Home Blog Page 135

নতুন নীতিতে চাপে বাংলাদেশি অভিবাসীরা , ইউরোপে আশ্রয় পাওয়া হবে আরও কঠিন

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি সাতটি দেশকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে গৃহীত অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তির কিছু দিক ২০২৬ সালের পরিবর্তে আগেই কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেই লক্ষ্যে এখন ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে এই তালিকাভুক্ত সাতটি দেশের মধ্যে কসোভো, কলম্বিয়া, মিশর, ভারত, মরক্কো এবং তিউনিশিয়ার পাশাপাশি রয়েছে বাংলাদেশ।

এই নতুন নীতির মূল লক্ষ্য হলো যেসব দেশের আবেদনকারীদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, সেসব আবেদন তিন মাসের মধ্যে দ্রুত নিষ্পত্তি করা। ইউরোপীয় কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক ও অভিবাসন কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার জানান, “যেখানে আমরা দ্রুত এগোতে পারি, সেখানে আরও দ্রুত এগিয়ে যাওয়া উচিত। অনেক সদস্য রাষ্ট্রে আশ্রয় আবেদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আটকে রয়েছে, ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে দ্রুততার প্রয়োজন বোধ করছি।” ইইউ-র এই উদ্যোগের মূল কারণ হলো অভিবাসনের বর্তমান বাস্তবতা। ২০১৫-১৬ সালে ইউরোপে অভিবাসীর ঢল নেমেছিল। এরপর থেকেই অভিবাসন নীতিতে সংস্কার আনার উদ্যোগ চলছিল। ২০২৩ সালেও ৩ লাখ ৮০ হাজার অবৈধ অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করেছে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপের প্রবণতা বাড়ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৪৩ হাজার ২৩৬ জন বাংলাদেশি আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন এবং ৪৭ হাজার ৭৭৮টি আবেদন তখনও ঝুলে ছিল। কিন্তু বাংলাদেশি আবেদনকারীদের মাত্র ৩.৯৪ শতাংশ সফল হয়েছেন। বাকি ৯৬.০৬ শতাংশের আবেদন নাকচ হয়েছে। এই নিম্ন সাফল্যের হারই ইইউ’র নতুন ‘দ্রুত প্রক্রিয়া’ নীতির মূল ভিত্তি। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে যাওয়া অভিবাসীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে যাচ্ছে। ‘নিরাপদ দেশ’ ঘোষণার ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো আর বাংলাদেশি আবেদনকারীদের নিরাপত্তার যুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে না। ফলে অনেক প্রকৃত নিরাপত্তা সংকটে থাকা ব্যক্তি ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও আশ্রয় পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

বিশ্লেষক শরীফুল হাসান মনে করেন, “আগে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গণজাগরণ মঞ্চের সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে যারা ইউরোপে আশ্রয় চেয়েছিল, তাদের আবেদনকে যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ আবেদনকারী অর্থনৈতিক অভিবাসী, যাদের কারণ ইইউ গ্রহণ করছে না।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা করায় এখন প্রকৃত সংকটে পড়া ব্যক্তিদেরও আশ্রয় পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।”

মরক্কো, তিউনিসিয়া, মিশরের মতো দেশ থেকে ইউরোপে অবৈধভাবে আসা অভিবাসীদের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসা বাংলাদেশিদের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই পথ ব্যবহারকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা ছিলেন শীর্ষে। আগে এদের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতো, ফলে অনেকেই সেই সময়টুকু কাজে লাগিয়ে ইউরোপে কর্মসংস্থানে যুক্ত হতেন। এখন ‘দ্রুত নিষ্পত্তি’র নিয়মে এই সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসবে।

ইতালির ডানপন্থি সরকার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই সিদ্ধান্তকে রোমের জন্য “সাফল্য” বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এর আগে একই দেশ মিশরীয় ও বাংলাদেশি নাগরিকদের আলবেনিয়ার বন্দিশালায় পাঠানোর চেষ্টা করেছিল, যা ইউরোপীয় বিচার আদালত আটকে দেয়। আদালতের ভাষ্য ছিল—যদি কোনো দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চল বা গোষ্ঠী নিরাপদ না হয়, তবে সেই দেশকে পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাবে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সাতটি দেশের মধ্যে এমন অনেক দেশ রয়েছে, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার প্রমাণ রয়েছে। ‘ইউরোমেড রাইটস’ নামের একটি সংগঠন সতর্ক করে বলেছে, এই তালিকা বিভ্রান্তিকর ও বিপজ্জনক হতে পারে। যদিও ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্ট করে বলেছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে বিবেচনা করতেই হবে।

এই ‘নিরাপদ দেশের তালিকা’ একটি গতিশীল তালিকা, যা সময়ের সাথে পরিবর্তনযোগ্য। কোনো দেশে যদি মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তাহলে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। তবে এখনই বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ থেকে আসা অধিকাংশ আশ্রয়প্রার্থী রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে নয়, বরং অর্থনৈতিক কারণে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন। এই সিদ্ধান্ত শুধুই অভিবাসনের আইনি কাঠামো নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত আছে বৈশ্বিক রাজনীতি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একদিকে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ চাপে এই নীতি গ্রহণ করা হলেও, অন্যদিকে এটি বিশ্বব্যাপী অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য একটি বড় বার্তা বহন করে—তাদের দেশে বাস্তব সংকট না থাকলে আর ‘নিরাপদ আশ্রয়’ মিলবে না।

