরান্বিত করবে এবং বিশেষভাবে ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তিতে উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করবে। তাদের মতে, একসময় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি সংকট কমে আসবে। তবে বিশেষজ্ঞরা এখনও এ সম্ভাবনা অনিশ্চিত মনে করেন, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার পরিবেশগত প্রভাব বাড়াতে পারে।

মরগান স্ট্যানলির একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, চলতি দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাপী ডাটা সেন্টারগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে প্রায় ২৫০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হবে। এটি একটি বড় পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ, যা পরিবেশের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলবে। বিশেষত ডাটা সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচারের কারণে এই নিঃসরণ বৃদ্ধি পাবে।