সামগ্রিকভাবে ইইউ’র নতুন অভিবাসন নীতির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যেমন দ্রুততর হতে যাচ্ছে, তেমনই সংকুচিত হচ্ছে দরজা—বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা সত্যি সংকটে থাকা সত্ত্বেও এখন ‘নিরাপদ দেশের’ নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। বাংলাদেশের অভিবাসন প্রেক্ষাপটের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। এখন প্রয়োজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বাস্তবতা সম্পর্কে নীতি নির্ধারণ, সচেতনতা ও মানবাধিকার বিবেচনায় যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ।

নির্বাচনের সময় নির্ভর করছে সংস্কার , বিচার ও কিছু পদক্ষেপের ওপর : আসিফ নজরুল

বুধবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএনপির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন – ‘আজকে আলোচনায় আমরা কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করেছি। একটা হচ্ছে ডিসেম্বর থেকে জুন, মানে আমরা যে ইচ্ছে করে দেরি করে মে বা জুন মাসে নির্বাচন করব, সেটা না। ডিসেম্বর থেকে জুন মানে হচ্ছে, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে । জানতে চেয়েছেন যে, সংস্কার যদি হয়ে যায় এত দেরি করার মানে কী। তখন আমরা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছি, জুলাই চার্টার প্রণীত হলেও যে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা, নীতিগত ব্যবস্থা সেগুলো গ্রহণ করতে মাঝে মাঝে সময় লাগে। যেমন: একটা উদাহরণ দিয়ে বলেছি যে, ডিজিটাল সুরক্ষা আইন আমরা ২৩ বার ড্রাফট করেছি বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার জন্য।

আরেকটা বিষয় আমরা বলেছি যে, আমাদের কাছে জনগণের তো একটা আকাঙ্ক্ষা আছে, যেন আমরা বিচার করে যাই। বাংলাদেশে হাজারের বেশি তরুণ জীবন দিয়েছে, আর প্রায় ৫০-৬০ হাজার মানুষ শারীরিকভাবে পারমানেন্টলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চোখ হারিয়েছে। তাদের যে বিচারের দাবি এটা তো এই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা। সেক্ষেত্রে আমরা যদি কোনো বিচার না করে যাই, কোনো বিচার না করে যদি নির্বাচন দেই, মানুষের কাছে নিজের কাছে জবাব দেবো কীভাবে। ফলে নির্বাচনের বিষয়টা সংস্কার, বিচার ও আমাদের সরকারের গৃহীত কিছু পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। এজন্যই ডিসেম্বর থেকে জুন টাইমলাইনটা বলা হয়। কিন্তু আমরা ক্যাটাগরিকালি বলেছি যে, এটা কোনোভাবেই জুনের বেশি যাবে না। যে যে কথাই বলুক না কেন, এটা প্রধান উপদেষ্টার অঙ্গীকার। নম্বর থ্রি হচ্ছে, যতটা সম্ভব সংস্কার আমরা করে যেতে চাই। এই হচ্ছে আমাদের বক্তব্য।’

মস্তিষ্ক কীভাবে ভয়ের উপর জয় লাভ করে ?

0

ভয় আমাদের টিকে থাকার প্রবৃত্তির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি মৌলিক মানবিক আবেগ। এটি এমন প্রতিক্রিয়া উদ্দীপিত করে যা আমাদের বিপদের মুখোমুখি হতে বা পালিয়ে যেতে প্রস্তুত করে। তবে ভয় যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে ওঠে, তা দুশ্চিন্তা জনিত ব্যাধি ও ফোবিয়ার রূপ নেয়।সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের এই বিষয়ে নতুন আলোকপাত করেছে—মস্তিষ্ক কীভাবে ভয় কাটিয়ে ওঠে এবং কীভাবে এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরি করা যেতে পারে।

ভয় মূলত আমাদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামক একটি ছোট বাদাম-আকৃতির নিউক্লিয়াস ক্লাস্টারের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়, যা টেম্পোরাল লোবের গভীরে অবস্থিত। যখন আমরা কোনো ভীতিকর উদ্দীপনার মুখোমুখি হই, অ্যামিগডালা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শরীরকে ‘লড়ো বা পালাও’ প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত করতে নানা শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটায়—যেমন হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি ও সজাগতা বৃদ্ধি। তবে অ্যামিগডালা একা কাজ করে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণে জড়িত প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে এবং সম্ভাব্য হুমকি কতটা বাস্তব তা নির্ণয় করে। এই দুটি মস্তিষ্ক অঞ্চলের পারস্পরিক সম্পর্ক ভয় ব্যবস্থাপনায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ভয়ের বিলুপ্তি (fear extinction) প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করেছে—অর্থাৎ, যেসব উদ্দীপনা একসময় ভয় জাগাতো, মস্তিষ্ক কীভাবে সেগুলোর প্রতি ভয় কমিয়ে আনে তা বোঝার চেষ্টা। পশু মডেল, বিশেষ করে ইঁদুরের উপর চালানো গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়ায় জড়িত স্নায়ু সংযোগ নিয়ে ধারণা পেয়েছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো—ভয় বিলুপ্তি চলাকালীন প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নির্দিষ্ট কিছু নিউরন সক্রিয় হয়। এই নিউরনগুলো অ্যামিগডালার কার্যকারিতা দমন করে, ফলে ভয়ের প্রতিক্রিয়া কমে আসে। অর্থাৎ এই নিউরনগুলোর কার্যকারিতা বাড়ালে ভয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়তে পারে।

এছাড়া নিউরোট্রান্সমিটার যেমন ডোপামিন ও সেরোটোনিনের ভূমিকাও চিহ্নিত হয়েছে। এই রাসায়নিক পদার্থগুলো মেজাজ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং ভয়ের প্রক্রিয়ায় জটিল বায়োকেমিক্যাল পরিবেশ তৈরি করে। এই জৈব-রাসায়নিক ও স্নায়ু সংযোগের মিথস্ক্রিয়া বোঝার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন ওষুধ তৈরি সম্ভব হতে পারে। এই আবিষ্কারগুলো শুধুমাত্র মৌলিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, তা দুশ্চিন্তা ও ফোবিয়ার চিকিৎসায় নতুন পথ খুলে দেয়। বর্তমানে প্রচলিত এক্সপোজার থেরাপির মতো পদ্ধতিগুলো ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভয় মোকাবেলা শেখায়। কিন্তু এর পেছনে থাকা স্নায়ুবিজ্ঞান বুঝে থেরাপির আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক রূপ তৈরি সম্ভব।

উদাহরণস্বরূপ যদি নির্দিষ্ট স্নায়ু সংযোগগুলোকে সক্রিয় বা উদ্দীপিত করা যায়, যেমন ট্রান্সক্র্যানিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (TMS)-এর মাধ্যমে, তাহলে ভয় বিলুপ্তি আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে ঘটানো যেতে পারে। একইসাথে নিউরোট্রান্সমিটার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে তৈরি নতুন ওষুধ এমন ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক হতে পারে, যারা অতিরিক্ত ভয় বা উদ্বেগে ভোগেন। ভয় কাটিয়ে ওঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্মৃতি। অতীত অভিজ্ঞতার স্মৃতি আমাদের ভয়ের প্রতিক্রিয়া গঠন করে। ভয় বিলুপ্তির প্রক্রিয়ায় কেবল ভয় দমন নয়, বরং নতুন নিরাপদ স্মৃতি তৈরি করাও জড়িত, যা আগের ভয়ভীতিক উদ্দীপনার সঙ্গে যুক্ত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কাউকে নিরাপদ পরিবেশে পূর্বে ভীতিকর কোনো কিছুর মুখোমুখি করা হয়, তখন মস্তিষ্ক নতুন, ভয়হীন সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করে। এই স্মৃতির নমনীয়তা থেরাপির নতুন কৌশল যেমন “memory reconsolidation” ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখায়। ভয় এবং তার বিলুপ্তি নিয়ে চলমান গবেষণা বেশ কিছু আকর্ষণীয় দিক উন্মোচন করছে। যেমন—ভয়ের প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত পার্থক্য বুঝতে পারলে পারসোনালাইজড থেরাপি তৈরি করা যাবে। জিনগত উপাদান অনেক সময় ভয় কাটিয়ে ওঠার দক্ষতাকে প্রভাবিত করে, যে অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি সাজানো সম্ভব হতে পারে।

এছাড়াও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মতো প্রযুক্তি এক্সপোজার থেরাপিতে প্রয়োগ করে ভয় বিলুপ্তির পদ্ধতি আরও কার্যকর করা যেতে পারে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ পরিবেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি অনুকরণ করা সম্ভব, যাতে ব্যক্তি নিজের ভয় অনুশীলন করতে পারেন এবং গবেষকেরা সরাসরি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। মস্তিষ্ক কীভাবে ভয় কাটিয়ে ওঠে তা আবিষ্কার মানব মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানে একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি। ভয়ের পেছনে থাকা জটিল স্নায়ুবিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলো অনুধাবনের ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এই পথে গবেষণা অব্যাহত থাকলে, মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় আরো কার্যকর পদ্ধতির বিকাশের সম্ভাবনা প্রবল।

যতই আমরা মস্তিষ্কের এই ভয়-নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা নিয়ে জানছি, ততই আমরা আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক সুস্থতার রহস্যের আরো কাছে পৌঁছাচ্ছি। ভয় ও উদ্বেগের যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের জন্য এটি এক আশাব্যঞ্জক বার্তা—মুক্তির পথ এখন আরও স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের চাপে চীনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার লড়াই

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চীনা পণ্যে ১৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর চীনের বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা আন্তর্জাতিক বাজারে এক সংকটময় অবস্থায় পড়েছেন। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল যেসব প্রতিষ্ঠান লাঞ্চ বক্স, হোম গুডসসহ দৈনন্দিন পণ্য তৈরি করত, তারা হঠাৎ করেই ক্রেতা হারিয়ে এখন দেশীয় বাজারে ফেরার চেষ্টা করছে। এই সংকট মোকাবিলায় চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Rednote-এ এক নতুন প্রবণতা দেখা গেছে। উদ্যোক্তারা সেখানে লাইভস্ট্রিমের মাধ্যমে মার্কিন বাজারের জন্য প্রস্তুতকৃত পণ্যগুলো চীনা ক্রেতাদের কাছে ছাড়ে বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছেন। এটি শুধুই বিক্রির কৌশল নয়, বরং একধরনের ‘প্রতিরোধের ভাষা’ হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। “Save the factory” কিংবা “China can make it”—এমন সব হ্যাশট্যাগ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

এই উদ্যোগে দেশের বড় প্রতিষ্ঠান যেমন JD.com ও আলিবাবার মালিকানাধীন Freshippo-ও যুক্ত হয়েছে। JD.com সরকার-সমর্থিত প্রচারণার অংশ হিসেবে একটি নতুন ফান্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ২৭.৩৫ বিলিয়ন ডলার। উদ্দেশ্য—রপ্তানিকারকদের স্থানীয় বাজারে টিকে থাকার সুযোগ করে দেওয়া। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংজু শহরে অনুষ্ঠিত চীনের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্যের মেলা ক্যান্টন ফেয়ারে উপস্থিত রপ্তানিকারকেরা বলছেন—যুক্তরাষ্ট্রের বাজার তাঁদের জন্য এখন কার্যত বন্ধ ।রপ্তানি খাতে কাজ করা বিশ্লেষকেরা একে নিছক বিপণন বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বরং তাঁরা বলছেন, এমন বিপণন কৌশল সময়োপযোগী এবং কার্যকর।

তবে রেডনোটে লাইভস্ট্রিম করা বেশ কয়েকজন বিক্রেতা রয়টার্সের সঙ্গে যোগাযোগে সাড়া না দেওয়ায় বিষয়টির প্রামাণ্যতা নিয়ে কিছু সংশয়ও তৈরি হয়েছে। তবুও ডিজিটাল পরামর্শক অ্যাশলে দুদারেনক মনে করেন, এই সংকটের মধ্যেও চীনের মধ্যে এক ধরনের ঐক্যবোধ তৈরি হচ্ছে—যা জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দিতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি বৃদ্ধির একটি মনস্তাত্ত্বিক জোগান দেবে ।এই সংকট হয়তো নতুন বাজারের সন্ধানে চীনা উদ্যোক্তাদের আরও সাহসী করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক-নীতির ফলে সংকট তৈরি হলেও, তা দীর্ঘমেয়াদে চীনের ভোক্তা মনস্তত্ত্ব এবং বিপণন কৌশলে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটাতে পারে।

পাকিস্তানের কাছে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সম্পদ ফেরতের দাবি জানাচ্ছে বাংলাদেশ

১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদ থেকে ন্যায্য হিস্যা হিসেবে ৪.৫২ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই দাবির মধ্যে রয়েছে তহবিল, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ। দীর্ঘ ১৫ বছর পর আগামী ১৭ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এই দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই দাবির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পাঠানো ২০ কোটি ডলারের বৈদেশিক সহায়তা। এই অর্থ স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকা শাখায় থাকলেও, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ব্যাংকটির লাহোর শাখায় স্থানান্তর করা হয়।

এছাড়াও, স্বাধীনতার পর পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত বহু বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা নিজ দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু তারা দেখতে পান, পাকিস্তান সরকার তাদের জমাকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ড ও সঞ্চয়পত্রের অর্থ আর ফেরত দেয়নি।এই অর্থগুলোও ৪.৫২ বিলিয়ন ডলারের মোট দাবির অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত প্রমাণ সংগ্রহ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবি উপস্থাপনের জন্য একটি সুসংহত ভিত্তি তৈরি করেছে, যেখানে বকেয়া অর্থের বিভিন্ন উপাদান স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ইস্যুটি চলতি মাসের শেষ দিকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সর্বশেষ পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে। সেবারও ঢাকা অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদ থেকে ন্যায্য হিস্যা দাবি করে। সেই সঙ্গে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ এবং আটকে পড়া পাকিস্তানিদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দাবি জানায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আত্মসাৎ করা ২০ কোটি ডলারের ঘূর্ণিঝড় সাহায্যের অর্থ ফেরতের দাবি বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছে। এর পাশাপাশি, অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদ থেকে প্রায় ৪.৩২ বিলিয়ন ডলারের ন্যায্য হিস্যার দাবিও বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে করে আসছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, কেবল জনসংখ্যার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদের ৫৬ শতাংশের অংশীদার ছিল। বিদেশি মুদ্রা অর্জনে বাংলাদেশের অবদান বিবেচনায় নিলে এই হিস্যা দাঁড়ায় ৫৪ শতাংশে। আর যে কোনো সমতার নীতি অনুসরণ করলেও বাংলাদেশ অন্তত ৫০ শতাংশের দাবি জানাতেই পারে। বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তান সরকারের বিক্রি করা বিভিন্ন সঞ্চয়পত্র ও বন্ডের দায় পরিশোধ করেছে, যেমন প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র এবং আয়কর বন্ড। এই ঋণগুলো পাকিস্তান সরকারের কাছে পাওনা বলে মনে করছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থের মোট মূল্য ছিল ৮৭০.৫৮ কোটি রুপি, যার অন্তত অর্ধেকের দাবিদার বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকারের কিছু ঋণ সিকিউরিটিজের ২১.৩৮ কোটি টাকা দায় নিয়েছে, যার ওপর ঢাকা দাবি করতে পারবে।

যুদ্ধের পরেও গাজায় থাকবে ইসরায়েলের সেনারা

ইসরায়েলের সেনাদের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও গাজার তথাকথিত বিভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্তজ। নিরাপত্তা অঞ্চল বা বাফার জোনে থাকা এসব ইসরায়েলি সেনারা ‘যে কোনো অস্থায়ী বা স্থায়ী পরিস্থিতিতে’ দেশটির মানুষকে সুরক্ষা দেবে। লেবানন ও সিরিয়াতেও নতুন করে তৈরি করা বাফার জোনে দেশটির সেনার অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবেন। বুধবার ইসরায়েল কার্তজ এসব কথা জানিয়েছেন। তিন সপ্তাহ আগে গাজায় নতুন করে অভিযান শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনের ‘দশ শতাংশ ভূখণ্ড’ ইসরায়েল দখলে নিয়েছে জানিয়ে কার্তজ বলেন, ‘এবার অতীতের মতো হবে না। যেসব এলাকা পরিষ্কার যেসব এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়ানো হয়েছে। এবং দখল করা হয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সেসব এলাকা ছাড়ছে না।’

কিন্তু হামাস আবারও জোর দিয়ে বলেছে, যে কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েলের সেনাদের গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে।বুধবার হামাস বলেছে, ‘যুদ্ধ বন্ধ, [ইসরায়েলি সেনাদের] সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, অবরোধ তুলে নেওয়া এবং পুনর্গঠন শুরু করার প্রকৃত নিশ্চয়তা না থাকলে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি একটি রাজনৈতিক ফাঁদে পরিণত হবে।’ ইসরায়েলের ‘দ্য হোস্টেজ অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিজ ফোরাম’ কার্তজের পরিকল্পনাকে ‘উদ্ভট কল্পনা’ বলে মন্তব্য করেছে। গাজায় আটক ইসরায়েলি নাগরিকদের আত্মীয়-স্বজনদের এই সংগঠন বলেছে, ‘তারা [সরকার] প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সবকিছুর আগে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার চেয়ে ভূখণ্ড দখলের দিকে বেশি মনোযোগী।’

ফোরামটি মনে করে, ‘একটি স্পষ্ট ও বাস্তব সমাধান রয়েছে। তা হলো একটি চুক্তির মাধ্যমে এক ধাপে সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া। এ জন্য প্রয়োজন হলে যুদ্ধ শেষ করা।’ ইসরায়েলের আপত্কালীন মজুত সেনা (রিজার্ভিস্ট) ও সাবেক সেনারা সম্প্রতি একাধিক খোলা চিঠিতে হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে জিম্মিদের ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ধারণা করা হয়, গাজায় হামাসের হাতে আরও ৫৯ জন জিম্মি আছেন। তাঁদের মধ্যে বেঁচে আছেন ২৪ জন। এদিকে ইসরায়েলের দেওয়া ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস। প্রস্তাবে হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করতে এবং হামাসের হাতে থাকা জীবিত জিম্মিদের অর্ধেককেই মুক্তি দিতে বলা হয়েছিল।



বাঙালির অভ্যাসগত সংস্কৃতির সময়ান্তরের প্রতিচ্ছবি

সংস্কৃতি অনেকটা নদীর মতো—ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়, পথ পাল্টায়, কিন্তু মূল স্রোতটি থাকে প্রবহমান। আর এই স্রোতের ভেতরেই থাকে অভ্যাস। অভ্যাসগত সংস্কৃতি মানে কেবল আচরণ নয়, তা হলো একটি জাতির অবচেতনে প্রোথিত হয়ে থাকা দৈনন্দিন রীতিনীতির ধারা, যা যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। বাঙালির ক্ষেত্রেও এই অভ্যাস একটি সাংস্কৃতিক ছাপ রেখে গেছে যা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করে। বাঙালি সমাজের অভ্যাসগত সংস্কৃতির শিকড় গেঁথে আছে তার জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে। প্রাক-ঐতিহাসিক সময়ের নদী-কেন্দ্রিক বসতিগুলোয় মানুষ গড়ে তোলে জেলে, কৃষক ও মৃৎশিল্পভিত্তিক সমাজ। বর্ষা ও ফসল-নির্ভর জীবন মানুষকে স্থিরতার অভ্যাস শেখায়—প্রকৃতির ছন্দে তাল মিলিয়ে চলার মানসিকতা তখন থেকেই গড়ে ওঠে। এই সময়কার মূল অভ্যাস ছিল ঋতুভিত্তিক খাদ্য, ঘর ও পোশাক পরিবর্তন, এবং গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে বৌদ্ধ ও পরে হিন্দু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাব বাঙালির আচরণগত অভ্যাসে আনে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার মিশেল।পরিবার হয়ে ওঠে ধর্মাচরণমূলক ইউনিট। ‘অতিথি দেব ভব:’-এর মতো ধারণা তখনকার সমাজে প্রতিফলিত হয় অতিথিপরায়ণতার অভ্যাসে।পরে মুসলিম শাসনামলে যখন পারস্য, তুর্কি ও আরব সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে, তখন সেই অতিথিপরায়ণতা আরেক রূপ নেয়—’মেহমানদারি’। হিন্দু রন্ধনশৈলীতে যেমন নিরামিষ অভ্যাস প্রাধান্য পায়, মুসলিম শাসনে মাংসাশী ও মসলা-নির্ভর রান্নার ছাপ পড়ে। এই যুগে ভোজন ও আচার-আচরণে বহুস্তরীয় অভ্যাস গড়ে ওঠে।

ব্রিটিশ শাসন কেবল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক অভ্যাসেও এক দ্বৈত জগত তৈরি করে দেয়। একদিকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ‘বাবু’ শ্রেণি তৈরি হয়, যারা ব্রিটিশদের মতো চলাফেরা, ডিনার পার্টি, চা খাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়। অন্যদিকে গ্রামবাংলায় তখনও টিকে থাকে চিরাচরিত মোড়লতন্ত্র, আঞ্চলিক রীতি, হাট-বাজার-কেন্দ্রিক জীবন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অভ্যাসগত সংস্কৃতিতে আসে আরও এক নতুন বাঁক। একটি স্বাধীন জাতি গঠনের প্রচেষ্টায় একদিকে জাতীয়তাবাদী উন্মেষ, অন্যদিকে প্রবল সামাজিক পরিবর্তন শুরু হয়। শহুরে মধ্যবিত্তের আবির্ভাব হয়, যারা ঘড়ি-ভিত্তিক সময়ানুবর্তিতা শেখে—স্কুল, অফিস, সরকারী ছুটির রুটিন যা পূর্বে গ্রামীণ জীবনের অবসরে চলা অভ্যাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

টিভি, রেডিও এবং পরে ইন্টারনেট এ সব প্রযুক্তি অভ্যাসকে করে তোলে আরও গতিশীল, কিন্তু একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। একসময় যে বিকেলের সময় মানে ছিল পাড়ার ছাদে বসে গল্প, সন্ধ্যার সময় মানে ছিল আজান ও খিচুড়ির ঘ্রাণ—তা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে স্ক্রিনের নীল আলো ও ব্যক্তিগত সময়ের সংস্কৃতি। অভ্যাসগত সংস্কৃতি সব সময়েই লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। গ্রামীণ বাংলায় নারী মানে গৃহস্থালি, ভোরের রান্না, সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালানো। পুরুষ মানে মাঠের কাজ, হাটে যাওয়া, মুরব্বিদের আসরে বসা। তবে নগরায়নের ফলে এই অভ্যাস ভেঙেছে; নারীরা এখন অফিসে, পুরুষরাও রান্নাঘরে—তবে এই রূপান্তর এখনও অসম্পূর্ণ।

বর্তমান প্রজন্মের অভ্যাস গড়ে উঠছে প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের প্রেক্ষিতে। কিন্তু এই নতুন অভ্যাস—ক্লিক-নির্ভরতা, তাৎক্ষণিকতা, নিঃসঙ্গতা—পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ আত্মীয়তার ধারণার বিপরীতে দাঁড়ায়। প্রশ্ন ওঠে এই নতুন অভ্যাস কি পুরনোকে ধ্বংস করছে? না কি নতুন একটি সংকর সংস্কৃতি গড়ে তুলছে, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা সমবেত? বাঙালি আজও দুপুরে ভাত খায়, সন্ধ্যায় চা খায়, কিন্তু সাথে থাকে মোবাইল ও গ্লোবাল চিন্তা। সে হয়তো শরীরের অভ্যাসে গ্রামীণ, কিন্তু মানসিক অভ্যাসে এক বহুজাতিক সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকে গেছে।

অভ্যাস কখনো শুধু অভ্যাস নয়, তা একটি সত্তার অবয়ব। বাঙালির অভ্যাসগত সংস্কৃতি তার ইতিহাসের সবচেয়ে জীবন্ত পাঠ্যপুস্তক, যেখানে প্রতিটি সময়, শ্রেণি ও পরিচয় একেকটি পৃষ্ঠার মতো খুলে পড়ে। সেই অভ্যাসে আছে গন্ধ—ধানের, ধূপের, ডিজিটালের। এই অভ্যাসগুলো আমাদের সময়ের ছায়া, এবং সেই ছায়াতেই প্রতিফলিত হয় জাতি হিসেবে আমাদের মৌলিক সত্তা।

ঢাকাকে ঘিরে গড়ে তোলা হবে ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ : সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

0

ঢাকা শহরের চারপাশে একটি সুসংগঠিত ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে পানি সম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর অভ্যন্তরে ইতিমধ্যেই ৬টি খাল পুনরুদ্ধার ও খননের কাজ শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে বছর শেষের মধ্যে মোট ১৯টি খাল দখলমুক্ত ও দূষণমুক্ত করে পুনরায় সচল করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার পানি ভবনে বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পানি বিষয়ক গ্লোবাল পার্টনারের প্র্যাকটিস ম্যানেজার সুমিলা গুলায়নির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে উপদেষ্টা এসব তথ্য তুলে ধরেন।

উপদেষ্টা জানান, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ঢাকাকে একটি পরিবেশবান্ধব, জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই শহরে রূপান্তর করা। এজন্য খাল ও নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার জরুরি। ইতোমধ্যে শুরু হওয়া ৬টি খালের কাজ ছাড়াও অতিরিক্ত ১২টি খালও এ বছর পুনরুদ্ধারের আওতায় আনা হবে। এছাড়া, ঢাকা ঘিরে থাকা চারটি গুরুত্বপূর্ণ নদী—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতালক্ষ্যা—দখল ও দূষণমুক্ত করার কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে। উপদেষ্টা বলেন, “যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত করে, সেটা হলো পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন জনগণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে। তারা যখন কোনো সমস্যা শনাক্ত করে এবং দ্রুত সাড়া দেয়, তখন মানুষের আস্থা বাড়ে। এই বিশ্বাস অর্জনই উন্নয়ন কার্যক্রমের সফলতার ভিত্তি।”

বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, “আমরা চাই বিশ্ব ব্যাংক আমাদের এই নদী ও খাল পুনরুদ্ধার উদ্যোগে পাশে থাকুক। নগর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।” সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু প্রকৌশলগত সমাধানের চেয়ে সামাজিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রকৌশলী ও সমাজকর্মীর সমন্বয়ে যদি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মানুষের জরুরি প্রয়োজন ও আবেগের প্রতিফলন প্রকল্পে থাকবে। এটিই আমাদের প্রথম এজেন্ডা হওয়া উচিত।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের প্রধান সমস্যা তিনটি—বন্যা ও ভাঙন, সেচের পানির ঘাটতি এবং পলি জমা। এই সমস্যাগুলো সমাধান না করে যদি আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করি, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।”

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমুল আহসান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পূর্বাঞ্চল) মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ, অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম চৌবে এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম। পরিশেষে উপদেষ্টা পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, “মানুষের আস্থা অর্জন করেই আমরা এই শহরকে জল-সংস্কৃতির নগরীতে রূপান্তর করতে পারি। ব্লু নেটওয়ার্ক শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি জীবিত শহরের প্রাণনির্মাণের প্রচেষ্টা।”

নির্বাচনের সময় ঠিক হবে জুলাই চার্টারের ভিত্তিতে : সামান্তা শারমিন , মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না : নাহিদ ইসলাম

0

গতকাল বিএনপির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকের পর বিকেলে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে এই বৈঠক নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তিনি লেখেন, “…একটি দলকে সন্তুষ্ট করার জন্য যদি প্রধান উপদেষ্টা (নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট) সময় বলতেন, তাহলে এর বাইরের সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষ অসন্তুষ্ট হতো। বিশেষত তখন যখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিরলসভাবে কাজ করছে।” সামান্তা শারমিন আরও লিখেছেন, “(নির্বাচনের) সময় ঠিক হবে জুলাই চার্টারের ভিত্তিতে। তারপর অন্তর্বর্তী সরকারকে দিতে হবে নির্বাচনপ্রক্রিয়ার রোডম্যাপ। বাংলাদেশের জনগণ জানবে কোন কোন বিষয়ে সব পক্ষ একমত হচ্ছে। যদি কোনো রাজনৈতিক দল প্রয়োজনীয় সংস্কারে একমত না হয়, তার ভিত্তিতে তার জনসমর্থন (ভোট) কমবে। তবে একমত হওয়া সংস্কারের পর সবাই নির্বাচনে সোৎসাহে অংশ নেবে।

বিশেষত কদিন আগে বলে ওঠা ‘এই সরকারের কোনো সংস্কার মানব না’ নেতাকে নিয়ে করা বৈঠকে এটুকু সাবধানতা দরকার বৈকি।” উল্লেখ্য, গত ১৬ মার্চ এক আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছিলেন, ওদের (অন্তর্বর্তী সরকার) হাতের, ওদের কলমের কোনো সংস্কার তাঁরা সহজে মানবেন না। সংস্কার করলে, তাঁরা সংশোধন করবেন। অন্যদিকে গতকাল সফররত মার্কিন কূটনীতিকদের সাথে আলোচনা শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহবায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ন্যূনতম সংস্কার নয়, আমরা এখানে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, গুণগত পরিবর্তনের জন্য কাজ করছি। কোনো ধরনের মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া নির্বাচনের দিকে গেলে সে নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হবে না এবং সে নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি অংশগ্রহণ করবে কি না, সেটাও বিবেচনাধীন থাকবে।’

নাহিদ বলেন, ‘আমরা লক্ষ করছি প্রশাসন আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ অবলম্বন করছে। অনেক জায়গায় এবং মাঠপর্যায়ে যে ধরনের চাঁদাবাজি চলছে, সেই জায়গায়ও মাঠ প্রশাসন আসলে নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। আমরা বলেছি, যদি এ ধরনের একটা প্রশাসন থাকে, তাহলে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের জন্য একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন, আমলাতন্ত্র এবং পুলিশ আমাদের ঠিক করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া নির্বাচনের টাইমফ্রেম আমরা প্রাথমিকভাবে সমর্থন করছি, কিন্তু নির্বাচনের আগে অবশ্যই কি কি কাজ করে নির্বাচনে যেতে হবে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বিচার, বিচারের রোডম্যাপ দেওয়া এবং সংস্কার ও জুলাই সনদ কার্যকর করা ইত্যাদি ব্যতীত নির্বাচনের সময় নিয়ে কথা বলে আসলে লাভ নেই।

‘দ্য ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট’ এবং আমাদের সময়

0

ইতিহাসের পাতায় যখনই কোনো প্রজাতন্ত্র আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়ে, যখন রাজনৈতিক আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে এক তীব্র সংঘর্ষ ঘটে তখনই যেন ফিরে আসে এক নাম, নিক্কোলো ম্যাকিয়াভেলি। তাঁর রচনাগুলোর মধ্যে এমন এক রাজনৈতিক বোধ নিহিত, যা সময়কে অতিক্রম করে এসে প্রতিটি যুগে নতুনভাবে উচ্চারিত হয়। এই বোধকেই রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা ‘The Machiavellian Moment’ নামে চিহ্নিত করেন— একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংকট, যেখানে নৈতিকতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নির্দিষ্ট কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

কিন্তু এই “ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট” কী?

এটি সেই মুহূর্ত যখন কোনো সমাজ রাজনৈতিক ও নৈতিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে পড়ে। যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা রক্ষার জন্য আদর্শ নয়, বাস্তবতা, কৌশল ও মানবস্বভাবের অসামঞ্জস্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই মুহূর্ত রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি নীরব চুক্তিভঙ্গের সময় — যেখানে ‘সততা’ আর ‘চতুরতা’-র মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি জাতি ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করে। ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন রাজনৈতিক চিন্তার এক উগ্র বাস্তববাদী। তাঁর মতে, রাজনীতি নীতিশাস্ত্রের শাখা নয়, মানব প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা এবং রাজনৈতিক সুযোগ-সন্ধানীতার বাস্তব প্রয়োগ। ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে তিনি বলেন, “It is better to be feared than loved, if you cannot be both।” এই বক্তব্য তাঁকে পাশ্চাত্য নৈতিক রাজনীতির বিপরীতে এক বিতর্কিত স্থানে দাঁড় করায়।

তবে ম্যাকিয়াভেলি নৈতিকতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। তাঁর ‘Discourses on Livy’ গ্রন্থে একটি রিপাবলিকের টিকে থাকার জন্য “সিভিক ভার্চু” বা নাগরিক গুণাবলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য বলে বিবেচিত হয়েছে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, কেবল একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা নয়, একটি কার্যকর ও সতর্ক নাগরিক সমাজই একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে। তাই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ছিল দ্বৈত প্রকৃতির। একদিকে নিষ্ঠুর বাস্তবতা, অন্যদিকে গঠনমূলক নাগরিকতা।

“দ্য ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট” ধারণাটি প্রধানত কোয়েন্টিন স্কিনার এবং জে.জি. পোককের বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পোকক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Machiavellian Moment: Florentine Political Thought and the Atlantic Republican Tradition-এ বলেন, এই ধারণা এমন এক সময়কে নির্দেশ করে যখন একটি প্রজাতন্ত্র নিজস্ব নৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শের গভীরে এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “আমরা আদর্শগতভাবে সত্যিই স্বাধীন? নাকি ক্ষমতা আর স্বার্থপরতার দাসত্বে বন্দি?” এই মোমেন্টে ব্যক্তিরা আর রাষ্ট্রের প্রতি নিছক আনুগত্য দেখায় না। তারা প্রশ্ন তোলে—রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কারা ক্ষমতায় এবং সেই ক্ষমতার ভিত্তি কতখানি ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই দ্বন্দ্বের মুহূর্তেই আসে এক ধাক্কা — যা সমাজকে হয় আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যায়, নয়তো এক ভয়ঙ্কর কর্তৃত্ববাদী ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক ম্যাকিয়াভেলিয়ান প্রতিধ্বনি –

বাংলাদেশে বারবার এই ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট ফিরে এসেছে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আদর্শ ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমতা। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, একনায়কতন্ত্র, সামরিক শাসন এবং গণতন্ত্রের নামে দলীয় স্বার্থ রাষ্ট্রকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ১৯৭৫-এর পরিবর্তন, ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলন কিংবা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনী সংকট—প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা দেখি এক ম্যাকিয়াভেলিয়ান দ্বিধা, জনগণের ভোটে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কি আদৌ জনগণের অধিকারকে রক্ষা করছে, নাকি কৌশল, ভয় এবং প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ক্ষমতার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করছে?

এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই আজকের বাংলাদেশও এক দীর্ঘ “ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট”-এর ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। নাগরিকদের মনে প্রশ্ন—রাজনীতির নামে কি কেবল ক্ষমতার পুনঃউৎপাদন ঘটছে? আদর্শের মৃত্যু কি কেবল অতীতের ইতিহাস বইয়ে সীমাবদ্ধ? যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, হাঙ্গেরি কিংবা ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশে ম্যাকিয়াভেলিয়ান চিন্তার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায়। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, পুতিনের কৌশলী কর্তৃত্ববাদ, অথবা নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি—সবখানেই আমরা দেখি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নৈতিকতাকে পাশ কাটিয়ে বাস্তববাদ ও জনমত প্রভাবের এক অনিবার্য খেলা।

ম্যাকিয়াভেলির শিয়ালের মতো চতুরতা আর সিংহের মতো ভয়ের এই নীতি আজও সমানভাবে কার্যকর। এই কারণেই “ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট” কেবল ইতিহাসের একটি ব্যাখ্যা নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বাস্তবতার ভাষ্য। ‘দ্য ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট’ আমাদের সময়ের দর্পণ। এটি কেবল রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং নাগরিক পরিচয়ের, আদর্শের, এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এটি এক দার্শনিক আহ্বান “আমরা কি কৌশলের শিকার হয়ে যাব, নাকি আদর্শের পথে অবিচল থাকব?” ম্যাকিয়াভেলি হয়তো নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর লেখার গভীরে লুকিয়ে ছিল এক আশঙ্কা—যদি নাগরিকেরা জাগ্রত না হয়, তবে রাষ্ট্র কেবল একটি কর্তৃত্বের মেশিনে পরিণত হবে। তাই এই মোমেন্টে আমাদের দায়িত্ব হলো প্রশ্ন করা, বিশ্লেষণ করা এবং এমন একটি রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলা যা নৈতিকতাকে ত্যাগ না করে বাস্তবতাকে বোঝে।